img

কিশোরগঞ্জে জমে উঠেছে পাঁচ শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট

প্রকাশিত :  ১৭:২৯, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫

কিশোরগঞ্জে জমে উঠেছে পাঁচ শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট

সংগ্রাম দত্ত: শারদীয় দুর্গাপূজা সামনে রেখে কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলায় জমে উঠেছে প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট। একে ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশে ভিড় করছেন দর্শনার্থী, পূজা উদ্যোক্তা ও ঢাকির দলগুলো। ঢাকের তালে তালে কাঁসর, সানাই, বাঁশি আর করতালের মাদকতাময় সুরে মুখরিত হয়ে উঠেছে কটিয়াদীর পুরান বাজার এলাকা।

ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা

প্রতিবছর দুর্গাপূজা শুরুর আগের দুই দিনব্যাপী এ হাট বসে কটিয়াদী পৌর এলাকার প্রেসক্লাব সংলগ্ন পুরাতন বাজারে। এ বছর শুক্রবার (২৬ সেপ্টেম্বর) থেকে শুরু হওয়া হাট চলবে শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাত পর্যন্ত। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দলবল নিয়ে হাজির হয়েছেন ঢাকিরা। বাজনার ঝংকারে তারা যেন দর্শকদের কাছে উৎসবের আনন্দ আগাম পৌঁছে দিচ্ছেন।

ঢাকিদের নাচ–গান ও দাম

ঢাকিরা শুধু বাজনাই নয়, সাথে নিয়ে আসেন ঢোল, কাঁসর, সানাই, খঞ্জরি ও বাঁশি। তারা দলবদ্ধভাবে নেচে–গেয়ে নিজেদের দক্ষতা প্রদর্শন করেন। পূজা আয়োজকরা মন ভরে শুনে সেরা দল বেছে নেন। দাম উঠছে ৩০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে এক লাখ টাকারও বেশি। পরে দর–কষাকষি শেষে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ঢাকিদের দল পূজামণ্ডপের উদ্দেশে রওনা দেয়।

ইতিহাসের গল্প

জনশ্রুতি রয়েছে, ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে কটিয়াদীর চারিপাড়া গ্রামে সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায় দুর্গাপূজা উপলক্ষে ঢাকিদের সমাবেশ ঘটান। ঢাকার বিক্রমপুর পরগনার (বর্তমান মুন্সিগঞ্জ) ঢাকিদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি নৌপথে তাদের যাত্রাঘাটে একত্র করেন। সেখানে রাজা নিজে দাঁড়িয়ে ঢাকের বাজনা শোনেন এবং সেরা দলকে পুরস্কৃত করেন। সেই আয়োজন থেকেই যাত্রাঘাটে ঢাকের হাটের সূচনা। পরে এ হাট স্থানান্তরিত হয়ে কটিয়াদীর পুরান বাজারে বসতে শুরু করে এবং আজও তা ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে।

উৎসবমুখর পরিবেশ

আয়োজকরা জানান, দেশের একমাত্র ঢাকের হাট এটি। পুলিশ প্রশাসন ঢাকিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। উৎসবপ্রেমী মানুষদের পদচারণায় এবং ঢাকির দলগুলোর তালে–তালে পুরো কটিয়াদী এখন আনন্দঘন পরিবেশে ভাসছে।

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর

img

গাজার দিনলিপি, মানবতার ভাষ্য

প্রকাশিত :  ১৮:২৮, ০৫ মার্চ ২০২৬

‘দ্য ডেইজ অব গাজা’ নিয়ে মুখোমুখি রেজুয়ান আহম্মেদ

ড. নাজমুল ইসলাম 

যুদ্ধের খবর প্রতিদিনই আসে—সংখ্যায়, পরিসংখ্যানে, কূটনৈতিক বিবৃতিতে। কিন্তু সেই সব সংখ্যার আড়ালে যে মানুষ, যে শিশু, যে মা—তাদের গল্প কতটা শোনা যায়? এই প্রশ্ন থেকেই কথাসাহিত্যিক রেজুয়ান আহম্মেদের সাম্প্রতিক গ্রন্থ ‘দ্য ডেইজ অব গাজা’-এর জন্ম। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বইটির প্রেরণা, নির্মাণপ্রক্রিয়া ও বার্তা নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।

বইটি লেখার পেছনের কারণ জানতে চাইলে রেজুয়ান আহম্মেদ বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক অবস্থান থেকে লেখা নয়। “গাজার শিশুদের চোখে যে আতঙ্ক, মায়েদের চোখে যে অপেক্ষা, আর ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকেও বেঁচে থাকার যে অদম্য ইচ্ছা—সেই মানবিক গল্পগুলো আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। আমি চেয়েছি যুদ্ধের পরিসংখ্যান নয়, মানুষের অনুভূতির ইতিহাস লিখতে।”

লেখকের ভাষায়, সংবাদ তাৎক্ষণিক; কিন্তু সাহিত্য দীর্ঘস্থায়ী। সংবাদ জানায় কী ঘটেছে, সাহিত্য অনুভব করায় কেন তা আমাদের ভাবায়।

‘দ্য ডেইজ অব গাজা’—নামের ভেতরেই যেন এক দীর্ঘ সময়ের সঞ্চিত বেদনা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “‘ডেইজ’ মানে দিনগুলো। কিন্তু এখানে প্রতিটি দিন এক-একটি দীর্ঘ ইতিহাস। প্রতিটি সকাল অনিশ্চয়তার, প্রতিটি রাত বেঁচে থাকার সংগ্রামের। গাজার দিনগুলো কেবল সংবাদ শিরোনাম নয়; এগুলো মানুষের জীবন, স্বপ্ন আর অশ্রুর দিনলিপি।” এই বক্তব্যেই বোঝা যায়, বইটি ঘটনাপঞ্জি নয়; বরং এক মানবিক দলিল।

বইটি পুরোপুরি বাস্তব ঘটনার ওপর নির্ভরশীল কিনা—এ প্রশ্নে রেজুয়ান আহম্মেদ জানান, এটি গবেষণা, সংবাদ ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বর্ণনার সঙ্গে সাহিত্যিক কল্পনার মিশ্রণে তৈরি। “সাহিত্যের কাজ কেবল তথ্য দেওয়া নয়, অনুভব করানো,”—বলেছেন তিনি। বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়েই তিনি চরিত্র নির্মাণ করেছেন, যাতে পাঠক কেবল পড়েন না, ভেতরে ভেতরে অংশ হয়ে ওঠেন।

লিখতে গিয়ে আবেগের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে বলেও জানান তিনি। “অনেক সময় লিখতে গিয়ে থেমে যেতে হয়েছে। কিছু অধ্যায় লেখার সময় চোখ ভিজে গেছে। কিন্তু আমি থামিনি। কারণ কেউ না কেউ তো এই গল্পগুলো বলবেই। যদি আমার কলম সেই কণ্ঠ হতে পারে, সেটাই আমার সার্থকতা।” এই স্বীকারোক্তি বইটির আবেগঘন ভেতরকার সুরকে স্পষ্ট করে।

বর্তমান প্রজন্মের উদ্দেশে লেখকের বার্তা—“মানবতা কখনো পরাজিত হয় না। পৃথিবীর যে প্রান্তেই অন্যায় হোক না কেন, আমাদের বিবেককে জাগ্রত রাখতে হবে। সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ এবং ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।” দ্রুত তথ্যপ্রবাহের যুগে ঘটনাকে দ্রুত ভুলে যাওয়ার প্রবণতার বিপরীতে সাহিত্যকে তিনি দেখেন স্মৃতি ও বিবেকের ধারক হিসেবে।

সাক্ষাৎকারের শেষপ্রান্তে রেজুয়ান আহম্মেদ বলেন, “বইটি পড়ুন খোলা হৃদয়ে। এটি কোনো পক্ষ নেওয়ার বই নয়; এটি মানুষকে অনুভব করার বই। যদি পাঠক একটি মুহূর্তের জন্যও গাজার কোনো শিশুর চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখতে পারেন, তবে আমার লেখা সফল।”

সমাপনী বক্তব্যে তিনি যোগ করেন, “সাহিত্যের শক্তি বন্দুকের চেয়ে বড়। শব্দের শক্তি ধ্বংস নয়, সৃষ্টি করে। ‘দ্য ডেইজ অব গাজা’ সেই সৃষ্টির একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা—মানবতার পক্ষে, জীবনের পক্ষে।”

যুদ্ধের কোলাহলের ভেতরেও মানবতার যে ক্ষীণ কিন্তু স্থায়ী সুর, এই বই যেন সেই সুরকেই শব্দে রূপ দেওয়ার চেষ্টা।