img

ভালোবাসার নামে শৃঙ্খল: একটি সংসারের ভেতরে ধীরে ধীরে মরে যাওয়া মানুষের গল্প

প্রকাশিত :  ০৮:৪৪, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

ভালোবাসার নামে শৃঙ্খল: একটি সংসারের ভেতরে ধীরে ধীরে মরে যাওয়া মানুষের গল্প

শান্ত নুর সোহাইল

মানুষের মন বড় বিচিত্র। একই ঘরে পাশাপাশি বসবাস করেও একজন মানুষ আরেকজনের মনের খবর কতটুকুই বা রাখে! প্রতিদিন দেখা হয়, কথা হয়, একসঙ্গে আহার হয়, রাত হলে একই ছাদের নিচে ঘুম আসে; তবু মনের মধ্যে যে কতখানি দূরত্ব জমে উঠতে পারে, তা বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই।

সংসারে এমন অনেক মানুষ আছে, যাদের দেখে মনে হয় তারা বেশ সুখেই আছে। স্বামী অফিস থেকে ফিরলে স্ত্রী এগিয়ে আসে, স্ত্রী অসুস্থ হলে স্বামী ওষুধ এনে দেয়, সন্তানদের পড়াশোনা চলে, ঈদে নতুন পোশাক কেনা হয়, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া-আসাও বন্ধ হয় না। পাড়া-প্রতিবেশীর চোখে তাদের সংসারে কোনো অভাব নেই।

অথচ সেই সংসারেরই কোনো এক কোণে হয়তো একজন মানুষ প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে।

তারও একদিন স্বপ্ন ছিল। ইচ্ছা ছিল নিজের মতো করে বাঁচার। হয়তো গান শুনতে ভালোবাসত, হয়তো বিকেলে পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে চাইত, হয়তো নিজের পছন্দের পোশাকটি কিনে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটু হাসতে চাইত। এসবের কোনোটিই তো খুব বড় চাওয়া ছিল না।

কিন্তু সংসারে আসার পর ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারল, তার নিজের বলে আর কিছু নেই। কখন কী পরবে, কোথায় যাবে, কার সঙ্গে কথা বলবে, কী পছন্দ করবে—সবকিছুরই যেন একজনের অনুমোদন প্রয়োজন।

প্রথম প্রথম সে প্রতিবাদ করেছিল। বলেছিল, \'আমারও তো কিছু ভালো লাগা আছে।\'

উত্তরে শুনেছিল, \'সংসার করতে হলে এত নিজের ইচ্ছা নিয়ে চললে হয় না।\'

কথাটি শুনে সে আর কিছু বলেনি। মনে মনে ভেবেছিল, হয়তো সংসার এমনই। হয়তো ভালোবাসার মানুষের জন্য কিছু ইচ্ছা বিসর্জন দিতে হয়।

কিন্তু মানুষ যে কতখানি বিসর্জন দিলে নিজের অস্তিত্বটুকুও হারিয়ে ফেলে, সে হিসাব বোধ হয় কেউ রাখে না।

একটুখানি স্বাধীনতার অপরাধ

যে মানুষটি এতদিন অন্যের ইশারায় চলেছে, তার মন পাওয়ার পথটিও নিয়ন্ত্রণকারী মানুষের কাছে বেশ মসৃণ ছিল। কিন্তু একদিন সে নিজের ইচ্ছায় সামান্য একটু ভিন্ন পথে হাঁটতে চাইল। নিজের পছন্দের কথা বলল, কিংবা কোনো সিদ্ধান্তে দ্বিমত প্রকাশ করল।

ব্যস, সেদিন থেকেই যেন সবকিছু বদলে গেল।

যে কথাটি আগে ভালোবাসার আবদার বলে মনে হতো, সেটিই এখন অবাধ্যতা। যে বন্ধুটির সঙ্গে কথা বলা নিয়ে কোনো আপত্তি ছিল না, সে-ই এখন সন্দেহের কারণ। যে সামান্য স্বাধীনতাটুকু একসময় স্বাভাবিক ছিল, সেটিই এখন সংসারের অশান্তির নামান্তর।

মানুষটি অবাক হয়ে ভাবল, এতদিন যে কথাগুলো বললে সংসারে ভালোবাসা ছিল, আজ সেই একই কথা বললে ভালোবাসা কমে গেল কেন?

সে বুঝতে পারল না, ভালোবাসা কি তবে শুধু মেনে নেওয়ার নাম? সেখানে নিজের মত প্রকাশের কোনো অধিকার নেই?

অথচ যে মানুষটি তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তারও হয়তো নিজের যুক্তি আছে। সে মনে করে, সংসারের ভালো-মন্দ বোঝার দায়িত্ব তারই বেশি। সে যেভাবে ভাবছে, সেটিই সঠিক। প্রিয় মানুষটিকে নিজের মতো করে চালাতে পারলেই বুঝি সংসার সুন্দর থাকবে।

এই ভুল ধারণাটিই একসময় ভালোবাসার জায়গায় দেয়াল তুলে দেয়।

যে অভিমান কেউ দেখতে পায় না

তারপর থেকে মানুষটি ধীরে ধীরে চুপ হয়ে গেল।

আগে কোনো কিছু ভালো না লাগলে বলত। এখন আর বলে না। আগে কোনো শখের কথা মনে এলে জানাত। এখন সেটিও জানায় না। কোনোদিন মন খারাপ হলে একা বসে থাকে। কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলে, \'কিছু হয়নি।\'

এই \'কিছু হয়নি\' কথাটির মধ্যে যে কত কিছু লুকিয়ে থাকে, তা বোঝার মতো মানুষটি পাশে থেকেও যেন পাশে থাকে না।

রাতের বেলা সবাই ঘুমিয়ে গেলে সে কখনো কখনো জানালার পাশে দাঁড়ায়। বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মনে পড়ে, একদিন সে কত কিছু করতে চেয়েছিল। কত জায়গায় যাওয়ার কথা ছিল, কত গান শোনার কথা ছিল, কত মানুষের সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল।

আজ সেসব কথা মনে করতেও তার কষ্ট হয়।

নিজের ইচ্ছাগুলোকে সে যেন একে একে মাটিচাপা দিয়েছে। মনের ভেতর তৈরি হয়েছে কতগুলো অদৃশ্য কবর। আর সেই কবরগুলোর পাশে সে নিঃশব্দে বসে নিজের অপূর্ণ স্বপ্নগুলোর জিয়ারত করে।

কেউ দেখে না। কেউ জানে না।

সংসারের মানুষটি শুধু ভাবে, সে আগের চেয়ে অনেক শান্ত হয়েছে।

কিন্তু সে জানে না, শান্ত হওয়া আর ভেতর থেকে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া এক কথা নয়।

যখন এক ছাদের নিচে দুটি পৃথিবী

দিন যায়, মাস যায়। সংসারের কাজকর্ম ঠিকই চলে। অথচ দুজন মানুষের মধ্যে কথার চেয়ে নীরবতা বাড়তে থাকে।

একজন ভাবে, অপরজন বুঝি আর আগের মতো ভালোবাসে না। অন্যজন ভাবে, এতদিনেও যখন কেউ তার মনের খবর নিল না, তখন আর বলেই বা কী হবে?

এইভাবে একই ঘরে দুটি আলাদা পৃথিবী তৈরি হয়।

একটি পৃথিবীতে আছে সংসারের হিসাব, দায়িত্ব, নিয়মকানুন এবং কর্তৃত্ব। অন্য পৃথিবীতে আছে অপূর্ণতা, অভিমান, দীর্ঘশ্বাস এবং কিছু না-পাওয়ার বেদনা।

একসময় মানুষটি মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। যে গান শুনলে একদিন তার মন ভালো হতো, আজ সেই গানেও আনন্দ পায় না। পরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলতেও অনীহা জন্মায়। কখনো অকারণে চোখ ভিজে আসে, কখনো সারারাত ঘুম আসে না।

এমন অবস্থাকে শুধু অভিমান বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ও অবহেলা মানুষের মনে গভীর অবসাদ তৈরি করতে পারে। তখন তার প্রয়োজন হয় সহমর্মিতা, নিরাপদ পরিবেশ এবং প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তা।

কিন্তু সংসারের মানুষটি হয়তো এসবের কিছুই বুঝতে পারে না। সে শুধু বলে, \'ইদানীং তোমাকে কেমন যেন লাগে।\'

কথাটি শুনে মানুষটি মৃদু হাসে। বলে, \'না, কিছু না।\'

তারপর আবার চুপ করে যায়।

অন্য কারও একটি প্রশ্ন

মানুষের জীবনে কখনো কখনো এমন একজন আসে, যে খুব বেশি কিছু করে না। শুধু মন দিয়ে কথা শোনে। জিজ্ঞাসা করে, \'তোমার মন খারাপ কেন?\'

হয়তো এই প্রশ্নটি সে বহুদিন শোনেনি।

যে মানুষটি দীর্ঘদিন নিজের কথা বলার কাউকে পায়নি, তার কাছে এই সামান্য মনোযোগটুকুও বড় হয়ে দেখা দেয়। কেউ তার পছন্দের গানটি শুনতে চায়, কেউ তার পুরোনো স্বপ্নের কথা জানতে চায়, কেউ তার হাসির আড়ালে জমে থাকা কষ্টটুকু বুঝতে চেষ্টা করে।

তখন তার মনে হয়, পৃথিবীতে অন্তত একজন মানুষ আছে, যার কাছে সে নিজের মতো করে কথা বলতে পারে।

কেউ সেই মমতার মধ্যে আশ্রয় খুঁজে পায়, কেউ আবার আবেগের দুর্বল মুহূর্তে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে।

তবে সব নিঃসঙ্গ মানুষ অন্য সম্পর্কে যায় না। কেউ নিজের ভেতরেই কষ্ট লুকিয়ে রাখে, কেউ সম্পর্কটি মেরামত করার চেষ্টা করে, কেউ নিজের আত্মসম্মান রক্ষায় আলাদা হয়ে যায়।

আর কেউ কেউ ভুল করে ফেলে।

কিন্তু মানুষের ভুলের বিচার করতে গিয়ে তার জীবনের আগের অধ্যায়গুলোও একেবারে মুছে ফেলা যায় না। আবার আগের কষ্টের অজুহাতে পরবর্তী বিশ্বাসভঙ্গকেও নির্দোষ বলা যায় না।

জীবন এত সরল নয়।

তারপর একদিন সংসারের গোপন খবর প্রকাশ পেল

একদিন হয়তো সেই মানুষটির অন্য সম্পর্কের কথা প্রকাশ হয়ে গেল।

সংসারে ঝড় উঠল। এতদিন যে মানুষটি নিজের ইচ্ছাকে সংসারের নিয়ম বলে প্রতিষ্ঠা করেছিল, সে ক্ষোভে ফেটে পড়ল।

বলল, \'আমি কি তার কোনো অভাব রেখেছিলাম? খাওয়াইনি? পরাইনি? এত কিছু করার পরও সে এমন করতে পারল?\'

তার আত্মীয়স্বজনও পাশে এসে দাঁড়ালেন।

কেউ বললেন, \'আমরা তো আগেই বুঝেছিলাম, মানুষটি ভালো নয়।\'

কেউ আবার সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, \'ওকে ভুলে যাও। তোমাকে এমন জায়গায় বিয়ে দেব, যেখানে তুমি রাজরানির মতো থাকবে। সম্রাট শাহজাহানের মমতাজ হয়ে থাকবে।\'

কথাগুলো শুনে সে হয়তো কিছুটা সান্ত্বনা পেল। কিন্তু যে সংসারটি এতদিন ধরে তার চোখের সামনে ছিল, তার ভেতরের গল্পটি কি সে একবারও মনে করার চেষ্টা করল?

একবারও কি মনে পড়ল, কতদিন ধরে অপর মানুষটি নিজের পছন্দের কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল?

কতদিন ধরে তার মুখে হাসি ছিল না?

কতদিন ধরে দুজনের মধ্যে কোনো মন খুলে কথা হয়নি?

সে কি কখনো জিজ্ঞাসা করেছিল, \'তুমি কি আমার সঙ্গে সুখে আছ?\'

নাকি শুধু জানতে চেয়েছিল, \'আমার কথা মতো চলছ তো?\'

এই প্রশ্ন দুটির মধ্যে যে আকাশ-পাতাল তফাত, তা সে হয়তো কোনোদিন বুঝতেই পারেনি।

ভালোবাসা কি তবে এত কঠিন?

দাম্পত্যে একজন আরেকজনের সম্পত্তি নয়। স্বামী যেমন নিজের পছন্দ নিয়ে বাঁচার অধিকার রাখে, স্ত্রীও তেমনি নিজের স্বপ্ন ও ব্যক্তিসত্তা নিয়ে বাঁচার অধিকার রাখে।

একজনের স্বাধীনতা অন্যজনের প্রতি দায়িত্বহীনতার নাম নয়। আবার দায়িত্বের নামে অন্যজনের সবটুকু স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়াও ভালোবাসা নয়।

সংসারে মতের অমিল থাকবে। কখনো ঝগড়া হবে, অভিমান হবে, ভুল বোঝাবুঝিও হবে। কিন্তু সবকিছুর শেষে দুজনের মধ্যে কথা বলার একটি দরজা খোলা থাকা চাই।

যেখানে একজন বলতে পারবে, \'তোমার এই কথায় আমার কষ্ট হয়েছে।\'

অন্যজন বলতে পারবে, \'আমি বুঝতে পারিনি, আমাকে ক্ষমা করো।\'

সেখানে নিজের ভুল স্বীকার করতে লজ্জা থাকবে না, অন্যের মতামত শুনতে অপমান বোধ হবে না।

কারণ সংসার কোনো আদালত নয়, যেখানে একজন বিচারক হবে আর অন্যজন সারাজীবন আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকবে।

সংসার তো দুটি মানুষের সহযাত্রা। একজনের পা ব্যথা হলে অন্যজন একটু ধীরে হাঁটবে। একজনের মন খারাপ হলে অন্যজন তার পাশে বসবে। একজন ভুল করলে অন্যজন তাকে বোঝাবে। কিন্তু কেউ কাউকে নিজের ইচ্ছার কারাগারে বন্দি করে রাখবে না।

শেষ দৃশ্যের আগে একটি প্রশ্ন

কোনো একদিন যদি সেই নিয়ন্ত্রণকারী মানুষটি হঠাৎ বুঝতে পারে, তার পাশে থাকা মানুষটি আর আগের মতো নেই, তখন হয়তো তার বুকের ভেতরেও শূন্যতা তৈরি হবে।

সে হয়তো অনেক কিছু ফিরিয়ে আনতে চাইবে। পুরোনো দিন, পুরোনো হাসি, একসঙ্গে কাটানো বিকেল, অভিমানের পর কাছে টেনে নেওয়া সেই মুহূর্তগুলো।

কিন্তু সবকিছু কি আর ফিরিয়ে আনা যায়?

যে স্বপ্নগুলো বহুদিন আগে মাটিচাপা পড়েছে, সেগুলো কি শুধু একদিনের অনুতাপে আবার বেঁচে ওঠে?

মানুষকে হারানোর পর তার ভুল খুঁজে পাওয়া সহজ। কিন্তু মানুষটি যখন পাশে ছিল, তখন তার মনের কথা বোঝার চেষ্টা করাই ছিল প্রকৃত ভালোবাসা।

সংসার বাঁচাতে হলে শুধু ঘরটিকে বাঁচালেই হয় না, ঘরের মানুষটিকেও বাঁচিয়ে রাখতে হয়।

কারণ মানুষকে শিকল দিয়ে পাশে রাখা যায়, কিন্তু হৃদয়ে রাখা যায় না। ভয় দেখিয়ে আনুগত্য আদায় করা যায়, ভালোবাসা নয়।

যে সংসারে দুজন মানুষ পাশাপাশি থেকেও নিজের মতো করে নিঃশ্বাস নিতে পারে, যে সংসারে একজনের স্বপ্ন অন্যজনের কাছে বোঝা নয়, বরং আনন্দের বিষয়—সেই সংসারেই ভালোবাসা বেঁচে থাকে।

আর যে সংসারে একজনের আকাশ অন্যজন নিজের হাতে ঢেকে দেয়, সেখানে একসময় দুজন মানুষই অন্ধকারে পথ হারায়।

ভালোবাসা মানুষকে বন্দি করে না, মুক্তি দেয়। ভালোবাসা কারও ডানা কেটে দেয় না, উড়তে সাহস জোগায়।

হয়তো পৃথিবীর সব সংসার টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সব বিচ্ছেদ ঠেকানোও সম্ভব নয়। কিন্তু ভালোবাসার নামে একজন মানুষকে প্রতিদিন একটু একটু করে মেরে ফেলা থেকে বিরত থাকা নিশ্চয়ই সম্ভব।

আর সেই উপলব্ধিটুকুই যদি একটি মানুষকে তার জীবনসঙ্গীর দিকে নতুন করে তাকাতে শেখায়, তবে এই লেখার সার্থকতা সেখানেই।

(শান্ত নুর সোহাইল
লেখক, গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী)
img

নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির ক্যাটালগে রেজুয়ান আহম্মেদ, সুইজারল্যান্ডের Eldar.ch-এ তিন বই শীর্ষস্থানে

প্রকাশিত :  ০৯:৪০, ০২ নভেম্বর ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা, ২ নভেম্বর ২০২৬: বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বইয়ের বাজারে নিজের সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে পরিচিতি গড়ে তুলছেন কথাসাহিত্যিক রেজুয়ান আহম্মেদ (Rajuan Ahmed)। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির অনলাইন ক্যাটালগে তাঁর নাম ও বই-সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যায়। অন্যদিকে, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক অনলাইন বই বিক্রয় প্রতিষ্ঠান Eldar.ch-এর নিজস্ব সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের তালিকায় তাঁর তিনটি গ্রন্থ প্রথম তিনটি অবস্থানে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে লেখক হিসেবে যাত্রা শুরু করেন রেজুয়ান আহম্মেদ। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় লেখালেখির পাশাপাশি তিনি উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, নাটক ও চিত্রনাট্য রচনায় যুক্ত রয়েছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে যুদ্ধ, ভূরাজনীতি, মানবিক বিপর্যয়, সামাজিক মনস্তত্ত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক, বাস্তুচ্যুতি ও মানুষের অস্তিত্বসংকটের মতো বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বই বিক্রয় ও ডিজিটাল পাঠের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তাঁর বইয়ের উপস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির ক্যাটালগে লেখকের উপস্থিতি

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী গ্রন্থাগার নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির (New York Public Library) অনলাইন ক্যাটালগে Rajuan Ahmed নাম দিয়ে অনুসন্ধান করলে তাঁর লেখক পরিচিতি ও বই-সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যায়। গ্রন্থাগারটির অনলাইন ক্যাটালগে লেখকের নাম, বইয়ের শিরোনাম এবং অন্যান্য গ্রন্থপঞ্জিগত তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধানের সুযোগ রয়েছে।

আন্তর্জাতিক গ্রন্থাগারের অনলাইন অনুসন্ধানব্যবস্থায় একজন বাংলাদেশি লেখকের নাম ও সাহিত্যকর্মের উপস্থিতি তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতি বিস্তারের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য দিক। বিশেষ করে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত বইয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের একজন লেখকের সাহিত্যকর্ম আন্তর্জাতিক পাঠক ও গবেষকদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

তবে গ্রন্থাগারের ক্যাটালগে লেখকের নাম অনুসন্ধান করে তথ্য পাওয়া এবং তাঁর কোনো নির্দিষ্ট বই গ্রন্থাগারের স্থায়ী সংগ্রহে অন্তর্ভুক্ত থাকা এক বিষয় নয়। তাই নির্দিষ্ট বইয়ের ক্যাটালগ রেকর্ড ও সংগ্রহের অবস্থা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

সুইজারল্যান্ডের বইবাজারে তিন গ্রন্থের শীর্ষ অবস্থান

রেজুয়ান আহম্মেদের আন্তর্জাতিক উপস্থিতির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য সুইজারল্যান্ডভিত্তিক অনলাইন বই বিক্রয় প্রতিষ্ঠান Eldar.ch-এর লেখক পৃষ্ঠা। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে প্রদর্শিত সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের তালিকায় তাঁর তিনটি গ্রন্থ প্রথম তিনটি অবস্থানে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তালিকার প্রথম অবস্থানে রয়েছে তাঁর মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কথাসাহিত্যভিত্তিক গ্রন্থ We Are All Mad। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে Beyond the Naf, যা নন-ফিকশন বিভাগে তালিকাভুক্ত। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে তাঁর আরেকটি উপন্যাস The Days of Gaza।

Eldar.ch-এর ওয়েবসাইটে বইগুলোর বিভাগভিত্তিক অবস্থান, মূল্য এবং অন্যান্য পণ্য-সম্পর্কিত তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তালিকায় প্রদর্শিত অবস্থানকে তাদের বিক্রয় বা জনপ্রিয়তার পরিসরের মধ্যে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একে সামগ্রিক আন্তর্জাতিক বইবাজারের বিক্রয়-র‍্যাঙ্কিং হিসেবে ব্যাখ্যা করা সমীচীন নয়।

তিনটি বইয়ের বিষয়বস্তুতেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য বৈচিত্র্য। We Are All Mad গ্রন্থে আধুনিক মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, সামাজিক সম্পর্ক, একাকিত্ব ও অন্তর্দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে কাহিনি নির্মিত হয়েছে। Beyond the Naf গ্রন্থে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, পরিচয়, মাতৃভূমি, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও বাস্তুচ্যুতির বেদনা তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে, The Days of Gaza উপন্যাসে যুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয়, ব্যক্তিগত ক্ষতি এবং সংঘাতের মধ্যে মানুষের সম্পর্ক ও বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা প্রাধান্য পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পাঠমাধ্যমেও বইয়ের উপস্থিতি

সুইজারল্যান্ডের Eldar.ch-এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পাঠ প্ল্যাটফর্ম Everand-এও রেজুয়ান আহম্মেদের লেখক পরিচিতি ও তাঁর একাধিক বইয়ের তালিকা পাওয়া যায়। সেখানে We Are All Mad, The Days of Gaza এবং Death Breakসহ তাঁর বিভিন্ন ইংরেজি ভাষার গ্রন্থের উপস্থিতি রয়েছে।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অনলাইন বই বিক্রয় ও গ্রন্থপঞ্জি প্ল্যাটফর্মেও তাঁর কয়েকটি বই তালিকাভুক্ত হয়েছে। এসব প্ল্যাটফর্মে বইয়ের উপস্থিতি তাঁর সাহিত্যকর্মকে ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে।

যুদ্ধ, ভূরাজনীতি ও মানবিক সংকট তাঁর লেখার অন্যতম উপজীব্য

রেজুয়ান আহম্মেদের ইংরেজি সাহিত্যকর্মের মধ্যে The Shadow of War বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভূরাজনৈতিক সংঘাতের পটভূমিতে রচিত এই উপন্যাসে যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাবের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের পারিবারিক জীবন, সম্পর্কের ভাঙন, মানসিক বিপর্যয় ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

তাঁর আরেকটি গ্রন্থ The Days of Gaza ফিলিস্তিনের যুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে রচিত। এতে সংঘাতের রাজনৈতিক বাস্তবতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত বেদনা, স্বজন হারানোর অভিজ্ঞতা এবং মানবিক সম্পর্কের সংকট গুরুত্ব পেয়েছে।

এ ছাড়া Death Break, Love of the Forest Bird, Prison of Dreams, Quantum Wizards এবং In the Land of Mirages গ্রন্থগুলো তাঁর বিষয়বৈচিত্র্য ও সৃজনশীল অনুসন্ধানের পরিচয় বহন করে।

তিন দশকের সাহিত্যযাত্রা

১৯৯১ সালে ‘আভাগী’ নামের একটি ছোটগল্প রচনার মধ্য দিয়ে রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যিক জীবনের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে তিনি টেলিভিশন নাটক ও চিত্রনাট্য রচনার সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁর রচিত ‘এই শহরে’, ‘সুইট সিক্সটিন’ ও ‘ম্যারেজ স্টেশন’ শিরোনামের টেলিভিশন নাটকগুলো তাঁকে নাট্যজগতে পরিচিতি এনে দেয়।

বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রেজুয়ান আহম্মেদ ইংরেজি ভাষায়ও নিয়মিত বই প্রকাশ করছেন। তাঁর লেখায় বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা, মানুষের মনস্তত্ত্ব, পারিবারিক টানাপোড়েন এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংকট বিভিন্ন আঙ্গিকে উঠে এসেছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা সাহিত্যের পরিচিতির নতুন সম্ভাবনা

ডিজিটাল প্রকাশনা ও আন্তর্জাতিক বই বিপণনব্যবস্থার বিস্তারের ফলে বিভিন্ন দেশের লেখকদের পক্ষে নিজস্ব প্রকাশনা বাজারের বাইরে আন্তর্জাতিক পাঠকদের কাছে পৌঁছানো আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। রেজুয়ান আহম্মেদের বই নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির অনলাইন অনুসন্ধানব্যবস্থা, সুইজারল্যান্ডের Eldar.ch এবং আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পাঠ প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত থাকার বিষয়টি এই পরিবর্তনের একটি উদাহরণ।

একজন বাংলাদেশি লেখকের একাধিক ইংরেজি ভাষার গ্রন্থ ইউরোপের একটি বই বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের তালিকায় প্রথম তিনটি অবস্থানে থাকা উল্লেখযোগ্য বিষয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক গ্রন্থাগার ও বইয়ের ক্যাটালগে তাঁর সাহিত্যকর্মের উপস্থিতি বাংলাদেশের লেখকদের বৈশ্বিক পাঠপরিসরে পৌঁছানোর সম্ভাবনাকে আরও প্রসারিত করছে।

বাংলাদেশের সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক পাঠকদের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রকাশনা ও বিপণন কার্যক্রম ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত ভূমিকা রাখতে পারে।