img

নীল গ্রহের যাযাবর

প্রকাশিত :  ১৮:০৬, ১৪ জুন ২০২৬

নীল গ্রহের যাযাবর

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

মানব সভ্যতার দীর্ঘ পথচলায় ব্যক্তিগত ঐশ্বর্যের সংজ্ঞা যুগে যুগে রূপ বদলেছে। কখনো তা ছিল প্রাচীনকালের ভূস্বামীদের সীমাহীন জমিদারি, কখনো মধ্যযুগের রাজাদের রাজকীয় মণি-মাণিক্যখচিত মুকুট, আবার কখনো শিল্পবিপ্লবের যুগে কয়লা, তেল কিংবা রেলওয়ের টাইকুনদের গড়ে তোলা বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য। প্রতিটি যুগই তার নিজস্ব গতিতে পুঁজির সীমানাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। কিন্তু ২০২৬ সালের ১২ জুনের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন সোনালি সকালে ওয়াল স্ট্রিটের নাসড্যাক স্টক এক্সচেঞ্জে যখন ‘এসপিসিএক্স’ (SPCX) টিকারে স্পেসএক্সের লেনদেন শুরু হলো, তখন মানবজাতি এক নজিরবিহীন এবং কল্পনাতীত অর্থনৈতিক রূপান্তরের সাক্ষী হলো। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ার ধূলিময় ও তপ্ত রাস্তা থেকে উঠে আসা এক জেদি, অন্তর্মুখী ও স্বপ্নাতুর বালক সেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার বা লক্ষ কোটিপতি হিসেবে নিজের নাম ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করে নিলেন। ইলন রিভ মাস্কের এই ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার যাত্রাটি কোনো আকস্মিক ম্যাজিক ছিল না; বরং তা ছিল চরম ব্যক্তিগত ঝুঁকি, অবসেসিভ ইঞ্জিনিয়ারিং দর্শন এবং বৈশ্বিক পুঁজির এক অভূতপূর্ব স্থানান্তরের মহাকাব্যিক আখ্যান।

ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে যখনই কোনো অভূতপূর্ব রূপান্তর ঘটে, তার নেপথ্যে থাকে দশকের পর দশক ধরে সঞ্চিত এক অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক জ্বালানি। ইলনের ঝুঁকি নেওয়ার এই অদম্য প্রবণতা এবং প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর মানসিকতা কোনো আকস্মিক অর্জন নয়; এটি তাঁর রক্তে বয়ে চলা এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক উত্তরাধিকার। তাঁর মাতৃকূলের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, সেটি ছিল দুঃসাহসী অভিযাত্রী ও চরমপন্থী জীবনদর্শনে ভরপুর।

ইলন মাস্কের মাতামহ জশুয়া নরম্যান হ্যাল্ডেম্যান ছিলেন কানাডীয় বংশোদ্ভূত এক ভিন্নধর্মী কাইরোপ্র্যাক্টর। তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন মূলত সুইজারল্যান্ডের সিগনাউ নামের এক প্রত্যন্ত গ্রামের মেনোনাইট সম্প্রদায়ভুক্ত, যাঁরা অষ্টাদশ শতাব্দীতে ধর্মীয় নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে আসেন। জশুয়ার মা আলমেদা জেন হ্যাল্ডেম্যান ছিলেন কাইরোপ্র্যাক্টরের পেশায় যুক্ত থাকা কানাডার ইতিহাসের প্রথম নারী, যা নির্দেশ করে যে এই পরিবারের নারীরাও অত্যন্ত স্বাধীনচেতা ও ভিন্নধর্মী ছিলেন। ১৯০২ সালে মিনেসোটার পেকুয়াট লেকসে জন্মগ্রহণকারী জশুয়া মাত্র দুই বছর বয়সে তাঁর বাবাকে হারান। ১৯৩০-এর দশকের সেই ভয়াল অর্থনৈতিক মন্দা বা ‘ডার্টি থার্টিজ’-এর থাবায় যখন তাঁর সাজানো শস্যক্ষেত ধূলিসাৎ হয়ে যায়, তখন জীবনের তাগিদে তিনি কাউবয় এবং রডিও পারফর্মার হিসেবে কঠোর কায়িক শ্রম দিতে বাধ্য হন।

পরবর্তীকালে জশুয়া হ্যাল্ডেম্যান কানাডার বিখ্যাত টেকনোক্রেসি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, সমাজ ও রাষ্ট্র কোনো রাজনীতিবিদের দ্বারা নয়, বরং বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত। তবে তাঁর এই বৈজ্ঞানিক চেতনার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক উগ্র ও কট্টরপন্থী মনস্তত্ত্ব। তিনি তৎকালীন কট্টর বর্ণবাদী, ইহুদিবিরোধী ও গণতন্ত্রবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি প্রচারের জন্য পরিচিত ছিলেন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার আপারথাইড বা বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থাকে চরমভাবে সমর্থন করে বইও লিখেছিলেন। ১৯৪৮ সালে ৪৫ বছর বয়সে পাইলট লাইসেন্স অর্জন করার পর তিনি এবং তাঁর স্ত্রী উইন ফ্লেচার সপরিবারে উড়োজাহাজে করে বিশ্বভ্রমণে বের হন। ১৯৫০ সালে কানাডার তথাকথিত নৈতিক অবক্ষয়ের অজুহাতে তাঁরা নিজেদের প্রিয় বিমানটি কাঠের বাক্সে বন্দি করে সমুদ্রপথে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমান। সেখানে জশুয়ার সবচেয়ে বড় নেশা ছিল কালাহারি মরুভূমির হারিয়ে যাওয়া আদিম শহরের সন্ধান করা, যা মূলত ১৮৮৫ সালে কানাডীয় অভিযাত্রী গুইলারমো ফারিনির কাল্পনিক বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। ১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু করে প্রায় এক দশক ধরে জশুয়া হ্যাল্ডেম্যান তাঁর সন্তানদের—যার মধ্যে ইলনের মা মেয়ি মাস্কও ছিলেন—নিয়ে মরুভূমির মাত্র ২০০ ফুট ওপরে দিয়ে বিমান উড়িয়ে ১২টি বিপজ্জনক অভিযান পরিচালনা করেন। যদিও ১৯৬৪ সালে গবেষক এ. জে. ক্লিমেন্ট প্রমাণ করেন যে, ফারিনির আবিষ্কৃত তথাকথিত হারিয়ে যাওয়া শহরটি আসলে ১৮০ মিলিয়ন বছর পুরোনো ডোলোরাইট পাথরের প্রাকৃতিক স্তর মাত্র। কিন্তু জশুয়া হ্যাল্ডেম্যান আজীবন এই কাল্পনিক তত্ত্বকে সত্য বলে বিশ্বাস করে ১৯৭৪ সালে এক বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। তাঁর এই প্রথাভাঙা বৈপ্লবিক জেদ ও মরুমায়ার পেছনে ছুটে চলার দুঃসাহস ইলনের মনে মহাকাশ ও অজানাকে জয়ের প্রথম বীজ বুনে দিয়েছিল।

অন্যদিকে, ইলনের পৈত্রিক কূল ছিল ইংরেজ ও দক্ষিণ আফ্রিকান বংশোদ্ভূত। তাঁর পিতামহ ওয়াল্টার হেনরি জেমস মাস্ক ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক প্রবীণ সেনাসদস্য, যিনি মিশরে ব্রিটিশ সামরিক গোয়েন্দা ইউনিটের একজন ক্রিপ্টোগ্রাফার বা সংকেত বিশ্লেষক হিসেবে সূক্ষ্ম গাণিতিক ও প্রযুক্তিগত শৃঙ্খলার সাথে কাজ করেছিলেন। ওয়াল্টারের স্ত্রী কোরা অ্যামেলিয়া রবিনসনের আদি বাড়ি ছিল ইংল্যান্ডের লিভারপুলে। তাঁদের সন্তান এরল গ্রাহাম মাস্ক ১৯৪৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে দক্ষিণ আফ্রিকার একজন অত্যন্ত ধনাঢ্য ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, বৈমানিক, নাবিক ও রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার হিসেবে আবির্ভূত হন। এরলের প্রকৌশল ব্যবসাটি প্রিটোরিয়ার বড় বড় অফিস কমপ্লেক্স ও শপিংমল নির্মাণের বিশাল প্রকল্প পরিচালনা করত এবং তিনি জাম্বিয়ার তিনটি ছোট পান্না খনির অংশীদারিত্বের মালিক ছিলেন। এরল ১৯৭০ সালে বিয়ে করেন মেয়ি হ্যাল্ডেম্যানকে, যিনি ছিলেন একাধারে কানাডীয় মডেল ও পুষ্টিবিদ। ১৯৭৯ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদের সময় এরল মাস্ক প্রিটোরিয়ার সবচেয়ে বড় বিলাসবহুল বাড়ি, ইয়ট, ব্যক্তিগত বিমান এবং একাধিক দামি গাড়ির মালিক ছিলেন। পরবর্তীতে ৪৫ বছর বয়সে এরল তাঁর সৎ মেয়ে জানা বেজুইডেনহাউটের সাথে সম্পর্কের মতো এক চরম বিতর্কিত পারিবারিক কেলেঙ্কারির জন্ম দেন। অন্যদিকে, ইলনের মা মেয়ি মাস্ক হ্যাল্ডেম্যান প্রায় ৫০ বছর ধরে ফ্যাশন জগতে নিজের আধিপত্য ধরে রাখেন এবং কভারগার্ল ক্যাম্পেইনের সবচেয়ে বয়স্ক মডেল হিসেবে ইতিহাস গড়েন।

ইলন রিভ মাস্ক ১৯৭১ সালের ২৮ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রশাসনিক রাজধানী প্রিটোরিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তিনি তাঁর ভাই কিম্বাল ও বোন টসকা মাস্কের সাথে অত্যন্ত ধনী ও সুরক্ষিত পরিবেশে বড় হতে থাকেন। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক পটভূমি ছিল চরম অস্থিতিশীল। ১৯৮০-এর দশকে যখন প্রিটোরিয়ার ওয়াটারক্লুফের মতো বিলাসবহুল, বেগুনি জ্যাকারান্ডা ফুলে ঘেরা শহরতলিতে শ্বেতাঙ্গরা নিরাপদ ও ঐশ্বর্যময় জীবন যাপন করছিল, তখনই কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ জনপদগুলো বিপ্লবের আগুনে জ্বলছিল। ইলন মাস্ক এই বিলাসবহুল কিন্তু কৃত্রিমভাবে বিভক্ত সমাজে প্রিটোরিয়া বয়েজ হাই স্কুলের একজন দিবাছাত্র হিসেবে পড়াশোনা শুরু করেন।

এই বাহ্যিক সুরক্ষার পেছনে ইলনের ব্যক্তিগত জীবন ছিল চরম ট্রমা ও নির্যাতনে ভরা। ১৯৭৯ সালে বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের পর নয় বছর বয়সী ইলন তাঁর বাবার সাথে থাকার সিদ্ধান্ত নেন, কারণ এরলের কাছে একটি সম্পূর্ণ এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা সেট ও একটি আদিম কম্পিউটার ছিল। এই সিদ্ধান্তটি ইলনের জীবনের সবচেয়ে বড় মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শৈশবে ইলন ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, অন্তর্মুখী ও বইপোকা। প্রায়শই তিনি নিজের ভাবনার জগতে এতটাই হারিয়ে যেতেন যে, তাঁর শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করার জন্য চিকিৎসকদের মাধ্যমে কানের অস্ত্রোপচারের কথা ভাবতে হয়েছিল।

সহপাঠীদের কাছে তিনি ছিলেন এক সহজ লক্ষ্য। ইলন পরবর্তীতে দক্ষিণ আফ্রিকার সেই চরমপন্থী বন্য স্কুল বা ‘ভেল্ডস্কুল’-এর ভয়াবহ স্মৃতির কথা উল্লেখ করেন, যা ছিল মূলত উইলিয়াম গোল্ডিংয়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘লর্ড অফ দ্য ফ্লাইজ’-এর মতো এক আদিম রূঢ় বাস্তব। মাত্র ১২ বছর বয়সে সেই ক্যাম্পে ইলন ছিলেন অত্যন্ত দুর্বল ও লাজুক, যেখানে তাঁকে নির্মমভাবে মারধর করা হয় এবং রেশনের খাবারের জন্য অন্য ছেলেদের সাথে মারামারি করতে হতো।

পরবর্তীতে ব্রায়ানস্টন হাই স্কুলে পড়ার সময় তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ ট্র্যাজেডিটি ঘটে। এক দুপুরে ইলন ও কিম্বাল স্কুলের কংক্রিটের সিঁড়ির চূড়ায় বসে স্যান্ডউইচ খাচ্ছিলেন। এমন সময় এক সহপাঠী পেছন থেকে এসে আচমকা ইলনের মাথায় লাথি মারে এবং তাঁকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। সিঁড়ির ধারালো ধাপে আঘাত খেতে খেতে ইলন যখন নিচে আছড়ে পড়েন, তখন একদল উগ্র কিশোর তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের দলপতি ইলনের মাথা ধরে সজোরে কংক্রিটের মেঝেতে আছড়াতে থাকে। কিম্বাল মাস্ক পরবর্তীতে স্মৃতিচারণ করে বলেন, যখন মারধর শেষ হলো, তখন ইলনের মুখমণ্ডল রক্ত আর মাংসের এমন এক ফোলা পিণ্ডে পরিণত হয়েছিল যে চোখ দুটো প্রায় দেখা যাচ্ছিল না। জ্ঞানহীন ইলনকে দ্রুত স্যান্ডটনের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে তাঁকে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় চিকিৎসাধীন থাকতে হয়েছিল এবং নাকের ভেতরের টিস্যু মেরামতের জন্য কয়েক দশক ধরে অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছিল।

শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও ভয়াবহ ছিল পারিবারিক মানসিক নির্যাতন। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর এরল মাস্ক তাঁর রক্তাক্ত সন্তানকে সান্ত্বনা দেওয়ার বদলে টানা এক ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখে তীব্র গালিগালাজ ও তিরস্কার করেন। এরলের দাবি ছিল, ইলন নিজেই সেই ছেলেটিকে ‘স্টুপিড’ বলে ডেকেছিলেন, যার বাবা মাত্র কয়েক দিন আগে আত্মহত্যা করেছিলেন। এরল তাঁর ছেলেদের জন্য এক চরম নির্মম ও কঠোর একনায়কতন্ত্র কায়েম করেছিলেন, যা ইলনকে জীবনের প্রতি পদে এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। এই সহিংসতা ও অবহেলা থেকে বাঁচতে ইলন কোডিং ও কল্পবিজ্ঞান বইয়ের জগতে আশ্রয় খোঁজেন। মাত্র ১০ বছর বয়সে কমোডোর ভিআইসি-২০ ম্যানুয়াল দেখে নিজে নিজে কোডিং শিখে ১২ বছর বয়সে তিনি ‘ব্লাস্টার’ (Blastar) নামের একটি স্পেস শুটার ভিডিও গেম তৈরি করেন এবং সেটি একটি প্রযুক্তি ম্যাগাজিনের কাছে ৫০০ ডলারে বিক্রি করেন। পনেরো বছর বয়সে পৌঁছে তিনি বডিবিল্ডিং, কুস্তি ও কারাতে শিখে নিজের শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি করেন এবং অবশেষে ১৬ বছর বয়সে এক সহপাঠী উত্ত্যক্তকারীকে সজোরে নাকে ঘুষি মেরে নিজের ওপর চলা দীর্ঘদিনের বুলিংয়ের অবসান ঘটান।

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদান এড়ানো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগের কাছাকাছি পৌঁছানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে ইলন সতেরো বছর বয়সে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর মা কানাডীয় হওয়ায় তিনি খুব সহজেই কানাডার পাসপোর্ট পেয়ে যান এবং ১৯৮৯ সালের জুন মাসে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা ত্যাগ করেন। কানাডায় পৌঁছে প্রথম বছরগুলোতে তাঁকে চরম আর্থিক অনটনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তিনি খামারে কাজ করা, সবজি কাটা এবং করাতকলে কাঠের গুঁড়ি পরিষ্কারের মতো অত্যন্ত কঠিন কায়িক শ্রম দিয়ে নিজের জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন।

১৯৯০ সালে ইলন মাস্ক কানাডার কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন। সেখানে অধ্যয়নকালেই তাঁর পরিচয় হয় তাঁর প্রথম স্ত্রী জাস্টিন উইলসনের সাথে। কুইন্সে দুই বছর পড়ার পর ইলন পেনসিলভেনিয়া ইউনিভার্সিটিতে স্থানান্তরিত হন। পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৭ সালে তিনি পদার্থবিদ্যায় ব্যাচেলর অব আর্টস (BA) এবং অর্থনীতিতে ব্যাচেলর অব সায়েন্স (BS) ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯৫ সালে ইলন ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে অ্যাপ্লায়েড ফিজিক্স ও মেটেরিয়াল সায়েন্সে ডক্টরেট (PhD) করার জন্য নির্বাচিত হন। কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালিতে পা রাখার সঙ্গেই তিনি বুঝতে পারেন, ইন্টারনেটের প্রথম জোয়ারটি বিশ্বকে যেভাবে পরিবর্তন করতে যাচ্ছে, তা ল্যাবরেটরির যেকোনো গবেষণার চেয়ে অনেক বেশি তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী। মাত্র দুই দিন ক্লাস করার পর তিনি স্ট্যানফোর্ড থেকে ড্রপআউট হন এবং নিজের প্রথম প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। স্ট্যানফোর্ড ছেড়ে দেওয়ার কারণে তাঁর স্টুডেন্ট ভিসাটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, যা তাঁকে ক্যালিফোর্নিয়ায় কাজ করার ক্ষেত্রে এক ধরনের আইনি ধূসর অঞ্চলে ফেলে দেয়।

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে আসার পর ইলন মাস্ক, তাঁর ভাই কিম্বাল মাস্ক ও গ্রেগ কুরি মিলে ১৯৯৫ সালে ‘জিপ২’ (Zip2) নামের কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল মূলত একটি অনলাইন সিটি গাইড, যা সংবাদপত্রগুলোকে ডিজিটাল মানচিত্র সরবরাহ করত। শুরুর দিনগুলোতে তাঁদের আর্থিক অবস্থা এতটাই শোচনীয় ছিল যে, তাঁরা পালো আল্টোতে একটি ছোট অফিস রুম ভাড়া নিয়ে সেখানেই রাতে ঘুমাতেন এবং প্রতি রাতে ইলনকে নিজে কোড লিখতে হতো। কঠোর পরিশ্রমের পর জিপ২ নিউ ইয়র্ক টাইমস ও শিকাগো ট্রিবিউনের মতো বড় বড় সংবাদপত্রের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করতে সক্ষম হয়। ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিখ্যাত কম্পিউটার প্রস্তুতকারক কোম্পানি কমপ্যাক (Compaq) জিপ২-কে ৩০৭ মিলিয়ন ডলার নগদে কিনে নেয়। এই চুক্তি থেকে মাস্ক তাঁর সাত শতাংশ শেয়ারের বিপরীতে ২২ মিলিয়ন ডলার লাভ করেন, যা তাঁকে মাত্র আটাশ বছর বয়সে কোটিপতি বানিয়ে দেয়।

জিপ২ বিক্রির টাকা পকেটে নিয়ে ইলন মাস্ক নিরাপদ জীবনের সন্ধান না করে তাঁর অর্জিত অর্থের সিংহভাগ (১২ মিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগ করে ১৯৯৯ সালের মার্চ মাসে ‘এক্স ডট কম’ (X.com) নামের একটি অনলাইন ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ইমেইল পেমেন্ট কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল আমেরিকার প্রথম ফেডারেল বীমাকৃত অনলাইন ব্যাংকগুলোর একটি। এক্স ডট কমের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বাজারে আবির্ভূত হয় পিটার থিয়েল ও ম্যাক্স লেভচিনের প্রতিষ্ঠিত ‘কনফিনিটি’ (Confinity), যার জনপ্রিয় সার্ভিসটি ছিল পেপ্যাল। দুই কোম্পানির মধ্যে তীব্র পেমেন্ট যুদ্ধ যখন উভয় পক্ষের মূলধন পুড়িয়ে দিচ্ছিল, তখন ২০০০ সালে তারা একত্রিত হয়ে মার্জার (একীভূতকরণ)-এর সিদ্ধান্ত নেয় এবং নতুন কোম্পানির নাম রাখা হয় এক্স ডট কম। ইলন মাস্ক এই মার্জড কোম্পানির সিইও হিসেবে দায়িত্ব নেন। কিন্তু নতুন এই বিশাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মে ইলন মাস্কের মাইক্রোসফটের উইন্ডোজভিত্তিক সফটওয়্যার ব্যবহারের জেদের কারণে কোম্পানির ভেতর তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়, যেখানে কনফিনিটির প্রকৌশলীরা ইউনিক্স বা লিনাক্সভিত্তিক সিস্টেম পছন্দ করতেন।

২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইলন যখন তাঁর স্ত্রী জাস্টিনকে নিয়ে হানিমুনে যাচ্ছিলেন, তখন কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ এক নীরব অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁকে প্রধান নির্বাহীর পদ থেকে সরিয়ে দেয় এবং পিটার থিয়েলকে নতুন সিইও নিয়োগ করে। ২০০১ সালে কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে পেপ্যাল (PayPal) রাখা হয়। সিইও পদ থেকে অপসারিত হয়েও ইলন ছিলেন কোম্পানির সবচেয়ে বড় অংশীদার। ২০০২ সালের শেষ দিকে ইন্টারনেট জায়ান্ট ইবে (eBay) পেপ্যালকে ১.৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের স্টকে কিনে নেয়। এই অধিগ্রহণ থেকে ইলন মাস্ক তাঁর ১১.৭ শতাংশ শেয়ারের বিনিময়ে ১৭৬ মিলিয়ন ডলার পান, যা তাঁকে তাঁর পরবর্তী জীবনের সবচেয়ে বড় বাজিগুলো ধরার প্রয়োজনীয় জ্বালানি এনে দেয়।

পেপ্যাল থেকে প্রাপ্ত বিপুল অর্থ দিয়ে ইলন মাস্ক দুটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ খাতে হাত দেন: মহাকাশ ভ্রমণ ও বৈদ্যুতিক গাড়ি। সাধারণ কোনো বিনিয়োগকারী যেখানে উচ্চপ্রযুক্তি ও মূলধননির্ভর এই খাতগুলোতে পা বাড়াতে ভয় পেতেন, সেখানে মাস্ক তাঁর অর্জিত অর্থের ১০০ মিলিয়ন ডলার নিয়ে স্পেস এক্সপ্লোরেশন টেকনোলজিস বা স্পেসএক্স (SpaceX) প্রতিষ্ঠা করেন ২০০২ সালের মে মাসে। মহাকাশ যাত্রার ব্যয় দশগুণ কমিয়ে মঙ্গলে মানুষের একটি স্বনির্ভর কলোনি স্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে তিনি এই স্বপ্নযাত্রা শুরু করেন। শুরুতে মাস্ক রাশিয়া থেকে পুনর্ব্যবহৃত আইসিবিএম রকেট কিনতে গিয়েছিলেন। কিন্তু রুশদের অপেশাদার আচরণ ও অবজ্ঞার পর তিনি নিজেই কম খরচে রকেট ডিজাইন ও তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। রকেট তৈরিতে তিনি ভার্টিক্যাল ইন্টিগ্রেশন (অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থা), অফ-দ্য-শেল্ফ বাণিজ্যিক যন্ত্রাংশ এবং আধুনিক সফটওয়্যার প্রকৌশল ব্যবহারের মাধ্যমে খরচ নজিরবিহীনভাবে কমিয়ে আনেন।

স্পেসএক্সের তৈরি প্রথম রকেট ফ্যালকন ১-এর উন্নয়ন ব্যয় ছিল প্রায় ৯০ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে ফ্যালকন ১-এর প্রথম তিনটি উৎক্ষেপণই একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ব্যর্থ হয়। প্রতিটি ব্যর্থতা স্পেসএক্সের কোটি কোটি ডলার পুড়িয়ে দিচ্ছিল এবং কোম্পানির কাছে চতুর্থ উৎক্ষেপণ অর্থায়নের মতো প্রায় কোনো মূলধন অবশিষ্ট ছিল না।

একই সাথে ইলন মাস্ক অন্য একটি ফ্রন্টে লড়াই করছিলেন। ২০০৪ সালে মার্টিন এবারহার্ড ও মার্ক টারপেনিংয়ের প্রতিষ্ঠিত ‘টেসলা মোটরস’-এ তিনি ৬.৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে কোম্পানির চেয়ারম্যান ও প্রধান শেয়ারহোল্ডার হন। উদ্দেশ্য ছিল টেসলা রোডস্টার নামের একটি প্রিমিয়াম স্পোর্টস কার-এর মাধ্যমে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে বিপ্লব আনা। কিন্তু ২০০৭ ও ২০০৮ সালের দিকে বিশ্বজুড়ে শুরু হওয়া সাবপ্রাইম মর্টগেজ সংকট ও মহামন্দার কারণে টেসলা চরম তারল্য সংকটে পড়ে। কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবারহার্ডের সাথে চরম বিরোধের পর মাস্ক তাঁকে সরিয়ে দিয়ে ২০০৮ সালের অক্টোবরে নিজে টেসলার সিইও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

২০০৮ সালের ডিসেম্বরের সেই শীতের দিনগুলোতে ইলন মাস্কের জীবন চরম বিভীষিকায় রূপ নেয়। একসঙ্গে তাঁর দুটি স্বপ্নের কোম্পানি—স্পেসএক্স ও টেসলা—দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল। ইলন রাতের পর রাত দুঃস্বপ্ন দেখে চিৎকার করে জেগে উঠতেন এবং তীব্র শারীরিক যন্ত্রণায় ভুগতেন। টেসলার রোডস্টার গাড়ির প্রোটোটাইপগুলো অনবরত ভেঙে পড়ছিল, প্রতি সপ্তাহে জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীরা ইস্তফা দিচ্ছিলেন, এবং ক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা বুকিংয়ের টাকা ফেরতের জন্য অনবরত চাপ দিচ্ছিলেন। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পাওনা ১২০ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ না করলে মামলার হুমকি দিয়ে আসছিল।

এই চরম সংকটময় মুহূর্তে ইলন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তার পরিচয় দেন। পেপ্যাল থেকে প্রাপ্ত তাঁর জীবনের শেষ ব্যক্তিগত সঞ্চয়টুকু তিনি দুই কোম্পানির মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অনেকেই তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যেকোনো একটিকে বাঁচিয়ে অন্যটিকে মরতে দিতে। বোর্ডের অন্যতম পরিচালক স্টিভ জুরভেটসনের ভাষায়, এটি ছিল উদ্যোক্তাসুলভ তীব্র জেদ ও প্রতিশ্রুতির সবচেয়ে অসাধারণ এক দৃষ্টান্ত। ক্রিসমাসের ঠিক আগে তপ্ত বোর্ড মিটিংয়ে ইলন ঘোষণা করেন যে, টেসলাকে বাঁচাতে তিনি তাঁর শেষ ডলারটুকুও বিনিয়োগ করবেন এবং প্রয়োজনে নিজের নিট সম্পদ ঋণাত্মক সীমানায় নিয়ে যাবেন। বিনিয়োগকারীরা তাঁর এই অবিশ্বাস্য আত্মত্যাগ দেখে অনুপ্রাণিত হন এবং নিজেদের শেষ পুঁজিটুকু ইলনের ২০ মিলিয়ন ডলারের সাথে যুক্ত করেন।

২০০৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৬টায়, কোম্পানির বেতন পরিশোধের মাত্র দুই দিন আগে, এই আপৎকালীন অর্থায়ন সফলভাবে সম্পন্ন হয় এবং টেসলা দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যায়। এর ঠিক দুই দিন আগে, ২০০৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর, নাসা স্পেসএক্সকে ১.৬ বিলিয়ন ডলারের একটি কমার্শিয়াল রিসাপ্লাই সার্ভিসেস (CRS) চুক্তি উপহার দেয়, যা কোম্পানিটিকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে নেয়। পরবর্তীতে ২০০৯ সালের মে মাসে বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ডাইমলার ৫০ মিলিয়ন ডলারে টেসলার ১০ শতাংশ শেয়ার কিনে নিলে টেসলার অর্থনৈতিক ভিত মজবুত হয় এবং তারা ৪০ মিলিয়ন ডলারের একটি ব্যাটারি সরবরাহ চুক্তিও সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়।

২০০৮ সালের সেই মহাবিপদ কাটিয়ে ওঠার পর ইলন মাস্কের দূরদর্শিতা ও প্রকৌশল প্রতিভা নতুন গতিতে বিকশিত হতে শুরু করে। ২০১০ সালের জুন মাসে টেসলা নাসড্যাকে আইপিও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাবলিক কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়, যা ছিল ১৯৫৬ সালে ফোর্ড মোটর কোম্পানির পর কোনো মার্কিন গাড়ি প্রস্তুতকারকের প্রথম আইপিও। ২০১০ সালেই টেসলা মার্কিন জ্বালানি বিভাগ থেকে ৪৬৫ মিলিয়ন ডলারের একটি কৌশলগত ঋণ লাভ করে, যা ফ্রেমন্টের প্রাক্তন টয়োটা কারখানা অধিগ্রহণ এবং টেসলা মডেল এস (Model S) সেডানের উন্নয়নে ব্যবহৃত হয়। ২০১২ সালে বাজারে আসা টেসলা মডেল এস দ্রুত বিশ্বব্যাপী বিলাসবহুল গাড়ির বাজারে আলোড়ন সৃষ্টি করে। গাড়ি উৎপাদন ও ব্যাটারির খরচ কমাতে মাস্ক নেভাডা, টেক্সাস, সাংহাই ও বার্লিনে দানবীয় ‘গিগাফ্যাক্টরি’ গড়ে তোলেন। টেসলার শেয়ারের দাম আকাশচুম্বী হতে শুরু করে এবং কোম্পানির মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন ২০২৬ সালের মধ্যে ১.৪৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।

স্পেসএক্স তার ফ্যালকন ৯ রকেটের মাধ্যমে উপগ্রহ উৎক্ষেপণের বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে। রকেটের প্রথম স্টেজ (বুস্টার) সফলভাবে ড্রোন শিপে নামিয়ে এনে বারবার ব্যবহার করার প্রযুক্তি স্পেসএক্সের উৎক্ষেপণ ব্যয় নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেয়। কিন্তু মাস্কের লক্ষ্য কেবল রকেট পাঠানো ছিল না। ২০১৫ সালে তিনি শুরু করেন স্টারলিংক (Starlink) প্রজেক্ট, যার উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে হাজার হাজার ক্ষুদ্র স্যাটেলাইটের জাল বিছিয়ে পুরো বিশ্বে উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া। ২০২৫ সালের মধ্যে স্টারলিংক স্পেসএক্সের মোট রাজস্বের ৬১ শতাংশের বেশি (১১.৪ বিলিয়ন ডলার) আয় করতে শুরু করে, যা স্পেসএক্সকে একটি অতি-লাভজনক মহাকাশ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে। তবে এই মহাকাশ সাম্রাজ্যের বাইরেও স্পেসএক্সের অভ্যন্তরীণ আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত জটিল; ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে তারা ৪.২৮ বিলিয়ন ডলারের নেট লোকসান ও ৪১.৩ বিলিয়ন ডলারের জমা হওয়া ঘাটতি প্রদর্শন করে, যার মূল কারণ ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রকেট উন্নয়নের পেছনে বিশাল খরচ।

২০১৬ সালে মাস্ক মানব মস্তিষ্কের সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরাসরি সংযোগ স্থাপনের উদ্দেশ্যে ‘নিউরালিংক’ (Neuralink) প্রতিষ্ঠা করেন। নিউরালিংক মূলত একটি সূক্ষ্ম ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস (BCI) তৈরি করে, যা পক্ষাঘাতগ্রস্ত বা গুরুতর স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিন্তাশক্তির মাধ্যমে কম্পিউটার বা রোবোটিক অঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে নিউরালিংক তার প্রথম মানুষের মস্তিষ্কে সফলভাবে চিপ ইমপ্লান্ট করে। ২০২৫ সালের মধ্যে কোম্পানিটি তার অস্ত্রোপচার পদ্ধতিকে অত্যন্ত উন্নত ও দ্রুততর করতে সক্ষম হয়; সেখানে একটি উন্নত রোবটের মাধ্যমে মাত্র দেড় সেকেন্ডে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ইলেকট্রোড থ্রেড মস্তিষ্কে স্থাপন করা সম্ভব হয়। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ নিউরালিংক বিশ্বজুড়ে ২১ জন রোগীকে এই ইমপ্লান্ট সরবরাহ করে তাদের জীবনের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয় এবং এই প্রযুক্তির বাজার সম্ভাবনা কোম্পানিটির মূল্যায়নকে ৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করে। ২০২৬ সালে নিউরালিংক তাদের উৎপাদন বাড়ানোর এবং সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রোপচার ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ করে।

একইসঙ্গে মাস্ক ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ তৈরির মাধ্যমে শহরের যানজট দূর করার জন্য ‘দ্য বোরিং কোম্পানি’ (The Boring Company) প্রতিষ্ঠা করেন। লাস ভেগাসের কনভেনশন সেন্টারের নিচে তৈরি ১.৭ মাইলের ‘ভেগাস লুপ’ (Vegas Loop) ছিল এর প্রথম বাস্তব প্রয়োগ। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে কোম্পানিটি ২.২৮ মাইলের একটি দীর্ঘতম একক টানেল খনন সম্পন্ন করে, যা লাস ভেগাসের বিভিন্ন রিসোর্টকে বিমানবন্দরের সাথে যুক্ত করার পথ উন্মোচন করে। তবে এই কাজের মাঝেই বোরিং কোম্পানিকে লাস ভেগাসের ড্রেনেজ সিস্টেমে ড্রিলিং ফ্লুইড (কাদা) ফেলার অপরাধে প্রায় ৫০০,০০০ ডলার জরিমানা করা হয়।

২০২২ সালে ইলন মাস্কের জীবনের অন্যতম বিতর্কিত ও আলোচিত অধ্যায়ের সূচনা হয়, যখন তিনি বিশ্বখ্যাত সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম টুইটার (Twitter) ৪৪ বিলিয়ন ডলারে কিনে নেন। বাকস্বাধীনতার চরম বিকাশ ঘটানো এবং টুইটারকে একটি ‘এভরিথিং অ্যাপ’-এ রূপান্তর করার পরিকল্পনা নিয়ে তিনি এই অধিগ্রহণ করেন। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে তিনি টুইটারকে ‘এক্স কর্পোরেশন’ (X Corp) হিসেবে পুনঃব্র্যান্ডিং করেন এবং এর ঐতিহ্যবাহী নীল পাখির লোগো সরিয়ে একটি ন্যূনতম ‘X’ প্রতীক ব্যবহার শুরু করেন।

এই অধিগ্রহণের পর এক্স কর্পোরেশনে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই ও নীতিগত পরিবর্তন নিয়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। তবে ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্টরা লক্ষ্য করেন যে, মাস্কের এই পরিকল্পনার মূল ভিত্তি কেবল একটি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করা ছিল না, বরং এক্স-এর বিপুল পরিমাণ রিয়েল-টাইম ডেটা ব্যবহার করে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এই উদ্দেশ্য নিয়েই ২০২৩ সালে তিনি ‘এক্সএআই’ (xAI) নামের একটি এআই স্টার্টআপ শুরু করেন। ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ xAI বাইরের বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১৩৪.৭ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে, যেখানে স্পেসএক্স নিজেই ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে xAI ৩৩ বিলিয়ন ডলারের স্টক লেনদেনের মাধ্যমে এক্স কর্পোরেশনকে নিজের অধীনে নিয়ে আসে, যা ঋণের হিসাবসহ কোম্পানিটির মূল্য নির্ধারণ করে ৪৫ বিলিয়ন ডলার। এই ক্রয়ের ফলে একটি নতুন হোল্ডিং কোম্পানি ‘এক্সএআই হোল্ডকো’ (xAI Holdco) গঠিত হয়।

xAI অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ‘গ্রোক’ (Grok) নামের একটি কৌতুকপূর্ণ ও বাস্তববাদী চ্যাটবট তৈরি করে, যা এক্স প্ল্যাটফর্মের সব রিয়েল-টাইম তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সাড়া দিতে পারে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে xAI-এর ডেটা প্রসেসিং ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য মাস্ক মেমফিসে ‘কোলোসাস’ (Colossus) নামের বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও দ্রুততম সুপার কম্পিউটার ডেটা সেন্টার গড়ে তোলেন, যা ২ লাখ ২০ হাজার এনভিডিয়া জিপিইউ (Nvidia GPU) দ্বারা চালিত। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে xAI বিখ্যাত এআই ল্যাব অ্যানথ্রোপিকের (Anthropic) সাথে প্রতি মাসে ১.২৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি ঐতিহাসিক ক্লাউড কম্পিউটিং চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা xAI-কে এআই শিল্পের অন্যতম শক্তিশালী ও অর্থনৈতিকভাবে সুরক্ষিত খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে xAI সফটওয়্যার কোম্পানি অ্যানিস্ফিয়ারের (Anysphere) সাথে ৬০ বিলিয়ন ডলারে অধিগ্রহণের একটি কৌশলগত চুক্তি সম্পন্ন করে।

২০২৪ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইলন মাস্ক ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রার্থীতার পক্ষে সরাসরি মাঠে নামেন। তিনি ট্রাম্পের প্রচারণায় প্রায় ২৯০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দেন এবং সুইং স্টেটগুলোতে ব্যাপক নির্বাচনী প্রচারণা চালান। ট্রাম্পের বিজয়ের পর ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষমতা গ্রহণের সাথে সাথেই প্রেসিডেন্ট একটি নতুন নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি’ (Doge) বা ডোজ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এই নতুন বিভাগের প্রধান কাজ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর আধুনিকায়ন, ফেডারেল খরচে ট্রিলিয়ন ডলার কাটছাঁট এবং প্রযুক্তির প্রয়োগ বৃদ্ধি করা। এর মূল নির্বাহী কাঠামোটি তৈরি করা হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিজিটাল সার্ভিসকে (USDS) বিলুপ্ত করে সেটিকে ‘ইউ.এস. ডোজ সার্ভিস’ নামের একটি সাময়িক সংস্থা হিসেবে রূপান্তরের মাধ্যমে, যার মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৬ সালের ৪ জুলাই পর্যন্ত।

ডোজের অধীনে মাস্কের নির্দেশে মার্কিন সরকারের আইটি পরিকাঠামোতে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন শুরু হয়। তবে এই বিভাগের কার্যক্রম সরকারি ও প্রশাসনিক মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। ২০২৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে ম্যাসাকার’ নামে এক নির্মম আদেশের মাধ্যমে ওপিএম (OPM) সব ফেডারেল এজেন্সির প্রবেশনারি (পরীক্ষাধীন) কর্মকর্তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করার নির্দেশ দেয়। ডোজের কর্মীরা অননুমোদিতভাবে আইআরএস (IRS)-এর অত্যন্ত গোপনীয় ট্যাক্সপেয়ার সিস্টেম এবং হাউজিং ডিপার্টমেন্টের (HUD) গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার নারীদের ব্যক্তিগত ডেটাবেজে অ্যাক্সেস করার চেষ্টা করে চরম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগের সম্মুখীন হন। তারা আইআরএস-এর প্রায় ৬,৭০০ কর্মী ছাঁটাই করে এবং ফেডারেল ফান্ডের হাজার হাজার চুক্তি ও অনুদান বাতিল করে।

ডোজের এই কঠোর পদক্ষেপের কারণে প্রায় ১৪টি মার্কিন অঙ্গরাজ্য মাস্ক ও তাঁর দলের বিরুদ্ধে সরকারের তথ্য ব্যবস্থা জোরপূর্বক দখল ও ক্ষমতা পৃথকীকরণ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা দায়ের করে। হোয়াইট হাউস অবশ্য আদালতে দাবি করে যে, ইলন মাস্ক ডোজের কোনো আনুষ্ঠানিক বেতনভুক্ত কর্মচারী বা প্রধান নন; বরং তিনি একজন ‘স্পেশাল গভর্নমেন্ট এমপ্লয়ি’ (SGE) বা বিশেষ সরকারি উপদেষ্টা হিসেবে অনূর্ধ্ব ১৩০ দিন কাজ করছেন। তবে ট্রাম্পের পাবলিক ঘোষণা ও একজন ফেডারেল বিচারকের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, মাস্কই ছিলেন ডোজের মূল চালিকাশক্তি।

ডোজের কাজের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে যখন মাস্ক ও সিনেটর র্যান্ড পল ফোর্ট নক্সের (Fort Knox) সুরক্ষিত মার্কিন স্বর্ণ রিজার্ভ অডিট করার ঘোষণা দেন। ফোর্ট নক্সের স্বর্ণ আসলেই সেখানে আছে কিনা—সে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘদিনের ষড়যন্ত্র তত্ত্বের উল্লেখ করে মাস্ক এক্স-এ লেখেন, ‘সেখানে স্বর্ণ থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে’ এবং ফোর্ট নক্সের ভেতর একটি লাইভ ভিডিও ওয়াকথ্রু ও সার্বক্ষণিক লাইভস্ট্রিম করার দাবি জানান। তৎকালীন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট অবশ্য নিশ্চিত করেন যে স্বর্ণ সেখানেই সুরক্ষিত আছে, যার বাজার মূল্য প্রায় ৪৫৯.২ বিলিয়ন ডলার।

২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্প ও মাস্কের মধ্যে সম্পর্কের তীব্র টানাপড়েন শুরু হয়। ট্রাম্পের বিতর্কিত ও বিশাল বাজেটসংবলিত ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’-এর তীব্র সমালোচনা করে মাস্ক এক্স-এ একাধিক পোস্ট দেন। তিনি এই বিলটিকে দেশের ঋণ বাড়ানোর জন্য একটি ‘নিন্দনীয় জঘন্য অপরাধ’ বলে আখ্যায়িত করেন এবং এটি বাতিলের দাবি জানান।

এই সমালোচনার জবাবে ট্রাম্প অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং জনসম্মুখে মাস্কের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রাথমিক কর্মসংস্থানের আইনি বৈধতা ও তাঁর কানাডীয় নাগরিকত্বের ইতিহাস টেনে এনে তাঁকে দেশ থেকে বহিষ্কার বা ডিপোর্ট করার হুমকি দেন। এমনকি ট্রাম্প আরও ঘোষণা করেন যে, তিনি মাস্কের পেন্টাগনের সাথে থাকা ২০ বিলিয়ন ডলারের মহাকাশ ও সামরিক চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন করবেন এবং ডোজকে মাস্কের নিজের কোম্পানির বিরুদ্ধেই লেলিয়ে দেবেন। এই তীব্র বিরোধের পর ২০২৫ সালের মে মাসে ইলন মাস্ক হোয়াইট হাউসের সিনিয়র উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পর্কের অবসান ঘটে। তবে এই সাময়িক রাজনৈতিক ধাক্কা মাস্কের অর্থনৈতিক ক্ষমতার ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি; বরং এটি তাঁকে তাঁর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য একীভূত করার কাজে আরও বেশি মনোযোগ দিতে প্ররোচিত করে।

ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হওয়ার পর ইলন মাস্ক তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের কাজটি শুরু করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, মহাকাশ উৎক্ষেপণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো ভৌত পরিকাঠামোর সাথে যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জ্ঞানীয় শক্তির সংযোগ ঘটানো না যায়, তবে ভবিষ্যতের এআই কম্পিউটিং চাহিদার সমাধান করা অসম্ভব। ২০২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি স্পেসএক্স এক অভূতপূর্ব অল-স্টক ট্রানজ্যাকশনের মাধ্যমে ইলন মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান xAI-কে নিজের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন সহযোগী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করে। এই ঐতিহাসিক একীভূতকরণের সময় স্পেসএক্সের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১ ট্রিলিয়ন ডলার এবং xAI-এর মূল্য ধরা হয় ২৫০ বিলিয়ন ডলার, যার ফলে যৌথ সত্ত্বাটির মোট বাজার মূল্য দাঁড়ায় ১.২৫ ট্রিলিয়ন ডলার। এই চুক্তির মাধ্যমে মহাকাশ উৎক্ষেপণ (SpaceX), স্যাটেলাইট ইন্টারনেট (Starlink) ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (xAI) একই কর্পোরেট ছাতার নিচে চলে আসে।

২০২৬ সালের মে মাসে স্পেসএক্স মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে তাদের পাবলিক লিস্টিংয়ের জন্য সংশোধিত এস-১ (S-1) প্রসপেক্টাস জমা দেয়। তারা প্রতি শেয়ার ১৩৫ ডলার মূল্যে মোট ৭৫ বিলিয়ন ডলারের পুঁজি সংগ্রহের লক্ষ্যে ৫৫৫.৬ মিলিয়ন ক্লাস এ শেয়ার বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এটি ছিল মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আইপিও উদ্যোগ, যা ২০১৯ সালে সৌদি আরামকোর গড়া রেকর্ডকে অনেক পেছনে ফেলে দেয়।

২০২৬ সালের ১২ জুন, শুক্রবার দুপুর ১২টায় নাসড্যাকে ‘এসপিসিএক্স’ (SPCX) টিকারে যখন স্পেসএক্সের লেনদেন শুরু হয়, তখন ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অভূতপূর্ব উন্মাদনা তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও খুচরা বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে মোট ২৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের ক্রয়াদেশ জমা পড়ে, যা ছিল বরাদ্দকৃত শেয়ারের প্রায় সাড়ে তিন গুণ। লেনদেন শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে শেয়ারের মূল্য ১৩৫ ডলার থেকে লাফিয়ে ১৬৮.৯০ ডলারে উঠে যায়, যা প্রায় ২৫ শতাংশের এক চোখ ধাঁধানো উত্থান। এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে স্পেসএক্সের মোট বাজার মূল্য ২.১২ ট্রিলিয়ন ডলারে স্পর্শ করে, যা কোম্পানিটিকে অ্যাপল, মাইক্রোসফট ও এনভিডিয়ার মতো অতি-এক্সক্লুসিভ মেগা-ক্যাপ ক্লাবে নিয়ে যায়।

এই ঐতিহাসিক লেনদেন প্রক্রিয়ায় প্রধান বুক রানার গোল্ডম্যান স্যাক্স ও মরগান স্ট্যানলি প্রত্যেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার ফি সংগ্রহ করে এবং ব্যাংক অব আমেরিকা, জেপি মরগান ও সিটিগ্রুপ প্রত্যেকে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ডলার করে আয় করে মোট ৫০০ মিলিয়ন ডলারের একটি ঐতিহাসিক ফি পুল তৈরি করে। স্পেসএক্সের অন্যতম প্রধান প্রারম্ভিক বিনিয়োগকারী আন্তোনিও গ্রাসিয়াস ও তাঁর কোম্পানি ভ্যালোর ইকুইটি পার্টনার্স এই লেনদেনের পর প্রায় ৮১ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ক্লাস এ শেয়ারের মালিক হয়ে রাতারাতি বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হন। একইসাথে জানা যায় যে, স্পেসএক্স তাদের ব্যালেন্স শিটে ১৮,৭১২টি বিটকয়েন (Bitcoin) ধারণ করছে, যার মূল্য প্রায় ১.২৯ বিলিয়ন ডলার।

আইপিও প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, স্পেসএক্সে মাস্কের মালিকানায় ছিল ৮৪৯,৪৯৪,৪৪০টি ক্লাস এ কমন শেয়ার ও ৫,৫৬৯,০৫৩,০৭৫টি ক্লাস বি কমন শেয়ার, যা তাঁকে কোম্পানিটির ৮২ শতাংশের বেশি ভোটিং পাওয়ার এবং প্রায় ৪২ শতাংশ ইকুইটি শেয়ারের মালিকানা দেয়। নাসড্যাকের প্রথম ট্রেডিং ডে শেষে শেয়ারের মূল্য যখন ১৬৮.৯০ ডলারে পৌঁছায়, তখন স্পেসএক্সে মাস্কের এই কাগুজে শেয়ারের মূল্য এক লাফে ৮৬৬.৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। একইসঙ্গে টেসলায় মাস্কের থাকা ১৩ শতাংশ সাধারণ শেয়ারের মূল্য (যা টেসলার ১.৪৭ ট্রিলিয়ন ডলার মার্কেট ক্যাপের ভিত্তিতে প্রায় ৩৫৫ বিলিয়ন ডলার) এবং তাঁর কাছে থাকা বিপুল পরিমাণ অব্যবহৃত অপশন যুক্ত করলে তাঁর মোট নিট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ১.২২ ট্রিলিয়ন ডলার। ফোর্বস ও ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ার ইনডেক্স উভয় স্কোরকার্ডেই ইলন মাস্কের সম্পদ ট্রিলিয়ন ডলারের জাদুকরী ল্যান্ডমার্কটি অত্যন্ত আরামদায়কভাবে পার করে যায় এবং তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আধুনিক পৃথিবীর প্রথম স্বঘোষিত ট্রিলিয়নিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হন।

ইলন মাস্কের এই সামগ্রিক সম্পদের হিসাব কষলে দেখা যায় যে তাঁর মূল কাগুজে শেয়ারের ৮৬৬.৫ বিলিয়ন ডলার মূলত স্পেসএক্স থেকেই এসেছে, যেখানে তিনি ৮২ শতাংশ ভোটিং ক্ষমতার অধিকারী। পাশাপাশি তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অংশীদার আন্তোনিও গ্রাসিয়াস ও তাঁর ভ্যালোর ইকুইটি ৮১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ক্লাস এ শেয়ার ধারণ করছেন। এছাড়াও স্পেসএক্সের নিজস্ব ব্যালেন্স শিটে রয়েছে প্রায় ১.২৯ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ১৮,৭১২টি বিটকয়েন। আইপিওর সামগ্রিক সমন্বয় ঘটাতে গোল্ডম্যান স্যাক্স ও মরগান স্ট্যানলির মতো জায়ান্টরা ব্যাংক অব আমেরিকা ও অন্যান্যদের সাথে মিলে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের এক বিপুল ফি পুল গঠন করতে সক্ষম হয়।

ব্যবসায়িক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে ইলন মাস্কের এই মহাবিজয় যখন পুরো বিশ্বকে চমকে দিচ্ছিল, তখন তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল চরম বিভ্রান্তিকর ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতায় ভরা। মাস্কের জীবনে কাজের প্রতি এক ধরনের বন্য আসক্তি রয়েছে, যা তাঁকে সপ্তাহে ১০০ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে বাধ্য করে এবং তিনি তাঁর পারিপার্শ্বিক মানুষের কাছ থেকেও একই ধরনের তীব্র কর্মোৎসর্গ প্রত্যাশা করেন। তাঁর মতে, যদি খাবার না খেয়েও বেঁচে থাকা যেত এবং সেই সময়টুকু কাজে লাগানো যেত, তবে তিনি খাওয়া বন্ধ করে দিতেন। এই তীব্র মানসিক চাপের প্রভাব তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোর ওপর মারাত্মকভাবে পড়েছে।

ইলন মাস্কের জীবনে জাস্টিন উইলসন ও ব্রিটিশ অভিনেত্রী তালুলাহ রাইলির সাথে তিনটি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে। তিনি এখন পর্যন্ত চারজন ভিন্ন নারীর গর্ভে অন্তত চৌদ্দটি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। জাস্টিনের গর্ভে জন্ম নেওয়া প্রথম সন্তান নেভাডা আলেকজান্ডারের শৈশবেই মৃত্যু হয়। জাস্টিনের সাথে তাঁর বাকি সন্তানেরা হলেন যমজ গ্রিফিন ও ভিভিয়ান এবং ট্রিপলেট কাই, স্যাক্সন ও ড্যামিয়ান। এদের মধ্যে ভিভিয়ান ২০২২ সালে আঠারো বছর বয়সে নিজের লিঙ্গ রূপান্তর করে নিজের নাম পরিবর্তন করেন এবং তাঁর বাবার সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে মায়ের শেষ নাম গ্রহণ করেন, যা ইলনকে গভীরভাবে মর্মাহত করে।

পরবর্তীতে কানাডীয় সঙ্গীতশিল্পী গ্রাইমসের (Grimes) সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে মাস্ক আরও তিনটি সন্তানের জন্ম দেন, যাদের নাম রাখা হয় এক্স অ্যাশ এ-টুয়েলভ (X Æ A-Xii), এক্সা ডার্ক সিডারিল (Exa Dark Sideræl) এবং টেকনো মেকানিকাস (Techno Mechanicus / Tau)। একই সময়ে নিউরালিংকের অপারেশন ডিরেক্টর শিবন জিলিসের (Shivon Zilis) সাথে তাঁর এক ধরনের গোপন কর্মক্ষেত্রীয় প্রণয় গড়ে ওঠে, যার ফলে তাঁদের কোল আলো করে আসে যমজ সন্তান অ্যাজিউর ও স্ট্রাইডার এবং পরবর্তীতে কন্যা আর্কাডিয়া ও পুত্র সেলডন লাইকার্গাস। এছাড়া লেখিকা অ্যাশলে সেন্ট ক্লেয়ারের গর্ভে জন্ম নেওয়া পুত্র রমুলাসের পিতৃত্ব পরীক্ষার রিপোর্টও মাস্কের দিকেই নির্দেশ করে, যা তাঁর পারিবারিক জীবনকে এক জটিল গোলকধাঁধায় পরিণত করেছে।

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ইলন মাস্কের এই চরম অনিরাপদ ও বহুসম্পর্কপ্রবণ পারিবারিক জীবনের মূল কারণ তাঁর শৈশবের সেই ট্রমা। দক্ষিণ আফ্রিকার স্কুলের ভয়াবহ নির্যাতন ও তাঁর বাবার মনস্তাত্ত্বিক নিষ্ঠুরতা তাঁকে এমন এক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে, যিনি কখনোই একটি সাধারণ শান্ত জীবন যাপন করতে পারেন না। প্রিটোরিয়ার সেই বুনো বুশ ক্যাম্পের বর্বরোচিত লড়াই এবং ব্রায়ানস্টন হাই স্কুলের কংক্রিটের সিঁড়িতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়ার ক্ষতগুলো তাঁর মনের গভীরে এমন এক চিরস্থায়ী যুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যেখানে নিজেকে অনবরত জয়ী হিসেবে প্রমাণ না করলে অস্তিত্বের বিনাশ ঘটে। তিনি প্রতিনিয়ত এক ধরনের অস্তিত্ব সংকটে ভোগেন, যার কারণে তিনি সবসময় নিজেকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেন। তাঁর এই মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতাই একদিকে তাঁকে স্পেসএক্স ও টেসলার মতো প্রায় দেউলিয়া কোম্পানিগুলোকে রক্ষা করতে সাহায্য করেছে, আবার অন্যদিকে তা তাঁকে একাকী ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক চিরস্থায়ী যাযাবর বানিয়ে রেখেছে।

মহাকাশভিত্তিক ক্লাউড ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্নায়বিক প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব সমন্বয় মানব সভ্যতাকে এমন এক ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে হয়তো রাষ্ট্রীয় সীমানার চেয়ে এক ব্যক্তির বা তাঁর প্রতিষ্ঠিত কর্পোরেট সাম্রাজ্যের ক্ষমতা অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে। ইলন মাস্কের এই ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার দীর্ঘ ও জটিল মহাকাব্যিক যাত্রাটি মূলত আমাদের এই বার্তাই দেয় যে, মানব মন যদি যথেষ্ট জেদ, বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও অবিচল আত্মবিশ্বাসের ডানা মেলাতে পারে, তবে মহাবিশ্বের দূরতম সীমানাও একদিন হাতের মুঠোয় চলে আসে। এই নব্য-সার্বভৌমত্বের যুগে দাঁড়িয়ে ইলন মাস্ক কেবল পৃথিবীর প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার নন, বরং তিনি মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল, ব্যাপক বিতর্কিত এবং প্রভাবশালী মহাজাগতিক রূপকার।

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর

img

পিতৃত্বের সম্বল

প্রকাশিত :  ২০:২৪, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ২০:৩৮, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রেজুয়ান আহম্মেদ

সিদ্ধেশ্বরীর ১৮৭/এ নম্বর বাড়ির তিনতলার ডি-থ্রি ফ্ল্যাটে বিকেল নামলে ঘরটা কেমন ঝিমিয়ে যায়। জানালার ভাঙা কাচ গলে ঢোকা হিমেল বাতাস বারান্দার পুরনো পর্দায় শহরের ধুলো জমায়। কোথাও প্রদীপ জ্বলে না। ঘরের কোণে কাঠমিস্ত্রির হাতে গড়া একখানা শালকাঠের টেবিল, তার ওপর গোছানো কয়েকটা হলদেটে কাগজ আর একটা ঝরনা কলম। সেই টেবিল-লাগোয়া কাঠের চেয়ারে চুপচাপ বসে আছেন ইয়াছির আহমেদ।

কোলঘেঁষে ঘুমিয়ে আছে তিন বছরের রুদ্র। ছেলেটার চোখের পাতা ঘন, কপাল তুলতুলে, দেখলে মনে হয় যেন কোনো রূপকথার রাজ্য থেকে নেমে এসেছে। তবু সেই মুখেও এখন ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। চব্বিশ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, পেটে এক ফোঁটা দুধ বা শক্ত খাবার পড়েনি। ইয়াছির ছেলের কপালে হাত রাখলেন, দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চোখের কোণে জমে থাকা জলটা দাড়ি বেয়ে গড়ানোর আগেই মুছে নিলেন।

পাশের ঘর থেকে ভেসে আসছে মায়ের ক্ষীণ কাশি। বৃদ্ধা মা কয়েক মাস ধরে শয্যাশায়ী; ফুসফুসের যন্ত্রণা তাঁকে দিনে দিনে খেয়ে ফেলছে। টেবিলে পড়ে থাকা প্রেসক্রিপশনের স্তূপ আর খালি ওষুধের পাতাগুলোই এই ঘরের একমাত্র নীরব সাক্ষী। ইয়াছির ড্রয়ারটা টেনে খুললেন। ভেতরে একটা ফাঁকা কৌটো আর তিনটে পুরনো চার আনার মুদ্রা ছাড়া কিছু নেই। অভাব যখন দরজায় এসে দাঁড়ায়, একজন লেখকের সমস্ত শব্দ মুহূর্তে অর্থহীন হয়ে যায়।

এই ফ্ল্যাটটা শুধু ইট-কাঠের কাঠামো নয়। প্রতিটা ইটের খাঁজে জড়িয়ে আছে একটা পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই। ইয়াছিরের পূর্বপুরুষের ভিটে ছিল পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনায়। দেশভাগের করুণ সময়ে শেকড় উপড়ে তাঁরা ঢাকায় চলে আসেন, সঙ্গে ছিল শুধু কিছু পিতলের থালাবাসন আর জীর্ণ কয়েকটা পাণ্ডুলিপি।

ঢাকায় নতুন করে জীবন শুরু হলেও শান্তি টেকেনি বেশি দিন। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হলে ইয়াছিরের বাবা ঘরে বসে থাকতে পারেননি। অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে নয় মাসের যুদ্ধে শহীদ হন। বাবার এই আত্মত্যাগের কথা ইয়াছির নিজে কখনো শোনেননি; শুনেছেন মায়ের মুখে, গল্পের মতো করে।

বাবা শহীদ হওয়ার পর মা একা হয়ে যান। কোলে শিশু ইয়াছির, সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তবু তিনি ভেঙে পড়েননি; দুঃখটাকে শক্তি বানিয়ে স্বাধীন দেশে নতুন করে দাঁড়ালেন এবং সিদ্ধেশ্বরী এলাকার শিক্ষাবিস্তারে জীবন উৎসর্গ করলেন।

মা চাকরি নিলেন সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে। ১৯৩৩ সালের ১ জানুয়ারি শ্রী বিভূতিভূষণ আহির ও তাঁর স্ত্রীর উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই বিদ্যালয় ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তান পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ পর্যন্ত বারবার রূপ বদলাতে দেখেছে। সেখানে কয়েক দশক ধরে বাংলা পড়িয়েছেন মা, সুনামের সঙ্গে, নিষ্ঠার সঙ্গে।

ছাত্রীদের তিনি শুধু ব্যাকরণ বা রবীন্দ্রনাথের কবিতা শেখাতেন না, শেখাতেন আত্মমর্যাদা আর দেশপ্রেম। মাসের পর মাস পরিশ্রম করে, নিজের সব শখ বিসর্জন দিয়ে জমিয়েছিলেন বাইশ লক্ষ টাকা। সেই টাকাতেই কেনা হয় সিদ্ধেশ্বরীর এই বারোশো বর্গফুটের ডি-থ্রি ফ্ল্যাট।

মা প্রায়ই বলতেন, "ইয়াছির, এই ঘর কোনো সাধারণ বাড়ি না। তোর বাবার রক্তের সম্মান আর আমার সারাজীবনের রোজগার এই চার দেয়ালের মধ্যে জমা আছে। এখানে বসে তুই সত্যি লিখবি, কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়াবি না।" কথাগুলো ইয়াছিরের মনে গভীর দাগ কেটেছিল। বাবার আদর্শ আর মায়ের সততা বুকে নিয়েই তিনি বড় হয়ে উঠেছেন।

ইয়াছিরের পড়াশোনা শুরু হয় গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলে। ছোটবেলা থেকেই শান্ত স্বভাবের, বইয়ের পোকা। বন্ধুরা মাঠে ফুটবল নিয়ে ব্যস্ত থাকত, আর ইয়াছির তখন লাইব্রেরির এক কোণে ডুবে থাকতেন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্রে।

মাধ্যমিক পাশ করে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। করিডোর, পুরনো লাইব্রেরি, বটতলার ছায়া, সব মিলিয়ে তাঁর মন আরও গভীরভাবে সাহিত্যের দিকে ঝুঁকে যায়। সাহিত্যকে তিনি কখনো নিছক বিনোদন মনে করেননি; মনে করতেন সমাজের আয়না।

উচ্চ মাধ্যমিক শেষে গন্তব্য হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৯২-৯৩ সেশনে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। সেই সময়ের বিভাগ ভরপুর ছিল প্রজ্ঞাবান শিক্ষকে; ভাষা, সাহিত্য ও রূপতত্ত্বের গভীর পাঠ নিয়েছেন সেখান থেকেই। অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম, মাস্টার্সেও সেরা ফল, নিজের প্রতিভার প্রমাণ রেখেছিলেন তিনি বারবার।

বিশ্ববিদ্যালয় শেষে চাকরির পথে হাঁটেননি। মন পড়ে ছিল কেবল লেখায়। পূর্ণকালীন লেখক হওয়ার কঠিন পথ বেছে নিলেন, নির্জন ঘরে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কলম চালিয়ে একের পর এক উপন্যাস লিখে গেলেন।

তাঁর লেখার শক্তি ছিল গভীর আবেগ, জীবনের কাঁচা সত্য, আর মনস্তত্ত্বের নিখুঁত রূপায়ণ। অল্প দিনেই নাম ছড়িয়ে পড়ল পাঠকমহলে। একুশে বইমেলায় তাঁর বই এলেই প্রকাশকের ব্যানারে নাম উঠত, পাঠকের দীর্ঘ লাইন পড়ত। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকত একটা অটোগ্রাফের আশায়।

এত খ্যাতির মধ্যেও ইয়াছির থেকে গেছেন একরকম আড়ালের মানুষ। প্রচার তাঁর পছন্দ ছিল না কখনোই। টকশোতে যাননি, পত্রিকা বা রেডিওতে সাক্ষাৎকার দেননি। বিশ্বাস করতেন, লেখকের আসল পরিচয় বইয়ের পাতায়; মুখ দেখানোর দরকার নেই। আড়ালে থেকেই তিনি জাতিকে উপহার দিয়ে গেছেন ধ্রুপদী সাহিত্য।

তাঁর জীবন ছিল পরিমিত ও সুশৃঙ্খল। রয়্যালটির টাকায় তিনজনের সংসার ভালোই চলছিল। মায়ের অবসরজীবন, ইয়াছিরের বইয়ের জগৎ, ছোট্ট ফ্ল্যাট, সব মিলিয়ে জীবনটা ছিল শান্ত এক দিঘির মতো।

এরই মাঝে এলেন সুচরিতা। শান্ত, অমায়িক স্বভাবের এই মেয়েটি ইয়াছিরের নির্জন মনটাকে ভালোই বুঝতেন। মায়ের সম্মতিতেই বিয়ে হলো। সুচরিতা ঘরে পা রাখার পর ফ্ল্যাটটা যেন নতুন প্রাণ পেল; প্রতিটা কোণে ফুটে উঠল এক স্নিগ্ধ পরিপাটি ছাপ।

লেখার টেবিলে চা পৌঁছে দেওয়া, মায়ের ওষুধের খেয়াল রাখা, প্রতিটা পাণ্ডুলিপির প্রথম পাঠিকা হওয়া, এভাবেই সুচরিতা এই সংসারের প্রাণভোমরা হয়ে উঠলেন। ইয়াছির ভাবতেন, জীবনের সব শূন্যতা বুঝি সৃষ্টিকর্তা একসঙ্গে ভরে দিয়েছেন। কিন্তু ভাগ্য যা লিখে রাখে, তা মানুষের ভাবনার চেয়ে ঢের বেশি নিষ্ঠুর।

তিন বছর আগের এক শীতের রাত। সুচরিতা তখন পূর্ণগর্ভা। মাঝরাতে হঠাৎ জটিলতা শুরু হলে ইয়াছির তাড়াহুড়ো করে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। ডাক্তারের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে প্রসবের টেবিলেই সুচরিতা শেষ নিশ্বাস ফেলেন।

জন্ম নিল নতুন প্রাণ, রুদ্র। কিন্তু সেই জন্মের আনন্দে ভাসার উপায় ইয়াছিরের ছিল না, কারণ পাশেই শুয়ে সুচরিতার নিথর দেহ। ত্রিশ বছর বয়সে মাতৃহীন হয়ে গেল সদ্যজাত শিশু। ইয়াছির কান্না বুকের গভীরে চেপে ধরে সন্তানকে বুকে টেনে নিলেন।

স্ত্রীর শোক ইয়াছিরকে প্রায় ভেঙে ফেলেছিল, কিন্তু কোলের রুদ্র আর বৃদ্ধা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁকে শক্ত হতে হয়েছিল। সেদিন থেকে ইয়াছির শুধু লেখক নন, একইসঙ্গে মা আর বাবা হয়ে উঠলেন। তখনও তিনি জানতেন না, দুঃসময়ের শুরু মাত্র; আসল ঝড় তখনও বাকি ছিল।

গত দুই-তিন বছরে প্রযুক্তিতে ঘটে গেল এক অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারে প্রকাশনা শিল্পের চেনা কাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে শুরু করল। বইয়ের বাজারে নামল এক নিষ্ঠুর পরিবর্তন।

যে প্রকাশকেরা একদিন ইয়াছিরের পাণ্ডুলিপির জন্য এই ফ্ল্যাটের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতেন, তাঁরাই এখন মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এআই দিয়ে সামান্য খরচে, মাত্র কয়েক ঘণ্টায় শত শত পাতার বই তৈরি হয়ে যাচ্ছে এখন।

মানুষের রক্তমাংসের আবেগ, বছরের পর বছরের সাধনা, এসবের কোনো দাম রইল না বাণিজ্যমুখী প্রকাশকের চোখে। সস্তায় ও দ্রুত বই বের করাই হয়ে উঠল একমাত্র লক্ষ্য। নতুন পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতে গিয়ে ইয়াছিরকে শুনতে হলো অপমানজনক কথা। বলা হলো, তাঁর মতো সনাতন ধারার লেখকের চাহিদা আর নেই, কম্পিউটারই এখন ভালো গল্প লিখে দিচ্ছে।

রয়্যালটি বন্ধ হওয়ার পর সঞ্চয়ে টান পড়ল। কিছুদিন টেনেটুনে চললেও বিপদ ক্রমে ঘনীভূত হলো। মা হঠাৎ হৃদরোগ আর ফুসফুসের জটিলতায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন।

মাকে বাঁচাতে শেষ সঞ্চয়টুকুও ডাক্তারের ফি, পরীক্ষা আর ওষুধের পেছনে খরচ হয়ে গেল। জমানো প্রতিটা পয়সা ফুরিয়ে এলো, এমনকি নিত্যদিনের বাজার করার টাকাও একসময় ইয়াছিরের হাতে রইল না।

এর মধ্যে রুদ্র তিন বছরে পা দিয়েছে। মায়ের আদর না পাওয়া ছেলেটা শুধু বাবার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। কিন্তু ঘরে খাবার বলতে কিছু নেই। চালের কৌটা ফাঁকা, ডালের বয়ামে ধুলো, আর শিশুর প্রধান খাবার গুঁড়ো দুধের শেষ কৌটাও দুদিন আগে খালি হয়ে গেছে।

দুদিন ধরে রুদ্র শুধু পানি আর সামান্য ভাতের মাড় খেয়ে বেঁচে আছে। দারিদ্র্য কী, এআই তার বাবার পেশা কীভাবে গিলে খেয়েছে, এসব ছেলেটা বোঝে না। সে কেবল ক্ষুধায় বাবার জামার আঁচল টেনে ধরে কেঁদে ওঠে।

"বাবা, দুধ খাবো, দুধ দাও।" রুদ্রের এই কান্না তীরের মতো বিঁধছিল ইয়াছিরের বুকে। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে চাইলেন, কিন্তু গলা শুকিয়ে আসছিল, কোনো কথা বেরোল না। নিজেকে তখন পৃথিবীর সবচেয়ে অপদার্থ বাবা মনে হচ্ছিল তাঁর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্র, যাঁর ধ্রুপদী বই হাজার পাঠক শ্রদ্ধায় পড়েছে, আজ সেই মানুষ নিজের তিন বছরের ছেলের জন্য এক কৌটা দুধ কিনতে পারেন না। এই দারিদ্র্য, এই অসহায়ত্ব ইয়াছিরের আত্মসম্মানকে ধীরে ধীরে পিষে ফেলছিল।

উপায় না দেখে ইয়াছির পরিচিত লেখক বন্ধু, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী আর পুরনো প্রকাশকদের কাছে সাহায্য চাইতে বেরোলেন। একের পর এক ফোন করলেন, কারও অফিসে সরাসরি গিয়ে হাজির হলেন। করুণা বা দান চাননি কারও কাছে; চেয়েছিলেন সামান্য ধার, বা নতুন পাণ্ডুলিপির বিনিময়ে সামান্য অগ্রিম। কিন্তু আধুনিক সমাজ বড় নিষ্ঠুর, বড় অর্থকেন্দ্রিক। একসময় যাঁরা তাঁকে ঘিরে প্রশংসা করতেন, আজ তাঁর দুর্দিনে তাঁরাই দূরে সরে গেলেন।

কেউ বাজারের মন্দার অজুহাত দিলেন, কেউ ফোন ধরেই অস্বীকার করলেন। এমনকি সবচেয়ে কাছের বন্ধুও ঠান্ডা গলায় বললেন, এই মুহূর্তে ধার দেওয়ার মতো অবস্থা তাঁদের নেই। ইয়াছির বুঝলেন, এই বিশাল ঢাকা শহরে তাঁর পরিবারের সত্যিকারের কেউ নেই।

সন্ধ্যা নামতেই ফ্ল্যাটের অন্ধকার আরও গাঢ় হলো। বিদ্যুৎ বিল বাকি থাকায় সংযোগ কেটে দেওয়ার হুমকি দিয়ে গেছে অফিস। ঘরে জ্বলছে শুধু একটা টিমটিমে মোমবাতি।

মা বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলেন, ওষুধের সময় পেরিয়ে গেছে কিন্তু ঘরে ওষুধ নেই। রুদ্র কাঁদতে কাঁদতে একসময় ইয়াছিরের কোলেই ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমের মধ্যেও তার ছোট ছোট দীর্ঘশ্বাস আর ঠোঁটের কাঁপুনি দেখে ইয়াছিরের মাথা কাজ করছিল না।

ঘুমন্ত রুদ্রকে মায়ের পাশে শুইয়ে দিলেন। মায়ের শীর্ণ হাতটা কিছুক্ষণ ধরে বসে রইলেন। তারপর ঠিক করলেন, কিছু একটা করতেই হবে। সন্তানকে না খাইয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরতে দেখা কোনো বাবার পক্ষে সম্ভব না। পিতৃত্বের টানে নিজের সারাজীবনের আত্মসম্মান, বংশের গৌরব, নৈতিকতার দেয়াল, সবকিছু ভাঙতে প্রস্তুত হলেন তিনি।

গায়ে পুরনো চাদর জড়িয়ে ঘর থেকে বেরোলেন। সিদ্ধেশ্বরীর গলি পেরিয়ে ধীরে হাঁটতে লাগলেন মালিবাগ মোড়ের দিকে। রাতের ঢাকা তখনও ঝলমলে, রাস্তায় গাড়ির সারি, মানুষ নিজেদের ব্যস্ততায় মগ্ন। কিন্তু ইয়াছিরের চোখের সামনে ভাসছিল শুধু রুদ্রের ক্ষুধার্ত, নিস্তেজ মুখ।

হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলেন মালিবাগ মোড়ের 'স্বপ্ন' সুপারশপের সামনে। কাচঘেরা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই দোকানে রঙবেরঙের পণ্যের ছড়াছড়ি, ভেতরে মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত মানুষেরা কেনাকাটায় ব্যস্ত।

দরজার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন ইয়াছির। বুক দুরুদুরু করছিল, কপালে ঠান্ডা ঘাম। জীবনে কখনো কারও একটা পয়সাও না বলে ছোঁননি। আজ তিনি এক মরিয়া বাবা, পেছনে এক ক্ষুধার্ত সন্তানের কান্না।

ধীরপায়ে শপে ঢুকলেন। জীর্ণ পোশাক আর মলিন চেহারা দেখে নিরাপত্তারক্ষীরা একবার আড়চোখে তাকাল, কিছু বলল না। তাক পেরিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন শিশুখাদ্যের সারিতে।

সারিবদ্ধ দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের দুধের কৌটা। একটা পরিচিত ব্র্যান্ডের কৌটা তুলে নিলেন হাতে। দামের অঙ্কের দিকে তাকিয়ে চোখ ঝাপসা হয়ে এলো; এই টাকা তাঁর কাছে এখন দুঃস্বপ্নের মতো দূরের।

চারপাশে তাকালেন একবার। ক্রেতাদের ভিড়ে সবাই যে যার কেনাকাটায় ব্যস্ত। হাত কাঁপছিল, বুক ধুকপুক করছিল দ্রুত থেকে দ্রুততর। কৌটাটা চাদরের তলায় লুকিয়ে ফেললেন সাবধানে। জীবনের প্রথম অপরাধ করতে গিয়ে যেন শিরায় শিরায় রক্ত জমে যাচ্ছিল তাঁর।

স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ক্যাশ কাউন্টার পেরিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। কিন্তু পাপের পথ সহজ হয় না কখনো। সিসিটিভিতে নজর রাখা এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা আগেই খেয়াল করেছিলেন তাঁর অস্বাভাবিক আচরণ।

ঠিক যখন ইয়াছির কাচের স্বয়ংক্রিয় দরজা পেরিয়ে ফুটপাতে পা রাখতে যাবেন, পেছন থেকে দুটো শক্ত হাত এসে চাদর চেপে ধরল। "চোর! চোর! ধর চোরকে!" রক্ষীর চিৎকারে এক মুহূর্তে তছনছ হয়ে গেল শপের শান্ত পরিবেশ।

কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষী আর কর্মচারী ঘিরে ফেলল ইয়াছিরকে। টানাহেঁচড়ায় চাদরের তলা থেকে দুধের কৌটা সশব্দে গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। উপস্থিত ক্রেতারা কেনাকাটা থামিয়ে সেই দৃশ্য দেখতে ভিড় করলেন।

তাঁকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হলো শপের পেছনের এক কোণে। একটা খুঁটির সঙ্গে দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলা হলো। ম্যানেজার ক্রুদ্ধ গলায় গালিগালাজ করতে লাগলেন।

কাচের দরজা পেরিয়ে পথচারী আর কৌতূহলী মানুষ ভিড় জমাল ভেতরে। ভদ্রবেশী একজন মানুষকে চুরির অপরাধে বাঁধা অবস্থায় দেখে কেউ কেউ মোবাইল বের করে ছবি তুলল, কেউ ছুড়ে দিল কটু মন্তব্য। "তোর মতো চোরের জন্যই দেশের বদনাম!" "দেখতে তো ভদ্রলোক, ভেতরে ভণ্ড চোর!" এমন নানা কথায় বাতাস ভারী হয়ে উঠল।

ইয়াছির প্রতিবাদ করলেন না, মাথা নিচু করে রইলেন। চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল অঝোরে; সেই জল অপমানের নাকি পরাজয়ের, বোঝার মতো মানুষ সেখানে কেউ ছিল না।

ভিড়ের মধ্যে থেকে কয়েকজন উৎসাহী যুবক আর কর্মচারী থাপ্পড়, ঘুসি মারতে শুরু করল। "চোরের শাস্তি না দিলে শিক্ষা হবে না," এই অজুহাতে হাত তুলল তারা। প্রতিটা আঘাত শরীরের চেয়েও বেশি বিঁধছিল আত্মায়।

একদিন যিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্র, যাঁর হাতে লেখা সাহিত্য হাজারো মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে, আজ সেই হাত দড়িতে বাঁধা, শরীরে বর্ষিত হচ্ছে গণপ্রহার। তবু মুখে আক্ষেপের কোনো ভাষা ছিল না তাঁর। শারীরিক যন্ত্রণা বা সামাজিক লজ্জার তোয়াক্কা করছিলেন না তিনি; মারধরের মধ্যে শুধু একটা কথাই বারবার আকুল গলায় বলে যাচ্ছিলেন, "আপনারা যা খুশি মারুন, শুধু আমাকে ছেড়ে দিন। আমার তিন বছরের ছেলে ঘরে অনাহারে কাঁদছে। দুধের অভাবে ও মরে যাবে। আমাকে একটা সুযোগ দিন, ও খুব ক্ষুধার্ত!"

সেই আকুতি, সেই চোখের জল কারও কারও মনে সামান্য দ্বিধা তৈরি করলেও বেশিরভাগের হৃদয় গলাতে পারল না। আধুনিক শহুরে জীবন মানুষকে বড় বেশি অসাড় আর সন্দিগ্ধ করে তুলেছে। সবাই ভাবল, ধরা পড়া চোর এমন হাজার মিথ্যা অজুহাত বানায়।

ম্যানেজার ঘোষণা দিলেন, পুলিশ না আসা পর্যন্ত এভাবেই বাঁধা থাকবে সে। দেয়ালে হেলান দিয়ে ইয়াছির চোখ বন্ধ করলেন। মনের পর্দায় ভেসে উঠল সিদ্ধেশ্বরীর সেই ফ্ল্যাটের ছবি— বিছানায় শুয়ে অসুস্থ মা, পাশে ক্ষুধার্ত রুদ্র হয়তো অন্ধকার ঘরে বাবার পথ চেয়ে কেঁদে কেঁদে নেতিয়ে পড়ছে। ইয়াছির ভাবলেন, তিনি কি সত্যিই কোনো অপরাধ করেছেন? সন্তানকে বাঁচানোর আকুতি কি অপরাধ হতে পারে? বাবার রক্ত, মায়ের সারাজীবনের শিক্ষকতা, তাঁর নিজের নির্জন সাধনা, সমাজ কি তাঁকে শেষে এই উপহারই দিল?

রাত গভীর হচ্ছিল। মালিবাগ মোড়ের কোলাহল কমে আসছিল ধীরে ধীরে, কিন্তু শপের ভেতরের আলো তখনও সমান উজ্জ্বল। ইয়াছির বাঁধা অবস্থায় মেঝেতে বসে, ঠোঁটের কোণে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত, কপালে কালশিটে দাগ।

মিডিয়া থেকে সবসময় নিজেকে দূরে রেখেছিলেন তিনি। চাননি কখনো নিজের মুখ লোকচক্ষুর সামনে আসুক। চেয়েছিলেন সাহিত্যই যেন তাঁর পরিচয় হয়ে থাকে। আজ যদি তিনি পরিচিত মুখ হতেন, নিয়মিত টিভিতে আসতেন, হয়তো এভাবে মালিবাগের রাস্তায় লাঞ্ছিত হতে হতো না। কিন্তু আড়াল থেকে সমাজকে কিছু দিতে চাওয়া এই মানুষটি আজ সমাজের চোখে নিছক এক সস্তা চোর। বুকের ভেতর জমছিল গভীর অভিমান। এই দেশ, এই শহর যেন তাঁর পিতৃত্বের মর্যাদা পায়ের তলায় পিষে দিয়েছে।

দূরে কোথাও পুলিশের সাইরেন বাজছিল। হয়তো আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আইনের হাতে তুলে দেওয়া হবে তাঁকে। কিন্তু ইয়াছিরের মন পড়ে ছিল সিদ্ধেশ্বরীর সেই ফ্ল্যাটে, যেখানে রুদ্র হয়তো তখনও বাবার নাম ধরে ডাকছে।

মালিবাগ মোড়ের আলো ঝলমলে সুপারশপের বাইরে তখন পুলিশের গাড়ির লাল-নীল আলো জ্বলছে। সাইরেনের শব্দে ফুটপাতে জমল কৌতূহলী মানুষ। দোকানের ভেতরে চাল, ডাল, প্রসাধনসামগ্রীর মাঝে ইয়াছির তখনও পিলারের সঙ্গে বাঁধা, কপাল থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত গড়িয়ে জমেছে চিবুকে। চাদরটা একপাশে খসে পড়েছে, সামনে মেঝেতে অবহেলায় পড়ে সেই দুধের কৌটো।

থানার ডিউটি অফিসার ঢুকতেই সিকিউরিটি গার্ড ব্যস্ত হয়ে উঠল। "স্যার, এই যে লোকটা। চাদরের নিচে কৌটা লুকিয়ে পালাচ্ছিল, হাতেনাতে ধরেছি।" অফিসার ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের এমন লাঞ্ছিত চেহারা দেখে তাঁর চোখে খানিকটা সংশয় ফুটে উঠল।

"আপনার নাম কী? বাড়ি কোথায়?" রুক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করলেন অফিসার। ইয়াছির রক্তাভ চোখ তুললেন ধীরে। গলায় ক্ষোভ ছিল না, ছিল শুধু অসীম ক্লান্তি। ফিসফিস করে বললেন, "আমার নাম ইয়াছির আহমেদ। ১৮৭/এ সিদ্ধেশ্বরী। কিন্তু থানায় নেওয়ার আগে দয়া করে এই দুধটুকু আমার ঘরে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। আমার তিন বছরের ছেলে না খেয়ে মরছে।"

অফিসার জবাব না দিয়ে গার্ডকে পকেট তল্লাশি করতে বললেন। টাকাপয়সা কিছু নেই। পাওয়া গেল শুধু একটা পুরনো, চামড়া উঠে যাওয়া মানিব্যাগ। উপুড় করতেই বেরিয়ে এলো কিছু ধুলোমাখা স্মৃতি— ১৯৭১ সালে শহীদ বাবার একটা ঝাপসা সাদাকালো পাসপোর্ট ছবি আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা পুরনো লাইব্রেরি কার্ড।

কার্ডটা হাতে নিয়ে অফিসার একটু থমকালেন। তাতে লেখা, "ইয়াছির আহমেদ, বাংলা বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ ১৯৯২-১৯৯৩।" চমকে গিয়ে লোকটার মুখের দিকে ভালো করে তাকালেন তিনি। মধ্যবয়সী এই মানুষের চেহারায় দাগি চোরের কোনো ছাপ নেই; বরং তাতে জড়িয়ে আছে শিক্ষিত, মার্জিত, আত্মমর্যাদাবান এক মুখের বিষাদ।

"আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র ছিলেন?" জিজ্ঞেস করলেন অফিসার। ইয়াছির উত্তর দিলেন না, শুধু চোখ বন্ধ করে রইলেন। সন্তানের খাবার কেনার সামর্থ্য যাঁর নেই, তাঁর কাছে ডিগ্রির অহংকার বড়ই অর্থহীন লাগে। এই শিক্ষাগত পরিচয় যেন তাঁর বর্তমান লাঞ্ছনাকে আরও বাড়িয়ে তুলছিল।

ঠিক তখনই ভিড়ের কোণে দাঁড়িয়ে ঘটনা দেখছিল শপের এক তরুণ কর্মী। সে হঠাৎ এগিয়ে এসে চেঁচিয়ে উঠল, "ইয়াছির আহমেদ! আপনি কি কথাসাহিত্যিক ইয়াছির আহমেদ? যাঁর 'অক্ষরের অশ্রুজল' আর 'পিতা' মেলায় হাজার কপি বিক্রি হতো?"

এই প্রশ্নে গোটা শপ যেন থমকে গেল। যারা একটু আগে "চোর, চোর" বলে চিৎকার করছিল, যারা মেরেছিল তাঁকে, তারা সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। দেশের ধ্রুপদী সাহিত্যের এক ধারক এভাবে সুপারশপ থেকে দুধ চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন, এটা যেন কারও বিশ্বাসই হতে চাইছিল না।

শপের ম্যানেজার হতবাক হয়ে হাঁটু গেড়ে বসলেন ইয়াছিরের সামনে। গলা কাঁপছিল তাঁর। "স্যার, আপনি? আপনি কেন এমন করতে গেলেন? আমাদের বললেই তো সাহায্য করতাম!" ইয়াছির ধীর গলায় বললেন, "আমি ভিক্ষা চাইতে আসিনি। চেয়েছিলাম সন্তানের জন্য কিছু জোগাড় করতে। মেধা বিক্রি করে আজ আমি নিঃস্ব, কিন্তু সন্তানের ক্ষুধা কোনো নীতিশাস্ত্র বোঝে না।"

লজ্জা আর অপরাধবোধে কর্মচারী আর গার্ডদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। একটু আগে যারা পশুর মতো মেরেছিল এই মানুষটাকে, তারা এবার ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে লাগল। মানুষের বাহ্যিক মোড়ক দেখে সমাজ সম্মান দেয় বা কেড়ে নেয়, কিন্তু পেটের ক্ষুধা যে জাতকুল বা খ্যাতি মানে না, এই অন্ধকার রাতে সেটাই স্পষ্ট হলো।

অফিসার আর দেরি করলেন না। ইয়াছিরের হাতের বাঁধন খুলে দিলেন। মুক্ত হয়ে অবশ হয়ে যাওয়া হাত দুটো একটু নাড়ালেন ইয়াছির। মনে তখন রাগ বা প্রতিশোধের কোনো ভাবনা নেই, শুধু তাকিয়ে রইলেন মেঝেতে ধুলো মাখা পড়ে থাকা দুধের কৌটার দিকে।

"স্যার, আমরা অত্যন্ত দুঃখিত। চিনতে পারিনি আপনাকে। কোনো কেস হবে না, বাড়ি যান।" হাত জোড় করে বললেন অফিসার। সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন ইয়াছির, কিন্তু দুর্বল শরীর কেঁপে উঠল। বললেন, "আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন। সমাজকে কিছু দিতে এসেছিলাম, শেষে একটা চোর হয়েই ফিরে যাচ্ছি।"

পুলিশের গাড়ি থেকে নেমে সিদ্ধেশ্বরীর গলিতে ঢোকার পথে ইয়াছিরের মনে ভেসে উঠল ত্রিশ বছরের ইতিহাস। ১৯৯৩ সালের জানুয়ারি— তরুণ ইয়াছির তখন সদ্য বাংলা বিভাগে পা রেখেছেন। কলা ভবনের করিডোর, কার্জন হলের লাল ইট, মধুর ক্যান্টিনের আড্ডা, সব মিলিয়ে সাহিত্যের এক মায়াবী জগতে ঢুকে পড়েছিলেন তিনি।

সেদিন মা স্কুলের বেতন থেকে কিছু টাকা বাঁচিয়ে হাতে তুলে দিয়েছিলেন নতুন একটা ফাউন্টেন পেন। বলেছিলেন, "ইয়াছির, তোর বাবা দেশের জন্য রক্ত দিয়েছেন। এই কলম দিয়ে তুই লিখবি মানুষের কষ্টের কথা। এমন কিছু লিখবি, যা মানুষের আত্মাকে নাড়া দেবে।"

মায়ের সেই কথা মনে রেখেই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাতগুলোতে জেগে ধ্রুপদী সাহিত্য চর্চা করেছেন তিনি। অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী আর ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর স্মৃতিবিজড়িত সেই বিভাগে ইয়াছির ছিলেন এক উজ্জ্বল নাম। অনার্সে প্রথম শ্রেণি পেয়েও কোনো সরকারি বা করপোরেট চাকরিতে যাননি, কারণ সাহিত্যকে ভালোবেসেছিলেন সবচেয়ে বেশি।

সেই ১৯৯২-৯৩ সেশনের দিনগুলোই ছিল ইয়াছিরের জীবনের সবচেয়ে স্বর্ণালী অধ্যায়। লাইব্রেরির কোণে বসে রবীন্দ্রনাথের গল্পের রূপতত্ত্ব খুঁজতে, বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষা নিয়ে ভাবতে ভাবতে কেটে যেত ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

সহপাঠীরা যখন বিসিএসের কোচিংয়ে দৌড়াদৌড়ি করত, ইয়াছির তখন বুড়িগঙ্গার তীরে বসে দেখতেন সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। তাঁর বিশ্বাস ছিল, খাঁটি সাহিত্য জন্মায় মানুষের জীবনের মাটির গন্ধ থেকে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের কল্পনা থেকে নয়।

মা সবসময় পাশে ছিলেন। সামান্য বেতনে সংসার চালিয়েও কখনো ছেলেকে চাকরির জন্য চাপ দেননি। বলতেন, "তোর বাবা দেশকে ভালোবেসে প্রাণ দিয়েছে, তুই সাহিত্যকে ভালোবেসে জীবন কাটা। টাকাপয়সা হয়তো বেশি পাবি না, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা পাবি।" মায়ের এই বিশ্বাসই ছিল ইয়াছিরের একমাত্র ভরসা।

মায়ের নিজের জীবনটাও এক দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। ১৯৩৩ সালের ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে তিনি তিন দশক শিক্ষকতা করেছেন বিশ্বস্ততার সঙ্গে। বেইলি রোড সংলগ্ন এই স্কুল শত শত মেয়েকে শিক্ষার আলো দেখিয়েছে।

প্রতিদিন সকালে রান্না সেরে হেঁটে স্কুলে যেতেন মা। বিকেলে ফিরে আবার বসতেন ইয়াছিরের পড়া নিয়ে। বছরের পর বছর নিজের জন্য একটা নতুন শাড়িও কেনেননি; শুধু টাকা জমিয়েছেন, যেন পিতৃহীন ছেলেটা অভাব বুঝতে না পারে।

শেষে সেই জমানো বাইশ লক্ষ টাকায় কিনেছিলেন সিদ্ধেশ্বরীর এই বারোশো বর্গফুটের ফ্ল্যাট। কেনার দিন ছেলেকে ডেকে বলেছিলেন, "ইয়াছির, এই ছাদটুকু আমাদের নিজের। এখানে বসে তুই স্বাধীনভাবে লিখবি, কাউকে তোষামোদ করতে হবে না।"

পরিবারের শেকড় ছিল ভারতের চব্বিশ পরগনায়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর লাখো মানুষের মতো ইয়াছিরের দাদাও ভিটেমাটি ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। নতুন দেশে শূন্য থেকে শুরু করতে হয়েছিল তাঁদের।

১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হলে ইয়াছিরের বাবা ঘর ছেড়ে চলে যান। ইয়াছির তখন মায়ের গর্ভে। বাবা আর ফেরেননি— যুদ্ধের শেষদিকে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে তুলে নিয়ে হত্যা করে। শহীদ বাবার মুখ ইয়াছির কোনোদিন দেখেননি।

মা তাঁকে বড় করেছেন বাবার একটা পুরনো ঘড়ি আর একখানা ডায়েরি দেখিয়ে। বলতেন, "তোর বাবা বলতেন, সততার চেয়ে বড় সম্পদ মানুষের হয় না। আমরা চব্বিশ পরগনা থেকে সব হারিয়ে এসেছি, কিন্তু ঈমান আর সততা হারাইনি।" মায়ের এই শিক্ষা ইয়াছির কখনো ভোলেননি।

বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে প্রথম বই প্রকাশ পেতেই পাঠকমহলে আলোড়ন তৈরি হয়েছিল। কোনো সস্তা চমক ছাড়াই, শুধু গভীর মানবিক অনুভূতি আর ভাষার জাদুতে তিনি জয় করে নিয়েছিলেন পাঠকের হৃদয়।

একুশে বইমেলায় তাঁর স্টলের সামনে ভিড় লেগে থাকত। প্রকাশকেরা ফ্ল্যাটে এসে লাইন দিতেন পাণ্ডুলিপির জন্য, অগ্রিম হিসেবে লাখ টাকা দিতে চাইতেন। কিন্তু ইয়াছির কখনো অতিরিক্ত নিতেন না; যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই নিতেন।

অনেক পরিচিত লেখক তখন টিভি টকশো আর পত্রিকার সাক্ষাৎকারে ব্যস্ত, নিজেদের প্রসারে মগ্ন। ইয়াছির তখন ঘরের কোণে বসে নির্জনে সাধনা করতেন। বলতেন, লেখক যখন নিজের মুখ বিক্রি শুরু করে, তার অক্ষরের জোর কমে যায়— লেখকের পরিচয় থাকা উচিত তার সাহিত্যেই।

সেই সুবর্ণ সময়ে এলেন সুচরিতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্রী, ইয়াছিরের সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠিকা। তাঁর নির্জনতা আর সরলতায় মুগ্ধ হয়ে এই অভাবী কিন্তু আত্মমর্যাদাবান পরিবারে বধূ হয়ে এসেছিলেন তিনি।

সুচরিতা আসার পর ফ্ল্যাটটা শান্তিতে ভরে উঠেছিল। শাশুড়ির সেবা, ইয়াছিরের এলোমেলো লেখা গুছিয়ে রাখা, ঘরটাকে পরিপাটি রাখা, সুচরিতা যেন এই সংসারের লক্ষ্মী হয়ে উঠেছিলেন।

তখনই ইয়াছির লিখেছেন জীবনের সেরা উপন্যাসগুলো। প্রতি বছর মেলায় তাঁর বই মানেই বেস্টসেলার তালিকার শীর্ষ। অর্থ আর যশ দুটোই তখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু সুখের সেই দিন যে এত দ্রুত শেষ হবে, তা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি ইয়াছির।

তিন বছর আগের সেই রাতে সুচরিতা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান। মুহূর্তে ওলটপালট হয়ে যায় ইয়াছিরের গোটা পৃথিবী। অপারেশন থিয়েটারের বাইরে ডাক্তার এসে বলেছিলেন, "আমরা মা-কে বাঁচাতে পারলাম না, কিন্তু সুন্দর একটা ছেলে হয়েছে আপনার।" ইয়াছির তখন পাথরের মতো স্থির দাঁড়িয়ে ছিলেন।

কোলে তুলে দেওয়া নবজাতক রুদ্রকে দেখে কান্না আর বেদনায় প্রায় ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। সুচরিতাকে হারানোর ক্ষত তাঁকে মানসিকভাবে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু বৃদ্ধা মা শক্ত হাতে নাতিকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন।

মা বলেছিলেন, "ইয়াছির, সুচরিতা তোকে রুদ্রকে দিয়ে গেছে। এই সন্তানই এখন তোর একমাত্র সম্বল। বাঁচতে হবে এই শিশুর জন্য।" নিজের কষ্ট চেপে ধরে কলম আবার তুলে নিয়েছিলেন ইয়াছির। কিন্তু ততদিনে সাহিত্যের বাজারে দেখা দিতে শুরু করেছে এক অদৃশ্য মড়ক।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আবির্ভাব প্রকাশনা শিল্পে নামিয়ে আনল এক কঠিন অন্ধকার। বিশ্বজুড়ে অ্যালগরিদমের আধিপত্যে প্রথাগত সাহিত্যচর্চা বড় একটা ধাক্কা খেল। দেশের নামী প্রকাশকেরা লাভ-ক্ষতির নতুন হিসাব কষতে লাগলেন।

এআই দিয়ে মিনিটের মধ্যে যেকোনো ধাঁচের উপন্যাস, গল্প বা অনুবাদ তৈরি করা সম্ভব হয়ে উঠল, লেখককে সম্মানী দিতে হয় না, মাসের পর মাস পাণ্ডুলিপির অপেক্ষা করতে হয় না। কম্পিউটারে তৈরি পাণ্ডুলিপি বাজারে সয়লাব করে দিতে লাগলেন প্রকাশকেরা। মৌলিক মানবিক অনুভূতি আর সাধনার জায়গা দখল করে নিল যান্ত্রিক শব্দমালা। ইয়াছিরের মতো লেখকেরা হঠাৎ নিজেদের আবিষ্কার করলেন এক নির্দয় নতুন জগতে, যেখানে মানুষের রক্তের অক্ষরের কোনো দাম নেই।

নতুন পাণ্ডুলিপি নিয়ে পুরনো প্রকাশকের কাছে গেলে সেই প্রকাশক চা খাইয়ে ঠান্ডা গলায় বললেন, "ইয়াছির সাহেব, লেখার মান নিয়ে কোনো কথা নেই, কিন্তু বাজার বদলে গেছে। এখন পাঠক গভীর উপন্যাস পড়ে না, সস্তা বিনোদন চায়। আর এআই দিয়ে এখন আমরা ইচ্ছেমতো গল্প বানাচ্ছি, খরচ নামমাত্র। আপনার এই জটিল সামাজিক উপন্যাস ছাপিয়ে লাভ হবে না। রোমান্টিক থ্রিলার সস্তায় লিখে দিতে পারলে দেখতে পারি।"

স্তব্ধ হয়ে শুনেছিলেন সেই কথা ইয়াছির। মেধা আর আত্মসম্মান বিক্রি করে সস্তা গল্প লেখা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। পাণ্ডুলিপি ব্যাগে ভরে বুকভাঙা কষ্ট নিয়ে হেঁটে ফিরেছিলেন সিদ্ধেশ্বরীর ঘরে। সেদিন থেকেই তাঁর আয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল।

আয় বন্ধ হতেই সঞ্চয় গলতে শুরু করল। আসল বিপদ এলো তখন, যখন মা মারাত্মক হৃদরোগ আর কিডনির জটিলতায় আক্রান্ত হলেন। যে মা সারাজীবন কষ্ট করে তাঁকে মানুষ করেছেন, সেই মায়ের চিকিৎসার জন্য নিজের শেষ সম্বলটুকু বাজি রাখলেন ইয়াছির।

পাণ্ডুলিপি বিক্রির সামান্য সঞ্চয়, সুচরিতার রেখে যাওয়া দুয়েকটা গয়না, সব একে একে বিক্রি হয়ে গেল ডাক্তারের ভিজিট আর ডায়ালিসিসে। কিন্তু মায়ের শরীরের কোনো উন্নতি হলো না; তিনি একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন।

এদিকে রুদ্র বড় হচ্ছিল। মায়ের বুকের দুধ না পাওয়া শিশুর মূল খাবার ছিল বাজারের গুঁড়ো দুধ। কিন্তু একসময় ইয়াছিরের হাতে টাকা রইল না একটাও। আয় শূন্য, ওষুধের টাকা নেই, চালের বয়াম পুরোপুরি খালি।

তিন দিন আগে ঘরের শেষ দুধের কৌটাটা ফুরিয়ে গিয়েছিল। রুদ্র কৌটাটা উপুড় করে শেষ গুঁড়োটুকুও চেটে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। সেই দৃশ্য দেখে ইয়াছিরের বুকের ভেতরটা দুমড়ে গিয়েছিল।

পরদিন সকাল থেকে শিশুটা এক ফোঁটা দুধ পায়নি। চাল ফুটিয়ে মাড় খাওয়ানোর চেষ্টা করেছিলেন ইয়াছির, কিন্তু তিন বছরের রুদ্র সেই তেতো মাড় মুখ থেকে ফেলে দিয়ে কেঁদে উঠেছিল, "বাবা, দুধ! দুধ দাও!" এই সরল আকুতি সিদ্ধেশ্বরীর শান্ত ঘরে কাচের মতো ভেঙে পড়ছিল।

পুরনো বন্ধুদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছিলেন ইয়াছির। যেসব বন্ধু একদিন তাঁর মেধার প্রশংসা করত, এখন বড় বড় পদে বসা, তারা সবাই ব্যস্ততার অজুহাতে ফিরিয়ে দিল। কেউ পাঁচশো টাকা ধার দেওয়ার সৌজন্যও দেখাল না।

আগের রাতে শেষবার এক পুরনো প্রকাশকের দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন যখন, প্রকাশক তাঁকে পাঁচশো টাকার নোট বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, "ইয়াছির সাহেব, ভিক্ষা হিসেবে নিয়ে যান। নতুন পাণ্ডুলিপি আর আনবেন না, এখন এআইয়ের যুগ, আপনার মতো লেখকের আর দরকার নেই।"

সেই নোট নেননি ইয়াছির। নীরব চোখে প্রকাশকের দিকে তাকিয়ে হেঁটে বেরিয়ে এসেছিলেন। ভিক্ষার টাকায় সন্তানকে খাওয়ানোর চেয়ে মরে যাওয়া ভালো, এমন অভিমান জন্মেছিল তাঁর মনে।

কিন্তু আজ বিকেলে রুদ্র কাঁদতে কাঁদতে নিস্তেজ হয়ে মেঝেতে পড়ে গেলে, চোখের তারা দুটো ওলটপালট হতে শুরু করলে, ইয়াছিরের সব অভিমান ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল। বুঝলেন, একজন মৃত লেখকের আত্মসম্মানের চেয়ে এক ফোঁটা দুধের দাম অনেক বেশি।

সেই তাড়না থেকেই আজ সন্ধ্যায় মালিবাগ মোড়ের 'স্বপ্ন' সুপারশপে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। পকেটে শূন্যতা, মাথায় সন্তানের নিস্তেজ মুখ। ভেবেছিলেন, চুরি করা পাপ, কিন্তু সন্তানকে না খাইয়ে মেরে ফেলা আরও বড় অপরাধ।

কিন্তু নিয়তি বড় অদ্ভুত। সারাজীবন সততার পথে হাঁটা মানুষটা জীবনের প্রথম অন্যায় করতে গিয়েই ধরা পড়ে গেলেন। মারধরের প্রতিটা আঘাত সহ্য করার সময় শুধু মনে মনে ভাবছিলেন, "হে ঈশ্বর, আমাকে অপমান করো, কিন্তু রুদ্রের জন্য একটু দুধের ব্যবস্থা করে দাও।"

রাত বারোটা তখন। মালিবাগ মোড় থেকে ধীরপায়ে হেঁটে সিদ্ধেশ্বরীর গলিতে এসে পৌঁছালেন ইয়াছির। গায়ের চাদর ছেঁড়া, ঠোঁটের কোণে জমাট রক্ত, কিন্তু হাতে ধরা সেই দুধের কৌটো। শপের সেই তরুণ কর্মী নিজের পকেটের টাকায় কিনে জোর করে গুঁজে দিয়েছিল তাঁর হাতে।

সিঁড়ি বেয়ে ওঠার প্রতিটা পা ভারী মনে হচ্ছিল। অন্ধকার সিঁড়িঘরের নীরবতা যেন উপহাস করছিল তাঁকে। তিন তলার দরজার সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন।

ভেতর থেকে কোনো শব্দ আসছে না। কাঁপা হাতে চাবি বের করে তালা খুললেন। দরজা খুলতেই ভেসে এলো এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। মোমবাতিটা অনেক আগেই নিভে গেছে।

পকেট থেকে ম্যাচ বের করে একটা কাঠি জ্বালালেন। ছোট্ট আলোয় ঘর স্পষ্ট হয়ে উঠল। বিছানায় শুয়ে মা, বুকের কাছে গুঁড়ি মেরে ঘুমিয়ে রুদ্র। ধীরপায়ে বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন ইয়াছির।

দেশলাইয়ের আলোটা রুদ্রের মুখের কাছে নিলেন। ছেলে ঘুমাচ্ছে, গাল বেয়ে শুকিয়ে যাওয়া চোখের জলের দাগ স্পষ্ট। ঘুমের মধ্যেও মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে সে। ইয়াছির হাত বাড়িয়ে রুদ্রের মাথায় রাখলেন।

তারপর মায়ের দিকে তাকালেন। শরীর অস্বাভাবিক ঠান্ডা। "মা, ও মা, দেখো আমি রুদ্রের জন্য দুধ এনেছি।" মা সাড়া দিলেন না। কপালে হাত রাখতেই ইয়াছিরের সারা শরীর কেঁপে উঠল।

মায়ের দেহ পুরোপুরি শক্ত, হিম। ইয়াছির যখন মালিবাগের রাস্তায় চোর অপবাদে লাঞ্ছিত হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই এই নির্জন ঘরে তাঁর মা নিঃশব্দে শেষ নিশ্বাস ফেলেছেন। একটা মুক্তিযুদ্ধোত্তর পরিবার, এক আত্মত্যাগী শিক্ষকের জীবনসন্ধ্যা এভাবেই ডুবে গেল চরম নীরবতায়।

চিৎকার করে কাঁদতে পারলেন না ইয়াছির। গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না। ধীরে ধীরে বসে পড়লেন নিথর মায়ের পায়ের কাছে। হাতে ধরা দুধের কৌটোটা গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে।

একদিকে মৃত মা, অন্যদিকে ক্ষুধার্ত নিস্তেজ সন্তান, মাঝে দাঁড়িয়ে এক ব্যর্থ লেখক, যাঁকে এই সমাজ আর প্রযুক্তি ধীরে ধীরে অপাঙক্তেয় করে তুলেছে। একুশে বইমেলার হাততালি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ডিগ্রি, বাবার শহীদি গৌরব, সবকিছু যেন এই অন্ধকারে তলিয়ে গেল।


ঘমন্ত রুদ্রকে আলতো করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন ইয়াছির। অন্ধকারেও বাবার চেনা গায়ের গন্ধ পেয়ে ছেলে ডুকরে উঠল, "বাবা, দুধ?" কপালে চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বললেন তিনি, "হ্যাঁ বাবা, দুধ এনেছি। কিন্তু তোর দাদিমা আজ অনেক দূরে চলে গেছে।"

এই শহরের বুকে পিতৃত্বের যে করুণ পরাজয় ঘটে গেল আজ রাতে, তা হয়তো কোনো এআইয়ের যান্ত্রিক গল্পে কখনো লেখা হবে না। থেকে যাবে শুধু সিদ্ধেশ্বরীর এই নীরব ইটের দেয়ালের দীর্ঘশ্বাসে।

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর