img

ইরানে নেই শক্তিশালী বিরোধী দল, শাসন পরিবর্তনের সম্ভাবনা ক্ষীণ

প্রকাশিত :  ১৭:৪৮, ০৪ মার্চ ২০২৬

ইরানে নেই শক্তিশালী বিরোধী দল, শাসন পরিবর্তনের সম্ভাবনা ক্ষীণ

নিজস্ব প্রতিবেদক : ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থায় বড় ধরনের কোনো ধস নামলে বা সংঘাত চললে সেখানে দ্রুত রাজনৈতিক পরিবর্তনের যে সম্ভাবনা ট্রাম্প প্রশাসন দেখছে, তা বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, দেশটিতে বর্তমানে এমন কোনো সুসংগঠিত বা স্পষ্ট বিরোধী আন্দোলন নেই, যা বর্তমান ব্যবস্থার বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।

ম্যালকম এইচ কের কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের পরিচালক মাহা ইয়াহিয়া কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই মূল্যায়ন তুলে ধরেন। তিনি বলেন, \"ইরানে এমন কোনো সংগঠিত বিরোধী শক্তি নেই, যারা এই মুহূর্তে দেশের দায়িত্ব নিতে সক্ষম।\"

ইয়াহিয়ার মতে, ইরানে ক্ষমতা নির্দিষ্ট কোনো কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠী, রাজনৈতিক কাঠামো এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। ফলে কোনো একক আন্দোলনের মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া প্রায় অসম্ভব।

শাহের উত্তরসূরি ও কুর্দি বিদ্রোহের বাস্তবতা

বর্তমানে ইরানের বাইরে অবস্থানরত প্রাক্তন শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পুত্রকে একমাত্র ঘোষিত বিরোধী নেতা হিসেবে দেখা হয়। তবে দেশের অভ্যন্তরে তাঁর প্রভাব নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। অন্যদিকে, কুর্দিদের নেতৃত্বে বড় কোনো বিদ্রোহের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা পাল্টে দেওয়ার যে ধারণা পশ্চিমা মহলে রয়েছে, তাকে \'সম্পূর্ণ ভুল হিসাব\' বলে অভিহিত করেছেন ইয়াহিয়া।

সামনের পথ: বিশৃঙ্খলা ও দমন-পীড়ন

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, কোনো কারণে বর্তমান কাঠামোর পতন ঘটলে সেখানে গণতন্ত্রের পরিবর্তে \'অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব\' এবং \'বৃহত্তর বিশৃঙ্খলা\' দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে সংঘাত-পরবর্তী তেহরানে সাধারণ নাগরিকদের ওপর দমন-পীড়নের মাত্রা কমার বদলে আরও বাড়তে পারে।

মাহা ইয়াহিয়া সতর্ক করে বলেন, \"যদি আগামীকালই বোমা হামলা বা বাহ্যিক সংঘাত বন্ধ হয়ে যায়, তবুও ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অত্যন্ত নড়বড়ে ও দুর্বল থেকে যাবে।\"

মতামত এর আরও খবর

img

বিভক্তির রাজনীতি নয়, এখন সময় এসেছে বাংলাদেশকে নিয়ে একসঙ্গে ভাবার

প্রকাশিত :  ১৩:৩৪, ২২ মে ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের রাজনীতি বহু বছর ধরেই যেন এক দীর্ঘ মেরুকরণের গল্প। এখানে মতের চেয়ে পরিচয় বড় হয়ে উঠেছে, যুক্তির চেয়ে উচ্চকণ্ঠের স্লোগান বেশি শোনা গেছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্টেছে ভাষা, বদলেছে প্রতিশ্রুতি, কিন্তু সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা একই থেকেছে—একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ।

এই দেশের মানুষ রাজনীতির কাছে খুব জটিল কিছু চায় না। তারা চায় এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে একজন তরুণ তার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পাবে, একজন কৃষক ন্যায্য মূল্য পাবে, একজন মা তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন। মানুষ এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি চায়, যেখানে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করাই মূল লক্ষ্য নয়; বরং ভিন্নমতকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার মানসিকতা থাকবে।

সময়ের সঙ্গে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে। এখন মানুষ কেবল বক্তৃতা শোনে না, তারা আচরণও দেখে। নেতার ভাষা, সহনশীলতা, ভিন্নমতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি—এসবও আজ রাজনৈতিক মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। সেই জায়গা থেকেই সাম্প্রতিক সময়ে অনেক মানুষের ভেতরে নতুন এক প্রত্যাশার জন্ম হয়েছে। বিশেষ করে তারেক রহমানকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং একটি তুলনামূলকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ভাষার প্রত্যাশাও কাজ করছে।

মানুষ আসলে এমন নেতৃত্ব খোঁজে, যা বিভক্তির দেয়ালকে আরও উঁচু না করে বরং সেতুবন্ধন তৈরি করতে চায়। কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার রাজনীতি প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে না দেখে তাকে গণতান্ত্রিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখতে শেখে। জাতীয় অগ্রগতি কখনো কোনো এক দলের একার অর্জন নয়; এটি সমষ্টিগত সহযোগিতা, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধের ফল।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই—আমরা এখনও অনেক সময় দেশকে নয়, দলকে আগে ভাবি। রাজনৈতিক আনুগত্য এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে নাগরিক পরিচয় আড়ালে পড়ে যায়। অথচ রাষ্ট্র কোনো দলের সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্র মানে কোটি মানুষের শ্রম, স্বপ্ন, সংগ্রাম ও ভবিষ্যতের সম্মিলিত নাম। তাই মতভেদ থাকবে, সমালোচনাও থাকবে; কিন্তু সেই সমালোচনা যদি ধ্বংসের বদলে সংশোধনের পথ দেখায়, তবেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়।

বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। বিশ্ব অর্থনীতি বদলাচ্ছে, প্রযুক্তি নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে, তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক সংঘাতের পুরোনো ধারা ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন। এখন প্রয়োজন এমন এক জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানবসম্পদ, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে সমান গুরুত্ব দেবে।

তরুণদের কর্মসংস্থান, শিক্ষার আধুনিকায়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি এবং সহনশীল সমাজব্যবস্থা—এসব অর্জনের জন্য জাতীয় ঐক্যের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। কারণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতন্ত্রের অংশ হতে পারে, কিন্তু স্থায়ী বিভাজন কখনো উন্নয়নের ভিত্তি হতে পারে না।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যে জাতি সংকীর্ণতার দেয়াল ভেঙে বৃহত্তর স্বার্থে এক হতে পেরেছে, তারাই টেকসই অগ্রগতির পথে এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানুষ—তাদের পরিশ্রম, অভিযোজনক্ষমতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা।

এখন সময় এসেছে সেই শক্তিকে বিভক্তির রাজনীতিতে ক্ষয় না করে উন্নয়নের শক্তিতে রূপান্তর করার। কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস তাদেরই মনে রাখে, যারা মানুষকে ভাঙার নয়, এক করার কথা বলেছে; যারা ক্ষমতার নয়, দেশের ভবিষ্যতের কথা ভেবেছে।

মতামত এর আরও খবর