img

আগামী ১০ বছরের মাইলফলক: উন্নত বাংলাদেশ——কাঠামোগত রূপান্তর ও টেকসই উন্নয়নের একটি সমন্বিত দিকনির্দেশনা

প্রকাশিত :  ১৯:০০, ০৩ মার্চ ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ২২:৪৭, ০৩ মার্চ ২০২৬

আগামী ১০ বছরের মাইলফলক: উন্নত বাংলাদেশ——কাঠামোগত রূপান্তর ও টেকসই উন্নয়নের একটি সমন্বিত দিকনির্দেশনা

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অভিযাত্রায় আগামী ১০ বছর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান এ দেশের মানুষের মনে যে নতুন আকাঙ্ক্ষার জন্ম দিয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি বৈষম্যহীন, উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয়। সরকারের রূপকল্প অনুযায়ী, আগামী ১০ বছরের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে একটি উচ্চ-আয়ের দেশে পরিণত করা, যেখানে মাথাপিছু আয় হবে ১২,৫০০ ডলারের বেশি এবং দারিদ্র্য থাকবে শুধু ইতিহাসের অংশ। তবে এই লক্ষ্য অর্জন কেবল কয়েকটি মেগা প্রকল্প বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না, বরং এর জন্য প্রয়োজন অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে গভীর ও কাঠামোগত সংস্কার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। বর্তমান সরকারের জন্য এই যাত্রা একাধারে যেমন চ্যালেঞ্জিং, তেমনি সম্ভাবনাময়; কারণ বিগত দেড় দশকের উন্নয়নের যে আখ্যান তৈরি করা হয়েছিল, তার অন্তর্নিহিত কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো এখন প্রকট আকারে ধরা দিয়েছে।

উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার এই মহাপরিকল্পনার সবচেয়ে বড় বাধা হলো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য। যখন দেশের মাত্র ১০ শতাংশ ধনাঢ্য ব্যক্তি মোট জাতীয় সম্পদের ৫৮ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, তখন উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে সরকারকে শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, বরং 'অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন'-এর ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। রূপকল্প ২০৪১-এর সফল বাস্তবায়নের জন্য সরকারের অগ্রাধিকার ক্ষেত্রগুলো হওয়া উচিত: ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, স্বাস্থ্য খাতে সাম্য প্রতিষ্ঠা এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ।

সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ব্যাংকিং খাতের শুদ্ধি অভিযান

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হলো তার আর্থিক খাত, যা বর্তমানে চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ ব্যাংকিং ব্যবস্থা উন্নত দেশ হওয়ার পথে প্রধান শর্ত। কিন্তু বিগত দেড় দশকে এই খাতটি রাজনৈতিক ও অলিগার্কিক লুটের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে, যার ফলে খেলাপি ঋণের (NPL) হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬ শতাংশের ওপরে। এস আলম বা বেক্সিমকোর মতো প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছে, যা শুধু আর্থিক বিপর্যয়ই ডেকে আনেনি, বরং সাধারণ আমানতকারীদের আস্থায় বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে। এই ক্ষতি সারাতে বর্তমান সরকারকে 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণ করতে হবে।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে রাজনৈতিক চাপের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করার আইনি সুরক্ষা দিতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে অর্থ ঋণ আদালত আইন ও ব্যাংক-কোম্পানি আইনে আমূল পরিবর্তন এনে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। যে সব ব্যাংক ইতিমধ্যে দেউলিয়া বা অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে, তাদের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া হতে হবে অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে, যাতে সবল ব্যাংকগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে। সম্প্রতি পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার সফলতা নির্ভর করবে কঠোর তদারকি ও সঠিক নিরীক্ষার ওপর।

মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা বর্তমান সরকারের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। যখন মুদ্রাস্ফীতি ১২ শতাংশের ঘরে পৌঁছে যায়, তখন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়ে তাদের জীবনযাত্রার মান নিম্নগামী হয়। শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, যদি না বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং সরবরাহ চেইন সচল রাখা যায়। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনে বিশেষ নজর দিতে হবে। বিগত ১৫ বছরে গড়ে প্রতি বছর ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে বলে বিভিন্ন নথিতে উঠে এসেছে। এই পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তা নেওয়া এবং হুন্ডি প্রতিরোধে রেমিট্যান্স প্রেরকদের জন্য বিশেষ সুবিধা ও ডিজিটাল চ্যানেল সহজ করা জরুরি। আর্থিক খাতের এই বিশৃঙ্খলা দূর করতে না পারলে বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারাবেন, আর পর্যাপ্ত বেসরকারি বিনিয়োগ ছাড়া গড়ে ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা অসম্ভব হবে।

রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ ও এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন-পরবর্তী প্রস্তুতি

বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যেতে হলে রপ্তানি খাতের বর্তমান কাঠামো বদলে ফেলতে হবে। বর্তমানে আমাদের রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত থেকে। একটি মাত্র খাতের ওপর এই অতি-নির্ভরশীলতা বিশ্ব অর্থনীতির যেকোনো সংকটে বাংলাদেশকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। বিশেষ করে ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিক উত্তরণের পর বাংলাদেশ বহু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সুবিধা হারাবে, যার মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার (ইবিএ) অন্যতম। উত্তরণ-পরবর্তী এই ধাক্কা সামলাতে বর্তমান সরকারকে রপ্তানি বহুমুখীকরণে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।

রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের ক্ষেত্রে ভিয়েতনামের মডেল আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। ভিয়েতনাম গত কয়েক দশকে ইলেকট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টর এবং অটোমোবাইল খাতে বিপ্লব ঘটিয়েছে, যা তার শ্রম-নিবিড় অর্থনীতিকে উচ্চ-প্রযুক্তির উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করেছে। বাংলাদেশেও ওষুধ শিল্প, চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু নীতিগত বৈষম্যের কারণে এই খাতগুলো বিকশিত হতে পারছে না। উদাহরণস্বরূপ, পোশাক খাত বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা বা শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির যে সুবিধা পায়, অন্যান্য সম্ভাব্য রপ্তানি খাত তা পায় না। সরকারকে অভিন্ন রপ্তানি নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে সব উদীয়মান খাত সমান সুযোগ পাবে।

ওষুধ শিল্পের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, কারণ বর্তমানে আমরা দেশের ৯৮ শতাংশ চাহিদা মিটিয়ে ১৫০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছি। তবে এলডিসি উত্তরণের পর মেধাস্বত্ব বা ট্রিপস চুক্তির আওতায় পাওয়া ছাড়গুলো আর থাকবে না, যার ফলে পেটেন্টকৃত ওষুধের উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যেতে পারে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকারকে এখনই গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের সাথে যুক্ত করতে হবে, কারণ দেশের মোট শিল্প মূল্য সংযোজনের প্রায় অর্ধেক আসে এই খাত থেকে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারকে প্রকৃত অর্থেই কার্যকর করা বর্তমান সরকারের জন্য অপরিহার্য।

মানবসম্পদ উন্নয়ন: চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ ও শিক্ষা সংস্কার

উন্নত দেশের মূল চালিকাশক্তি হলো তার দক্ষ জনশক্তি। বাংলাদেশের সামনে এখন জনমিতিক লভ্যাংশের যে সুযোগ রয়েছে, তা ২০৩০ সালের পর সংকুচিত হতে শুরু করবে। অর্থাৎ, আমাদের জনসংখ্যার বিশাল একটি অংশ এখন কর্মক্ষম, কিন্তু তাদের বড় অংশই অদক্ষ। উন্নত দেশের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে এই জনশক্তিকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স এবং অটোমেশনের প্রভাবে ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্প খাতের প্রায় ৫৭ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। এই বিশাল চ্যালেঞ্জকে সুযোগে রূপান্তর করতে হলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে।

বর্তমানে শিক্ষা খাতে আমাদের জিডিপির মাত্র ১.৬ শতাংশ বরাদ্দ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখতে হলে এই বরাদ্দ ন্যূনতম ৪ থেকে ৬ শতাংশে উন্নীত করা জরুরি। শুধু বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন এবং পাঠক্রমকে কর্মমুখী করাও আবশ্যক। মুখস্থবিদ্যা বা শুধু সনদনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গবেষণায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে এবং শিল্প-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা পাস করার পরেই সরাসরি কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারে।

শিক্ষকদের মর্যাদা ও প্রশিক্ষণের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দেশে প্রায় ১০ লাখ শিক্ষক থাকলেও তাদের বড় অংশেরই আধুনিক প্রযুক্তি বা সৃজনশীল শিক্ষাদান পদ্ধতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই। ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে শিক্ষকদের নিয়মিত অনলাইন প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তঃসক্রিয় শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রে 'সংলাপমূলক ক্রমবর্ধমান নীতি' অনুসরণ করা উচিত, যেখানে সংস্কারগুলো শুধু ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হবে না, বরং শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মতামতের প্রতিফলন ঘটবে। মনে রাখতে হবে, শিক্ষা কেবল একটি সামাজিক খাত নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ, যা দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে স্থায়ীভাবে ২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে।

স্বাস্থ্য খাতে সমতা ও সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা

একটি জাতির সমৃদ্ধি নির্ভর করে তার সুস্বাস্থ্যের ওপর। বাংলাদেশ গত দুই দশকে শিশু মৃত্যুহার ও মাতৃমৃত্যুহার হ্রাসে অসাধারণ সাফল্য দেখালেও স্বাস্থ্য খাতের পরিকাঠামো এখনও অত্যন্ত দুর্বল ও বৈষম্যমূলক। বর্তমানে দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭২.৫ শতাংশ সাধারণ মানুষকে নিজের পকেট থেকে দিতে হয়, যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চগুলোর একটি। এই উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। উন্নত দেশ হওয়ার পথে এটি একটি বড় অন্তরায়।

বর্তমান সরকারকে ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছাতে হলে স্বাস্থ্য খাতে 'সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা' নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য একটি কার্যকর স্বাস্থ্য বিমা পদ্ধতি বা সামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রকল্প চালু করা জরুরি, বিশেষ করে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের জন্য। তবে শুধু বিমা চালু করলেই হবে না, সরকারি হাসপাতালের সেবার মান নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট দূর করতে হবে। বর্তমানে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকের অভাব, নোংরা পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সংকটে মানুষ বেসরকারি হাসপাতালের ব্যয়বহুল সেবার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছে। ১৮ কোটি মানুষের জন্য সরকারি খাতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসকের তুলনায় ১৭ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে, আর নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ক্ষেত্রে এই ঘাটতি ৮০ শতাংশের বেশি।

বর্তমানে বাংলাদেশে মৃত্যুর ৭০ শতাংশই ঘটে অসংক্রামক রোগ যেমন—হৃদরোগ, ক্যান্সার ও ডায়াবেটিসের কারণে। এই রোগগুলোর চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সরকার যদি কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে শক্তিশালী করে গ্রামীণ পর্যায়ে নিয়মিত রোগনির্ণয়ের ব্যবস্থা করতে পারে, তবে মৃত্যুর হার এবং চিকিৎসার খরচ অনেকাংশে কমানো সম্ভব। গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসকদের অবস্থান নিশ্চিত করতে তাদের আবাসন সমস্যা সমাধান এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি রোধ এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোর জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করা বর্তমান সরকারের বড় দায়িত্ব।

অবকাঠামো উন্নয়ন ও আঞ্চলিক বৈষম্য নিরসন

উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বিগত বছরগুলোতে অবকাঠামো খাতে বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে। মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলেও এর পেছনে ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং অগ্রাধিকার নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল বা বঙ্গবন্ধু টানেল অবশ্যই আমাদের সক্ষমতার পরিচয় দেয়, তবে উন্নয়নের এই মডেলটি ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক হয়ে পড়ার ফলে আঞ্চলিক বৈষম্য প্রকট হয়েছে। ইসিএনইসি-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট বরাদ্দের একটি বিশাল অংশ শুধু চট্টগ্রাম ও ঢাকা জেলা পায়, যেখানে দেশের অন্তত ২১টি জেলায় কোনো নতুন বড় প্রকল্প নেওয়া হয়নি।

এই আঞ্চলিক বঞ্চনা দূর করতে হলে সরকারকে বিকেন্দ্রীকরণভিত্তিক অবকাঠামো পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। উত্তরাঞ্চল বা দক্ষিণাঞ্চলের প্রান্তিক জেলাগুলোর গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্ক এবং লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন না করলে সেখানকার কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প বিকশিত হবে না। শুধু চকচকে মেগা প্রকল্প নয়, বরং 'শেষ সংযোগ' বা লাস্ট-মাইল কানেক্টিভিটির ওপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়লেও সঞ্চালন লাইনের দুর্বলতার কারণে অনেক সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এই সিস্টেম লস কমাতে হবে।


জ্বালানি খাতে আমদানিকৃত এলএনজি বা কয়লার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। বর্তমানে মোট শক্তির মাত্র ৩ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে, যা আগামী ১০ বছরের মধ্যে ৪০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। জ্বালানি খাতের অস্বচ্ছতা ও 'ক্যাপাসিটি চার্জ'-এর নামে জনগণের করের টাকা গুটিকয়েক কোম্পানিকে দেওয়ার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা বন্ধ করে একটি প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ জ্বালানি বাজার গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ নির্মাণ এবং বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-এর যথাযথ বাস্তবায়ন উন্নত বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে অপরিহার্য।

প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন

একটি রাষ্ট্র তখনই উন্নত হিসেবে পরিগণিত হয়, যখন তার সেবা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে যায়। বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো এখনও অত্যন্ত ঢাকাকেন্দ্রিক, যেখানে সামান্য দাপ্তরিক কাজের জন্যও মানুষকে রাজধানীর ওপর নির্ভর করতে হয়। উন্নত দেশ হওয়ার পথে এই আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রীকরণ একটি বড় বাধা। আগামী ১০ বছরের রূপকল্পের অন্যতম স্তম্ভ হওয়া উচিত প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা।

ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং পৌরসভাগুলো বর্তমানে কেন্দ্রের বরাদ্দের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। তাদের নিজস্ব রাজস্ব আয়ের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা প্রায় নেই। স্থানীয় সরকারকে সত্যিকারের স্বায়ত্তশাসন দিতে হলে তাদের নিজস্ব আয়ের উৎস নিশ্চিত করতে হবে এবং উন্নয়ন বাজেটের একটি নির্দিষ্ট অংশ সরাসরি স্থানীয় সরকারগুলোর হাতে হস্তান্তর করতে হবে। বর্তমানে জনপ্রতিনিধিদের বদলে আমলাদের মাধ্যমে স্থানীয় পরিষদ চালানোর যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতাকে ক্ষুণ্ণ করছে। বর্তমান সরকারের উচিত দ্রুত স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারগুলোর ক্ষমতায়ন করা।

স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন 'স্থানীয় সরকার কমিশন' গঠনের সুপারিশ বারবার উঠে এসেছে, যা বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন কাজে সরাসরি সম্পৃক্ততা কমিয়ে তাদের আইন প্রণয়নে বেশি মনোযোগ দিতে হবে এবং স্থানীয় পরিষদের কাজে তাদের প্রভাব বন্ধ করতে হবে। বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ওপর জনসংখ্যার চাপ কমানো সম্ভব, যা শহরগুলোর বাসযোগ্যতা বাড়াবে এবং গ্রামাঞ্চলে নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তুলবে। ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে ৯৫ শতাংশ সরকারি সেবা মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে আসা সম্ভব হলে আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি ও হয়রানি অনেকাংশে কমে যাবে।

জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা ও স্মার্ট কৃষি

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। যদিও বিশ্ব উষ্ণায়নে আমাদের অবদান নগণ্য, কিন্তু এর নেতিবাচক প্রভাবগুলো আমাদের অর্থনীতির জন্য বিশাল হুমকি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের এক-পঞ্চমাংশ এলাকা তলিয়ে যাওয়ার এবং কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উন্নত দেশ হওয়ার লক্ষ্যে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করাই হবে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক সংকটও বটে। এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশ বহু ধরনের সহজ শর্তের জলবায়ু তহবিল হারাবে। তাই এখন থেকেই নিজস্ব অর্থায়নে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। কৃষি খাতের ওপর জলবায়ুর প্রভাব অত্যন্ত প্রকট। উচ্চ তাপমাত্রা এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ফলে ধানের ফলন ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় 'স্মার্ট কৃষি' বা জলবায়ু-সহনশীল কৃষির ওপর জোর দিতে হবে। লবণাক্ততা-সহনশীল এবং বন্যার সময় টিকে থাকতে পারে—এমন নতুন জাতের ফসল উদ্ভাবনে গবেষণায় ব্যাপক বিনিয়োগ প্রয়োজন।

কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এবং প্রযুক্তির ব্যবহার উন্নত দেশের পথে সহায়ক হতে পারে। ড্রোন বা এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ফসলের রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হলে কৃষকের খরচ কমবে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়বে। সরকারের ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর যথাযথ বাস্তবায়ন শুধু উপকূলীয় অঞ্চলেই নয়, বরং পুরো দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। কৃষিকে লাভজনক পেশা হিসেবে গড়ে তুলতে হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে কৃষকদের সরাসরি বাজারের সাথে যুক্ত করতে হবে এবং হিমাগার সুবিধা বাড়াতে হবে।


অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসন ও প্রগতিশীল কর সংস্কার


উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন প্রবৃদ্ধির সুফল শুধু গুটিকয়েক ধনীর হাতে কুক্ষিগত না থেকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য এক উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। গিনি কোফিশিয়েন্ট বা আয়বৈষম্যের সূচক ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে ০.৫৭-এ দাঁড়িয়েছে, যা সামাজিক অস্থিরতার একটি বড় কারণ। এই বৈষম্য নিরসনে বর্তমান সরকারকে একটি শক্তিশালী ও প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

বর্তমানে আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৮ থেকে ৯ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়া এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় অত্যন্ত কম। এর প্রধান কারণ হলো ধনীদের কাছ থেকে কর আদায়ে ব্যর্থতা এবং বিপুল কর ফাঁকি। বাংলাদেশে মাত্র ৩.৬ মিলিয়ন মানুষ আয়কর রিটার্ন দাখিল করে, যেখানে সম্ভাব্য করদাতার সংখ্যা ৮ থেকে ৯ মিলিয়ন হতে পারে। সরকারকে করের জাল বিস্তৃত করতে হবে এবং ধনীদের ওপর উচ্চ হারে কর আরোপ করতে হবে। বর্তমানে ৩.৫ লাখ টাকা আয় করা ব্যক্তি এবং ৩৫০ কোটি টাকা আয় করা ব্যক্তির ওপর করের হারের পার্থক্য খুব সামান্য। প্রগতিশীল কর ব্যবস্থার মাধ্যমে ধনীদের কাছ থেকে উচ্চ হারে কর আদায় করে সেই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যয় করতে হবে।

উত্তরাধিকার কর এবং সম্পদের ওপর সারচার্জ বাড়ানোর মাধ্যমে সম্পদ বৈষম্য কমানো সম্ভব। এছাড়া ভ্যাট বা পরোক্ষ করের হার সব স্তরে সমান না রেখে সামাজিক শ্রেণীভেদে পৃথক করা যেতে পারে; যেমন—বিলাসবহুল রেস্টুরেন্টে ভ্যাট বেশি এবং সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্যে ভ্যাট কম রাখা। কর আদায়ের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল এবং দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে, যাতে মানুষ কর দিতে উৎসাহিত হয়। মনে রাখতে হবে, শুধু রাজস্ব বাড়ানোই লক্ষ্য নয়, বরং সংগৃহীত অর্থ যাতে সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যয় হয় এবং মেগা প্রকল্পের নামে অপচয় না হয়, তা নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব।

সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রাম

উন্নত দেশের মাপকাঠি শুধু বহুতল ভবন নয়, বরং আইনের শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা। বাংলাদেশে উন্নয়নের যে আখ্যান তৈরি করা হয়েছে, তার পেছনে রয়েছে সীমাহীন দুর্নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই হয় না। দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করে না, এটি মেধা পাচার এবং সামাজিক অবক্ষয়কেও উৎসাহিত করে। বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় কাজ হলো রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

দুর্নীতি দমন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। গত ১৫ বছরে কীভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে লুট হলো এবং বিদেশে পাচার হলো, তার সুষ্ঠু তদন্ত করে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। জনগণের তথ্যের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের স্বচ্ছতা ফেরাতে হবে, যাতে উন্নয়নের প্রকৃত চিত্র আড়ালে না থাকে। তথ্যের কারচুপি করে 'উন্নয়নের রোল মডেল' সাজার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ করতে হবে।

গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতা উন্নত দেশের অন্যতম অনুষঙ্গ। গণমাধ্যম যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে এবং সরকারের ভুলগুলো ধরিয়ে দিতে না পারে, তবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো নিবর্তনমূলক আইনগুলোর আমূল সংস্কার বা বাতিল করে একটি অবাধ ও মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। জনমুখী অসামরিক প্রশাসন গড়ে তোলা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক তকমা থেকে মুক্ত করা বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যদি রাষ্ট্রের সকল নাগরিক সমান আইনি সুরক্ষা না পায়, তবে আগামী ১০ বছরের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

আগামী ১০ বছরের অভিমুখে একটি সামগ্রিক মূল্যায়ন

বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে যেমন রয়েছে আগামী ১০ বছরের মধ্যে উন্নত দেশ হওয়ার বিশাল হাতছানি, অন্যদিকে রয়েছে ব্যাংকিং খাতের সংকট, মুদ্রাস্ফীতি, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ। বর্তমান সরকারকে মনে রাখতে হবে যে, উন্নয়ন শুধু গুটিকয়েক মেগা প্রকল্পের সমষ্টি নয়, বরং এটি প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার নাম। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা এখন আকাশচুম্বী। তারা শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন চায় না, তারা রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারও চায়।

উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সরকারের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশগুলো হলো: সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে ব্যাংকিং খাতের আমূল সংস্কার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা; রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের মাধ্যমে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী ঝুঁকি মোকাবিলা করা; শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে মানবসম্পদ উন্নয়ন করা; প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা; এবং একটি প্রগতিশীল কর ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো।

বাংলাদেশের মানুষ লড়াকু এবং তারা বারবার প্রমাণ করেছে যে তারা বড় বড় সংকট জয় করতে জানে। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪-এর গণ-আন্দোলন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই এ দেশের মানুষ আত্মত্যাগের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে এনেছে। বর্তমান সরকার যদি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করে, তবে আগামী ১০ বছরের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ শুধু একটি লক্ষ্যমাত্রা থাকবে না, বরং তা বাস্তব রূপ লাভ করবে। সেই আগামীর বাংলাদেশ হবে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো এক সমৃদ্ধ রাষ্ট্র।

img

শিক্ষকেরও কি আনন্দ করার অধিকার নেই?

প্রকাশিত :  ১৩:৫৮, ২৬ জুলাই ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৪:১০, ২৬ জুলাই ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক একটি ঘটনা আমাদের সমাজ সম্পর্কে বেশ কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। প্রশ্নটি খুব সরল: একজন শিক্ষক কি শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি একজন মানুষও থাকতে পারবেন?

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পালের একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়েছিল। ভিডিওতে তাঁকে হালকা বাতাসে আঁচল উড়িয়ে, বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের অন্যতম জনপ্রিয় গান ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’–এর সঙ্গে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটতে দেখা যায়। কয়েক সেকেন্ডের সেই ভিডিওই হয়ে ওঠে সমালোচনা, কটাক্ষ ও সামাজিক বিচারের বিষয়।

কিন্তু সেই সমালোচনার প্রতিক্রিয়ায় যা ঘটেছে, তা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। গত দুই দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা একই গান ব্যবহার করে রিলস তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। কেউ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে, কেউ কর্মস্থলে, কেউ ব্যক্তিগত পরিবেশে ভিডিও করেছেন। তাঁদের বক্তব্য একটাই—একজন শিক্ষক বা একজন নারীকে তাঁর ব্যক্তিগত আনন্দ, পোশাক, হাসি, গান কিংবা স্বাভাবিক অভিব্যক্তির জন্য হেনস্তা করা হলে তার প্রতিবাদ হওয়া দরকার।

একটি রোমান্টিক গান এভাবে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠবে—সম্ভবত গানটির গীতিকার ও সুরকার আশরাফ বাবুও ১৯৮৭ সালের এক শ্রাবণে খুলনায় বসে গানটি লেখার সময় তা ভাবেননি। কিন্তু সময় কখনো কখনো শিল্পকে নতুন অর্থ দেয়। ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটি এই শ্রাবণে হয়ে উঠেছে সামাজিক বিচারপ্রবণতার বিরুদ্ধে এক ধরনের সম্মিলিত প্রতিবাদের প্রতীক।

শিক্ষিকা সামিয়া শিকদার লিখেছেন, ‘বিউটি রানী পাল ম্যাডামকে হেনস্তার চেষ্টা সফল হয়নি। আজ প্রতিটি সাহসী শিক্ষকই একেকজন বিউটি রানী পাল। আমরা মাথা নত করব না, সম্মান নিয়ে এগিয়ে যাব।’

কুমিল্লার শিক্ষিকা লায়লা নূর পিংকি লিখেছেন, ‘আজ কেনো মন উদাসী হয়ে’ গানের ভিডিও নিয়ে কটাক্ষের প্রসঙ্গ টেনে, শিক্ষকদের এই প্রতিবাদের ফলে মানুষ অন্তত কিছু সময়ের জন্য অন্য কিছু নিয়ে কথা বলছে। তাঁর ভাষায়, ডিজিটাল এই প্রতিবাদ দেখিয়ে দিয়েছে, অন্যায় হলে শিক্ষকেরাও ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ জানাতে পারেন।

পঞ্চগড়ের শিক্ষিকা ফেরদৌস লিখেছেন, ‘এরপর শাড়ি পরেই দিব শিক্ষকের সেই ভাইরাল নাচ!’ আর চট্টগ্রামের মতলব বাজারের শিক্ষিকা জয়ন্তী ভৌমিকের প্রশ্নটি আরও সরাসরি: ‘শিক্ষক যদি হাসেন, সমস্যা! সাজেন, সমস্যা! পরিপাটি থাকেন, সমস্যা! ভ্রমণে যান, সমস্যা! ছবি পোস্ট করেন, সমস্যা! তাহলে কি শিক্ষক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ হওয়ার অধিকারটাও জমা দিতে হবে?’

এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিজেদেরই খুঁজে নিতে হবে।

একজন শিক্ষক অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর কাছ থেকে দায়িত্বশীলতা, শালীনতা, পেশাগত সততা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত। কোনো শিক্ষক আইন ভঙ্গ করলে, শিক্ষার্থীদের ক্ষতি করলে, প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা লঙ্ঘন করলে বা দায়িত্বে অবহেলা করলে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। শিক্ষকও আইনের ঊর্ধ্বে নন।

কিন্তু একটি ব্যক্তিগত ভিডিওতে কাউকে গান করতে, হাঁটতে, হাসতে বা আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা গেলেই তাঁর চরিত্র, সততা কিংবা পেশাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কি ন্যায়সংগত?

এখানেই মূল সমস্যাটি।

আমরা শিক্ষকদের কাছ থেকে এমন এক ধরনের আচরণ প্রত্যাশা করি, যা অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছেও প্রত্যাশা করি না। শিক্ষক যেন সব সময় গম্ভীর থাকবেন, সব সময় সংযত থাকবেন, ব্যক্তিগত আনন্দ প্রকাশ করবেন না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করবেন না—এমন একটি অলিখিত সামাজিক বিধি যেন তৈরি হয়ে গেছে।

কিন্তু শিক্ষক কি কেবল শ্রেণিকক্ষের মানুষ?

বিদ্যালয়ের দরজা দিয়ে ঢোকার পর তিনি শিক্ষক—এটি সত্য। কিন্তু বিদ্যালয়ের দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসার পর তিনি কি মানুষ নন?

একজন শিক্ষকেরও পরিবার আছে, বন্ধুত্ব আছে, পছন্দ-অপছন্দ আছে, সংস্কৃতিচর্চা আছে, আনন্দ আছে, ক্লান্তি আছে। তিনি গান শুনতে পারেন, ভ্রমণে যেতে পারেন, ছবি তুলতে পারেন, সাজতে পারেন, হাসতে পারেন। এসবের কোনোটিই তাঁকে কম দায়িত্বশীল শিক্ষক বানায় না।

বরং বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় সৃজনশীলতা ও সংস্কৃতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে শেখাতে হলে শুধু পাঠ্যবইয়ের তথ্য জানলেই হয় না। গান, অভিনয়, গল্প, আবৃত্তি, নৃত্য ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড শিশুর কল্পনাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক বোধ গড়ে তোলে।

আমরা যখন একজন শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গান গাইতে বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে দেখি, তখন সেটিকে শিক্ষার অংশ হিসেবে স্বাগত জানাই। কিন্তু একই শিক্ষক বিদ্যালয়ের বাইরে নিজের ব্যক্তিগত পরিসরে একটি গান বা নাচের ভিডিও প্রকাশ করলে তাঁর চরিত্র বা পেশাগত মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু করি।

এই দ্বৈত মানসিকতা কেন?

একজন শিক্ষক যদি সংস্কৃতির মূল্য বোঝেন, সৃজনশীলতার চর্চা করেন এবং জীবনে আনন্দের জায়গা রাখেন, তাহলে তিনি শিক্ষার্থীদেরও আরও মানবিক, আত্মবিশ্বাসী ও মুক্তচিন্তার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন। একজন আনন্দহীন মানুষই যে ভালো শিক্ষক হবেন—এমন কোনো প্রমাণ নেই।

এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সামাজিক বিচার অনেক সময় আরও কঠোর হয়ে ওঠে।

একজন পুরুষ শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গান করলে বা আনন্দের ভিডিও প্রকাশ করলে সেটিকে অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে দেখা হয়। কিন্তু একজন নারী শিক্ষক একই কাজ করলে তাঁর পোশাক, চুল, হাঁটা, হাসি কিংবা শরীরী ভাষা নিয়ে শুরু হয় নৈতিকতার আলোচনা।

নারীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সমাজের এই অতিরিক্ত আগ্রহ নতুন নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু সেই প্রবণতাকে আরও দ্রুত, আরও প্রকাশ্য এবং আরও নিষ্ঠুর করে তুলেছে।

একটি ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর শুরু হয় মন্তব্য, কটাক্ষ, চরিত্রহনন, এমনকি চাকরি হারানোর দাবি। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েকটি পোস্ট কখনোই পুরো সমাজের মতামতকে প্রতিনিধিত্ব করে না।

কোনো সংবাদে যদি বলা হয়, ‘অভিভাবকদের ক্ষোভ’, ‘জনগণের দাবি’ বা ‘সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ’, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—সত্যিই কি সংশ্লিষ্ট অভিভাবকেরা অভিযোগ করেছেন? লিখিত কোনো অভিযোগ আছে কি? অভিযোগের প্রকৃতি কী? নাকি কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট ধীরে ধীরে ‘জনমত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে?

সমালোচনার অধিকার সবার আছে। কেউ মনে করতেই পারেন, কোনো নির্দিষ্ট আচরণ একজন শিক্ষকের পেশাগত ভূমিকার সঙ্গে মানানসই নয়। সেই মত প্রকাশের অধিকারও তাঁর আছে। কিন্তু মতের সঙ্গে ব্যক্তিগত অপমান, চরিত্রহনন বা ধর্মীয় বিদ্বেষ যুক্ত হলে তা আর সুস্থ সমালোচনা থাকে না।

বিউটি রাণী পাল হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন নারী। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে কোনো বৈষম্য বা বিদ্বেষ হয়েছে কি না, সেটি প্রমাণ ও তদন্তের বিষয়। প্রমাণ ছাড়া কাউকে ধর্মীয় বিদ্বেষের জন্য অভিযুক্ত করা যেমন অনুচিত, তেমনি কারও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তিনি সামাজিক বা পেশাগত চাপের মুখে পড়ছেন কি না, সেটিও উপেক্ষা করা যায় না।

একই সঙ্গে প্রতিবাদের ভাষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। যারা একজন নারী শিক্ষককে অপমান করেছেন, তাঁদের সমালোচনা করতে গিয়ে যদি পাল্টা কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক গোষ্ঠীকে একইভাবে অপমান করা হয়, তাহলে সমস্যার সমাধান হয় না। এক ধরনের অসহিষ্ণুতার জবাব আরেক ধরনের অসহিষ্ণুতা দিয়ে দেওয়া যায় না।

প্রতিবাদ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু প্রতিবাদ যেন আরেকটি নিপীড়নের ভাষা না হয়ে ওঠে।

‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানে শিক্ষিকাদের এই সম্মিলিত ভিডিও প্রকাশের ঘটনা তাই শুধু একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রবণতা নয়। এর মধ্যে এক ধরনের সামাজিক বার্তাও আছে। একজনকে হেনস্তা করার চেষ্টা যখন হাজারো মানুষকে একই প্রতীকের অধীনে দাঁড় করিয়ে দেয়, তখন সেটি নিছক বিনোদন থাকে না; তা প্রতিবাদের রূপ নেয়।

তবে এই প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এখানেই যে, বহু শিক্ষক ও শিক্ষিকা নিজেদের স্বাভাবিক প্রকাশের জায়গাটি নতুন করে দাবি করেছেন।

লায়লা নূর পিংকির কথায়, ‘যেসব শিক্ষকেরা কোনো দিন লজ্জায় ভিডিও দিতেন না, তাদের প্রতিভাও বিকশিত করে দিলেন।’ কথাটির মধ্যে রসিকতা আছে, কিন্তু সামাজিক বাস্তবতাও আছে। আমরা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছি, যেখানে অনেক মানুষ স্বাভাবিকভাবে আনন্দ প্রকাশ করার আগেও ভাবেন—কেউ কি তাঁকে বিচার করবে?

এটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়।

একজন শিক্ষককে তাঁর পেশাগত কাজের জন্য মূল্যায়ন করা উচিত। তিনি শ্রেণিকক্ষে কেমন পড়ান, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন, দায়িত্ব কতটা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন, বিদ্যালয়ে তাঁর অবদান কী—এসব হওয়া উচিত মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড।

একটি ভিডিও দিয়ে একজন মানুষের সমগ্র পরিচয় নির্ধারণ করা ন্যায়সংগত নয়।

আরও বড় কথা, শিক্ষকদের ব্যক্তিগত মুহূর্তকে সামাজিক নজরদারির বস্তুতে পরিণত করা হলে শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে পড়ে যায়। শিক্ষক সংকট, শিক্ষার মান, অবকাঠামোর ঘাটতি, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া, নিরাপদ শিক্ষাপরিবেশ ও মানসিক স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা করার বদলে আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি—কে কী পোশাক পরলেন, কীভাবে হাঁটলেন, কোন গানের সঙ্গে ভিডিও করলেন।

এটি কেবল একজন শিক্ষক বা একটি ভিডিওর সমস্যা নয়। এটি আমাদের সামাজিক অগ্রাধিকারেরও প্রশ্ন।

আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের বাইরে নিজেকে মানুষ হিসেবে প্রকাশ করতে ভয় পাবেন?

আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে নারীর হাসি, পোশাক, চুল, সাজসজ্জা কিংবা আনন্দের মুহূর্তও জনসমক্ষে নৈতিক বিচারের বিষয় হয়ে উঠবে?

যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।

একজন শিক্ষককে অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে। কিন্তু দায়িত্বশীলতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা পরস্পরের বিরোধী নয়। পেশাগত দায়িত্বের জন্য একজন শিক্ষককে জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের জন্য তাঁকে সমাজের অনুমতি নিতে হবে—এমন কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারণা থাকতে পারে না।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন সবার আছে, তেমনি অন্যের মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্বও সবার।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এই ভারসাম্য: স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু দায়িত্বও থাকবে; সমালোচনা থাকবে, কিন্তু অপমান নয়; মতভেদ থাকবে, কিন্তু বিদ্বেষ নয়।

বিউটি রাণী পালকে ঘিরে বিতর্কের শেষ কথা তাই কোনো পক্ষের জয় বা পরাজয় নয়। মূল প্রশ্নটি আরও বড়।

একজন শিক্ষক কি শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি একজন মানুষও থাকতে পারবেন?

উত্তরটি হওয়া উচিত—অবশ্যই।

শিক্ষকেরও হাসার অধিকার আছে। আনন্দ করার অধিকার আছে। গান শোনার অধিকার আছে। সংস্কৃতিচর্চার অধিকার আছে। নিজের ব্যক্তিগত পরিসরে বাঁচার অধিকার আছে।

একজন শিক্ষককে তাঁর কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও দিয়ে নয়, তাঁর দীর্ঘদিনের কাজ দিয়ে মূল্যায়ন করা হোক।

একজন নারীকে তাঁর পোশাক, হাসি, চুল বা আনন্দের মুহূর্তের জন্য সামাজিক বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আগে আমরা অন্তত একবার নিজেদের দিকে তাকাই।

কারণ শিক্ষকরা রোবট নন।

নারীরাও নন।

তাঁরা মানুষ।

আর একটি মানবিক সমাজের প্রথম শর্তই হলো—মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা।


মতামত এর আরও খবর