কক্সবাজারের উত্তর কলাতলী জেলেপল্লীর বাতাসে চিরকালই এক অদ্ভুত ভ্যাপসা গন্ধ ভেসে বেড়ায়। সেই গন্ধে মিশে থাকে সাগরের শুকানো নোনা জল, পচা গলদা ও বাগদার আঁশটে টান এবং বহু যুগের জমানো কুঁড়েঘরের রুদ্ধ নিঃশ্বাসের আর্দ্রতা। বঙ্গোপসাগরের উত্তাল তরঙ্গমালা যখন তটের বালুচরে এসে সজোরে আছড়ে পড়ে, তখন ফেনিল ক্ষোভের সেই শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে বাজে এই জনপদের হাজারো মানুষের গোপন দীর্ঘশ্বাস।
সমুদ্রের একেবারে কোলঘেঁষে, যেখানে জোয়ারের নোনা জল এসে মাঝে মাঝে ভিটে ছুঁয়ে যায়, সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে একটি জরাজীর্ণ কুঁড়েঘর। বাঁশের বাতা, ছেঁড়া প্লাস্টিকের চট আর পুরোনো ছনের বেড়া দিয়ে বানানো সেই ঘরের টিনের চালে অজস্র সূক্ষ্ম ছিদ্র। দিনের বেলা সেই সব ছিদ্র দিয়ে সূর্যের প্রখর রোদের বল্লম মেঝের ভেজা বালুতে এসে বিঁধে, আর রাতের বেলা অন্ধকারের বুক চিরে আকাশের নিঃসঙ্গ তারাগুলো ঘরে আলো ঝরায়।
এই আলো-আঁধারির ভঙ্গুর আশ্রয়েই বসবাস চব্বিশ বছর বয়সী তরুণী মোমেনা এবং তার আট-নয় বছরের ছেলে মোমেনের। মোমেনা একসময় এই কলাতলী উপকূলে অনন্য সুন্দরী নারী হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু অকালবিয়ে, অভাবের নির্মম ঘর্ষণ এবং সমুদ্রের নোনা বাতাসের রুক্ষতায় তার সেই দিনগুলো হারিয়ে গেছে। তার চোখের কোলে এখন গভীর কালচে ছায়া, গাল দুটো সামান্য বসে গেছে। অভাব আর অনাহারের তাড়নায় রূপের ঔজ্জ্বল্য মলিন হলেও, একধরনের নিষ্পাপ ও করুণ সৌন্দর্য এখনও তার ফ্যাকাশে চেহারায় লেগে আছে। আর এই রূপই যেন এই পিতৃহীন কুঁড়েঘরের জন্য এক অলিখিত অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
তিন বছর আগের এক অমাবস্যার রাতে মোমেনার স্বামী আলম ট্রলারে করে গভীর সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। সামুদ্রিক ঝড়ের ঘূর্ণিপাকে পড়ে কত জেলে হারিয়ে যায়, আলমও তেমনি নিখোঁজদের খাতায় নাম লিখিয়েছে। কিন্তু মোমেনা মনের গহীনে এক অন্ধ বিশ্বাস লালন করে চলেছে, আলম একদিন ঠিক ফিরে আসবে। সাগরের প্রতিটি ঢেউ যখন তীরে এসে আছড়ে পড়ে, মোমেনা চমকে উঠে তটরেখার দিকে তাকায়। সে ভাবে, এই বুঝি আলম ভিজে কাপড় নিয়ে ঘরে ফিরে এল। এই অপেক্ষাকেই বুকের গভীরে আঁকড়ে ধরে সে সন্তান মোমেনকে নিয়ে বেঁচে আছে।
কিন্তু অরক্ষিত যুবতী এবং পরম সুন্দরী হওয়ায় সমাজের কুনজর তার ওপর থেকে সরেনি। এলাকার প্রভাবশালী ফড়িয়া, স্থানীয় শুঁটকি মহালের দালাল আর মাতব্বরদের লালসাঘন দৃষ্টি প্রতিনিয়ত মোমেনার ওপর ছায়া ফেলে। নানান প্রলোভন, টাকার গরম আর বিয়ের মোড়কে আসে কুপ্রস্তাব। কিন্তু মোমেনা পাথর হয়ে থাকে। স্বামীর রেখে যাওয়া সতীত্ব ও স্মৃতির মর্যাদা রক্ষা করে সে কোনো প্রলোভনে পা দেয় না। তার জীবনের একমাত্র ধ্রুবতারা এখন তার সন্তান মোমেন।
মোমেন বয়স অনুযায়ী বেশ চঞ্চল প্রকৃতির বালক, তবে তার মনের ভেতরটা এক নিঝুম দীঘি। সমুদ্রের পাড়ে একাকী দৌড়ানো, গাংচিলের পেছনে ধাওয়া করা কিংবা চরে পড়ে থাকা ঝিনুক কুড়ানোতেই তার যত আনন্দ। তবে ঘরের ভেতরে ঢুকলেই সে এক শান্ত, গম্ভীর বয়স্ক শিশুর মতো মায়ের মুখপানে চেয়ে থাকে। সে স্থানীয় এক এনজিও পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। পড়ালেখায় তার মাথা দারুণ তীক্ষ্ণ। সামান্য আলোতেই সে স্কুলের পড়া শেষ করে ফেলে। এই দারিদ্র্যপীড়িত শিশুদের স্কুলে ধরে রাখার জন্য এনজিওর পক্ষ থেকে প্রতিদিন বিনামূল্যে সেদ্ধ ডিম, কলা, রুটি ও প্যাকেটের দুধ দেওয়া হয়। ক্ষুধা সামলানোর এই সামান্য খাদ্য সাহায্যই গরিবের মেধাবী শিশুদের অপুষ্টির হাত থেকে কিছুটা রক্ষা করে চলেছে।
কলাতলী জেলেপল্লীর শত শত পরিবারের মতো মোমেনা ও তার ছেলের জীবনধারণের একমাত্র অবলম্বন ছিল সাগরের বাগদা ও গলদা চিংড়ির পোনা আহরণ করা। প্রতিদিন ভোরে ভাটার টান ধরলে মশারি জাল কিংবা বিহিন্দি জাল নিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুরা সাগরের হাঁটু পানিতে নেমে পড়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নোনা জলে দাঁড়িয়ে জাল টেনে দিনশেষে মাত্র কয়েকশো চিংড়ি পোনা পাওয়া যায়। ফড়িয়াদের কাছে এগুলো বিক্রি করে যা মেলে, তা দিয়ে চাল-ডাল কেনাই দুষ্কর হয়ে পড়ে।
বাস্তবতা অত্যন্ত নিষ্ঠুর। ২০০১ সালের মৎস্য পোনা আহরণ আইন অনুযায়ী সমুদ্র উপকূল থেকে চিংড়ি পোনা ধরা সম্পূর্ণ বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ। কারণ একটি মাত্র বাগদা বা গলদার পোনা ধরতে গিয়ে মশারি জালের সূক্ষ্ম বুননে ধরা পড়ে এবং ধ্বংস হয়ে যায় সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের আরও ২৫ থেকে ৭০টি অন্যান্য প্রজাতির মূল্যবান মাছ ও জলজ প্রাণীর পোনা ও লার্ভা। কোস্টগার্ড কিংবা মৎস্য বিভাগ প্রায়শই অভিযান চালায়, জাল পুড়িয়ে দেয়, জরিমানা করে। কিন্তু ক্ষুধার কাছে তো আইনের পাতাগুলো বড় মিছে। কলাতলী থেকে শুরু করে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার সৈকতজুড়ে ক্ষুধার্ত মানুষগুলো প্রাণের মায়াকে তুচ্ছ করে সাগরে নামে।
মোমেনাদের ঘরেও এই একই সমীকরণ। সাগরে নেমে পোনা ধরতে পারলে হাঁড়িতে চাল ফোটে, চুলায় আগুন জ্বলে; অন্যথায় জঠরজ্বালা আর অনাহারই হয় রাতের একমাত্র সঙ্গী।
কিন্তু শেষ তিন দিন ধরে মোমেনাদের জরাজীর্ণ চালার নিচে কোনো উনুনে আগুন জ্বলেনি। তিন দিন ধরে মোমেনা তীব্র জ্বরে আচ্ছন্ন হয়ে কাঁথা গায়ে দিয়ে পড়ে আছে। সাগরের কালচে নোনা বাতাসে নেমে পোনা ধরার মতো ন্যূনতম শারীরিক শক্তি তার অবশিষ্ট নেই। শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে, মাথা তুলতে গেলে পুরো পৃথিবী যেন চক্কর দিয়ে ওঠে।
তিন দিন ধরে কাজ নেই, তাই ঘরে এক দানা চালও নেই। প্রথম দুই দিন পাশের ঘরের অন্যান্য দুস্থ জেলেরাও তাদের নিজেদের সামান্য খাবার থেকে এক বাটি জাউ ভাত বা পান্তা ভাত দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই দরিদ্র পল্লীতে প্রতিনিয়ত অভাবের কামড় এতটাই নির্মম যে, নিজের পেটে টান পড়লে অন্যের দিকে হাত বাড়ানোর ক্ষমতা কারও থাকে না। আজ সকাল থেকে সারাদিন গড়িয়ে সাঁঝ নেমে এলেও পাশের কোনো ঘর থেকেই এক দানা খাবার আসেনি। অনাহারের হিংস্র কামড় মা ও ছেলের পেটকে দোমড়ানো-মোচড়ানো শুরু করেছে।
আগামীকাল পবিত্র শবে বরাত, মহিমান্বিত ক্ষমা ও ভাগ্য নির্ধারণের রজনী। মুসলিম সমাজে এই রাতকে কেন্দ্র করে ঘরে ঘরে আনন্দের আমেজ থাকে, ভালো-মন্দ রান্নার প্রস্তুতি চলে। কিন্তু জেলেপল্লীর এই জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরটিতে অন্ধকার যেন আরও ভারী হয়ে জমে উঠছিল।
মোমেনাদের কুঁড়েঘরের ঠিক গা ঘেঁষেই একটি ছোট বাঁশের ছাপড়া। সেখানে থাকেন এক অশীতিপর বৃদ্ধা। এই বিশাল পৃথিবীতে তাঁর নিজের বলতে আর কেউ বেঁচে নেই। স্বামী ও সন্তান বহু আগেই সাগরের পেটে চলে গেছে। লাঠিতে ভর দিয়ে গ্রামে গ্রামে ভিক্ষা করে তিনি কোনোমতে প্রাণ ধারণ করেন। বার্ধক্যের কারণে চোখে ছানি পড়েছে, এখন কেবল আলোর আবছা ছায়া আর ঝাপসা রূপ দেখতে পান। আজ সারাদিন তিনি ভিক্ষায় বের হতে পারেননি, শরীর চলছে না। ঘরে একবিন্দু খাবার না থাকায় ক্ষুধার চরম যন্ত্রণায় কাতর হয়ে তিনি বাঁশের বেড়ায় মাথা ঠুকে বিলাপ করছিলেন।
অন্ধকার ছনের ঘরে বসে বৃদ্ধা আকাশের দিকে ঝাপসা চোখ দুটো তুলে তীব্র ক্ষোভে ও আর্তনাদে বলে উঠলেন,
“ও আল্লাহ! তুমি কি চোখে কিচ্ছু দ্যাখো না? আমারে এত কষ্ট দিচ্ছ কেন? দুনিয়ায় কত তাজা মানুষ মরে যায়, আমারে কেন উঠায় নাও না? আমি আর ক্ষুধা সহ্য করতে পারতেছি না আল্লাহ... আমারে মরণ দাও!”
অনাহারের চোটে এক অসহায় বৃদ্ধার এমন মর্মান্তিক ও করুণ আক্ষেপ পাশের ঘরে শুয়ে শুনছিল ছোট মোমেন। অবুঝ ও সরল হৃদয় শিশুটি এই কথা শুনে থমকে যায়। আল্লাহকে এভাবে আক্ষেপ করতে শুনে তার মনে ভীতি ও বিস্ময় জেগে ওঠে। সে অসুস্থ মায়ের বুকে মাথা রেখে কাঁপাকাঁপা গলায় প্রশ্ন করল, “মা! পাশের ঘরের বুড়ি দাদি আল্লাহরে এত কথা বলতেছে কেন? আল্লাহ কি আমাদের কষ্ট দ্যাখে না?”
জ্বরে কঁকিয়ে ওঠা মোমেনা ফ্যাকাশে হাতটি বাড়িয়ে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে। কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে ফিসফিস করে বলল, “ছিঃ বাবা! আল্লাহরে গালি দিতে নাই, পাপ হয়। বুড়ি মানুষ, ক্ষুধার কষ্টে মাথা ঠিক নাই। কালকে যে শবে বরাত বাবা, পবিত্র রাত। কাল রাতে পরওয়ারদেগার আল্লাহ তাআলা নিজে প্রথম আসমানে নেমে আসেন। তিনি বান্দার সব আকুতি শোনেন, দুঃখ-কষ্ট দূর করেন আর রিজিক বাড়িয়ে দেন।”
অসুস্থ মায়ের মুখের এই বাণী মোমেনের শিশুমনে এক গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করল। তার নিষ্পাপ মনে জন্ম নিল এক পরম বিশ্বাস। সে মনে মনে হিসাব মেলাতে লাগল, আল্লাহ যদি কাল রাতে এত কাছে প্রথম আসমানে নেমে আসেন, তবে তাঁর কাছে নিজের কষ্টের কথা পৌঁছানোর একটা পথ তো অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে!
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে মোমেনের ক্ষুধার তীব্রতা আর সহ্যসীমার মধ্যে রইল না। তিন দিন ধরে পেট আধপেটা, আর আজ সারাদিন পেটে এক ফোঁটা পানি ছাড়া কিছুই পড়েনি। সে মায়ের ফ্যাকাশে গায়ে হাত বুলিয়ে কেঁদে উঠে বলল, “মা! আমার খুব ক্ষুধা লাগছে... ঘরে কি একটা টাকাও নাই? সামান্য কিছু কিনে খাইতাম...”
মোমেনা চোখ মেলে ছেলের আর্তনাদ দেখে বুক ফেটে যাওয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মোচড়ানো শরীরে কষ্ট সহ্য করে ঘরের কোণে অন্ধকার কুলুঙ্গির দিকে আঙুল নির্দেশ করল। সেখানে একটি পুরোনো মাটির পাতিল উল্টানো অবস্থায় রাখা ছিল।
মোমেনা ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, “বাবাজান... ওই পাতিলটার নিচে কয়েকটা টাকা আছিল... হয়তো ৫০ টাকার মতো হবে। নিয়ে যা বাবা... কিসব কিনে খাইয়া আয়।”
এই ৫০ টাকাই ছিল মা ও ছেলের বেঁচে থাকার শেষ সম্বল। চরম বিপদের দিনে ওষুধ বা একবেলার চাল কেনার জন্য মোমেনা আঁচলে বেঁধে এই টাকা রেখেছিল। মোমেন দৌড়ে গিয়ে মাটির পাতিল সরিয়ে দুমড়ানো ৫০ টাকার নোটটি হাতে তুলে নেয়।
টাকাটা হাতে পেয়েই মোমেনা ভেবেছিল ছেলে হয়তো পাশের মুদির দোকান থেকে বিস্কুট বা মুড়ি কিনে এনে নিজের জঠরজ্বালা মেটাবি। কিন্তু মোমেনের মাথায় তখন অন্য এক অবোধ ও নির্দোষ শিশুর কল্পনার জগৎ ঘুরপাক খাচ্ছিল। সে দোকানে গিয়ে কোনো খাবার কিনল না।
মোমেন সোজা চলে গেল জেলেপল্লীর মোড়ের দোকানটিতে। সেখান থেকে ১০ টাকা দিয়ে সুতোর দুটি গোলা এবং ২০ টাকা দিয়ে লাল-নীল রঙের একটি পাতলা কাগজের ঘুড়ি কিনল। দোকানদার অবাক হয়ে তাকালেও মোমেন কোনো কথা না বলে বাকি ২০ টাকা পকেটে গুঁজে দৌড়ে চলে গেল ফাঁকা ও নির্জন সমুদ্রসৈকতের দিকে।
এনজিও স্কুলে মাস্টার মশাই তাকে পেন্সিল দিয়ে কাঁচা হাতে বাংলা অক্ষর লেখা শিখিয়েছিলেন। মোমেন বালুর ওপর বসে পকেটে থাকা পেন্সিলের টুকরোটি বের করল। তারপর অতি যত্ন করে, পরম আকুতি দিয়ে ঘুড়ির সেই লাল-নীল পাতলা কাগজের বুকে তার জীবনের প্রথম ও শেষ চিঠিটি লিখল:
“আল্লাহ, আমাদের তিন বেলা খাবার পাঠিয়ে দিও, আমার মার শাড়িটা অনেক ছেঁড়া, আমার মার জন্য তিনটে শাড়ি পাঠাইও।”
এই চিঠি কেবল কাগজের ওপর পেন্সিলের কিছু আঁচড় ছিল না; এটি ছিল বঙ্গোপসাগরের নোনা তটে দাঁড়িয়ে থাকা এক নিঃস্ব, পিতৃহীন, ক্ষুধার্ত শিশুর পরম করুণাময়ের দরবারে পাঠানো আত্মার আর্জি।
শেষ বিকেলের রক্তিম আলো যখন বঙ্গোপসাগরের বুক ছুঁয়ে বিলীন হওয়ার উপক্রম করছিল, তখন মোমেন সৈকতের বালুতে দাঁড়িয়ে বাতাসে ঘুড়িটি উড়িয়ে দিল। লাল-নীল রঙের ঘুড়িটি বাতাসের তোড় পেয়ে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠতে শুরু করল।
ঘুড়ি যত ওপরে উঠতে থাকে, মোমেনের ছোট হৃদয়টি তত বেশি আনন্দে নেচে ওঠে। সে আনমনে ভাবতে থাকে, তার ঘুড়িটি আকাশে উড়তে উড়তে সোজা আল্লাহর কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ঘুড়িটি যখন অনেক উঁচুতে উঠে গেল, তখন তার হাতের সুতো শেষ হয়ে এল। মোমেন দৌড়ে আবার দোকানে গেল, পকেটের শেষ সম্বল সেই বাকি ২০ টাকা দিয়ে আরও দুটি সুতোর গোলা কিনে আনল।
নতুন সুতোর মুখে একটি সাধারণ গিট্টু দিয়ে মোমেন আবার ঘুড়ি ওড়াতে শুরু করল। ঘুড়ি উঁচুতে উঠতে উঠতে আকাশের নীলিমায় মিশে যেতে লাগল। মোমেন মনে মনে হাসছিল। সে চিন্তা করছিল, আর মাত্র কিছুক্ষণ! ঘুড়িটা আল্লাহর হাতে পৌঁছালেই আর তাদের কোনো অভাব থাকবে না। চাল আসবে, দুধ আসবে, আর মায়ের ছেঁড়া শাড়ির বদলে তিনটে নতুন সুন্দর শাড়ি আসবে!
কিন্তু উপকূলীয় সামুদ্রিক বাতাস ক্ষণে ক্ষণে তার মেজাজ বদলায়। সন্ধ্যার আঁধার ঘন হয়ে আসার সাথে সাথে সমুদ্রের গভীর থেকে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও প্রলয়ঙ্করী হাওয়ার ঝাপটা এসে পড়ল। মোমেনের হাত থেকে লাটাই সজোরে টান খেল।
বাতাসের সেই তীব্র টানে ঘুড়ির সুতোর কাঁচা গিট্টুটি এক লহমায় খুলে গেল!
মোমেন হা করে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরতে লাগল। সুতোকাটা লাল-নীল ঘুড়িটি মুক্ত বাতাসে গোল হয়ে চক্কর খেতে খেতে গোধূলির আলো পেরিয়ে অসীম অন্ধকার সাগরের দিকে ভেসে চলে গেল।
হাত থেকে কাঠের লাটাইটা বালুতে পড়ে গেল। মোমেন দুই হাঁটুর ভেতর মুখ গুঁজে নিঃসঙ্গ সৈকতে বসে পড়ল। সমুদ্রের নোনা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল তার বুকফাটা বিলাপ। সে অসীম অন্ধকারের দিকে হাত তুলে পরম হতাশায় ফিসফিস করে বলল,
“আল্লাহর কাছে আমি চিঠিটা পাঠাইতে পারলাম না...”
রাত গভীর হলে বিষণ্ণ ও বিধ্বস্ত মোমেন ঘরের দিকে পা বাড়াল। ঘরের ভেতরে কোনো আলো নেই, অন্ধকার যেন এক বিষাদময় নীরবতা নিয়ে চেপে বসে আছে। মোমেনা তীব্র জ্বরে শয্যাশায়ী হয়ে ছেলের পথ চেয়ে ছটফট করছিল।
মোমেন ঘরে ঢুকে কোনো কথা না বলে অসুস্থ মায়ের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল। মোমেনা তার ফ্যাকাশে, বরফের মতো ঠাণ্ডা হাত দুটো বাড়িয়ে ছেলেকে বুকের গভীরে টেনে নেয়। অন্ধকারের মধ্যেই মায়ের চোখ দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় জল গড়িয়ে পড়তে থাকে মোমেনের চুলে। হয়তো কোনো অলৌকিক অনুভূতির মাধ্যমে মোমেনা বুঝতে পেরেছিল, এই পৃথিবীতে তার সময় ফুরিয়ে এসেছে। তার যাত্রার সময় হয়ে গেছে ওপারে। সে নিবিড় মমতায় ছেলেকে আঁকড়ে ধরে গায়ের সাথে চেপে রেখে কান্না চাপতে লাগল।
অনাহার, মানসিক আঘাত আর ক্লান্তিতে মোমেন মায়ের সেই উনুনহীন ঠাণ্ডা বুকে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়ল। আর ঘুমের ঘোরে অবুঝ শিশুটি দেখতে পেল এক স্বর্গীয় অপূর্ব স্বপ্ন:
তাদের জরাজীর্ণ ছনের কুঁড়েঘরটি যেন চোখের সামনে বাতাসে মিলিয়ে গেছে। তার জায়গায় উঠে দাঁড়িয়েছে এক বিশাল, শুভ্র রাজপ্রাসাদ। রাজপ্রাসাদের আলো ঝলমলে সুন্দর এক ড্রয়িংরুমে সোনালী সিংহাসনে বসে আছে তার মা মোমেনা। মায়ের গায়ে কোনো জোড়াতালি দেওয়া ছেঁড়া শাড়ি নেই, পরনে অপূর্ব সুতি রাজকীয় পোশাক। মায়ের মুখে কোনো রোগ বা অভাবের কালিমা নেই, সে হাসছে, একেবারে আগের মতো স্বাভাবিক ও অনন্য সুন্দরী রূপ নিয়ে!
আসমানের মেঘমালা চিরে তাদের জন্য নেমে আসছে শত শত সুস্বাদু খাবারের থালা, গ্লাস ভরা খাঁটি দুধ আর নতুন নতুন রেশমি শাড়ি। মোমেন রাজপ্রাসাদের মেঝেতে বসে হাততালি দিয়ে আনন্দে চিৎকার করে উঠছে, “মা! মা দ্যাখো! আল্লাহ আমাদের চিঠি পাইয়া গেছে! আমাদের আর কোনো অভাব নাই মা!”
কিন্তু স্বপ্নের সেই মায়াবী রাজপ্রাসাদ ভোরের প্রথম আলোর সাথে সাথে মিলিয়ে যেতে সময় নিল না।
ভোরের সূর্য যখন বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে জেগে উঠল, তখন মোমেনাদের ভাঙা টিনের চালের সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে সূর্যের একটি তীক্ষ্ণ ও উজ্জ্বল আলো এসে পড়ল মোমেনার নিষ্পন্দ ফ্যাকাশে মুখের ওপর।
মোমেন ঘুমের ঘোরে হাসতে হাসতে চোখ মেলল। আনন্দিত কণ্ঠে ডেকে উঠল, “মা! মা ওঠো! দ্যাখো সকাল হইয়া গেছে! কাল রাতে আমি কত সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখছি মা... আমাদের আর কোনো কষ্ট নাই!”
কিন্তু মোমেনা কোনো কথা বলল না।
মোমেন অধৈর্য হয়ে মায়ের গায়ে হাত দিয়ে ঝাঁকুনি দিতে গেল। স্পর্শ করতেই তার হাত থমকে গেল। মায়ের গা বরফের চেয়েও ঠাণ্ডা, শরীর শক্ত হয়ে জমে গেছে। মোমেনা আর এই পৃথিবীতে নেই। ক্ষুধা, চিকিৎসা আর অনাহারের যাতনা সইতে না পেরে সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে চিরদিনের জন্য চলে গেছে ওপারে, যেখানে কোনো শাড়ি ছেঁড়ার অপমান নেই, চুলায় আগুন না জ্বলার কোনো হাহাকার নেই।
অবুঝ মোমেন প্রথমে কিছু বুঝতে পারল না। সে মায়ের বুকের ওপর মাথা রেখে ধাক্কা দিতে লাগল, “মা কথা বলতেছ না কেন? মা ওঠো না... আমার খুব ক্ষুধা লাগছে...”
চালে জমা থাকা শিশিরবিন্দু টিনের ছিদ্র দিয়ে গড়িয়ে এসে মোমেনার নিষ্প্রাণ চোখের কোণে পড়ল, যেন মনে হচ্ছিল মৃত মোমেনাও বিদায়বেলায় এক ফোঁটা অশ্রু ফেলে গেছে। আর বাইরে, চিরকালের মতো বঙ্গোপসাগরের বিশাল তরঙ্গমালা নিরাসক্ত ও নির্মম গর্জনে তটে আছড়ে পড়তে লাগল।
প্রকাশিত :
২০:২৪, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট: ২০:৩৮, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রেজুয়ান আহম্মেদ
সিদ্ধেশ্বরীর ১৮৭/এ নম্বর বাড়ির তিনতলার ডি-থ্রি ফ্ল্যাটে বিকেল নামলে ঘরটা কেমন ঝিমিয়ে যায়। জানালার ভাঙা কাচ গলে ঢোকা হিমেল বাতাস বারান্দার পুরনো পর্দায় শহরের ধুলো জমায়। কোথাও প্রদীপ জ্বলে না। ঘরের কোণে কাঠমিস্ত্রির হাতে গড়া একখানা শালকাঠের টেবিল, তার ওপর গোছানো কয়েকটা হলদেটে কাগজ আর একটা ঝরনা কলম। সেই টেবিল-লাগোয়া কাঠের চেয়ারে চুপচাপ বসে আছেন ইয়াছির আহমেদ।
কোলঘেঁষে ঘুমিয়ে আছে তিন বছরের রুদ্র। ছেলেটার চোখের পাতা ঘন, কপাল তুলতুলে, দেখলে মনে হয় যেন কোনো রূপকথার রাজ্য থেকে নেমে এসেছে। তবু সেই মুখেও এখন ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। চব্বিশ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, পেটে এক ফোঁটা দুধ বা শক্ত খাবার পড়েনি। ইয়াছির ছেলের কপালে হাত রাখলেন, দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চোখের কোণে জমে থাকা জলটা দাড়ি বেয়ে গড়ানোর আগেই মুছে নিলেন।
পাশের ঘর থেকে ভেসে আসছে মায়ের ক্ষীণ কাশি। বৃদ্ধা মা কয়েক মাস ধরে শয্যাশায়ী; ফুসফুসের যন্ত্রণা তাঁকে দিনে দিনে খেয়ে ফেলছে। টেবিলে পড়ে থাকা প্রেসক্রিপশনের স্তূপ আর খালি ওষুধের পাতাগুলোই এই ঘরের একমাত্র নীরব সাক্ষী। ইয়াছির ড্রয়ারটা টেনে খুললেন। ভেতরে একটা ফাঁকা কৌটো আর তিনটে পুরনো চার আনার মুদ্রা ছাড়া কিছু নেই। অভাব যখন দরজায় এসে দাঁড়ায়, একজন লেখকের সমস্ত শব্দ মুহূর্তে অর্থহীন হয়ে যায়।
এই ফ্ল্যাটটা শুধু ইট-কাঠের কাঠামো নয়। প্রতিটা ইটের খাঁজে জড়িয়ে আছে একটা পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই। ইয়াছিরের পূর্বপুরুষের ভিটে ছিল পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনায়। দেশভাগের করুণ সময়ে শেকড় উপড়ে তাঁরা ঢাকায় চলে আসেন, সঙ্গে ছিল শুধু কিছু পিতলের থালাবাসন আর জীর্ণ কয়েকটা পাণ্ডুলিপি।
ঢাকায় নতুন করে জীবন শুরু হলেও শান্তি টেকেনি বেশি দিন। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হলে ইয়াছিরের বাবা ঘরে বসে থাকতে পারেননি। অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে নয় মাসের যুদ্ধে শহীদ হন। বাবার এই আত্মত্যাগের কথা ইয়াছির নিজে কখনো শোনেননি; শুনেছেন মায়ের মুখে, গল্পের মতো করে।
বাবা শহীদ হওয়ার পর মা একা হয়ে যান। কোলে শিশু ইয়াছির, সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তবু তিনি ভেঙে পড়েননি; দুঃখটাকে শক্তি বানিয়ে স্বাধীন দেশে নতুন করে দাঁড়ালেন এবং সিদ্ধেশ্বরী এলাকার শিক্ষাবিস্তারে জীবন উৎসর্গ করলেন।
মা চাকরি নিলেন সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে। ১৯৩৩ সালের ১ জানুয়ারি শ্রী বিভূতিভূষণ আহির ও তাঁর স্ত্রীর উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই বিদ্যালয় ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তান পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ পর্যন্ত বারবার রূপ বদলাতে দেখেছে। সেখানে কয়েক দশক ধরে বাংলা পড়িয়েছেন মা, সুনামের সঙ্গে, নিষ্ঠার সঙ্গে।
ছাত্রীদের তিনি শুধু ব্যাকরণ বা রবীন্দ্রনাথের কবিতা শেখাতেন না, শেখাতেন আত্মমর্যাদা আর দেশপ্রেম। মাসের পর মাস পরিশ্রম করে, নিজের সব শখ বিসর্জন দিয়ে জমিয়েছিলেন বাইশ লক্ষ টাকা। সেই টাকাতেই কেনা হয় সিদ্ধেশ্বরীর এই বারোশো বর্গফুটের ডি-থ্রি ফ্ল্যাট।
মা প্রায়ই বলতেন, "ইয়াছির, এই ঘর কোনো সাধারণ বাড়ি না। তোর বাবার রক্তের সম্মান আর আমার সারাজীবনের রোজগার এই চার দেয়ালের মধ্যে জমা আছে। এখানে বসে তুই সত্যি লিখবি, কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়াবি না।" কথাগুলো ইয়াছিরের মনে গভীর দাগ কেটেছিল। বাবার আদর্শ আর মায়ের সততা বুকে নিয়েই তিনি বড় হয়ে উঠেছেন।
ইয়াছিরের পড়াশোনা শুরু হয় গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলে। ছোটবেলা থেকেই শান্ত স্বভাবের, বইয়ের পোকা। বন্ধুরা মাঠে ফুটবল নিয়ে ব্যস্ত থাকত, আর ইয়াছির তখন লাইব্রেরির এক কোণে ডুবে থাকতেন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্রে।
মাধ্যমিক পাশ করে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। করিডোর, পুরনো লাইব্রেরি, বটতলার ছায়া, সব মিলিয়ে তাঁর মন আরও গভীরভাবে সাহিত্যের দিকে ঝুঁকে যায়। সাহিত্যকে তিনি কখনো নিছক বিনোদন মনে করেননি; মনে করতেন সমাজের আয়না।
উচ্চ মাধ্যমিক শেষে গন্তব্য হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৯২-৯৩ সেশনে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। সেই সময়ের বিভাগ ভরপুর ছিল প্রজ্ঞাবান শিক্ষকে; ভাষা, সাহিত্য ও রূপতত্ত্বের গভীর পাঠ নিয়েছেন সেখান থেকেই। অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম, মাস্টার্সেও সেরা ফল, নিজের প্রতিভার প্রমাণ রেখেছিলেন তিনি বারবার।
বিশ্ববিদ্যালয় শেষে চাকরির পথে হাঁটেননি। মন পড়ে ছিল কেবল লেখায়। পূর্ণকালীন লেখক হওয়ার কঠিন পথ বেছে নিলেন, নির্জন ঘরে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কলম চালিয়ে একের পর এক উপন্যাস লিখে গেলেন।
তাঁর লেখার শক্তি ছিল গভীর আবেগ, জীবনের কাঁচা সত্য, আর মনস্তত্ত্বের নিখুঁত রূপায়ণ। অল্প দিনেই নাম ছড়িয়ে পড়ল পাঠকমহলে। একুশে বইমেলায় তাঁর বই এলেই প্রকাশকের ব্যানারে নাম উঠত, পাঠকের দীর্ঘ লাইন পড়ত। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকত একটা অটোগ্রাফের আশায়।
এত খ্যাতির মধ্যেও ইয়াছির থেকে গেছেন একরকম আড়ালের মানুষ। প্রচার তাঁর পছন্দ ছিল না কখনোই। টকশোতে যাননি, পত্রিকা বা রেডিওতে সাক্ষাৎকার দেননি। বিশ্বাস করতেন, লেখকের আসল পরিচয় বইয়ের পাতায়; মুখ দেখানোর দরকার নেই। আড়ালে থেকেই তিনি জাতিকে উপহার দিয়ে গেছেন ধ্রুপদী সাহিত্য।
তাঁর জীবন ছিল পরিমিত ও সুশৃঙ্খল। রয়্যালটির টাকায় তিনজনের সংসার ভালোই চলছিল। মায়ের অবসরজীবন, ইয়াছিরের বইয়ের জগৎ, ছোট্ট ফ্ল্যাট, সব মিলিয়ে জীবনটা ছিল শান্ত এক দিঘির মতো।
এরই মাঝে এলেন সুচরিতা। শান্ত, অমায়িক স্বভাবের এই মেয়েটি ইয়াছিরের নির্জন মনটাকে ভালোই বুঝতেন। মায়ের সম্মতিতেই বিয়ে হলো। সুচরিতা ঘরে পা রাখার পর ফ্ল্যাটটা যেন নতুন প্রাণ পেল; প্রতিটা কোণে ফুটে উঠল এক স্নিগ্ধ পরিপাটি ছাপ।
লেখার টেবিলে চা পৌঁছে দেওয়া, মায়ের ওষুধের খেয়াল রাখা, প্রতিটা পাণ্ডুলিপির প্রথম পাঠিকা হওয়া, এভাবেই সুচরিতা এই সংসারের প্রাণভোমরা হয়ে উঠলেন। ইয়াছির ভাবতেন, জীবনের সব শূন্যতা বুঝি সৃষ্টিকর্তা একসঙ্গে ভরে দিয়েছেন। কিন্তু ভাগ্য যা লিখে রাখে, তা মানুষের ভাবনার চেয়ে ঢের বেশি নিষ্ঠুর।
তিন বছর আগের এক শীতের রাত। সুচরিতা তখন পূর্ণগর্ভা। মাঝরাতে হঠাৎ জটিলতা শুরু হলে ইয়াছির তাড়াহুড়ো করে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। ডাক্তারের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে প্রসবের টেবিলেই সুচরিতা শেষ নিশ্বাস ফেলেন।
জন্ম নিল নতুন প্রাণ, রুদ্র। কিন্তু সেই জন্মের আনন্দে ভাসার উপায় ইয়াছিরের ছিল না, কারণ পাশেই শুয়ে সুচরিতার নিথর দেহ। ত্রিশ বছর বয়সে মাতৃহীন হয়ে গেল সদ্যজাত শিশু। ইয়াছির কান্না বুকের গভীরে চেপে ধরে সন্তানকে বুকে টেনে নিলেন।
স্ত্রীর শোক ইয়াছিরকে প্রায় ভেঙে ফেলেছিল, কিন্তু কোলের রুদ্র আর বৃদ্ধা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁকে শক্ত হতে হয়েছিল। সেদিন থেকে ইয়াছির শুধু লেখক নন, একইসঙ্গে মা আর বাবা হয়ে উঠলেন। তখনও তিনি জানতেন না, দুঃসময়ের শুরু মাত্র; আসল ঝড় তখনও বাকি ছিল।
গত দুই-তিন বছরে প্রযুক্তিতে ঘটে গেল এক অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারে প্রকাশনা শিল্পের চেনা কাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে শুরু করল। বইয়ের বাজারে নামল এক নিষ্ঠুর পরিবর্তন।
যে প্রকাশকেরা একদিন ইয়াছিরের পাণ্ডুলিপির জন্য এই ফ্ল্যাটের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতেন, তাঁরাই এখন মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এআই দিয়ে সামান্য খরচে, মাত্র কয়েক ঘণ্টায় শত শত পাতার বই তৈরি হয়ে যাচ্ছে এখন।
মানুষের রক্তমাংসের আবেগ, বছরের পর বছরের সাধনা, এসবের কোনো দাম রইল না বাণিজ্যমুখী প্রকাশকের চোখে। সস্তায় ও দ্রুত বই বের করাই হয়ে উঠল একমাত্র লক্ষ্য। নতুন পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতে গিয়ে ইয়াছিরকে শুনতে হলো অপমানজনক কথা। বলা হলো, তাঁর মতো সনাতন ধারার লেখকের চাহিদা আর নেই, কম্পিউটারই এখন ভালো গল্প লিখে দিচ্ছে।
রয়্যালটি বন্ধ হওয়ার পর সঞ্চয়ে টান পড়ল। কিছুদিন টেনেটুনে চললেও বিপদ ক্রমে ঘনীভূত হলো। মা হঠাৎ হৃদরোগ আর ফুসফুসের জটিলতায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন।
মাকে বাঁচাতে শেষ সঞ্চয়টুকুও ডাক্তারের ফি, পরীক্ষা আর ওষুধের পেছনে খরচ হয়ে গেল। জমানো প্রতিটা পয়সা ফুরিয়ে এলো, এমনকি নিত্যদিনের বাজার করার টাকাও একসময় ইয়াছিরের হাতে রইল না।
এর মধ্যে রুদ্র তিন বছরে পা দিয়েছে। মায়ের আদর না পাওয়া ছেলেটা শুধু বাবার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। কিন্তু ঘরে খাবার বলতে কিছু নেই। চালের কৌটা ফাঁকা, ডালের বয়ামে ধুলো, আর শিশুর প্রধান খাবার গুঁড়ো দুধের শেষ কৌটাও দুদিন আগে খালি হয়ে গেছে।
দুদিন ধরে রুদ্র শুধু পানি আর সামান্য ভাতের মাড় খেয়ে বেঁচে আছে। দারিদ্র্য কী, এআই তার বাবার পেশা কীভাবে গিলে খেয়েছে, এসব ছেলেটা বোঝে না। সে কেবল ক্ষুধায় বাবার জামার আঁচল টেনে ধরে কেঁদে ওঠে।
"বাবা, দুধ খাবো, দুধ দাও।" রুদ্রের এই কান্না তীরের মতো বিঁধছিল ইয়াছিরের বুকে। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে চাইলেন, কিন্তু গলা শুকিয়ে আসছিল, কোনো কথা বেরোল না। নিজেকে তখন পৃথিবীর সবচেয়ে অপদার্থ বাবা মনে হচ্ছিল তাঁর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্র, যাঁর ধ্রুপদী বই হাজার পাঠক শ্রদ্ধায় পড়েছে, আজ সেই মানুষ নিজের তিন বছরের ছেলের জন্য এক কৌটা দুধ কিনতে পারেন না। এই দারিদ্র্য, এই অসহায়ত্ব ইয়াছিরের আত্মসম্মানকে ধীরে ধীরে পিষে ফেলছিল।
উপায় না দেখে ইয়াছির পরিচিত লেখক বন্ধু, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী আর পুরনো প্রকাশকদের কাছে সাহায্য চাইতে বেরোলেন। একের পর এক ফোন করলেন, কারও অফিসে সরাসরি গিয়ে হাজির হলেন। করুণা বা দান চাননি কারও কাছে; চেয়েছিলেন সামান্য ধার, বা নতুন পাণ্ডুলিপির বিনিময়ে সামান্য অগ্রিম। কিন্তু আধুনিক সমাজ বড় নিষ্ঠুর, বড় অর্থকেন্দ্রিক। একসময় যাঁরা তাঁকে ঘিরে প্রশংসা করতেন, আজ তাঁর দুর্দিনে তাঁরাই দূরে সরে গেলেন।
কেউ বাজারের মন্দার অজুহাত দিলেন, কেউ ফোন ধরেই অস্বীকার করলেন। এমনকি সবচেয়ে কাছের বন্ধুও ঠান্ডা গলায় বললেন, এই মুহূর্তে ধার দেওয়ার মতো অবস্থা তাঁদের নেই। ইয়াছির বুঝলেন, এই বিশাল ঢাকা শহরে তাঁর পরিবারের সত্যিকারের কেউ নেই।
সন্ধ্যা নামতেই ফ্ল্যাটের অন্ধকার আরও গাঢ় হলো। বিদ্যুৎ বিল বাকি থাকায় সংযোগ কেটে দেওয়ার হুমকি দিয়ে গেছে অফিস। ঘরে জ্বলছে শুধু একটা টিমটিমে মোমবাতি।
মা বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলেন, ওষুধের সময় পেরিয়ে গেছে কিন্তু ঘরে ওষুধ নেই। রুদ্র কাঁদতে কাঁদতে একসময় ইয়াছিরের কোলেই ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমের মধ্যেও তার ছোট ছোট দীর্ঘশ্বাস আর ঠোঁটের কাঁপুনি দেখে ইয়াছিরের মাথা কাজ করছিল না।
ঘুমন্ত রুদ্রকে মায়ের পাশে শুইয়ে দিলেন। মায়ের শীর্ণ হাতটা কিছুক্ষণ ধরে বসে রইলেন। তারপর ঠিক করলেন, কিছু একটা করতেই হবে। সন্তানকে না খাইয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরতে দেখা কোনো বাবার পক্ষে সম্ভব না। পিতৃত্বের টানে নিজের সারাজীবনের আত্মসম্মান, বংশের গৌরব, নৈতিকতার দেয়াল, সবকিছু ভাঙতে প্রস্তুত হলেন তিনি।
গায়ে পুরনো চাদর জড়িয়ে ঘর থেকে বেরোলেন। সিদ্ধেশ্বরীর গলি পেরিয়ে ধীরে হাঁটতে লাগলেন মালিবাগ মোড়ের দিকে। রাতের ঢাকা তখনও ঝলমলে, রাস্তায় গাড়ির সারি, মানুষ নিজেদের ব্যস্ততায় মগ্ন। কিন্তু ইয়াছিরের চোখের সামনে ভাসছিল শুধু রুদ্রের ক্ষুধার্ত, নিস্তেজ মুখ।
দরজার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন ইয়াছির। বুক দুরুদুরু করছিল, কপালে ঠান্ডা ঘাম। জীবনে কখনো কারও একটা পয়সাও না বলে ছোঁননি। আজ তিনি এক মরিয়া বাবা, পেছনে এক ক্ষুধার্ত সন্তানের কান্না।
ধীরপায়ে শপে ঢুকলেন। জীর্ণ পোশাক আর মলিন চেহারা দেখে নিরাপত্তারক্ষীরা একবার আড়চোখে তাকাল, কিছু বলল না। তাক পেরিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন শিশুখাদ্যের সারিতে।
সারিবদ্ধ দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের দুধের কৌটা। একটা পরিচিত ব্র্যান্ডের কৌটা তুলে নিলেন হাতে। দামের অঙ্কের দিকে তাকিয়ে চোখ ঝাপসা হয়ে এলো; এই টাকা তাঁর কাছে এখন দুঃস্বপ্নের মতো দূরের।
চারপাশে তাকালেন একবার। ক্রেতাদের ভিড়ে সবাই যে যার কেনাকাটায় ব্যস্ত। হাত কাঁপছিল, বুক ধুকপুক করছিল দ্রুত থেকে দ্রুততর। কৌটাটা চাদরের তলায় লুকিয়ে ফেললেন সাবধানে। জীবনের প্রথম অপরাধ করতে গিয়ে যেন শিরায় শিরায় রক্ত জমে যাচ্ছিল তাঁর।
স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ক্যাশ কাউন্টার পেরিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। কিন্তু পাপের পথ সহজ হয় না কখনো। সিসিটিভিতে নজর রাখা এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা আগেই খেয়াল করেছিলেন তাঁর অস্বাভাবিক আচরণ।
ঠিক যখন ইয়াছির কাচের স্বয়ংক্রিয় দরজা পেরিয়ে ফুটপাতে পা রাখতে যাবেন, পেছন থেকে দুটো শক্ত হাত এসে চাদর চেপে ধরল। "চোর! চোর! ধর চোরকে!" রক্ষীর চিৎকারে এক মুহূর্তে তছনছ হয়ে গেল শপের শান্ত পরিবেশ।
কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষী আর কর্মচারী ঘিরে ফেলল ইয়াছিরকে। টানাহেঁচড়ায় চাদরের তলা থেকে দুধের কৌটা সশব্দে গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। উপস্থিত ক্রেতারা কেনাকাটা থামিয়ে সেই দৃশ্য দেখতে ভিড় করলেন।
তাঁকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হলো শপের পেছনের এক কোণে। একটা খুঁটির সঙ্গে দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলা হলো। ম্যানেজার ক্রুদ্ধ গলায় গালিগালাজ করতে লাগলেন।
কাচের দরজা পেরিয়ে পথচারী আর কৌতূহলী মানুষ ভিড় জমাল ভেতরে। ভদ্রবেশী একজন মানুষকে চুরির অপরাধে বাঁধা অবস্থায় দেখে কেউ কেউ মোবাইল বের করে ছবি তুলল, কেউ ছুড়ে দিল কটু মন্তব্য। "তোর মতো চোরের জন্যই দেশের বদনাম!" "দেখতে তো ভদ্রলোক, ভেতরে ভণ্ড চোর!" এমন নানা কথায় বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
ইয়াছির প্রতিবাদ করলেন না, মাথা নিচু করে রইলেন। চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল অঝোরে; সেই জল অপমানের নাকি পরাজয়ের, বোঝার মতো মানুষ সেখানে কেউ ছিল না।
ভিড়ের মধ্যে থেকে কয়েকজন উৎসাহী যুবক আর কর্মচারী থাপ্পড়, ঘুসি মারতে শুরু করল। "চোরের শাস্তি না দিলে শিক্ষা হবে না," এই অজুহাতে হাত তুলল তারা। প্রতিটা আঘাত শরীরের চেয়েও বেশি বিঁধছিল আত্মায়।
একদিন যিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্র, যাঁর হাতে লেখা সাহিত্য হাজারো মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে, আজ সেই হাত দড়িতে বাঁধা, শরীরে বর্ষিত হচ্ছে গণপ্রহার। তবু মুখে আক্ষেপের কোনো ভাষা ছিল না তাঁর। শারীরিক যন্ত্রণা বা সামাজিক লজ্জার তোয়াক্কা করছিলেন না তিনি; মারধরের মধ্যে শুধু একটা কথাই বারবার আকুল গলায় বলে যাচ্ছিলেন, "আপনারা যা খুশি মারুন, শুধু আমাকে ছেড়ে দিন। আমার তিন বছরের ছেলে ঘরে অনাহারে কাঁদছে। দুধের অভাবে ও মরে যাবে। আমাকে একটা সুযোগ দিন, ও খুব ক্ষুধার্ত!"
সেই আকুতি, সেই চোখের জল কারও কারও মনে সামান্য দ্বিধা তৈরি করলেও বেশিরভাগের হৃদয় গলাতে পারল না। আধুনিক শহুরে জীবন মানুষকে বড় বেশি অসাড় আর সন্দিগ্ধ করে তুলেছে। সবাই ভাবল, ধরা পড়া চোর এমন হাজার মিথ্যা অজুহাত বানায়।
ম্যানেজার ঘোষণা দিলেন, পুলিশ না আসা পর্যন্ত এভাবেই বাঁধা থাকবে সে। দেয়ালে হেলান দিয়ে ইয়াছির চোখ বন্ধ করলেন। মনের পর্দায় ভেসে উঠল সিদ্ধেশ্বরীর সেই ফ্ল্যাটের ছবি— বিছানায় শুয়ে অসুস্থ মা, পাশে ক্ষুধার্ত রুদ্র হয়তো অন্ধকার ঘরে বাবার পথ চেয়ে কেঁদে কেঁদে নেতিয়ে পড়ছে। ইয়াছির ভাবলেন, তিনি কি সত্যিই কোনো অপরাধ করেছেন? সন্তানকে বাঁচানোর আকুতি কি অপরাধ হতে পারে? বাবার রক্ত, মায়ের সারাজীবনের শিক্ষকতা, তাঁর নিজের নির্জন সাধনা, সমাজ কি তাঁকে শেষে এই উপহারই দিল?
রাত গভীর হচ্ছিল। মালিবাগ মোড়ের কোলাহল কমে আসছিল ধীরে ধীরে, কিন্তু শপের ভেতরের আলো তখনও সমান উজ্জ্বল। ইয়াছির বাঁধা অবস্থায় মেঝেতে বসে, ঠোঁটের কোণে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত, কপালে কালশিটে দাগ।
মিডিয়া থেকে সবসময় নিজেকে দূরে রেখেছিলেন তিনি। চাননি কখনো নিজের মুখ লোকচক্ষুর সামনে আসুক। চেয়েছিলেন সাহিত্যই যেন তাঁর পরিচয় হয়ে থাকে। আজ যদি তিনি পরিচিত মুখ হতেন, নিয়মিত টিভিতে আসতেন, হয়তো এভাবে মালিবাগের রাস্তায় লাঞ্ছিত হতে হতো না। কিন্তু আড়াল থেকে সমাজকে কিছু দিতে চাওয়া এই মানুষটি আজ সমাজের চোখে নিছক এক সস্তা চোর। বুকের ভেতর জমছিল গভীর অভিমান। এই দেশ, এই শহর যেন তাঁর পিতৃত্বের মর্যাদা পায়ের তলায় পিষে দিয়েছে।
দূরে কোথাও পুলিশের সাইরেন বাজছিল। হয়তো আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আইনের হাতে তুলে দেওয়া হবে তাঁকে। কিন্তু ইয়াছিরের মন পড়ে ছিল সিদ্ধেশ্বরীর সেই ফ্ল্যাটে, যেখানে রুদ্র হয়তো তখনও বাবার নাম ধরে ডাকছে।
মালিবাগ মোড়ের আলো ঝলমলে সুপারশপের বাইরে তখন পুলিশের গাড়ির লাল-নীল আলো জ্বলছে। সাইরেনের শব্দে ফুটপাতে জমল কৌতূহলী মানুষ। দোকানের ভেতরে চাল, ডাল, প্রসাধনসামগ্রীর মাঝে ইয়াছির তখনও পিলারের সঙ্গে বাঁধা, কপাল থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত গড়িয়ে জমেছে চিবুকে। চাদরটা একপাশে খসে পড়েছে, সামনে মেঝেতে অবহেলায় পড়ে সেই দুধের কৌটো।
থানার ডিউটি অফিসার ঢুকতেই সিকিউরিটি গার্ড ব্যস্ত হয়ে উঠল। "স্যার, এই যে লোকটা। চাদরের নিচে কৌটা লুকিয়ে পালাচ্ছিল, হাতেনাতে ধরেছি।" অফিসার ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের এমন লাঞ্ছিত চেহারা দেখে তাঁর চোখে খানিকটা সংশয় ফুটে উঠল।
"আপনার নাম কী? বাড়ি কোথায়?" রুক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করলেন অফিসার। ইয়াছির রক্তাভ চোখ তুললেন ধীরে। গলায় ক্ষোভ ছিল না, ছিল শুধু অসীম ক্লান্তি। ফিসফিস করে বললেন, "আমার নাম ইয়াছির আহমেদ। ১৮৭/এ সিদ্ধেশ্বরী। কিন্তু থানায় নেওয়ার আগে দয়া করে এই দুধটুকু আমার ঘরে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। আমার তিন বছরের ছেলে না খেয়ে মরছে।"
অফিসার জবাব না দিয়ে গার্ডকে পকেট তল্লাশি করতে বললেন। টাকাপয়সা কিছু নেই। পাওয়া গেল শুধু একটা পুরনো, চামড়া উঠে যাওয়া মানিব্যাগ। উপুড় করতেই বেরিয়ে এলো কিছু ধুলোমাখা স্মৃতি— ১৯৭১ সালে শহীদ বাবার একটা ঝাপসা সাদাকালো পাসপোর্ট ছবি আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা পুরনো লাইব্রেরি কার্ড।
কার্ডটা হাতে নিয়ে অফিসার একটু থমকালেন। তাতে লেখা, "ইয়াছির আহমেদ, বাংলা বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ ১৯৯২-১৯৯৩।" চমকে গিয়ে লোকটার মুখের দিকে ভালো করে তাকালেন তিনি। মধ্যবয়সী এই মানুষের চেহারায় দাগি চোরের কোনো ছাপ নেই; বরং তাতে জড়িয়ে আছে শিক্ষিত, মার্জিত, আত্মমর্যাদাবান এক মুখের বিষাদ।
"আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র ছিলেন?" জিজ্ঞেস করলেন অফিসার। ইয়াছির উত্তর দিলেন না, শুধু চোখ বন্ধ করে রইলেন। সন্তানের খাবার কেনার সামর্থ্য যাঁর নেই, তাঁর কাছে ডিগ্রির অহংকার বড়ই অর্থহীন লাগে। এই শিক্ষাগত পরিচয় যেন তাঁর বর্তমান লাঞ্ছনাকে আরও বাড়িয়ে তুলছিল।
ঠিক তখনই ভিড়ের কোণে দাঁড়িয়ে ঘটনা দেখছিল শপের এক তরুণ কর্মী। সে হঠাৎ এগিয়ে এসে চেঁচিয়ে উঠল, "ইয়াছির আহমেদ! আপনি কি কথাসাহিত্যিক ইয়াছির আহমেদ? যাঁর 'অক্ষরের অশ্রুজল' আর 'পিতা' মেলায় হাজার কপি বিক্রি হতো?"
এই প্রশ্নে গোটা শপ যেন থমকে গেল। যারা একটু আগে "চোর, চোর" বলে চিৎকার করছিল, যারা মেরেছিল তাঁকে, তারা সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। দেশের ধ্রুপদী সাহিত্যের এক ধারক এভাবে সুপারশপ থেকে দুধ চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন, এটা যেন কারও বিশ্বাসই হতে চাইছিল না।
শপের ম্যানেজার হতবাক হয়ে হাঁটু গেড়ে বসলেন ইয়াছিরের সামনে। গলা কাঁপছিল তাঁর। "স্যার, আপনি? আপনি কেন এমন করতে গেলেন? আমাদের বললেই তো সাহায্য করতাম!" ইয়াছির ধীর গলায় বললেন, "আমি ভিক্ষা চাইতে আসিনি। চেয়েছিলাম সন্তানের জন্য কিছু জোগাড় করতে। মেধা বিক্রি করে আজ আমি নিঃস্ব, কিন্তু সন্তানের ক্ষুধা কোনো নীতিশাস্ত্র বোঝে না।"
লজ্জা আর অপরাধবোধে কর্মচারী আর গার্ডদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। একটু আগে যারা পশুর মতো মেরেছিল এই মানুষটাকে, তারা এবার ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে লাগল। মানুষের বাহ্যিক মোড়ক দেখে সমাজ সম্মান দেয় বা কেড়ে নেয়, কিন্তু পেটের ক্ষুধা যে জাতকুল বা খ্যাতি মানে না, এই অন্ধকার রাতে সেটাই স্পষ্ট হলো।
অফিসার আর দেরি করলেন না। ইয়াছিরের হাতের বাঁধন খুলে দিলেন। মুক্ত হয়ে অবশ হয়ে যাওয়া হাত দুটো একটু নাড়ালেন ইয়াছির। মনে তখন রাগ বা প্রতিশোধের কোনো ভাবনা নেই, শুধু তাকিয়ে রইলেন মেঝেতে ধুলো মাখা পড়ে থাকা দুধের কৌটার দিকে।
"স্যার, আমরা অত্যন্ত দুঃখিত। চিনতে পারিনি আপনাকে। কোনো কেস হবে না, বাড়ি যান।" হাত জোড় করে বললেন অফিসার। সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন ইয়াছির, কিন্তু দুর্বল শরীর কেঁপে উঠল। বললেন, "আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন। সমাজকে কিছু দিতে এসেছিলাম, শেষে একটা চোর হয়েই ফিরে যাচ্ছি।"
পুলিশের গাড়ি থেকে নেমে সিদ্ধেশ্বরীর গলিতে ঢোকার পথে ইয়াছিরের মনে ভেসে উঠল ত্রিশ বছরের ইতিহাস। ১৯৯৩ সালের জানুয়ারি— তরুণ ইয়াছির তখন সদ্য বাংলা বিভাগে পা রেখেছেন। কলা ভবনের করিডোর, কার্জন হলের লাল ইট, মধুর ক্যান্টিনের আড্ডা, সব মিলিয়ে সাহিত্যের এক মায়াবী জগতে ঢুকে পড়েছিলেন তিনি।
সেদিন মা স্কুলের বেতন থেকে কিছু টাকা বাঁচিয়ে হাতে তুলে দিয়েছিলেন নতুন একটা ফাউন্টেন পেন। বলেছিলেন, "ইয়াছির, তোর বাবা দেশের জন্য রক্ত দিয়েছেন। এই কলম দিয়ে তুই লিখবি মানুষের কষ্টের কথা। এমন কিছু লিখবি, যা মানুষের আত্মাকে নাড়া দেবে।"
মায়ের সেই কথা মনে রেখেই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাতগুলোতে জেগে ধ্রুপদী সাহিত্য চর্চা করেছেন তিনি। অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী আর ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর স্মৃতিবিজড়িত সেই বিভাগে ইয়াছির ছিলেন এক উজ্জ্বল নাম। অনার্সে প্রথম শ্রেণি পেয়েও কোনো সরকারি বা করপোরেট চাকরিতে যাননি, কারণ সাহিত্যকে ভালোবেসেছিলেন সবচেয়ে বেশি।
সেই ১৯৯২-৯৩ সেশনের দিনগুলোই ছিল ইয়াছিরের জীবনের সবচেয়ে স্বর্ণালী অধ্যায়। লাইব্রেরির কোণে বসে রবীন্দ্রনাথের গল্পের রূপতত্ত্ব খুঁজতে, বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষা নিয়ে ভাবতে ভাবতে কেটে যেত ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
সহপাঠীরা যখন বিসিএসের কোচিংয়ে দৌড়াদৌড়ি করত, ইয়াছির তখন বুড়িগঙ্গার তীরে বসে দেখতেন সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। তাঁর বিশ্বাস ছিল, খাঁটি সাহিত্য জন্মায় মানুষের জীবনের মাটির গন্ধ থেকে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের কল্পনা থেকে নয়।
মা সবসময় পাশে ছিলেন। সামান্য বেতনে সংসার চালিয়েও কখনো ছেলেকে চাকরির জন্য চাপ দেননি। বলতেন, "তোর বাবা দেশকে ভালোবেসে প্রাণ দিয়েছে, তুই সাহিত্যকে ভালোবেসে জীবন কাটা। টাকাপয়সা হয়তো বেশি পাবি না, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা পাবি।" মায়ের এই বিশ্বাসই ছিল ইয়াছিরের একমাত্র ভরসা।
মায়ের নিজের জীবনটাও এক দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। ১৯৩৩ সালের ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে তিনি তিন দশক শিক্ষকতা করেছেন বিশ্বস্ততার সঙ্গে। বেইলি রোড সংলগ্ন এই স্কুল শত শত মেয়েকে শিক্ষার আলো দেখিয়েছে।
প্রতিদিন সকালে রান্না সেরে হেঁটে স্কুলে যেতেন মা। বিকেলে ফিরে আবার বসতেন ইয়াছিরের পড়া নিয়ে। বছরের পর বছর নিজের জন্য একটা নতুন শাড়িও কেনেননি; শুধু টাকা জমিয়েছেন, যেন পিতৃহীন ছেলেটা অভাব বুঝতে না পারে।
শেষে সেই জমানো বাইশ লক্ষ টাকায় কিনেছিলেন সিদ্ধেশ্বরীর এই বারোশো বর্গফুটের ফ্ল্যাট। কেনার দিন ছেলেকে ডেকে বলেছিলেন, "ইয়াছির, এই ছাদটুকু আমাদের নিজের। এখানে বসে তুই স্বাধীনভাবে লিখবি, কাউকে তোষামোদ করতে হবে না।"
পরিবারের শেকড় ছিল ভারতের চব্বিশ পরগনায়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর লাখো মানুষের মতো ইয়াছিরের দাদাও ভিটেমাটি ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। নতুন দেশে শূন্য থেকে শুরু করতে হয়েছিল তাঁদের।
১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হলে ইয়াছিরের বাবা ঘর ছেড়ে চলে যান। ইয়াছির তখন মায়ের গর্ভে। বাবা আর ফেরেননি— যুদ্ধের শেষদিকে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে তুলে নিয়ে হত্যা করে। শহীদ বাবার মুখ ইয়াছির কোনোদিন দেখেননি।
মা তাঁকে বড় করেছেন বাবার একটা পুরনো ঘড়ি আর একখানা ডায়েরি দেখিয়ে। বলতেন, "তোর বাবা বলতেন, সততার চেয়ে বড় সম্পদ মানুষের হয় না। আমরা চব্বিশ পরগনা থেকে সব হারিয়ে এসেছি, কিন্তু ঈমান আর সততা হারাইনি।" মায়ের এই শিক্ষা ইয়াছির কখনো ভোলেননি।
বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে প্রথম বই প্রকাশ পেতেই পাঠকমহলে আলোড়ন তৈরি হয়েছিল। কোনো সস্তা চমক ছাড়াই, শুধু গভীর মানবিক অনুভূতি আর ভাষার জাদুতে তিনি জয় করে নিয়েছিলেন পাঠকের হৃদয়।
একুশে বইমেলায় তাঁর স্টলের সামনে ভিড় লেগে থাকত। প্রকাশকেরা ফ্ল্যাটে এসে লাইন দিতেন পাণ্ডুলিপির জন্য, অগ্রিম হিসেবে লাখ টাকা দিতে চাইতেন। কিন্তু ইয়াছির কখনো অতিরিক্ত নিতেন না; যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই নিতেন।
অনেক পরিচিত লেখক তখন টিভি টকশো আর পত্রিকার সাক্ষাৎকারে ব্যস্ত, নিজেদের প্রসারে মগ্ন। ইয়াছির তখন ঘরের কোণে বসে নির্জনে সাধনা করতেন। বলতেন, লেখক যখন নিজের মুখ বিক্রি শুরু করে, তার অক্ষরের জোর কমে যায়— লেখকের পরিচয় থাকা উচিত তার সাহিত্যেই।
সেই সুবর্ণ সময়ে এলেন সুচরিতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্রী, ইয়াছিরের সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠিকা। তাঁর নির্জনতা আর সরলতায় মুগ্ধ হয়ে এই অভাবী কিন্তু আত্মমর্যাদাবান পরিবারে বধূ হয়ে এসেছিলেন তিনি।
সুচরিতা আসার পর ফ্ল্যাটটা শান্তিতে ভরে উঠেছিল। শাশুড়ির সেবা, ইয়াছিরের এলোমেলো লেখা গুছিয়ে রাখা, ঘরটাকে পরিপাটি রাখা, সুচরিতা যেন এই সংসারের লক্ষ্মী হয়ে উঠেছিলেন।
তখনই ইয়াছির লিখেছেন জীবনের সেরা উপন্যাসগুলো। প্রতি বছর মেলায় তাঁর বই মানেই বেস্টসেলার তালিকার শীর্ষ। অর্থ আর যশ দুটোই তখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু সুখের সেই দিন যে এত দ্রুত শেষ হবে, তা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি ইয়াছির।
তিন বছর আগের সেই রাতে সুচরিতা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান। মুহূর্তে ওলটপালট হয়ে যায় ইয়াছিরের গোটা পৃথিবী। অপারেশন থিয়েটারের বাইরে ডাক্তার এসে বলেছিলেন, "আমরা মা-কে বাঁচাতে পারলাম না, কিন্তু সুন্দর একটা ছেলে হয়েছে আপনার।" ইয়াছির তখন পাথরের মতো স্থির দাঁড়িয়ে ছিলেন।
কোলে তুলে দেওয়া নবজাতক রুদ্রকে দেখে কান্না আর বেদনায় প্রায় ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। সুচরিতাকে হারানোর ক্ষত তাঁকে মানসিকভাবে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু বৃদ্ধা মা শক্ত হাতে নাতিকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন।
মা বলেছিলেন, "ইয়াছির, সুচরিতা তোকে রুদ্রকে দিয়ে গেছে। এই সন্তানই এখন তোর একমাত্র সম্বল। বাঁচতে হবে এই শিশুর জন্য।" নিজের কষ্ট চেপে ধরে কলম আবার তুলে নিয়েছিলেন ইয়াছির। কিন্তু ততদিনে সাহিত্যের বাজারে দেখা দিতে শুরু করেছে এক অদৃশ্য মড়ক।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আবির্ভাব প্রকাশনা শিল্পে নামিয়ে আনল এক কঠিন অন্ধকার। বিশ্বজুড়ে অ্যালগরিদমের আধিপত্যে প্রথাগত সাহিত্যচর্চা বড় একটা ধাক্কা খেল। দেশের নামী প্রকাশকেরা লাভ-ক্ষতির নতুন হিসাব কষতে লাগলেন।
এআই দিয়ে মিনিটের মধ্যে যেকোনো ধাঁচের উপন্যাস, গল্প বা অনুবাদ তৈরি করা সম্ভব হয়ে উঠল, লেখককে সম্মানী দিতে হয় না, মাসের পর মাস পাণ্ডুলিপির অপেক্ষা করতে হয় না। কম্পিউটারে তৈরি পাণ্ডুলিপি বাজারে সয়লাব করে দিতে লাগলেন প্রকাশকেরা। মৌলিক মানবিক অনুভূতি আর সাধনার জায়গা দখল করে নিল যান্ত্রিক শব্দমালা। ইয়াছিরের মতো লেখকেরা হঠাৎ নিজেদের আবিষ্কার করলেন এক নির্দয় নতুন জগতে, যেখানে মানুষের রক্তের অক্ষরের কোনো দাম নেই।
নতুন পাণ্ডুলিপি নিয়ে পুরনো প্রকাশকের কাছে গেলে সেই প্রকাশক চা খাইয়ে ঠান্ডা গলায় বললেন, "ইয়াছির সাহেব, লেখার মান নিয়ে কোনো কথা নেই, কিন্তু বাজার বদলে গেছে। এখন পাঠক গভীর উপন্যাস পড়ে না, সস্তা বিনোদন চায়। আর এআই দিয়ে এখন আমরা ইচ্ছেমতো গল্প বানাচ্ছি, খরচ নামমাত্র। আপনার এই জটিল সামাজিক উপন্যাস ছাপিয়ে লাভ হবে না। রোমান্টিক থ্রিলার সস্তায় লিখে দিতে পারলে দেখতে পারি।"
স্তব্ধ হয়ে শুনেছিলেন সেই কথা ইয়াছির। মেধা আর আত্মসম্মান বিক্রি করে সস্তা গল্প লেখা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। পাণ্ডুলিপি ব্যাগে ভরে বুকভাঙা কষ্ট নিয়ে হেঁটে ফিরেছিলেন সিদ্ধেশ্বরীর ঘরে। সেদিন থেকেই তাঁর আয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল।
আয় বন্ধ হতেই সঞ্চয় গলতে শুরু করল। আসল বিপদ এলো তখন, যখন মা মারাত্মক হৃদরোগ আর কিডনির জটিলতায় আক্রান্ত হলেন। যে মা সারাজীবন কষ্ট করে তাঁকে মানুষ করেছেন, সেই মায়ের চিকিৎসার জন্য নিজের শেষ সম্বলটুকু বাজি রাখলেন ইয়াছির।
পাণ্ডুলিপি বিক্রির সামান্য সঞ্চয়, সুচরিতার রেখে যাওয়া দুয়েকটা গয়না, সব একে একে বিক্রি হয়ে গেল ডাক্তারের ভিজিট আর ডায়ালিসিসে। কিন্তু মায়ের শরীরের কোনো উন্নতি হলো না; তিনি একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন।
এদিকে রুদ্র বড় হচ্ছিল। মায়ের বুকের দুধ না পাওয়া শিশুর মূল খাবার ছিল বাজারের গুঁড়ো দুধ। কিন্তু একসময় ইয়াছিরের হাতে টাকা রইল না একটাও। আয় শূন্য, ওষুধের টাকা নেই, চালের বয়াম পুরোপুরি খালি।
তিন দিন আগে ঘরের শেষ দুধের কৌটাটা ফুরিয়ে গিয়েছিল। রুদ্র কৌটাটা উপুড় করে শেষ গুঁড়োটুকুও চেটে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। সেই দৃশ্য দেখে ইয়াছিরের বুকের ভেতরটা দুমড়ে গিয়েছিল।
পরদিন সকাল থেকে শিশুটা এক ফোঁটা দুধ পায়নি। চাল ফুটিয়ে মাড় খাওয়ানোর চেষ্টা করেছিলেন ইয়াছির, কিন্তু তিন বছরের রুদ্র সেই তেতো মাড় মুখ থেকে ফেলে দিয়ে কেঁদে উঠেছিল, "বাবা, দুধ! দুধ দাও!" এই সরল আকুতি সিদ্ধেশ্বরীর শান্ত ঘরে কাচের মতো ভেঙে পড়ছিল।
পুরনো বন্ধুদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছিলেন ইয়াছির। যেসব বন্ধু একদিন তাঁর মেধার প্রশংসা করত, এখন বড় বড় পদে বসা, তারা সবাই ব্যস্ততার অজুহাতে ফিরিয়ে দিল। কেউ পাঁচশো টাকা ধার দেওয়ার সৌজন্যও দেখাল না।
আগের রাতে শেষবার এক পুরনো প্রকাশকের দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন যখন, প্রকাশক তাঁকে পাঁচশো টাকার নোট বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, "ইয়াছির সাহেব, ভিক্ষা হিসেবে নিয়ে যান। নতুন পাণ্ডুলিপি আর আনবেন না, এখন এআইয়ের যুগ, আপনার মতো লেখকের আর দরকার নেই।"
সেই নোট নেননি ইয়াছির। নীরব চোখে প্রকাশকের দিকে তাকিয়ে হেঁটে বেরিয়ে এসেছিলেন। ভিক্ষার টাকায় সন্তানকে খাওয়ানোর চেয়ে মরে যাওয়া ভালো, এমন অভিমান জন্মেছিল তাঁর মনে।
কিন্তু আজ বিকেলে রুদ্র কাঁদতে কাঁদতে নিস্তেজ হয়ে মেঝেতে পড়ে গেলে, চোখের তারা দুটো ওলটপালট হতে শুরু করলে, ইয়াছিরের সব অভিমান ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল। বুঝলেন, একজন মৃত লেখকের আত্মসম্মানের চেয়ে এক ফোঁটা দুধের দাম অনেক বেশি।
সেই তাড়না থেকেই আজ সন্ধ্যায় মালিবাগ মোড়ের 'স্বপ্ন' সুপারশপে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। পকেটে শূন্যতা, মাথায় সন্তানের নিস্তেজ মুখ। ভেবেছিলেন, চুরি করা পাপ, কিন্তু সন্তানকে না খাইয়ে মেরে ফেলা আরও বড় অপরাধ।
কিন্তু নিয়তি বড় অদ্ভুত। সারাজীবন সততার পথে হাঁটা মানুষটা জীবনের প্রথম অন্যায় করতে গিয়েই ধরা পড়ে গেলেন। মারধরের প্রতিটা আঘাত সহ্য করার সময় শুধু মনে মনে ভাবছিলেন, "হে ঈশ্বর, আমাকে অপমান করো, কিন্তু রুদ্রের জন্য একটু দুধের ব্যবস্থা করে দাও।"
রাত বারোটা তখন। মালিবাগ মোড় থেকে ধীরপায়ে হেঁটে সিদ্ধেশ্বরীর গলিতে এসে পৌঁছালেন ইয়াছির। গায়ের চাদর ছেঁড়া, ঠোঁটের কোণে জমাট রক্ত, কিন্তু হাতে ধরা সেই দুধের কৌটো। শপের সেই তরুণ কর্মী নিজের পকেটের টাকায় কিনে জোর করে গুঁজে দিয়েছিল তাঁর হাতে।
সিঁড়ি বেয়ে ওঠার প্রতিটা পা ভারী মনে হচ্ছিল। অন্ধকার সিঁড়িঘরের নীরবতা যেন উপহাস করছিল তাঁকে। তিন তলার দরজার সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন।
ভেতর থেকে কোনো শব্দ আসছে না। কাঁপা হাতে চাবি বের করে তালা খুললেন। দরজা খুলতেই ভেসে এলো এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। মোমবাতিটা অনেক আগেই নিভে গেছে।
পকেট থেকে ম্যাচ বের করে একটা কাঠি জ্বালালেন। ছোট্ট আলোয় ঘর স্পষ্ট হয়ে উঠল। বিছানায় শুয়ে মা, বুকের কাছে গুঁড়ি মেরে ঘুমিয়ে রুদ্র। ধীরপায়ে বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন ইয়াছির।
দেশলাইয়ের আলোটা রুদ্রের মুখের কাছে নিলেন। ছেলে ঘুমাচ্ছে, গাল বেয়ে শুকিয়ে যাওয়া চোখের জলের দাগ স্পষ্ট। ঘুমের মধ্যেও মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে সে। ইয়াছির হাত বাড়িয়ে রুদ্রের মাথায় রাখলেন।
তারপর মায়ের দিকে তাকালেন। শরীর অস্বাভাবিক ঠান্ডা। "মা, ও মা, দেখো আমি রুদ্রের জন্য দুধ এনেছি।" মা সাড়া দিলেন না। কপালে হাত রাখতেই ইয়াছিরের সারা শরীর কেঁপে উঠল।
মায়ের দেহ পুরোপুরি শক্ত, হিম। ইয়াছির যখন মালিবাগের রাস্তায় চোর অপবাদে লাঞ্ছিত হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই এই নির্জন ঘরে তাঁর মা নিঃশব্দে শেষ নিশ্বাস ফেলেছেন। একটা মুক্তিযুদ্ধোত্তর পরিবার, এক আত্মত্যাগী শিক্ষকের জীবনসন্ধ্যা এভাবেই ডুবে গেল চরম নীরবতায়।
চিৎকার করে কাঁদতে পারলেন না ইয়াছির। গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না। ধীরে ধীরে বসে পড়লেন নিথর মায়ের পায়ের কাছে। হাতে ধরা দুধের কৌটোটা গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে।
একদিকে মৃত মা, অন্যদিকে ক্ষুধার্ত নিস্তেজ সন্তান, মাঝে দাঁড়িয়ে এক ব্যর্থ লেখক, যাঁকে এই সমাজ আর প্রযুক্তি ধীরে ধীরে অপাঙক্তেয় করে তুলেছে। একুশে বইমেলার হাততালি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ডিগ্রি, বাবার শহীদি গৌরব, সবকিছু যেন এই অন্ধকারে তলিয়ে গেল।
ঘমন্ত রুদ্রকে আলতো করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন ইয়াছির। অন্ধকারেও বাবার চেনা গায়ের গন্ধ পেয়ে ছেলে ডুকরে উঠল, "বাবা, দুধ?" কপালে চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বললেন তিনি, "হ্যাঁ বাবা, দুধ এনেছি। কিন্তু তোর দাদিমা আজ অনেক দূরে চলে গেছে।"
এই শহরের বুকে পিতৃত্বের যে করুণ পরাজয় ঘটে গেল আজ রাতে, তা হয়তো কোনো এআইয়ের যান্ত্রিক গল্পে কখনো লেখা হবে না। থেকে যাবে শুধু সিদ্ধেশ্বরীর এই নীরব ইটের দেয়ালের দীর্ঘশ্বাসে।