img

সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডীয় লেখিকা অ্যান কার্সন

প্রকাশিত :  ১২:৩৪, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডীয় লেখিকা অ্যান কার্সন

কানাডীয় লেখিকা অ্যান কার্সন ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। সাহিত্যে তার সাহসী ও নতুন ধরনের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টায় সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম থেকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়।

অ্যান কার্সন ১৯৫০ সালে কানাডার টরন্টোতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮১ সালে তিনি ক্লাসিকস বিষয়ে ‘ওদি এত আমো এরগো সুম’ নামে ডক্টরাল থিসিস প্রকাশ করেন। এই ল্যাটিন বাক্যাংশটির শাব্দিক অর্থ, ‘আমি ঘৃণা করি এবং আমি ভালোবাসি, সুতরাং আমি আছি’।

তিনি কবিতা লেখার পাশাপাশি বিভিন্ন বই অনুবাদ করেছেন এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। অ্যান কার্সনের বেশিরভাগ সাহিত্যকর্মে ভাষা ও শব্দের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পেয়েছে। নতুন অর্থ ও ভাবনা তৈরির জন্য তিনি শব্দের উৎস ও ব্যুৎপত্তি নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করেন। তার অনেক লেখার শুরুই শব্দের ব্যুৎপত্তি থেকে।

অ্যান কার্সন তার পুরো সাহিত্যজীবনে লেখার নতুন নতুন ধরন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। প্রচলিত সাহিত্যিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে ভিন্নভাবে লেখার প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। এর একটি উদাহরণ ২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘ফ্লোট’। বইটিতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখা ২২টি ছোট রচনা রয়েছে। এগুলো যেকোনো ক্রমে পড়া যায়।

এ ছাড়া দৃশ্যশিল্পী, নৃত্য পরিচালক, অপেরা ও থিয়েটার পরিচালকদের সঙ্গে অ্যান কার্সনের যৌথ কাজ তার ভিন্নধর্মী চিন্তা ও সৃজনশীলতার পরিচয় দেয়। তিনি প্রচলিত সাহিত্যিক নিয়মের বাইরে গিয়ে নতুনভাবে কাজ করতে পছন্দ করেন। ১৯৯০-এর দশক থেকে আন্তর্জাতিক শিল্প ও সাহিত্য অঙ্গনে তার কাজ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। 

২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘রং নর্মা’তেও কার্সনের এই বৈচিত্র্যময় লেখার ধরন দেখা যায়। বইটিতে বিভিন্ন ধরনের রচনা রয়েছে এবং এতে অভিনয় ও মঞ্চ পরিবেশনার উপাদানও রয়েছে। একই সঙ্গে সাহিত্য, শিল্প ও শিক্ষাক্ষেত্রের নানা বিষয় তিনি এতে তুলে ধরেছেন।

প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য থেকে তার করা অনুবাদগুলোও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে গ্রিক কবি স্যাফোর কবিতার বিভিন্ন খণ্ডাংশ নিয়ে কাজ এবং ২০০২ সালে প্রকাশিত ‘ইফ নট, উইন্টার’ উল্লেখযোগ্য। তিনি গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিসের ‘ইলেক্ট্রা’ ও ‘অ্যান্টিগোন’ এবং ইউরিপিডিসের ‘বাক্কাই’ নাটকও অনুবাদ করেছেন। এসব অনুবাদ যথাক্রমে ২০০১ ও ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয়।

১৯৯০-এর দশকে অ্যান কার্সন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম প্রকাশ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ‘গ্লাস, আয়রনি অ্যান্ড গড’ কাব্যগ্রন্থের ‘দ্য গ্লাস এসে’। এই দীর্ঘ কবিতায় কবিতা, প্রবন্ধসহ বিভিন্ন সাহিত্যধারার মিশেল দেখা যায়। এর মাধ্যমে কার্সন দীর্ঘ কবিতার একটি নতুন ধরনের রূপ তুলে ধরেছেন, যেখানে বিভিন্ন সাহিত্যধারার সীমারেখা স্পষ্ট থাকে না।

১৯৯০-এর দশকে অ্যান কার্সনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশিত হয়, ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড : আ নভেল ইন ভার্স’। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত এই বইটিকে তার অন্যতম সেরা কাজ হিসেবে ধরা হয়। বইটিতে কার্সন প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যকে আধুনিক জীবন ও ভাষার সঙ্গে মিলিয়েছেন। এর মূল চরিত্র গেরিয়ন—ডানাওয়ালা এক লাল দানব।

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর গ্রিক কবি স্টেসিখোরোসের গেরিয়নকে নিয়ে লেখা একটি কবিতার খণ্ডাংশ থেকেই কার্সন এই বইয়ের ভাবনা নিয়েছেন। প্রাচীন এই গল্পকে আধুনিক ভাষা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে কার্সন বইটিতে একটি নতুন ধরনের সাহিত্যিক রূপ তৈরি করেছেন।


img

ভালোবাসা—যেখানে হৃদয় কথা বলে, নীরবতাও ভাষা হয়ে ওঠে

প্রকাশিত :  ০৭:৫৬, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

কাছে থাকার নাম নয়, ভালোবাসা কখনো দূরে থেকেও একজন মানুষের ভালো থাকার প্রার্থনা

শান্ত নুর সোহাইল

ভালোবাসা—মাত্র চার অক্ষরের একটি শব্দ। অথচ মানুষের জীবনে এর বিস্তার একটি মহাবিশ্বের মতো। ভালোবাসা কখনো প্রথম দেখার মুগ্ধতা, কখনো দীর্ঘ অপেক্ষা; কখনো হাত ধরে পথ চলা, আবার কখনো হাত ছেড়ে দিয়েও প্রিয় মানুষটির জন্য নীরবে প্রার্থনা করা।

মানুষের জীবনে অর্থ, সাফল্য কিংবা পরিচয়ের পাশাপাশি ভালোবাসারও রয়েছে গভীর মানসিক গুরুত্ব। বিশ্বাস ও পারস্পরিক সম্পর্ক মানুষের জীবনসন্তুষ্টি ও সামগ্রিক সুস্থতার সঙ্গে ইতিবাচকভাবে সম্পর্কিত—বিভিন্ন গবেষণাতেও এমন চিত্র উঠে এসেছে।

কিন্তু ভালোবাসা কি শুধু একজন মানুষকে পাওয়ার নাম?

সম্ভবত নয়।

ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া নয়

আমরা ভালোবাসাকে অনেক সময় অধিকার দিয়ে মাপি। প্রিয় মানুষটি পাশে থাকবে, প্রতিদিন কথা বলবে, সবকিছু জানাবে—এসব প্রত্যাশাকে ভালোবাসার স্বাভাবিক অংশ মনে করি।

কিন্তু ভালোবাসার গভীরতা হয়তো তখনই বোঝা যায়, যখন নিজের চাওয়ার চেয়ে প্রিয় মানুষটির ভালো থাকাকে বড় করে দেখা যায়।

কখনো মানুষটি পাশে থাকে না, তবুও তার জন্য মনের দরজা খোলা থাকে।

কখনো সম্পর্ক থাকে না, কিন্তু শুভকামনা থেকে যায়।

কখনো কথা হয় না, অথচ নীরবে বলা হয়—

‘তুমি যেখানে থাকো, ভালো থেকো।’

এই নিঃশব্দ শুভকামনাও ভালোবাসার এক গভীর রূপ।

কিছু ভালোবাসার কোনো পরিণতি হয় না

জীবনের সব ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না। কিছু ভালোবাসা গল্পের মাঝপথে থেমে যায়। কিছু সম্পর্ক সময়ের কাছে হেরে যায়। আবার কিছু মানুষ একে অপরকে ভালোবেসেও একই জীবনের গল্প হয়ে উঠতে পারে না।

তবু সেই ভালোবাসা মিথ্যে হয়ে যায় না।

বরং কখনো কখনো অপূর্ণ ভালোবাসাই মানুষের স্মৃতিতে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে।

একটি পুরোনো গান, বৃষ্টিভেজা বিকেল, নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো নির্জনতা, পরিচিত কোনো সুগন্ধ কিংবা বহু বছর আগের একটি দৃষ্টি—হঠাৎ করেই অতীতকে বর্তমানের দরজায় এনে দাঁড় করায়।

মানুষটি হয়তো অনেক দূরে।

কিন্তু স্মৃতি কখনো দূরত্ব মানে না।

ভালোবাসা ও অপেক্ষা

ভালোবাসার সঙ্গে অপেক্ষার সম্পর্ক গভীর।

যে অপেক্ষা ক্যালেন্ডারের পাতা গুনে না, ঘড়ির কাঁটা দেখে না—শুধু মনে মনে বলে, ‘হয়তো একদিন...’

সেই অপেক্ষার ভেতরে যেমন আশা থাকে, তেমনি থাকে ভয়ও।

তবে অপেক্ষা তখনই সুন্দর, যখন সেখানে আত্মসম্মান অক্ষুণ্ণ থাকে। কারও অবহেলার কাছে নিজেকে প্রতিনিয়ত ছোট করে অপেক্ষা করা ভালোবাসা নয়; সেটি নিজের প্রতি অন্যায়।

সত্যিকারের ভালোবাসা কাউকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নিজের মর্যাদাকেও বাঁচিয়ে রাখতে শেখে।

ভালোবাসা কি অধিকার?

বর্তমান সময়ে সম্পর্কের বড় একটি সংকট হলো অতিরিক্ত অধিকারবোধ।

প্রিয় মানুষটি কার সঙ্গে কথা বলছে, কোথায় যাচ্ছে, কেন ফোন ধরছে না, কেন বার্তা দিতে দেরি করছে—এসব প্রশ্ন যখন বিশ্বাসকে ছাপিয়ে যায়, তখন ভালোবাসা ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের রূপ নেয়।

অথচ ভালোবাসা কারও স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার নাম নয়।

ভালোবাসা মানে—

‘তুমি আমার প্রিয়, তাই তোমার স্বাধীনতাকেও আমি সম্মান করি।’

বিশ্বাস ছাড়া কোনো সম্পর্ক দীর্ঘদিন টিকে থাকা কঠিন। আর পারস্পরিক আস্থা মানুষের সম্পর্ক ও সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ—গবেষণাতেও এর ইতিবাচক সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

ভালোবাসার প্রথম শর্ত—সম্মান

‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’—এই বাক্যটি বলা সহজ।

কিন্তু প্রিয় মানুষটির মতামতকে সম্মান করা, তার ‘না’কে মেনে নেওয়া, তার দুর্বলতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করা এবং তার ব্যক্তিসত্তাকে স্বীকৃতি দেওয়া—এসবই ভালোবাসার প্রকৃত পরীক্ষা।

যেখানে ভালোবাসা আছে, সেখানে ভয় থাকার কথা নয়।

যেখানে ভালোবাসা আছে, সেখানে অপমান থাকার কথা নয়।

যেখানে ভালোবাসা আছে, সেখানে মানুষ নিজেকে হারিয়ে ফেলে না; বরং নিজের সবচেয়ে সুন্দর রূপটিকে খুঁজে পায়।

বিচ্ছেদ মানেই ভালোবাসার মৃত্যু নয়

বিচ্ছেদ শব্দটি শুনলেই আমরা সাধারণত সম্পর্কের শেষ বুঝি। কিন্তু সব বিচ্ছেদের ভেতর ঘৃণা থাকে না।

কিছু বিচ্ছেদ আসে পরিস্থিতির কারণে।

কিছু আসে সময়ের কারণে।

কিছু আসে সামাজিক বাস্তবতায়।

আর কিছু বিচ্ছেদ হয়তো দুজন মানুষকে আলাদা করে দেয়, কিন্তু তাদের স্মৃতিকে আলাদা করতে পারে না।

তাই সব বিচ্ছেদের শেষ বাক্য ‘আমি তোমাকে ঘৃণা করি’ নয়।

কখনো শেষ বাক্যটি হয়—

‘আমাদের পথ আলাদা, কিন্তু তুমি ভালো থেকো।’

হয়তো এখানেই ভালোবাসার সবচেয়ে নিঃস্বার্থ রূপটি লুকিয়ে আছে।

ভালোবাসা থেকে জন্ম নেয় শিল্প

মানুষের অসংখ্য গান, কবিতা, গল্প ও উপন্যাসের পেছনে রয়েছে ভালোবাসা।

কখনো প্রাপ্তির আনন্দ শিল্পীকে গান লিখিয়েছে, আবার কখনো হারানোর বেদনা তাকে কলম ধরিয়েছে।

যে মানুষটিকে জীবনে পাওয়া যায়নি, তাকে কখনো কবিতায় পাওয়া যায়।

যে কথাটি মুখে বলা হয়নি, সেটি কখনো গানের কথায় উচ্চারিত হয়।

যে স্মৃতি ভুলে যাওয়া সম্ভব হয়নি, সেটি কখনো হয়ে ওঠে একটি উপন্যাসের চরিত্র।

অর্থাৎ ভালোবাসা শুধু জীবনকে স্পর্শ করে না—কখনো কখনো সৃষ্টি করে একটি নতুন পৃথিবী।

ভালোবাসা শুধু নারী-পুরুষের সম্পর্ক নয়

মায়ের সন্তানের জন্য রাত জাগা ভালোবাসা।

বাবার নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়া ভালোবাসা।

বন্ধুর বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানো ভালোবাসা।

অসহায় মানুষের পাশে হাত বাড়িয়ে দেওয়া ভালোবাসা।

প্রকৃতি, প্রাণী ও পৃথিবীর প্রতি মমতাও ভালোবাসা।

তাই ভালোবাসাকে যদি শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্কের মধ্যে আটকে রাখা হয়, তবে ভালোবাসার বিশালতাকেই ছোট করে দেখা হয়।

শেষ কথা

ভালোবাসার কোনো একক সংজ্ঞা নেই।

কারও কাছে ভালোবাসা মানে পাশাপাশি হাঁটা।

কারও কাছে দীর্ঘ অপেক্ষা।

কারও কাছে প্রতিদিনের যত্ন।

আবার কারও কাছে ভালোবাসা মানে—দূরে থেকেও একজন মানুষের সুখ কামনা করা।

সব ভালোবাসা সংসার পর্যন্ত পৌঁছায় না। সব অপেক্ষার শেষে দেখা হয় না। সব গল্পের শেষ হয় না ‘তারপর তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করল’ দিয়ে।

কিছু গল্প অসমাপ্ত থাকে।

কিছু মানুষ দূরে চলে যায়।

কিছু নাম পুরোনো হয়ে যায়।

কিন্তু হৃদয়ের কোনো এক গোপন ঘরে একটি অনুভূতি থেকে যায়—যাকে সময়ও পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারে না।

হয়তো ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর সংজ্ঞা এটাই—

কাউকে নিজের করে পাওয়ার চেয়েও, তার ভালো থাকাকে নিজের সুখের অংশ করে নেওয়া।

আর সত্যিকারের ভালোবাসা যদি কখনো দূরত্বে হারিয়েও যায়, তার স্মৃতি মানুষের ভেতর একটি আলো হয়ে থাকে।

কারণ মানুষ চলে যায়—

ভালোবাসা থেকে যায়।


শান্ত নুর সোহাইল: লেখক, গীতিকার, সুরকার ও কন্ঠ শিল্পী ।