img

বাংলাদেশের ইতিহাসে রাণী ভবানী ও নাটোর রাজবাড়ী: অর্ধবঙ্গেশ্বরীর গৌরবগাথা

প্রকাশিত :  ০৯:২৫, ০৪ নভেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের ইতিহাসে রাণী ভবানী ও নাটোর রাজবাড়ী: অর্ধবঙ্গেশ্বরীর গৌরবগাথা

সংগ্রাম দত্ত

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত নাটোর জেলা একসময় ছিল রাজকীয় ঐশ্বর্যের কেন্দ্রস্থল। এই জেলার সদর উপজেলায় অবস্থিত বিখ্যাত রাণী ভবানী রাজবাড়ী, বাংলার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়ের সাক্ষী। জমিদারি প্রথার উত্থান-পতনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই রাজবংশের নাম, যেখান থেকে এক নারী – রাণী ভবানী – সমগ্র বাংলার “অর্ধবঙ্গেশ্বরী” হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন।

নাটোর রাজবংশের সূচনা: অষ্টাদশ শতকের শুরুতে নাটোর রাজবংশের যাত্রা শুরু হয়। ১৭০৬ খ্রিস্টাব্দে পরগণা বানগাছির জমিদার গণেশ রায় ও ভবানীচরণ চৌধুরী রাজস্ব প্রদানে ব্যর্থ হয়ে চাকরিচ্যুত হন। তাঁদের জমিদারি কেড়ে নিয়ে দেওয়ান রঘুনন্দন তাঁর ভাই রামজীবনের নামে বন্দোবস্ত নেন। এই রামজীবনই ছিলেন নাটোর রাজবংশের প্রথম রাজা।

রাজা রামজীবন ১৭০৬ খ্রিস্টাব্দে (মতান্তরে ১৭১০ খ্রিস্টাব্দে) জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৭৩৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর নিজ সন্তান না থাকায় জীবদ্দশায় এক পুত্র দত্তক নেন—রামকান্ত।

রাণী ভবানীর আগমন:১৭৩০ খ্রিস্টাব্দে রাজা রামজীবনের দত্তকপুত্র রামকান্তের সঙ্গে বিয়ে হয় রাণী ভবানীর। রাজা রামকান্তের মৃত্যুর পর ১৭৪৮ সালে নবাব আলীবর্দী খাঁ রাণী ভবানীর হাতে জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেন।

রাণী ভবানীর জন্ম ১৭২৩ সালে বগুড়া জেলার আদমদিঘি থানার ছাতিয়ানগ্রাম গ্রামে। তাঁর পিতা আত্মারাম চৌধুরী ও মাতা জয়দুর্গা দেবী। অল্প বয়সেই তিনি রাজবংশের বধূ হিসেবে নাটোরে আসেন।

অর্ধবঙ্গেশ্বরী রাণী ভবানী: রাণী ভবানীর রাজত্বকালে নাটোর রাজবাড়ির প্রভাব বিস্তৃত হয় এক বিশাল অঞ্চলে। তাঁর জমিদারি ছড়িয়ে ছিল বর্তমান বাংলাদেশের রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, কুষ্টিয়া, যশোর, রংপুর জেলা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও মালদহ পর্যন্ত।

ইংরেজ লেখক হলওয়েলের হিসাবে, তাঁর জমিদারি থেকে বার্ষিক রাজস্ব আয় হতো প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা, যা তৎকালীন সময়ের এক বিরাট অঙ্ক। দক্ষ প্রশাসন, প্রজাহিতৈষী মনোভাব ও দানশীলতার কারণে প্রজারা তাঁকে ভালোবেসে “অর্ধবঙ্গেশ্বরী” নামে অভিহিত করেছিল।

প্রজাদের কল্যাণে দানশীল রাণী: রাণী ভবানীর জীবনযাপন ছিল অনাড়ম্বর, কিন্তু সমাজসেবায় তাঁর দৃষ্টান্ত অনন্য। তিনি শত শত মন্দির, অতিথিশালা ও রাস্তা নির্মাণ করেন। প্রজাদের জন্য পুকুর খনন করে পানীয় জলের ব্যবস্থা করেন এবং শিক্ষা বিস্তারে অনুদান প্রদান করেন।

১৭৫৩ সালে তিনি কাশীতে (বর্তমান বারাণসী) ভবানীশ্বর শিব ও দুর্গাবাড়ী, দুর্গাকুণ্ড ও কুরুক্ষেত্রতলা নামক পবিত্র স্থান নির্মাণ করেন। তাঁর উদ্যোগেই হাওড়া থেকে কাশী পর্যন্ত দীর্ঘ সড়কপথ নির্মিত হয়, যা তখন পরিচিত ছিল “রাণী ভবানী রোড” বা “বেনারস রোড” নামে।

ধর্মীয় অবদান ও দেবোত্তর সম্পত্তি: বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার ভবানীপুর শক্তিপীঠ উন্নয়নে রাণী ভবানীর অবদান আজও স্মরণীয়। কথিত আছে, তিনি প্রতি বছর দু’বার হাতি বহর নিয়ে ভবানীপুরে যেতেন।

পাকিস্তান আমলে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলেও রাণী ভবানী স্টেটের উত্তরাধিকারীরা ২৬২ একর জমি দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে ভবানীপুর শক্তিপীঠের নামে দানপত্রে নিবন্ধন করে দেন। বর্তমানে ঐ জমির একটি বড় অংশ প্রভাবশালী মহলের দখলে চলে গেছে, যার পুনরুদ্ধারে আদালতে একাধিক মামলা চলছে।

তারাপীঠে অবদান ও বামাক্ষ্যাপার নিয়োগ: বীরভূম জেলার বিখ্যাত তারাপীঠ মন্দিরও তাঁর জমিদারির অন্তর্গত ছিল। ভগ্নপ্রায় অবস্থায় থাকা মন্দিরটি তিনি পুনর্নির্মাণ করেন এবং কিংবদন্তি সাধক বামাক্ষ্যাপাকে মন্দিরের পুরোহিত হিসেবে নিয়োগ দেন।

রাণী ভবানীর রাজবাড়ি, স্থাপত্য ও ঐতিহ্য: নাটোর রাজবাড়ি নির্মাণ শুরু হয় ১৭০৬-১৭১০ সালের মধ্যে। রাজবাড়ির আয়তন প্রায় ১২০ একর, যেখানে ছোট-বড় ৮টি ভবন, ৭টি পুকুর, এবং দুটি স্তরের বেষ্টনী প্রাচীর রয়েছে।

রাজবাড়ি বিভক্ত দুই ভাগে—বড় তরফ ও ছোট তরফ। এখানকার প্রধান মন্দিরগুলো হলো শ্যামসুন্দর মন্দির, আনন্দময়ী কালিবাড়ি ও তারকেশ্বর শিবমন্দির।

রাজবংশের রাজধানী স্থাপনের জন্য রামজীবন ভাতঝাড়ার বিল এলাকা নির্বাচন করেন, যা পরবর্তীতে “নাট্যপুর” নাম ধারণ করে “নাটোর” নামে পরিচিত হয়।

জীবনের শেষ অধ্যায়: দত্তক পুত্র রামকৃষ্ণের হাতে জমিদারি দায়িত্ব অর্পণ করে রাণী ভবানী মুর্শিদাবাদ জেলার বড়নগরে চলে আসেন এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ভাগীরথী নদীর তীরে তিনি নির্মাণ করেন ১০০টি শিবমন্দির, যার কিছু আজও টিকে আছে।

তাঁর মৃত্যুর পর ওয়ারেন হেস্টিংস তাঁর রংপুরের জমিদারি দখল করেন। দীর্ঘ ও কর্মবহুল জীবনের পর রাণী ভবানী ১৮০২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর, ৭৯ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন।

বর্তমান অবস্থা: নাটোর রাজবাড়ি আজ বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও পর্যটন স্থাপনা। ১৯৮৬ সাল থেকে রাজবাড়ির পুরো এলাকা জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে “রাণী ভবানী কেন্দ্রীয় উদ্যান ও যুবপার্ক” নামে পরিচালিত হচ্ছে।

রাণী ভবানী কেবল নাটোর বা রাজশাহীর ইতিহাসে নয়, সমগ্র বাংলার ইতিহাসে এক আলোকবর্তিকা—যিনি প্রমাণ করেছিলেন, নারীর নেতৃত্বও রাজনীতি ও প্রশাসনে সমান সফল হতে পারে। তাঁর স্মৃতি, দানশীলতা ও প্রজাহিতৈষী মনোভাব আজও বাংলার মাটিতে কিংবদন্তি হয়ে আছে।


img

বিশ্বমঞ্চে বাংলা সাহিত্যের ঐতিহাসিক জয়, গ্লোবাল বুক চার্টের শীর্ষে কথাসাহিত্যিক রেজুয়ান আহম্মেদ

প্রকাশিত :  ০৯:১৯, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১০:৫০, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা: বিশ্বসাহিত্যের দরবারে এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক গৌরব বয়ে আনলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক, কবি ও প্রাবন্ধিক রেজুয়ান আহম্মেদ। দীর্ঘ তিন দশক ধরে সস্তা প্রচারণার আড়াল থেকে নিজেকে দূরে রেখে নিভৃতে যিনি সৃষ্টি করে গেছেন অসাধারণ সব কালজয়ী আখ্যান, সেই লেখকের ইংরেজি বইগুলো আজ আন্তর্জাতিক বইয়ের বাজারে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে। বিশ্বখ্যাত ডিজিটাল ও খুচরা বই বিক্রয় প্ল্যাটফর্মগুলোর গ্লোবাল বেস্টসেলার চার্টে তাঁর বইগুলো শীর্ষ স্থান দখল করে নিয়েছে, যা সমকালীন বিশ্বসাহিত্যে বাংলাদেশের অবস্থানকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক বুক ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, রেজুয়ান আহম্মেদের সাড়াজাগানো মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস 'উই আর অল ম্যাড' এবং সমকালীন ভূরাজনৈতিক সংকট নিয়ে লেখা 'দ্য শ্যাডো অব ওয়ার' ও 'দ্য ডেজ অব গাজা' গ্লোবাল বুক চার্টগুলোতে অভূতপূর্ব সাড়া জাগিয়েছে। আমাজন, কোবো, ইন্ডিগো, বুকটোপিয়া এবং ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী বুক চেইন হিউজেন্ডুবেলের যৌথ বিক্রয় ও রেটিং চার্টে তাঁর বইগুলো শীর্ষ তিনটি অবস্থানের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের অন্তত ৭৫টি দেশে হার্ডকভার, পেপারব্যাক ও ই-বুক সংস্করণে তাঁর বইগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে বিতরণ করা হচ্ছে। তাঁর প্রকাশিত ২৬টিরও বেশি গ্রন্থের মধ্যে ১৪টি ইংরেজি সংস্করণ রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত 'থ্রিফটবুকস'সহ আন্তর্জাতিক লাইব্রেরিগুলোতে অফিসিয়াল ক্যাটালগভুক্ত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সমালোচকদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ও উদ্ধৃতি

রেজুয়ান আহম্মেদের বিশ্বমঞ্চে এই অভাবনীয় সাফল্যকে বিশ্বসাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সাহিত্য বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশ থেকে বিশ্বমঞ্চে এমন উত্থানকে তারা অভিহিত করছেন যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে। তাঁর লেখার গভীর সর্বজনীনতা নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ইউরোপীয় সাহিত্য সমালোচক ড. এলিনা রোমানোভা বলেন: "রেজুয়ান আহম্মেদ তাঁর গল্পে কোনো সুনির্দিষ্ট অঞ্চলের ভূগোল ব্যবহার করলেও, তাঁর ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক আর্তিটি সম্পূর্ণ বৈশ্বিক। যুদ্ধাবস্থার ভেতর মানুষের টিকে থাকার লড়াই ও অস্তিত্বের সংকটকে তিনি যেভাবে তুলে এনেছেন, তা সমকালীন বিশ্বসাহিত্যে বিরল। তিনি কেবল একজন গল্পকার নন, তিনি এই সময়ের মানবিক বিবেকের কণ্ঠস্বর।"

অনুরূপভাবে, ব্রিটিশ লিটারারি রিভিউয়ের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মার্কাস ডেনিস তাঁর এক কলামে লিখেছেন:

"আহম্মেদের আখ্যানে এক ধরনের সম্মোহনী শক্তি রয়েছে। 'দ্য শ্যাডো অব ওয়ার' পড়তে গিয়ে পাঠক কেবল একটি যুদ্ধক্ষেত্রের বিবরণ পায় না, বরং যুদ্ধের করাল গ্রাসে একজন মানুষের চূর্ণ-বিচূর্ণ মনস্তত্ত্বের মুখোমুখি হয়। তাঁর গভীর মননশীল লেখার স্টাইল সমকালীন কথাসাহিত্যকে এক নতুন দর্শন দিয়েছে।"

আন্তর্জাতিক রেটিং ও চমৎকার রিভিউ

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পাঠকদের প্ল্যাটফর্ম এবং বুক রিভিউ পোর্টালগুলোতে রেজুয়ান আহম্মেদের বইগুলো রেকর্ড সংখ্যক ইতিবাচক রেটিং পাচ্ছে।

গ্লোবাল রিডার্স চয়েসে দেখা যাচ্ছে, গুডরিডস এবং আমাজন ডটকমে তাঁর সাড়াজাগানো মনস্তাত্ত্বিক বই 'উই আর অল ম্যাড' ৫-এর মধ্যে ৪.৮ রেটিং ধরে রেখেছে, যা এই ঘরানার বইয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সম্মানজনক।

আন্তর্জাতিক বুক রিভিউ ফোরাম তাঁর 'দ্য ১৬০ টাকা ড্রিম' এবং 'ইন দ্য ল্যান্ড অব মিরাজেস' বইগুলোকে "প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর" হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সমালোচকদের মতে, গভীর দারিদ্র্য এবং মানুষের অবদমিত স্বপ্নের এমন নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত চিত্রায়ন বিশ্বপাঠককে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।

তাঁর বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রবন্ধ গ্রন্থ 'ইওর অ্যাটেনশন ইজ ইওর গ্রেটেস্ট পাওয়ার' বইটিকে একাডেমিক ও মননশীল পাঠকমহল বর্তমান ডিজিটাল যুগের অবক্ষয় রোধে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও চিন্তাশীল কাজ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে।

নীরব সাধনা থেকে বিশ্বমঞ্চের মাইলফলক

১৯৯৬ সালে সাহিত্যযাত্রা শুরু করার পর থেকে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে রেজুয়ান আহম্মেদ সস্তা খ্যাতি কিংবা মূলধারার মিডিয়ার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে রেখেছেন। তাঁর দীর্ঘদিনের সাহিত্যিক দর্শন "সত্যিকারের সাহিত্য নিজের আলোয় নিজেই দীপ্ত" আজ বিশ্বমঞ্চে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। সমকালীন বিশ্বরাজনীতি, মানুষের বাস্তুচ্যুতির হাহাকার এবং সামাজিক সংকটের এই যুগে রেজুয়ান আহম্মেদ বিশ্বপাঠকদের কাছে এক নৈতিক ভাষ্যকার ও মানবিক কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে তাঁর এই অভাবনীয় ও যুগান্তকারী সাফল্য সমকালীন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর