img

জেলা প্রশাসনের নির্দেশে শাহজালাল-শাহপরানের মাজারের দানবাক্সে তালা

প্রকাশিত :  ১৬:৫৭, ১২ জুন ২০২৬

জেলা প্রশাসনের নির্দেশে শাহজালাল-শাহপরানের মাজারের দানবাক্সে তালা

এবার তালা দেওয়া হচ্ছে সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.) দরগাহর দানবাক্সে । মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এ তালা দেওয়া হয়।

শাহজালাল (রহ.) মাজারের মোতোয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান জানান, এক মাসের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষার জন্য ওয়াক্‌ফ এস্টেটকে দানবাক্সে তালা দিতে বলা হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

তিনি বলেন, ‘দরগাহর হিসাবে অস্বচ্ছতার কী আছে আমি বুঝি না। এখানে ফিক্সড ইনকাম নাই। এখানে অনেক মানুষ আসে। যে যাই দিয়ে থাকে অন্যখানেও চলে যাচ্ছে। এজন্য তো আমরা দায়ী নই। এখানে মাদ্রাসা, মসজিদ, দরগাহ তিনটি ভাগে মানুষজন দান খয়রাত করে যাচ্ছে। আমরা জোর করে নিচ্ছি না। মানত করে গবাদিপশুও দিয়ে যাচ্ছে আমরা কিছু বিক্রি করি। কিছু তারা শিরনি করে। আমাদেরকে দান করে। এখানে অস্বচ্ছতার কী আছে?’

মোতোয়াল্লি আরও বলেন, ‘ব্রিটিশ সরকারও চেয়েছিল দরগাহ নিয়ে নিতে। কিন্তু পারে নি। সবই আল্লাহর হুকুম।’

প্রশাসনের এই উদ্যোগে বিস্মিত হয়েছেন মাজার কর্তৃপক্ষ। শাহজালাল (রহ.) মাজারের মোতোয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান বলেন, প্রশাসন কেন হঠাৎ করে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে বিষয়ে তারা স্পষ্ট ধারণা পাননি। সভায় অংশগ্রহণের জন্যও পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি। আমাদের কথাও শোনতে রাজি হননি জেলা প্রশাসক। আমরা এটা কিভাবে পেলাম এটাও শোনতে রাজি নন। আমাদের একটা কোর্টের রায় আছে। একটা মামলাও চলমান আছে। কিন্তু তিনি আমাদেরকে কথা বলারও সুযোগ দেন নি। আমরা অসহায় হয়ে বসে আছি।

তিনি বলেন, ‘আমাদের হিসাবপত্র রয়েছে, তবে সেগুলো উপস্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সুযোগ পাইনি। তাই কিছু বিষয়ে অসঙ্গতি বা অসম্পূর্ণতা থাকতে পারে। তবে আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।’

প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এমনকি বিদেশ থেকেও অসংখ্য মানুষ সিলেটের শাহজালাল (রহ.) দরগাহে আসেন। কেউ প্রার্থনা করতে, কেউ মানত পূরণ করতে এবং কেউবা মানসিক শান্তির আশায় দান করেন অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার, গবাদিপশুসহ নানা মূল্যবান সামগ্রী।

পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশনার পর সিলেট জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় সিটি করপোরেশন, ওয়াক্‌ফ এস্টেট, ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং মাজার ও মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সভায় দরগাহর আয়-ব্যয়ের হিসাব ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ, নিয়মিত অডিট এবং নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় ব্যবস্থাপনার বিষয়েও মতামত দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষের দেওয়া পূর্ববর্তী হিসাবকে আংশিক অস্বচ্ছ হিসেবে উল্লেখ করে আরও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী এক মাস জেলা প্রশাসন ও ওয়াক্‌ফ এস্টেটের সমন্বয়ে দরগাহর আয়-ব্যয়ের হিসাব যৌথভাবে যাচাই করা হবে। এ সময় দানের উৎস, ব্যয়ের খাত এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা শেষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

শ্রীমঙ্গলের সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক গ্রাম নোয়াগাঁও

প্রকাশিত :  ১৪:৫১, ১২ জুলাই ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৪:৫৩, ১২ জুলাই ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম কেন্দ্র শ্রীমঙ্গল। চা-বাগান, পাহাড়ি টিলা ও বনভূমির জন্য পরিচিত এই অঞ্চল এখন অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও পর্যটনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় শ্রীমঙ্গল কৌশলগতভাবেও দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল।

শ্রীমঙ্গল শুধু পর্যটননির্ভর উপজেলা নয়; এটি দেশের অন্যতম চা-শিল্পকেন্দ্র। এখানে প্রায় অর্ধশত চা-শিল্প প্রতিষ্ঠান জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। পাশাপাশি বিভিন্ন হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্র দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে।

উপজেলার বিভিন্ন গ্রামও ধীরে ধীরে শিল্প, বাণিজ্য ও পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। রাধানগর এলাকায় আন্তর্জাতিক মানের হোটেল ও রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। সাতগাঁও থেকে মৌলভীবাজারের জগন্নাথপুর পর্যন্ত আঞ্চলিক মহাসড়কের দুই পাশে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় কর্মসংস্থান ও আঞ্চলিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়েছে।

এই ধারাবাহিকতায় শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের নোয়াগাঁও গ্রামও শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন সম্ভাবনার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।

ঐতিহ্য ও নেতৃত্বের ইতিহাস

নোয়াগাঁও শুধু একটি গ্রাম নয়; রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ইতিহাসেও এর পরিচিতি রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে এলাকাটি রাজনৈতিক সচেতনতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত ছিল।

স্বাধীনতা আন্দোলনে ভূমিকা রাখা যতীন্দ্রমোহন দত্ত চৌধুরী ১৯৪৭ সালের পর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে গ্রামের অবকাঠামোগত উন্নয়নে কাজ করেন। তাঁর ছেলে ধীরেন্দ্র দত্ত চৌধুরী স্বাধীনতার পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আরেক ছেলে সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী ১৯৮৩ সালে শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে রাস্তা, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন।

পরবর্তী সময়েও স্থানীয় নেতৃত্ব অবকাঠামো উন্নয়ন, জনকল্যাণমূলক স্থাপনা নির্মাণ ও সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। এই ধারাবাহিক নেতৃত্ব নোয়াগাঁওয়ের উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করেছে।

শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের প্রসার

বর্তমানে নোয়াগাঁও ধীরে ধীরে একটি আধুনিক অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপ নিচ্ছে। ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের নিকটবর্তী অবস্থান, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ এবং যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধা এ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।

এলাকায় বিভিন্ন শিল্প ও উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে ন্যাজারিন মিশন, হেলদি চয়েজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানি, প্রাণ-আরএফএলের মাছের হ্যাচারি, কারিতাস বাংলাদেশ, বাংলাদেশ বনশিল্প করপোরেশন ও ইস্পাহানি টি কোম্পানি।

এসব প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো নতুন আয়ের সুযোগ পাচ্ছে, যা জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।

ভৌগোলিক সুবিধা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা

নোয়াগাঁওয়ের অন্যতম বড় শক্তি এর ভৌগোলিক অবস্থান। শ্রীমঙ্গল শহর ও ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের কাছাকাছি হওয়ায় পণ্য পরিবহন সহজ ও দ্রুত।

এ ছাড়া সড়ক, রেল ও নৌপথের সঙ্গে সহজ সংযোগ থাকায় এলাকাটি বাণিজ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, আশুগঞ্জ নৌবন্দর এবং সিলেট ও ঢাকার বিমানবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ সুবিধা ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

চা-অঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ায় এখানে চা প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

পর্যটন ও ডিজিটাল সম্ভাবনা

নোয়াগাঁওয়ের আশপাশে রয়েছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, বাইক্কা বিল ও বিভিন্ন চা-বাগান। ফলে পর্যটননির্ভর ব্যবসারও সম্ভাবনা রয়েছে।

স্থানীয় শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ ফ্রিল্যান্সিং, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও কৃষিভিত্তিক প্রযুক্তিনির্ভর কাজে যুক্ত হচ্ছেন। ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ সুবিধা বাড়ায় ই-কমার্স ও ডিজিটাল ব্যবসার সুযোগও তৈরি হয়েছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিত উন্নয়ন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে নোয়াগাঁও পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক গ্রামে পরিণত হতে পারে।

সম্ভাবনাময় খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে পর্যটনভিত্তিক হোটেল ও রিসোর্ট, হস্তশিল্প, চা প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ, ডিজিটাল ব্যবসা এবং রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান।

স্থানীয় উদ্যোক্তারা মনে করছেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, যোগাযোগব্যবস্থা ও শিল্পায়নের সুযোগ মিলিয়ে নোয়াগাঁও ভবিষ্যতে শ্রীমঙ্গলের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর