img

মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় উল্টো রথযাত্রা উদযাপিত

প্রকাশিত :  ০৮:১৫, ০৭ জুলাই ২০২৫

মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় উল্টো রথযাত্রা উদযাপিত

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার সদর, রাজনগর, কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও যথাযোগ্য মর্যাদায় শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের উল্টো রথযাত্রা উৎসব পালিত হয়েছে। 

শনিবার (৫ জুলাই) বিকেলে শ্রীমঙ্গল উপজেলার সবুজবাগ আবাসিক এলাকার ইসকন মন্দির ও হবিগঞ্জ রোডস্হ শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের আখরা  থেকে  শত শত মহিলা-পুরুষ ও শিশু ভক্তদের সমন্বয়ে দুটি পৃথক বিশাল উল্টা রথ যাত্রা বের করা হয়। 

এদিকে সকাল থেকে দুটি মন্দিরে শত শত ভক্ত বৃন্দ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দেন। জগন্নাথ দেবের পূজা, নাম সংকীর্তন ও জগন্নাথ দেবের ভোগ আরতির মধ্যে দিয়ে শেষ হয়। পরে মন্দিরে মন্দিরে মহা প্রসাদ বিতরণ করা হয়। 

পুরীর রথযাত্রায় জগন্নাথদেব রওনা দেন তাঁর মাসির বাড়ি। আট দিন ধরে মাসির বাড়িতে থাকেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। তারপরেই উল্টো রথে নিজের ধামে ফেরেন।

আষাঢ় মাসের দ্বিতীয়ায় শুক্লপক্ষে রথযাত্রায় বেরিয়ে পড়েন প্রভু জগন্নাথ। দাদা বলরাম ও বোন সুভদ্রাকে নিয়ে তাঁর এই স্বর্গীয় রথযাত্রা হিন্দু শাস্ত্রীয় বিধি মেনে ধুমধাম সহকারে আয়োজিত হয়। পুরীতে এই রথযাত্রার মহাসমারোহ তো দেখার মতো। কিন্তু, এই জগন্নাথ প্রভুর রথযাত্রা ও তাঁর বাড়ি ফেরার এই উল্টোরথ ঘিরে জমাট বেঁধেছে বেশ কিছু অনন্য কাহিনি। এই কাহিনিগুলো রথযাত্রা, উল্টোরথের মাহাত্ম্য প্রচার করে।

পুরীর রথযাত্রা গুন্ডিচা যাত্রা নামে পরিচিত। এইদিন রথে জগন্নাথদেব তাঁর মাসির বাড়ি যান। আট দিন ধরে বলরাম ও সুভদ্রাকে নিয়ে শেখানেই থাকেন। এরপর দশমী তিথিতে ৯ দিনের মাথায় গুন্ডিচা মন্দির থেকে বাড়ি ফেরেন। নন্দীঘোষ রথে চড়েন জগন্নাথ, বলরাম চড়েন তালধ্বজে, সুভদ্রা দর্পদলন রথে চড়ে এই যাত্রা সম্পন্ন করেন। উল্টো পথে রথ আসায় এই যাত্রা উল্টোরথ নামে পরিচিত। বহুড়া যাত্রাও বলা হয়।

মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্নর আমলে রথযাত্রার প্রথা চালু হয়েছিল। কারণ কথিত আছে যে তাঁর আমলেই নাকি জগন্নাথদেব, বলরাম এবং সুভদ্রার মূর্তি তৈরি করা হয়েছিল।

কথিত আছে যে সত্যযুগে রাজা ইন্দ্রদ্যুন্মের স্ত্রী গুন্ডিচা নিজের কাছে শ্রীকৃষ্ণকে কিছুদিন রাখার আশীর্বাদ পেয়েছিলেন। তখন থেকেই এই প্রচলন। যদিও কপিলা সংহিতা, ব্রহ্ম পুরাণ, পদ্ম পুরাণ ও স্কন্দ পুরাণ দেয় অন্য তথ্য। 

ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ বলে, রাজা ইন্দ্রদ্যুন্ম ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত। সমুদ্রে ভেসে আসা কাঠের খণ্ড দিয়ে দেবমূর্তি নির্মাণের আদেশ পেয়েছিলেন তিনি। কেউ কেউ আবার বলে, স্বপ্নে বিষ্ণু মন্দির গড়ার আদেশ পেয়েছিলেন রাজা। মূর্তি গড়ার দায়িত্ব পড়েছিল স্বয়ং বিশ্বকর্মার কাঁধে। শর্ত ছিল যে মূর্তি গড়ার সময়ে কেউ মন্দিরে প্রবেশ করতে পারবেন না। কিন্তু রাজা সেই শর্ত মানতে পারেননি।

মূর্তি গড়ার সময় মন্দিরের ভিতর থেকে কোনও আওয়াজ না পেয়ে রাজা প্রবেশ করেছিলেন মন্দিরে। মূর্তি তখন সবেমাত্র অর্ধেক গড়া হয়েছে। রাজা ঢুকে পড়ায় আর সম্পূর্ণ হয়নি মূর্তি, অদৃশ্য হয়ে যান বিশ্বকর্মা। অগত্যা রাজা তারপর থেকে সেই মূর্তিকেই দেবজ্ঞানে পুজো করেন। তখন থেকেই পুরীর মন্দিরে জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রার পুজো হয়ে আসছে।

যদিও অনেক ঐতিহাসিকই রথযাত্রার ইতিহাসে অন্য গল্প বলেন। তাঁদের দাবি, ১০৭৮ সালে তৈরি হয়েছিল পুরীর জগন্নাথ মন্দির। এরপর, ১১৭৪ সালে মেরামতি করানোর পরেই নাকি আজকের এই জগন্নাথ মন্দির গড়ে ওঠে। তারপর থেকেই শুরু হয়েছে রথযাত্রা।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

লাউয়াছড়ায় সড়ক পার হতে গিয়ে গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ গেল বিপন্ন মুখপোড়া হনুমানের

প্রকাশিত :  ১৫:৫৯, ২৫ জুলাই ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে সড়ক পার হওয়ার সময় দ্রুতগতির গাড়ির ধাক্কায় বিপন্ন প্রজাতির একটি মুখপোড়া হনুমান (Capped Leaf Monkey) মারা গেছে। শুক্রবার (২৪ জুলাই) দুপুরের পর কোনো একসময় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভানুগাছ–শ্রীমঙ্গল সড়কের মাগুরছড়া গ্যাসফিল্ড এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিকেল পাঁচটার দিকে বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী কাজল হাজরা মোটরসাইকেলে ওই সড়ক দিয়ে শ্রীমঙ্গলের দিকে যাওয়ার সময় রাস্তার পাশে হনুমানটিকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে তিনি বিষয়টি বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগকে জানান।

সন্ধ্যা সাতটার দিকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের বিট অফিসের বনকর্মীরা ঘটনাস্থল থেকে মৃত হনুমানটি উদ্ধার করেন। পরে সেটি জানকিছড়া বন্যপ্রাণী রেসকিউ সেন্টারের কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মধ্য দিয়ে শ্রীমঙ্গল–কমলগঞ্জ সড়কটি চলে গেছে। ফলে বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া এ সড়কটি বন্যপ্রাণীদের চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার ওপর দিয়ে গেছে। প্রতিবছরই এ সড়কে যানবাহনের নিচে চাপা পড়ে লাউয়াছড়া বনাঞ্চলের বিভিন্ন প্রজাতির পশুপাখি মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যায়।

শুধু সড়কপথ নয়, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে গেছে আখাউড়া–সিলেট রেলপথও। ফলে সড়ক ও রেল—দুই ধরনের যোগাযোগ অবকাঠামোর কারণে বন্যপ্রাণীদের চলাচলের ওপর বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে লাউয়াছড়া ও আশপাশের বনাঞ্চলের বন্যপ্রাণী ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ রেলপথে মাঝেমধ্যে মানুষও ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় বন্যপ্রাণীপ্রেমীদের অভিযোগ, বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া সড়কটিতে অনেক চালক অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালান। ফলে বন্যপ্রাণীরা সড়ক পার হওয়ার সময় প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। তাঁদের মতে, সড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং বন্যপ্রাণী চলাচলের এলাকাগুলোতে কার্যকর নজরদারি না থাকায় এমন ঘটনা বারবার ঘটছে।

লাউয়াছড়া এলাকার বাসিন্দা ও গণমাধ্যমকর্মী সাজু মারচিয়াং মৃত হনুমানটির ছবি ও ঘটনার তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশ করলে বিষয়টি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

মুখপোড়া হনুমান বাংলাদেশের একটি বিপন্ন বন্যপ্রাণী। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) বাংলাদেশের রেড লিস্টে এ প্রজাতিটি অন্তর্ভুক্ত। বনভূমি সংকুচিত হওয়া, আবাসস্থলে মানুষের হস্তক্ষেপ এবং সড়ক দুর্ঘটনাসহ নানা কারণে এ প্রজাতির সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

বন্যপ্রাণীপ্রেমীরা বলছেন, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মধ্য দিয়ে যাওয়া সড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন এবং নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি রেলপথে বন্যপ্রাণীর চলাচল বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তাঁদের মতে, দুর্ঘটনার পর মৃত প্রাণী উদ্ধার করাই যথেষ্ট নয়; লাউয়াছড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাওয়া সড়ক ও রেলপথে বন্যপ্রাণী এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।


সিলেটের খবর এর আরও খবর