img

আত্মবিশ্বাসের পুনর্জাগরণ

প্রকাশিত :  ০৯:২৬, ০১ অক্টোবর ২০২৫

আত্মবিশ্বাসের পুনর্জাগরণ


\"✍️\" রেজুয়ান আহম্মেদ
রাত দশটা। ঢাকার বেইলি রোডের ছোট্ট এক পুরনো ফ্ল্যাটে গভীর নিস্তব্ধতা। রাফি বসে আছে তার ছোট্ট ঘরে। টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে আছে কয়েকটি আবেদনপত্রের অনুলিপি, কিছু অমীমাংসিত বিল, আর ল্যাপটপের সেই ফাঁকা ইনবক্স—যেখানে প্রতি মুহূর্তে সে যেন এক অনিবার্য ঘোষণার অপেক্ষায়: “আপনার আবেদন গৃহীত হয়নি।”
বছরখানেক আগেও জীবনটা চলছিল অন্য ছন্দে। বহুজাতিক সংস্থায় মিড-লেভেল ম্যানেজার রাফি—সম্মানজনক বেতন, কর্মব্যস্ত দিন আর সহকর্মীদের উষ্ণ আড্ডা—সব মিলিয়ে জীবন চলছিল মসৃণ গতিতে। হঠাৎ একদিন কোম্পানির আর্থিক সংকটের অজুহাতে চাকরি চলে গেল। সেই দিনটিই যেন তার জীবন থেকে প্রধান চালিকাশক্তি ছিনিয়ে নিল।
রাফি খাটে হেলান দিয়ে জানালার বাইরে তাকায়। মৃদু হাওয়া বইছে, তবু বুকের ভেতরটা ভারী, শ্বাসরুদ্ধ। মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত গতি, সমস্ত শব্দ তার জন্য থমকে গেছে। ভেতরের এক শূন্যতা তাকে ধীরে ধীরে গিলে খাচ্ছে।
— “আমি কী ভুল করলাম? এত পরিশ্রম, এত সময় দিলাম, তবু কেন?” প্রশ্নগুলো মস্তিষ্কে বারবার আছড়ে পড়ছে।
পাশের ঘরে স্ত্রী মিতু চুপচাপ বসে আছেন। ঘরের প্রতিটি কোণ যেন এই ভারী পরিবেশের নীরব সাক্ষী। সন্তানের স্কুলের ফি, মাসের ভাড়া, বাজারের খরচ—সংসারের এই বোঝা প্রতিদিন আরও বেশি করে চেপে বসছে।
রাফি একসময়ে উঠে দাঁড়াল। বুকের অস্থিরতায় ঘরের মধ্যে পায়চারি শুরু করল। ক্রমেই মনে হচ্ছে, নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ তার মুঠো থেকে ফসকে যাচ্ছে।
সে আপন মনে বিড়বিড় করে—
— “আমার মতো অভিজ্ঞ মানুষ যদি কাজ না পায়, তবে আমার কি আদৌ কোনো মূল্য আছে?”
এই প্রশ্নটাই তার ভেতরের সেই সমালোচকের কণ্ঠস্বর, যে কোনোভাবেই থামে না। যে ফিসফিস করে বলে: “তুমি ব্যর্থ, তুমি অক্ষম, তোমার চেষ্টা কোনোদিন ফল দেবে না।” এ যেন তার ভেতরে জন্ম নেওয়া এক অদৃশ্য শত্রু।
ফোনে এল পুরোনো সহকর্মীর ফেসবুক নোটিফিকেশন—নতুন চাকরির ছবি, অফিস ট্যুর, প্রাণবন্ত হাসি। রাফি ফোনটা নামিয়ে রাখল। বুক চিরে ঈর্ষা, হীনমন্যতা আর গভীর হতাশা এক অদ্ভুত যন্ত্রণার জন্ম দিল।
— “আমার জীবনটা এমন হতে পারত না? আমি কেন পিছিয়ে গেলাম?” আক্ষেপ তার কণ্ঠনালী চেপে ধরল।
ঘরের ঘড়ি সেকেন্ড গুনছে। অথচ রাফির কাছে সময় যেন স্থবির। এই দুশ্চিন্তা তাকে অতীত আর ভবিষ্যতের মাঝে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে। মনে হয়—“আগেরবার ঠিকমতো পারফর্ম করিনি বলেই চাকরি গেছে।” সেই অপরাধবোধের পাশে জন্ম নেয় ভবিষ্যতের ভয়—“নিশ্চয়ই আর কিছু হবে না, আমি আর উঠে দাঁড়াতে পারব না।”
বর্তমান তার কাছে এক অচেনা, শূন্য গহ্বর।
বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে পরিবারের চিন্তিত মুখ। মেয়ে একদিন স্কুল থেকে ফিরে বলেছিল, “আব্বু, তুমি এখন অফিসে যাও না কেন?” সে কোনো উত্তর দিতে পারেনি; বুকের ভেতর হাহাকার জমে উঠেছিল। আজও সেই প্রশ্ন যেন তাকে বিঁধে যায়। এক অদ্ভুত অসহায়তা—তার সমস্ত শ্রম, সমস্ত সামর্থ্য যেন এক অচল দেয়ালের সামনে মুখ থুবড়ে পড়েছে।
অন্ধকার এভাবেই তার জীবনে ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে। কাল পর্যন্ত যে পৃথিবী তার হাতের মুঠোয় ছিল, আজ মনে হচ্ছে—সে নিজেই পৃথিবীর কাছে অসহায়।
সকালের আলো জানালার ফাঁক গলে ঘরে ঢুকলেও রাফির চোখে কোনো দীপ্তি নেই। ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে, কিন্তু তার জীবনের কাঁটা যেন থেমে আছে। অফিসের সহকর্মীরা হয়তো এখন সাপ্তাহিক মিটিংয়ে ব্যস্ত, নতুন প্রজেক্টের পরিকল্পনা করছে, কেউবা কফি কর্নারে আড্ডা দিচ্ছে। আর রাফি?
সে ফ্ল্যাটের ছোট্ট টেবিলে বসে আছে, যেখানে ঠাণ্ডা ভাত-ডাল পড়ে আছে। মিতু নিরব দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। কথার বদলে তার চোখে এখন অভিযোগের ক্লান্তি। সংসারের হিসেব প্রতিদিনই এক অমীমাংসিত প্রশ্ন হয়ে আসে।
— “তুমি আবার কবে চেষ্টা করবে? এতগুলো আবেদন করলে, কিন্তু কোনো খবর তো আসছে না…” মিতুর কণ্ঠে কোনো আক্রোশ নেই, আছে শুধু আশা হারানোর নিস্তেজতা।
রাফি নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে। একসময়ের প্রাণবন্ত মানুষটা এখন জবাব দিতে চায় না। ভেতরের কণ্ঠস্বরই উত্তর দেয়: “আমি কি আদৌ কিছু করতে পারি? আমার সব চেষ্টা কি বৃথা?”
কর্মপরিচয়—যা ছিল তার গর্ব, শক্তি, আত্মমর্যাদার ভিত্তি—আজ সেটাই ভেঙে পড়েছে। গতকাল পর্যন্ত যাদের সামনে মাথা উঁচু করে বলত, “আমি অমুক প্রতিষ্ঠানে কাজ করি,” আজ তাদের চোখে চোখ রাখার সাহস নেই।
বন্ধুরা ফোন করলে রাফি সত্যিটা বলতে পারে না। মুখে হাসি টেনে বলে, “ভালো আছি, নতুন কিছু খুঁজছি।” কিন্তু ফোন কেটে দেওয়ার পর নিজেকে ভাঙা আয়নার মতো মনে হয়—যেখানে মুখোশের আড়ালে শুধু ভাঙাচোরা টুকরো দেখা যায়।
একদিন পুরোনো সহকর্মীর সঙ্গে রাস্তায় হঠাৎ দেখা। সে উজ্জ্বল মুখে বলল, “দোস্ত, আমার পদোন্নতি হয়েছে! এখন আমি টিম লিডার!” রাফির ঠোঁট কেঁপে উঠল, জোর করে অভিনন্দন জানাল। কিন্তু মনে হলো, কেউ যেন বুকের ভেতর ছুরি বসিয়ে দিল। সেই মুহূর্তে সে বুঝল—সে কেবল চাকরি হারায়নি, হারিয়েছে সামাজিক অবস্থান, সম্মান আর আত্মবিশ্বাসের স্তম্ভ।
সেই শীতল এক সকালে রাফি জানালার পর্দা সরাল। বাইরে নরম রোদ ঝলমল করছে। অনেক দিন পর মনে হলো—এই আলো কেবল পৃথিবীর জন্য নয়, তার ভেতরেও এক নতুন সকাল এসেছে।
চা খেতে খেতে ল্যাপটপ খুলল, চাকরির বিজ্ঞাপন দেখতে লাগল। কিন্তু আজ তার ভঙ্গি ভিন্ন। প্রতিটি ব্যর্থতা যা আগে তাকে আঘাত করত, আজ সে নিজেকে বলল: “হয়তো এটাতে হবে না, কিন্তু অন্য কোথাও নিশ্চয়ই দরজা খুলবে। আমি চেষ্টা চালিয়ে যাব।”
সে ভাবল, কেন জীবনের নিয়ন্ত্রণ কেবল একটি চাকরির হাতে তুলে দেবে? কেন নতুন কিছু শুরু করবে না? মনে পড়ল, বিশ্ববিদ্যালয়ে সে বন্ধুদের নিয়ে ছোট্ট টিউশনি সেন্টার চালাত। তার সাংগঠনিক দক্ষতার সবাই প্রশংসা করত। সেই দক্ষতাকে আবার কাজে লাগাবে না কেন?
রাফি একটি খাতা বের করল। নিজের পরিকল্পনা লিখতে শুরু করল—
১. নতুন চাকরির চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
২. পাশাপাশি তরুণদের জন্য অনলাইনে ইংরেজি ও আইটির একটি কোর্স শুরু করা।
৩. প্রতিদিন অন্তত আধঘণ্টা আত্ম-অনুশীলন—ধ্যান, আত্ম-সহানুভূতির চর্চা।
মিতু খাতার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, “এই তো! তোমাকে আবার আগের রাফির মতো লাগছে।”
তার চোখে ভরসার আলো, যা রাফির ভেতরে সাহস জোগাল।
কয়েকদিন পর রাফি সোশ্যাল মিডিয়ায় কোর্সের বিজ্ঞাপন দিল। অবাক হয়ে দেখল, অনেকেই যোগাযোগ করেছে। প্রথম ক্লাসের দিন বুক ধড়ফড় করলেও ছাত্রদের আগ্রহ দেখে মনে হলো—হ্যাঁ, সে এখনও কিছু দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
প্রথম ক্লাস শেষ হতেই ভেতর এক অদ্ভুত আনন্দ বয়ে গেল। মনে হলো, সে এখনও জীবনের খেলায় অংশ নিচ্ছে, হারিয়ে যায়নি।
সন্ধ্যায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাফি আকাশের দিকে তাকাল। দীর্ঘদিন যে চাঁদকে নিঃসঙ্গতার প্রতীক মনে করত, আজ তা আশার প্রতীক হয়ে উঠল।
সে মনে মনে বলল: “হয়তো আমি আগের চাকরির মানুষ নই। হয়তো জীবনটা অন্য পথে আমাকে ডাকছে। কিন্তু আমি ভেঙে পড়িনি, আমি আবার দাঁড়াতে শিখেছি। আর এটাই আমার সত্যিকারের জয়।”
মেয়ে দৌড়ে এসে হাত ধরল। “আব্বু, তুমি আবার হাসছো কেন?”
রাফি মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “কারণ আমি নতুন করে শুরু করেছি।”
সেদিন রাতে শোয়ার সময় তার ভেতরের সমালোচকের কণ্ঠস্বর যেন সম্পূর্ণ নীরব। জায়গা করে নিয়েছিল এক নতুন, শান্ত কণ্ঠ: “তুমি যথেষ্ট। তুমি হেরে যাওনি, তুমি শিখছো। আর এই শিক্ষাই তোমার জয়।”
এভাবেই অন্ধকারের ভেতর থেকে জন্ম নিল এক নতুন রাফি—যিনি আর কেবল হারানো চাকরির পরিচয়ে আটকে নেই, বরং নিজের ভেতরের আলোয় নতুন এক যাত্রা শুরু করেছেন।
-সমাপ্ত-
img

সময়, সমাজ ও মানুষের গল্পের লেখক রেজুয়ান আহম্মেদ

প্রকাশিত :  ১৮:৫২, ২৪ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:০২, ২৪ জুন ২০২৬

তিন দশকের সাহিত্যচর্চায় গড়ে উঠেছে একটি স্বতন্ত্র চিন্তার জগৎ

✍️ ড. ইমরান ইলাহী 

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রতিটি সময়েই এমন কিছু লেখকের আবির্ভাব ঘটে, যাঁরা কেবল গল্প বা উপন্যাস রচনা করেন না; বরং নিজেদের সময়কে ধারণ করেন, সমাজের পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করেন এবং মানুষের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন। সমকালীন বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে রেজুয়ান আহম্মেদ তেমনই একজন লেখক, কবি, গীতিকার, চিন্তাবিদ ও কলামিস্ট, যাঁর সাহিত্যচর্চা, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং সামাজিক-রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ দীর্ঘদিন ধরে পাঠকমহলে আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ থেকেই তাঁর লেখালেখির যাত্রা শুরু। সময়ের পরিক্রমায় তিনি বিস্তৃত পাঠকসমাজের কাছে একজন সুপরিচিত সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, গান, প্রবন্ধ, গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ এবং সমসাময়িক নানা বিষয়ে কলাম লেখার মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজস্ব সাহিত্যিক পরিচয়।

সাহিত্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, রেজুয়ান আহম্মেদের লেখার প্রধান শক্তি হলো মানুষের মনোজগতের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ। সমাজের পরিবর্তন, ব্যক্তির সংকট, মূল্যবোধের বিবর্তন এবং সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁর লেখায় এমনভাবে উঠে আসে, যা পাঠককে শুধু বিনোদিতই করে না; বরং গভীরভাবে চিন্তা করতেও উদ্বুদ্ধ করে।

রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যচর্চার সূচনা তরুণ বয়সেই। বইপড়া, সমাজপর্যবেক্ষণ এবং মানুষের জীবনসংগ্রামের নানা গল্প তাঁকে লেখালেখির প্রতি আকৃষ্ট করে। প্রথম দিকে তিনি ছোটগল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ লিখলেও পরবর্তীকালে উপন্যাস, গবেষণামূলক রচনা এবং বিশ্লেষণধর্মী কলামের মাধ্যমে নিজের সাহিত্যকর্মের পরিধি বিস্তৃত করেন।

তাঁর সমসাময়িকদের মতে, সাহিত্যকে তিনি কখনোই নিছক কল্পনার জগৎ হিসেবে দেখেননি। বরং সাহিত্যকে তিনি বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি এবং সামাজিক পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন তাঁর প্রায় সব লেখাতেই দেখা যায়। তাঁর গল্পের চরিত্রগুলো বাস্তব জীবনের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে; তাঁদের আনন্দ, বেদনা, স্বপ্ন ও সংগ্রাম বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

বাংলা সাহিত্যে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণধর্মী লেখার একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। তবে সমসাময়িক সময়ে এই ধারাকে নতুন মাত্রায় উপস্থাপনের ক্ষেত্রে রেজুয়ান আহম্মেদের অবদান উল্লেখযোগ্য বলে মনে করেন অনেক সাহিত্যবোদ্ধা।

তাঁর লেখায় মানুষের অদৃশ্য ভয়, আত্মপরিচয়ের সংকট, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং মানসিক দ্বন্দ্ব গভীরভাবে ফুটে ওঠে। তিনি বিশ্বাস করেন, সমাজকে বোঝার আগে মানুষকে বুঝতে হবে; আর মানুষকে বুঝতে হলে তার মনোজগতকে অনুধাবন করতে হবে।

এ কারণেই তাঁর অনেক গল্প ও উপন্যাসে ঘটনাপ্রবাহের চেয়ে চরিত্রের মানসিক বিবর্তন অধিক গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অন্যতম বৃহৎ আয়োজন অমর একুশে বইমেলা। বছরের এই একটি মাসকে কেন্দ্র করে লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদের মধ্যে এক অনন্য সেতুবন্ধন গড়ে ওঠে।

রেজুয়ান আহম্মেদের নতুন বই প্রকাশের ক্ষেত্রেও বইমেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতি বছর তাঁর নতুন বই প্রকাশকে ঘিরে পাঠকদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ লক্ষ করা যায়।

প্রকাশনা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কথাসাহিত্য, সমাজবিশ্লেষণ এবং মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ভিত্তিক রচনার মাধ্যমে তিনি একটি বিশেষ পাঠকগোষ্ঠী গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। নতুন বই প্রকাশের পর পাঠকদের সঙ্গে মতবিনিময়, আলোচনা এবং সাহিত্য আড্ডায় তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে।

শুধু সাহিত্যিক হিসেবেই নয়, একজন চিন্তাবিদ হিসেবেও রেজুয়ান আহম্মেদ সুপরিচিত। সমসাময়িক বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণধর্মী কলাম পাঠকমহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

অর্থনীতি, শিক্ষা, রাজনীতি, সামাজিক মূল্যবোধ, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং বিশ্বপরিস্থিতি নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো জটিল বিষয়কে সহজ, সাবলীল ও প্রাঞ্জল ভাষায় ব্যাখ্যা করার দক্ষতা। ফলে সাধারণ পাঠকও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির পটভূমি ও প্রভাব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারেন।

বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বায়ন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জীবনধারায় আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে।

রেজুয়ান আহম্মেদ তাঁর লেখায় এসব পরিবর্তনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকই বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে মানবিক সম্পর্কের ওপর নতুন ধরনের চাপও সৃষ্টি করেছে।

তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধ, কবিতা ও গানে আধুনিক মানুষের একাকিত্ব, মানসিক চাপ এবং মূল্যবোধের পরিবর্তনের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

বর্তমান সময়ে পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখা সহজ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে দীর্ঘ লেখা পড়ার অভ্যাস ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। তবুও রেজুয়ান আহম্মেদের লেখার পাঠকদের মধ্যে তরুণদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। কারণ তিনি সমসাময়িক প্রজন্মের সমস্যা, সম্ভাবনা ও সংকটকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।

শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক পরিবর্তন, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন এবং ব্যক্তিগত স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতার সংঘাত—এসব বিষয় তাঁর লেখায় নিয়মিত ভাবে স্থান পায়।

রেজুয়ান আহম্মেদ নামটি নিয়ে অনেক সময় বিভ্রান্তি দেখা যায়। বিশেষ করে সাবেক সংসদ সদস্য রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক এবং পাকিস্তানি আমলা রিজওয়ান আহমেদের সঙ্গে নামের সাদৃশ্য থাকায় অনেকেই বিভ্রান্ত হন।

তবে সাহিত্য ও চিন্তাচর্চার জগতে রেজুয়ান আহম্মেদের পরিচয় সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তিনি মূলত লেখক, কবি, গীতিকার, গবেষক, চিন্তাবিদ ও কলামিস্ট হিসেবেই পরিচিত।

বাংলা সাহিত্য ও সমাজচিন্তার জগতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকা রেজুয়ান আহম্মেদ এখনো নিয়মিত লিখে চলেছেন। নতুন প্রজন্মের পাঠকদের সঙ্গে সংযোগ বজায় রেখে তিনি সাহিত্য ও চিন্তাচর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করার প্রয়াস অব্যাহত রেখেছেন।

সাহিত্যবোদ্ধাদের মতে, সময়, সমাজ এবং মানুষের মনোজগতকে একসঙ্গে ধারণ করার যে প্রয়াস তাঁর লেখায় দেখা যায়, সেটিই তাঁকে সমকালীন লেখকদের মধ্যে স্বতন্ত্র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।

বাংলা সাহিত্যের দীর্ঘ অভিযাত্রায় রেজুয়ান আহম্মেদের নাম হয়তো এমন একজন সাহিত্যস্রষ্টা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, যিনি মানুষের জন্য গল্প লিখেছেন, কবিতা রচনা করেছেন, গান সৃষ্টি করেছেন, সমাজকে নিয়ে ভেবেছেন এবং সময়ের সত্যকে ধারণ করার জন্য কলম ধরেছেন।

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর