img

দুর্ভোগে অতিষ্ঠ আমি, আমার এই প্যাঁচাল

প্রকাশিত :  ০৬:৩৬, ০৯ এপ্রিল ২০২৬

দুর্ভোগে অতিষ্ঠ আমি, আমার এই প্যাঁচাল

আবদুল হামিদ মাহবুব

পৃথিবী সব সময়ই অস্থির। কোথাও না কোথাও কিছু একটা ঘটতেই থাকে। আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনী কি শোনা যাচ্ছে? আগাম কেউই কিছু বলতে পারবেনা, হুট করে কখন কি ঘটে যাবে।ওইসব বড় বড় মাথাদের বিষয়। একজন সাধারন মানুষ হিসাবে আমার সমস্যা, আমার কাছে বড় বিষয়। হয়তো দেশের অন্য কোন নাগরিক, তার কাছে তার নিজের সমস্যা আমার সমস্যা থেকেও আরো অনেক বড় মনে হতে পারে। আমি লিখতে পারি, তাই সেটা প্রকাশ করি। সেই সমস্যাগ্রস্ত নাগরিক হয়তো লিখার অভ্যাস গড়ে তুলেননি। সে কারণে তার সমস্যাটা চাপা পড়ে থাকে। আমার কথাগুলো পাঠক সাধারণের ভালো নাও লাগতে পারে। কিন্তু পাঠকের সামনে প্রকাশ করতে না পারলে আমার ভেতর অস্বস্তিক কাজ করবে। তাই এই প্যাঁচাল লিখছি। 

আমার পাঠক জানেন, আমি মফস্বলের বাসিন্দা।আগে মৌলভীবাজার পৌরসভার ভিতরেই নিজেদের বাসায় বসবাস করতাম। কিন্তু বর্ষায় জলাবদ্ধতার সমস্যার কারণে প্রায় আড়াই বছর হলো শহরের লাগোয়া পাহাড়ি এলাকায় বাসা নিয়ে চলে এসেছি।শহরের কোলাহলমুক্ত পরিবেশে সবুজের কাছাকাছি থাকায় মন ফুরফুরে থাকে ঠিকই। কিন্তু এতদিন শহরে থাকায় সেই প্রিয় শহরের কথা ভুলতে পারিনা। প্রতিদিন সম্ভব না হলেও, অন্তত সপ্তাহে একদিন শহরের সাথে যোগাযোগ রাখতে চেষ্টা করি।

মাসের প্রথম দিন ব্যাংকে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম। যাওয়ার পথে আমাদের পৌরসভায় (মৌলভীবাজার পৌরসভা) ঢুকলাম। চার মাস আগে গিয়ে একবার বলে এসেছিলাম, মৌলভীবাজার সরকারি মহাবিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশ হয়ে যাওয়া সড়কখানার বেহাল দশার কথা। এই সড়ক বড়বাড়ি হয়ে সোনাপুর পর্যন্ত পৌরসভার অংশ। কয়েক বছর ধরে এই সড়কে কোন রক্ষণাবেক্ষণ কাজ হচ্ছে না। আমি সহ এলাকায় বসবাস করা অনেক সরকারি কর্মকর্তা ওই সড়ক দিয়ে আসা-যাওয়া করেন। আর কেউ বেহাল দশা দেখেন কিনা আমি জানিনা! এই সড়ক দিয়ে যেতে যেতে পড়েছে কমলগঞ্জ উপজেলায় কালেঙ্গা। সেই কালেঙ্গায় প্রায় ৪০ সহস্র মানুষের বসবাস। বেশির ভাগই নিম্ন আয়ের মানুষ। সবাইকে এই সড়ক দিয়ে আসা-যাওয়া করতে হয়। প্রতিদিন সিএনজি চলে কয়েকশত। বাস ট্রাকও চলে। মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সিবাজার, রহিমপুর, শমশেরনগর, পতনউষার এই ইউনিয়ন গুলোর কিছু অংশের মানুষ জেলা শহরের সাথে যোগাযোগের বাইপাস হিসাবে এই সড়ক ব্যবহার করেন। একজন পীর সাহেবের মাজার আছে কালেঙ্গায়। সেই মাজারে প্রতিদিন দেশের দূরদূরান্ত থেকে লোক আসেন বড় বড় কোচ (বাস) ভাড়া করে। এই সড়ক নিয়ে স্থানীয় সরকার (এলজিইডি) ও পৌরসভার মধ্যে টানা-হেচড়া ছিল দীর্ঘদিন। আমি নিজেও খুঁজে পাচ্ছিলাম না এই সড়কের মূল মালিক কারা?

পূর্বে একবার এই সড়কের কাজ করিয়েছে মৌলভীবাজার পৌরসভা। আরেকবার এই সড়কে কাজ করায় স্থানীয় সরকার অর্থাৎ এলজিইডি। খোঁজখবর নিয়ে জেনেছিলাম দুই কর্তৃপক্ষই তখন কাজ করিয়েছিল তাদের তহবিলের খরচ দেখানোর জন্য। হায়রে লুটপাট! বিপত্তি এখান থেকেই শুরু হয়।

সেই চার মাস আগে গিয়ে জানতে পেরেছিলাম পৌরসভা এলজিইডির সাথে একটা সমোঝতা  করতে পেরেছে। তারাই এখন সড়কের উন্নয়নের কাজ করাবে। এর জন্য পাঁচ কোটি টাকার একটি প্রকল্প তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। আজও যখন গিয়ে কথা বললাম, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী সেই পুরনো বয়ান শোনালেন। এখনো প্রকল্প অনুমোদন হয়ে আসেনি, তাই কিছু করতে পারছেন না। মধ্যে কিছু ইট দিয়ে মেরামতের চেষ্টা করা হয়েছিল। অত্যধিক ভারী গাড়ির চাকায় পীষ্ঠ হতে হতে সেই সব ইটের অস্তিত্ব প্রায় শেষ হয়ে গেছে। পুরো রাস্তা বড় বড় গর্ত হয়ে আছে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে এই সড়ক দিয়ে মানুষ পায়ে হেঁটেও চলতে পারবে কিনা আমার সন্দেহ আছে! বর্ষার আগে সড়কটি আদৌ মেরামত হবে কিনা এই এলাকার মানুষ সন্দিহান। মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে জেলা প্রশাসন-সহ (পৌর প্রশাসক) কর্তৃপক্ষ এই সড়কের প্রতি সুনজর দেবেন এটাই কাম্য। ইতোমধ্যে আমরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি সম্মানিত সংসদ সদস্যদেরও পেয়েগেছি। এই সড়কের অংশ পড়েছে সংসদীয় আসন মৌলভীবাজার-৩ ও মৌলভীবাজার-৪-এ। দুই আসনের সংসদ সদস্য উদ্যোমী ব্যক্তি। আমি দুজনকেই ভালো ভাবে জানি। এই লেখা তাদের নজরে গেলে নিশ্চয় সুদৃষ্টি দেবেন। এই সুযোগে আমি নির্বাচিত সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান ও মুজিবুর রহমান চৌধুরীকে অভিনন্দন জানিয়ে তাদের সাফল্য কমনা করছি।

সড়কের কথা বললাম। এখন বলি মৌলভীবাজার পৌরসভার প্রাণ প্রবাহ যার মাধ্যমে রক্ষা হয় সেই \'কোদালিছড়ার\' কথা। গত ক\'মাস ধরে \'কোদালিছড়া\'য়ও স্রোত নেই। ছড়ার পুরো পানি বদ্ধ হয়ে আছে। ময়লা আবর্জনা পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কারণ এই ছড়ার ভাটিতে পাঁচটি স্থানে বাঁধ দিয়ে রাখা হয়েছে। কৃষকরা \'কোদালিছড়া\'র পানি দিয়ে বোরো চাষের জন্য এইসব বাঁধ দিয়েছেন। বৃষ্টি নেমে গেছে যদিও; পুরোদমে বর্ষা নামার আগে এই বাঁধগুলো পুরো কেটে না দিলে পৌর শহরের অধিকাংশ এলাকার ঘরবাড়ি প্লাবিত হতে পারে। গত বছরও এমন হয়েছিলো।

এই বাঁধগুলো অপসারণের বিষয়েও পৌর কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বললাম। কিন্তু জানলাম যেটা, সেটা হচ্ছে; বাঁধ তো পৌরসভার ভেতরে নয়, সেগুলো পড়েছে মোস্তফাপুর ও গিয়াসনগর ইউনিয়নে। এখানে পৌর কর্তৃপক্ষের কিছু করণীয় নেই। তা হলে বাঁধ অপসারণ কে করবে এখন? বর্ষার বৃষ্টি নামার আগে এইসব বাঁধ অপসারিত না হলে শহরের সৈয়ারপুর, ফাটাবিল, গীর্জাপাড়া, আরামবাগ, কলিমাবাদ, কাঁজিরগাও, বেরিরচর,গোবিন্দশ্রী, ধরকাপন, চৌমুহনা, পশ্চিমবাজার, এলাকার মানুষের কপালে দুর্ভোগ আছে। জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসাবে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন, একসময়ে জনপ্রিয় ছাত্র নেতা মৌলভীবাজার সরকারি মহাবিদ্যালয়ের নির্বাচিত ভিপি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আমার খুবই প্রিয়জন মিজানুর রহমান মিজান। উনাকে এবিষয়ে দৃষ্টি দেওয়ার অনুরোধ করছি। কোদালিছড়ার পানি প্রবাহ ঠিক না করলে তিনিও শহরের যে এলাকায় বসবাস করেন সে এলাকার মানুষও দুর্ভোগে পড়বে।

গত বছর বৃষ্টির জমাট পানিতে তলিয়ে অনেক দোকান মালিকের লক্ষ লক্ষ টাকার মালামাল নষ্ট হয়েছিল। অনেক বাসা বাড়ির আসবাবপত্র, কাপড়-চোপড়, বইপত্র, জরুরী কাগজ বিনষ্ট হয়েছে। এবারও কি তাহলে সেই অবস্থাই হবে? সময় থাকতে সংশ্লিষ্টরা সজাগ হন। আমার এই লেখা পড়ে কেউ কেউ হয়তো ক্ষুব্ধ হবে, কেউ কেউ গালিও দেবেন। বলবেন বর্ষার খবর নেই, এখন কেনো এসব লেখা?

পৌরসভা থেকে বের হয়ে ব্যাংকের কাজ সেরে হাঁটতে হাঁটতে চৌমহনা পর্যন্ত গিয়েছিলাম। সেখানে দৈনিক সমকাল প্রতিনিধি নুরুল ইসলামকে পেলাম। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতা বিভাগে লেখাপড়া করা মানুষ। মফস্বলে থেকে সাংবাদিকতাই করছে। তার সাথে ছিল ডেইলি স্টারের মিন্টু দেশোয়াল। তাদেরকেও জানিয়ে আসলাম এই সমস্যার কথা। মিন্টু তার স্বভাব সুলভ হাঃ হাঃ করে হাসি দিয়েই গেল। বললাম খোঁজখবর নিয়ে নিউজ করার জন্য। করবে কিনা জানিনা! অবশ্য তাদের সাথে আমার আরো অনেক প্রসঙ্গে কথা হয়েছে। রাজনীতিসহ আমার ইদানিংকালের লেখালেখির ধরনধারণ বাদ যায়নি।

দীপ্ত টিভির তরুণ এক সাংবাদিকের সাথেও পরিচয় হলো। সিনিয়র হিসেবে তাকেও কিছু \'ছবক\' দিলাম। বললাম বাবার টাকা পয়সা থাকলে সাংবাদিকতা পেশায় থাকো, না হয় অন্য কিছু করার চিন্তা মাথায় রাখো। চাঁদাবাজ সাংবাদিক হয়ো না। সে অবশ্য জানিয়েছে, সরকারি চাকরির চেষ্টায় আছে। শুনে আমার ভালো লাগলো।

দুর্ভোগে অতিষ্ঠ আমি। তাই আমার এই প্যাঁচাল। এটা কারো ভালো লাগার কথা নয়। তাই এখানেই থামি। ধৈর্য নিয়ে যারা পড়বেন, সবাই ভালো থাকবেন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব। সাংবাদিকতা বিষয়ক প্রকাশিত গ্রন্থ: ‘গণমাধ্যম সাংবাদিকতা দেশ দশের আমার কথা’।

img

মুহম্মদ জাফর ইকবাল দুবছর কই ছিলেন?

প্রকাশিত :  ১৫:৪২, ২৫ জুলাই ২০২৬

আবদুল হামিদ মাহবুব

বাংলাদেশের সাহিত্য, বিজ্ঞানচর্চা ও শিশু-কিশোর সাহিত্যের জগতে মুহম্মদ জাফর ইকবাল একটি অত্যন্ত পরিচিত নাম। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি অসংখ্য তরুণ-তরুণীকে বই পড়তে শিখিয়েছেন, বিজ্ঞানমনস্ক হতে উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সাহিত্যের ভাষায় তুলে ধরেছেন। ঠিক এই কারণেই তার প্রতিটি বক্তব্য, প্রতিটি রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তও সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে একটি অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি এবং সেখানে দেওয়া বক্তব্য নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হচ্ছে; গত দুই বছর তিনি কোথায় ছিলেন?

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মুহম্মদ জাফর ইকবালকে আর দেশের জনপরিসরে এক্কেবারেই দেখা যায়নি। এরপরও দীর্ঘ সময় তিনি প্রকাশ্যে ছিলেন না। হঠাৎ করেই ২০২৬ সালের  ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে এক অনুষ্ঠানে তাকে দেখা গেল। সেখানে তিনি নিজেই বলেন, তারা গত দুই বছর ধরে ‘নির্বাসনে’ আছেন। এই একটি শব্দই জনমনে নতুন কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। কারণ ‘নির্বাসন’ সাধারণত এমন একটি অবস্থা বোঝায়, যেখানে রাষ্ট্র কাউকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে অথবা দেশে ফিরে আসার সুযোগ সীমিত করে। কিন্তু মুহম্মদ জাফর ইকবালের ক্ষেত্রে এমন কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত বা প্রজ্ঞাপনের তথ্য এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।

এই কারণেই প্রশ্ন উঠছে, তিনি কি স্বেচ্ছায় দেশ ছেড়েছেন, নাকি এমন কোনো বাস্তবতা ছিল যা তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছে? যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তাহলে সেটি কী? আবার যদি তিনি নিজ সিদ্ধান্তে বিদেশে অবস্থান করে থাকেন, তাহলে তাকে ‘নির্বাসিত’ বলা কতটা যথাযথ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় তার একটি সংক্ষিপ্ত লেখা বিশেষ বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। সেখানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের একটি স্লোগানের অংশবিশেষ উল্লেখ করে লিখেছিলেন, \"ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমার বিশ্ববিদ্যালয়, আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়। তবে আমি মনে হয় আর কোনোদিন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে চাইব না। ছাত্র-ছাত্রীদের দেখলেই মনে হবে, এরাই হয়তো সেই \'রাজাকার\'। আর যে কয়দিন বেঁচে আছি, আমি কোনো রাজাকারের মুখ দেখতে চাই না। একটাই তো জীবন। সেই জীবনে আবার কেন নতুন করে রাজাকারদের দেখতে হবে?\" তার এই মন্তব্য অনেকের কাছে অত্যন্ত আপত্তিকর মনে হয়েছে। কারণ আন্দোলনের স্লোগান ছিল, \"তুমি কে? আমি কে? রাজাকার রাজাকার।\" পরের অংশ ছিল; \"কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার স্বৈরাচার।\" তিনি শিক্ষার্থীদের স্লোগানের প্রথম অংশ নিয়ে সমালোচনা করে শিক্ষার্থীদের কাছে বিরাগভাজন হন। কিন্তু দ্বিতীয় অংশ স্বৈরাচারের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার পেছনে কি রহস্য ছিল? যা তিনি কোন সময়েই খোলাসা করেননি। তার সমালোচকদের অভিযোগ, তিনি তখনকার সরকারের অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই বক্তব্য দিয়েছিলেন।

এরপর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। আন্দোলনে বহু মানুষের মৃত্যু হয়, রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে এবং শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারান। কিন্তু এই পুরো সময়ে মুহম্মদ জাফর ইকবালের কাছ থেকে সেই হত্যাকাণ্ড, রক্তপাত কিংবা পরবর্তী বাস্তবতা নিয়ে তেমন কোনো প্রকাশ্য মন্তব্য শোনা যায়নি। অনেকেই মনে করেন, তার নীরবতা ছিল বিস্ময়কর। আবার অন্যদের মতে, তিনি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বা অন্য কোনো কারণে প্রকাশ্যে আসেননি। কোন ব্যাখ্যাটি সত্য, সেটি একমাত্র তিনিই স্পষ্ট করতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বাংলাদেশ একদিন আবার একাত্তরের আদর্শে ফিরে যাবে। তিনি আরও বলেন, ইতিহাসকে ‘রিসেট বাটন’ টিপে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তার এই বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার দীর্ঘদিনের অবস্থানই প্রতিফলিত হয়েছে। কারণ তার সাহিত্যজীবনের বড় একটি অংশজুড়েই মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্ন ছিল।

কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে। যে মানুষটি শিশু-কিশোরদের দেশপ্রেমের শিক্ষা দিয়েছেন, তিনি কেন এমন একটি সময়ে দেশ ছেড়ে গেলেন, যখন দেশ রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল? যদি তিনি সত্যিই নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করে থাকেন, তাহলে সেই অভিজ্ঞতার কথা খোলাখুলিভাবে বলা কি উচিত নয়? আর যদি তিনি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে বিদেশে থাকেন, তাহলে সেটিও স্পষ্ট করে জানানো দরকার। কারণ জনপরিসরের একজন মানুষের নীরবতা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় জল্পনা-কল্পনার জন্ম দেয়।

আরেকটি বিষয় জনমনে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে কোন আইনি মর্যাদায় অবস্থান করছেন? তিনি কি পর্যটক ভিসায় আছেন, কোনো দীর্ঘমেয়াদি ভিসায় আছেন, স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে আছেন, নাকি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক? এ বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য প্রকাশ্যে নেই। ফলে বিভিন্ন ধরনের গুঞ্জন শোনা গেলেও সেগুলোকে তথ্য হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। তার ঘনিষ্ঠজন কিংবা তিনি নিজেই যদি এ বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দেন, তাহলে এই বিতর্কের অবসান হতে পারে।

একইভাবে বহুদিন ধরেই একটি প্রশ্ন আলোচনায় রয়েছে; মুহম্মদ জাফর ইকবাল কি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন? তিনি দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা ও কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু নাগরিকত্ব নিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ্যে নেই। তাই এটি নিয়ে অনুমান করার চেয়ে তথ্যের অপেক্ষা করাই যুক্তিযুক্ত।

নিউ জার্সির অনুষ্ঠানে তার স্ত্রী অধ্যাপক ইয়াসমিন হকও বলেন, তারা ‘দেশহীন’ অবস্থায় আছেন। এই বক্তব্যও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ ‘দেশহীন’ শব্দটির একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক ও আইনি অর্থ রয়েছে। তারা কি সেই অর্থে দেশহীন, নাকি এটি কেবল মানসিক বেদনার প্রকাশ?সেটিও স্পষ্ট নয়। একইভাবে ‘নির্বাসন’ শব্দটি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, নাকি আইনি বাস্তবতা বোঝাতে; সেটিও ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

মুহম্মদ জাফর ইকবালের সমালোচনা করা যেমন একজন নাগরিকের অধিকার, তেমনি তার দীর্ঘ সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিষয়ক অবদান অস্বীকার করাও ন্যায়সঙ্গত হবে না। তিনি এমন একজন লেখক, যার বই পড়ে বহু তরুণ বিজ্ঞানকে ভালোবেসেছে, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জেনেছে এবং যুক্তিবাদী চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। সেই কারণেই তার কাছ থেকে মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। একজন জনপ্রিয় লেখকের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাখ্যার দাবি তৈরি করে।

আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি রাজনৈতিক নয়, ব্যক্তিগতও নয়; বরং জনস্বার্থের। দুই বছর তিনি কোথায় ছিলেন? কী পরিস্থিতিতে দেশ ছাড়লেন? বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে কী স্ট্যাটাসে আছেন? তিনি কি আবার বাংলাদেশে ফিরবেন? যদি ফিরতে চান, তাহলে কবে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানার আগ্রহ অস্বাভাবিক নয়। কারণ তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরের অন্যতম পরিচিত মুখ।

বিতর্কের চেয়ে স্বচ্ছতা সবসময় বেশি শক্তিশালী। মুহম্মদ জাফর ইকবাল যদি নিজেই এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেন, তাহলে হয়তো অনেক বিতর্কের অবসান হবে। কারণ গুজবের চেয়ে সত্য সবসময় বেশি গ্রহণযোগ্য। একজন লেখকের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ভাষা, আর সেই ভাষায় নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে বলার সাহসও তারই থাকা উচিত।

আজকের বাংলাদেশে মতের ভিন্নতা থাকবে, রাজনৈতিক অবস্থানও ভিন্ন হবে। কিন্তু একজন লেখক, একজন শিক্ষক এবং একজন জনবুদ্ধিজীবী হিসেবে মুহম্মদ জাফর ইকবালের কাছে মানুষ যে জবাবদিহির প্রত্যাশা করবে, সেটিও অস্বাভাবিক নয়। প্রশ্ন করা গণতন্ত্রের অংশ, আবার সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াও জনজীবনের অংশ। এখন অপেক্ষা শুধু একটাই; তিনি কি নিজেই এই নীরবতার অবসান ঘটাবেন?


লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব  ও  যুগ্ম সাধারণ  সম্পাদক, মৌলভীবাজার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল। মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪, ই-মেইল:  [email protected]

মতামত এর আরও খবর