img

ইউনেস্কো উদ্যোগে শ্রীমঙ্গলে জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ

প্রকাশিত :  ১৫:১৪, ২৩ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৫:১৭, ২৩ মে ২০২৬

 ইউনেস্কো উদ্যোগে শ্রীমঙ্গলে জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ

ইউনেস্কো, আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (CRIHAP) ও অনুবাদের সহযোগিতায় শ্রীমঙ্গলে পাঁচ দিনের কর্মশালার আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে।

১৭–২১ মে পর্যন্ত ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় সিলেট বিভাগের তিনটি সম্প্রদায় — বিষ্ণুপ্রিয়া, মেইতেই এবং চা-জনগোষ্ঠী — থেকে ১৫ জন আদিবাসী তরুণ অংশগ্রহণ করেন।

কর্মশালার মাধ্যমে তারা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কমিউনিটি-ভিত্তিক তালিকাকরণে ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করেন। এর মধ্যে রয়েছে মৌখিক ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক চর্চা, ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প এবং আদিবাসী জ্ঞানব্যবস্থার নথিভুক্তকরণ।

কর্মশালাটি পরিচালনা করেন ইউনেস্কো স্বীকৃত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিশেষজ্ঞ ড. আলেকজান্দ্রা ডেনেস।

কর্মশালার উদ্বোধনীতে ইউনেস্কোর বাংলাদেশ অফিস প্রধান ও প্রতিনিধি ড. সুসান ভাইস বলেন, “তরুণরা শুধুমাত্র ভবিষ্যতের ঐতিহ্যের রক্ষকের ভূমিকা পালন করবে এমন নয়, বরং বর্তমানেও তারা সক্রিয় সংস্কৃতির অংশীদার। এই কর্মশালার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা কমিউনিটি ভিত্তিক তালিকাকরণে ব্যবহারযোগ্য দক্ষতা অর্জন করবে, যা সাক্ষাৎকার গ্রহণ, অডিওভিজুয়াল ডকুমেন্টেশন, নৈতিক গবেষণা পদ্ধতি এবং সঠিক অনুমোদন প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত। এই পুরো প্রক্রিয়ার সময় কমিউনিটির ভূমিকা সর্বদাই কেন্দ্রীয় হওয়া উচিত।”

তিনি আরও বলেন: “সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে তরুণরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কমিউনিটি-ভিত্তিক তালিকাকরণ ও নথিভুক্তকরণে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই কর্মশালা আদিবাসী তরুণদের নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সক্রিয় রক্ষক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।”

কমলগঞ্জের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণকারী তৃষা সিনহা বলেন: “নিজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে কাজ শুরু করার পর এই কর্মশালাটি আমার জন্য অনেক অর্থবহ হয়ে উঠেছে। ছোটবেলায় শুধু বইয়ে ইউনেস্কো সম্পর্কে পড়েছি, কিন্তু এই প্রথমবার তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ কার্যক্রমকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেলাম। গত কয়েক দিনে আমি অনেক নতুন বিষয় শিখেছি, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নতুন বন্ধু পেয়েছি এবং আমাদের ঐতিহ্য সংরক্ষণের গুরুত্ব আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি।”

শমসেরনগর, কমলগঞ্জের চা-জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকারী জিয়ানা মাদ্রাজি বলেন: “আমি সত্যি এখানকার কর্মশালার অংশ হতে পেরে খুবই আনন্দিত এবং গর্বিত। ইউনেস্কো ও CRIHAP দ্বারা আয়োজিত এই প্রশিক্ষণ কর্মশালার মাধ্যমে আমি আমাদের চা-জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। বিশেষত, আমাদের দল "পাটিচকা" ঐতিহ্য নিয়ে আমাদের গবেষণার মাধ্যমে এই কর্মশালা আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারার কথা তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। আমি বিশ্বাস করি, এ ধরনের উদ্যোগ আমাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে এবং ভবিষ্যতে চা-জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”

img

আজ ১৯ মে: আসামে বাংলা ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত দিন

প্রকাশিত :  ০৮:০৯, ১৯ মে ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষার সংগ্রামে শুধু ঢাকার রাজপথই রক্তে রঞ্জিত হয়নি, ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়েছিল ভারতের আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকায়। ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচর রেলওয়ে স্টেশনে বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলনরত নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালায় আসাম প্রাদেশিক পুলিশ। সেই ঘটনায় প্রাণ হারান ১১ জন ভাষাসৈনিক। তাঁদের মধ্যে ছয়জনই ছিলেন অবিভক্ত সিলেটের সন্তান।

আজ ১৯ মে। বরাক উপত্যকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বাঙালির কাছে দিনটি ‘বাংলা ভাষা শহীদ দিবস’ হিসেবে গভীর শ্রদ্ধা ও বেদনার সঙ্গে স্মরণীয়।

অসমীয়াকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ থেকেই উত্তেজনা

১৯৬০ সালের এপ্রিলে আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটিতে অসমীয়াকে প্রদেশের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। এতে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অসমিয়া উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হামলার মুখে বহু বাঙালি পরিবার এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়।

বিভিন্ন সহিংস ঘটনায় হাজার হাজার বাঙালি ক্ষতিগ্রস্ত হন। তদন্ত কমিশনের তথ্যমতে, কামরূপ জেলার বহু গ্রামে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়, নিহত হন অন্তত নয়জন বাঙালি, আহত হন শতাধিক মানুষ।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬০ সালের ২৪ অক্টোবর আসাম বিধানসভায় অসমীয়াকে রাজ্যের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। উত্তর করিমগঞ্জের বিধায়ক রণেন্দ্রমোহন দাস এ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করলেও শেষ পর্যন্ত তা পাস হয়।

জন্ম নেয় কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ

অসম সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বরাক উপত্যকার বাংলাভাষী জনগণ সংগঠিত হতে শুরু করেন। ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় ‘কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ’। বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে শুরু হয় গণআন্দোলন।

১৪ এপ্রিল পালন করা হয় ‘সংকল্প দিবস’। এরপর ২৪ এপ্রিল থেকে শুরু হয় দীর্ঘ পদযাত্রা। প্রায় ২০০ মাইল পথ ঘুরে আন্দোলনকারীরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে জনমত গড়ে তোলেন। আন্দোলনের নেতা রথীন্দ্রনাথ সেন ঘোষণা দেন—বাংলাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা না দিলে ১৯ মে সর্বাত্মক হরতাল পালন করা হবে।

আন্দোলন দমনে প্রশাসন কঠোর অবস্থান নেয়। ১৮ মে আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা নলিনীকান্ত দাস, রথীন্দ্রনাথ সেন ও সাংবাদিক বিধুভূষণ চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

শিলচর রেলস্টেশনে রক্তঝরা ১৯ মে

১৯ মে সকাল থেকেই শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে শান্তিপূর্ণ হরতাল ও পিকেটিং চলছিল। শিলচর রেলস্টেশনে সত্যাগ্রহে অংশ নেন হাজারো মানুষ। সকালজুড়ে পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও দুপুরের পর উত্তেজনা বাড়তে থাকে।

প্রায় আড়াইটার দিকে কাটিগোরা থেকে গ্রেপ্তারকৃত কয়েকজন আন্দোলনকারীকে বহনকারী একটি পুলিশ ট্রাক স্টেশনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় জনতা প্রতিবাদ জানায়। পরে সেখানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই স্টেশনে অবস্থান নেওয়া প্যারামিলিটারি বাহিনী আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ শুরু করে এবং মাত্র সাত মিনিটে ১৭ রাউন্ড গুলি চালায়।

গুলিতে আহত হন ১২ জন। তাঁদের মধ্যে নয়জন ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে আরও দু’জনের মৃত্যু হয়। ইতিহাসে অমর হয়ে যান বাংলা ভাষার ১১ শহীদ।

ভাষা আন্দোলনের ১১ শহীদ

শহীদরা হলেন—কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, হিতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্রকুমার দেব, কুমুদরঞ্জন দাস, সুনীল সরকার, তরণী দেবনাথ, শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুকোমল পুরকায়স্থ ও কমলা ভট্টাচার্য।

১১ শহীদের মধ্যে ৬ জনই সিলেটের সন্তান

ভাষা আন্দোলনে আত্মদানকারী ১১ শহীদের মধ্যে ছয়জন ছিলেন বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের মানুষ। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন হবিগঞ্জ জেলার এবং একজন সিলেটের গোলাপগঞ্জের বাসিন্দা। তাঁরা হলেন—বীরেন্দ্র সূত্রধর, নবীগঞ্জের বাহারামপুর গ্রামের সন্তান শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, নবীগঞ্জের সন্দলপুর গ্রামের বাসিন্দা

হিতেশ বিশ্বাস, হবিগঞ্জের ব্রাহ্মণডুরা গ্রামের সন্তান

সত্যেন্দ্র দেব, হবিগঞ্জের দেউলী গ্রামের কৃতি সন্তান চণ্ডীচরণ সূত্রধর, উছাইল গ্রামের বাসিন্দা

কমলা ভট্টাচার্য, সিলেটের গোলাপগঞ্জের ঢাকা দক্ষিণ গ্রামের সন্তান কমলা ভট্টাচার্য ছিলেন বাংলা ভাষার দাবিতে প্রাণ দেওয়া একমাত্র নারী শহীদ।

আন্দোলনের বিজয় ও ইতিহাসের স্বীকৃতি

১৯ মে’র রক্তক্ষয়ী ঘটনার পর প্রবল জনচাপের মুখে আসাম সরকার বরাক উপত্যকায় বাংলাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দিতে বাধ্য হয়। সেই থেকে প্রতি বছর ১৯ মে বরাক উপত্যকাসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলা ভাষা শহীদ দিবস পালিত হয়ে আসছে।

শুধু ১৯৬১ সালেই নয়, আসামে বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষার আন্দোলনে পরবর্তীতেও রক্ত ঝরেছে। ১৯৭২ সালের ১৭ আগস্ট শহীদ হন বিজন চক্রবর্তী। পরে ১৯৮৬ সালের ২১ জুলাই প্রাণ দেন জগন্ময় দেব ও দিব্যেন্দু দাস।

ভাষার জন্য আত্মত্যাগের ইতিহাসে তাই ১৯ মে শুধু বরাক উপত্যকার নয়, সমগ্র বাঙালি জাতির এক অবিস্মরণীয় দিন।


সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর