পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আজ। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের স্মৃতিবিজড়িত এই দিনটি মুসলিমরা যথাযোগ্য ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও মর্যাদায় পালন করছেন।
আরবি বর্ষের রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেন। ৬৩ বছরের জীবনে মানবজাতিকে ইহকাল ও পরকালের মুক্তির পথ দেখিয়ে একই তারিখে তিনি ইন্তেকাল করেন।
আইয়ামে জাহেলিয়াতের অন্ধকারে ডুবে থাকা আরব সমাজে আলোর দিশারি হয়ে আবির্ভূত হন মহানবী (সা.)। মক্কার কুরাইশ গোত্রের একটি সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া হজরত মুহাম্মদ (সা.) অল্প বয়সেই সত্যবাদিতা ও সততার প্রতীক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ক্ষমাশীলতা, দানশীলতা, সহিষ্ণুতা ও মানবিক গুণাবলির মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ।
৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভের পর দীর্ঘ ২৩ বছর তিনি ইসলামের বাণী প্রচার করেন। শুধু আধ্যাত্মিক শিক্ষাই নয়, মদিনায় ন্যায়, সাম্য ও মানবিকতার ভিত্তিতে একটি কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্তও স্থাপন করেন তিনি।
সারাবিশ্বের মুসলমানদের মতো বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরাও দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করছেন। ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে বিভিন্ন স্থানে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, কোরআনখানি ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। অনেকে নফল নামাজ আদায় ও রোজা রাখছেন।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সাজানো হয়েছে কালেমাখচিত পতাকা ও জাতীয় পতাকায়।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণীতে দেশবাসী এবং মুসলিম উম্মাহকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বাণীতে মহানবী (সা.) এর শান্তি, ন্যায়, সহনশীলতা, ভালোবাসা ও মানবিকতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে হিংসা-বিদ্বেষ, বিভেদ ও অন্যায় পরিহার করে শান্তি, সম্প্রীতি, সাম্য ও মানবিকতার ভিত্তিতে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়। দিনটি উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটি।
ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : মানুষের পাশে দাঁড়ানোও এক মহান ইবাদত
প্রকাশিত :
১৫:৩৬, ২১ আগষ্ট ২০২৬
শায়খ আনিসুল হক
\'মানুষের সেবা করা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মানুষের উপকারে এগিয়ে আসাও হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত\' । ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবায় বিষয়টি তুলে ধরেছেন ইমাম শায়খ আনিসুল হক । তিনি ১৪ আগস্ট শুক্রবার খুতবা উপস্থাপন করেন।
খুতবায় তিনি হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর বর্ণিত একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। একবার সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ (সা:) এর সঙ্গে সফরে ছিলেন । তাঁদের মধ্যে কেউ রোজা রেখেছিলেন, কেউ রাখেননি । প্রচণ্ড গরমের কারণে রোজাদার সাহাবিরা এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েন যে তাঁরা বিশ্রামে চলে যান । তখন যারা রোজা রাখেননি, তাঁরা উঠে তাঁবু তৈরি করেন, বাহনের দেখাশোনা করেন এবং সবার জন্য পানি সংগ্রহসহ প্রয়োজনীয় কাজগুলো সম্পন্ন করেন।
তাঁদের এই সেবা দেখে রাসুলুল্লাহ (সা:) বললেন, “আজ যারা রোজা রাখেনি, তারাই সব সওয়াব নিয়ে গেল।”
শায়খ আনিসুল হক বলেন, এ ঘটনা আমাদেরকে ইবাদত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। আমরা অনেক সময় মনে করি নামাজ, রোজা, কুরআন তিলাওয়াত ও জিকিরই শুধু ইবাদত। অথচ আল্লাহর বান্দাদের উপকার করা, তাদের কষ্ট দূর করা এবং প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানোও আল্লাহর নৈকট্য লাভের বড় মাধ্যম।
তিনি বলেন, একজন মুমিন শুধু নিজের জন্য বাঁচে না। তার জীবন, পরিবার, প্রতিবেশী ও সমাজের মানুষের কল্যাণের সঙ্গেও যুক্ত।
খুতবায় রাসুলুল্লাহ (সা:) এর মদিনায় হিজরতের পর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ভ্রাতৃত্বের কথাও তুলে ধরা হয় । মক্কা থেকে আসা মুহাজিররা নিজেদের ঘরবাড়ি, সম্পদ ও অনেক ক্ষেত্রে পরিবার-পরিজনও পেছনে রেখে এসেছিলেন । মদিনার আনসাররা তাঁদের শুধু স্বাগত জানাননি, বরং নিজেদের সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা ভাগ করে নেওয়ার জন্যও প্রস্তুত ছিলেন।
বিশেষভাবে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা:) ও সা‘দ ইবনে রাবি‘ (রা.)-এর মধ্যকার ভ্রাতৃত্বের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আনসারদের সেবা শুধু মুখের সহানুভূতি ছিল না; তারা বাস্তবে ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিলেন।
এ কারণেই আল্লাহ তাআলা তাঁদের প্রশংসা করে বলেন, “তারা নিজেদের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যদের নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয়।” —সুরা হাশর, ৫৯:৯।
খুতবায় ক্ষুধার্ত এক অতিথির ঘটনাও তুলে ধরা হয় । রাসুলুল্লাহ (সা:) এর ঘরে তাঁকে খাওয়ানোর মতো খাবার না থাকায় এক সাহাবি তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান । কিন্তু সাহাবির ঘরেও ছিল খুব অল্প খাবার, যা মূলত সন্তানদের জন্য রাখা হয়েছিল । শেষ পর্যন্ত ওই সাহাবি ও তাঁর স্ত্রী সন্তানদের না খাইয়ে অতিথিকে খাবার খাওয়ান । এসময় ঘরের বাতি নিভিয়ে দেওয়া হয়, যাতে অতিথি মনে করেন সবাই একসঙ্গে খাচ্ছেন।
শায়খ আনিসুল হক আরো বলেন, এটাই প্রকৃত সেবা । শুধু “আমি তোমার পাশে আছি” বলাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজনে নিজের সময়, শ্রম, আরাম কিংবা সম্পদের কিছু অংশ ত্যাগ করাও সেবার অংশ।
তিনি রাসুলুল্লাহ (সা:) এর একটি হাদিস উল্লেখ করে বলেন, যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার কষ্ট দূর করে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার কষ্ট দূর করবেন। আর আল্লাহ তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেন, যতক্ষণ সে তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে।
খুতবায় তরুণদের প্রতিও বিশেষ আহ্বান জানানো হয় । শায়খ আনিসুল হক বলেন, ছুটির দিনগুলো শুধু দেরি করে ঘুমানো, ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল স্ক্রল করা কিংবা গেম খেলায় কাটিয়ে দেওয়া উচিত নয়। বিশ্রাম ও আনন্দের পাশাপাশি চারপাশে তাকিয়ে দেখতে হবে—কোথায় নিজেকে কাজে লাগাতে পারি?
তিনি বলেন, মা বাজার করলে ব্যাগ বহন করা, বাবার কোনো কাজে সাহায্য করা, মসজিদে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করা, কোনো বয়স্ক আত্মীয়ের প্রয়োজনীয় জিনিস এনে দেওয়া কিংবা তাদের ছোটখাটো কাজে সহযোগিতা করা—এসবও গুরুত্বপূর্ণ সেবা।
তিনি বলেন মানুষের উপকার করতে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে যেতে হবে না। অনেক সময় বড় সাওয়াবের সুযোগ পাশের ঘরেই থাকে।
পরিবারের ভেতর সহযোগিতার গুরুত্বও তুলে ধরেন শায়খ আনিসুল হক । হযরত আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা:) নিজ ঘরে পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন। তিনি আল্লাহর রাসুল ও মুসলিম উম্মাহর নেতা হয়েও ঘরের কাজকে নিজের জন্য মর্যাদাহানিকর মনে করেননি।
তিনি বলেন, তাই ঘরের কাজ করা, বাসন ধোয়া, সন্তানদের দেখাশোনা করা কিংবা পরিবারের কাউকে সহযোগিতা করাও সুন্নাহর অনুসরণ হতে পারে, যদি তা আন্তরিকতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়।
ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) ও ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর বক্তব্য উল্লেখ করে শায়খ আনিসুল হক বলেন, অন্য মানুষের প্রয়োজন পূরণের সুযোগ পাওয়া আসলে একটি বড় নিয়ামত। কারণ সবাই সাহায্য করার অবস্থায় থাকে না; অনেকেই বরং সাহায্য পাওয়ার প্রয়োজনের মধ্যে থাকে।
তিনি বলেন, সেবাকে বোঝা মনে করবেন না; বরং আল্লাহর দেওয়া একটি সুযোগ ও অনুগ্রহ হিসেবে দেখুন।
খুতবার শেষাংশে তিনি উপস্থিত মুসল্লিদের স্মরণ করিয়ে দেন, একদিন সবাইকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু একজন মানুষের ভালো কাজ, উপকার এবং সেবার প্রভাব তাঁর মৃত্যুর পরও মানুষের জীবনে থেকে যেতে পারে।
তিনি দোয়া করেন, আল্লাহ যেন আমাদের এমন মানুষ হিসেবে কবুল করেন- যারা পরিবার, প্রতিবেশী ও সমাজের জন্য উপকারী । মানুষের প্রয়োজন বুঝে পাশে দাঁড়ানোর তাওফিক দান করেন এবং মানুষের সেবার মাধ্যমে আল্লাহ\'র সাহায্য, করুণা ও সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ করে দেন। আমিন।
শায়খ সৈয়দ আনিসুল হক : ইস্ট লন্ডন মসজিদের সিনিয়র ইমাম । জুমার খুতবা, ১৪ আগস্ট ২০২৬।