img

শব্দের সীমানা পেরিয়ে: বিশ্বসাহিত্যের দোরগোড়ায় লেখক রেজুয়ান আহম্মেদের সৃজনযাত্রা

প্রকাশিত :  ০৭:২৯, ৩০ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৭:৫২, ৩০ জুন ২০২৬

শব্দের সীমানা পেরিয়ে: বিশ্বসাহিত্যের দোরগোড়ায় লেখক রেজুয়ান আহম্মেদের সৃজনযাত্রা

✍️ ড. নাজমুল ইসলাম 

সাহিত্য কখনো কেবল শব্দের যান্ত্রিক সমষ্টি নয়; সাহিত্য হলো মানুষের দীর্ঘশ্বাস, আনন্দ, বেদনা, অবিনাশী স্বপ্ন ও প্রতিবাদের এক শিল্পিত ইশতেহার। একটি জাতির প্রকৃত পরিচয় কেবল তার রাজনীতি বা অর্থনীতি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না, বরং তা নির্মিত হয় তার সাহিত্য ও সংস্কৃতির মননশীল চর্চায়। ভূগোল ও ভাষার ভিন্নতা থাকলেও মানুষের মৌলিক অনুভূতির কোনো কাঁটাতার নেই। আর সে কারণেই পৃথিবীর এক প্রান্তে বসে লেখা কোনো উপাখ্যান অন্য প্রান্তের পাঠকের হৃদয়ে অবলীলায় আলোড়ন তুলতে পারে।

বাংলা সাহিত্য আপন ঐতিহ্যে ও ঐশ্বর্যে বিশ্বমঞ্চে অনন্য। এই মাটিতে জন্ম নিয়েছেন এমন অসংখ্য কালজয়ী স্রষ্টা, যাঁদের সৃষ্টি দেশ ও কালের সীমানা অতিক্রম করেছে। তবে একবিংশ শতাব্দীর এই ডিজিটাল ও গ্লোবাল পাবলিশিংয়ের যুগে সাহিত্যের বাস্তবতা বদলেছে। এখন একজন লেখকের পাঠকপরিধি কেবল নিজ দেশের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রযুক্তি আজ সৃজনশীলতাকে এনে দিয়েছে বিশ্বজনীন এক ক্যানভাস।

এই নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক আঙিনায় মেলে ধরার এক নিষ্ঠাবান প্রয়াস চালাচ্ছেন লেখক রেজুয়ান আহম্মেদ। তাঁর সামগ্রিক সাহিত্যচর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মানুষ—মানুষের প্রাত্যহিক সংগ্রাম, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, প্রেম, সামাজিক বৈষম্য এবং এক অদম্য ন্যায়বোধ। তাঁর লেখনীর আবেগ কৃত্রিমতার দেয়াল ভেঙে সরাসরি জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে।

সম্প্রতি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রকাশনা ও বই বিতরণ প্ল্যাটফর্ম 'অ্যামাজন'-এর মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইংরেজি গ্রন্থ—The Days of Gaza এবং Love of the Forest Bird। এই প্রকাশনা কেবল দুটি বই বাজারে আসার সাধারণ ঘটনা নয়; বরং এটি সমকালীন বিশ্বপাঠকের দরবারে একজন বাংলাদেশি লেখকের জোরালো আত্মপ্রকাশ এবং বাংলা সাহিত্যের বৈশ্বিক যাত্রার এক তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ।

যুদ্ধের ক্ষত ও প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর: The Days of Gaza

একজন লেখকের প্রকৃত সার্থকতা তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যায় নয়, বরং তিনি কোন শ্রেণির মানুষের কথা বলছেন এবং কীভাবে বলছেন—তার ওপর নির্ভর করে। রেজুয়ান আহম্মেদের রচনায় যে বিষয়টি প্রথমেই দৃষ্টি কাড়ে, তা হলো মানুষের প্রতি তাঁর গভীর ও মায়াবী সহমর্মিতা। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো কোনো অতিমানবীয় রূপকথা নয়; তারা আমাদের চারপাশের রক্ত-মাংসের সাধারণ মানুষ, যারা প্রতিদিন হোঁচট খায়, ক্ষতবিক্ষত হয়, আবার নতুন করে বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে পায়।

The Days of Gaza গ্রন্থে যুদ্ধের নারকীয় বিভীষিকার মধ্যেও মানবিকতার আলো খোঁজার এক নিবিড় অন্বেষণ রয়েছে। যুদ্ধ মানে তো কেবল ভূ-রাজনীতি বা অস্ত্রের গর্জন নয়; যুদ্ধ মানে অসংখ্য ঘর হারানোর গল্প, শিশুর নিষ্পাপ শৈশব কেড়ে নেওয়ার ক্রূরতা, মায়ের অন্তহীন অপেক্ষা আর বাবার চরম অসহায়ত্ব। এই রূঢ় বাস্তবতাকে যখন লেখক সাহিত্যের ফ্রেমে বন্দি করেন, তখন তা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভূগোল ছাড়িয়ে সমগ্র মানবজাতির বিবেকের সামনে এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন ছুড়ে দেয়। প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের এই কণ্ঠস্বর এখানে কোনো উচ্চকিত স্লোগান নয়, বরং এক সংযত ও মর্মস্পর্শী নীরব প্রতিবাদ, যা পাঠককে নিজের বিবেকের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

প্রকৃতির ক্যানভাসে জীবন ও প্রেম: Love of the Forest Bird

অন্যদিকে, Love of the Forest Bird উপন্যাসটি পাঠককে নিয়ে যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিবেশে। এখানে প্রকৃতি কেবল জড় পটভূমি নয়, বরং প্রকৃতি নিজেই যেন এক জীবন্ত ও স্পন্দনশীল চরিত্র। পাহাড়, অরণ্য, ঝরনার নীরবতা আর মানুষের মনস্তত্ত্ব—সবকিছু মিলে এখানে এক অনন্য রসায়ন তৈরি হয়েছে।

আধুনিক সভ্যতার যান্ত্রিক ব্যস্ততায় প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যে আত্মিক সম্পর্কটি আজ প্রায় বিপন্ন, এই উপন্যাস আমাদের সেই আদিম ও অকৃত্রিম সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দেয়। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের লোকায়ত জীবন, সংস্কৃতি ও তাদের নীরব সংগ্রাম আন্তর্জাতিক পরিসরে খুব কমই উঠে এসেছে। সেই দিক থেকে এই ব্রাত্য জীবনকে ইংরেজি ভাষায় বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করার উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। প্রেম, ত্যাগ, দারিদ্র্য এবং সব প্রতিকূলতার মাঝেও মানুষের যে বেঁচে থাকার আদিম জিজীবিষা—তা এই উপন্যাসের মূল চালিকা শক্তি।

সমকাল, চ্যালেঞ্জ ও বিশ্বসাহিত্যের দূত

আজকের দ্রুতগতির পৃথিবীতে, যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের মনোযোগকে খণ্ডিত করে ফেলেছে, সেখানে বই পড়ার ধৈর্য ধরে রাখা এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ। তবু সাহিত্য কখনো তার প্রাসঙ্গিকতা হারায় না; কারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজের প্রতিচ্ছবি দেখার জন্য গল্পের কাছেই ফিরে আসে।

এই মনস্তাত্ত্বিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক প্রকাশনামাধ্যমে রেজুয়ান আহম্মেদের এই সৃজনশীল যাত্রা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এটি কেবল কোনো ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, তরুণ প্রজন্মের লেখকদের জন্যও এক বড় অনুপ্রেরণা। লেখক এখানে প্রমাণ করেছেন—ভাষা বদলাতে পারে, মাধ্যমের রূপান্তর ঘটতে পারে, কিন্তু আন্তরিক গল্পের সার্বজনীন আবেদন কখনো ফুরিয়ে যায় না।

সাহিত্য আসলে সংস্কৃতির এক নীরব ও শক্তিশালী দূত। একটি ভালো বই কোনো পাসপোর্টের তোয়াক্কা না করে সীমান্ত পেরিয়ে বিশ্বনাগরিকের কাছে পৌঁছে দেয় একটি দেশ, একটি সমাজ ও একটি জাতির আত্মিক পরিচয়। রেজুয়ান আহম্মেদের চরিত্ররা তাই কোনো সংকীর্ণ ধর্ম, জাতি বা ভূগোলের ফ্রেমে বন্দি নয়; তারা সবার আগে মানুষ। এই উদার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর লেখাকে বিশ্বসাহিত্যের মূল চেতনার সমকক্ষ করে তুলেছে।

অবশ্যই একজন সত্যিকারের সাহিত্যিকের পথ কখনো কুসুমাস্তীর্ণ হয় না। একাকীত্ব, সমালোচনা আর দীর্ঘ প্রতীক্ষা—এই নিয়েই তাঁর কলম সচল থাকে। কারণ লেখা তাঁর কাছে কোনো সাময়িক বিলাসিতা বা সস্তা খ্যাতির মাধ্যম নয়, বরং আত্মার দায়বদ্ধতা।

বইয়ের আসল জীবন তো শুরু হয় তখনই, যখন তা পাঠকের হাতে পৌঁছায়। লেখকের কল্পনা ও দর্শনকে পাঠক নিজের জীবনানুভূতি দিয়ে নতুন নতুন অর্থে রূপান্তর করেন। সাহিত্য শেষ পৃষ্ঠাতেই শেষ হয়ে যায় না; বরং সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন এক চিন্তার মহাবৃত্ত।

মানুষের যন্ত্রণার ভেতরে মানবতার আলো খোঁজার এবং ভালোবাসাকে জীবনের পরম শক্তি হিসেবে উদযাপনের এই যে মহৎ যাত্রা লেখক রেজুয়ান আহম্মেদ শুরু করেছেন—তা অব্যাহত থাকুক। এই অনন্ত যাত্রাপথে তাঁর কলম আরও ধারালো ও শক্তিশালী হোক, তাঁর সাহিত্য আরও বিস্তৃত দিগন্ত স্পর্শ করুক এবং বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রে বাংলা ভাষার সৃজনশীল ঐতিহ্য আরও উজ্জ্বলতর হয়ে উঠুক—নিরন্তর এই শুভকামনা।

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর

img

পিলারে বাঁধা আলো

প্রকাশিত :  ১৮:৫৫, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:৩২, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

উজিরপুরের পশ্চিম বামরাইল গ্রামকে দূর থেকে দেখলে আর দশটা গ্রামের সঙ্গে আলাদা করা যায় না। কয়েকটি পাকা বাড়ি, বেশির ভাগই টিনের চালা। পুকুরপাড়ে কলাগাছের ঝাড়, সীমানা ধরে সুপারিগাছের সরু সারি। বর্ষায় উঠোনের মাটি নরম হয়ে এলে সেখানে মানুষের পায়ের ছাপ পড়ে থাকে অনেকক্ষণ।

তবু প্রতিটি গ্রামেই দু-একটি বাড়ি থাকে, যার দরজার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মানুষ অকারণেই পা ধীর করে ফেলে। শিকদারদের বাড়িটি ছিল তেমনই।

সামনে বড় উঠোন। এক পাশে পুরোনো আমগাছ, অন্য পাশে নারিকেলগাছের সারি। গাছগুলো এত উঁচু যে ঝড়ের দিনে মনে হতো, পাতারা আকাশের সঙ্গে কথা বলছে। পেছনে পুকুর, তার উত্তর পাড়ে বাঁশঝাড়। বর্ষায় সেখানে ব্যাঙ ডাকত, শীতের ভোরে বাঁশের মাথায় কুয়াশা এসে জমে থাকত।

অনিকের বাবা ছিলেন গ্রামের পুরোনো পরিবারের মানুষ। ধনী নন, অভাবীও নন। তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল মানুষের বিশ্বাস। কারও অসুখ হলে ডাক্তার আনতে নিজের সাইকেলটি এগিয়ে দিতেন। কারও মেয়ের বিয়েতে টাকার টান পড়লে চুপচাপ কিছু টাকা রেখে আসতেন। শহরে চাকরির পরীক্ষা দিতে যাওয়া কোনো ছেলের ভাড়া না থাকলে সেটাও মিটিয়ে দিতেন নিজের পকেট থেকে।

প্রায়ই বলতেন, “মানুষের ঘরে টাকা না থাকতেই পারে। কিন্তু দরজা যেন বন্ধ না হয়।”

ছোট অনিক কথাটার মানে বুঝত না। দরজা তো কাঠের জিনিস, ভাবত সে। বন্ধ না করলে ভেতরে শুধু বাতাস ঢোকে। বড় হয়ে সে বুঝেছিল, বাবা কাঠের দরজার কথা বলেননি, বলেছিলেন মনের দরজার কথা।

সে বাড়িতে সন্ধ্যা নামলেই কেরোসিনের বাতি জ্বলত। পরে গ্রামে বিদ্যুৎ এল, কিন্তু পুরোনো বাতিটি ফেলা হলো না।

“বিদ্যুৎ চলে গেলে এটা জ্বালাবি,” বাবা বলতেন।

অনিক হেসে জিজ্ঞেস করত, “এখন আর কেরোসিনের বাতি দিয়ে কী হবে?”

“আলো কখনো পুরোনো হয় না।”

কথাটা অনিকের মনে পড়েছিল বহু বছর পর, যেদিন সে নিজেকে একটি লোহার পিলারের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় আবিষ্কার করল। সেদিনও তার মনে হয়েছিল, পৃথিবীর কোথাও হয়তো একটি আলো এখনো জ্বলছে। কোথায়, তা সে জানত না। পরে বুঝেছিল, আলোটি ছিল তার নিজেরই ঘরে, তার মেয়ের চোখে।

ছোটবেলায় অনিক ছিল ভালো ছাত্র। স্কুলের শিক্ষকেরা তার বাবাকে বলতেন, “ছেলেটাকে পড়ান, অনেক দূর যাবে।” বাবা গর্ব দেখাতেন না। মাথা নিচু করে শুধু বলতেন, “আল্লাহ ভরসা।”

মা ছেলের বইয়ের মলাটে খবরের কাগজ জড়িয়ে দিতেন। নতুন বই কেনার সামর্থ্য সব সময় হতো না, তাই পুরোনো বইয়ের পাতায় থাকত অন্য কোনো ছাত্রের নাম। অনিক সেই নামের ওপরেই যত্ন করে নিজের নাম লিখত।

তার স্বপ্ন ছিল শহরে গিয়ে পড়াশোনা করার। কিন্তু গ্রামের ছেলেদের স্বপ্নেরও একটা সংসার থাকে। বাবা অসুস্থ হলে সেই সংসার এসে চাপল তার কাঁধে।

শুরুতে অসুখটাকে তেমন গুরুতর মনে হয়নি। স্থানীয় ডাক্তার দেখানো হলো, ওষুধ চলল, কয়েক দিনের মধ্যে বাবা কিছুটা সুস্থও হলেন। তারপর আবার অসুখ, আবার পরীক্ষা, তার পরে আরেক পরীক্ষা। একসময় অনিক বুঝল, রোগের চেয়ে বড় সমস্যা রোগের খরচ।

হাসপাতালের করিডরে দাঁড়িয়ে সে প্রথমবার টের পেয়েছিল, টাকা যেন মানুষের কষ্ট মাপার এক অদৃশ্য যন্ত্র। ডাক্তারের কক্ষে ঢোকার আগে টাকা লাগে, পরীক্ষার আগে লাগে, ওষুধের আগে লাগে। অ্যাম্বুলেন্সে টাকা, বিছানায় টাকা, বাড়ি ফেরার পরেও টাকা।

এক রাতে বাবা বললেন, “তুই আর এত দৌড়াস না।”

“আপনি ভালো হয়ে যান, তারপর থামব।”

বাবা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “সবাইকে বাঁচাতে হয় না, বাবা।”

“আপনাকে আমার বাঁচাতেই হবে,” অনিক উত্তর দিল।

বাবা আর কিছু বললেন না।

সে রাতে অনিক হাসপাতালের বারান্দায় বসে ছিল। দূরে মেঝেতে ঘুমিয়ে ছিল কোনো রোগীর স্বজন। একজন নার্স দ্রুত পায়ে হেঁটে গেলেন। জানালার কাচে শহরের আলো কাঁপছিল। অনিক মোবাইল বের করে হিসাব কষল। হাতে যা টাকা আছে, তাতে আর দুই দিনের ওষুধও হবে না।

তখনই সে প্রথমবার নিজের জমির কথা ভাবল।

জমি বিক্রির দিন মানুষ টের পায়, মাটি আসলে কতটা ভারী।

বাবা নিজের হাতে যে জমিগুলো কিনেছিলেন, তার প্রতিটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একটি করে গল্প। কোনোটিতে ধান হতো, কোনোটিতে পাট, কোনোটিতে শীতের সবজি। ছোটবেলায় বর্ষার দিনে অনিক সেই জমিতে দাঁড়িয়ে কাদায় পা ডুবিয়ে রাখত।

এখন সেই জমির কাগজে একে একে উঠতে লাগল অন্য মানুষের নাম। প্রথম জমিটি গেল চিকিৎসার খরচে, দ্বিতীয়টি আগের ঋণ শোধ করতে, তৃতীয়টির টাকা গেল হাসপাতালের বকেয়া মেটাতে। জমির পর গেল গয়না, গয়নার পর সঞ্চয়। তারপর শুরু হলো ধার, আর ধারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের কাছে মাথা নিচু করা।

একদিন বাড়ি ফিরে অনিক দেখল, মা চুপচাপ একটি ছোট বাক্স খুলে বসে আছেন। ভেতরে দুটি কানের দুল।

“এগুলো রেখে আর কী হবে?” মা বললেন।

“থাক মা, রাখেন।”

“তোর বাবার ওষুধ লাগবে।”

অনিক চুপ করে রইল। মা দুল দুটি তার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, “নিয়ে যা।”

দুল হাতে সে বাইরে বেরিয়ে এল। উঠোনে দাঁড়িয়ে তার মনে হলো, সে শুধু মায়ের কাছ থেকে সোনা নিচ্ছে না, এই পরিবারের শেষ উজ্জ্বলতাটুকুও কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে।

বাবার চিকিৎসা চলল, কিন্তু রোগ থামল না। ধীরে ধীরে বাড়িতে লোকের আসা কমে গেল। যাঁরা আগে সন্ধ্যায় এসে বসতেন, তাঁরা আর এলেন না। কারও হয়তো সময় ছিল না, কারও ছিল অস্বস্তি। কেউ হয়তো ভাবতেন, ও বাড়িতে গেলে টাকা ধার চেয়ে বসবে।

অথচ অনিক কারও কাছে টাকা চাইত না। সে শুধু চাইত, কেউ তার পাশে পাঁচ মিনিট বসুক, কেউ বলুক, “ভয় পেয়ো না।”

দারিদ্র্য যাদের ছোঁয়, অনেক সময় তাদের বন্ধুত্বও দরিদ্র হয়ে যায়।

একদিন বিছানায় শুয়ে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, “তুই ক্লান্ত?”

“না।”

“মিথ্যা বলিস না।”

অনিক হাসল। “আপনি সুস্থ হয়ে উঠলেই আমি বিশ্রাম নেব।”

বাবা জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার জন্য নিজেকে শেষ করে দিস না।”

এবার অনিক রেগে উঠল। “আপনি এসব কথা বলবেন না।”

“কেন?”

“কারণ আপনি আমার বাবা।”

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “এটাই তোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।”

অনিক তখন কথাটার মানে বোঝেনি। বুঝেছিল বহু বছর পরে। মানুষ প্রিয়জনকে হারানোর ভয়ে কাতর হলে নিজের জীবনটাকেই সবচেয়ে সহজে বন্ধক রেখে দেয়।

তারপর একদিন বাবার শরীর আরও খারাপ হলো। হাসপাতালের বিছানায় অনিকের হাত ধরে তিনি বললেন, “তোর মেয়েটাকে দেখিস।”

“আপনি নিজেই দেখবেন।”

বাবা মৃদু হাসলেন। “সবাই সব সময় থাকে না।”

কথাটা অনিকের ভেতরে কোথাও গিয়ে আটকে রইল।

কিছুদিন পর বাবা আর কথা বলতে পারলেন না। তারপর একদিন চলেই গেলেন। বাড়িতে মানুষের ভিড় জমল। এই উঠোনেই একসময় বাবা বসে মানুষের সমস্যা শুনতেন, আজ সেই মানুষেরাই নীরবে এসে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কোরআন পড়ল, কেউ কাঁদল, কেউ সান্ত্বনা দিল। তারপর একে একে সবাই ফিরে গেল।

রাতে উঠোন ফাঁকা হয়ে গেল। অনিক একা বসে রইল। তার মনে হচ্ছিল, বাড়ির দেয়ালগুলোও যেন একটু সরে গেছে। মা সেদিন থেকে প্রায় কথা বলা ছেড়ে দিলেন, শুধু বাতিটির দিকে তাকিয়ে থাকতেন।

অনিক বুঝল, মৃত্যু অনেক সময় কষ্টের শেষ নয়। যে যায় সে চলে যায়, আর কষ্টের ভারটুকু রেখে যায় বাকিদের জন্য।

বাড়িতে ঋণ ছিল, চিকিৎসার ধার ছিল। জমি আর ছিল না, সঞ্চয়ও না। বাবার পুরোনো পরিচয় তখনো ছিল, কিন্তু সেই পরিচয় দেখিয়ে বাজার থেকে এক কেজি চালও আনা যায় না।

স্ত্রী জান্নাতুল প্রাণপণে সংসার সামলানোর চেষ্টা করছিলেন। তাঁদের বড় মেয়ে তুবার বয়স তখন নয়। ছোট ছেলেটি একেবারেই শিশু। তুবা সারাক্ষণ বাবার পিছু পিছু ঘুরত।

“বাবা, তুমি কোথায় যাবে?”

“বাজারে।”

“আমাকেও নেবে?”

“আজ না।”

“কেন?”

“তুমি আগে পড়া শেষ করো।”

তুবা মুখ ফুলিয়ে বলত, “তুমি খালি পড়ার কথা বলো।”

অনিক হেসে বলত, “তুই পড়লে আমার কাজ কমবে।”

“কীভাবে?”

“তুই বড় হয়ে ডাক্তার হবি।”

“আমি ডাক্তার হব না।”

“তাহলে কী হবি?”

তুবা একটু ভেবে বলত, “আমি তোমার সঙ্গে থাকব।”

অনিক হাসত। সে জানত না, একদিন এই ছোট্ট মেয়েটিই তাকে আবার বাঁচার কারণ এনে দেবে।

মানুষ একদিনে নষ্ট হয়ে যায় না। প্রথমে সে ক্লান্ত হয়, তারপর একা হয়ে পড়ে। তারপর আসে লজ্জা, কারও কাছে যেতে ভয় হয়। শেষে সে নিজের কাছ থেকেও পালাতে শুরু করে।

অনিকও পালাতে চেয়েছিল। বাজারে কিছু মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় হলো। তারা বেশি প্রশ্ন করত না, শুধু বলত, “চিন্তা করিস না।” তখনকার অনিকের কাছে এই একটি বাক্যেরই অনেক দাম ছিল। সে চেয়েছিল, কেউ একজন বলুক, সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু কিছুই ঠিক হয়নি।

নেশা প্রথমে তাকে কয়েক ঘণ্টার জন্য নিজের জীবন ভুলিয়ে দিত। সেই কয়েক ঘণ্টা বাবার মৃত্যুর কথা মনে থাকত না, ঋণের কথা না, স্ত্রীর চোখের জলের কথাও না। মনে পড়ত না তুবার স্কুলের খরচের কথা। কিন্তু নেশা কেবল সময় ধার দেয়। দাম নেয় পরে, এবং অনেক বেশি করে।

কখন যে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে, অনিক টের পায়নি। যারা তাকে নেশা জোগাত, তারা ততদিনে তার দুর্বলতা চিনে ফেলেছে। ক্ষুধার্ত মানুষকে খাবার দিলে সে কৃতজ্ঞ হয়, আর ভাঙা মানুষকে নেশা দিলে সে আরও সহজে বশ মানে, এ কথা তারা ভালোই জানত। অনিক ধীরে ধীরে তাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠল। ইচ্ছাশক্তি কমে গেল, লজ্জা বাড়ল, ঘর থেকে দূরত্বও বাড়ল।

একদিন তুবা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি কি অসুস্থ?”

“না।”

“তাহলে তোমার চোখ লাল কেন?”

অনিক উত্তর দিতে পারেনি।

জান্নাতুল অনেক কিছুই বুঝতেন, কিন্তু সব কথা মুখে বলা যায় না। একদিন তিনি বললেন, “তুমি যদি এভাবেই চলতে থাকো, বাচ্চাদের কী হবে?”

অনিক চুপ করে রইল।

“আমি তোমাকে ঘৃণা করি না।”

অনিক তাকাল।

“আমি ভয় পাই।”

“কীসের ভয়?”

“একদিন তুমি আর ফিরে আসবে না।”

জানালার দিকে তাকিয়ে অনিক বলল, “আমি নিজেও জানি না কোথায় যাচ্ছি।”

জান্নাতুল আর কিছু বললেন না।

সে রাতে তুবা এসে বাবার পাশে ঘুমাল। অনিক মেয়ের চুলে হাত রাখল। তার মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষটি তারই পাশে শুয়ে আছে। অথচ এই শিশুর ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় ভয় হয়ে উঠছে সে নিজেই। সারা রাত তার ঘুম এল না।

ভোরে বাইরে বেরিয়ে দেখল, আকাশ ধূসর। পাখি ডাকছে, দূর থেকে আজানের সুর ভেসে আসছে। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, সে বদলে যাবে। কিন্তু দুপুর গড়াতে না গড়াতেই সেই সংকল্প ভেঙে পড়ল।

অন্ধকারের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা অনেকটা নদীর মতো। একবার গভীরে নামলে আর পাড় দেখা যায় না।

রাত নামলে বামরাইল বাজারের চেহারা বদলে যায়।

দিনের বেলা দোকানের সামনে ভিড়। চায়ের দোকানে আড্ডা জমে, সবজির ঝুড়ি সাজানো থাকে, রিকশা আর ভ্যানের হর্নে কথাবার্তা চাপা পড়ে। রাতে সবকিছু ধীরে ধীরে থেমে আসে। কিছু দোকানের ঝাঁপ পড়ে, কিছু আলো জ্বলে থাকে। কুকুর ঘোরে, নৈশপ্রহরীরা টহল দেয়, দূরের কোনো দোকান থেকে ভেসে আসে টেলিভিশনের শব্দ।

সেই রাতটিও ছিল ঠিক এমনই। কেউ জানত না, কয়েক ঘণ্টা পরে এই বাজারের একটি খুঁটি একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে লজ্জার স্মৃতি হয়ে দাঁড়াবে।

অনিক সেখানে কী করতে গিয়েছিল, সে বিষয়ে স্থানীয়দের বর্ণনায় নানা রকম কথা পাওয়া যায়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চুরির চেষ্টার অভিযোগে তাকে আটকে রাখা হয়েছিল।

কিন্তু কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা আর আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক কথা নয়। সেই রাতের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক ছিল, এই পার্থক্যটুকু কেউ মনে রাখেনি।

লোকজন তাকে ঘিরে ধরল। কেউ চিৎকার করে উঠল, “চোর!” আরেকজন বলল, “বেঁধে রাখ।” কোথা থেকে একটি দড়ি এল, আর সামনেই ছিল একটি খুঁটি। ক্রুদ্ধ মানুষের জন্য এটুকুই যথেষ্ট।

দড়ি বাঁধার সময় অনিক প্রথমে কিছু বলেনি। তার মাথা ঝিমঝিম করছিল। কেউ গালাগাল করল, কেউ ধাক্কা দিল, কেউ শাসিয়ে বলল, “কাল পুলিশে দেব।”

“একবার বাড়িতে ফোন করতে দেন,” অনিক বলল।

কেউ শুনল না। তার হাত শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হলো।

পিলারটি ছিল বরফের মতো ঠান্ডা। পিঠ ঠেকতেই অনিকের সারা শরীর কেঁপে উঠল। সে আকাশের দিকে তাকাল। চাঁদ নেই, শুধু অন্ধকার।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বাজার প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল, তবু চারপাশে অদৃশ্য কিছু চোখ যেন রয়ে গেল। প্রথমে অনিকের মনে হলো, মানুষ তাকে দেখছে। তারপর বুঝল, মানুষ নয়, তার অতীত তাকে দেখছে। বাবা দেখছেন, মা দেখছেন, স্ত্রী দেখছেন। সবার শেষে দেখছে তুবা, তার নয় বছরের মেয়ে।

সে চোখ বন্ধ করল। যেন কানে এল তুবার গলা, “বাবা, তুমি কি সত্যিই চোর?”

চমকে চোখ খুলে সে বলে উঠল, “না।”

কেউ শুনল না। সে আবার বলল, “আমি চোর নই।”

রাতের বাজারে তার কণ্ঠ মিলিয়ে গেল।

রাত বারোটার পর সময় অন্যরকম হয়ে যায়। ঘড়ির কাঁটা এগোয়, অথচ মনে হয় পৃথিবী দাঁড়িয়ে আছে।

অনিকের শরীর ব্যথায় টনটন করছিল। তেষ্টা পেয়েছিল, ক্ষুধাও। কিন্তু সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছিল লজ্জায়। একসময় সে ভাবল, বাবা বেঁচে থাকলে কী হতো। বাবা কি তাকে এই অবস্থায় দেখতে পারতেন? নিজেই উত্তর দিল, না, পারতেন না। হয়তো বলতেন, “মানুষকে বিচার করার আগে তার দিকে তাকাস।”

অনিকের চোখে জল এল, কিন্তু কেউ দেখল না।

একটি কুকুর এসে পিলারের কাছে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চলে গেল। অনিক হঠাৎ হেসে ফেলল। হাসিটা ছিল নিজেরই বিরুদ্ধে। একটা কুকুরও আজ তাকে মানুষ বলে চিনল না।

রাত আরও গভীর হলো। দূরের কোনো মসজিদ থেকে তাহাজ্জুদের সুর ভেসে এল। অনিক মাথা নিচু করে মনে মনে বলল, “আল্লাহ, আমি অনেক ভুল করেছি।”

অনেকক্ষণ থেমে থেকে যোগ করল, “কিন্তু আমার মেয়েটাকে তুমি রক্ষা করো।”

ওদিকে জান্নাতুল সারা রাত জেগে বসে ছিলেন। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই তুবা বাবাকে খুঁজল।

“মা, বাবা কোথায়?”

জান্নাতুল চুপ করে রইলেন।

“মা?”

“বাজারে গেছে।”

“এত সকালে?”

এবারও মা কিছু বললেন না। তখন পাড়ার একটি ছেলে এসে দরজায় দাঁড়াল। তার মুখে অস্বস্তি।

“তুবা...”

“কী?”

“তোর বাবা বাজারে আছে।”

“কেন?”

ছেলেটি নিচু গলায় বলল, “লোকজন ধরে রেখেছে।”

“কেন ধরে রেখেছে?”

“চুরির কথা বলছে।”

তুবা স্থির হয়ে গেল। তারপর বলল, “আমার বাবা চোর না।”

ছেলেটি কিছু বলল না।

তুবা ঘরে গিয়ে একটি ছোট কাপড়ের ব্যাগ খুলল। ভেতরে কিছু টাকা ছিল। টাকাগুলো গুনে নিয়ে সে পাশের দোকান থেকে পাউরুটি আর চা কিনে আনল। জান্নাতুল তাকে থামাতে চাইলেন।

“তুই কোথায় যাবি?”

“বাবার কাছে।”

“একা যাবি না।”

“আমি যাব, মা।”

“তুবা...”

মেয়েটি মায়ের দিকে তাকাল। তার চোখে ভয় ছিল না, ছিল শুধু এক অটল বিশ্বাস।

“বাবা না খেয়ে আছে।”

জান্নাতুল আর বাধা দিলেন না।

তুবা দ্রুত পায়ে হাঁটছিল। এক হাতে পাউরুটির প্যাকেট, অন্য হাতে চায়ের কাপ। রাস্তায় কাদা জমে ছিল। এক জায়গায় তার পা পিছলে গেল, কাপ থেকে কিছুটা চা চলকে পড়ল। সে একবার কাপের দিকে তাকাল, তারপর আবার হাঁটতে লাগল। সেই মুহূর্তে বাবার জন্য নিয়ে যাওয়া ওই চায়ের চেয়ে দামি আর কিছুই ছিল না তার কাছে।

বাজারের কাছে আসতেই ভিড় চোখে পড়ল। তুবা একটু থমকে দাঁড়াল। বুকের ভেতর ধড়ফড় করছিল। তারপর সে ভিড়ের ভেতর ঢুকে পড়ল। কেউ তাকে চিনতে পেরে বলে উঠল, “ওই তো অনিকের মেয়ে।” মানুষ সরে গিয়ে পথ করে দিল।

তারপর সে দেখল। পিলার। দড়ি। বাবা।

কয়েক সেকেন্ড সে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ছুটে গেল।

“বাবা!”

অনিক মাথা তুলল। প্রথমে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। “তুই এখানে কেন?”

কাঁদতে কাঁদতে তুবা বলল, “তুমি তো কিছু খাওনি।”

অনিক মুখ ঘুরিয়ে নিল। সে চায়নি, মেয়ে তার চোখের জল দেখুক।

তুবা পাউরুটির প্যাকেট খুলল। এক টুকরো ছিঁড়ে বাবার মুখের কাছে ধরে বলল, “খাও।”

“তুই খা।”

“আমি খেয়েছি।”

“মিথ্যা বলিস না।”

“সত্যি বলছি।”

তুবা আবার রুটির টুকরোটি এগিয়ে দিল। “খাও না, বাবা।”

এবার অনিক মুখ খুলল। ছোট্ট টুকরোটি তার মুখে গেল। তারপর তুবা চায়ের কাপ তুলে ধরল।

“গরম আছে,” অনিক বলল। “তুই সাবধানে ধর।”

“আমি পারব।”

চায়ের দিকে তাকিয়ে অনিক কাঁদতে শুরু করল। সেই কান্নায় ছিল লজ্জা, ছিল ক্ষুধা, ছিল পরাজয়। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ছিল একজন বাবার কাছে তার মেয়ের ফিরে আসা।

ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ানো এক তরুণ মোবাইল বের করে দৃশ্যটি ধারণ করল। তখন কেউ ভাবেনি, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওই ছোট্ট ভিডিও অগণিত মানুষের সামনে পৌঁছে যাবে।

দৃশ্যটির দিকে তাকিয়ে ভিড়ের অনেকেই হঠাৎ কেমন অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। কেউ চোখ নামিয়ে নিল, কেউ পিছিয়ে দাঁড়াল। একজন এগিয়ে এসে অনিকের হাতের দড়ি খুলে দিল। কারও মুখে কোনো কথা ছিল না। পুলিশ পৌঁছানোর আগেই মানুষ অনিককে ছেড়ে দিল।

ভিডিওতে কোনো বড় ভাষণ ছিল না, রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না, ছিল না নাটকীয় সংগীতও। ছিল শুধু একটি শিশু, একজন বাঁধা বাবা, একটুকরো পাউরুটি, এক কাপ চা আর চারপাশের মানুষের ভিড়।

ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ল। মানুষ দেখল, আর মন্তব্য লিখতে শুরু করল। কেউ লিখল, “এটা কীভাবে সম্ভব?” কেউ লিখল, “একটা শিশুর সামনে একজন মানুষকে এভাবে রাখা হলো কেন?” কেউ বলল, “অভিযোগ সত্য হলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যায় না।” আবার কেউ অনিকের অতীত নিয়ে নানা কথা বলতে লাগল।

ডিজিটাল দুনিয়ার সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সেখানে একজন মানুষের জীবনের বিচার হয়ে যায় কয়েক মিনিটেই। কেউ তার শৈশব জানে না, বাবার অসুখের কথা জানে না, জানে না তার ঘরে কত রাত ভাত জোটেনি। কেউ জানে না, তার মেয়ের নাম তুবা। তবু মতামত দিতে সবাই প্রস্তুত।

অনিক তখনো জানত না, তার জীবনের সবচেয়ে অপমানের রাতটিই তাকে আবার মানুষের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।

পরদিন সকাল থেকে সাংবাদিকেরা খোঁজখবর নিতে শুরু করলেন। কেউ গেলেন বাজারে, কেউ অনিকের বাড়িতে, কেউ কথা বললেন পুলিশের সঙ্গে, কেউ স্থানীয় মানুষের সঙ্গে।

প্রতিবেদনগুলোতে ঘটনার বিবরণ একরকম হলো না। কোথাও অনিকের নাম এল অনিক সরদার, কোথাও অনিক হাওলাদার। ঘটনাস্থল, সময় আর কিছু পারিবারিক তথ্যেও অমিল দেখা গেল। তবু প্রায় সবখানে একটি ছবি ছিল অভিন্ন: একজন বাবা, একটি শিশু, একটি পিলার, এক কাপ চা। আর ছিল এমন এক সমাজ, যে মাঝে মাঝে মানুষের অপরাধের আগে তার দুর্বলতাকে দেখতে পায় না।

উজিরপুর থানায়ও খবর পৌঁছেছিল। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু পৌঁছানোর আগেই স্থানীয়রা অনিককে ছেড়ে দিয়েছিল। বিষয়টি অনুসন্ধান করা হবে বলেও জানানো হয়।

পুলিশ কর্মকর্তা ফারুক হোসেন এ নিয়ে কথা বলেছিলেন। তাঁর কাছে এটি শুধু একটি ভাইরাল ভিডিও ছিল না, এর ভেতরে ছিল আইনের প্রশ্নও। একজন মানুষ অপরাধ করেছে কি না, তা ঠিক করার অধিকার কার? রাস্তার মানুষের? বাজারের? নাকি আইনের?

প্রশ্নগুলো কাগজে লেখা সহজ। কিন্তু গ্রামের বাস্তবতা এত সরল নয়। সেখানে সবাই সবাইকে চেনে। আজ যাকে চোর বলা হচ্ছে, কাল তার কাছ থেকেই হয়তো কেউ টাকা ধার নেবে। আজ যে লোক দড়ি ধরে দাঁড়িয়েছে, কাল তার নিজের ছেলেই হয়তো বিপদে পড়বে। মানুষের বিচার হয় দ্রুত, আইনের বিচারে সময় লাগে। আর সেই সময়টুকুতেই অনেক সময় একজন মানুষের জীবন বদলে যায়।

সেদিন তুবাদের বাড়িতে অনেক মানুষ এসেছিল। কেউ সাংবাদিক, কেউ স্বেচ্ছাসেবক, কেউ কৌতূহলী, কেউ এসেছিল সাহায্য করতে। জান্নাতুল সবাইকে চা দিতে চাইছিলেন। একজন বললেন, “আপনি বসুন।”

“মানুষ এসেছে, কিছু না দিলে কেমন দেখায়?”

দরিদ্র মানুষের আত্মসম্মান এমনই অদ্ভুত। ঘরে খাবার কম থাকতে পারে, কিন্তু অতিথির সামনে খালি হাতে দাঁড়াতে তার লজ্জা করে।

একজন স্বেচ্ছাসেবক তুবার পাশে বসে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কী চাও?”

“কিছু না।”

“খেলনা?”

“না।”

“নতুন জামা?”

“না।”

“স্কুলের বই?”

তুবা একটু চুপ করে থেকে বলল, “বাবার একটা কাজ লাগবে।”

লোকটি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। “কী কাজ?”

“যে কাজ করলে কেউ বাবাকে আর চোর বলবে না।”

ঘরের ভেতর কয়েক মুহূর্ত কোনো শব্দ হলো না। জান্নাতুল মুখ ফিরিয়ে নিলেন, তাঁর চোখ ভিজে উঠেছে। তুবা বুঝতেই পারল না, সে এমন কী বলেছে যে সবাই হঠাৎ চুপ হয়ে গেল।

সেদিন রাতে অনিকের ঘুম এল না। জান্নাতুল জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি বদলাতে চাও?”

“চাই।”

“সত্যি?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে শুরু করো।”

“কীভাবে?”

“আজ থেকেই।”

অনিক মাথা নিচু করল। “আমি জানি না, পারব কি না।”

“তুমি একা পারবে না,” জান্নাতুল বললেন। “কিন্তু চেষ্টা না করলে কেউ তোমাকে টেনে তুলতে পারবে না।”

অনেকক্ষণ চুপ থেকে অনিক বলল, “আমি তুবার চোখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না।”

“কেন?”

“কারণ ও আমাকে এখনো ভালো মানুষ ভাবে।”

“তুমি এখনো ওর বাবা।”

“সেটাই তো ভয়ের।”

জান্নাতুল স্বামীর দিকে তাকালেন। “বাবা হওয়া মানে শুধু ভালো সময়ের মানুষ হওয়া নয়। এবার তোমাকে ওর জন্য ভালো হতে হবে।”

সে রাতেই অনিক ঠিক করল, নেশা ছাড়ার চেষ্টা করবে। পথটা কতটা কঠিন হবে, তা সে জানত না। শুধু এটুকু বুঝেছিল, পিলারে বাঁধা থাকার রাতটি তাকে একটা শিক্ষা দিয়ে গেছে। মানুষ একেবারে তলানিতে নেমে গেলেও তার সামনে অন্তত একটি পথ খোলা থাকে। উপরে ওঠার পথ।

ভিডিওটি একসময় WAB Foundation-এর নজরে আসে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ঘটনাটি অনুসন্ধানের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে যোগাযোগ করা হয়, এবং পরে অনিকের পরিবারকে সহায়তা করার উদ্যোগের কথা প্রকাশ্যে আসে।

একদল মানুষ যেদিন অনিকের বাড়িতে এলেন, তুবা তাঁদের দিকে চুপ করে তাকিয়ে ছিল। একজন তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার বাবার জন্য কী করা যায়?”

“কাজ।”

“আর তোমার জন্য?”

“আমি পড়ব।”

“কী পড়বে?”

“সব।”

লোকটি হেসে ফেললেন। “সব কি পড়া যায়?”

“আমি চেষ্টা করব,” তুবা বলল।

তারপর সে বাবার দিকে তাকাল। অনিক মাথা নিচু করে বসে আছে। একজন স্বেচ্ছাসেবক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কী করতে চান?”

কিছুক্ষণ নীরব থেকে অনিক বলল, “অটোভ্যান চালাতে পারলে ভালো হয়।”

“কেন?”

“নিজে আয় করতে পারব।”

“আর?”

“কারও কাছে হাত পাততে হবে না।”

শেষ কথাটা বলতে গিয়ে তার গলা কেঁপে গেল।

একটি অটোভ্যানের দাম দিয়ে কোনো মানুষের অতীত কেনা যায় না। কিন্তু তার ভবিষ্যতের একটি দরজা খুলে দেওয়া যায়।

WAB Foundation-এর পক্ষ থেকে অটোভ্যান দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানানো হলো। প্রকাশিত প্রতিবেদনে তুবার পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার কথাও এসেছে।

যেদিন অটোভ্যানটি বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল, তুবা অনেকক্ষণ সেটির দিকে তাকিয়ে থাকল।

“এটা কি বাবার?”

“হ্যাঁ,” অনিক বলল।

“তুমি চালাবে?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে তুমি আর রাতে বাজারে যাবে না?”

অনিক মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসল। “না।”

“আমাকে স্কুলে নিয়ে যাবে?”

“যদি দেরি না করিস।”

তুবা ছুটে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। অনিক মেয়েকে শক্ত করে বুকে চেপে রাখল। তার মনে হলো, পৃথিবীর সব আদালতের রায়ের চেয়ে এই আলিঙ্গন অনেক বড়। আদালত তাকে অপরাধী বলতে পারে, নির্দোষও বলতে পারে। কিন্তু এই শিশুটি তাকে ডাকছে বাবা বলে।

প্রথম দিন অনিক উঠল ভোরে। ফজরের আজান তখন শেষ হয়েছে, আকাশে নীল আর ধূসরের মিশেল। জান্নাতুল চুলায় পানি বসিয়েছেন, তুবা তখনো ঘুমে। অনিক বাইরে এসে অটোভ্যানের পাশে দাঁড়াল। স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখতেই তার আঙুল কাঁপতে লাগল।

নতুন জীবনের শুরুতে মানুষ সব সময় আত্মবিশ্বাসী থাকে না। কখনো ভয় পায়, কখনো নিজের অতীতকেই সন্দেহ করে। অনিকও ভয় পাচ্ছিল। সে জানত, গ্রামের মানুষ তাকে সহজে ভুলবে না। কেউ তাকে নিয়ে কথা বলবে, কেউ হাসবে, কেউ হয়তো পুরোনো ঘটনা মনে করিয়ে দিয়ে বলবে, “ওই যে, পিলারে বাঁধা হয়েছিল যে লোকটা।”

সবই সে জানত। তবু ইঞ্জিন চালু করল। অটোভ্যানের শব্দে ভোরের নীরবতা ভেঙে গেল। ঘর থেকে বেরিয়ে এল তুবা।

“বাবা!”

“কী রে?”

“আমি স্কুলে যাব।”

“যা।”

“আজ তুমি আমাকে নিয়ে যাবে?”

অনিক হাসল। “চল।”

কাঁধে ব্যাগ নিয়ে তুবা অটোভ্যানে উঠে বসল। রাস্তায় কুয়াশা, ধানখেতের ওপর ধোঁয়ার মতো সাদা চাদর। সুপারিগাছের মাথা শিশিরে ভেজা, দূরে কোথাও পাখি ডাকছে। অনিক ধীরে ধীরে ভ্যান চালাতে লাগল। পেছন থেকে তুবা ডাকল, “বাবা।”

“হুম?”

“তুমি আর কাঁদবে না?”

কিছুক্ষণ চুপ থেকে অনিক বলল, “মানুষ কাঁদে।”

“তুমিও কাঁদো?”

“হ্যাঁ।”

“কখন?”

রাস্তার দিকে তাকিয়ে সে বলল, “যখন খুব ভালোবাসে।”

তুবা কথাটা বুঝল কি না, বোঝা গেল না। সে শুধু বাবার পিঠের দিকে তাকিয়ে হাসল।

নতুন জীবন শুরু করা সহজ নয়। অটোভ্যান চলতে শুরু করলেও অনিকের অতীত তার সঙ্গে সঙ্গেই চলছিল। একদিন বাজারে কেউ ডেকে বলল, “কী খবর, পিলার সাহেব?” কয়েকজন হেসে উঠল। অনিকও হাসল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ব্যথা পেল। সে গাড়ি থামাল না।

আরেকদিন একজন জিজ্ঞেস করল, “ভালো হয়ে গেছিস নাকি?”

“চেষ্টা করছি।”

“দেখি, কতদিন টিকিস।”

অনিক উত্তর দিল না। সে বুঝেছিল, মানুষের বিশ্বাস ফিরে পেতে সময় লাগে। নিজের ওপর বিশ্বাস ফিরে পেতেও।

তার সবচেয়ে কঠিন লড়াইটা ছিল রাতের সঙ্গে। রাত নামলে নেশার টান ফিরে আসত। পুরোনো লোকগুলো ডাকত, “চল।” অনিক তখন কখনো দরজা বন্ধ করে বসে থাকত, কখনো তাকিয়ে থাকত তুবার বইয়ের দিকে, কখনো বের করত বাবার পুরোনো ছবি। একদিন সেই ছবির সামনে বসে সে বলল, “আমি পারছি না।”

ছবির মানুষটি কোনো উত্তর দিলেন না।

“তবু চেষ্টা করছি,” অনিক বলল।

তুবার স্কুলের পোশাক পুরোনো, তবু সেদিন সে সেটি খুব যত্ন করে পরেছিল। জান্নাতুল চুল বেঁধে দিচ্ছিলেন। আয়নায় নিজেকে দেখে তুবা বলল, “আমি বড় হলে কী হব, মা?”

“তুই যা হতে চাস।”

“আমি বাবার মতো হব না।”

জান্নাতুলের হাত থেমে গেল। একটু পরে তিনি বললেন, “তুই বাবার মতো ভালোবাসতে শিখবি।”

তুবা চুপ করে রইল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “বাবা কি খারাপ?”

মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “মানুষ খারাপ হওয়া আর মানুষের ভুল করা এক জিনিস নয়।”

তুবা কথাটা মনে রাখল। সেদিন স্কুল থেকে ফিরে সে বাবাকে বলল, “মা বলেছে, মানুষ ভুল করে।”

“হ্যাঁ।”

“তুমিও ভুল করেছিলে?”

অনিক মাথা নিচু করল। “হ্যাঁ।”

“আবার করবে?”

“না, করব না।”

“প্রমিজ?”

“প্রমিজ।”

তুবা হাত বাড়িয়ে বলল, “তাহলে হাত দাও।”

অনিক মেয়ের ছোট্ট হাতটি নিজের হাতে নিল। তুবা গম্ভীর মুখে বলল, “এই হলো প্রমিজ।”

অনিকের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসলে অটোভ্যান নয়। সে আবার সময়ের মূল্য বুঝতে শিখেছিল। সকাল মানে কাজ, দুপুর মানে যাত্রী, বিকেল মানে বাড়ি ফেরা, আর রাত মানে পরিবার। আগে রাত ছিল পালানোর সময়। এখন রাত মানে তুবার পড়ার খাতা।

তুবা অঙ্ক করত, অনিক পাশে বসে থাকত।

“বাবা, এটা কীভাবে হবে?”

“আমি জানি না।”

“তুমি না বাবা?”

“বাবা হলেই কি সব জানা যায়?”

তুবা হেসে ফেলত। “তাহলে তুমি কী জানো?”

“মানুষের জীবন নষ্ট করতে কত অল্প সময় লাগে, তা জানি।”

তুবা বুঝত না। অনিক আবার বলত, “আর সেটা ঠিক করতে যে কত সময় লাগে, তা-ও জানি।”

একদিন তুবা জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি আবার অনেক টাকা কামাবে?”

“অনেক না।”

“তাহলে?”

“যতটুকু দরকার।”

“কতটুকু?”

“তুই যেন স্কুলে যেতে পারিস। তোর ভাই যেন পড়তে পারে। তোর মাকে যেন কারও কাছে হাত পাততে না হয়।”

“আর তোমার?”

অনিক একটু হাসল। “আমার?”

“তোমার কী দরকার?”

মেয়ের মাথায় হাত রেখে সে বলল, “আমার দরকার, তুই আমাকে বাবা বলে ডাকিস।”

কয়েক সপ্তাহ পর একদিন অনিক একা বাজারে গেল। পিলারটি তখনো সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। সে গাড়ি থামিয়ে কিছুক্ষণ দূর থেকে তাকিয়ে রইল। তারপর কাছে গিয়ে পিলারের গায়ে হাত রাখল। ঠান্ডা লোহা। সেই একই পিলার, কিন্তু আজ তার হাত বাঁধা নেই।

চোখ বন্ধ করতেই সেই রাতটা ফিরে এল। দড়ি, অন্ধকার, ক্ষুধা, তেষ্টা আর মানুষের কণ্ঠস্বর। তারপর তুবা, পাউরুটি আর চা। চোখ খুলতেই দেখল, এক বৃদ্ধ পাশ দিয়ে যেতে যেতে থেমে গেছেন।

“কী করছিস ওখানে?”

“কিছু না, চাচা।”

“ওখানে দাঁড়িয়ে থাকিস না।”

অনিক মৃদু হেসে বলল, “আগে আমাকে এখানে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল।”

বৃদ্ধ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন, কিছু বললেন না।

“আজ আমি নিজে এসে দাঁড়িয়েছি,” অনিক বলল।

শীতের এক সকালে তুবা বাবার অটোভ্যানে চড়ে স্কুলে যাচ্ছিল। রাস্তার দুই পাশে কাশফুল, ধানখেতের ওপর কুয়াশা, সূর্য তখনো ভালো করে ওঠেনি।

“বাবা।”

“হুম?”

“আলো কোথা থেকে আসে?”

“সূর্য থেকে।”

“না।”

“তাহলে?”

“মানুষের কাছ থেকে।”

অনিক অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকাল। “কে বলেছে তোকে?”

“আমি জানি।”

অনিক হাসল। “তুই তো অনেক কিছু জানিস।”

তুবা বলল, “যেদিন তুমি পিলারে বাঁধা ছিলে, সবাই তোমাকে দেখছিল। কিন্তু কেউ তোমাকে আলো দেয়নি।”

অনিক গাড়ির গতি কমিয়ে দিল।

“আমি দিয়েছিলাম,” তুবা বলল।

অনিক কিছু বলতে পারল না। তার চোখ ঝাপসা হয়ে এল। সে শুধু সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালিয়ে যেতে লাগল।

মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করলেও সমাজ সব সময় তাকে দ্বিতীয় সুযোগ দিতে প্রস্তুত থাকে না। এটাই জীবনের কঠিনতম সত্যগুলোর একটি। অনিক তা বুঝেছিল, তবু সে আর পালাতে চায়নি। কেউ তাকে “চোর” বললে সে শান্ত গলায় উত্তর দিত, “আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল। আমি নিজের জীবনের ভুলও স্বীকার করি। কিন্তু আমি বদলাতে চাই।”

এই কথায় কোনো নাটক ছিল না। ছিল ক্লান্ত একজন মানুষের সত্যি হয়ে ওঠার চেষ্টা।

একদিন বাজারের এক দোকানি তাকে ডেকে বলল, “অনিক, চা খাবি?”

অনিক অবাক হলো। “আমি?”

“হ্যাঁ, বস।”

অনিক বসল। দোকানি চা এগিয়ে দিল। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল। তারপর দোকানি বলল, “তোর মেয়েটা খুব সাহসী।”

“ও আমার চেয়ে অনেক সাহসী।”

দোকানি মাথা নেড়ে বলল, “হয়তো।”

সেদিন অনিক বুঝল, মানুষের মনও ধীরে ধীরে বদলায়, তবে সবাই একসঙ্গে নয়। কেউ বদলায় একদিনে, কেউ এক বছরে, আর কেউ কোনোদিনই বদলায় না।

জান্নাতুলও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। তিনি লেখাপড়া জানতেন, নিজের জন্য কিছু করার ইচ্ছাও ছিল। কিন্তু সংসারের টানাপোড়েনে সব থেমে গিয়েছিল। একদিন তিনি অনিককে বললেন, “আমি কিছু করতে চাই।”

“করো।”

“তুমি পারবে?”

“কী পারব?”

“সংসারটা সামলাতে?”

অনিক বলল, “এতদিন তুমি আমাকে ধরে রেখেছ। এবার আমি তোমাকে ধরে রাখব।”

জান্নাতুল মৃদু হাসলেন। বহুদিন পর এমন হাসি দেখা গেল তাঁর মুখে।

একটি পরিবার ভেঙে পড়লে শুধু একজন মানুষ ভাঙে না। ঘরের ভাষা বদলে যায়, খাবারের স্বাদ বদলে যায়, শিশুর প্রশ্নগুলো বদলে যায়, স্বামী-স্ত্রীর নীরবতাও অন্যরকম হয়ে ওঠে। আবার পরিবার যখন ঘুরে দাঁড়ায়, তখনো সবকিছু একদিনে আগের মতো হয়ে যায় না। তবু একটি জিনিস ফিরে আসে। আশা।

একদিন স্কুল থেকে তুবা একটি রচনা লিখে আনল। বিষয় ছিল “আমার বাবা”। সে লিখেছিল:

“আমার বাবা একজন গাড়ি চালান। তিনি আমাকে স্কুলে নিয়ে যান। তিনি আমাকে পড়তে বলেন। আগে বাবা অনেক কষ্ট পেয়েছিলেন। আমি বাবাকে খাবার দিয়েছিলাম। বাবা কেঁদেছিলেন। এখন বাবা হাসেন।”

শিক্ষিকা রচনাটি পড়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি বাবাকে খুব ভালোবাসো?”

“হ্যাঁ।”

“কেন?”

“কারণ তিনি আমার বাবা।”

“আর যদি কেউ তোমার বাবাকে খারাপ বলে?”

“মানুষ ভুল করতে পারে,” তুবা বলল।

শিক্ষিকা তার মাথায় হাত রাখলেন। “তুমি মন দিয়ে পড়াশোনা করো।”

“আমি অনেক পড়ব।”

অনিকের গল্প শুধু একটি পরিবারের গল্প হয়ে থাকেনি। মানুষ এ গল্পের মধ্যে নিজেদেরই খুঁজে পেয়েছিল। কেউ দেখেছিল নিজের ভাইকে, কেউ বাবাকে, কেউ নিজের ভুলকে, কেউ নিজের সন্তানকে। কেউ দেখেছিল সমাজের তাড়াহুড়ো, কেউ আইনের প্রয়োজন, কেউ বা পুনর্বাসনের গুরুত্ব। আর কেউ কেউ শুধু দেখেছিল একটি শিশুকে, যে বাবার মুখে খাবার তুলে দিয়েছিল।

সেই শিশু কোনো বক্তৃতা দেয়নি, কোনো দাবিও তোলেনি। সে শুধু বলেছিল, “খাও।” মানবিকতার সবচেয়ে গভীর ভাষা কখনো কখনো এটুকুই।

বছর গড়ালে মানুষ অনেক ঘটনা ভুলে যায়। একদিনের খবর পরদিনই পুরোনো হয়ে যায়, একটি ভিডিও হারিয়ে যায় হাজারো ভিডিওর ভিড়ে, একজন মানুষের কান্না ঢাকা পড়ে যায় অন্যদের ব্যস্ততার আড়ালে। তবু কিছু দৃশ্য মানুষের ভেতরে রয়ে যায়। তুবার হাতে পাউরুটি, এক কাপ চা, পিলারে বাঁধা একজন বাবা, ভিড়ের মাঝে একটি শিশুর কান্না। আর তার পেছনে জেগে থাকে একটি প্রশ্ন।

মানুষ কি শুধু শাস্তি পাওয়ার জন্যই জন্মায়? নাকি ভুলের পর ফিরে আসারও অধিকার তার আছে?

অনিকের জীবন এই প্রশ্নের সহজ উত্তর দেয় না। কারণ মানুষ একরঙা নয়। একই মানুষ ভুল করতে পারে, আবার ভালোবাসতেও পারে। সে পড়ে যেতে পারে, আবার উঠে দাঁড়াতেও পারে। সে অন্যকে কষ্ট দিতে পারে, আবার নিজের সন্তানকে ভালোবাসতে পারে পৃথিবীর সবার চেয়ে বেশি।

তার অপরাধের বিচার আইনের বিষয়। তার পুনর্বাসনের সুযোগ সমাজের মানবিকতার বিষয়। আর সন্তানকে ভালোবাসার অধিকার তার অস্তিত্বেরই অংশ।

সেদিন সন্ধ্যায় অটোভ্যান নিয়ে অনিক বাড়ি ফিরল। তুবা উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিল। বাবাকে দেখেই সে ছুটে এসে বলল, “বাবা, আজ আমি একটা কবিতা লিখেছি।”

“শোনাবি?”

“হ্যাঁ।”

তুবা খাতা খুলে কয়েক লাইন পড়ে শোনাল। অনিক পুরোটা বুঝল না, কিন্তু শেষ লাইনে এসে থমকে গেল।

“আলো কখনো একা আসে না।”

সে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। “এই লাইনটা কোথা থেকে পেলি?”

“আমি নিজেই লিখেছি।”

“কেন লিখলি?”

“কারণ সেদিন তুমি অন্ধকারে ছিলে।”

অনিকের গলা ভারী হয়ে এল।

“আমি তো আলো নিয়ে গিয়েছিলাম,” তুবা বলল।

অনিক মেয়েকে বুকে টেনে নিল।

সন্ধ্যা নামছিল। দূরের মসজিদ থেকে আজানের সুর ভেসে এল, নারিকেলপাতায় বাতাসের শব্দ উঠল, আকাশে ফুটল প্রথম তারা। মেয়ের মাথায় হাত রেখে অনিকের মনে হলো, মানুষ হয়তো কখনোই পুরোপুরি অতীত থেকে মুক্ত হতে পারে না। কিন্তু অতীতের ওপরে সে নতুন একটি সকাল গড়ে তুলতে পারে।

ঠিক তখনই গ্রামের বিদ্যুৎ চলে গেল। চারদিক এক নিমেষে অন্ধকার হয়ে এল। অনিক ঘরে ঢুকে তাক থেকে সেই পুরোনো কেরোসিনের বাতিটি নামাল। বাবার কণ্ঠ যেন বহুদিন পর কানের কাছে বেজে উঠল, “বিদ্যুৎ চলে গেলে এটা জ্বালাবি।”

দেশলাইয়ের কাঠি জ্বলল। বাতির শিখা কেঁপে উঠে ধীরে ধীরে স্থির হলো। সেই আলোয় ঘরের দেয়াল আবার কাছে সরে এল।

অনিকের বাবা নেই, পুরোনো জমি নেই, সচ্ছলতা নেই, হারানো দিনগুলোও নেই। তবু একটি পরিবার আছে, একটি অটোভ্যান আছে, একটি স্কুলব্যাগ আছে, আছে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ। আর আছে এক মানুষ, যে নতুন করে শুরু করার চেষ্টা করছে।

বাতির আলোর দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ সে চুপ করে থাকল। তারপর তুবাকে বলল, “চল, পড়তে বস।”

“আজ গল্প শুনব।”

“কী গল্প?”

“তোমার গল্প।”

অনিক মৃদু হাসল। “আমার গল্প তো অনেক লম্বা।”

“আমি শুনব।”

অনিক মেয়ের হাত ধরল। দুজনে বাতির কাছে গিয়ে বসল। বাইরে রাত নামছিল, কিন্তু সে রাতের অন্ধকার আর আগের মতো ছিল না। ঘরের ভেতর আলো জ্বলছিল, আর সেই আলোর পাশে বসে ছিল একজন বাবা। তার পাশে তার মেয়ে, সামনে একটি খাতা, একটি কলম, আর আগামী দিনের জন্য খোলা একটি দরজা।

যে মানুষকে এক রাতে পিলারের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল, সে হয়তো সারাজীবন সেই রাতের স্মৃতি বহন করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পিলারটি তার জীবনের পরিচয় হয়ে থাকবে না। তার পরিচয় হয়ে থাকবে সেই ছোট্ট হাত, যা দড়ি খুলতে পারেনি, কিন্তু বাবার মুখে তুলে দিতে পেরেছিল একটুকরো পাউরুটি। থাকবে সেই এক কাপ চা, যা ক্ষুধা মেটানোর চেয়েও বড় কিছু ছিল। আর থাকবে একটি শিশুর অটুট বিশ্বাস।

হয়তো জীবনের সবচেয়ে গভীর সত্য এটাই। কখনো কখনো একজন মানুষকে অন্ধকার থেকে টেনে তুলতে বড় কোনো বক্তৃতার দরকার হয় না। একটি হাতই যথেষ্ট, একটি ডাকই যথেষ্ট। একটি ছোট্ট শিশু যদি কাঁদতে কাঁদতে বলে, “বাবা, খাও,” তাহলে পৃথিবীর সব অপমানের মাঝেও একজন মানুষ আবার বেঁচে থাকার কারণ খুঁজে পেতে পারে।

অনিক সেই কারণ পেয়েছিল। তার নাম তুবা।

সে আলো ছিল খুব ছোট। তবু একটি মানুষের জীবন বদলে দিতে কখনো কখনো ততটুকুই যথেষ্ট।

-সমাপ্ত-


সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর