img

সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে মাছ, মুরগি ও সবজির দাম

প্রকাশিত :  ০৬:৩৫, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৩

সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে মাছ, মুরগি ও সবজির দাম

ভরা বেড়েছে মৌসুমেও অধিকাংশ সবজির দাম । এছাড়া আগের মতোই উচ্চমূল্যে বিক্রি হচ্ছে মাছ, চিনি, চাল, আটা ও ডাল। নতুন করে বেড়েছে ব্রয়লার মুরগির দাম। গত সপ্তাহের তুলনার ব্রয়লার মুরগি কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

শুক্রবার (২৯ ডিসেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন বাজারঘুরে ক্রেতা এবং বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এ তথ্য।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, চলতি সপ্তাহে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে ব্রয়লার মুরগি। যা গত সপ্তাহে ১৯০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সোনালি, সোনালি হাইব্রিড ও লেয়ার মুরগির দাম বেড়েছে। সোনালি ৩২০ টাকা, সোনালি হাইব্রিড ৩০০ টাকা, দেশি মুরগি ৫০০ থেকে ৫২০ টাকা কেজি, লেয়ার ২৯০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

এ ব্যাপারে শেওড়াপাড়া বাজারের মুরগি বিক্রেতা সজিব বলেন, গত এক মাস ধরে মুরগির বাজার বাড়তি রয়েছে। প্রতি সপ্তাহেই মুরগির দাম বাড়ছে। পাইকারি বাজারে দাম বাড়ায় আমরাও বাড়তি দামে বিক্রি করছি।

চলতি সপ্তাহে এসব বাজারে পেঁয়াজ ও আলুর দাম কমেছে। পেঁয়াজ দেশিটা (পুরাতন) ১৩০ টাকা, দেশি নতুন পেঁয়াজ ১০০ টাকা এবং ইন্ডিয়ান পেঁয়াজ ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

এ ব্যাপারে শেওড়াপাড়া বাজারের পেঁয়াজ বিক্রেতা আরমান বলেন, গত সপ্তাহে দেশি পুরাতন পেঁয়াজ ১৫০ টাকা, দেশি নতুন পেঁয়াজ ১৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। চলতি সপ্তাহে পেঁয়াজের দাম কমেছে। শুধু তাই নয় নতুন আলুও কেজিতে ১০ টাকা কমে ৭০ টাকা দরে বিক্রি করছি।

এসব বাজারে শীতকালীন সবজি দাম বেড়েছে। শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপিসহ সকল ধরনের সবজির দাম বেড়েছে।

রাজধানীর মহাখালীর বাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মিজান শেখ বলেন, বাজারে আসলে অতিরিক্ত দামের কারণে কোন মাছই কেনা যায় না। গরিবের মাছ তেলাপিয়া, পাঙ্গাশ, চাষের কই’য়ের দামও চড়া। আর অন্য কোনো মাছ তা কেনার কথা ভাবাই যায় না। এখন পাঙ্গাশ মাছও কেজি ২২০/২৪০ টাকা করে কিনতে হয়।

মালিবাগে বাজারে মাছ কিনতে আসা কবির হোসেন একজন গার্মেন্টস কর্মী। তিনি বলেন, ইদানীং বাজারে এলে মাছ কিনতে পারি না বাড়তি দামের কারণে। বাজারে সবচেয়ে কম দামের মাছও এখন বিক্রি হচ্ছে বেশি দামে। দরদাম করে সবশেষে তেলাপিয়া মাছ কিনলাম তাও ২২০ টাকা কেজি দরে। এই বছর কোনো সময়ের জন্যই কোনো মাছের দাম কমেনি। আমাদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষরা কোনো মাছই এখন সেভাবে কিনতে পারছি না।

এদিকে মাছের বাড়তি দামের বিষয়ে গুলশান সংলগ্ন লেকপাড় বাজারের বিক্রেতা কামাল উদ্দিন বলেন, মাছের খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ার পর থেকেই সব ধরনের মাছের দাম চড়া যাচ্ছে। এছাড়া মাঝে হরতাল অবরোধের কারণে পরিবহন ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় মাছের দামও বেড়েছিল। এরপর থেকে দাম নতুন করে কমেনি।

তিনি আরও বলেন, পাইকারি বাজারেই আমাদের সব ধরনের মাছ বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। এরপর পরিবহন খরচ, শ্রমিক খরচ, রাস্তা খরচ, দোকান ভাড়া সব মিলিয়ে দাম আগের চেয়ে কিছুটা বেশিই যাচ্ছে। আমাদের মাছ কেনা যখন কম দামে পড়বে তখন আমরাও খুচরা বাজারে কম দামেই বিক্রি করতে পারব।

বাজারগুলোতে প্রতি কেজি মুলা বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা, শিম ৮০ থেকে ৯০ টাকা, ফুলকপি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, বাঁধা কপি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, পাকা টমেটো প্রকারভেদে ৮০ থেকে ১০০ টাকা, কাঁচা টমেটো ৫০ টাকা, কচুরমুখী ৭০ টাকা এবং গাজর ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

শুক্রবার এসব বাজারে বেগুন ৫০ থেকে ৮০ টাকা, করলা ৬০ টাকা, ঢেঁড়স ১০০ টাকা, পটল ৮০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকায়, ধুন্দুল ৮০ টাকা, চিচিঙ্গা ৮০ টাকা, শসা ৫০ থেকে ৬০ টাকা, প্রতিটি লাউ বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা, পেঁপে প্রতি কেজি ৪০ টাকা, লেবুর হালি ২০ থেকে ৪০ টাকা, ধনে পাতা কেজি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, কলা হালি বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকায়, জালি কুমড়া ৪০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া কেজি ৪০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে। পুরাতন আলু বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা, নতুন আলু ৭০ টাকা, নতুন উঠা দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা কেজি দরে, ভারতীয় পেঁয়াজ ১১০ টাকা দরে, পেঁয়াজের ফুলকলি ৬০ টাকা ও কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

এছাড়া বাজারগুলোতে লাল শাক ১০ টাকা আঁটি, লাউ শাক ৪০ টাকা, মূলা শাক ১০ টাকা, পালং শাক ২০ টাকা, কলমি শাক ১০টাকা আঁটি দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে।

এসব বাজারে গরুর মাংস কেজি প্রতি ৫৮০ থেকে ৬৫০ টাকা এবং খাসির মাংস কেজি প্রতি ১০৫০-১১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক ডজন লাল ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়, হাঁসের ডিম ২০০ টাকায়, দেশি মুরগির ডিমের হালি ৮০ টাকায়। তবে গত সপ্তাহে লাল ডিম ১২০ টাকা ডজন বিক্রি হয়েছে।

এসব বাজারে গরুর মাংসের দাম কিছুটা কম থাকায় মাছের বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। শুক্রবার ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ মাছ কেজি প্রতি বিক্রি হচ্ছে ৭০০ টাকা, এক কেজি শিং মাছ চাষের (আকারভেদে) বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায়, প্রতি কেজি রুই মাছের দাম বেড়ে (আকারভেদে) ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকায়, মাগুর মাছ ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা , মৃগেল ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকায়, পাঙ্গাশ ২০০ থেকে ২২০ টাকায়, চিংড়ি প্রতি কেজি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায়, বোয়ালমাছ প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৯০০ টাকায়, কাতল ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায়, পোয়া মাছ ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়, পাবদা মাছ ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায়, তেলাপিয়া ২২০ টাকায়, কৈ মাছ ২২০ থেকে ২৩০ টাকায়, মলা ৫০০ টাকা, বাতাসি টেংরা ৯০০ টাকায়, টেংরা মাছ ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, কাচকি মাছ ৬০০ টাকায়, পাঁচ মিশালি মাছ ২২০ টাকায়, রূপচাঁদা ১০০০ টাকা, বাইম মাছ ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা, দেশি কই ১০০০ টাকা, মেনি মাছ ৭৬০০ টাকা, সোল মাছ ৬০০ থেকে ৮০০টাকা, আড়ই মাছ ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং কাইকলা মাছ ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

অর্থনীতি এর আরও খবর

img

এনআরবিসি ব্যাংকে লুটপাট ও ভয়ংকর জালিয়াতি লুকাতে মুছে ফেলা হয়েছে ১১ লাখ তথ্য

প্রকাশিত :  ০৫:৩১, ১৭ জুন ২০২৬

এনআরবিসি (নন-রেসিডেনসিয়াল বাংলাদেশি কমার্শিয়াল) ব্যাংক অর্থ লুটপাট করার পর তথ্য গোপন করতে ভয়ংকর জালিয়াতি করেছে। তারা আইটি (তথ্যপ্রযুক্তি) সিস্টেম থেকে প্রায় ১১ লাখ তথ্য মুছে ফেলেছে ব্যাংকটি। এর মাধ্যমে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল করা, হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি লুকানো এবং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য আড়ালের চেষ্টা করা হয়েছে। এসব ঘটনা ২০১৩-২০২৫ সালের মে মাসের মধ্যে হয়েছে। অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরেও ব্যাংকটিতে অনিয়ম অব্যাহত আছে। এর সঙ্গে ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এসএম পারভেজ তমাল, নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান আদনান ইমাম এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমানসহ অনেকের সম্পৃক্ততা মিলেছে।

এনআরবিসি ব্যাংক নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক নিযুক্ত ফরেনসিক অডিট রিপোর্টে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

রিপোর্টে বলা হয়েছে-কেওয়াইসি (গ্রাহককে জানুন) ফর্ম ছাড়া ১২ হাজার হিসাব খোলা হয়েছে। ব্যাংকটি ২০২৫ সালের জুন শেষে ২৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ খেলাপি ঋণ দেখায়। কিন্তু ফরেনসিক অডিটের তথ্য বলছে-খেলাপি ঋণ ৩৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রকৃত খেলাপি ঋণ ব্যাংকের ঘোষিত হারের চেয়ে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। বহু ঋণ হিসাব খেলাপি হওয়ার পরও ‘স্ট্যান্ডার্ড’ (সঠিক আছে) হিসাবে দেখানো হয়েছে। ভুয়া ঠিকাদার নিয়োগ এবং পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ২১৭ কোটি টাকার বেশি ঋণ দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা নজিরবিহীন।

জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে যা হয়েছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। জনগণ নিরাপত্তার জন্য ব্যাংকে টাকা জমা রেখেছেন। কিন্তু সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষসহ সবাই মিলে লুটপাট করে ওই টাকা খেয়ে ফেলেছে। চোখের সামনে এভাবে একের পর এক ব্যাংক ডাকাতি হয়েছে। কোনো সভ্য দেশে এ ধরনের ঘটনা কল্পনা করা যায় না। তিনি বলেন ‘নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের চোখের সামনে এসব ঘটনা ঘটেছে। তারা কী করেছে? তারা কেন এসব অনিয়ম সহ্য করল। কেন ওই সময় ব্যবস্থা নেওয়া হলো না?’ আবু আহমেদ বলেন-ব্যাংক, লিজিং কোম্পানি, বিমা কোম্পানি এবং শেয়ারবাজারসহ পুরো আর্থিক খাত লুটপাট হয়েছে। এটা কল্পনা করা যায়?’

আওয়ামী লীগের শাসনামলে অনুমোদন পাওয়া এনআরবিসি ব্যাংকের নিয়ম নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ। আমানতকারীদের স্বার্থবিরোধী কাজ, অর্থ পাচার, নিয়মবহির্ভূত ঋণ বিতরণ, নিয়োগে অনিয়ম, ক্রয় নীতিমালা লঙ্ঘনসহ নানা অপরাধে জড়িয়েছে ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এসএম পারভেজ তমাল, সাবেক নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান আদনান ইমামসহ বোর্ডের অনেক সদস্য। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলে ওই গ্রুপটি অনেকটা বিপাকে পড়ে। বিভিন্ন ভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের অনিয়ম তদন্তে ২০২৫ সালের আগস্টে ফরেনসিক অডিটর নিয়োগ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। অডিট কমিটি দীর্ঘদিন কাজ করার পর সম্প্রতি রিপোর্ট জমা দিয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, অবশ্যই অপরাধ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব অপরাধের ধরন ভিন্ন ভিন্ন। ফলে একেকটা একেক বিভাগের সঙ্গে জড়িত। তাই সংশ্লিষ্ট বিভাগসহ ব্যাংকের পর্ষদকেও এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হবে।

খেলাপি ঋণ : ২০২৫ সালের জুন শেষে নিজস্ব রিপোর্টে ২৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ খেলাপি ঋণ দেখায় ব্যাংক। কিন্তু ফরেনসিক অডিটের তথ্য বলছে খেলাপি ঋণ ৩৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রকৃত খেলাপি ঋণ ব্যাংকের ঘোষিত হারের চেয়ে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। প্রতিবেদনে একাধিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ অনুমোদনে গুরুতর অনিয়মের তথ্য মিলেছে। এর মধ্যে আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি প্রায় ৪৭০ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা পেয়েছে। এক্ষেত্রে কোম্পানির তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। এছাড়া শর্ত পূরণ না করেও পুনঃতফসিল সুবিধা পেয়েছে বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমস লিমিটেড। পুনঃতফসিলের শর্ত অনুযায়ী ১০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা সমন্বয় করার কথা ছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি পরিশোধ করেছে মাত্র ৩ লাখ টাকা। আর্থিক দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও নতুন ঋণ ও ওভারড্রাফট সুবিধা পেয়েছে ইক্সোরা অ্যাপারেলস লিমিটেড। ইনসাইড নিট কম্পোজিটকে ভুয়া আবেদনপত্র, খালি লেটারহেডে স্বাক্ষর এবং নিয়মবহির্ভূত পুনঃতফসিল সুবিধা দিয়েছে। ১৮ কিস্তির মধ্যে মাত্র একটি কিস্তি পরিশোধ করেছে স্টাইলিশ গার্মেন্টস। কিন্তু তাদের খেলাপি না দেখিয়ে নিয়মিত দেখানো হয়েছে। এতে অন্তত ২৭ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আরও যেসব গ্রাহকের ক্ষেত্রে ঋণ দেওয়ার নিয়ম যথাযথভাবে মানা হয়নি সেসব প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে-জিপিএইচ ইস্পাত, সায়মা সামিরা টেক্সটাইল মিলস, হাবিব স্টিলস লিমিটেড এবং জেন এয়ার টেকনোলজি অন্যতম।

প্রভিশন ঘাটতি ২৬০৩ কোটি টাকা : প্রতিবেদনে বলা হয়, সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হিসাবে উঠে এসেছে ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতির (প্রভিশন) ঘাটতি। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকের মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে ৩ হাজার ৪৮৭টি ঋণ হিসাবের বিপরীতে কোনো প্রভিশনই রাখা হয়নি। এছাড়া ৩৯৪টি হিসাবের ক্ষেত্রে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে প্রভিশন নির্ধারণ করা হয়েছে। জামানতের মূল্য অতিরঞ্জিত দেখিয়ে আরও ১১৯ কোটি টাকার প্রভিশন কম দেখানো হয়েছে।

সিস্টেম থেকে তথ্য মুছে ফেলা : তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অনুসন্ধানে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত ছয়জন ব্যবহারকারী কোর ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে ১০ লাখ ৭০ হাজারের বেশি তথ্য মুছে ফেলেছেন। এসব তথ্যের মধ্যে ছিল ঋণ, গ্রাহক ও ট্রেড ফাইন্যান্সসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড। অডিটে বলা হয়েছে, এসব মুছে ফেলার কোনো অনুমোদিত নথি পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে ১২ হাজার ১৮৭ জন গ্রাহককে বাধ্যতামূলক কেওয়াইসি (গ্রাহককে জানুন) নথি ছাড়া ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার তথ্যও পাওয়া গেছে। অডিটরদের ধারণা অর্থ পাচারের তথ্য লুকাতে এই কাজ করা হয়েছে।

জানতে চাইলে ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া সোমবার বলেন, যেসব অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে তার সবকিছু আমরা রেগুলেটর সংস্থা অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়েছি। পাশাপাশি আমাদের যা করণীয় আছে, প্রশাসনিকভাবে আমরা তা করার চেষ্টা করছি। এতটুকু বলতে পারি এ বিষয়ে কাজ চলছে।

স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ২১৭ কোটি টাকার ঋণ : ফরেনসিক অডিটে ব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বড় অঙ্কের ঋণের বিষয়ও উঠে এসেছে। এনআরবিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজের স্পন্সর পরিচালক মো. শহিদুল আহসানের প্রতিষ্ঠান এজি অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে ১২১ কোটি টাকা এবং এজি শিপ ব্রেকিং ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে ৯৬ কোটি টাকা ঋণ বকেয়া রয়েছে। অডিটে বলা হয়েছে, এসব ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জামানত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। মো. শহিদুল আহসানের সঙ্গে সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেওয়ান মুজিবুর রহমানের পূর্ব সম্পর্ক ছিল। প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, মুজিবুর রহমান ২০১৭ সালে দুর্নীতির অভিযোগে অপসারিত হয়েছিলেন। তাদের এই সম্পর্ককে স্বার্থের সংঘাত উল্লেখ করা হয়েছে।

শেয়ার কারসাজি সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগে বড় ক্ষতি : ফরেনসিক অডিটে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চিহ্নিত শেয়ার কারসাজি চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে ব্যাংকের বিনিয়োগের বিষয়ও উঠে এসেছে। ফরচুন সুজ নামে ‘নামসর্বস্ব’ একটি প্রতিষ্ঠানে ব্যাংকের বিনিয়োগ ছিল ১৫ কোটি ২৯ কোটি টাকা। যেখানে ব্যাংকের ক্ষতি (আনরিয়ালাইজড) ১২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। সোনালী পেপারে ১২ কোটি ৩১ লাখ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে ক্ষতি ৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এসব বিনিয়োগের কারণে ২০২৪ সালেই ব্যাংকের প্রভিশন রাখতে হয়েছে ৭২ কোটি টাকা। এই চক্রের সঙ্গে ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান এসএম পারভেজ তমাল, শেয়ারবাজারের আলোচিত কারসাজি চক্র-আবুল খায়ের হিরু, হিরুর বাবা আবুল কালাম মাতবর, স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসান এবং বোন কনিকা আফরোজের সংশ্লিষ্টতা মিলেছে।

ভূতুড়ে ঠিকাদারকে ২৯ কোটি টাকার কাজ : প্রতিবেদনে টিএসএন ট্রেড অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচারকে ‘ঘোস্ট ভেন্ডর’ বা ভূতুড়ে ঠিকাদার হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটিকে ২৯ কোটি ৭ লাখ টাকার কাজ দেওয়া হয়েছে। অবাক করার বিষয় হলো-ওই প্রতিষ্ঠান নিজেরা কোনো কাজ করেনি। দরপত্রে অংশ নেওয়া অন্য প্রতিষ্ঠানকে সাব-কন্ট্রাক্ট দিয়েছে। এ ধরনের ঘটনা নজিরবিহীন। এছাড়া আসবাবপত্র ও ইন্টেরিয়রের জন্য হাই ফার্ম নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে দরপত্র ছাড়াই ৪ কোটি ১৫ লাখ টাকার কাজ দেওয়া হয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানকে রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়) পরামর্শ সেবার নামে আরও ২ কোটি ৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ব্যাংকের তৎকালীন নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান আদনান ইমাম এবং সৃষ্টি আর্কিটেকচার অ্যান্ড কনসালট্যান্সির সংশ্লিষ্টতা মিলেছে। তারা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম প্রতিযোগিতা তৈরি এবং বিড রিগিংয়ের মাধ্যমে কাজ হাতিয়ে নিয়েছে।

অনুমোদন ছাড়া অর্থ পরিশোধ : ভলগা ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং নামে একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৫৯ লাখ ৬০ হাজার টাকার পে-অর্ডার দেওয়া হয়েছে। এর বিপরীতে যথাযথ অনুমোদন বা কোনো কাগজপত্র নেই। একই প্রতিষ্ঠানকে রেমিট্যান্স পরামর্শ ফি হিসাবে আরও ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

ক্রেডিট কার্ড ও আইসিটিতে ব্যাপক অনিয়ম : ৬৭টি ক্রেডিট কার্ড ফাইল পরীক্ষা করে দেখেছে অডিট কমিটি। এর মধ্যে ৬০টিতে আবেদনপত্র অসম্পূর্ণ বা অনুপস্থিত। ৬৩টি কার্ডে কেওয়াইসি নথি নেই। অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে, একজন কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল হাসান একাই ৮৮৯টি ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করেছেন। যার মোট সীমা ছিল ৭৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এসব কার্ডে বকেয়া ১৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা। একই ভাবে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের অডিটে ৮৬টি ঝুঁকি চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯টি উচ্চ ঝুঁকি, ২৮টি মধ্যম মানের ঝুঁকি এবং ৯টি নিু ঝুঁকি হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। মূল ব্যাংকিং (কোর ব্যাংকিং) সিস্টেমের অখণ্ডতা, সাইবার নিরাপত্তা, অ্যাকসেস নিয়ন্ত্রণ এবং ডাটাবেজ ব্যবস্থাপনায় গুরুতর দুর্বলতার কথা বলা হয়েছে। এসব অনিয়ম কোনো নির্দিষ্ট শাখা বা সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর ফলে ব্যাংকের প্রায় সব স্তরেই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকটির অনিয়মগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ঋণ ব্যবস্থাপনা, আর্থিক প্রশাসন, মানবসম্পদ, তথ্যপ্রযুক্তি ও ক্রয় ব্যবস্থার প্রায় সব ক্ষেত্রেই অনিয়ম ও জালিয়াতি হয়েছে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করেছে অডিটররা।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর