রামগঙ্গাছড়ার ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে ভাইরাল পর্যটন স্পট, চন্ডিচড়া চা-বাগান সড়ক ও সবুজ বাগানাঞ্চল
আর কয়েক হাত দূরে ‘চুনারুঘাট’ নামফলক ও যাত্রী ছাউনি, ঝুঁকিতে চন্ডিচড়া চা-বাগানের পর্যটন করিডর
সংগ্রাম দত্ত: সিলেট বিভাগের চা শিল্পসমৃদ্ধ চুনারুঘাটের চন্ডিচড়া চা-বাগান এলাকা এখন বড় ধরনের পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি। রামগঙ্গাছড়ার অব্যাহত ভাঙনে শুধু নদীতীর নয়, হুমকির মুখে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া পর্যটন স্পট, চা-বাগানের বুক চিরে চলে যাওয়া নান্দনিক সড়ক এবং বিস্তীর্ণ সবুজ বাগানাঞ্চল। বর্ষার প্রবল স্রোত ও টানা বৃষ্টিপাতের মধ্যে পরিস্থিতি দিন দিন আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের পাশ ঘেঁষে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চন্ডিচড়া চা-বাগানের ভেতর দিয়ে চলে গেছে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় চা-বাগান সড়ক। সবুজ চা-বাগান, আঁকাবাঁকা পথ এবং পাশে বয়ে চলা রামগঙ্গাছড়ার মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের কারণে এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর এটি দেশের অন্যতম আলোচিত পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হয়। তবে সেই সৌন্দর্য এখন ভাঙনের হুমকিতে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে।
সাম্প্রতিক ভিডিও ও ড্রোনচিত্রে দেখা গেছে, রামগঙ্গাছড়ার ভাঙন ইতোমধ্যে নদীতীরের বড় অংশ গ্রাস করেছে। খাড়া পাড় ধসে পড়ে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে একের পর এক অংশ। ভাঙনের রেখা দ্রুত এগিয়ে এসেছে চা-বাগান সড়কের দিকে। নদীর প্রবল স্রোত প্রতিনিয়ত তীরবর্তী মাটি কেটে নিয়ে যাওয়ায় সড়ক, পর্যটন অবকাঠামো এবং চা-বাগানের জমি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, ভাঙন আর মাত্র প্রায় সাত হাত অগ্রসর হলেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে পর্যটকদের কাছে পরিচিত ‘চুনারুঘাট’ নামফলক এবং এলাকাটির একমাত্র যাত্রী ছাউনি। স্থানটির পরিচিত দৃশ্যপট ও পর্যটন আকর্ষণের অন্যতম প্রতীক হিসেবে বিবেচিত এই স্থাপনাগুলো হারিয়ে গেলে পর্যটন খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ভিডিওচিত্রে আরও দেখা যায়, নদীর পাড়ের বড় বড় অংশ ভেঙে পড়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। ভাঙনস্থল থেকে সড়কের দূরত্বও উদ্বেগজনকভাবে কমে এসেছে। অব্যাহত বৃষ্টিপাতের বর্তমান ধারা চলতে থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে রামগঙ্গাছড়া সেতুর নিচে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ট্রলি ব্যবহার করে প্রকাশ্যে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং প্রাকৃতিক প্রবাহের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। বর্ষার পানির চাপ সেই ক্ষয়কে আরও তীব্র করে তুলছে। ফলে নদীভাঙনের পাশাপাশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে সেতু ও সড়ক অবকাঠামোও।
টানা বৃষ্টিপাতের কারণে সড়কের বিভিন্ন অংশে ধস ও ক্ষয় দেখা দিয়েছে। কোথাও মাটি সরে গিয়ে রাস্তা সরু হয়ে গেছে, কোথাও তৈরি হয়েছে বড় গর্ত। বিশেষ করে রাতের বেলা কিংবা বৃষ্টির সময় এই পথে চলাচল এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নেচারস নোটবুক ফেসবুক একাউন্ট থেকে ভিডিও একটি ভাইরাল হলে ইঞ্জিনিয়ার রিমন সরকার তার মন্তব্যে লিখেন যে,
\"ট্রলি দিয়ে বালু উত্তোলনের দৃশ্য নিজ চোখে দেখেছি। রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ। এই বর্ষা মৌসুমেই সড়কটি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।\"
তিনি দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং স্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মাসাধিককাল ধরে ভাঙন অব্যাহত থাকলেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ এখনো চোখে পড়েনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে ক্ষয়ক্ষতির বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠলেও ভাঙন রোধে জরুরি উদ্যোগের অভাব নিয়ে এলাকাজুড়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ভাঙনের গতি বিবেচনায় দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বর্ষা মৌসুমের মধ্যেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
উল্লেখ্য, গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে দেশের অন্যতম প্রাচীন জাতীয় দৈনিক সংবাদ ও লন্ডন থেকে প্রকাশিত জনমত এ ‘রামগঙ্গাছড়ায় ভাঙছে সড়ক, চন্ডিচড়া চা-বাগানের প্রকৃতি ও অবহেলার দ্বৈরথ’ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে ভাঙনের ঝুঁকি এবং অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি ঘটেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাঙন আরও বিস্তৃত হয়েছে।
চুনারুঘাটের এই পর্যটন করিডর শুধু একটি সড়ক নয়; এটি এলাকার পর্যটন অর্থনীতি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং চা শিল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু অব্যাহত নদীভাঙন, অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অভাবে এখন একই সঙ্গে ঝুঁকিতে পড়েছে রামগঙ্গাছড়ার ভাইরাল পর্যটন স্পট, চন্ডিচড়া চা-বাগানের নান্দনিক সড়ক এবং বিস্তীর্ণ সবুজ চা-বাগান এলাকা।
দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে খুব শিগগিরই চা-বাগানের বুক চিরে চলে যাওয়া এই স্বপ্নের পথ, পর্যটকদের প্রিয় দর্শনীয় স্থান এবং সবুজে মোড়া প্রাকৃতিক পরিবেশের একটি অংশ ইতিহাসের পাতায় স্থান নিতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে চুনারুঘাটজুড়ে।



















