img

রাধানাথ দেব চৌধুরী: শ্রীমঙ্গলের ইতিহাসে এক নীরব নির্মাতা

প্রকাশিত :  ১৮:৩৯, ০৪ জানুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৮:৪০, ০৪ জানুয়ারী ২০২৬

রাধানাথ দেব চৌধুরী: শ্রীমঙ্গলের ইতিহাসে এক নীরব নির্মাতা

সংগ্রাম দত্ত

শ্রীমঙ্গল—চা-বাগান, পাহাড় আর সবুজ প্রকৃতির শহর। এই শহরের ইতিহাস শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে গঠিত নয়; এর ভিত নির্মিত হয়েছে কিছু দূরদর্শী মানুষের চিন্তা, দান ও শ্রমে। তাঁদেরই একজন ছিলেন জমিদার, শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক রাধানাথ দেব চৌধুরী—যাঁর অবদান আজও শ্রীমঙ্গলের শিক্ষা, নগরায়ণ ও ভূগোলের ইতিহাসে অমলিন।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

রাধানাথ দেব চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন ৩১ আগস্ট ১৮৭৫ সালে। তিনি ছিলেন এক ঐতিহ্যবাহী জমিদার পরিবারের সন্তান। তাঁর পিতা চন্দ্রনাথ দেব চৌধুরী এবং সহধর্মিণী জয়তারা দেব চৌধুরী।

তাঁদের চার পুত্র—রাসবিহারী দেব চৌধুরী, পুলিন বিহারী দেব চৌধুরী, বিনোদ বিহারী দেব চৌধুরী ও সর্বকনিষ্ঠ ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী—পরবর্তীকালে সমাজ, রাজনীতি ও মানবসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

নবীগঞ্জের ভূবীরবাগ থেকে শ্রীমঙ্গল: জমিদারি ও বসতি স্থাপন

তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের হবিগঞ্জ মহকুমার নবীগঞ্জ থানার ভূবীরবাগ এলাকায় রাধানাথ দেব চৌধুরীর ছিল এক বিস্তৃত ও প্রভাবশালী জমিদারি। এই জমিদারি শুধু আর্থিক শক্তির প্রতীকই ছিল না; বরং এলাকার কৃষি, শিক্ষা ও সামাজিক কাঠামোতেও এর গভীর প্রভাব ছিল।

জমিদারি পরিচালনা ও ব্যবসায়িক প্রয়োজনে তিনি পরবর্তীতে শ্রীমঙ্গলের পুরান বাজার এলাকায় এসে স্থায়ী বসতি স্থাপন করেন। এই বসতিই ধীরে ধীরে তাঁর সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এবং শ্রীমঙ্গলের নগর উন্নয়নে নতুন গতি সঞ্চার করে।

ভূমি ক্রয়, নগরায়ণ ও অট্টালিকা নির্মাণ

রাধানাথ দেব চৌধুরী তৎকালীন সময়ে শ্রীমঙ্গল থানাধীন ডলুছড়া পাহাড় এলাকায় প্রায় ১৭৮ বিঘা জমি ক্রয় করেন। একসময়ের নির্জন এই পাহাড়ি অঞ্চল পরবর্তীতে তাঁর নামানুসারে “রাধানগর” হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

শুধু ভূমি ক্রয়েই সীমাবদ্ধ ছিলেন না তিনি। তৎকালীন সময়ে শ্রীমঙ্গল শহরের বিভিন্ন এলাকায় তিনি চুন-সুরকী দিয়ে নির্মিত একাধিক অট্টালিকা ও স্থায়ী ভবন নির্মাণ করেন। এসব ভবন সে সময়ের আধুনিক নির্মাণশৈলীর নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হতো এবং শ্রীমঙ্গলের প্রাথমিক নগর কাঠামো গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

শিক্ষা ও সমাজসেবায় ঐতিহাসিক অবদান

রাধানাথ দেব চৌধুরী বিশ্বাস করতেন—শিক্ষাই সমাজ উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার জন্য নিজস্ব জমি দান করেন।

তিনি পিতা-মাতার নামে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য চন্দ্রনাথ প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দীনময়ী বালিকা বিদ্যালয়।

এছাড়াও শ্রীমঙ্গল শহরের হবিগঞ্জ রোডে তিনি আখড়ার বিগ্রহ মন্দির ও নাটমন্দির নির্মাণ করে দেন, যা তৎকালীন সময়ে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।

শ্রীমঙ্গল টাউন কমিটি ও প্রশাসনিক ভূমিকা

১৯২৩ সালের আসাম মিউনিসিপাল অ্যাক্ট অনুযায়ী ১ অক্টোবর ১৯৩৫ সালে শ্রীমঙ্গল স্মল টাউন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

এই উপলক্ষে রাধানাথ দেব চৌধুরী ইংল্যান্ডের কেন্ট (Kent) শহর থেকে বিশেষভাবে কেক আমদানি করে টাউন কমিটির উদ্বোধনের আয়োজন করেন—যা শ্রীমঙ্গলের পৌর ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী ও স্মরণীয় ঘটনা।

শ্রীমঙ্গল টাউন কমিটির প্রথম পরিষদে (১৯৩৫–১৯৩৭) তিনি সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং শহরের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি সুদৃঢ় করতে কার্যকর ভূমিকা রাখেন।

রাধানগর: ঐতিহ্য থেকে আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র

আজকের রাধানগর পাহাড়ি এলাকায় আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক রিসোর্ট, বিলাসবহুল হোটেল, চা-বাগানঘেরা পর্যটন অবকাঠামো ও বিনোদন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নিয়মিত পদচারণায় রাধানগর এখন শ্রীমঙ্গলের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র।

যে জনপদ একসময় ছিল নিভৃত ও অনুন্নত পাহাড়ি অঞ্চল, সেটিই আজ আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছে—যার সূচনা হয়েছিল রাধানাথ দেব চৌধুরীর দূরদর্শী ভূমি পরিকল্পনার মাধ্যমে।

জমিদারি বিলুপ্তি ও উত্তরাধিকার বণ্টন

১৯৫০ সালে পাকিস্তান সরকার জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত ঘোষণা করলে নবীগঞ্জ থানার ভূবীরবাগ এলাকায় অবস্থিত রাধানাথ দেব চৌধুরীর বিশাল জমিদারি প্রজাস্বত্ব আইনের আওতায় সরকারের অধীনে চলে যায়।

আইনানুযায়ী তিনি পারিবারিক ভোগদখলের জন্য মোট ৫০ হাল জমি সংরক্ষণের অধিকার লাভ করেন।

এই ৫০ হাল জমি তিনি তাঁর চার পুত্রের মধ্যে বণ্টন করে দেন। এর মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্র রাসবিহারী দেব চৌধুরী পান ২৫ হাল জমি, এবং অবশিষ্ট ২৫ হাল জমি বণ্টিত হয় অন্য তিন পুত্রের মধ্যে।

পরবর্তী সময়ে বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে কিছু জমি বিক্রি হয়ে যায়, আবার অনেক অংশ বেদখল হয়ে পড়ে। তবুও এসব জমির ওপর গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক স্থাপনা আজও তাঁর সমাজমুখী চিন্তার সাক্ষ্য বহন করছে।

১৯৮০-এর দশকে তাঁর সর্বকনিষ্ঠ পুত্র ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী, যিনি ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ—এই তিনটি আমল দেখেছেন, তাঁর পিতার নামে শ্রীমঙ্গল শহরতলী এলাকায় বিরামপুরে প্রায় ৩১ শতক জমি দান করেন “রাধানাথ প্রাথমিক বিদ্যালয়” এর জন্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার ধারক বাহকরা বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে “বিরামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়” করেছেন, যা ভূমিদাতার নামকে প্রকারান্তরে অস্বীকার করেছে।

প্রয়াণ ও উত্তরাধিকার

১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৮ সালে, প্রায় ৮৩ বছর বয়সে, জমিদার ও শিক্ষানুরাগী রাধানাথ দেব চৌধুরী ইহলোক ত্যাগ করেন।

তিনি রেখে যান শিক্ষা, সমাজসেবা, নগরায়ণ ও জনপদ গঠনের এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার—যা আজও শ্রীমঙ্গলের ইতিহাস ও পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

শেষ কথা 

রাধানাথ দেব চৌধুরী কেবল একজন জমিদার ছিলেন না; তিনি ছিলেন শ্রীমঙ্গলের ইতিহাসের এক নীরব নির্মাতা।

ভূবীরবাগ থেকে শ্রীমঙ্গল, ডলুছড়া পাহাড় থেকে রাধানগর—প্রতিটি অধ্যায়ে তাঁর দূরদর্শিতা ও দানশীলতা আজও জীবন্ত।

একজন মানুষের চিন্তা ও কর্ম কীভাবে একটি জনপদের শতবর্ষের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে—রাধানাথ দেব চৌধুরী তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।


সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

লাউয়াছড়ায় সড়ক পার হতে গিয়ে গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ গেল বিপন্ন মুখপোড়া হনুমানের

প্রকাশিত :  ১৫:৫৯, ২৫ জুলাই ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে সড়ক পার হওয়ার সময় দ্রুতগতির গাড়ির ধাক্কায় বিপন্ন প্রজাতির একটি মুখপোড়া হনুমান (Capped Leaf Monkey) মারা গেছে। শুক্রবার (২৪ জুলাই) দুপুরের পর কোনো একসময় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভানুগাছ–শ্রীমঙ্গল সড়কের মাগুরছড়া গ্যাসফিল্ড এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিকেল পাঁচটার দিকে বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী কাজল হাজরা মোটরসাইকেলে ওই সড়ক দিয়ে শ্রীমঙ্গলের দিকে যাওয়ার সময় রাস্তার পাশে হনুমানটিকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে তিনি বিষয়টি বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগকে জানান।

সন্ধ্যা সাতটার দিকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের বিট অফিসের বনকর্মীরা ঘটনাস্থল থেকে মৃত হনুমানটি উদ্ধার করেন। পরে সেটি জানকিছড়া বন্যপ্রাণী রেসকিউ সেন্টারের কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মধ্য দিয়ে শ্রীমঙ্গল–কমলগঞ্জ সড়কটি চলে গেছে। ফলে বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া এ সড়কটি বন্যপ্রাণীদের চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার ওপর দিয়ে গেছে। প্রতিবছরই এ সড়কে যানবাহনের নিচে চাপা পড়ে লাউয়াছড়া বনাঞ্চলের বিভিন্ন প্রজাতির পশুপাখি মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যায়।

শুধু সড়কপথ নয়, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে গেছে আখাউড়া–সিলেট রেলপথও। ফলে সড়ক ও রেল—দুই ধরনের যোগাযোগ অবকাঠামোর কারণে বন্যপ্রাণীদের চলাচলের ওপর বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে লাউয়াছড়া ও আশপাশের বনাঞ্চলের বন্যপ্রাণী ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ রেলপথে মাঝেমধ্যে মানুষও ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় বন্যপ্রাণীপ্রেমীদের অভিযোগ, বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া সড়কটিতে অনেক চালক অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালান। ফলে বন্যপ্রাণীরা সড়ক পার হওয়ার সময় প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। তাঁদের মতে, সড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং বন্যপ্রাণী চলাচলের এলাকাগুলোতে কার্যকর নজরদারি না থাকায় এমন ঘটনা বারবার ঘটছে।

লাউয়াছড়া এলাকার বাসিন্দা ও গণমাধ্যমকর্মী সাজু মারচিয়াং মৃত হনুমানটির ছবি ও ঘটনার তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশ করলে বিষয়টি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

মুখপোড়া হনুমান বাংলাদেশের একটি বিপন্ন বন্যপ্রাণী। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) বাংলাদেশের রেড লিস্টে এ প্রজাতিটি অন্তর্ভুক্ত। বনভূমি সংকুচিত হওয়া, আবাসস্থলে মানুষের হস্তক্ষেপ এবং সড়ক দুর্ঘটনাসহ নানা কারণে এ প্রজাতির সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

বন্যপ্রাণীপ্রেমীরা বলছেন, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মধ্য দিয়ে যাওয়া সড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন এবং নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি রেলপথে বন্যপ্রাণীর চলাচল বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তাঁদের মতে, দুর্ঘটনার পর মৃত প্রাণী উদ্ধার করাই যথেষ্ট নয়; লাউয়াছড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাওয়া সড়ক ও রেলপথে বন্যপ্রাণী এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।


সিলেটের খবর এর আরও খবর