img

ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ, শ্রীমঙ্গলে দুই দিনে নিহত ২

প্রকাশিত :  ০৬:২৯, ১০ জুন ২০২৬

 ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ, শ্রীমঙ্গলে দুই দিনে নিহত ২

মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় চলন্ত ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে দুই দিনে দুই যুবকের মৃত্যু হয়েছে। পৃথক দুটি ঘটনায় আরও ৩ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।

শনি ও রোববার উপজেলার উত্তরসুর এলাকায় দ্বারিকাপাল মহিলা ডিগ্রি কলেজ সংলগ্ন রেললাইনের পাশে এসব দুর্ঘটনা ঘটে।

ঈদযাত্রাকে সামনে রেখে যখন ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ ঠেকাতে কঠোর অবস্থানের কথা বলছে বাংলাদেশ রেলওয়ে, ঠিক তখনই পরপর দুটি প্রাণহানির ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, শনিবার (৬ জুন) বিকেল ৩টায় ঢাকাগামী আন্তঃনগর জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার এনামুল মিয়া ফাহিম (২৫) ও মো. সিয়াম (১৮)। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও রেলওয়ে পুলিশ তাঁদের উদ্ধার করে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে ফাহিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে, তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মৃত্যু বরণ করেন। সিয়াম বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এর একদিন পর রবিবার (৭ জুন) বিকেল ৩টা ১০ মিনিটে একই স্থানে চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে অজ্ঞাতপরিচয় ( ৩৫) নামে এক যুবক ঘটনাস্থলেই নিহত হন। একই ঘটনায় সামছু মিয়া (৩০) নামে আরও ১ জন আহত হন। তাদের বাড়ি রংপুর জেলায় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, গতকাল রবিবার আহত সামছু মিয়াকে হাসপাতালে এনে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে ৬ জুন শনিবার আহত দুইজনের মধ্যে এনামুল মিয়া ফাহিমকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার করা হলে পরে তার ও মৃত্যু হয়েছে।

শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহাঙ্গীর আলম সোমবার জানান, নিহত দুই ব্যক্তির ঘটনায় পৃথক অপমৃত্যু মামলা দায়ের হয়েছে। জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস থেকে পড়ে মৃত্যুর ঘটনায় মামলা নং-১৭, তারিখ ০৬/০৬/২০২৬ এবং গতকাল রবিবার পাহাড়িকা এক্সপ্রেস থেকে পড়ে মৃত্যুর ঘটনায় মামলা নং-১৮, তারিখ ০৭/০৬/২০২৬ রুজু করা হয়েছে। নিহতদের মরদেহ মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে রয়েছে এবং ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়া চলমান।

তিনি আরও জানান, পাহাড়িকা এক্সপ্রেস থেকে পড়ে নিহত অজ্ঞাত যুবকের পরিচয় শনাক্তে পিবিআই মৌলভীবাজারকে অবহিত করা হয়েছে।পিবিআই মৌলভীবাজার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং পরিচয় নিশ্চিত করার কাজ চলছে।

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ট্রেনের ছাদে বসে ভ্রমণের গাছের ডাল ধাক্কা লেগে বা অসাবধানতা বশত তারা নিচে পড়ে যান।

এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “দুই দিনে একই স্থানে জয়ন্তিকা ও পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে ২ জন যাত্রীর মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক। যাত্রীদের বারবার সতর্ক করা হলেও কিছু মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করেন। এমন ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে।”

এদিকে ঈদযাত্রাকে সামনে রেখে ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ ঠেকাতে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, স্টেশনগুলোতে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা, অতিরিক্ত নজরদারি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে।

তবে শ্রীমঙ্গলের এই দুর্ঘটনাগুলোর পর প্রশ্ন উঠেছে—এত নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরও কীভাবে যাত্রীরা ট্রেনের ছাদে উঠে দীর্ঘ পথ ভ্রমণ করতে পারছেন? নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

সম্প্রতি নরসিংদীর ঘোড়াশালে আন্তঃনগর উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদে ভ্রমণের সময় বজ্রপাতে সজীব সরকার (৪০) নামে এক যাত্রীর মৃত্যুর ঘটনাও দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। গত ২৪ মে বিকেল প্রায় ৫টার দিকে ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় ওই দুর্ঘটনা ঘটে।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আবারও যাত্রীদের ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রেনের ছাদে ভ্রমণকারীরা গাছের ডাল, সেতু, বৈদ্যুতিক তার, বজ্রপাত কিংবা হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়ার মতো প্রাণঘাতী ঝুঁকির মুখে থাকেন।


সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

শ্রীমঙ্গলের সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক গ্রাম নোয়াগাঁও

প্রকাশিত :  ১৪:৫১, ১২ জুলাই ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৪:৫৩, ১২ জুলাই ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম কেন্দ্র শ্রীমঙ্গল। চা-বাগান, পাহাড়ি টিলা ও বনভূমির জন্য পরিচিত এই অঞ্চল এখন অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও পর্যটনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় শ্রীমঙ্গল কৌশলগতভাবেও দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল।

শ্রীমঙ্গল শুধু পর্যটননির্ভর উপজেলা নয়; এটি দেশের অন্যতম চা-শিল্পকেন্দ্র। এখানে প্রায় অর্ধশত চা-শিল্প প্রতিষ্ঠান জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। পাশাপাশি বিভিন্ন হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্র দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে।

উপজেলার বিভিন্ন গ্রামও ধীরে ধীরে শিল্প, বাণিজ্য ও পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। রাধানগর এলাকায় আন্তর্জাতিক মানের হোটেল ও রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। সাতগাঁও থেকে মৌলভীবাজারের জগন্নাথপুর পর্যন্ত আঞ্চলিক মহাসড়কের দুই পাশে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় কর্মসংস্থান ও আঞ্চলিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়েছে।

এই ধারাবাহিকতায় শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের নোয়াগাঁও গ্রামও শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন সম্ভাবনার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।

ঐতিহ্য ও নেতৃত্বের ইতিহাস

নোয়াগাঁও শুধু একটি গ্রাম নয়; রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ইতিহাসেও এর পরিচিতি রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে এলাকাটি রাজনৈতিক সচেতনতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত ছিল।

স্বাধীনতা আন্দোলনে ভূমিকা রাখা যতীন্দ্রমোহন দত্ত চৌধুরী ১৯৪৭ সালের পর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে গ্রামের অবকাঠামোগত উন্নয়নে কাজ করেন। তাঁর ছেলে ধীরেন্দ্র দত্ত চৌধুরী স্বাধীনতার পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আরেক ছেলে সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী ১৯৮৩ সালে শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে রাস্তা, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন।

পরবর্তী সময়েও স্থানীয় নেতৃত্ব অবকাঠামো উন্নয়ন, জনকল্যাণমূলক স্থাপনা নির্মাণ ও সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। এই ধারাবাহিক নেতৃত্ব নোয়াগাঁওয়ের উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করেছে।

শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের প্রসার

বর্তমানে নোয়াগাঁও ধীরে ধীরে একটি আধুনিক অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপ নিচ্ছে। ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের নিকটবর্তী অবস্থান, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ এবং যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধা এ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।

এলাকায় বিভিন্ন শিল্প ও উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে ন্যাজারিন মিশন, হেলদি চয়েজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানি, প্রাণ-আরএফএলের মাছের হ্যাচারি, কারিতাস বাংলাদেশ, বাংলাদেশ বনশিল্প করপোরেশন ও ইস্পাহানি টি কোম্পানি।

এসব প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো নতুন আয়ের সুযোগ পাচ্ছে, যা জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।

ভৌগোলিক সুবিধা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা

নোয়াগাঁওয়ের অন্যতম বড় শক্তি এর ভৌগোলিক অবস্থান। শ্রীমঙ্গল শহর ও ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের কাছাকাছি হওয়ায় পণ্য পরিবহন সহজ ও দ্রুত।

এ ছাড়া সড়ক, রেল ও নৌপথের সঙ্গে সহজ সংযোগ থাকায় এলাকাটি বাণিজ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, আশুগঞ্জ নৌবন্দর এবং সিলেট ও ঢাকার বিমানবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ সুবিধা ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

চা-অঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ায় এখানে চা প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

পর্যটন ও ডিজিটাল সম্ভাবনা

নোয়াগাঁওয়ের আশপাশে রয়েছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, বাইক্কা বিল ও বিভিন্ন চা-বাগান। ফলে পর্যটননির্ভর ব্যবসারও সম্ভাবনা রয়েছে।

স্থানীয় শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ ফ্রিল্যান্সিং, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও কৃষিভিত্তিক প্রযুক্তিনির্ভর কাজে যুক্ত হচ্ছেন। ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ সুবিধা বাড়ায় ই-কমার্স ও ডিজিটাল ব্যবসার সুযোগও তৈরি হয়েছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিত উন্নয়ন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে নোয়াগাঁও পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক গ্রামে পরিণত হতে পারে।

সম্ভাবনাময় খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে পর্যটনভিত্তিক হোটেল ও রিসোর্ট, হস্তশিল্প, চা প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ, ডিজিটাল ব্যবসা এবং রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান।

স্থানীয় উদ্যোক্তারা মনে করছেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, যোগাযোগব্যবস্থা ও শিল্পায়নের সুযোগ মিলিয়ে নোয়াগাঁও ভবিষ্যতে শ্রীমঙ্গলের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর