img

সাহিত্যে বাংলাদেশের নতুন আন্তর্জাতিক পরিচয়: কথাসাহিত্যিক রেজুয়ান আহম্মেদ

প্রকাশিত :  ১৮:০৪, ১৭ আগষ্ট ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:৩৪, ১৭ আগষ্ট ২০২৬

সাহিত্যে বাংলাদেশের নতুন আন্তর্জাতিক পরিচয়: কথাসাহিত্যিক রেজুয়ান আহম্মেদ

✍️ ড. নাজমুল ইসলাম 

বাংলা সাহিত্যের আন্তর্জাতিক পরিচয় নিয়ে আলোচনা হলে আমরা সাধারণত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম কিংবা পরবর্তী সময়ের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ লেখকের নাম স্মরণ করি। কিন্তু বিশ্বসাহিত্যের পরিসর বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের লেখকদেরও আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তনের সময়ে কথাসাহিত্যিক রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যিক যাত্রা তাই আলাদাভাবে আলোচনার দাবি রাখে।

রেজুয়ান আহম্মেদের বিশেষত্ব শুধু তাঁর লেখার বিষয়বৈচিত্র্যে নয়, ভাষার ব্যবহারেও। বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই তাঁর লেখালেখি বিস্তৃত। প্রকাশিত বইয়ের হিসাব অনুযায়ী তাঁর বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে কয়েক ডজন বই রয়েছে। একটি দেশের লেখক যখন নিজের মাতৃভাষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক যোগাযোগের প্রধান ভাষায়ও নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করেন, তখন তাঁর সামনে পাঠকের পরিসর স্বাভাবিকভাবেই বড় হয়ে ওঠে।

এই জায়গাতেই রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যিক উদ্যোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁর লেখায় একদিকে বাংলাদেশের সমাজ, প্রান্তিক মানুষের জীবন ও মানুষের ব্যক্তিগত সংকট উঠে আসে, অন্যদিকে যুদ্ধ, অভিবাসন, প্রযুক্তি, ভবিষ্যৎ পৃথিবী এবং সমকালীন আন্তর্জাতিক বাস্তবতার মতো বিষয়ও স্থান পায়। ফলে তাঁর সাহিত্য শুধু একটি ভূখণ্ডের অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। স্থানীয় অভিজ্ঞতা থেকে বৈশ্বিক প্রশ্নের দিকে যাওয়ার একটি চেষ্টা সেখানে লক্ষ করা যায়।

আজকের বিশ্বে কোনো লেখকের আন্তর্জাতিক পরিচিতি শুধু একটি দেশের বইয়ের দোকানে তাঁর বই পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। ডিজিটাল প্রকাশনা, ই-বুক, অডিওবুক এবং বৈশ্বিক অনলাইন বই বিপণনের কারণে একজন লেখক একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারেন। রেজুয়ান আহম্মেদের বই আন্তর্জাতিক বই ও ডিজিটাল কনটেন্ট প্ল্যাটফর্মে উপস্থিত থাকার বিষয়টি এই নতুন বাস্তবতারই একটি উদাহরণ।

রকমারি ডটকমের মতো বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বই বিক্রয় প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি Amazon, Kobo, Apple Books, Barnes & Noble, Google Books, Booktopia, Fnac, Tolino, Everand, Hoopla, BorrowBox, OverDrive, Gardners এবং Bookshop.org-এর মতো আন্তর্জাতিক বই ও ডিজিটাল পাঠ প্ল্যাটফর্মে তাঁর বইয়ের উপস্থিতি তাঁর প্রকাশনা কার্যক্রমের বিস্তৃত পরিসরকে নির্দেশ করে। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, কোনো প্ল্যাটফর্মে বই তালিকাভুক্ত থাকা এবং ব্যাপক আন্তর্জাতিক পাঠকপ্রিয়তা বা বেস্টসেলার হওয়া এক বিষয় নয়। সাহিত্যিক সাফল্যের প্রকৃত মূল্যায়নে পাঠকসংখ্যা, বিক্রি, সমালোচনামূলক গ্রহণযোগ্যতা, অনুবাদ, পুরস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি পাঠকপ্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ।

তবু রেজুয়ান আহম্মেদের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি বিশেষভাবে আশাব্যঞ্জক, তা হলো তাঁর নিরন্তর লেখার চেষ্টা। একজন লেখকের আন্তর্জাতিক পরিচিতি এক দিনে তৈরি হয় না। একটি বই, একটি পাঠক, একটি নতুন ভাষা এবং একটি নতুন বাজার ধরে ধরে সেই পরিচয় তৈরি হয়। সেই অর্থে বহুভাষিক লেখালেখি ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনা পরিসরে প্রবেশের তাঁর উদ্যোগ বাংলাদেশের সাহিত্যকে বৃহত্তর পাঠকসমাজের সঙ্গে যুক্ত করার একটি সম্ভাবনাময় প্রচেষ্টা।

সাহিত্য সমালোচকের দৃষ্টিতে রেজুয়ান আহম্মেদের মূল্যায়ন করতে গেলে তাঁর বইয়ের সংখ্যা বা আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে উপস্থিতির বাইরেও যেতে হবে। দেখতে হবে তিনি কীভাবে চরিত্র নির্মাণ করেন, তাঁর ভাষা কতটা নিজস্ব, কাহিনির ভেতরে সময় ও সমাজকে কীভাবে ধারণ করেন এবং পাঠকের মনে তাঁর লেখা কতটা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব তৈরি করতে পারে। একজন লেখকের প্রকৃত পরিচয় শেষ পর্যন্ত তাঁর বইয়ের তালিকায় নয়, তাঁর সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্যে।

রেজুয়ান আহম্মেদের লেখার আরেকটি সম্ভাবনাময় দিক হলো প্রান্তিক মানুষের জীবনকে বৃহত্তর মানবিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়াস। সাহিত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী কাজগুলোর একটি হলো এমন মানুষের কথা বলা, যাদের কণ্ঠ সাধারণত সমাজের মূলধারায় অনুচ্চারিত থেকে যায়। সেই জায়গা থেকে প্রান্তিকতা, স্বপ্ন, যুদ্ধ, অভিবাসন, সামাজিক বৈষম্য কিংবা মানুষের অস্তিত্বের সংকট নিয়ে লেখালেখি শুধু দেশীয় বাস্তবতাকে তুলে ধরে না, আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছেও মানবিক সংযোগ তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে এমন লেখকদের প্রয়োজন, যারা একই সঙ্গে দেশকে ধারণ করবেন এবং বিশ্বের সঙ্গে কথোপকথন করবেন। রেজুয়ান আহম্মেদের লেখালেখির মধ্যে সেই আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ রয়েছে। বাংলা ভাষার শিকড়কে অক্ষুণ্ণ রেখে ইংরেজি ভাষায়ও সাহিত্য নির্মাণের চেষ্টা তাঁকে একটি বৃহত্তর পাঠকসমাজের সামনে নিজের কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গৌরব হয়ে ওঠার পথটি দীর্ঘ। সেখানে শুধু বই প্রকাশ করলেই হবে না, প্রয়োজন শক্তিশালী সাহিত্যমান, আন্তর্জাতিক সমালোচনা, অনুবাদ, সাহিত্য উৎসবে অংশগ্রহণ, গবেষণায় অন্তর্ভুক্তি এবং বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার পাঠকের কাছে ধারাবাহিকভাবে পৌঁছানো। রেজুয়ান আহম্মেদের সামনে তাই সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় দায়িত্বও রয়েছে।

একজন লেখকের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাঁর পাঠক। আর সেই পাঠক যদি দেশের সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, একটি দেশের সাহিত্যিক পরিচয়েরও বিস্তার। রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যিক যাত্রাকে সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই দেখা যেতে পারে।

বাংলাদেশের সাহিত্য আজ আর কেবল বাংলাদেশের পাঠকের জন্য লেখা হচ্ছে না। নতুন প্রজন্মের লেখকেরা ডিজিটাল প্রকাশনা ও আন্তর্জাতিক বইবাজারের মাধ্যমে বিশ্বের পাঠকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ পাচ্ছেন। এই পরিবর্তনের সময়ে রেজুয়ান আহম্মেদের বহুভাষিক সাহিত্যচর্চা এবং আন্তর্জাতিক প্রকাশনা পরিসরে প্রবেশ নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক।

সাহিত্যের ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সময়ই লেখে। আজকের পরিচিতি আগামী দিনের স্থায়ী স্বীকৃতিতে রূপ নেবে কি না, তার উত্তর ভবিষ্যৎ পাঠক ও সমালোচকের হাতে। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য যে নিরলস লেখালেখি, সাহসী বিষয় নির্বাচন এবং আন্তর্জাতিক পাঠকের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা প্রয়োজন, রেজুয়ান আহম্মেদের বর্তমান সাহিত্যিক কর্মকাণ্ডে তার একটি স্পষ্ট আকাঙ্ক্ষা দেখা যায়।

বাংলাদেশের সাহিত্যকে বিশ্বমঞ্চে আরও দৃশ্যমান করার এই প্রচেষ্টা তাই স্বাগত জানানোর মতো। কারণ একজন লেখক যখন দেশের সীমানা পেরিয়ে নিজের গল্প, নিজের সমাজ এবং নিজের সময়কে বিশ্বের পাঠকের সামনে তুলে ধরেন, তখন তাঁর যাত্রার সঙ্গে অদৃশ্যভাবে যুক্ত হয়ে যায় বাংলাদেশেরও একটি নতুন সাহিত্যিক পরিচয়।

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর

img

সাইদুর রহমান সাঈদের ‘আলোতে আঁধার ঢাকে’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন

প্রকাশিত :  ১৮:৩৪, ০৩ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ২০:৪০, ০৩ অক্টোবর ২০২৬

সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, কবি সাইদুর রহমান সাঈদের ‘আলোতে আঁধার ঢাকে’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। ৩ অক্টোবর সিলেটের স্টেশন রোডস্থ বাসিয়া প্রকাশনী অফিসে মোড়ক উম্মোচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

শারীরিক ভাবে অসুস্থ লেখক সাইদুর রহমান সাঈদের অনুপস্থিতি অনুষ্ঠিত প্রকাশনা অনুষ্ঠানটি আনন্দের চেয়ে বিষাদে রূপ নেয়। লেখকের ভক্তরা বই নিয়ে আলোচনার বদলে লেখককে নিয়েই স্মৃতিচারণ করতে থাকেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ গবেষক কবি এ কে শেরাম বলেন, আজকের অনুষ্ঠানটি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। কারণ, প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বই নিয়ে আলোচনা করা হয় কিন্তু আজকের অনুষ্ঠানে শুধু লেখককে নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। আজকের অনুষ্ঠানে হাততালির বদলে নীরব ও নিস্তব্ধ ছিলেন সকলেই। এত মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ফুটে উঠেছে। একজন মানুষ সফল না হলে সে ভালোবাসা পাওয়া যায় না। তিনি একজন সফল মানুষ, সফল লেখক। তিনি আরও বলেন, সাম্যবাদী চেতনা, নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের প্রতিবাদ এ গ্রন্থে দক্ষতার সাথে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন। তার প্রতিটি গ্রন্থই মানুষকে সাহস যোগায়, শক্তি দেয় সমাজ পরিবর্তনের।

আফলাতুন নেছা-পীর বকস ট্রাস্টের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ‘আলোতে আঁধার ঢাকে’। এবার থেকে ট্রাস্ট প্রতি বছর একটি করে বই প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে। সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশ, প্রসার ও সংরক্ষণের জন্য ট্রাস্টের এ মহতী উদ্যোগ বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়। বাসিয়া প্রকাশনী ও আফলাতুন নেছা-পীর বকস ট্রাস্টের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত মোড়ক উন্মোচনি অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ট্রাস্টের চেয়ারম্যান, পূর্ব স্টেশন রোডস্থ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি, কামালবাজার ইউনিয়নের বর্তমান মেম্বার মো. ছোয়াব আলী।

গীতিকবি হরিপদ চন্দের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষক কবি এ কে শেরাম, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভাস্কর সম্পাদক কবি পুলিন রায়, অধ্যাক্ষ নিয়াজ উদ্দিন, অধ্যাপিকা জান্নাত আরা খান পান্না, ছড়াকার অজিত রায় ভজন, কবি ও রাজনীতিবিদ দেওয়ান মতিউর রহমান খান, কবি সুমন বনিক, গোয়ালাবাজার গণপাঠাগারের সম্পাদক মো. আরজু মিয়া। অতিথি হিসেবে ইংল্যান্ড থেকে অনলাইনে সংযুক্ত হন আফলাতুন নেছা-পীর বকস ট্রাস্টের পাণ্ডুলিপি যাচাই বাচাই কমিটির সভাপতি প্রবীণ সাংবাদিক ও গবেষক মতিয়ার চৌধুরী।

শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাসিয়া প্রকাশনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা, বিশিষ্ট নাট্যকার ও লেখক বাবুল আহমদ। অন্যানের মধ্যে বক্তব্য রাখেন কবি মুনিরা সিরাজ চৌধুরী, কবি কামাল আহমদ, সাংবাদিক ও কবি মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম, দক্ষিণ সুরমা সাহিত্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এম আলী হোসাইন, সাংবাদিক জালাল জয়, কবি ও সাংবাদিক নুরুদ্দীন রাসেল, কবি বিজন চন্দ্র দাস বিজয়, সাংবাদিক এমরান ফয়সল, আফলাতুন নেছা-পীর বকস ট্রাস্টের কোষাধ্যক্ষ লেখক রহমত আলী খোকন ও নাফিস ইকবাল। -সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর