img

যখন নারী সমৃদ্ধ হয়, সমাজ প্রস্ফুটিত হয়

প্রকাশিত :  ০৭:৪১, ০৭ মার্চ ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৯:২৮, ০৭ মার্চ ২০২৬

যখন নারী সমৃদ্ধ হয়, সমাজ প্রস্ফুটিত হয়

হুসনা খান হাসি


একটি সমাজের শক্তি তার নারীদের অবস্থান ও কল্যাণ দিয়ে পরিমাপ করা যায়। যখন নারীরা সুস্থ, শিক্ষিত, সম্মানিত এবং ক্ষমতায়িত হন, তখন সেই সাফল্যের প্রভাব কেবল ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবার আরও স্থিতিশীল হয়, অর্থনীতি শক্তিশালী হয় এবং সমাজে স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য আমাদের একটি গভীর ও রূপান্তরমূলক সত্য স্মরণ করিয়ে দেয়, যখন নারী সমৃদ্ধ হয়, সমাজ প্রস্ফুটিত হয়। এটি কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং বাস্তব ও প্রমাণযোগ্য একটি সত্য।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস বরাবরই অগ্রগতি ও অসম্পূর্ণ কাজের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রতি বছর এটি নারীদের অর্জন উদযাপন করে এবং একই সঙ্গে বিদ্যমান বাধাগুলোর দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য টিকে থাকার চেয়ে এগিয়ে গিয়ে সমৃদ্ধির কথা বলে। সমৃদ্ধি মানে সুযোগের প্রাপ্তি, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং স্বপ্ন দেখার স্বাধীনতা। এটি মৌলিক অধিকার থেকে পূর্ণ অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের দিকে আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

শিক্ষা নারীর অগ্রগতির সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তিগুলোর একটি। যখন কন্যাশিশুরা মানসম্মত শিক্ষা লাভ করে, তারা জ্ঞান, আত্মবিশ্বাস এবং সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি অর্জন করে। শিক্ষিত নারীরা স্থিতিশীল কর্মসংস্থান লাভে সক্ষম হন, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং পরিবারের পক্ষে কথা বলতে পারেন। এর ফলে তাদের সন্তানরাও শিক্ষার পথে এগিয়ে যায়। একজন শিক্ষিত নারী প্রজন্মের পর প্রজন্মকে প্রভাবিত করতে পারেন।

অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যখন নারীরা ন্যায্য মজুরি, সম্পত্তির অধিকার এবং আর্থিক সম্পদের সুযোগ পান, তখন পুরো পরিবার দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের পথে এগিয়ে যায়। নারীরা সাধারণত তাদের আয়ের বড় অংশ পরিবার ও সমাজের উন্নয়নে ব্যয় করেন। নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষুদ্র ব্যবসা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং স্থানীয় বাজারকে শক্তিশালী করে। আর্থিক স্বনির্ভরতা নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও বাড়ায়।

স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা নারীর সমৃদ্ধির অপরিহার্য অংশ। মাতৃত্বকালীন সেবা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা জনস্বাস্থ্যের মৌলিক উপাদান। যখন নারীরা যথাযথ চিকিৎসা পান, শিশুমৃত্যুর হার কমে এবং পরিবারের সার্বিক কল্যাণ বৃদ্ধি পায়। সুস্থ নারী শিক্ষা, কর্মজীবন এবং সামাজিক নেতৃত্বে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন। তাই স্বাস্থ্য কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি সামাজিক বিনিয়োগ।

নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও নারীর অংশগ্রহণ অপরিহার্য। রাজনৈতিক, কর্পোরেট ও সামাজিক অঙ্গনে নারীরা ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন। অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করে। যখন নারীরা নেতৃত্বে থাকেন, তখন নীতিনির্ধারণে শিশু যত্ন, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। প্রতিনিধিত্ব অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে, আর অগ্রাধিকার ভবিষ্যৎ গড়ে।

সমৃদ্ধির জন্য সহিংসতা ও বৈষম্য থেকে মুক্তিও অপরিহার্য। এখনও বহু নারী ক্ষতিকর প্রথা, বৈষম্যমূলক আইন ও সামাজিক পক্ষপাতের শিকার হন। নিরাপত্তা সুযোগের ভিত্তি। নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জনজীবনে পূর্ণ অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ করা কেবল নারীর বিষয় নয়, এটি পুরো সমাজের দায়িত্ব।

ডিজিটাল বিশ্ব নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। প্রযুক্তি শিক্ষা, দূরবর্তী কাজ এবং বৈশ্বিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে অনলাইন হয়রানি ও ডিজিটাল বৈষম্য নতুন চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করেছে। নারীদের নিরাপদ ও সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা আধুনিক সমৃদ্ধির শর্ত। ডিজিটাল লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে পারলে সমাজে উদ্ভাবন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়।

সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারীর সাফল্য সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা ও বৈচিত্র্যময় ভূমিকার স্বীকৃতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। বিজ্ঞান, রাজনীতি, শিল্প কিংবা পরিচর্যা, প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অবদান সমানভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। ইতিবাচক উপস্থাপন তরুণীদের সামনে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

পুরুষ ও ছেলেদের অংশগ্রহণ এই পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। লিঙ্গ সমতা কোনো প্রতিযোগিতা নয়, এটি পারস্পরিক সহযোগিতা। পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে সমান দায়িত্ব ভাগাভাগি করলে সম্পর্ক আরও মজবুত হয়। সহমর্মিতা ও সমর্থন সমাজকে ভারসাম্যপূর্ণ করে তোলে। সমৃদ্ধ নারী ও সচেতন পুরুষ একসঙ্গে সুস্থ সমাজ গড়ে তোলেন।

তৃণমূল উদ্যোগ প্রায়ই বাস্তব পরিবর্তনের সূচনা করে। স্থানীয় নারী সংগঠন ও সমবায়গুলো নিজ নিজ সমাজের চাহিদা ভালোভাবে বোঝে। তারা সাক্ষরতা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয় নিয়ে কাজ করে। যখন এই উদ্যোগগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পায়, তখন তাদের প্রভাব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

সংকটকালেও নারীর ভূমিকা স্পষ্টভাবে দেখা যায়। অর্থনৈতিক মন্দা বা জনস্বাস্থ্য সংকটে নারীরা পরিচর্যাকারী, সংগঠক ও সমস্যার সমাধানকারী হিসেবে এগিয়ে আসেন। যথাযথ সম্পদ ও কর্তৃত্ব পেলে তারা পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে সক্ষম হন। একটি স্থিতিশীল সমাজ গড়ে ওঠে নারীর স্থিতিস্থাপকতার উপর ভিত্তি করে।

পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য আমাদের আশা ও দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সমৃদ্ধ নারী কোনো আলাদা গোষ্ঠী নন, তারা পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, নেতৃত্ব ও সমতার মাধ্যমে নারীর উন্নয়নে বিনিয়োগ করলে পুরো সমাজই তার সুফল পায়। সত্যিই, যখন নারী সমৃদ্ধ হয়, তখন সমাজ প্রস্ফুটিত হয় এবং ভবিষ্যৎ সবার জন্য আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।


হুসনা খান হাসি: টিভি হোস্ট, কলামিস্ট
লন্ডন, ইউকে
০৮/০৩/২০২৬

মতামত এর আরও খবর

img

বিভক্তির রাজনীতি নয়, এখন সময় এসেছে বাংলাদেশকে নিয়ে একসঙ্গে ভাবার

প্রকাশিত :  ১৩:৩৪, ২২ মে ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের রাজনীতি বহু বছর ধরেই যেন এক দীর্ঘ মেরুকরণের গল্প। এখানে মতের চেয়ে পরিচয় বড় হয়ে উঠেছে, যুক্তির চেয়ে উচ্চকণ্ঠের স্লোগান বেশি শোনা গেছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্টেছে ভাষা, বদলেছে প্রতিশ্রুতি, কিন্তু সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা একই থেকেছে—একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ।

এই দেশের মানুষ রাজনীতির কাছে খুব জটিল কিছু চায় না। তারা চায় এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে একজন তরুণ তার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পাবে, একজন কৃষক ন্যায্য মূল্য পাবে, একজন মা তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন। মানুষ এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি চায়, যেখানে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করাই মূল লক্ষ্য নয়; বরং ভিন্নমতকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার মানসিকতা থাকবে।

সময়ের সঙ্গে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে। এখন মানুষ কেবল বক্তৃতা শোনে না, তারা আচরণও দেখে। নেতার ভাষা, সহনশীলতা, ভিন্নমতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি—এসবও আজ রাজনৈতিক মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। সেই জায়গা থেকেই সাম্প্রতিক সময়ে অনেক মানুষের ভেতরে নতুন এক প্রত্যাশার জন্ম হয়েছে। বিশেষ করে তারেক রহমানকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং একটি তুলনামূলকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ভাষার প্রত্যাশাও কাজ করছে।

মানুষ আসলে এমন নেতৃত্ব খোঁজে, যা বিভক্তির দেয়ালকে আরও উঁচু না করে বরং সেতুবন্ধন তৈরি করতে চায়। কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার রাজনীতি প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে না দেখে তাকে গণতান্ত্রিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখতে শেখে। জাতীয় অগ্রগতি কখনো কোনো এক দলের একার অর্জন নয়; এটি সমষ্টিগত সহযোগিতা, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধের ফল।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই—আমরা এখনও অনেক সময় দেশকে নয়, দলকে আগে ভাবি। রাজনৈতিক আনুগত্য এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে নাগরিক পরিচয় আড়ালে পড়ে যায়। অথচ রাষ্ট্র কোনো দলের সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্র মানে কোটি মানুষের শ্রম, স্বপ্ন, সংগ্রাম ও ভবিষ্যতের সম্মিলিত নাম। তাই মতভেদ থাকবে, সমালোচনাও থাকবে; কিন্তু সেই সমালোচনা যদি ধ্বংসের বদলে সংশোধনের পথ দেখায়, তবেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়।

বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। বিশ্ব অর্থনীতি বদলাচ্ছে, প্রযুক্তি নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে, তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক সংঘাতের পুরোনো ধারা ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন। এখন প্রয়োজন এমন এক জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানবসম্পদ, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে সমান গুরুত্ব দেবে।

তরুণদের কর্মসংস্থান, শিক্ষার আধুনিকায়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি এবং সহনশীল সমাজব্যবস্থা—এসব অর্জনের জন্য জাতীয় ঐক্যের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। কারণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতন্ত্রের অংশ হতে পারে, কিন্তু স্থায়ী বিভাজন কখনো উন্নয়নের ভিত্তি হতে পারে না।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যে জাতি সংকীর্ণতার দেয়াল ভেঙে বৃহত্তর স্বার্থে এক হতে পেরেছে, তারাই টেকসই অগ্রগতির পথে এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানুষ—তাদের পরিশ্রম, অভিযোজনক্ষমতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা।

এখন সময় এসেছে সেই শক্তিকে বিভক্তির রাজনীতিতে ক্ষয় না করে উন্নয়নের শক্তিতে রূপান্তর করার। কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস তাদেরই মনে রাখে, যারা মানুষকে ভাঙার নয়, এক করার কথা বলেছে; যারা ক্ষমতার নয়, দেশের ভবিষ্যতের কথা ভেবেছে।

মতামত এর আরও খবর