img

বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছা!

প্রকাশিত :  ০৮:৩০, ২৪ এপ্রিল ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১২:০৮, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছা!

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

এই দৃশ্যমান মহাবিশ্বের বিশালতার মাঝে প্রবাহমান অগণিত প্রাণের স্পন্দনে মানুষ এক অনন্য রহস্যময় সত্তা। পৃথিবীর ধূলিকণা থেকে শুরু করে আকাশের মেঘচুম্বী অট্টালিকা পর্যন্ত যেখানেই মানুষের পদচিহ্ন পড়েছে, সেখানেই রচিত হয়েছে এক আশ্চর্য ঐক্যের মহাকাব্য। সেই ঐশ্বর্যের শিখরে আসীন কোনো রাজকীয় ব্যক্তিত্ব হোক কিংবা ফুটপাতের ধুলোয় পড়ে থাকা কোনো ব্রাত্য জন—সবার প্রাণের গহীনে এক অদ্ভুত অভিন্নতা লক্ষ করা যায়। মৃত্যুর শীতল ও অনিবার্য আহ্বান কেউ স্বেচ্ছায় বরণ করতে চায় না; বরং প্রাণের প্রতিটি স্পন্দনে, হৃদয়ের নিভৃততম প্রকোষ্ঠে মানুষ কেবল বেঁচে থাকার পক্ষেই তার অটল সংকল্প ধরে রাখে। জীবন আসলে কেবল একটি জৈবিক যন্ত্রের ছন্দোবদ্ধ নিঃশ্বাস নয়, বরং এটি এক দুর্দমনীয় আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, যা প্রতিকূলতার রুক্ষ মরুভূমিতেও এক বিন্দু জলের সন্ধানে মরিয়া হয়ে ওঠে।

জীবনকে তুলনা করা যেতে পারে এক অতি সূক্ষ্ম ও কোমল অদেখা সুতোর সঙ্গে, যা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি প্রাণকে এক নিগূঢ় বন্ধনে গেঁথে রেখেছে। এই মায়াবী সুতোর এক প্রান্তে যদি থাকে নীরব যাতনা ও অপ্রাপ্তির দীর্ঘশ্বাস, তবে অন্য প্রান্তে টিমটিম করে জ্বলে এক অনির্বাণ আশার প্রদীপ। এই মৃদু আলোটুকুই মানুষকে প্রতিদিনের ধূসর ভোরে নতুন করে জাগিয়ে তোলে, শ্রান্ত-ক্লান্ত ও অবসন্ন শরীরকে পুনরায় সচল করে এবং চূর্ণবিচূর্ণ মনকে নতুন এক পথের অভিমুখে ধাবিত করে। যখন চারদিকের সব পরিচিত দরজা রুদ্ধ হয়ে আসে, যখন মনে হয় সবকিছু শেষ, তখনও মানুষের অন্তরাত্মা এক অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে—‘আরেকটু দেখি... হয়তো এবার কিছু বদলাবে, হয়তো এই গাঢ় অন্ধকারই আলোর প্রসববেদনা।’ এই ‘হয়তো’ শব্দটির গুপ্ত আশার মধ্যেই নিহিত আছে মানবসভ্যতার টিকে থাকার পরম রহস্য।

মানুষের বেঁচে থাকার এই আকাঙ্ক্ষা কেবল টিকে থাকার এক আদিম তাগিদ নয়, বরং এটি এক চিরন্তন দার্শনিক গাথা। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে যখন পৃথিবী দুটি মহাযুদ্ধের ধ্বংসলীলা প্রত্যক্ষ করেছিল, তখন অস্তিত্ববাদ দর্শন মানুষের সামনে এক নতুন আয়না তুলে ধরে। অস্তিত্ববাদীরা বিশ্বাস করেন যে মানুষের অস্তিত্ব তার সারসত্তার পূর্বগামী; অর্থাৎ মানুষ প্রথমে পৃথিবীতে আসে, তারপর তার প্রতিটি কর্ম ও সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সে নিজের সত্তাকে তিলে তিলে নির্মাণ করে। এই দর্শনের গভীরে নিহিত আছে ব্যক্তিমানুষের অপার স্বাধীনতা ও সেই স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত গুরুভার দায়িত্ব। মানুষ যখন নিজেকে এক শূন্যতা বা ‘নাথিংনেস’-এর মুখোমুখি দাঁড় করায়, তখনই সে বুঝতে পারে—তার বেঁচে থাকার সার্থকতা কেবল নিঃশ্বাস নেওয়ার মধ্যে নয়, বরং নিজের অস্তিত্বের অর্থ অন্বেষণের মধ্যেই।

মনীষী ভিক্টর ফ্রাঙ্কল, যিনি নাৎসিদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের অবর্ণনীয় বীভৎসতা থেকে অক্ষত ফিরেছিলেন, তিনি লক্ষ করেছিলেন যে কেবল তারাই সেই নরকসম পরিবেশে টিকে থাকতে পেরেছিলেন যাদের অন্তরে কোনো এক সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সজীব ছিল। ফ্রাঙ্কলের মতে, মানুষের কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নেওয়া সম্ভব হলেও একটি স্বাধীনতা কেউ কখনো হরণ করতে পারে না—তা হলো যেকোনো ঘোরতর পরিস্থিতিতে নিজের মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গি বেছে নেওয়ার ক্ষমতা। এই মনস্তাত্ত্বিক সক্ষমতাই মানুষকে মৃত্যুর উপত্যকা থেকেও জীবনের আলোর দিকে ফিরিয়ে আনে। যেমন আলবের কামু তাঁর ‘দ্য মিথ অব সিসিফাস’ প্রবন্ধে জীবনের আপাত অর্থহীনতাকে স্বীকার করেও সিসিফাসের সেই অন্তহীন সংগ্রামকে আনন্দের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সিসিফাস যখন পাহাড়ের চূড়ায় পাথর তোলার ব্যর্থ চেষ্টা বারবার করে, তখন সেই সংগ্রামের মুহূর্তেই সে নিজের ভাগ্যের অধিপতি হয়ে ওঠে।

মানুষের এই বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা কেবল বুদ্ধিদীপ্ত মস্তিষ্কের ফসল নয়, বরং এটি শরীরের প্রতিটি কোষে খোদিত এক আদিম প্রবৃত্তি। মৃত্যুর অনিবার্যতা নখদর্পণে থাকা সত্ত্বেও মানুষ স্বেচ্ছায় সেই পরিণতির দিকে পা বাড়ায় না, কারণ থেমে যাওয়ার মাঝে কোনো মহাকাব্য থাকে না। জীবনের সার্থকতা নিহিত থাকে টিকে থাকার প্রতিটি মুহূর্তের ছোট ছোট বিজয়ে—যেখানে সম্ভাবনা এখনো নিঃশ্বাস নেয় এবং আগামীর হাতছানি বিদ্যমান থাকে। কেন একজন ক্ষুধার্ত মানুষ, যার শারীরিক শক্তি প্রায় নিঃশেষ, সে-ও এক মুঠো ভাতের আশায় দিনের পর দিন লড়াই চালিয়ে যায়? কেন একজন মুমূর্ষু রোগী শয্যাশায়ী হয়েও হাসপাতালের সাদা ছাদের দিকে তাকিয়ে আগামী সুস্থতার স্বপ্ন বুনে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিদ্যার গভীরে। মানুষের টিকে থাকার প্রবৃত্তি বা ‘সারভাইভাল ইনস্টিংক্ট’ হলো এক শক্তিশালী জৈবিক ব্যবস্থা, যা কোনো বিপদের সংকেত পেলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে—যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় আমরা ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট রেসপন্স’ বলি।

এই শারীরিক প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি কাজ করে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সক্ষমতা, যাকে বিশেষজ্ঞরা ‘সাইকোলজিক্যাল রেজিলিয়েন্স’ বা মানসিক স্থিতিস্থাপকতা হিসেবে অভিহিত করেন। স্থিতিস্থাপকতা কেবল আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা নয়, বরং আঘাত পাওয়ার পর পুনরায় পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসার বা আরও শক্তিশালী হয়ে জেগে ওঠার এক আশ্চর্য ক্ষমতা। যারা চরম সংকটের মুহূর্তেও ভেঙে পড়েন না, তাদের মধ্যে কিছু বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেখা যায়—যেমন অদম্য আশাবাদ, খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং একটি শক্তিশালী সামাজিক সংযোগ। এই বৈজ্ঞানিক কাঠামোর বাইরেও মানুষের ভেতরে এক অদৃশ্য টান কাজ করে। মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতে, মানুষের অবচেতন মনে দুটি বিপরীতমুখী প্রবৃত্তি কাজ করে—একদিকে জীবনতৃষ্ণা, অন্যদিকে মৃত্যুপ্রবৃত্তি। স্বাভাবিক অবস্থায় জীবনতৃষ্ণাই জয়ী হয়। মানুষ তার সচেতন চিন্তার ঊর্ধ্বে গিয়েও জীবনের প্রতি টান অনুভব করে, কারণ তার অবচেতন মন প্রতিনিয়ত তাকে সুরক্ষার বার্তা পাঠায়।

তাত্ত্বিক আলোচনার বাইরে যখন আমরা রূঢ় বাস্তবের দিকে দৃষ্টিপাত করি, তখন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বেঁচে থাকার এই দুর্দম ইচ্ছা এক করুণ কিন্তু মহিমান্বিত রূপ ধারণ করে। ঢাকার ঘিঞ্জি বস্তিগুলোতে কিংবা চরাঞ্চলের দুর্গম জনপদে বসবাসকারী মানুষগুলোর জীবন দেখলে বোঝা যায়, বেঁচে থাকাটা সেখানে কত বড় এক অলৌকিক প্রাপ্তি। কড়াইল বা ধোলাইপাড়ার বস্তিবাসীদের জীবনে কোনো কিছুরই নিশ্চয়তা নেই—না আছে বাসস্থানের স্থায়ী ঠিকানা, না আছে বিশুদ্ধ পানির সুযোগ। অথচ এই চরম দারিদ্র্যের মাঝেও তারা জীবনের স্পন্দন ধরে রাখে প্রবল প্রতাপে। নাজমা নামের এক বস্তিবাসী নারী, যার ঘর আর দোকান একই ছোট কুঠুরিতে সীমাবদ্ধ, তিনি সেই প্রচণ্ড দাবদাহেও হাসিমুখে চা বিক্রি করে সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দেন। হাসিনা নামের আরেক নারী, যার স্বামী অসুস্থ এবং পরিবারের সদস্যসংখ্যা অনেক, তিনি নিজের ক্ষুদ্র আয় দিয়ে সংসারের হাল ধরেছেন অতি কষ্টে। জরিনা বেগমের গল্পটি আরও প্রেরণাদায়ক; স্বামীপরিত্যক্তা হয়েও তিনি হাঁস-মুরগি পালন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে নিজেকে এক সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলেছেন। তাদের এই লড়াই প্রমাণ করে যে টিকে থাকার ইচ্ছা যখন প্রবল হয়, তখন দারিদ্র্য বা সামাজিক বাধা আর বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায় না।

এই মানুষগুলোর জন্য প্রতিটি সকাল মানেই নতুন এক রণক্ষেত্র। তারা যখন সস্তা শাকসবজি বা চাল কিনতে বাজারে যায়, তখন তাদের চোখে হতাশা নয়, বরং টিকে থাকার এক অবিশ্বাস্য জেদ লক্ষ করা যায়। এই জেদটুকুই তাদের জীবনের শেষ সম্বল। আমরা প্রতিদিন রাজপথে যে শত শত রিকশাচালককে দেখি, তাদের প্রত্যেকের পেছনে রয়েছে একেকটি পরিবারের স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার হাড়ভাঙা খাটুনি। তারা থামতে জানে না, কারণ থেমে যাওয়ার অর্থ একটি পরিবারের স্বপ্নের সলিল সমাধি। বাংলাসাহিত্য চিরকালই জীবনের এই অন্ধকার-আলোর খেলাকে নিপুণভাবে চিত্রিত করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে জীবনানন্দ দাশ পর্যন্ত প্রত্যেকের লেখনীতে বেঁচে থাকার হাহাকার ও আনন্দ ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় ধরা দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথের দর্শনে জীবন মানেই নিরন্তর পথচলা—‘চরৈবেতি’। তিনি মনে করতেন, মানুষের ধর্ম হলো তার সুপ্ত সত্তাকে বিকশিত করা এবং কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যে স্থির না হওয়া। তাঁর কাছে বেঁচে থাকা আর অস্তিত্বশীল হওয়া এক কথা নয়; যারা আত্মোত্তীর্ণের চেষ্টা করে না, তারা প্রতীকী অর্থে বেঁচে থাকলেও প্রকৃত অর্থে অস্তিত্বশীল নয়।

জীবনানন্দ দাশের কাব্যে যদিও এক ধরনের বিষাদ ও ক্লান্তির আস্তরণ লক্ষ করা যায়, কিন্তু সেই ধূসরতার আড়ালেও জীবনের এক তপ্ত অনুভূতি সবসময় প্রবাহমান। তিনি যখন লেখেন—‘আমরা রক্তের মতো অশ্রু ঢেলে এই জীবনের আলো জ্বেলে রাখি’, তখন তা মূলত সমগ্র মানবজাতির টিকে থাকার এক পরম সত্যকে প্রকাশ করে। জীবনানন্দের কবিতায় মৃত্যু যেন জীবনেরই এক অন্য রূপ, এক পরম শান্তি, যা ক্লান্তির শেষে কাম্য। কিন্তু সেই শান্তির আগে তিনি জীবনের সব রং, রূপ ও গন্ধকে আস্বাদন করার যে তীব্র ব্যাকুলতা দেখিয়েছেন, তা অতুলনীয়। সাহিত্যে জীবনকে কতভাবেই না বর্ণনা করা হয়েছে—কখনো নদী হিসেবে যা অবিরাম বাঁক বদলিয়ে সমুদ্রের দিকে ধাবিত হয়, কখনো পদ্ম হিসেবে যা কর্দমাক্ত জলেও তার পবিত্রতা রক্ষা করে, আবার কখনো পাখির ডানার ঝাপটানি হিসেবে যা মুক্তির আকুতি জানায়। পি. লাল তাঁর কবিতায় জীবনকে একটি পাঁচপাপড়ি ফুলের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে প্রেম, বিশ্বাস, আশা এবং যন্ত্রণাও একেকটি অবিচ্ছেদ্য পাপড়ি হিসেবে বিদ্যমান। তিনি বুঝিয়েছেন যে জীবনের এই পূর্ণতাকে গ্রহণ করতে হলে আনন্দ ও বেদনা উভয়কেই আপন করে নিতে হবে। যন্ত্রণাও আমাদের জীবনের এক অপরিহার্য অলংকার, যা আত্মাকে আরও খাঁটি করে তোলে।

জীবনের পথ সবসময় কুসুমাস্তীর্ণ হয় না। এমন সময় আসে যখন চারপাশ হঠাৎ অন্ধকার হয়ে যায়—কাছের মানুষের অবহেলা, বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণা কিংবা দীর্ঘদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পরেও চূড়ান্ত ব্যর্থতার গ্লানি যখন মনকে চুরমার করে দেয়, তখন আত্মহননের মতো নেতিবাচক চিন্তা আসা স্বাভাবিক। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, অধিকাংশ মানুষই সেই অন্ধকারের অতল গহ্বরে চিরতরে তলিয়ে যায় না। কারণ মানুষের ভেতরের সেই আদিম আলো সহজে নির্বাপিত হয় না। তা হয়তো কখনো মেঘের আড়ালে গিয়ে বিশ্রাম নেয়, কিন্তু উপযুক্ত সময়ে আবার ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকে। মনোবিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে মানুষের মধ্যে জয়ের আকাঙ্ক্ষা যখন তীব্র হয়, তখন তার মস্তিষ্ক ‘ফ্লো’ নামক এক বিশেষ অবস্থায় প্রবেশ করে। এই অবস্থায় মানুষ বাইরের যন্ত্রণা বা সীমাবদ্ধতাকে ভুলে কেবল তার লক্ষ্যের দিকে অবিচল থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ইয়ানিস ম্যাকডেভিডের কথা বলা যায়, যিনি হাত-পা ছাড়াই জন্মেছিলেন। একসময় জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা আসলেও পরবর্তীতে তিনি তাঁর এই সীমাবদ্ধতাকেই শক্তিতে রূপান্তরিত করেছেন। আজ তিনি সারা বিশ্বে ঘুরে মানুষকে অনুপ্রেরণা দেন।

ঢাকা শহরের মতো মেগাসিটিগুলোতে জীবনের স্পন্দন শোনা যায় তার প্রতিদিনের কোলাহলে। সাত সকালে যখন মানুষের পদচারণা শুরু হয়, তখন বাতাসের ঘ্রাণে মেশে নতুন দিনের প্রত্যাশা। রিকশার টুংটাং শব্দ, ফেরিওয়ালার ছন্দময় ডাক আর বাসের ইঞ্জিনের গর্জন—সব মিলিয়ে যে এক অদ্ভুত শব্দমালা তৈরি হয়, তাকে অনেকে ‘শহরের কান্নাহাসি’ বলে অভিহিত করেন। কিন্তু এই শব্দের ভেতরেই লুকিয়ে আছে লক্ষ লক্ষ মানুষের বেঁচে থাকার গান। ঢাকার রাস্তায় এক রিকশাচালক যখন তার সিটের ওপর কসরত করে একটু ঘুমানোর চেষ্টা করেন, তখন সেই ঘুমের মধ্যেও তাকে আগামী ট্রিপের পরিকল্পনা করতে হয়। ফুটপাতে বসা ফুল বিক্রেতা শিশুটি জানে যে তার বিক্রি করা প্রতিটি রজনীগন্ধার গুচ্ছই তার পরিবারের রাতের আহার নিশ্চিত করবে। জীবনের এই তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়গুলোর সঙ্গেই টিকে থাকার গভীর সম্পর্ক নিহিত, যা মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছাকে আরও দুর্দম করে তোলে।

মানুষ একা বাঁচতে পারে না। তার বেঁচে থাকার ইচ্ছার মূলে থাকে অন্য মানুষের ভালোবাসা ও গোষ্ঠীর সমর্থন। বিভিন্ন সেবামূলক সংস্থা যখন প্রান্তিক নারীদের ক্ষমতায়ন করে, তখন তারা কেবল কিছু অর্থ দেয় না, বরং তাদের ভেতরে ‘আমি পারি’—এই আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলে। যখন নারীরা দলবদ্ধ হয়ে সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন তাদের বেঁচে থাকার ইচ্ছা এক নতুন শক্তি লাভ করে। এই যৌথ শক্তিই টিকে থাকার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। বিপদে পড়লে মানুষ একে অন্যকে সাহায্য করে দাঁড়ায়—এটি একটি আদিম বিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য। আদিমকালে মানুষ যখন গুহায় বাস করত, তখনও তারা দলবদ্ধভাবে বন্য পশুর সঙ্গে লড়াই করত। আধুনিক যুগেও যখন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মহামারি আসে, তখন মানুষ নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ ভুলে একে অপরের সহায়তায় এগিয়ে আসে। অন্যের জন্য ত্যাগ করার এই মানসিকতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবনের এক উচ্চতর অর্থ।

এই দীর্ঘ আলোচনার শেষে আমরা জীবনের এক অত্যন্ত সরল অথচ গভীর শিক্ষার মুখোমুখি হই—যতই কষ্ট আসুক, পথ যতই কণ্টকাকীর্ণ হোক, বেঁচে থাকার ইচ্ছাকে কোনোভাবেই হারানো যাবে না। এই ইচ্ছাই মানুষকে নতুন করে শুরু করতে শেখায়, ভাঙা স্বপ্নগুলোকে জোড়া লাগাতে সাহায্য করে এবং নিঃশ্ছিদ্র অন্ধকারের মাঝেও আলোর দিশা দেখায়। জীবন কখনো একরঙা নয়; এখানে কান্নার পাশে হাসি আর হারানোর পাশে পাওয়া সবসময় ছায়ার মতো লেগে থাকে। এই বৈপরীত্যই জীবনকে পূর্ণতা দেয়। আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে আমাদের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসই একেকটি অলৌকিক ঘটনা। যে মানুষটি আজ পরাজিত হয়ে মাথা নিচু করে বাড়ি ফিরছে, তার ভেতরেও লুকিয়ে আছে আগামীকালের এক অপরাজিত বীর। কারণ প্রাণের যে স্পন্দন আমাদের ভেতরে প্রবাহমান, তা কোনো জাগতিক শক্তির কাছে হার মানতে শেখেনি।

তাই জীবনের বড় শিক্ষা হলো—বাঁচতে হবে, আরও একবার চেষ্টা করতে হবে এবং অন্ধকারের বুক চিরে আলোর অভিমুখে যাত্রা করতে হবে। কারণ থেমে যাওয়ার মাঝে কোনো সার্থকতা নেই; সার্থকতা আছে প্রতিটি নিঃশ্বাসে জীবনের জয়গান গাওয়ার মধ্যে। আজকের এই ভারী দুঃখগুলো একদিন হালকা স্মৃতি হয়ে যাবে, আর এই বদলে যাওয়ার সম্ভাবনাই মানুষকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে শেখায়। জীবনকে ভালোবেসে, তার প্রতিটি যন্ত্রণাকে অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াই প্রকৃত মনুষ্যত্ব। এই পৃথিবীর সব মানুষের মধ্যেই সেই আশ্চর্য মিলটি হলো জীবনের প্রতি এই অবিনশ্বর ভালোবাসা—যা মৃত্যুকে উপেক্ষা করে অনন্তকাল ধরে বেঁচে থাকার পক্ষে অটল থাকে।

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর

img

বাঙালির জাতিসত্তা ও পহেলা বৈশাখ: ঐতিহ্য অন্বেষণে এক মহাকাব্যিক পথরেখা

প্রকাশিত :  ০৯:০৯, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

​বাঙালির পহেলা বৈশাখ কেবল পঞ্জিকার আবর্তন নয়, বরং এটি একটি জাতির সহস্রাব্দের আত্মপরিচয়ের দর্পণ। এই দিনটি আমাদের প্রাণের স্পন্দন এবং অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পহেলা বৈশাখ মানেই আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের শিকড় ও হাজার বছরের ঐতিহ্যের এক নিরন্তর স্মৃতিচারণা। বাঙালির আত্মপরিচয়ের এই উৎসব মূলত একটি অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন লোকউৎসব, যার গভীরতা মিশে আছে এ দেশের মাটি ও মানুষের দীর্ঘশ্বাসের সাথে। তবে বর্তমানের এই আনন্দধারার সমান্তরালে একটি গূঢ় কষ্টের সুরও অনুরণিত হচ্ছে, যা আমাদের অবচেতন মনকে বিদ্ধ করে। আমাদের অনেক সুন্দর ঐতিহ্য আজ সময়ের নিষ্ঠুর আবর্তে চোখের সামনে হারিয়ে যাচ্ছে। যে জমজমাট বৈশাখী মেলা একসময় গ্রামবাংলার প্রাণকেন্দ্র ছিল, আজ তা শহুরে কৃত্রিমতার চাপে ম্লান। লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ কিংবা হাডুডুর মতো শৌর্য-বীর্যের প্রতীকগুলো আজ ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই খুঁজছে। লোকসংগীত, বাউলগান বা পালাগানের সেই আধ্যাত্মিক মদিরা আজ নতুন প্রজন্মের কাছে এক অচেনা সুর। গ্রামবাংলার সেই সহজ-সরল সংস্কৃতি আজ বিশ্বায়ন ও নগরায়ণের জটিলতায় পর্যুদস্ত। তবুও বাঙালির অন্তরের বিশ্বাস এই যে—এই ঐতিহ্যই আমাদের প্রকৃত পরিচয় এবং আমাদের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। এই শিকড়কে বাঁচিয়ে রাখা কেবল নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা অঞ্চলের নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি বাঙালির পবিত্র দায়িত্ব।

​ঐতিহ্য অন্বেষণের এই মহাকাব্যিক পথরেখায় আমরা দেখতে পাই, বাঙালির পহেলা বৈশাখ কোনো একক ধর্ম বা গোষ্ঠীর সম্পদ নয়। এটি একটি বহুত্ববাদী সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ, যেখানে হিন্দু জমিদারের পুণ্যাহ আর মুসলিম কৃষকের নবান্ন একাকার হয়ে গিয়েছিল। কালানুক্রমিক বিবর্তনে এই দিনটি রাজনৈতিক প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষ করে ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এই বর্ষবরণ উৎসব। ১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে ছায়ানটের যে আয়োজন শুরু হয়, তা মূলত ছিল বাঙালির আত্মমর্যাদা রক্ষার এক শৈল্পিক লড়াই। এই প্রবন্ধে পহেলা বৈশাখের ঐতিহাসিক বিবর্তন, বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বর্তমান সংকট এবং আগামীর পথরেখা নিয়ে একটি নিবিড় বিশ্লেষণ উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।

​নববর্ষের ঐতিহাসিক পটভূমি: ফসলি সন থেকে জাতীয় উৎসব

​বাংলা নববর্ষের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এর মূলে রয়েছে কৃষি ও অর্থনীতির এক গভীর মেলবন্ধন। মুঘল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে কৃষিকাজের সুবিধার্থে এবং রাজস্ব আদায়ের একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতি প্রবর্তনের লক্ষ্যে ‘ফসলি সন’ হিসেবে বাংলা সনের গণনা শুরু হয়। ১৫৫৬ থেকে ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে আকবর যখন এই ভূখণ্ডের খাজনা আদায়ের পদ্ধতিকে সহজতর করতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি সৌর ও চন্দ্র বছরের সংমিশ্রণে একটি নতুন সময়রেখা তৈরি করেন। হিজরি সন চন্দ্রকেন্দ্রিক হওয়ায় তা ঋতু পরিবর্তনের সাথে মিলত না, ফলে কৃষকদের কর দিতে সমস্যা হতো। ঐতিহাসিক আবুল ফজল তাঁর ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, সম্রাট আকবর ৯৬৩ হিজরিতে (১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ) এই সনের প্রবর্তন করেন, যা তৎকালীন সময়ে ‘তারিখ-ই-ইলাহি’ নামে পরিচিত ছিল। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে ‘হালখাতা’ বা ব্যবসায়িক নতুন খাতা খোলার যে রীতি, তা এই অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটেরই এক শৈল্পিক রূপ।

​ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে নববর্ষ উদযাপনের বিবর্তনকে তিনটি প্রধান কালখণ্ডে বিভক্ত করা যায়। প্রথমত, প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় প্রেক্ষাপট, যেখানে এটি ছিল মূলত কৃষি উৎসব ও পুণ্যাহের দিন। সম্রাট আকবরের সময় থেকে এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। দ্বিতীয়ত, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল, যখন বাঙালির চিত্তে স্বাদেশিকতা ও জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই সময়ে পহেলা বৈশাখ বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য প্রকাশের একটি প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে। তৃতীয়ত, পাকিস্তান আমল—যা ছিল বাঙালির সাংস্কৃতিক সংগ্রামের এক অগ্নিপরীক্ষার কাল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি যে অস্তিত্বের জানান দিয়েছিল, ১৯৬০-এর দশকে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মাধ্যমে তা এক পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক বিপ্লবে রূপ নেয়। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিবাদে ১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল, যা আজ বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার আলোকবর্তিকা।

​স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পহেলা বৈশাখকে একটি সর্বজনীন জাতীয় উৎসবে রূপান্তর করেন এবং দিনটিকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রদর্শন ও আদর্শের অন্যতম ভিত্তি ছিল দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ। তবে পহেলা বৈশাখের ছুটির ইতিহাসের পেছনে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারেরও একটি বড় অবদান ছিল। মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক সেই সময় প্রথম এই দিনটিকে সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন, যদিও তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বর্তমানে এই উৎসব কেবল একটি দিন উদযাপনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত ‘বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পরিচয়কে মহিমান্বিত করেছে।

​বাংলা ভাষার ধ্রুপদী মহিমা: আড়াই হাজার বছরের শিকড়

​বাঙালির নববর্ষ উদযাপনের সঙ্গে তার ভাষার মর্যাদা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলা ভাষা বিশ্বের দরবারে একটি সমৃদ্ধ ও প্রাচীন ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর ভারত সরকার বাংলাকে ‘ধ্রুপদী ভাষা’র (Classical Language) মর্যাদা প্রদান করেছে। এই স্বীকৃতির প্রধান মানদণ্ড হলো ভাষাটির ইতিহাস হতে হবে অন্তত দেড় থেকে দুই হাজার বছরের প্রাচীন এবং এর একটি সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ঐতিহ্য থাকতে হবে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, বাংলা ভাষার বয়স আড়াই হাজার বছরেরও বেশি। এর আদি উৎস হিসেবে মাগধী প্রাকৃত বা পূর্বী অপভ্রংশকে চিহ্নিত করা যায়, যেখান থেকে পর্যায়ক্রমে বাংলা, অসমীয়া ও ওড়িয়া ভাষার উদ্ভব হয়েছে।

​বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হলো ‘চর্যাপদ’, যা মূলত অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে রচিত বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের আধ্যাত্মিক গানের সংকলন। ১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবার থেকে এই অমূল্য পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন, যা প্রমাণ করে যে হাজার বছর আগেই বাংলা ভাষা তার কাব্যিক ও দার্শনিক গভীরতা অর্জন করেছিল। চর্যাপদ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর এবং আধুনিক যুগের রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও জীবনানন্দের সাহিত্যকর্ম আমাদের এই ভাষাকে ধ্রুপদী সৌন্দর্যে মণ্ডিত করেছে। বিশেষ করে ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল বিজয় বাংলা ভাষাকে বিশ্বসাহিত্যের শিখরে আসীন করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ভাষার এই ধ্রুপদী শিকড় নিয়ে গর্ব করলেও বাস্তব জীবনে আমরা বাংলা ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগে অনেক ক্ষেত্রে উদাসীন। ইংরেজি মাধ্যমের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত প্রজন্মের অনেকেই তাদের মাতৃভাষা এবং সাহিত্যিক ঐতিহ্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখে না। এই উদাসীনতা আমাদের দীর্ঘস্থায়ী পরিচয় সংকটের একটি বড় কারণ।

​পুণ্যাহ ও হালখাতা: রাজা-প্রজা থেকে ব্যবসায়ীর মেলবন্ধন

​বাংলা সনের প্রবর্তনের সাথে সাথে এর অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে ‘পুণ্যাহ’ উৎসবের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। মুঘল ও নবাবী আমলে চৈত্র মাসের শেষ দিকে কৃষকরা ফসল ঘরে তুলতেন এবং বৈশাখের প্রথম দিনে জমিদারের কাঁচারিতে খাজনা পরিশোধ করতে যেতেন। এই অনুষ্ঠানকেই বলা হতো পুণ্যাহ। জমিদাররা প্রজাদের মিষ্টি ও পানের মাধ্যমে আপ্যায়ন করতেন, যা রাজা ও প্রজার মধ্যে একটি সামাজিক সেতুবন্ধন তৈরি করত। ব্রিটিশ আমলের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর এই উৎসবটি আরও ব্যাপকতা লাভ করে। নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ এই উৎসবের একটি সুনির্দিষ্ট রীতি প্রচলন করেছিলেন। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির সাথে সাথে পুণ্যাহ উৎসব আজ বিলুপ্তপ্রায় হলেও তার রেশ আজও টিকে আছে ব্যবসায়ীদের ‘হালখাতা’র মধ্যে।

​হালখাতা হলো বাঙালির এক অনন্য অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। বৈশাখের প্রথম দিনে ব্যবসায়ীরা তাঁদের পুরনো হিসাবের খাতা বন্ধ করে নতুন খাতা খোলেন। এই দিনে ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করানো হয় এবং বকেয়া পরিশোধের মাধ্যমে সম্পর্কের নবায়ন করা হয়। কলকাতা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত এই ঐতিহ্য আজও অমলিন। হালখাতা কেবল দেনা-পাওনার হিসাব নয়, বরং এটি বাঙালির সামাজিক সংহতির এক অনন্য উদাহরণ। আধুনিক শপিং মল ও অনলাইন কেনাকাটার যুগেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা আজও এই হালখাতার ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে আছেন।

​বিলুপ্তপ্রায় গ্রাম্য সংস্কৃতি: হারানোর দীর্ঘশ্বাস ও আধুনিকতার ঘাত-প্রতিঘাত

​বাঙালির সংস্কৃতির প্রধান উৎসস্থল হলো তার পল্লীপ্রকৃতি। হাজার বছরের গ্রামীণ সংস্কৃতিই আমাদের ঐতিহ্যের মূল কাঠামো। কিন্তু এই ডিজিটাল যুগে বিশ্বায়নের প্রবল স্রোতে আমাদের সেই পরিচিত গ্রামগুলো আজ আর আগের মতো নেই। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের হাজার বছরের লোকজ খেলাধুলা এবং সংগীত আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। একসময় বৈশাখী মেলা ছিল গ্রামের মানুষের চিত্তবিনোদনের একমাত্র ভরসা। মেলার সেই ধুলোমাখা পথ, মাটির পুতুলের বাঁশি, নাগরদোলার শব্দ আজ স্মৃতিতে ফিকে হয়ে আসছে।

​গ্রামের মেলার দৃশ্য ছিল শৈল্পিক ও প্রাণবন্ত। সেখানে কামারদের তৈরি দা-বঁটি থেকে শুরু করে কুমোরদের তৈরি মাটির হাঁড়ি ও পুতুলের এক অপূর্ব সমাহার দেখা যেত। শিশুদের জন্য ছিল তালপাতার বাঁশি কিংবা মাটির ঘোড়া। কিন্তু আজ প্লাস্টিকের সস্তা খেলনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির আগ্রাসনে মাটির পুতুল ও বাঁশি তৈরির কারিগররা পেশা বদলে ফেলছেন। বায়োস্কোপের মতো ভ্রাম্যমাণ বিনোদন আজ টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। শোলার তৈরি খেলনা ও অলঙ্কার আজ কাঁচামালের অভাব ও কারিগরদের অনাগ্রহে হারিয়ে যেতে বসেছে। শহুরে বৈশাখী মেলাগুলোতে জৌলুস থাকলেও গ্রামীণ মেলার সেই প্রাণের টান আজ অনুপস্থিত।

​ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া ও বাঙালির শৌর্য: মাঠ থেকে স্মার্টফোনে স্থানান্তর

​বাঙালির শৌর্য-বীর্য এবং সাহসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটত তার নিজস্ব খেলাধুলার মাধ্যমে। পহেলা বৈশাখ এবং মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ ও হাডুডু। বিশেষ করে হাডুডু বা কাবাডি, যা আমাদের জাতীয় খেলা, তা একসময় গ্রামবাংলার প্রতিটি জনপদে জনপ্রিয় ছিল। ১৯৭২ সাল থেকে এটি বাংলাদেশের জাতীয় খেলার মর্যাদা পেলেও বর্তমান প্রজন্মের কাছে এটি অনেকটা অচেনা। আধুনিক প্রজন্মের কিশোররা আজ স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ভিডিও গেমে আসক্ত হয়ে মাঠের ধুলোবালি থেকে দূরে সরে গেছে।

​নৌকাবাইচ ছিল বর্ষা ও বৈশাখের এক অনন্য উন্মাদনা। গ্রামবাংলার নদ-নদীগুলো যখন বর্ষায় টইটম্বুর থাকত, তখন আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটত। একইভাবে লাঠিখেলা, যা আমাদের পূর্বপুরুষদের আত্মরক্ষার এক শৈল্পিক কৌশল ছিল, তা আজ নিয়মিত চর্চার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। দাঁড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, বৌছি কিংবা কানামাছির মতো খেলাগুলো গ্রামীণ কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়ক ছিল। আধুনিক যুগের অভিভাবকরা আজ শিশুদের ধুলোবালি ও কাদা থেকে দূরে রাখতে গিয়ে তাদের এই প্রাকৃতিক আনন্দ থেকে বঞ্চিত করছেন। এর ফলে শিশুরা একাকিত্ব ও যান্ত্রিকতায় ভুগছে, যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকি।

​লোকসংগীতের আধ্যাত্মিক ধারা: বাউল ও পালাগানের সংকট

​বাঙালির সংগীতের প্রাণভোমরা হলো তার লোকসংগীত। বাউল গান, পালাগান ও লোকগাঁথা আমাদের মাটির গন্ধমাখা সুর। বাউল দর্শন কেবল গান নয়, এটি এক গূঢ় আধ্যাত্মিক সাধনা। বাউলরা বিশ্বাস করেন যে, মানুষের দেহের মধ্যেই স্রষ্টা বা ‘মনের মানুষ’-এর অবস্থান। ফকির লালন শাহের মতো সাধকরা এই দর্শনের মাধ্যমে মানুষে মানুষে বিভেদ দূর করার এবং মানবতার জয়গান গেয়েছেন। কিন্তু বর্তমান সময়ের ‘আকাশ সংস্কৃতি’ ও আধুনিক পপ মিউজিকের প্রভাবে এই সুরগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। পালাগান বা যাত্রাপালার সেই জমজমাট রাত জাগা আসর আজ টিভির সিরিয়াল কিংবা ইন্টারনেটের ভিডিওর দাপটে বিলুপ্তির পথে। লোকসংগীতের এই ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা আমাদের সংস্কৃতির মেরুদণ্ডকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

​মঙ্গল শোভাযাত্রা: ইউনেস্কো স্বীকৃতি ও অসাম্প্রদায়িকতার জয়গান

​পহেলা বৈশাখের আধুনিক উদযাপনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হলো ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে প্রথম এই শোভাযাত্রা বের করা হয়। তৎকালীন সামরিক শাসনের অন্ধকার থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে এবং মানুষের মনে নতুন আশা জাগানোর জন্য এই বর্ণাধ্য মিছিলের সূচনা হয়েছিল। ১৯৯৬ সাল থেকে এটি ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিতি পায়। এই শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত বাঘ (শৌর্য), হাতি (সম্পদ), পেঁচা (প্রজ্ঞা) এবং সূর্যমুখীর মতো লোকজ মোটিফগুলো বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরই প্রতিফলন। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো এই শোভাযাত্রাকে ‘মানবতার বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।

​মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল আবেদন হলো এর অসাম্প্রদায়িকতা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই শোভাযাত্রার নাম ও বিষয়বস্তু নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে এর নাম ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই ধরনের নাম পরিবর্তনকে বাঙালির দীর্ঘদিনের অসাম্প্রদায়িক পরিচয়ের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছেন অনেক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তবুও এটি আজও বাঙালির প্রতিরোধের এক সৃজনশীল রূপ হিসেবে টিকে আছে।

​নগরায়ণ ও বিশ্বায়নের প্রভাব: আত্মপরিচয়ের নব্য সংকট

​বর্তমানে নগরায়ণ বলতে কেবল দালানকোঠা নির্মাণ নয়, বরং এটি জীবনযাত্রার আমূল পরিবর্তনকে বোঝায়। শিল্পের প্রসারে গ্রামের মানুষ আজ কাজের খোঁজে শহরে ভিড় করছে, যার ফলে যৌথ পরিবার প্রথা ভেঙে যাচ্ছে। বিশ্বায়ন সারা বিশ্বকে একটি কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত করলেও এর ফলে ক্ষুদ্র ও আঞ্চলিক সংস্কৃতিগুলো হুমকির মুখে পড়ছে। পহেলা বৈশাখ আজ অনেক ক্ষেত্রে কেবল পান্তা-ইলিশ খাওয়ার একটি ‘ফ্যাশন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহুরে উৎসবের জৌলুসে গ্রামীণ ঐতিহ্যের সেই প্রাণের টান অনুপস্থিত। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে যে করপোরেট বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হয়েছে, তা এই উৎসবের মূল নির্যাসকে অনেক ক্ষেত্রে ম্লান করে দিচ্ছে।

​প্রবাসে বাঙালির লড়াই: পরবাসে শিকড়ের অস্তিত্ব রক্ষা

​জীবিকার তাগিদে দেশান্তরী হলেও প্রবাসে বসবাসরত বাঙালিরা তাঁদের হৃদয়ে বাংলাদেশকেই লালন করেন। লন্ডন, নিউইয়র্ক কিংবা আমস্টারডামের মতো শহরগুলোতে আজ নিয়মিত বৈশাখী মেলা আয়োজিত হয়। প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মকে বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতি জানানো আজ এক বড় চ্যালেঞ্জ। ড. হুমায়ুন আজাদের ‘মাই বিউটিফুল বাংলাদেশ’-এর মতো বই কিংবা বিভিন্ন বাংলা স্কুলের মাধ্যমে তাদের শিকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রবাসীরাই বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদায় আসীন করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

​ঐতিহ্যের প্রবহমানতা ও আবহমান বাংলা

​বাঙালির শিকড় ও ঐতিহ্যের কথা বলতে গেলে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘আবহমান’ কবিতার কথা মনে পড়ে। কবি সেখানে দেখিয়েছেন যে, মানুষ যতই আধুনিক হোক না কেন, তার অস্তিত্বের সত্য নিহিত আছে মাটির গহীন শিকড়ে। তাঁর কবিতায় লাউমাচা আর সন্ধ্যার বাতাসে দুলতে থাকা ফুলের যে চিত্রকল্প, তা বাঙালির চিরন্তন ঐতিহ্যের প্রতীক। ঐতিহ্যের মৃত্যু নেই, এটি কেবল রূপান্তর লাভ করে। জীবনানন্দ দাশের দর্শনেও আমরা আমাদের ‘নীল বাংলা’র সাথে এক আত্মিক সংযোগ অনুভব করি, যা পহেলা বৈশাখের চেতনায় আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

​সাহিত্যে বৈশাখ: মুকুন্দরাম থেকে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল

​বাংলা সাহিত্যে বৈশাখ কেবল একটি মাস নয়, বরং এটি রুদ্র ও নতুনের সংমিশ্রণ। ষোড়শ শতাব্দীর কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী বৈশাখকে বর্ণনা করেছেন দাবদাহ আর প্রাকৃতিক বিক্ষুব্ধতার মাস হিসেবে। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৈশাখকে দেখেছেন এক নতুনের আবাহন হিসেবে। তাঁর ‘এসো হে বৈশাখ’ গানটি আজ বাঙালির জাতীয় ঐতিহ্যের অংশে পরিণত হয়েছে, যা জীর্ণ ও পুরনোকে ধুয়ে-মুছে ফেলার আহ্বান জানায়। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বৈশাখকে দেখেছেন ধ্বংসের নকীব এবং অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে এক প্রচণ্ড বিপ্লব হিসেবে। এভাবে সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাধ্যমে বৈশাখ বাঙালির জাতীয়তাবোধের এক প্রধান স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

​আগামীর অঙ্গীকার: শিকড়কে শক্ত রাখার উপায়

​পহেলা বৈশাখ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিশ্বে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে হলে আগে আমাদের নিজেদের শিকড়কে শক্ত রাখতে হবে। আজ আমাদের প্রধান কাজ হলো হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যগুলোকে পুনরুদ্ধার করা। কেবল বছরে একদিন পান্তা-ইলিশ খেয়ে নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনে বাঙালি সংস্কৃতিকে চর্চা করতে হবে। আমাদের সন্তানদের ঐতিহ্যের গল্প শোনাতে হবে; পরিচয় করিয়ে দিতে হবে হাডুডু কিংবা নৌকাবাইচের রোমাঞ্চের সঙ্গে। রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত উভয় পর্যায়ের উদ্যোগের মাধ্যমেই আমাদের গৌরবময় সংস্কৃতিকে ধারণ করতে হবে। পহেলা বৈশাখ যেন কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ হয়ে না থাকে, বরং এটি যেন বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার জয়গান গেয়ে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার শপথের দিনে পরিণত হয়।