প্রকাশিত :
০৭:০২, ১২ জুলাই ২০২৫ সর্বশেষ আপডেট: ০৮:৩৬, ১২ জুলাই ২০২৫
বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও ও সুনামগঞ্জ সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে ২ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। হরিপুর সীমান্তে মো. আসকর আলী (২৪) নামের এক বাংলাদেশি যুবক এবং দোয়ারাবাজার সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে শফিকুল ইসলাম নামে আরও এক বাংলাদেশি নিহত হন।
আজ শনিবার (১২ জুলাই) ভোর ৪টার দিকে উপজেলার মিনাপুর সীমান্ত এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
নিহত মো. আসকর আলী ওই উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের জীবনপুর এলাকার মো. কানু আলীর ছেলে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন হরিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাকারিয়া মন্ডল।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার ভোরে হরিপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত মিনাপুর বিওপির আওতাধীন মেইন পিলার ৩৫৩/ হতে ১০০ গজ ভারতের অভ্যন্তরে তারকাটার কাছে যান আসকর আলী। তখন তাকে লক্ষ্য করে বিএসএফের সদস্যরা গুলি ছোড়েন। গুলির আওয়াজ শুনে স্থানীয় লোকজন এসে দেখেন তার মরদেহ কাঁটাতারে পড়ে আছে।
এ ব্যাপারে হরিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাকারিয়া মন্ডল বলেন, বিএসএফের গুলিতে সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানা যাবে।
অপরদিকে, শুক্রবার গভীর রাতে সুনামগঞ্জ উপজেলার ভাঙাপাড়া সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন শফিকুল ইসলাম। সে দোয়ারাবাজার উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের ভাঙ্গাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাতে শফিকুল ইসলামসহ কয়েকজন মিলে বাগানবাড়ি সীমান্তে গেলে ভারতের অভ্যন্তরে দায়িত্বরত বিএসএফ সদস্যরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালান। এতে শফিকুল ইসলাম বুকে গুলিবিদ্ধ হন।
স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দোয়ারাবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
দোয়ারাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল হক বলেন, ‘নিহতের বুকে গুলি লেগেছে। রাতের আঁধারে সীমান্ত দিয়ে গরু আনতে যাওয়ার সময় এ ঘটনা ঘটে।’
শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি অরণ্যে ৩০টির বেশি প্রাচীন গিরিখাত, পর্যটন সম্ভাবনায় নতুন দিগন্ত
প্রকাশিত :
১৪:৪১, ২২ জুন ২০২৬
শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি: চা-বাগান, পাহাড়ি টিলা, হাওর, লেক ও বনাঞ্চলের জন্য পরিচিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে একগুচ্ছ প্রাচীন গিরিখাত। উপজেলার সিন্দুরখান ইউনিয়নের ভারতীয় সীমান্তসংলগ্ন নাহার চা-বাগানের পাশের পুঞ্জি এলাকার গভীর পাহাড়ি অরণ্যে ৩০টিরও বেশি গিরিখাতের সন্ধান পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব গিরিখাতের কোনোটি প্রায় এক কিলোমিটার, আবার কোনোটি কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। কয়েকটি গিরিখাত বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ভেতরেও প্রবেশ করেছে।
স্থানীয় খাসিয়াসহ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষেরা গিরিখাতগুলোর নাম দিয়েছেন ‘লাসুবন’, ‘ক্রেম উল্কা’, ‘ক্রেম কেরি’সহ বিভিন্ন নামে। স্থানীয় ভাষায় ‘লাসুবন’-এর অর্থ পাহাড়ি ফুল। এলাকার গাছপালা, ফুল-ফল এবং ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে এসব নামকরণ করা হয়েছে।
গিরিখাতগুলোর চারপাশে রয়েছে গভীর গুহা, পাহাড়ি ঝরনা, ছোট ছোট জলপ্রপাত এবং বৈচিত্র্যময় শিলা গঠন। সব মিলিয়ে অঞ্চলটি পেয়েছে এক অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, যা প্রকৃতিপ্রেমী ও অভিযাত্রীদের কাছে নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।
আবিষ্কারের নেপথ্যে
শ্রীমঙ্গল উপজেলা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বিষয়ক সমন্বয়কারী তাজুল ইসলাম জাবেদ জানান, ২০১৮ সালে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনযাত্রা নিয়ে কাজ করার সময় তিনি প্রথম এসব গিরিখাতের সন্ধান পান। পরে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম এবং কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী এলাকাটি পরিদর্শন করেন।
তাজুল ইসলাম জাবেদ বলেন, দুর্গম যাতায়াতব্যবস্থা এবং জনসমাগমের অভাবে দীর্ঘদিন এলাকাটি সাধারণ মানুষের দৃষ্টির আড়ালে ছিল। পরবর্তীতে করোনা মহামারির কারণে চলাচলে বিধিনিষেধ থাকায় এ নিয়ে পর্যটন উন্নয়নের উদ্যোগও থমকে যায়।
স্থানীয়দের মতে, তারা বহু বছর ধরে এসব গিরিখাতের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানলেও এর পর্যটন ও গবেষণাগত গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না। অনেকের ধারণা, দীর্ঘমেয়াদি প্রাকৃতিক ক্ষয়প্রক্রিয়ার ফলে এসব গিরিখাতের সৃষ্টি হয়েছে।
পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হয় দুর্গম পথ
গিরিখাতগুলোতে পৌঁছাতে হলে প্রথমে জিপ বা মোটরসাইকেলে সিন্দুরখান ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকায় যেতে হয়। এরপর কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে অতিক্রম করতে হয় খাড়া পাহাড়ি ছড়া, ঘন জঙ্গল এবং পাথুরে উঁচু-নিচু পথ।
সীমান্তবর্তী এ অঞ্চলে খাসিয়া সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ এবং চা-বাগানের শ্রমিকেরা বসবাস করেন। দুর্গম অবস্থানের কারণে এলাকাটি এখনও অনেকাংশে অনাবিষ্কৃত ও অপরিচিত রয়ে গেছে।
প্রশাসনের নজরে আসে গিরিখাত
তৎকালীন মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মো. ইসরাইল হোসেন এবং তৎকালীন শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসলাম উদ্দিন লাসুবন গিরিখাত পরিদর্শন করেন। বর্তমানে তাঁরা দুজনই অন্যত্র বদলি হয়েছেন।
পরিদর্শনের পর তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. ইসরাইল হোসেন তাঁর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে লিখেছিলেন, “শ্রীমঙ্গলের নাহারপুঞ্জির নিকটস্থ লা-সুবহান (লা-সুবন) গিরিখাত ভ্রমণ করলাম। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ভরপুর এই স্থান ভ্রমণপিপাসুদের জন্য হতে পারে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আপনাদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।”
তৎকালীন ইউএনও মো. ইসলাম উদ্দিন জানিয়েছিলেন, গিরিখাত এলাকায় যাতায়াত সহজ করতে সড়ক ও সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। একটি সেতুর নির্মাণকাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং অন্য সেতুগুলোর কাজও পর্যায়ক্রমে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তিনি সে সময় পর্যটকদের সতর্ক করে বলেছিলেন, দুর্গম এলাকায় ভ্রমণের ক্ষেত্রে একা না গিয়ে অবশ্যই অভিজ্ঞ গাইডের সহায়তা নেওয়া উচিত।
পর্যটন মানচিত্রে নতুন সংযোজনের সম্ভাবনা
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, যথাযথ সংরক্ষণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে শ্রীমঙ্গলের পর্যটন মানচিত্রে যুক্ত হতে পারে নতুন একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য। চা-বাগান, বনাঞ্চল, ঝরনা, গুহা ও গিরিখাতের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ অঞ্চল দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য হয়ে উঠতে পারে প্রকৃতি ও রোমাঞ্চভিত্তিক পর্টনের অন্যতম কেন্দ্র।
প্রকৃতির নিভৃত কোলে লুকিয়ে থাকা এই গিরিখাতগুলো ধীরে ধীরে মানুষের নজরে আসছে। তবে পর্যটনের বিকাশের পাশাপাশি এলাকার পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ব্যবস্থা—এমন মত স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশসচেতনদের।