img

২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২০ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না তাহিরপুরে

প্রকাশিত :  ০৭:৪১, ১৮ জুন ২০২৬

 ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২০ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না তাহিরপুরে

সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলায় অসহনীয় লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে উপজেলার সর্বত্র এই বিপর্যয় চলমান।

জানা গেছে, উপজেলার সব এলাকায় বিদ্যুৎ সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২০ ঘণ্টাই লোডশেডিংয়ের খাতায়। গড়ে মাত্র চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে গ্রাহকদের; যার কারণে আবাসিক এলাকার হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার– সর্বত্র দুর্ভোগে নাকাল মানুষ। চলমান বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ধস নেমেছে ব্যবসা-বাণিজ্যে।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, নির্ধারিত কোনো শিডিউল ছাড়াই চলছে লোডশেডিং। দিন-রাতের যেকোনো সময় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। তীব্র গরমে শিশু-বৃদ্ধসহ সাধারণ মানুষ আছেন অবর্ণনীয় দুর্ভোগে। রাতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বন্ধ রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জেনারেটর থাকলেও সেটি বিকল থাকায় ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা ও স্বাভাবিক কার্যক্রম।

তাহিরপুর বাজারের ব্যবসায়ী মুতাকাব্বির মিয়া বলেন, ফ্রিজ বন্ধ থাকায় আইসক্রিম ও ঠান্ডা জাতীয় খাবার নষ্ট হচ্ছে। ক্রেতারাও দোকানে আসছেন না। ব্যবসা একেবারে বসে গেছে। এদিকে তীব্র লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে সামাজিক মাধ্যমে সরব হয়েছেন স্থানীয়রা। দ্রুত লোডশেডিং কমিয়ে নিয়মিত শিডিউল অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন তারা।

তাহিরপুর জয়নাল আবেদীন ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ জহির উদ্দিন তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর এমন এক উপজেলা, যেখানে দৈনিক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৫ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না।

টাঙ্গুয়ার হাওর-সংলগ্ন ছিলানি গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হালিম সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, বিদ্যুৎ বিল নিয়মিত পরিশোধ করছে গ্রাহক। কিন্তু বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না।

স্থানীয় তরুণদের একাংশ জানায়, সারাদেশ বিশ্বকাপ ফুটবলে বুঁদ হয়ে আছে। এখানকার মানুষ সেই উৎসব থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকা কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয়। অথচ এই সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্টদের তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়ছে না।

হাসপাতালে ভর্তি থাকা শ্রীপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের মানিকখিলা গ্রামের রোগী জালাল উদ্দিন বলেন, গরমে প্রাণ বের হয়ে যাচ্ছে। সারারাত বিদ্যুৎ থাকে না। হঠাৎ এলেও ৩০ মিনিট পরেই চলে যায়।

উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাফিজ উদ্দিন বলেন, সারারাত বিদ্যুৎ না থাকার কারণে ক্রীড়ামোদীরা বিশ্বকাপের ফুটবল খেলা দেখতে পারছেন না। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক তাহিরপুর শাখার ব্যবস্থাপক অমর সরকার জানান, বিদ্যুতের অসহনীয় লোডশেডিংয়ের কারণে পুরো ব্যাংক পিরিয়ড জেনারেটর দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। চাকরি জীবনের ৩৫ বছরে বিদ্যুতের এমন ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের অভিজ্ঞতা আর হয়নি।

তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) নাশাদ আহমেদ বলেন, ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কারণে স্বাস্থ্যসেবা গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়েছে। হাসপাতালের জেনারেটরটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল। মেরামতের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগকে। তারা এখনও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট পল্লী বিদ্যুৎ সাব-জোনাল অফিসের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) আলাউল হক সরকার জানান, তাহিরপুর উপজেলায় দৈনিক ৯ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন। সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩ মেগাওয়াট। ঘাটতি বেশি হওয়ায় প্রতি এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ দিলে বাধ্য হয়ে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

৭০ বছরের অপেক্ষা: একটি সেতুর স্বপ্নে বদলে যেতে পারে কমলগঞ্জ–রাজনগরের হাজারো মানুষের জীবন

প্রকাশিত :  ১১:১০, ১৮ জুন ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ ও রাজনগর উপজেলার সীমান্তবর্তী জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি—লাঘাটা নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু। স্বাধীনতারও আগে থেকে নদীটি দুই উপজেলার মানুষের যাতায়াত ও যোগাযোগের পথে বড় বাধা হয়ে আছে। প্রায় ৭০ বছর ধরে স্থায়ী সেতুর অভাবে এলাকার কয়েক হাজার মানুষকে এখনো একটি জরাজীর্ণ বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভর করে চলাচল করতে হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার যুগে দাঁড়িয়ে এখনো তারা মৌলিক অবকাঠামোগত সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামাজিক যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই তাদের নানামুখী দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

একটি সাঁকো, হাজারো মানুষের ভরসা

লাঘাটা নদীর পশ্চিম তীরে কমলগঞ্জ উপজেলার রকিব বাজার-গোপিনগর, উত্তর শ্রীরামপুর, রাধাগোবিন্দপুর, বৃন্দাবনপুর, কান্দিগাঁও, মাঝগাঁও, নোয়াগাঁও, নন্দগ্রাম, কোনাগাঁও, বৈরাগীচক ও রাজদিঘিরপার এলাকার মানুষ বসবাস করেন। অপরদিকে পূর্ব তীরে রয়েছে রাজনগর উপজেলার মৌলভীচক, নোয়াগাঁও, মিলের বাজার, চানহারাবেলী, পালপুর, আপসলগতি, মরিচা ও বাঘুয়া গ্রামের জনপদ।

এই দুই পাড়ের মানুষের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম একটি বাঁশের সাঁকো। বর্ষা মৌসুমে সাঁকোটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এটি ব্যবহার করেন।

স্বাস্থ্যসেবায় সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ

এলাকাবাসীর মতে, সেতু না থাকায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হতে হয় রোগীদের। বিশেষ করে মুমূর্ষু রোগী ও গর্ভবতী নারীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বর্তমানে বিকল্প পথ ব্যবহার করে জেলা সদর হাসপাতালে পৌঁছাতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। স্থানীয়দের ধারণা, লাঘাটা নদীর ওপর ২৫ থেকে ৩০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতু নির্মিত হলে এই সময় কমে প্রায় ৩০ মিনিটে নেমে আসবে। এতে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি অনেক মূল্যবান জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে।

শিক্ষার্থীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পথচলা

নদীর দুই পাড়ে রয়েছে একাধিক স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী বাঁশের সাঁকো পার হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে। বর্ষাকালে সাঁকো পিচ্ছিল ও নড়বড়ে হয়ে পড়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়।

অভিভাবকদের অভিযোগ, নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। ফলে শিক্ষার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে।

কৃষি ও বাণিজ্যের সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত

কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলের অর্থনীতি মূলত ফসল উৎপাদন ও স্থানীয় বাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু সেতু না থাকায় কৃষকরা সহজে তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে পারেন না। এতে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং ন্যায্য মূল্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয়দের মতে, সেতু নির্মিত হলে রকিব বাজার, রাজদিঘিরপার বাজার ও মিলের বাজারসহ আশপাশের বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো নতুন গতি পাবে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

দীর্ঘদিনের দাবিতে এলাকাবাসী

এলাকাবাসীর পক্ষে মো. রকিব মিয়া জেলা প্রশাসকের কাছে একটি আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন। আবেদনে লাঘাটা নদীর ওপর ২৫ থেকে ৩০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে। তাদের বিশ্বাস, একটি সেতু শুধু দুই পাড়কে সংযুক্ত করবে না; বরং দীর্ঘদিনের অবহেলায় পিছিয়ে থাকা একটি বিস্তীর্ণ জনপদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক উন্নয়নের নতুন দ্বার উন্মোচন করবে।

লাঘাটা নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু এখন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের দাবি নয়; এটি হাজারো মানুষের নিরাপদ জীবন, উন্নত যোগাযোগ এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের স্বপ্নের প্রতীক হয়ে উঠেছে।


সিলেটের খবর এর আরও খবর