শ্রীমঙ্গলে সাংবাদিকতার নৈতিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জনপ্রত্যাশা
সংগ্রাম দত্ত: সাংবাদিকতা কেবল তথ্য সংগ্রহ ও সংবাদ পরিবেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি জনস্বার্থ রক্ষা, সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি এবং জনগণের ন্যায্য প্রত্যাশাকে সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সমাজের কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠী যখন নিজেদের কথা বলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় কিংবা কোনো সংকটময় পরিস্থিতিতে অসহায়ত্ব অনুভব করে, তখন সাংবাদিকরা পেশাগত নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার আলোকে সেই বিষয়গুলো জাতির সামনে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে সমস্যা চিহ্নিত করার পাশাপাশি সম্ভাব্য সমাধানের পথ নির্দেশ এবং জনমত গঠনে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করাও সাংবাদিকতার অন্যতম অনুষঙ্গ।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া মাঠে এক জনসভায় ভাষণ দেন। এর সাত বছর পর, ১৯৮৫ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ শ্রীমঙ্গল সফরে এসে ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত জনসভায় শ্রীমঙ্গল কলেজ ও শ্রীমঙ্গল উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়কে জাতীয়করণের ঘোষণা দেন এবং শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মের সামনে একটি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারের ধারাবাহিক উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দেশ সামগ্রিকভাবে অনেক দূর এগিয়েছে।
প্রায় চার দশক পর, গত ১৭ জুন জাতীয় নেতা ও সরকারপ্রধান তারেক রহমান শ্রীমঙ্গলের ঐতিহাসিক ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জনসভায় ভাষণ দেন। এ সফরকে ঘিরে শ্রীমঙ্গলবাসীর প্রত্যাশা ছিল স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। উন্নয়ন, অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট নানা বিষয় নিয়ে মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়।
বর্তমানে শ্রীমঙ্গলে কর্মরত সাংবাদিকদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য এবং সমাজ গঠন, জনমত সৃষ্টি ও গণমানুষের প্রত্যাশাকে সামনে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় সমস্যা, সম্ভাবনা ও দীর্ঘদিনের দাবিদাওয়া সম্পর্কে তারা নিবিড়ভাবে অবগত। সমাজের সচেতন ও পথপ্রদর্শক শ্রেণি হিসেবে সাংবাদিকদের প্রতি মানুষের প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকে।
সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার আলোকে বিবেচনা করলে বলা যায়, সরকারপ্রধানের শ্রীমঙ্গল সফর ছিল জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরার একটি তাৎপর্যপূর্ণ সুযোগ। সম্মিলিতভাবে স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ চাইলে শ্রীমঙ্গলবাসীর পক্ষ থেকে একটি স্মারকলিপির মাধ্যমে এলাকার দীর্ঘদিনের সমস্যা, উন্নয়ন চাহিদা ও জনগণের প্রত্যাশাগুলো সরকারপ্রধানের নজরে আনতে পারতেন। তবে সেই ধরনের কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান না হওয়ায় অনেকের মতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
সমাজের সচেতন পথপ্রদর্শক হিসেবে সাংবাদিকদের যে ভূমিকার কথা প্রায়ই বলা হয়, সেই বিবেচনায় এবার শ্রীমঙ্গলের জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট দাবিগুলো সমন্বিতভাবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে আলোচনা রয়েছে বিভিন্ন মহলে।
অন্যদিকে একজন রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে মৌলভীবাজারের স্থানীয় সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান মৌলভীবাজারে সরকারপ্রধান তারেক রহমানের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত জনসভায় জেলার জনগণের পক্ষ থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দাবি ও উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট বিষয় তুলে ধরেন। তিনি স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো উল্লেখ করে সেগুলোর বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। এতে জনগণের দাবিদাওয়া সরাসরি সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উপস্থাপনের একটি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয় বলে অনেকেই মনে করেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও উন্নয়ন ভাবনাকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়া কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বের নয়, সমাজের সচেতন অংশ হিসেবে সাংবাদিক সমাজেরও একটি নৈতিক দায়িত্ব। কারণ, সাংবাদিকতার প্রকৃত শক্তি কেবল সংবাদ পরিবেশনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং জনগণের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করা, সমস্যার সমাধানের পথ অনুসন্ধান করা এবং রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন গড়ে তোলার মধ্যেই এর মৌলিক তাৎপর্য নিহিত।



















