সমরবিদের বিশ্লেষণ

img

পরাজয় অথবা আরও আক্রমণের দোটানায় পড়েছেন ট্রাম্প

প্রকাশিত :  ১৫:১২, ০৩ মার্চ ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৫:৫৭, ০৩ মার্চ ২০২৬

পরাজয় অথবা আরও আক্রমণের দোটানায় পড়েছেন ট্রাম্প

 ডমিনিক ওয়াগহর্ন

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আংশিক লক্ষ্য অর্জন করেছে। এ অবস্থায় যুদ্ধ বন্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে এখন দুটি সম্ভাব্য বিকল্প আছে। প্রথমত, খামেনির মৃত্যুকে জয় ধরে নিয়ে থেমে যাওয়া কিংবা শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি বদলের জন্য দ্বিগুণ শক্তিতে আক্রমণ চালানো।

ট্রাম্প আসলে কোন পথে যাবেন তা সম্ভবত ঠিক করতে পারছেন না। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, যুদ্ধ আরও কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- কথাটি ট্রাম্প কি দায়িত্ব নিয়ে বা গুরুত্ব সহকারে বলেছেন? যুক্তরাষ্ট্র কি এত লম্বা সময় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে?

যুদ্ধ শুরুর আগে পেন্টাগনের কমান্ডাররা কিছু গোপন তথ্যের মাধ্যমে সতর্ক করেছিলেন, এই অঞ্চলে (মধ্যপ্রাচ্য) বর্তমানে যে পরিমাণ সামরিক শক্তি জড়ো করা হয়েছে, তা বড়জোড় এক বা দুই সপ্তাহের যুদ্ধের জন্য যথেষ্ট। অপরদিকে আঞ্চলিক মার্কিন মিত্রদের জন্যও সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের খবর অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো ইতোমধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার চাপ দিচ্ছেন। এর বড় কারণ হলো, তাদের কাছে থাকা আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত উদ্বেগজনক হারে কমে গেছে।

এই যুদ্ধকে বলা হচ্ছে ‘অসম যুদ্ধ’। কেউ কেউ এটিকে ই-বাইকের বিরুদ্ধে ফেরারি গাড়ি ব্যবহারের মতো ভারসাম্যহীন বলে তুলনা করছেন। যেমন- মাত্র কয়েক হাজার ডলার মূল্যের একটি ড্রোন ভূপাতিত করতে কয়েক মিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে অনির্দিষ্টকাল ধরে এভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।

একই সঙ্গে ইরান একাধিক অভিমুখে আক্রমণ করার যে কৌশল নিয়েছে, তা অনেককেই অবাক করেছে। ট্রাম্পের ধারাবাহিক হুমকির মুখে তারা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করছিল- যদি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কোনো চেষ্টা করা হয়, তবে আর কোনো রাখঢাক করা হবে না। অর্থ্যাৎ, উপসাগরীয় মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হবে।

কিন্তু এই পাল্টা আঘাত ইরানের জন্য চরম মূল্য দেওয়ার পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে। কারণ, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো এবং সৌদি আরব তাদের নিজস্ব সামরিক বাহিনী নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সরাসরি যোগ দেওয়ার কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

তবে আপাতত ঘাঁটিতে আক্রমণের ইরানি কৌশল কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে। একদিকে তারা গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর যুদ্ধ শেষ করার চাপ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে হামলাকারীদের বাধ্য করছে তাদের অত্যন্ত ব্যয়বহুল সমরাস্ত্রের মজুত খালি করতে।

কিছু বিষয় এখনো অজানা রয়ে গেছে। যেমন- যুদ্ধ সক্ষমতা জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্র আরও কত সময় নেবে? সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো- বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রে আসলে কী ঘটছে? আকাশপথে ইরানের বিভিন্ন অংশকে দুর্বল করে দিয়ে ইসরায়েল কি ফিল্ড এজেন্টদের সহায়তায় সশস্ত্র আঞ্চলিক বিদ্রোহ শুরু করতে চাচ্ছে? যদি তেমনটা ঘটে, তবে যুদ্ধ সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারে। ইরান খণ্ডবিখণ্ড হলে তা গৃহযুদ্ধের দিকে যেতে পারে।

তবে এখন পর্যন্ত এমন পরিকল্পনার কোনো বড় লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ‘শত্রুপক্ষ’ বিদ্রোহ ঘটানোর কৌশল যদি না নেয়, তবে আকাশপথের আক্রমণ যতই বিধ্বংসী হোক না কেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম।

এই যুদ্ধ লক্ষ্য বা পরিণতির দিক থেকেও অসম। জেতার জন্য ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে হবে। কারণ, এটাই তাদের মূল লক্ষ্য। অন্যদিকে, ইরানের এই শাসনব্যবস্থার জন্য বিজয় ঘোষণার জন্য শুধু টিকে থাকাই যথেষ্ট- তা যত দিনই লাগুক না কেন।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল কারো পক্ষেই অনির্দিষ্টকাল ধরে ইরানের ওপর হামলা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এভাবে চলতে থাকলে আগামী দিনে আরও বেশি মার্কিন পাইলট গুলিবিদ্ধ হয়ে ভূপাতিত হবেন অথবা স্থলভাগে সৈন্যরা মারা যাবেন। বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এই সংঘাতের প্রভাবও হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। আঞ্চলিক মার্কিন মিত্রদের পক্ষে এই চাপ সামাল দেওয়াটাও বেশ কঠিন হবে। পাশাপাশি, বিদেশে হস্তক্ষেপের বিষয়ে ট্রাম্পও মার্কিন জনগণের সমর্থন হারাতে থাকবেন।

সবকিছুর মতো যুদ্ধেরও একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকে। সেই সীমায় পৌঁছানো পর্যন্ত ইরানের শাসনব্যবস্থা যদি টিকে যায়- তাহলে বাকিদের পরিণতি কেমন হবে?

(লেখক: ডমিনিক ওয়াগহর্ন, সমর বিশ্লেষক, স্কাই নিউজের আন্তর্জাতিক বিভাগের সম্পাদক)


img

সূচকের পতনের চেয়ে বড় সংকট আস্থার অবক্ষয়

প্রকাশিত :  ১১:২৯, ২২ জুন ২০২৬

✍️ নিজস্ব প্রতিবেদক

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দরপতন নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত এক যুগে বিনিয়োগকারীরা উত্থানের চেয়ে পতনের গল্পই বেশি শুনেছেন। তবু প্রতি বড় দরপতনের দিন আমাদের সামনে নতুন করে একটি প্রশ্ন হাজির হয়—সমস্যাটা কী কেবল বাজারের, নাকি এর পেছনে অর্থনীতি, নীতি এবং আস্থার আরও গভীর সংকট কাজ করছে?

সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৮৫ পয়েন্টের বেশি হারিয়েছে। এক দিনে শতাংশ দেড় ভাগের বেশি পতন নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু উদ্বেগের প্রকৃত কারণ সূচকের পতন নয়; বরং বাজারের সামগ্রিক চিত্র। অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম কমেছে, লেনদেনের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও প্রকট হয়েছে।

পুঁজিবাজার মূলত আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। বিনিয়োগকারী যখন বিশ্বাস করেন যে অর্থনীতি স্থিতিশীল, নীতিনির্ধারকরা সুস্পষ্ট অবস্থানে আছেন এবং বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তখন তিনি বিনিয়োগে আগ্রহী হন। বিপরীতে অনিশ্চয়তা বাড়লে তিনি অপেক্ষার পথ বেছে নেন। বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে সেই অপেক্ষার প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের বিষয়। তেলের দাম, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের দুর্বলতার ব্যাখ্যা কেবল বাইরের ঘটনায় খুঁজলে ভুল হবে। কারণ আমাদের বাজার বহুদিন ধরেই তারল্যসংকট, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এবং সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণের সমস্যায় ভুগছে।

সোমবারের বাজারে তারল্যসংকটের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিপুল অঙ্কের সরকারি সুকুক ইস্যুর কারণে আর্থিক খাতের একটি বড় অংশের অর্থ শেয়ারবাজারের বাইরে চলে গেছে। এটি সাময়িক ঘটনা হলেও এর মধ্য দিয়ে একটি পুরোনো বাস্তবতা আবার সামনে এসেছে—বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনও পর্যাপ্ত দীর্ঘমেয়াদি তহবিল আকর্ষণ করতে পারেনি। ফলে সামান্য চাপ এলেই বাজার নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

এদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নজরদারি বাজারের জন্য ইতিবাচক বার্তা। কারসাজি ও কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তবে এটিও সত্য যে দীর্ঘদিন ধরে বাজারের একটি অংশ অস্বাভাবিক লেনদেন ও জল্পনানির্ভর প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল। ফলে নজরদারি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই অর্থের একটি অংশ বাজার ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। এটিকে নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং দীর্ঘমেয়াদে এটি বাজারকে আরও সুস্থ ও স্বচ্ছ করে তুলতে পারে।

ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর অনেক শেয়ারের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এতে স্বল্পমেয়াদে কিছু কোম্পানির শেয়ারে বড় ধরনের দরপতন দেখা গেলেও বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী এটি অস্বাভাবিক নয়। দীর্ঘদিন কৃত্রিমভাবে আটকে রাখা দাম একসময় বাস্তবতার মুখোমুখি হবেই।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কোথায়?

প্রথমত, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। বিনিয়োগকারীরা যেন মনে করেন, এখানে নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য এবং কারসাজিকারীরা কোনোভাবেই পার পাবে না। দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলছে, শক্তিশালী পেনশন ফান্ড, মিউচুয়াল ফান্ড এবং দীর্ঘমেয়াদি তহবিল ছাড়া স্থিতিশীল পুঁজিবাজার গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তৃতীয়ত, ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনার উদ্যোগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগকারীদের সামনে মানসম্মত বিনিয়োগের সুযোগ যত বাড়বে, বাজার তত শক্তিশালী হবে।

স্বল্পমেয়াদে সূচক আরও কিছুটা ওঠানামা করতে পারে। সেটি বাজারের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হলে সূচকের দৈনিক ওঠানামার বাইরে গিয়ে মূল সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে।

কারণ পুঁজিবাজার কেবল কিছু শেয়ারের দর বাড়া–কমার নাম নয়। এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। আর সেই আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরলে সূচকের কয়েক পয়েন্ট পতনের চেয়েও বড় ক্ষতি হয়ে যায়।