বইমেলায় চাকরিপ্রার্থীদের ঢল, 'স্বপ্নের চাকরি' এখন সবার হাতে
প্রকাশিত :
০৪:৫৯, ০২ মার্চ ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক: অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এ এবার এক ভিন্ন দৃশ্য চোখে পড়ছে। সাহিত্যের পাশাপাশি ক্যারিয়ার গঠনের বই ঘিরেও তৈরি হয়েছে আলাদা উচ্ছ্বাস। বিশেষ করে চাকরিপ্রার্থীদের ভিড় দেখা গেছে একটি নির্দিষ্ট স্টলের সামনে। তাদের হাতে একটি বই—\'স্বপ্নের চাকরি\'।
বহুল আলোচিত লেখক রেজুয়ান আহম্মেদের এই বইটি প্রকাশ করেছে অনিন্দ্য প্রকাশ। প্রকাশনীর স্টল নম্বর ৫৬৫ থেকে ৫৬৯—সেখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভিড় লেগেই আছে। অনেক তরুণ-তরুণীকে লাইনে দাঁড়িয়ে বই সংগ্রহ করতে দেখা গেছে। কারও হাতে বিসিএস প্রস্তুতির খাতা, কারও হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ভর্তি পরীক্ষার নোট—সবার সঙ্গী হয়ে উঠেছে \'স্বপ্নের চাকরি\'।
পাঠকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বইটিকে তাঁরা শুধু গাইড হিসেবেই নয়, অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবেও দেখছেন। চাকরির প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজেকে প্রস্তুত করতে আত্মবিশ্বাস, সময় ব্যবস্থাপনা ও মানসিক দৃঢ়তার যে প্রয়োজন, বইটিতে সে বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে তুলে ধরা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অনেকে।
বইটিতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির কৌশল, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় নিজেকে উপস্থাপনের বাস্তব টিপস এবং ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার মানসিক শক্তি নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এ কারণেই এটি তরুণদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একাধিক পাঠক জানিয়েছেন, \"চাকরির প্রস্তুতির বই অনেক আছে, কিন্তু এই বইটি আমাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে সাহায্য করছে।\"
বইমেলায় যেখানে গল্প-উপন্যাস ঘিরে সাধারণত বেশি আলোচনা হয়, সেখানে ক্যারিয়ারভিত্তিক একটি বইয়ের এমন সাড়া সবার নজর কেড়েছে। অনেকের মতে, বর্তমান সময়ে তরুণদের প্রধান চিন্তা কর্মসংস্থান—সেই বাস্তবতাই যেন প্রতিফলিত হচ্ছে এই ভিড়ে।
চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন—এমন পাঠকদের জন্য \'স্বপ্নের চাকরি\' এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। মেলায় ঘুরতে আসা অনেকেই বলছেন, হয়তো এই বই-ই বদলে দিতে পারে তাঁদের ক্যারিয়ারের মোড়।
মানব সভ্যতার দীর্ঘ পথচলায় ব্যক্তিগত ঐশ্বর্যের সংজ্ঞা যুগে যুগে রূপ বদলেছে। কখনো তা ছিল প্রাচীনকালের ভূস্বামীদের সীমাহীন জমিদারি, কখনো মধ্যযুগের রাজাদের রাজকীয় মণি-মাণিক্যখচিত মুকুট, আবার কখনো শিল্পবিপ্লবের যুগে কয়লা, তেল কিংবা রেলওয়ের টাইকুনদের গড়ে তোলা বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য। প্রতিটি যুগই তার নিজস্ব গতিতে পুঁজির সীমানাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। কিন্তু ২০২৬ সালের ১২ জুনের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন সোনালি সকালে ওয়াল স্ট্রিটের নাসড্যাক স্টক এক্সচেঞ্জে যখন ‘এসপিসিএক্স’ (SPCX) টিকারে স্পেসএক্সের লেনদেন শুরু হলো, তখন মানবজাতি এক নজিরবিহীন এবং কল্পনাতীত অর্থনৈতিক রূপান্তরের সাক্ষী হলো। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ার ধূলিময় ও তপ্ত রাস্তা থেকে উঠে আসা এক জেদি, অন্তর্মুখী ও স্বপ্নাতুর বালক সেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার বা লক্ষ কোটিপতি হিসেবে নিজের নাম ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করে নিলেন। ইলন রিভ মাস্কের এই ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার যাত্রাটি কোনো আকস্মিক ম্যাজিক ছিল না; বরং তা ছিল চরম ব্যক্তিগত ঝুঁকি, অবসেসিভ ইঞ্জিনিয়ারিং দর্শন এবং বৈশ্বিক পুঁজির এক অভূতপূর্ব স্থানান্তরের মহাকাব্যিক আখ্যান।
ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে যখনই কোনো অভূতপূর্ব রূপান্তর ঘটে, তার নেপথ্যে থাকে দশকের পর দশক ধরে সঞ্চিত এক অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক জ্বালানি। ইলনের ঝুঁকি নেওয়ার এই অদম্য প্রবণতা এবং প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর মানসিকতা কোনো আকস্মিক অর্জন নয়; এটি তাঁর রক্তে বয়ে চলা এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক উত্তরাধিকার। তাঁর মাতৃকূলের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, সেটি ছিল দুঃসাহসী অভিযাত্রী ও চরমপন্থী জীবনদর্শনে ভরপুর।
ইলন মাস্কের মাতামহ জশুয়া নরম্যান হ্যাল্ডেম্যান ছিলেন কানাডীয় বংশোদ্ভূত এক ভিন্নধর্মী কাইরোপ্র্যাক্টর। তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন মূলত সুইজারল্যান্ডের সিগনাউ নামের এক প্রত্যন্ত গ্রামের মেনোনাইট সম্প্রদায়ভুক্ত, যাঁরা অষ্টাদশ শতাব্দীতে ধর্মীয় নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে আসেন। জশুয়ার মা আলমেদা জেন হ্যাল্ডেম্যান ছিলেন কাইরোপ্র্যাক্টরের পেশায় যুক্ত থাকা কানাডার ইতিহাসের প্রথম নারী, যা নির্দেশ করে যে এই পরিবারের নারীরাও অত্যন্ত স্বাধীনচেতা ও ভিন্নধর্মী ছিলেন। ১৯০২ সালে মিনেসোটার পেকুয়াট লেকসে জন্মগ্রহণকারী জশুয়া মাত্র দুই বছর বয়সে তাঁর বাবাকে হারান। ১৯৩০-এর দশকের সেই ভয়াল অর্থনৈতিক মন্দা বা ‘ডার্টি থার্টিজ’-এর থাবায় যখন তাঁর সাজানো শস্যক্ষেত ধূলিসাৎ হয়ে যায়, তখন জীবনের তাগিদে তিনি কাউবয় এবং রডিও পারফর্মার হিসেবে কঠোর কায়িক শ্রম দিতে বাধ্য হন।
পরবর্তীকালে জশুয়া হ্যাল্ডেম্যান কানাডার বিখ্যাত টেকনোক্রেসি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, সমাজ ও রাষ্ট্র কোনো রাজনীতিবিদের দ্বারা নয়, বরং বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত। তবে তাঁর এই বৈজ্ঞানিক চেতনার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক উগ্র ও কট্টরপন্থী মনস্তত্ত্ব। তিনি তৎকালীন কট্টর বর্ণবাদী, ইহুদিবিরোধী ও গণতন্ত্রবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি প্রচারের জন্য পরিচিত ছিলেন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার আপারথাইড বা বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থাকে চরমভাবে সমর্থন করে বইও লিখেছিলেন। ১৯৪৮ সালে ৪৫ বছর বয়সে পাইলট লাইসেন্স অর্জন করার পর তিনি এবং তাঁর স্ত্রী উইন ফ্লেচার সপরিবারে উড়োজাহাজে করে বিশ্বভ্রমণে বের হন। ১৯৫০ সালে কানাডার তথাকথিত নৈতিক অবক্ষয়ের অজুহাতে তাঁরা নিজেদের প্রিয় বিমানটি কাঠের বাক্সে বন্দি করে সমুদ্রপথে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমান। সেখানে জশুয়ার সবচেয়ে বড় নেশা ছিল কালাহারি মরুভূমির হারিয়ে যাওয়া আদিম শহরের সন্ধান করা, যা মূলত ১৮৮৫ সালে কানাডীয় অভিযাত্রী গুইলারমো ফারিনির কাল্পনিক বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। ১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু করে প্রায় এক দশক ধরে জশুয়া হ্যাল্ডেম্যান তাঁর সন্তানদের—যার মধ্যে ইলনের মা মেয়ি মাস্কও ছিলেন—নিয়ে মরুভূমির মাত্র ২০০ ফুট ওপরে দিয়ে বিমান উড়িয়ে ১২টি বিপজ্জনক অভিযান পরিচালনা করেন। যদিও ১৯৬৪ সালে গবেষক এ. জে. ক্লিমেন্ট প্রমাণ করেন যে, ফারিনির আবিষ্কৃত তথাকথিত হারিয়ে যাওয়া শহরটি আসলে ১৮০ মিলিয়ন বছর পুরোনো ডোলোরাইট পাথরের প্রাকৃতিক স্তর মাত্র। কিন্তু জশুয়া হ্যাল্ডেম্যান আজীবন এই কাল্পনিক তত্ত্বকে সত্য বলে বিশ্বাস করে ১৯৭৪ সালে এক বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। তাঁর এই প্রথাভাঙা বৈপ্লবিক জেদ ও মরুমায়ার পেছনে ছুটে চলার দুঃসাহস ইলনের মনে মহাকাশ ও অজানাকে জয়ের প্রথম বীজ বুনে দিয়েছিল।
অন্যদিকে, ইলনের পৈত্রিক কূল ছিল ইংরেজ ও দক্ষিণ আফ্রিকান বংশোদ্ভূত। তাঁর পিতামহ ওয়াল্টার হেনরি জেমস মাস্ক ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক প্রবীণ সেনাসদস্য, যিনি মিশরে ব্রিটিশ সামরিক গোয়েন্দা ইউনিটের একজন ক্রিপ্টোগ্রাফার বা সংকেত বিশ্লেষক হিসেবে সূক্ষ্ম গাণিতিক ও প্রযুক্তিগত শৃঙ্খলার সাথে কাজ করেছিলেন। ওয়াল্টারের স্ত্রী কোরা অ্যামেলিয়া রবিনসনের আদি বাড়ি ছিল ইংল্যান্ডের লিভারপুলে। তাঁদের সন্তান এরল গ্রাহাম মাস্ক ১৯৪৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে দক্ষিণ আফ্রিকার একজন অত্যন্ত ধনাঢ্য ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, বৈমানিক, নাবিক ও রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার হিসেবে আবির্ভূত হন। এরলের প্রকৌশল ব্যবসাটি প্রিটোরিয়ার বড় বড় অফিস কমপ্লেক্স ও শপিংমল নির্মাণের বিশাল প্রকল্প পরিচালনা করত এবং তিনি জাম্বিয়ার তিনটি ছোট পান্না খনির অংশীদারিত্বের মালিক ছিলেন। এরল ১৯৭০ সালে বিয়ে করেন মেয়ি হ্যাল্ডেম্যানকে, যিনি ছিলেন একাধারে কানাডীয় মডেল ও পুষ্টিবিদ। ১৯৭৯ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদের সময় এরল মাস্ক প্রিটোরিয়ার সবচেয়ে বড় বিলাসবহুল বাড়ি, ইয়ট, ব্যক্তিগত বিমান এবং একাধিক দামি গাড়ির মালিক ছিলেন। পরবর্তীতে ৪৫ বছর বয়সে এরল তাঁর সৎ মেয়ে জানা বেজুইডেনহাউটের সাথে সম্পর্কের মতো এক চরম বিতর্কিত পারিবারিক কেলেঙ্কারির জন্ম দেন। অন্যদিকে, ইলনের মা মেয়ি মাস্ক হ্যাল্ডেম্যান প্রায় ৫০ বছর ধরে ফ্যাশন জগতে নিজের আধিপত্য ধরে রাখেন এবং কভারগার্ল ক্যাম্পেইনের সবচেয়ে বয়স্ক মডেল হিসেবে ইতিহাস গড়েন।
ইলন রিভ মাস্ক ১৯৭১ সালের ২৮ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রশাসনিক রাজধানী প্রিটোরিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তিনি তাঁর ভাই কিম্বাল ও বোন টসকা মাস্কের সাথে অত্যন্ত ধনী ও সুরক্ষিত পরিবেশে বড় হতে থাকেন। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক পটভূমি ছিল চরম অস্থিতিশীল। ১৯৮০-এর দশকে যখন প্রিটোরিয়ার ওয়াটারক্লুফের মতো বিলাসবহুল, বেগুনি জ্যাকারান্ডা ফুলে ঘেরা শহরতলিতে শ্বেতাঙ্গরা নিরাপদ ও ঐশ্বর্যময় জীবন যাপন করছিল, তখনই কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ জনপদগুলো বিপ্লবের আগুনে জ্বলছিল। ইলন মাস্ক এই বিলাসবহুল কিন্তু কৃত্রিমভাবে বিভক্ত সমাজে প্রিটোরিয়া বয়েজ হাই স্কুলের একজন দিবাছাত্র হিসেবে পড়াশোনা শুরু করেন।
এই বাহ্যিক সুরক্ষার পেছনে ইলনের ব্যক্তিগত জীবন ছিল চরম ট্রমা ও নির্যাতনে ভরা। ১৯৭৯ সালে বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের পর নয় বছর বয়সী ইলন তাঁর বাবার সাথে থাকার সিদ্ধান্ত নেন, কারণ এরলের কাছে একটি সম্পূর্ণ এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা সেট ও একটি আদিম কম্পিউটার ছিল। এই সিদ্ধান্তটি ইলনের জীবনের সবচেয়ে বড় মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শৈশবে ইলন ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, অন্তর্মুখী ও বইপোকা। প্রায়শই তিনি নিজের ভাবনার জগতে এতটাই হারিয়ে যেতেন যে, তাঁর শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করার জন্য চিকিৎসকদের মাধ্যমে কানের অস্ত্রোপচারের কথা ভাবতে হয়েছিল।
সহপাঠীদের কাছে তিনি ছিলেন এক সহজ লক্ষ্য। ইলন পরবর্তীতে দক্ষিণ আফ্রিকার সেই চরমপন্থী বন্য স্কুল বা ‘ভেল্ডস্কুল’-এর ভয়াবহ স্মৃতির কথা উল্লেখ করেন, যা ছিল মূলত উইলিয়াম গোল্ডিংয়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘লর্ড অফ দ্য ফ্লাইজ’-এর মতো এক আদিম রূঢ় বাস্তব। মাত্র ১২ বছর বয়সে সেই ক্যাম্পে ইলন ছিলেন অত্যন্ত দুর্বল ও লাজুক, যেখানে তাঁকে নির্মমভাবে মারধর করা হয় এবং রেশনের খাবারের জন্য অন্য ছেলেদের সাথে মারামারি করতে হতো।
পরবর্তীতে ব্রায়ানস্টন হাই স্কুলে পড়ার সময় তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ ট্র্যাজেডিটি ঘটে। এক দুপুরে ইলন ও কিম্বাল স্কুলের কংক্রিটের সিঁড়ির চূড়ায় বসে স্যান্ডউইচ খাচ্ছিলেন। এমন সময় এক সহপাঠী পেছন থেকে এসে আচমকা ইলনের মাথায় লাথি মারে এবং তাঁকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। সিঁড়ির ধারালো ধাপে আঘাত খেতে খেতে ইলন যখন নিচে আছড়ে পড়েন, তখন একদল উগ্র কিশোর তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের দলপতি ইলনের মাথা ধরে সজোরে কংক্রিটের মেঝেতে আছড়াতে থাকে। কিম্বাল মাস্ক পরবর্তীতে স্মৃতিচারণ করে বলেন, যখন মারধর শেষ হলো, তখন ইলনের মুখমণ্ডল রক্ত আর মাংসের এমন এক ফোলা পিণ্ডে পরিণত হয়েছিল যে চোখ দুটো প্রায় দেখা যাচ্ছিল না। জ্ঞানহীন ইলনকে দ্রুত স্যান্ডটনের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে তাঁকে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় চিকিৎসাধীন থাকতে হয়েছিল এবং নাকের ভেতরের টিস্যু মেরামতের জন্য কয়েক দশক ধরে অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছিল।
শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও ভয়াবহ ছিল পারিবারিক মানসিক নির্যাতন। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর এরল মাস্ক তাঁর রক্তাক্ত সন্তানকে সান্ত্বনা দেওয়ার বদলে টানা এক ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখে তীব্র গালিগালাজ ও তিরস্কার করেন। এরলের দাবি ছিল, ইলন নিজেই সেই ছেলেটিকে ‘স্টুপিড’ বলে ডেকেছিলেন, যার বাবা মাত্র কয়েক দিন আগে আত্মহত্যা করেছিলেন। এরল তাঁর ছেলেদের জন্য এক চরম নির্মম ও কঠোর একনায়কতন্ত্র কায়েম করেছিলেন, যা ইলনকে জীবনের প্রতি পদে এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। এই সহিংসতা ও অবহেলা থেকে বাঁচতে ইলন কোডিং ও কল্পবিজ্ঞান বইয়ের জগতে আশ্রয় খোঁজেন। মাত্র ১০ বছর বয়সে কমোডোর ভিআইসি-২০ ম্যানুয়াল দেখে নিজে নিজে কোডিং শিখে ১২ বছর বয়সে তিনি ‘ব্লাস্টার’ (Blastar) নামের একটি স্পেস শুটার ভিডিও গেম তৈরি করেন এবং সেটি একটি প্রযুক্তি ম্যাগাজিনের কাছে ৫০০ ডলারে বিক্রি করেন। পনেরো বছর বয়সে পৌঁছে তিনি বডিবিল্ডিং, কুস্তি ও কারাতে শিখে নিজের শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি করেন এবং অবশেষে ১৬ বছর বয়সে এক সহপাঠী উত্ত্যক্তকারীকে সজোরে নাকে ঘুষি মেরে নিজের ওপর চলা দীর্ঘদিনের বুলিংয়ের অবসান ঘটান।
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদান এড়ানো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগের কাছাকাছি পৌঁছানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে ইলন সতেরো বছর বয়সে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর মা কানাডীয় হওয়ায় তিনি খুব সহজেই কানাডার পাসপোর্ট পেয়ে যান এবং ১৯৮৯ সালের জুন মাসে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা ত্যাগ করেন। কানাডায় পৌঁছে প্রথম বছরগুলোতে তাঁকে চরম আর্থিক অনটনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তিনি খামারে কাজ করা, সবজি কাটা এবং করাতকলে কাঠের গুঁড়ি পরিষ্কারের মতো অত্যন্ত কঠিন কায়িক শ্রম দিয়ে নিজের জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন।
১৯৯০ সালে ইলন মাস্ক কানাডার কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন। সেখানে অধ্যয়নকালেই তাঁর পরিচয় হয় তাঁর প্রথম স্ত্রী জাস্টিন উইলসনের সাথে। কুইন্সে দুই বছর পড়ার পর ইলন পেনসিলভেনিয়া ইউনিভার্সিটিতে স্থানান্তরিত হন। পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৭ সালে তিনি পদার্থবিদ্যায় ব্যাচেলর অব আর্টস (BA) এবং অর্থনীতিতে ব্যাচেলর অব সায়েন্স (BS) ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯৫ সালে ইলন ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে অ্যাপ্লায়েড ফিজিক্স ও মেটেরিয়াল সায়েন্সে ডক্টরেট (PhD) করার জন্য নির্বাচিত হন। কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালিতে পা রাখার সঙ্গেই তিনি বুঝতে পারেন, ইন্টারনেটের প্রথম জোয়ারটি বিশ্বকে যেভাবে পরিবর্তন করতে যাচ্ছে, তা ল্যাবরেটরির যেকোনো গবেষণার চেয়ে অনেক বেশি তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী। মাত্র দুই দিন ক্লাস করার পর তিনি স্ট্যানফোর্ড থেকে ড্রপআউট হন এবং নিজের প্রথম প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। স্ট্যানফোর্ড ছেড়ে দেওয়ার কারণে তাঁর স্টুডেন্ট ভিসাটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, যা তাঁকে ক্যালিফোর্নিয়ায় কাজ করার ক্ষেত্রে এক ধরনের আইনি ধূসর অঞ্চলে ফেলে দেয়।
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে আসার পর ইলন মাস্ক, তাঁর ভাই কিম্বাল মাস্ক ও গ্রেগ কুরি মিলে ১৯৯৫ সালে ‘জিপ২’ (Zip2) নামের কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল মূলত একটি অনলাইন সিটি গাইড, যা সংবাদপত্রগুলোকে ডিজিটাল মানচিত্র সরবরাহ করত। শুরুর দিনগুলোতে তাঁদের আর্থিক অবস্থা এতটাই শোচনীয় ছিল যে, তাঁরা পালো আল্টোতে একটি ছোট অফিস রুম ভাড়া নিয়ে সেখানেই রাতে ঘুমাতেন এবং প্রতি রাতে ইলনকে নিজে কোড লিখতে হতো। কঠোর পরিশ্রমের পর জিপ২ নিউ ইয়র্ক টাইমস ও শিকাগো ট্রিবিউনের মতো বড় বড় সংবাদপত্রের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করতে সক্ষম হয়। ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিখ্যাত কম্পিউটার প্রস্তুতকারক কোম্পানি কমপ্যাক (Compaq) জিপ২-কে ৩০৭ মিলিয়ন ডলার নগদে কিনে নেয়। এই চুক্তি থেকে মাস্ক তাঁর সাত শতাংশ শেয়ারের বিপরীতে ২২ মিলিয়ন ডলার লাভ করেন, যা তাঁকে মাত্র আটাশ বছর বয়সে কোটিপতি বানিয়ে দেয়।
জিপ২ বিক্রির টাকা পকেটে নিয়ে ইলন মাস্ক নিরাপদ জীবনের সন্ধান না করে তাঁর অর্জিত অর্থের সিংহভাগ (১২ মিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগ করে ১৯৯৯ সালের মার্চ মাসে ‘এক্স ডট কম’ (X.com) নামের একটি অনলাইন ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ইমেইল পেমেন্ট কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল আমেরিকার প্রথম ফেডারেল বীমাকৃত অনলাইন ব্যাংকগুলোর একটি। এক্স ডট কমের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বাজারে আবির্ভূত হয় পিটার থিয়েল ও ম্যাক্স লেভচিনের প্রতিষ্ঠিত ‘কনফিনিটি’ (Confinity), যার জনপ্রিয় সার্ভিসটি ছিল পেপ্যাল। দুই কোম্পানির মধ্যে তীব্র পেমেন্ট যুদ্ধ যখন উভয় পক্ষের মূলধন পুড়িয়ে দিচ্ছিল, তখন ২০০০ সালে তারা একত্রিত হয়ে মার্জার (একীভূতকরণ)-এর সিদ্ধান্ত নেয় এবং নতুন কোম্পানির নাম রাখা হয় এক্স ডট কম। ইলন মাস্ক এই মার্জড কোম্পানির সিইও হিসেবে দায়িত্ব নেন। কিন্তু নতুন এই বিশাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মে ইলন মাস্কের মাইক্রোসফটের উইন্ডোজভিত্তিক সফটওয়্যার ব্যবহারের জেদের কারণে কোম্পানির ভেতর তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়, যেখানে কনফিনিটির প্রকৌশলীরা ইউনিক্স বা লিনাক্সভিত্তিক সিস্টেম পছন্দ করতেন।
২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইলন যখন তাঁর স্ত্রী জাস্টিনকে নিয়ে হানিমুনে যাচ্ছিলেন, তখন কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ এক নীরব অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁকে প্রধান নির্বাহীর পদ থেকে সরিয়ে দেয় এবং পিটার থিয়েলকে নতুন সিইও নিয়োগ করে। ২০০১ সালে কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে পেপ্যাল (PayPal) রাখা হয়। সিইও পদ থেকে অপসারিত হয়েও ইলন ছিলেন কোম্পানির সবচেয়ে বড় অংশীদার। ২০০২ সালের শেষ দিকে ইন্টারনেট জায়ান্ট ইবে (eBay) পেপ্যালকে ১.৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের স্টকে কিনে নেয়। এই অধিগ্রহণ থেকে ইলন মাস্ক তাঁর ১১.৭ শতাংশ শেয়ারের বিনিময়ে ১৭৬ মিলিয়ন ডলার পান, যা তাঁকে তাঁর পরবর্তী জীবনের সবচেয়ে বড় বাজিগুলো ধরার প্রয়োজনীয় জ্বালানি এনে দেয়।
পেপ্যাল থেকে প্রাপ্ত বিপুল অর্থ দিয়ে ইলন মাস্ক দুটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ খাতে হাত দেন: মহাকাশ ভ্রমণ ও বৈদ্যুতিক গাড়ি। সাধারণ কোনো বিনিয়োগকারী যেখানে উচ্চপ্রযুক্তি ও মূলধননির্ভর এই খাতগুলোতে পা বাড়াতে ভয় পেতেন, সেখানে মাস্ক তাঁর অর্জিত অর্থের ১০০ মিলিয়ন ডলার নিয়ে স্পেস এক্সপ্লোরেশন টেকনোলজিস বা স্পেসএক্স (SpaceX) প্রতিষ্ঠা করেন ২০০২ সালের মে মাসে। মহাকাশ যাত্রার ব্যয় দশগুণ কমিয়ে মঙ্গলে মানুষের একটি স্বনির্ভর কলোনি স্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে তিনি এই স্বপ্নযাত্রা শুরু করেন। শুরুতে মাস্ক রাশিয়া থেকে পুনর্ব্যবহৃত আইসিবিএম রকেট কিনতে গিয়েছিলেন। কিন্তু রুশদের অপেশাদার আচরণ ও অবজ্ঞার পর তিনি নিজেই কম খরচে রকেট ডিজাইন ও তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। রকেট তৈরিতে তিনি ভার্টিক্যাল ইন্টিগ্রেশন (অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থা), অফ-দ্য-শেল্ফ বাণিজ্যিক যন্ত্রাংশ এবং আধুনিক সফটওয়্যার প্রকৌশল ব্যবহারের মাধ্যমে খরচ নজিরবিহীনভাবে কমিয়ে আনেন।
স্পেসএক্সের তৈরি প্রথম রকেট ফ্যালকন ১-এর উন্নয়ন ব্যয় ছিল প্রায় ৯০ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে ফ্যালকন ১-এর প্রথম তিনটি উৎক্ষেপণই একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ব্যর্থ হয়। প্রতিটি ব্যর্থতা স্পেসএক্সের কোটি কোটি ডলার পুড়িয়ে দিচ্ছিল এবং কোম্পানির কাছে চতুর্থ উৎক্ষেপণ অর্থায়নের মতো প্রায় কোনো মূলধন অবশিষ্ট ছিল না।
একই সাথে ইলন মাস্ক অন্য একটি ফ্রন্টে লড়াই করছিলেন। ২০০৪ সালে মার্টিন এবারহার্ড ও মার্ক টারপেনিংয়ের প্রতিষ্ঠিত ‘টেসলা মোটরস’-এ তিনি ৬.৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে কোম্পানির চেয়ারম্যান ও প্রধান শেয়ারহোল্ডার হন। উদ্দেশ্য ছিল টেসলা রোডস্টার নামের একটি প্রিমিয়াম স্পোর্টস কার-এর মাধ্যমে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে বিপ্লব আনা। কিন্তু ২০০৭ ও ২০০৮ সালের দিকে বিশ্বজুড়ে শুরু হওয়া সাবপ্রাইম মর্টগেজ সংকট ও মহামন্দার কারণে টেসলা চরম তারল্য সংকটে পড়ে। কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবারহার্ডের সাথে চরম বিরোধের পর মাস্ক তাঁকে সরিয়ে দিয়ে ২০০৮ সালের অক্টোবরে নিজে টেসলার সিইও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
২০০৮ সালের ডিসেম্বরের সেই শীতের দিনগুলোতে ইলন মাস্কের জীবন চরম বিভীষিকায় রূপ নেয়। একসঙ্গে তাঁর দুটি স্বপ্নের কোম্পানি—স্পেসএক্স ও টেসলা—দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল। ইলন রাতের পর রাত দুঃস্বপ্ন দেখে চিৎকার করে জেগে উঠতেন এবং তীব্র শারীরিক যন্ত্রণায় ভুগতেন। টেসলার রোডস্টার গাড়ির প্রোটোটাইপগুলো অনবরত ভেঙে পড়ছিল, প্রতি সপ্তাহে জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীরা ইস্তফা দিচ্ছিলেন, এবং ক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা বুকিংয়ের টাকা ফেরতের জন্য অনবরত চাপ দিচ্ছিলেন। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পাওনা ১২০ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ না করলে মামলার হুমকি দিয়ে আসছিল।
এই চরম সংকটময় মুহূর্তে ইলন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তার পরিচয় দেন। পেপ্যাল থেকে প্রাপ্ত তাঁর জীবনের শেষ ব্যক্তিগত সঞ্চয়টুকু তিনি দুই কোম্পানির মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অনেকেই তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যেকোনো একটিকে বাঁচিয়ে অন্যটিকে মরতে দিতে। বোর্ডের অন্যতম পরিচালক স্টিভ জুরভেটসনের ভাষায়, এটি ছিল উদ্যোক্তাসুলভ তীব্র জেদ ও প্রতিশ্রুতির সবচেয়ে অসাধারণ এক দৃষ্টান্ত। ক্রিসমাসের ঠিক আগে তপ্ত বোর্ড মিটিংয়ে ইলন ঘোষণা করেন যে, টেসলাকে বাঁচাতে তিনি তাঁর শেষ ডলারটুকুও বিনিয়োগ করবেন এবং প্রয়োজনে নিজের নিট সম্পদ ঋণাত্মক সীমানায় নিয়ে যাবেন। বিনিয়োগকারীরা তাঁর এই অবিশ্বাস্য আত্মত্যাগ দেখে অনুপ্রাণিত হন এবং নিজেদের শেষ পুঁজিটুকু ইলনের ২০ মিলিয়ন ডলারের সাথে যুক্ত করেন।
২০০৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৬টায়, কোম্পানির বেতন পরিশোধের মাত্র দুই দিন আগে, এই আপৎকালীন অর্থায়ন সফলভাবে সম্পন্ন হয় এবং টেসলা দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যায়। এর ঠিক দুই দিন আগে, ২০০৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর, নাসা স্পেসএক্সকে ১.৬ বিলিয়ন ডলারের একটি কমার্শিয়াল রিসাপ্লাই সার্ভিসেস (CRS) চুক্তি উপহার দেয়, যা কোম্পানিটিকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে নেয়। পরবর্তীতে ২০০৯ সালের মে মাসে বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ডাইমলার ৫০ মিলিয়ন ডলারে টেসলার ১০ শতাংশ শেয়ার কিনে নিলে টেসলার অর্থনৈতিক ভিত মজবুত হয় এবং তারা ৪০ মিলিয়ন ডলারের একটি ব্যাটারি সরবরাহ চুক্তিও সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়।
২০০৮ সালের সেই মহাবিপদ কাটিয়ে ওঠার পর ইলন মাস্কের দূরদর্শিতা ও প্রকৌশল প্রতিভা নতুন গতিতে বিকশিত হতে শুরু করে। ২০১০ সালের জুন মাসে টেসলা নাসড্যাকে আইপিও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাবলিক কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়, যা ছিল ১৯৫৬ সালে ফোর্ড মোটর কোম্পানির পর কোনো মার্কিন গাড়ি প্রস্তুতকারকের প্রথম আইপিও। ২০১০ সালেই টেসলা মার্কিন জ্বালানি বিভাগ থেকে ৪৬৫ মিলিয়ন ডলারের একটি কৌশলগত ঋণ লাভ করে, যা ফ্রেমন্টের প্রাক্তন টয়োটা কারখানা অধিগ্রহণ এবং টেসলা মডেল এস (Model S) সেডানের উন্নয়নে ব্যবহৃত হয়। ২০১২ সালে বাজারে আসা টেসলা মডেল এস দ্রুত বিশ্বব্যাপী বিলাসবহুল গাড়ির বাজারে আলোড়ন সৃষ্টি করে। গাড়ি উৎপাদন ও ব্যাটারির খরচ কমাতে মাস্ক নেভাডা, টেক্সাস, সাংহাই ও বার্লিনে দানবীয় ‘গিগাফ্যাক্টরি’ গড়ে তোলেন। টেসলার শেয়ারের দাম আকাশচুম্বী হতে শুরু করে এবং কোম্পানির মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন ২০২৬ সালের মধ্যে ১.৪৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
স্পেসএক্স তার ফ্যালকন ৯ রকেটের মাধ্যমে উপগ্রহ উৎক্ষেপণের বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে। রকেটের প্রথম স্টেজ (বুস্টার) সফলভাবে ড্রোন শিপে নামিয়ে এনে বারবার ব্যবহার করার প্রযুক্তি স্পেসএক্সের উৎক্ষেপণ ব্যয় নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেয়। কিন্তু মাস্কের লক্ষ্য কেবল রকেট পাঠানো ছিল না। ২০১৫ সালে তিনি শুরু করেন স্টারলিংক (Starlink) প্রজেক্ট, যার উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে হাজার হাজার ক্ষুদ্র স্যাটেলাইটের জাল বিছিয়ে পুরো বিশ্বে উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া। ২০২৫ সালের মধ্যে স্টারলিংক স্পেসএক্সের মোট রাজস্বের ৬১ শতাংশের বেশি (১১.৪ বিলিয়ন ডলার) আয় করতে শুরু করে, যা স্পেসএক্সকে একটি অতি-লাভজনক মহাকাশ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে। তবে এই মহাকাশ সাম্রাজ্যের বাইরেও স্পেসএক্সের অভ্যন্তরীণ আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত জটিল; ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে তারা ৪.২৮ বিলিয়ন ডলারের নেট লোকসান ও ৪১.৩ বিলিয়ন ডলারের জমা হওয়া ঘাটতি প্রদর্শন করে, যার মূল কারণ ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রকেট উন্নয়নের পেছনে বিশাল খরচ।
২০১৬ সালে মাস্ক মানব মস্তিষ্কের সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরাসরি সংযোগ স্থাপনের উদ্দেশ্যে ‘নিউরালিংক’ (Neuralink) প্রতিষ্ঠা করেন। নিউরালিংক মূলত একটি সূক্ষ্ম ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস (BCI) তৈরি করে, যা পক্ষাঘাতগ্রস্ত বা গুরুতর স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিন্তাশক্তির মাধ্যমে কম্পিউটার বা রোবোটিক অঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে নিউরালিংক তার প্রথম মানুষের মস্তিষ্কে সফলভাবে চিপ ইমপ্লান্ট করে। ২০২৫ সালের মধ্যে কোম্পানিটি তার অস্ত্রোপচার পদ্ধতিকে অত্যন্ত উন্নত ও দ্রুততর করতে সক্ষম হয়; সেখানে একটি উন্নত রোবটের মাধ্যমে মাত্র দেড় সেকেন্ডে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ইলেকট্রোড থ্রেড মস্তিষ্কে স্থাপন করা সম্ভব হয়। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ নিউরালিংক বিশ্বজুড়ে ২১ জন রোগীকে এই ইমপ্লান্ট সরবরাহ করে তাদের জীবনের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয় এবং এই প্রযুক্তির বাজার সম্ভাবনা কোম্পানিটির মূল্যায়নকে ৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করে। ২০২৬ সালে নিউরালিংক তাদের উৎপাদন বাড়ানোর এবং সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রোপচার ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
একইসঙ্গে মাস্ক ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ তৈরির মাধ্যমে শহরের যানজট দূর করার জন্য ‘দ্য বোরিং কোম্পানি’ (The Boring Company) প্রতিষ্ঠা করেন। লাস ভেগাসের কনভেনশন সেন্টারের নিচে তৈরি ১.৭ মাইলের ‘ভেগাস লুপ’ (Vegas Loop) ছিল এর প্রথম বাস্তব প্রয়োগ। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে কোম্পানিটি ২.২৮ মাইলের একটি দীর্ঘতম একক টানেল খনন সম্পন্ন করে, যা লাস ভেগাসের বিভিন্ন রিসোর্টকে বিমানবন্দরের সাথে যুক্ত করার পথ উন্মোচন করে। তবে এই কাজের মাঝেই বোরিং কোম্পানিকে লাস ভেগাসের ড্রেনেজ সিস্টেমে ড্রিলিং ফ্লুইড (কাদা) ফেলার অপরাধে প্রায় ৫০০,০০০ ডলার জরিমানা করা হয়।
২০২২ সালে ইলন মাস্কের জীবনের অন্যতম বিতর্কিত ও আলোচিত অধ্যায়ের সূচনা হয়, যখন তিনি বিশ্বখ্যাত সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম টুইটার (Twitter) ৪৪ বিলিয়ন ডলারে কিনে নেন। বাকস্বাধীনতার চরম বিকাশ ঘটানো এবং টুইটারকে একটি ‘এভরিথিং অ্যাপ’-এ রূপান্তর করার পরিকল্পনা নিয়ে তিনি এই অধিগ্রহণ করেন। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে তিনি টুইটারকে ‘এক্স কর্পোরেশন’ (X Corp) হিসেবে পুনঃব্র্যান্ডিং করেন এবং এর ঐতিহ্যবাহী নীল পাখির লোগো সরিয়ে একটি ন্যূনতম ‘X’ প্রতীক ব্যবহার শুরু করেন।
এই অধিগ্রহণের পর এক্স কর্পোরেশনে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই ও নীতিগত পরিবর্তন নিয়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। তবে ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্টরা লক্ষ্য করেন যে, মাস্কের এই পরিকল্পনার মূল ভিত্তি কেবল একটি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করা ছিল না, বরং এক্স-এর বিপুল পরিমাণ রিয়েল-টাইম ডেটা ব্যবহার করে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এই উদ্দেশ্য নিয়েই ২০২৩ সালে তিনি ‘এক্সএআই’ (xAI) নামের একটি এআই স্টার্টআপ শুরু করেন। ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ xAI বাইরের বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১৩৪.৭ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে, যেখানে স্পেসএক্স নিজেই ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে xAI ৩৩ বিলিয়ন ডলারের স্টক লেনদেনের মাধ্যমে এক্স কর্পোরেশনকে নিজের অধীনে নিয়ে আসে, যা ঋণের হিসাবসহ কোম্পানিটির মূল্য নির্ধারণ করে ৪৫ বিলিয়ন ডলার। এই ক্রয়ের ফলে একটি নতুন হোল্ডিং কোম্পানি ‘এক্সএআই হোল্ডকো’ (xAI Holdco) গঠিত হয়।
xAI অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ‘গ্রোক’ (Grok) নামের একটি কৌতুকপূর্ণ ও বাস্তববাদী চ্যাটবট তৈরি করে, যা এক্স প্ল্যাটফর্মের সব রিয়েল-টাইম তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সাড়া দিতে পারে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে xAI-এর ডেটা প্রসেসিং ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য মাস্ক মেমফিসে ‘কোলোসাস’ (Colossus) নামের বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও দ্রুততম সুপার কম্পিউটার ডেটা সেন্টার গড়ে তোলেন, যা ২ লাখ ২০ হাজার এনভিডিয়া জিপিইউ (Nvidia GPU) দ্বারা চালিত। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে xAI বিখ্যাত এআই ল্যাব অ্যানথ্রোপিকের (Anthropic) সাথে প্রতি মাসে ১.২৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি ঐতিহাসিক ক্লাউড কম্পিউটিং চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা xAI-কে এআই শিল্পের অন্যতম শক্তিশালী ও অর্থনৈতিকভাবে সুরক্ষিত খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে xAI সফটওয়্যার কোম্পানি অ্যানিস্ফিয়ারের (Anysphere) সাথে ৬০ বিলিয়ন ডলারে অধিগ্রহণের একটি কৌশলগত চুক্তি সম্পন্ন করে।
২০২৪ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইলন মাস্ক ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রার্থীতার পক্ষে সরাসরি মাঠে নামেন। তিনি ট্রাম্পের প্রচারণায় প্রায় ২৯০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দেন এবং সুইং স্টেটগুলোতে ব্যাপক নির্বাচনী প্রচারণা চালান। ট্রাম্পের বিজয়ের পর ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষমতা গ্রহণের সাথে সাথেই প্রেসিডেন্ট একটি নতুন নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি’ (Doge) বা ডোজ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এই নতুন বিভাগের প্রধান কাজ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর আধুনিকায়ন, ফেডারেল খরচে ট্রিলিয়ন ডলার কাটছাঁট এবং প্রযুক্তির প্রয়োগ বৃদ্ধি করা। এর মূল নির্বাহী কাঠামোটি তৈরি করা হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিজিটাল সার্ভিসকে (USDS) বিলুপ্ত করে সেটিকে ‘ইউ.এস. ডোজ সার্ভিস’ নামের একটি সাময়িক সংস্থা হিসেবে রূপান্তরের মাধ্যমে, যার মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৬ সালের ৪ জুলাই পর্যন্ত।
ডোজের অধীনে মাস্কের নির্দেশে মার্কিন সরকারের আইটি পরিকাঠামোতে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন শুরু হয়। তবে এই বিভাগের কার্যক্রম সরকারি ও প্রশাসনিক মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। ২০২৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে ম্যাসাকার’ নামে এক নির্মম আদেশের মাধ্যমে ওপিএম (OPM) সব ফেডারেল এজেন্সির প্রবেশনারি (পরীক্ষাধীন) কর্মকর্তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করার নির্দেশ দেয়। ডোজের কর্মীরা অননুমোদিতভাবে আইআরএস (IRS)-এর অত্যন্ত গোপনীয় ট্যাক্সপেয়ার সিস্টেম এবং হাউজিং ডিপার্টমেন্টের (HUD) গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার নারীদের ব্যক্তিগত ডেটাবেজে অ্যাক্সেস করার চেষ্টা করে চরম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগের সম্মুখীন হন। তারা আইআরএস-এর প্রায় ৬,৭০০ কর্মী ছাঁটাই করে এবং ফেডারেল ফান্ডের হাজার হাজার চুক্তি ও অনুদান বাতিল করে।
ডোজের এই কঠোর পদক্ষেপের কারণে প্রায় ১৪টি মার্কিন অঙ্গরাজ্য মাস্ক ও তাঁর দলের বিরুদ্ধে সরকারের তথ্য ব্যবস্থা জোরপূর্বক দখল ও ক্ষমতা পৃথকীকরণ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা দায়ের করে। হোয়াইট হাউস অবশ্য আদালতে দাবি করে যে, ইলন মাস্ক ডোজের কোনো আনুষ্ঠানিক বেতনভুক্ত কর্মচারী বা প্রধান নন; বরং তিনি একজন ‘স্পেশাল গভর্নমেন্ট এমপ্লয়ি’ (SGE) বা বিশেষ সরকারি উপদেষ্টা হিসেবে অনূর্ধ্ব ১৩০ দিন কাজ করছেন। তবে ট্রাম্পের পাবলিক ঘোষণা ও একজন ফেডারেল বিচারকের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, মাস্কই ছিলেন ডোজের মূল চালিকাশক্তি।
ডোজের কাজের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে যখন মাস্ক ও সিনেটর র্যান্ড পল ফোর্ট নক্সের (Fort Knox) সুরক্ষিত মার্কিন স্বর্ণ রিজার্ভ অডিট করার ঘোষণা দেন। ফোর্ট নক্সের স্বর্ণ আসলেই সেখানে আছে কিনা—সে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘদিনের ষড়যন্ত্র তত্ত্বের উল্লেখ করে মাস্ক এক্স-এ লেখেন, ‘সেখানে স্বর্ণ থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে’ এবং ফোর্ট নক্সের ভেতর একটি লাইভ ভিডিও ওয়াকথ্রু ও সার্বক্ষণিক লাইভস্ট্রিম করার দাবি জানান। তৎকালীন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট অবশ্য নিশ্চিত করেন যে স্বর্ণ সেখানেই সুরক্ষিত আছে, যার বাজার মূল্য প্রায় ৪৫৯.২ বিলিয়ন ডলার।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্প ও মাস্কের মধ্যে সম্পর্কের তীব্র টানাপড়েন শুরু হয়। ট্রাম্পের বিতর্কিত ও বিশাল বাজেটসংবলিত ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’-এর তীব্র সমালোচনা করে মাস্ক এক্স-এ একাধিক পোস্ট দেন। তিনি এই বিলটিকে দেশের ঋণ বাড়ানোর জন্য একটি ‘নিন্দনীয় জঘন্য অপরাধ’ বলে আখ্যায়িত করেন এবং এটি বাতিলের দাবি জানান।
এই সমালোচনার জবাবে ট্রাম্প অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং জনসম্মুখে মাস্কের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রাথমিক কর্মসংস্থানের আইনি বৈধতা ও তাঁর কানাডীয় নাগরিকত্বের ইতিহাস টেনে এনে তাঁকে দেশ থেকে বহিষ্কার বা ডিপোর্ট করার হুমকি দেন। এমনকি ট্রাম্প আরও ঘোষণা করেন যে, তিনি মাস্কের পেন্টাগনের সাথে থাকা ২০ বিলিয়ন ডলারের মহাকাশ ও সামরিক চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন করবেন এবং ডোজকে মাস্কের নিজের কোম্পানির বিরুদ্ধেই লেলিয়ে দেবেন। এই তীব্র বিরোধের পর ২০২৫ সালের মে মাসে ইলন মাস্ক হোয়াইট হাউসের সিনিয়র উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পর্কের অবসান ঘটে। তবে এই সাময়িক রাজনৈতিক ধাক্কা মাস্কের অর্থনৈতিক ক্ষমতার ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি; বরং এটি তাঁকে তাঁর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য একীভূত করার কাজে আরও বেশি মনোযোগ দিতে প্ররোচিত করে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হওয়ার পর ইলন মাস্ক তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের কাজটি শুরু করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, মহাকাশ উৎক্ষেপণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো ভৌত পরিকাঠামোর সাথে যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জ্ঞানীয় শক্তির সংযোগ ঘটানো না যায়, তবে ভবিষ্যতের এআই কম্পিউটিং চাহিদার সমাধান করা অসম্ভব। ২০২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি স্পেসএক্স এক অভূতপূর্ব অল-স্টক ট্রানজ্যাকশনের মাধ্যমে ইলন মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান xAI-কে নিজের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন সহযোগী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করে। এই ঐতিহাসিক একীভূতকরণের সময় স্পেসএক্সের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১ ট্রিলিয়ন ডলার এবং xAI-এর মূল্য ধরা হয় ২৫০ বিলিয়ন ডলার, যার ফলে যৌথ সত্ত্বাটির মোট বাজার মূল্য দাঁড়ায় ১.২৫ ট্রিলিয়ন ডলার। এই চুক্তির মাধ্যমে মহাকাশ উৎক্ষেপণ (SpaceX), স্যাটেলাইট ইন্টারনেট (Starlink) ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (xAI) একই কর্পোরেট ছাতার নিচে চলে আসে।
২০২৬ সালের মে মাসে স্পেসএক্স মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে তাদের পাবলিক লিস্টিংয়ের জন্য সংশোধিত এস-১ (S-1) প্রসপেক্টাস জমা দেয়। তারা প্রতি শেয়ার ১৩৫ ডলার মূল্যে মোট ৭৫ বিলিয়ন ডলারের পুঁজি সংগ্রহের লক্ষ্যে ৫৫৫.৬ মিলিয়ন ক্লাস এ শেয়ার বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এটি ছিল মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আইপিও উদ্যোগ, যা ২০১৯ সালে সৌদি আরামকোর গড়া রেকর্ডকে অনেক পেছনে ফেলে দেয়।
২০২৬ সালের ১২ জুন, শুক্রবার দুপুর ১২টায় নাসড্যাকে ‘এসপিসিএক্স’ (SPCX) টিকারে যখন স্পেসএক্সের লেনদেন শুরু হয়, তখন ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অভূতপূর্ব উন্মাদনা তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও খুচরা বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে মোট ২৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের ক্রয়াদেশ জমা পড়ে, যা ছিল বরাদ্দকৃত শেয়ারের প্রায় সাড়ে তিন গুণ। লেনদেন শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে শেয়ারের মূল্য ১৩৫ ডলার থেকে লাফিয়ে ১৬৮.৯০ ডলারে উঠে যায়, যা প্রায় ২৫ শতাংশের এক চোখ ধাঁধানো উত্থান। এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে স্পেসএক্সের মোট বাজার মূল্য ২.১২ ট্রিলিয়ন ডলারে স্পর্শ করে, যা কোম্পানিটিকে অ্যাপল, মাইক্রোসফট ও এনভিডিয়ার মতো অতি-এক্সক্লুসিভ মেগা-ক্যাপ ক্লাবে নিয়ে যায়।
এই ঐতিহাসিক লেনদেন প্রক্রিয়ায় প্রধান বুক রানার গোল্ডম্যান স্যাক্স ও মরগান স্ট্যানলি প্রত্যেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার ফি সংগ্রহ করে এবং ব্যাংক অব আমেরিকা, জেপি মরগান ও সিটিগ্রুপ প্রত্যেকে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ডলার করে আয় করে মোট ৫০০ মিলিয়ন ডলারের একটি ঐতিহাসিক ফি পুল তৈরি করে। স্পেসএক্সের অন্যতম প্রধান প্রারম্ভিক বিনিয়োগকারী আন্তোনিও গ্রাসিয়াস ও তাঁর কোম্পানি ভ্যালোর ইকুইটি পার্টনার্স এই লেনদেনের পর প্রায় ৮১ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ক্লাস এ শেয়ারের মালিক হয়ে রাতারাতি বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হন। একইসাথে জানা যায় যে, স্পেসএক্স তাদের ব্যালেন্স শিটে ১৮,৭১২টি বিটকয়েন (Bitcoin) ধারণ করছে, যার মূল্য প্রায় ১.২৯ বিলিয়ন ডলার।
আইপিও প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, স্পেসএক্সে মাস্কের মালিকানায় ছিল ৮৪৯,৪৯৪,৪৪০টি ক্লাস এ কমন শেয়ার ও ৫,৫৬৯,০৫৩,০৭৫টি ক্লাস বি কমন শেয়ার, যা তাঁকে কোম্পানিটির ৮২ শতাংশের বেশি ভোটিং পাওয়ার এবং প্রায় ৪২ শতাংশ ইকুইটি শেয়ারের মালিকানা দেয়। নাসড্যাকের প্রথম ট্রেডিং ডে শেষে শেয়ারের মূল্য যখন ১৬৮.৯০ ডলারে পৌঁছায়, তখন স্পেসএক্সে মাস্কের এই কাগুজে শেয়ারের মূল্য এক লাফে ৮৬৬.৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। একইসঙ্গে টেসলায় মাস্কের থাকা ১৩ শতাংশ সাধারণ শেয়ারের মূল্য (যা টেসলার ১.৪৭ ট্রিলিয়ন ডলার মার্কেট ক্যাপের ভিত্তিতে প্রায় ৩৫৫ বিলিয়ন ডলার) এবং তাঁর কাছে থাকা বিপুল পরিমাণ অব্যবহৃত অপশন যুক্ত করলে তাঁর মোট নিট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ১.২২ ট্রিলিয়ন ডলার। ফোর্বস ও ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ার ইনডেক্স উভয় স্কোরকার্ডেই ইলন মাস্কের সম্পদ ট্রিলিয়ন ডলারের জাদুকরী ল্যান্ডমার্কটি অত্যন্ত আরামদায়কভাবে পার করে যায় এবং তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আধুনিক পৃথিবীর প্রথম স্বঘোষিত ট্রিলিয়নিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হন।
ইলন মাস্কের এই সামগ্রিক সম্পদের হিসাব কষলে দেখা যায় যে তাঁর মূল কাগুজে শেয়ারের ৮৬৬.৫ বিলিয়ন ডলার মূলত স্পেসএক্স থেকেই এসেছে, যেখানে তিনি ৮২ শতাংশ ভোটিং ক্ষমতার অধিকারী। পাশাপাশি তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অংশীদার আন্তোনিও গ্রাসিয়াস ও তাঁর ভ্যালোর ইকুইটি ৮১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ক্লাস এ শেয়ার ধারণ করছেন। এছাড়াও স্পেসএক্সের নিজস্ব ব্যালেন্স শিটে রয়েছে প্রায় ১.২৯ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ১৮,৭১২টি বিটকয়েন। আইপিওর সামগ্রিক সমন্বয় ঘটাতে গোল্ডম্যান স্যাক্স ও মরগান স্ট্যানলির মতো জায়ান্টরা ব্যাংক অব আমেরিকা ও অন্যান্যদের সাথে মিলে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের এক বিপুল ফি পুল গঠন করতে সক্ষম হয়।
ব্যবসায়িক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে ইলন মাস্কের এই মহাবিজয় যখন পুরো বিশ্বকে চমকে দিচ্ছিল, তখন তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল চরম বিভ্রান্তিকর ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতায় ভরা। মাস্কের জীবনে কাজের প্রতি এক ধরনের বন্য আসক্তি রয়েছে, যা তাঁকে সপ্তাহে ১০০ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে বাধ্য করে এবং তিনি তাঁর পারিপার্শ্বিক মানুষের কাছ থেকেও একই ধরনের তীব্র কর্মোৎসর্গ প্রত্যাশা করেন। তাঁর মতে, যদি খাবার না খেয়েও বেঁচে থাকা যেত এবং সেই সময়টুকু কাজে লাগানো যেত, তবে তিনি খাওয়া বন্ধ করে দিতেন। এই তীব্র মানসিক চাপের প্রভাব তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোর ওপর মারাত্মকভাবে পড়েছে।
ইলন মাস্কের জীবনে জাস্টিন উইলসন ও ব্রিটিশ অভিনেত্রী তালুলাহ রাইলির সাথে তিনটি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে। তিনি এখন পর্যন্ত চারজন ভিন্ন নারীর গর্ভে অন্তত চৌদ্দটি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। জাস্টিনের গর্ভে জন্ম নেওয়া প্রথম সন্তান নেভাডা আলেকজান্ডারের শৈশবেই মৃত্যু হয়। জাস্টিনের সাথে তাঁর বাকি সন্তানেরা হলেন যমজ গ্রিফিন ও ভিভিয়ান এবং ট্রিপলেট কাই, স্যাক্সন ও ড্যামিয়ান। এদের মধ্যে ভিভিয়ান ২০২২ সালে আঠারো বছর বয়সে নিজের লিঙ্গ রূপান্তর করে নিজের নাম পরিবর্তন করেন এবং তাঁর বাবার সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে মায়ের শেষ নাম গ্রহণ করেন, যা ইলনকে গভীরভাবে মর্মাহত করে।
পরবর্তীতে কানাডীয় সঙ্গীতশিল্পী গ্রাইমসের (Grimes) সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে মাস্ক আরও তিনটি সন্তানের জন্ম দেন, যাদের নাম রাখা হয় এক্স অ্যাশ এ-টুয়েলভ (X Æ A-Xii), এক্সা ডার্ক সিডারিল (Exa Dark Sideræl) এবং টেকনো মেকানিকাস (Techno Mechanicus / Tau)। একই সময়ে নিউরালিংকের অপারেশন ডিরেক্টর শিবন জিলিসের (Shivon Zilis) সাথে তাঁর এক ধরনের গোপন কর্মক্ষেত্রীয় প্রণয় গড়ে ওঠে, যার ফলে তাঁদের কোল আলো করে আসে যমজ সন্তান অ্যাজিউর ও স্ট্রাইডার এবং পরবর্তীতে কন্যা আর্কাডিয়া ও পুত্র সেলডন লাইকার্গাস। এছাড়া লেখিকা অ্যাশলে সেন্ট ক্লেয়ারের গর্ভে জন্ম নেওয়া পুত্র রমুলাসের পিতৃত্ব পরীক্ষার রিপোর্টও মাস্কের দিকেই নির্দেশ করে, যা তাঁর পারিবারিক জীবনকে এক জটিল গোলকধাঁধায় পরিণত করেছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ইলন মাস্কের এই চরম অনিরাপদ ও বহুসম্পর্কপ্রবণ পারিবারিক জীবনের মূল কারণ তাঁর শৈশবের সেই ট্রমা। দক্ষিণ আফ্রিকার স্কুলের ভয়াবহ নির্যাতন ও তাঁর বাবার মনস্তাত্ত্বিক নিষ্ঠুরতা তাঁকে এমন এক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে, যিনি কখনোই একটি সাধারণ শান্ত জীবন যাপন করতে পারেন না। প্রিটোরিয়ার সেই বুনো বুশ ক্যাম্পের বর্বরোচিত লড়াই এবং ব্রায়ানস্টন হাই স্কুলের কংক্রিটের সিঁড়িতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়ার ক্ষতগুলো তাঁর মনের গভীরে এমন এক চিরস্থায়ী যুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যেখানে নিজেকে অনবরত জয়ী হিসেবে প্রমাণ না করলে অস্তিত্বের বিনাশ ঘটে। তিনি প্রতিনিয়ত এক ধরনের অস্তিত্ব সংকটে ভোগেন, যার কারণে তিনি সবসময় নিজেকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেন। তাঁর এই মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতাই একদিকে তাঁকে স্পেসএক্স ও টেসলার মতো প্রায় দেউলিয়া কোম্পানিগুলোকে রক্ষা করতে সাহায্য করেছে, আবার অন্যদিকে তা তাঁকে একাকী ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক চিরস্থায়ী যাযাবর বানিয়ে রেখেছে।
মহাকাশভিত্তিক ক্লাউড ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্নায়বিক প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব সমন্বয় মানব সভ্যতাকে এমন এক ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে হয়তো রাষ্ট্রীয় সীমানার চেয়ে এক ব্যক্তির বা তাঁর প্রতিষ্ঠিত কর্পোরেট সাম্রাজ্যের ক্ষমতা অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে। ইলন মাস্কের এই ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার দীর্ঘ ও জটিল মহাকাব্যিক যাত্রাটি মূলত আমাদের এই বার্তাই দেয় যে, মানব মন যদি যথেষ্ট জেদ, বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও অবিচল আত্মবিশ্বাসের ডানা মেলাতে পারে, তবে মহাবিশ্বের দূরতম সীমানাও একদিন হাতের মুঠোয় চলে আসে। এই নব্য-সার্বভৌমত্বের যুগে দাঁড়িয়ে ইলন মাস্ক কেবল পৃথিবীর প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার নন, বরং তিনি মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল, ব্যাপক বিতর্কিত এবং প্রভাবশালী মহাজাগতিক রূপকার।