img

আরেকবার

প্রকাশিত :  ০৬:৫১, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রেজুয়ান আহম্মেদ                        

পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষের মুখ বদলেছে, সভ্যতা বদলেছে, সাম্রাজ্য উঠেছে আর ধ্বংস হয়েছে, নদীর গতিপথ পাল্টেছে, শহরের নাম বদলেছে, মানুষের বিশ্বাসও বহুবার জন্ম নিয়ে আবার মিলিয়ে গেছে। তবু মানুষের ভেতরে একটি প্রাচীন সত্য আজও অমলিন হয়ে আছে। মানুষ বাঁচতে চায়।

এই ইচ্ছার কোনো একক ভাষা নেই।

ধনী মানুষ যখন নিজের বিশাল ঘরের জানালা খুলে ভোরের আলো দেখে, তার চোখে যে জীবনের আকাঙ্ক্ষা ফুটে ওঠে, ফুটপাতে রাত কাটানো মানুষের চোখেও তার একটি ভিন্ন রূপ থাকে। সফল মানুষ আগামী দিনের নতুন পরিকল্পনা করে, ব্যর্থ মানুষও পরদিনের জন্য কোনো না কোনো অজুহাত খুঁজে নেয়। বৃদ্ধ মানুষ ফিরে তাকান অতীতের দিকে, শিশু তাকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের পানে। সময়ের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এই দুজনকে জুড়ে দেয় একটি অদৃশ্য সেতু। সেই সেতুর নাম জীবন।

মৃত্যু সম্পর্কে মানুষ জানে। জন্মের মুহূর্ত থেকেই তার যাত্রা শুরু হয় মৃত্যুর দিকে। এই সত্য এত পুরোনো যে পৃথিবীর কোনো ধর্ম, কোনো দর্শন কিংবা কোনো বিজ্ঞান তা অস্বীকার করতে পারেনি। তবু মানুষ প্রতিদিন এমনভাবে বাঁচে, যেন সামনে আরও একটি সকাল অপেক্ষা করছে। সম্ভবত এটাই মানুষের সবচেয়ে গভীর রহস্য।

সে জানে শেষ আছে, তবু শুরু করে।

সে জানে বিদায় আসবে, তবু ভালোবাসে।

সে জানে সবকিছু একদিন হারিয়ে যাবে, তবু ঘর বাঁধে।

সে জানে শরীর একদিন মাটিতে মিশে যাবে, তবু ভবিষ্যতের জন্য বীজ বোনে।

এই আপাত বিরোধের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানুষের অস্তিত্বের গভীরতম কবিতা।

জীবন কখনো মানুষের হাতে পুরোপুরি থাকে না। সে নিজের জন্ম বেছে নেয় না, মৃত্যুর দিনও জানে না। কার সঙ্গে তার দেখা হবে, কে তাকে ভালোবাসবে, কে ছেড়ে যাবে, কোন স্বপ্ন পূর্ণ হবে আর কোনটি অসমাপ্ত থেকে যাবে, কিছুই সে জানে না। তবু সে হাঁটে।

কেন?

হয়তো এই কারণে যে, মানুষ নিশ্চিততার চেয়ে সম্ভাবনাকে বেশি ভালোবাসে। একটি সম্ভাবনা, যত ক্ষীণই হোক না কেন, মানুষের কাছে কখনো কখনো গোটা একটা পৃথিবীর সমান হয়ে ওঠে।

ক্ষুধার্ত মানুষ যখন খাবারের অপেক্ষা করে, তখন সে শুধু খাদ্যের জন্য অপেক্ষা করে না; অপেক্ষা করে পরের মুহূর্তটির জন্য। অসুস্থ মানুষ যখন বিছানায় শুয়ে সুস্থ হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তখন সে কেবল সুস্থ শরীর চায় না; সে ফিরে যেতে চায় তার চেনা পৃথিবীতে। ব্যর্থ মানুষ যখন আবার চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সে জানে না পরের চেষ্টা সফল হবে কি না, তবু চেষ্টা করে।

কারণ ভেতরে একটি কণ্ঠ থাকে, যে যুক্তির ভাষায় কথা বলে না।

সে শুধু বলে, আরেকবার।

আরেকটি সকাল।

আরেকটি চেষ্টা।

আরেকটু অপেক্ষা।

এই \"আরেকবার\" শব্দটির মধ্যেই বোধহয় লেখা আছে মানবসভ্যতার দীর্ঘতম ইতিহাস।

কত যুদ্ধের পর মানুষ আবার ঘর তুলেছে। কত দুর্ভিক্ষের পর আবার জমিতে বীজ ফেলেছে। কত মহামারির পর শহরগুলো আবার আলোয় ভরে উঠেছে। কত ব্যক্তিগত শোকের পর একজন মানুষ আবার সন্তানের হাত ধরেছে। পৃথিবী বারবার তাকে ভেঙেছে, আর সে বারবার নিজের ভাঙা টুকরো দিয়েই গড়ে তুলেছে নতুন কোনো অর্থ।

এই ক্ষমতাকে হয়তো পুনর্জন্ম বলা চলে না, কারণ মানুষ একই রূপে ফিরে আসে না। সে বদলে যায়। কিছু পুরোনো তার ভেতরে থেকে যায়, কিছু নতুন জন্ম নেয়। কিছু ক্ষত শুকিয়ে যায়, কিছু থেকে যায় চিরকাল। কিছু স্মৃতি তাকে অনুসরণ করে, কিছু স্মৃতি থেকে সে মুক্তি পায়। কিন্তু তার যাত্রা কখনো থামে না।

সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার আগে জীবন তাকে বহুবার ভেঙে দেয়।

সম্ভবত ভাঙনও শেখার একটি ভাষা।

গতকাল আমরা যে মানুষ ছিলাম, আজ আর ঠিক সেই মানুষ নেই। একটি মৃত্যু বদলে দেয় আমাদের। একটি প্রেম বদলে দেয়। একটি প্রত্যাখ্যান বদলে দেয়। একটি অপমান, একটি ব্যর্থতা, একটি দীর্ঘ নির্ঘুম রাত, একজন অনুপস্থিত মানুষ, এমনকি একটি অপ্রত্যাশিত ক্ষমাও মানুষকে অন্যরকম করে তুলতে পারে।

মানুষের চরিত্র আসলে কেবল তার অর্জনের ইতিহাস নয়। তার সহ্য করার ইতিহাসও বটে।

কত রাত সে নিঃশব্দে পার করেছে, কেউ জানে না।

কতবার নিজের চোখের জল নিজেই মুছে আবার সবার সামনে দাঁড়িয়েছে, তার হিসাব নেই।

কতবার মনে হয়েছে আর পারবে না, অথচ পরদিন সকালে আবার উঠে দাঁড়িয়েছে, সে খবর কোথাও ছাপা হয়নি।

কিন্তু মানুষের জীবনের সবচেয়ে জরুরি সংবাদগুলো প্রায় কখনোই সংবাদপত্রে জায়গা পায় না।

একজন মানুষ রাতে একা কাঁদে, আর সকালে স্বাভাবিক মুখে কাজে যায়, এটাও একটা সংবাদ।

একজন মা নিজের ভয় লুকিয়ে সন্তানের সামনে হাসেন, এটাও একটা সংবাদ।

একজন বৃদ্ধ বহু কিছু হারানোর পরও সকালে জানালা খুলে আকাশ দেখেন, এটাও একটা সংবাদ।

একজন ব্যর্থ মানুষ নিজের সব পরাজয় সঙ্গে নিয়ে আরেকটি আবেদনপত্র লেখেন, এটাও একটা সংবাদ।

মানুষের আসল বীরত্ব প্রায়ই মঞ্চে ঘটে না।

তা ঘটে নিঃশব্দ ঘরে।

নিভু নিভু আলোয়।

একলা বিছানায়।

এমন এক সকালে, যখন কেউ জানে না গত রাতটা পার করতে তাকে কতটা শক্তি ব্যয় করতে হয়েছে।

এই কারণেই মানুষের ভেতরের অন্ধকারকে অবহেলা করা যায় না।

প্রত্যেকের জীবনে এমন কিছু দরজা থাকে, যার সামনে সে একা দাঁড়ায়। সেখানে অন্য কেউ পুরোপুরি ঢুকতে পারে না। কিছু বেদনা ভাষায় ধরা যায় না। কিছু বিচ্ছেদ ব্যাখ্যাতীত থেকে যায়। কিছু অপমানের কোনো প্রতিকার নেই। কিছু প্রশ্নের কোনো জবাব আসে না।

তখন মানুষ মুখোমুখি হয় নিজের ভেতরের নীরবতার।

সেই নীরবতা কখনো কখনো ভয়ংকর হয়ে ওঠে। মনে হয়, পৃথিবী যেন হঠাৎ তার সব শব্দ হারিয়ে ফেলেছে। চেনা মানুষগুলো দূরে সরে গেছে। ভবিষ্যৎ দাঁড়িয়ে আছে একটা বন্ধ দেয়ালের মতো। অতীত ফিরে আসতে চায়, বর্তমান সহ্য হয় না, আর ভবিষ্যৎ কল্পনা করাই কঠিন মনে হয়।

কিন্তু মানুষের অনুভূতি অনেক সময় বাস্তবের চেয়ে অনেক দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়।

যে মুহূর্তে মনে হয় সব শেষ, সেই মুহূর্তটি আসলে একটি মুহূর্তই। জীবন নয়।

দুঃখের সময় এই পার্থক্যটুকু আমরা ভুলে যাই।

একটি রাত কখনো গোটা জীবন নয়। একটি ব্যর্থতা সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। একটি বিচ্ছেদ সমগ্র পৃথিবী নয়। একজন মানুষের প্রত্যাখ্যান আমাদের অস্তিত্বের চূড়ান্ত রায় নয়।

সময়ের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। সে কোনো অনুমতির অপেক্ষা না করেই বদল নিয়ে আসে।

আজ যে দুঃখ অসহনীয় মনে হয়, সময় তা মুছে দেবেই এমন নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু সময় তাকে অন্যভাবে দেখতে শেখাতে পারে। আজ যে ক্ষত রক্তাক্ত, একদিন হয়তো তার ওপর জমবে স্মৃতির পাতলা এক আস্তরণ। স্পর্শ করলে তখনও ব্যথা লাগবে, কিন্তু সেই ব্যথা আর আগের মতো জীবনকে দখল করে রাখবে না।

তাই মানুষের আরোগ্য মানে বিস্মৃতি নয়।

আরোগ্য মানে কখনো কখনো ব্যথাকে সঙ্গী করেই হাঁটতে শেখা।

যে মানুষটি একদিন ভেঙে পড়েছিল, সে হয়তো পরে বুঝতে পারে, নিজের অচেনা একটা শক্তিই তাকে সেদিন ধরে রেখেছিল।

আমরা নিজেদের শক্তি নিয়ে প্রায়ই ভুল ধারণা পুষে রাখি। সুখের দিনে মানুষ নিজের শক্তি সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানে না। শক্তির আসল পরিচয় মেলে বিপদের দিনে, যখন চেনা আশ্রয়গুলো একে একে সরে যেতে থাকে, আর মানুষ নিজের ভেতরে এমন কিছুর দেখা পায় যা আগে কখনো দেখেনি।

অনেকটা বীজের মতো।

বীজের ভেতরে যে গাছটি লুকিয়ে থাকে, বাইরে থেকে তা দেখা যায় না। মাটির নিচে অন্ধকার। সেখানে আকাশ নেই, আলো নেই। তবু বীজ একদিন ভেঙে যায়, আর সেই ভাঙনই তার জন্মের শুরু।

মানুষের কিছু ভাঙনও তেমনই।

সব ভাঙন ধ্বংসের নয়।

কিছু ভাঙন জন্মেরও।

কিছু পরাজয় খুলে দেয় নতুন পরিচয়ের দরজা। কিছু বিচ্ছেদ মানুষকে ফিরিয়ে আনে নিজের কাছে। কিছু একাকিত্ব শেখায়, অন্যের ভালোবাসা পাওয়ার আগে নিজের অস্তিত্বকে নিজেরই স্বীকার করে নিতে হয়।

জীবন তাই শুধু আমাদের যা দিয়েছে তার গল্প নয়। জীবন যা কেড়ে নিয়ে আমাদের নতুন করে দেখতে শিখিয়েছে, সেটাও তার গল্পের অংশ।

এই পৃথিবীতে কেউ সম্পূর্ণভাবে জয়ী নয়। সাফল্যের চূড়ায় দাঁড়িয়েও মানুষ ভয় পায়। প্রাচুর্যের মধ্যেও একা হয়ে যায়। খ্যাতির ভিড়ে একটা হৃদয় নিঃসঙ্গ থেকে যেতে পারে। আবার নিঃস্ব মানুষের ঘরেও এমন হাসি দেখা যায়, যার তুলনা পৃথিবীর কোনো প্রাসাদেও মেলে না।

তাই জীবনের মূল্য মাপার জন্য বাইরের কোনো মাপকাঠি যথেষ্ট নয়।

একজন মানুষের ব্যাংক হিসাব তার স্বপ্নের গভীরতা জানে না।

তার পদবি জানে না তার চোখের জলের ইতিহাস।

তার পোশাক জানে না তার একাকিত্ব।

তার সামাজিক পরিচয় জানে না তার ভেতরের যুদ্ধ।

মানুষকে সত্যিকারের বোঝার জন্য তার নীরবতার কাছে যেতে হয়। আর সেই নীরবতার কাছে গেলে টের পাওয়া যায়, প্রত্যেকেই আসলে কোনো না কোনোভাবে বেঁচে থাকার জন্য লড়ছে।

কেউ অর্থের জন্য।

কেউ সম্মানের জন্য।

কেউ পরিবারের জন্য।

কেউ একটা অসমাপ্ত স্বপ্নের জন্য।

কেউ শুধু আগামীকাল পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য।

এই শেষ মানুষটির লড়াইও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং কখনো কখনো এটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় লড়াই।

কারণ বেঁচে থাকা সবসময় আনন্দের সিদ্ধান্ত নয়। কখনো তা সাহসের সিদ্ধান্ত, কখনো ধৈর্যের। কখনো তা কেবল এই বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে যে, আজকের অনুভূতিই জীবনের শেষ কথা নয়।

মানুষের ভেতরের আলো তাই সূর্যের মতো নিশ্চিত নয়। সূর্য ডুবলে আমরা জানি সে আবার উঠবে, কিন্তু মানুষের আলো সম্পর্কে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাকে কখনো নিজের হাতেই রক্ষা করতে হয়। কখনো অন্যের ভালোবাসা দিয়ে জ্বালিয়ে রাখতে হয়। কখনো একটা বই, একটা গান, একটা স্মৃতি, একটা প্রার্থনা, একটা বন্ধুত্ব, একটা শিশুর মুখ, একটা স্বপ্ন কিংবা কোনো অদৃশ্য বিশ্বাসই সেই আলোকে বাঁচিয়ে রাখে।

এই আলো হতে পারে বড় ক্ষীণ। কিন্তু ক্ষীণ আলোও অন্ধকারের বিরুদ্ধে একটা ঘোষণা।

তাই হয়তো মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার আশা নয়, বরং আশার দিকে বারবার ফিরে যাওয়ার ক্ষমতা। আশা সবসময় আনন্দময় নয়। কখনো সে ভীষণ ক্লান্ত। ধীরে হাঁটে। জানে না কোথায় গিয়ে থামবে। তবু হাঁটে।

এই হাঁটার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক গভীর নৈতিক সৌন্দর্য।

কারণ মানুষ যখন কেবল নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্যও বাঁচতে শেখে, তখন তার জীবন ব্যক্তিগত গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। বাবা বাঁচেন সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য। মা সন্তানের মুখ দেখে ভুলে যান নিজের ক্লান্তি। শিক্ষক গড়ে তোলেন অচেনা এক ছাত্রের আগামী দিন। লেখক লেখেন এমন এক পাঠকের জন্য, যার সঙ্গে তার হয়তো কোনোদিন দেখাই হবে না।

তখন মানুষ নিজের জীবনের সীমানা ছাড়িয়ে হয়ে ওঠে আরও বড় এক জীবনের অংশ।

সম্ভবত এটাই সভ্যতার আসল রহস্য।

আমরা প্রত্যেকেই একদিন চলে যাব, কিন্তু আমাদের কিছু কাজ থেকে যাবে অন্যের জীবনে। একটা ভালো কথা। একটা শিক্ষা। একটা বই। একটা গান। একটা ভালোবাসা। একটা ক্ষমা। একটুখানি সাহস। একটা হাত, যা কোনো অন্ধকার মুহূর্তে ধরে রেখেছিল আরেকজনের হাত।

এই সামান্য জিনিসগুলোই বোধহয় মানুষের অস্তিত্বকে মৃত্যুর পরও কিছুটা প্রলম্বিত করে।

কারণ মানুষ কেবল শরীর নিয়ে পৃথিবীতে থাকে না। সে থাকে স্মৃতির ভেতর। থাকে অন্য কারও বদলে যাওয়া জীবনে। থাকে অচেনা কোনো ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তে।

আমরা হয়তো কখনো জানবই না, আমাদের একটা ছোট্ট কাজ কারও জীবনে কতটা বড় অর্থ বয়ে এনেছিল। একটা বাক্য হয়তো কোনো তরুণকে ফিরিয়ে দিয়েছিল তার স্বপ্নের কাছে। একটা ক্ষমা হয়তো বাঁচিয়ে দিয়েছিল একটা সম্পর্ক। একটা বিশ্বাস হয়তো কাউকে শিখিয়েছিল নিজের ওপর আবার আস্থা রাখতে।

এই অদৃশ্য প্রভাবগুলোই মানুষের জীবনের সবচেয়ে গভীর উত্তরাধিকার।

তাই বেঁচে থাকা মানে কেবল নিজের গল্প চালিয়ে যাওয়া নয়। কখনো কখনো অন্যের গল্পে একটা অর্থবহ বাক্য হয়ে ওঠাও বেঁচে থাকা।

জীবনের চূড়ান্ত অর্থ হয়তো কেউই জানে না। দর্শন শত শতাব্দী ধরে সেই উত্তর খুঁজে চলেছে। ধর্ম দিয়েছে তার নিজস্ব ভাষায় উত্তর। বিজ্ঞান উন্মোচন করেছে জগতের বস্তুগত রহস্য। সাহিত্য তাকিয়েছে মানুষের অন্তরের গহনে। তবু মানুষ আজও প্রশ্ন করে, আমি কেন এখানে?

সম্ভবত এই প্রশ্নের একটিমাত্র উত্তর নেই।

হয়তো জীবন নিজেই তৈরি করে নেয় তার উত্তর।

একটা শিশু জন্ম নেয়, আর তার সঙ্গে জন্ম নেয় একটা নতুন অর্থ। কেউ ভালোবাসে, আর সেই ভালোবাসার ভেতরেই জেগে ওঠে নতুন অর্থ। কেউ সৃষ্টি করে, আর সৃষ্টির মধ্যে রেখে যায় নিজের অস্তিত্বের একটা অংশ। কেউ অন্যের দুঃখ লাঘব করে, আর সেই মুহূর্তে পৃথিবী একটুখানি ভালো হয়ে ওঠে।

হয়তো জীবনের অর্থ কোনো দূরের সত্য নয়।

হয়তো অর্থ তৈরি করে নিতে হয়। প্রতিদিন। ছোট ছোট কাজে। ছোট ছোট সিদ্ধান্তে।

মানুষ যখন বলে, \"আমি এখনও চেষ্টা করব\", তখন সে কেবল নিজের জীবনকে নয়, সম্ভাবনাকেও একটা সুযোগ দেয়।

এই কারণেই বেঁচে থাকা আসলে একটা দার্শনিক অবস্থান।

এটা বলা যে, পৃথিবী অসম্পূর্ণ, তবু আমি তার অংশ হতে চাই। এটা বলা যে, আমি সব উত্তর জানি না, তবু প্রশ্ন করা থামাব না। এটা বলা যে, আমি সবকিছু হারাতে পারি, তবু ভালোবাসার সামর্থ্যটুকু পুরোপুরি নষ্ট হতে দেব না। এটা বলা যে, আমার গল্পে অন্ধকার আছে, কিন্তু অন্ধকারই আমার শেষ পরিচয় নয়।

শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই এগিয়ে চলেছি একই নদীর দিকে। কারও নৌকা বড়, কারও ছোট। কারও যাত্রা শান্ত, কারও পথ ঝড়ে ঢাকা। কেউ তীরে পৌঁছানোর আগেই অনেকটা পথ পাড়ি দেয়, কেউ থেমে যায় অল্প পথেই। কিন্তু নদী সবার জন্যই বহন করে একই সত্য।

সময় থামে না।

তাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটা এই নয় যে, কতদূর গিয়েছি। বরং প্রশ্নটা হলো, এই মুহূর্তে কীভাবে হাঁটছি।

আমি কি এখনও মানুষের দিকে তাকিয়ে মমতা অনুভব করতে পারি? আমি কি এখনও নতুন কোনো সকালকে স্বাগত জানাতে পারি? আমি কি এখনও একটা অসম্ভব স্বপ্নের জন্য একটুখানি জায়গা রেখে দিয়েছি? আমি কি এখনও নিজের ভেতরের আলোটুকু আগলে রাখতে পারি?

উত্তরটা যদি সামান্যও হ্যাঁ হয়, তাহলে গল্প এখনও শেষ হয়নি।

কারণ মানুষের গল্প কখনো শুধু তার সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় দিয়েই লেখা হয় না। একটা বইয়ের মাঝখানে কয়েকটা কালো পাতা থাকতেই পারে, তাতে বইটা শেষ হয়ে যায় না। পরের পাতাটা তখনও সাদা থাকতে পারে। সেখানে কী লেখা হবে, তা এখনও অজানা।

এই অজানাই জীবনকে সহনীয় করে তোলে।

এই অজানাই জীবনকে সুন্দর করে।

এই অজানাই মানুষকে আবার হাঁটিয়ে নিয়ে যায় ভোরের দিকে।

তাই পৃথিবী যখন অসহনীয় মনে হয়, তখন হয়তো গোটা পৃথিবীটাকে একসঙ্গে বাঁচানোর দরকার নেই। কখনো শুধু পরের মুহূর্তটুকু পার হওয়াই যথেষ্ট। তারপর পরের সকাল। তারপর আরেকটা দিন।

জীবন সবসময় বড় কোনো লাফ চায় না। কখনো তার দরকার শুধু একটা ছোট্ট পদক্ষেপ। একটা দরজা খোলা। একটা ফোন করা। কারও কাছে ফিরে যাওয়া। কারও বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা ধরা। থেমে থাকা কোনো কাজ আবার শুরু করা। অথবা নিঃশব্দে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা, যতক্ষণ না আকাশের রং বদলায়।

কারণ আকাশ বদলায়। সময় বদলায়। মানুষ বদলায়। দুঃখের চেহারাও বদলে যায় সময়ের সঙ্গে।

আর সবচেয়ে জরুরি কথা, মানুষ নিজেকেও বদলাতে পারে।

হয়তো এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল। আজ আমরা যেমন, আগামীকাল ঠিক তেমনই থাকতে বাধ্য নই। নতুন করে শেখা যায়। নতুন করে ভালোবাসা যায়। নতুন করে বিশ্বাস করা যায়। নতুন করে শুরু করা যায়।

জীবনের প্রতি আস্থা রাখার অর্থ এই নয় যে জীবন আমাদের প্রতি দয়ালু হবে। এর অর্থ বরং এই যে, জীবন কঠিন হলেও তার ভেতরে অর্থ গড়ে তোলার ক্ষমতা আমাদের এখনো আছে।

অন্ধকার থাকবে, কিন্তু আলোও থাকবে। ক্ষতি থাকবে, কিন্তু প্রাপ্তিও থাকবে। বিদায় থাকবে, কিন্তু কোনো কোনো বিদায়ের পরে নতুন আগমনও অপেক্ষা করে থাকে। কান্না থাকবে, কিন্তু কোনো এক অপ্রত্যাশিত সকালে হাসিও ফিরে আসতে পারে।

আর যতক্ষণ এই \"পারে\" শব্দটা মানুষের ভাষায় বেঁচে আছে, ততক্ষণ মানুষ পুরোপুরি পরাজিত নয়।

কারণ সম্ভাবনা কখনো জোরে গলায় কথা বলে না। সে শুধু অপেক্ষা করে। একটা দরজার ওপারে। একটা ভোরের ঠিক আগে। একটা অন্ধকার ঘরের জানালায়। কোনো ক্লান্ত হৃদয়ের গহিনে, যেখানে সব যুক্তি ফুরিয়ে যাওয়ার পরও একটা ক্ষীণ বিশ্বাস টিকে থাকে।

আমি এখনও আছি।

আমি এখনও অনুভব করি।

আমি এখনও স্বপ্ন দেখতে পারি।

আমি এখনও ভালোবাসতে পারি।

আমি এখনও আগামীকালকে ফিরিয়ে দিইনি।

আর হয়তো মানুষের গোটা ইতিহাসকে যদি এক বাক্যে লিখতে হয়, তাহলে এটুকুই যথেষ্ট।

সে পড়ে গেছে, কিন্তু উঠে দাঁড়িয়েছে। সে কেঁদেছে, কিন্তু আবার হেসেছে। সে হারিয়েছে, কিন্তু আবার খুঁজেছে। সে ভেঙেছে, কিন্তু নিজেকে আবার গড়ে তুলেছে। সে মৃত্যুকে চিনেছে, তবু মুখ ফিরিয়েছে জীবনের দিকেই।

কারণ মানুষের গভীরে শেষ পর্যন্ত একটা আলো টিকে থাকে।

সেই আলো কখনো সূর্যের মতো উজ্জ্বল নয়, কখনো একটা তারার মতোই ক্ষীণ, কখনো প্রায় অদৃশ্য। তবু সে থাকে।

আর যতক্ষণ সেই আলো টিকে থাকে, ততক্ষণ কোনো রাতই সম্পূর্ণ রাত নয়। ততক্ষণ কোনো গল্পই একেবারে শেষ নয়। ততক্ষণ মানুষের সামনে একটা সকাল অপেক্ষা করে থাকে, হয়তো অনেক দূরে, হয়তো একদম কাছেই।

কিন্তু কোথাও না কোথাও, অন্ধকারের ওপারে, একটা আলো জ্বলছেই।

আর সেই আলোর দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়ার নামই বোধহয় জীবন।

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর

img

পিতৃত্বের সম্বল

প্রকাশিত :  ২০:২৪, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ২০:৩৮, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রেজুয়ান আহম্মেদ

সিদ্ধেশ্বরীর ১৮৭/এ নম্বর বাড়ির তিনতলার ডি-থ্রি ফ্ল্যাটে বিকেল নামলে ঘরটা কেমন ঝিমিয়ে যায়। জানালার ভাঙা কাচ গলে ঢোকা হিমেল বাতাস বারান্দার পুরনো পর্দায় শহরের ধুলো জমায়। কোথাও প্রদীপ জ্বলে না। ঘরের কোণে কাঠমিস্ত্রির হাতে গড়া একখানা শালকাঠের টেবিল, তার ওপর গোছানো কয়েকটা হলদেটে কাগজ আর একটা ঝরনা কলম। সেই টেবিল-লাগোয়া কাঠের চেয়ারে চুপচাপ বসে আছেন ইয়াছির আহমেদ।

কোলঘেঁষে ঘুমিয়ে আছে তিন বছরের রুদ্র। ছেলেটার চোখের পাতা ঘন, কপাল তুলতুলে, দেখলে মনে হয় যেন কোনো রূপকথার রাজ্য থেকে নেমে এসেছে। তবু সেই মুখেও এখন ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। চব্বিশ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, পেটে এক ফোঁটা দুধ বা শক্ত খাবার পড়েনি। ইয়াছির ছেলের কপালে হাত রাখলেন, দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চোখের কোণে জমে থাকা জলটা দাড়ি বেয়ে গড়ানোর আগেই মুছে নিলেন।

পাশের ঘর থেকে ভেসে আসছে মায়ের ক্ষীণ কাশি। বৃদ্ধা মা কয়েক মাস ধরে শয্যাশায়ী; ফুসফুসের যন্ত্রণা তাঁকে দিনে দিনে খেয়ে ফেলছে। টেবিলে পড়ে থাকা প্রেসক্রিপশনের স্তূপ আর খালি ওষুধের পাতাগুলোই এই ঘরের একমাত্র নীরব সাক্ষী। ইয়াছির ড্রয়ারটা টেনে খুললেন। ভেতরে একটা ফাঁকা কৌটো আর তিনটে পুরনো চার আনার মুদ্রা ছাড়া কিছু নেই। অভাব যখন দরজায় এসে দাঁড়ায়, একজন লেখকের সমস্ত শব্দ মুহূর্তে অর্থহীন হয়ে যায়।

এই ফ্ল্যাটটা শুধু ইট-কাঠের কাঠামো নয়। প্রতিটা ইটের খাঁজে জড়িয়ে আছে একটা পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই। ইয়াছিরের পূর্বপুরুষের ভিটে ছিল পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনায়। দেশভাগের করুণ সময়ে শেকড় উপড়ে তাঁরা ঢাকায় চলে আসেন, সঙ্গে ছিল শুধু কিছু পিতলের থালাবাসন আর জীর্ণ কয়েকটা পাণ্ডুলিপি।

ঢাকায় নতুন করে জীবন শুরু হলেও শান্তি টেকেনি বেশি দিন। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হলে ইয়াছিরের বাবা ঘরে বসে থাকতে পারেননি। অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে নয় মাসের যুদ্ধে শহীদ হন। বাবার এই আত্মত্যাগের কথা ইয়াছির নিজে কখনো শোনেননি; শুনেছেন মায়ের মুখে, গল্পের মতো করে।

বাবা শহীদ হওয়ার পর মা একা হয়ে যান। কোলে শিশু ইয়াছির, সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তবু তিনি ভেঙে পড়েননি; দুঃখটাকে শক্তি বানিয়ে স্বাধীন দেশে নতুন করে দাঁড়ালেন এবং সিদ্ধেশ্বরী এলাকার শিক্ষাবিস্তারে জীবন উৎসর্গ করলেন।

মা চাকরি নিলেন সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে। ১৯৩৩ সালের ১ জানুয়ারি শ্রী বিভূতিভূষণ আহির ও তাঁর স্ত্রীর উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই বিদ্যালয় ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তান পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ পর্যন্ত বারবার রূপ বদলাতে দেখেছে। সেখানে কয়েক দশক ধরে বাংলা পড়িয়েছেন মা, সুনামের সঙ্গে, নিষ্ঠার সঙ্গে।

ছাত্রীদের তিনি শুধু ব্যাকরণ বা রবীন্দ্রনাথের কবিতা শেখাতেন না, শেখাতেন আত্মমর্যাদা আর দেশপ্রেম। মাসের পর মাস পরিশ্রম করে, নিজের সব শখ বিসর্জন দিয়ে জমিয়েছিলেন বাইশ লক্ষ টাকা। সেই টাকাতেই কেনা হয় সিদ্ধেশ্বরীর এই বারোশো বর্গফুটের ডি-থ্রি ফ্ল্যাট।

মা প্রায়ই বলতেন, "ইয়াছির, এই ঘর কোনো সাধারণ বাড়ি না। তোর বাবার রক্তের সম্মান আর আমার সারাজীবনের রোজগার এই চার দেয়ালের মধ্যে জমা আছে। এখানে বসে তুই সত্যি লিখবি, কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়াবি না।" কথাগুলো ইয়াছিরের মনে গভীর দাগ কেটেছিল। বাবার আদর্শ আর মায়ের সততা বুকে নিয়েই তিনি বড় হয়ে উঠেছেন।

ইয়াছিরের পড়াশোনা শুরু হয় গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলে। ছোটবেলা থেকেই শান্ত স্বভাবের, বইয়ের পোকা। বন্ধুরা মাঠে ফুটবল নিয়ে ব্যস্ত থাকত, আর ইয়াছির তখন লাইব্রেরির এক কোণে ডুবে থাকতেন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্রে।

মাধ্যমিক পাশ করে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। করিডোর, পুরনো লাইব্রেরি, বটতলার ছায়া, সব মিলিয়ে তাঁর মন আরও গভীরভাবে সাহিত্যের দিকে ঝুঁকে যায়। সাহিত্যকে তিনি কখনো নিছক বিনোদন মনে করেননি; মনে করতেন সমাজের আয়না।

উচ্চ মাধ্যমিক শেষে গন্তব্য হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৯২-৯৩ সেশনে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। সেই সময়ের বিভাগ ভরপুর ছিল প্রজ্ঞাবান শিক্ষকে; ভাষা, সাহিত্য ও রূপতত্ত্বের গভীর পাঠ নিয়েছেন সেখান থেকেই। অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম, মাস্টার্সেও সেরা ফল, নিজের প্রতিভার প্রমাণ রেখেছিলেন তিনি বারবার।

বিশ্ববিদ্যালয় শেষে চাকরির পথে হাঁটেননি। মন পড়ে ছিল কেবল লেখায়। পূর্ণকালীন লেখক হওয়ার কঠিন পথ বেছে নিলেন, নির্জন ঘরে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কলম চালিয়ে একের পর এক উপন্যাস লিখে গেলেন।

তাঁর লেখার শক্তি ছিল গভীর আবেগ, জীবনের কাঁচা সত্য, আর মনস্তত্ত্বের নিখুঁত রূপায়ণ। অল্প দিনেই নাম ছড়িয়ে পড়ল পাঠকমহলে। একুশে বইমেলায় তাঁর বই এলেই প্রকাশকের ব্যানারে নাম উঠত, পাঠকের দীর্ঘ লাইন পড়ত। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকত একটা অটোগ্রাফের আশায়।

এত খ্যাতির মধ্যেও ইয়াছির থেকে গেছেন একরকম আড়ালের মানুষ। প্রচার তাঁর পছন্দ ছিল না কখনোই। টকশোতে যাননি, পত্রিকা বা রেডিওতে সাক্ষাৎকার দেননি। বিশ্বাস করতেন, লেখকের আসল পরিচয় বইয়ের পাতায়; মুখ দেখানোর দরকার নেই। আড়ালে থেকেই তিনি জাতিকে উপহার দিয়ে গেছেন ধ্রুপদী সাহিত্য।

তাঁর জীবন ছিল পরিমিত ও সুশৃঙ্খল। রয়্যালটির টাকায় তিনজনের সংসার ভালোই চলছিল। মায়ের অবসরজীবন, ইয়াছিরের বইয়ের জগৎ, ছোট্ট ফ্ল্যাট, সব মিলিয়ে জীবনটা ছিল শান্ত এক দিঘির মতো।

এরই মাঝে এলেন সুচরিতা। শান্ত, অমায়িক স্বভাবের এই মেয়েটি ইয়াছিরের নির্জন মনটাকে ভালোই বুঝতেন। মায়ের সম্মতিতেই বিয়ে হলো। সুচরিতা ঘরে পা রাখার পর ফ্ল্যাটটা যেন নতুন প্রাণ পেল; প্রতিটা কোণে ফুটে উঠল এক স্নিগ্ধ পরিপাটি ছাপ।

লেখার টেবিলে চা পৌঁছে দেওয়া, মায়ের ওষুধের খেয়াল রাখা, প্রতিটা পাণ্ডুলিপির প্রথম পাঠিকা হওয়া, এভাবেই সুচরিতা এই সংসারের প্রাণভোমরা হয়ে উঠলেন। ইয়াছির ভাবতেন, জীবনের সব শূন্যতা বুঝি সৃষ্টিকর্তা একসঙ্গে ভরে দিয়েছেন। কিন্তু ভাগ্য যা লিখে রাখে, তা মানুষের ভাবনার চেয়ে ঢের বেশি নিষ্ঠুর।

তিন বছর আগের এক শীতের রাত। সুচরিতা তখন পূর্ণগর্ভা। মাঝরাতে হঠাৎ জটিলতা শুরু হলে ইয়াছির তাড়াহুড়ো করে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। ডাক্তারের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে প্রসবের টেবিলেই সুচরিতা শেষ নিশ্বাস ফেলেন।

জন্ম নিল নতুন প্রাণ, রুদ্র। কিন্তু সেই জন্মের আনন্দে ভাসার উপায় ইয়াছিরের ছিল না, কারণ পাশেই শুয়ে সুচরিতার নিথর দেহ। ত্রিশ বছর বয়সে মাতৃহীন হয়ে গেল সদ্যজাত শিশু। ইয়াছির কান্না বুকের গভীরে চেপে ধরে সন্তানকে বুকে টেনে নিলেন।

স্ত্রীর শোক ইয়াছিরকে প্রায় ভেঙে ফেলেছিল, কিন্তু কোলের রুদ্র আর বৃদ্ধা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁকে শক্ত হতে হয়েছিল। সেদিন থেকে ইয়াছির শুধু লেখক নন, একইসঙ্গে মা আর বাবা হয়ে উঠলেন। তখনও তিনি জানতেন না, দুঃসময়ের শুরু মাত্র; আসল ঝড় তখনও বাকি ছিল।

গত দুই-তিন বছরে প্রযুক্তিতে ঘটে গেল এক অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারে প্রকাশনা শিল্পের চেনা কাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে শুরু করল। বইয়ের বাজারে নামল এক নিষ্ঠুর পরিবর্তন।

যে প্রকাশকেরা একদিন ইয়াছিরের পাণ্ডুলিপির জন্য এই ফ্ল্যাটের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতেন, তাঁরাই এখন মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এআই দিয়ে সামান্য খরচে, মাত্র কয়েক ঘণ্টায় শত শত পাতার বই তৈরি হয়ে যাচ্ছে এখন।

মানুষের রক্তমাংসের আবেগ, বছরের পর বছরের সাধনা, এসবের কোনো দাম রইল না বাণিজ্যমুখী প্রকাশকের চোখে। সস্তায় ও দ্রুত বই বের করাই হয়ে উঠল একমাত্র লক্ষ্য। নতুন পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতে গিয়ে ইয়াছিরকে শুনতে হলো অপমানজনক কথা। বলা হলো, তাঁর মতো সনাতন ধারার লেখকের চাহিদা আর নেই, কম্পিউটারই এখন ভালো গল্প লিখে দিচ্ছে।

রয়্যালটি বন্ধ হওয়ার পর সঞ্চয়ে টান পড়ল। কিছুদিন টেনেটুনে চললেও বিপদ ক্রমে ঘনীভূত হলো। মা হঠাৎ হৃদরোগ আর ফুসফুসের জটিলতায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন।

মাকে বাঁচাতে শেষ সঞ্চয়টুকুও ডাক্তারের ফি, পরীক্ষা আর ওষুধের পেছনে খরচ হয়ে গেল। জমানো প্রতিটা পয়সা ফুরিয়ে এলো, এমনকি নিত্যদিনের বাজার করার টাকাও একসময় ইয়াছিরের হাতে রইল না।

এর মধ্যে রুদ্র তিন বছরে পা দিয়েছে। মায়ের আদর না পাওয়া ছেলেটা শুধু বাবার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। কিন্তু ঘরে খাবার বলতে কিছু নেই। চালের কৌটা ফাঁকা, ডালের বয়ামে ধুলো, আর শিশুর প্রধান খাবার গুঁড়ো দুধের শেষ কৌটাও দুদিন আগে খালি হয়ে গেছে।

দুদিন ধরে রুদ্র শুধু পানি আর সামান্য ভাতের মাড় খেয়ে বেঁচে আছে। দারিদ্র্য কী, এআই তার বাবার পেশা কীভাবে গিলে খেয়েছে, এসব ছেলেটা বোঝে না। সে কেবল ক্ষুধায় বাবার জামার আঁচল টেনে ধরে কেঁদে ওঠে।

"বাবা, দুধ খাবো, দুধ দাও।" রুদ্রের এই কান্না তীরের মতো বিঁধছিল ইয়াছিরের বুকে। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে চাইলেন, কিন্তু গলা শুকিয়ে আসছিল, কোনো কথা বেরোল না। নিজেকে তখন পৃথিবীর সবচেয়ে অপদার্থ বাবা মনে হচ্ছিল তাঁর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্র, যাঁর ধ্রুপদী বই হাজার পাঠক শ্রদ্ধায় পড়েছে, আজ সেই মানুষ নিজের তিন বছরের ছেলের জন্য এক কৌটা দুধ কিনতে পারেন না। এই দারিদ্র্য, এই অসহায়ত্ব ইয়াছিরের আত্মসম্মানকে ধীরে ধীরে পিষে ফেলছিল।

উপায় না দেখে ইয়াছির পরিচিত লেখক বন্ধু, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী আর পুরনো প্রকাশকদের কাছে সাহায্য চাইতে বেরোলেন। একের পর এক ফোন করলেন, কারও অফিসে সরাসরি গিয়ে হাজির হলেন। করুণা বা দান চাননি কারও কাছে; চেয়েছিলেন সামান্য ধার, বা নতুন পাণ্ডুলিপির বিনিময়ে সামান্য অগ্রিম। কিন্তু আধুনিক সমাজ বড় নিষ্ঠুর, বড় অর্থকেন্দ্রিক। একসময় যাঁরা তাঁকে ঘিরে প্রশংসা করতেন, আজ তাঁর দুর্দিনে তাঁরাই দূরে সরে গেলেন।

কেউ বাজারের মন্দার অজুহাত দিলেন, কেউ ফোন ধরেই অস্বীকার করলেন। এমনকি সবচেয়ে কাছের বন্ধুও ঠান্ডা গলায় বললেন, এই মুহূর্তে ধার দেওয়ার মতো অবস্থা তাঁদের নেই। ইয়াছির বুঝলেন, এই বিশাল ঢাকা শহরে তাঁর পরিবারের সত্যিকারের কেউ নেই।

সন্ধ্যা নামতেই ফ্ল্যাটের অন্ধকার আরও গাঢ় হলো। বিদ্যুৎ বিল বাকি থাকায় সংযোগ কেটে দেওয়ার হুমকি দিয়ে গেছে অফিস। ঘরে জ্বলছে শুধু একটা টিমটিমে মোমবাতি।

মা বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলেন, ওষুধের সময় পেরিয়ে গেছে কিন্তু ঘরে ওষুধ নেই। রুদ্র কাঁদতে কাঁদতে একসময় ইয়াছিরের কোলেই ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমের মধ্যেও তার ছোট ছোট দীর্ঘশ্বাস আর ঠোঁটের কাঁপুনি দেখে ইয়াছিরের মাথা কাজ করছিল না।

ঘুমন্ত রুদ্রকে মায়ের পাশে শুইয়ে দিলেন। মায়ের শীর্ণ হাতটা কিছুক্ষণ ধরে বসে রইলেন। তারপর ঠিক করলেন, কিছু একটা করতেই হবে। সন্তানকে না খাইয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরতে দেখা কোনো বাবার পক্ষে সম্ভব না। পিতৃত্বের টানে নিজের সারাজীবনের আত্মসম্মান, বংশের গৌরব, নৈতিকতার দেয়াল, সবকিছু ভাঙতে প্রস্তুত হলেন তিনি।

গায়ে পুরনো চাদর জড়িয়ে ঘর থেকে বেরোলেন। সিদ্ধেশ্বরীর গলি পেরিয়ে ধীরে হাঁটতে লাগলেন মালিবাগ মোড়ের দিকে। রাতের ঢাকা তখনও ঝলমলে, রাস্তায় গাড়ির সারি, মানুষ নিজেদের ব্যস্ততায় মগ্ন। কিন্তু ইয়াছিরের চোখের সামনে ভাসছিল শুধু রুদ্রের ক্ষুধার্ত, নিস্তেজ মুখ।

হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলেন মালিবাগ মোড়ের 'স্বপ্ন' সুপারশপের সামনে। কাচঘেরা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই দোকানে রঙবেরঙের পণ্যের ছড়াছড়ি, ভেতরে মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত মানুষেরা কেনাকাটায় ব্যস্ত।

দরজার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন ইয়াছির। বুক দুরুদুরু করছিল, কপালে ঠান্ডা ঘাম। জীবনে কখনো কারও একটা পয়সাও না বলে ছোঁননি। আজ তিনি এক মরিয়া বাবা, পেছনে এক ক্ষুধার্ত সন্তানের কান্না।

ধীরপায়ে শপে ঢুকলেন। জীর্ণ পোশাক আর মলিন চেহারা দেখে নিরাপত্তারক্ষীরা একবার আড়চোখে তাকাল, কিছু বলল না। তাক পেরিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন শিশুখাদ্যের সারিতে।

সারিবদ্ধ দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের দুধের কৌটা। একটা পরিচিত ব্র্যান্ডের কৌটা তুলে নিলেন হাতে। দামের অঙ্কের দিকে তাকিয়ে চোখ ঝাপসা হয়ে এলো; এই টাকা তাঁর কাছে এখন দুঃস্বপ্নের মতো দূরের।

চারপাশে তাকালেন একবার। ক্রেতাদের ভিড়ে সবাই যে যার কেনাকাটায় ব্যস্ত। হাত কাঁপছিল, বুক ধুকপুক করছিল দ্রুত থেকে দ্রুততর। কৌটাটা চাদরের তলায় লুকিয়ে ফেললেন সাবধানে। জীবনের প্রথম অপরাধ করতে গিয়ে যেন শিরায় শিরায় রক্ত জমে যাচ্ছিল তাঁর।

স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ক্যাশ কাউন্টার পেরিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। কিন্তু পাপের পথ সহজ হয় না কখনো। সিসিটিভিতে নজর রাখা এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা আগেই খেয়াল করেছিলেন তাঁর অস্বাভাবিক আচরণ।

ঠিক যখন ইয়াছির কাচের স্বয়ংক্রিয় দরজা পেরিয়ে ফুটপাতে পা রাখতে যাবেন, পেছন থেকে দুটো শক্ত হাত এসে চাদর চেপে ধরল। "চোর! চোর! ধর চোরকে!" রক্ষীর চিৎকারে এক মুহূর্তে তছনছ হয়ে গেল শপের শান্ত পরিবেশ।

কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষী আর কর্মচারী ঘিরে ফেলল ইয়াছিরকে। টানাহেঁচড়ায় চাদরের তলা থেকে দুধের কৌটা সশব্দে গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। উপস্থিত ক্রেতারা কেনাকাটা থামিয়ে সেই দৃশ্য দেখতে ভিড় করলেন।

তাঁকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হলো শপের পেছনের এক কোণে। একটা খুঁটির সঙ্গে দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলা হলো। ম্যানেজার ক্রুদ্ধ গলায় গালিগালাজ করতে লাগলেন।

কাচের দরজা পেরিয়ে পথচারী আর কৌতূহলী মানুষ ভিড় জমাল ভেতরে। ভদ্রবেশী একজন মানুষকে চুরির অপরাধে বাঁধা অবস্থায় দেখে কেউ কেউ মোবাইল বের করে ছবি তুলল, কেউ ছুড়ে দিল কটু মন্তব্য। "তোর মতো চোরের জন্যই দেশের বদনাম!" "দেখতে তো ভদ্রলোক, ভেতরে ভণ্ড চোর!" এমন নানা কথায় বাতাস ভারী হয়ে উঠল।

ইয়াছির প্রতিবাদ করলেন না, মাথা নিচু করে রইলেন। চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল অঝোরে; সেই জল অপমানের নাকি পরাজয়ের, বোঝার মতো মানুষ সেখানে কেউ ছিল না।

ভিড়ের মধ্যে থেকে কয়েকজন উৎসাহী যুবক আর কর্মচারী থাপ্পড়, ঘুসি মারতে শুরু করল। "চোরের শাস্তি না দিলে শিক্ষা হবে না," এই অজুহাতে হাত তুলল তারা। প্রতিটা আঘাত শরীরের চেয়েও বেশি বিঁধছিল আত্মায়।

একদিন যিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্র, যাঁর হাতে লেখা সাহিত্য হাজারো মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে, আজ সেই হাত দড়িতে বাঁধা, শরীরে বর্ষিত হচ্ছে গণপ্রহার। তবু মুখে আক্ষেপের কোনো ভাষা ছিল না তাঁর। শারীরিক যন্ত্রণা বা সামাজিক লজ্জার তোয়াক্কা করছিলেন না তিনি; মারধরের মধ্যে শুধু একটা কথাই বারবার আকুল গলায় বলে যাচ্ছিলেন, "আপনারা যা খুশি মারুন, শুধু আমাকে ছেড়ে দিন। আমার তিন বছরের ছেলে ঘরে অনাহারে কাঁদছে। দুধের অভাবে ও মরে যাবে। আমাকে একটা সুযোগ দিন, ও খুব ক্ষুধার্ত!"

সেই আকুতি, সেই চোখের জল কারও কারও মনে সামান্য দ্বিধা তৈরি করলেও বেশিরভাগের হৃদয় গলাতে পারল না। আধুনিক শহুরে জীবন মানুষকে বড় বেশি অসাড় আর সন্দিগ্ধ করে তুলেছে। সবাই ভাবল, ধরা পড়া চোর এমন হাজার মিথ্যা অজুহাত বানায়।

ম্যানেজার ঘোষণা দিলেন, পুলিশ না আসা পর্যন্ত এভাবেই বাঁধা থাকবে সে। দেয়ালে হেলান দিয়ে ইয়াছির চোখ বন্ধ করলেন। মনের পর্দায় ভেসে উঠল সিদ্ধেশ্বরীর সেই ফ্ল্যাটের ছবি— বিছানায় শুয়ে অসুস্থ মা, পাশে ক্ষুধার্ত রুদ্র হয়তো অন্ধকার ঘরে বাবার পথ চেয়ে কেঁদে কেঁদে নেতিয়ে পড়ছে। ইয়াছির ভাবলেন, তিনি কি সত্যিই কোনো অপরাধ করেছেন? সন্তানকে বাঁচানোর আকুতি কি অপরাধ হতে পারে? বাবার রক্ত, মায়ের সারাজীবনের শিক্ষকতা, তাঁর নিজের নির্জন সাধনা, সমাজ কি তাঁকে শেষে এই উপহারই দিল?

রাত গভীর হচ্ছিল। মালিবাগ মোড়ের কোলাহল কমে আসছিল ধীরে ধীরে, কিন্তু শপের ভেতরের আলো তখনও সমান উজ্জ্বল। ইয়াছির বাঁধা অবস্থায় মেঝেতে বসে, ঠোঁটের কোণে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত, কপালে কালশিটে দাগ।

মিডিয়া থেকে সবসময় নিজেকে দূরে রেখেছিলেন তিনি। চাননি কখনো নিজের মুখ লোকচক্ষুর সামনে আসুক। চেয়েছিলেন সাহিত্যই যেন তাঁর পরিচয় হয়ে থাকে। আজ যদি তিনি পরিচিত মুখ হতেন, নিয়মিত টিভিতে আসতেন, হয়তো এভাবে মালিবাগের রাস্তায় লাঞ্ছিত হতে হতো না। কিন্তু আড়াল থেকে সমাজকে কিছু দিতে চাওয়া এই মানুষটি আজ সমাজের চোখে নিছক এক সস্তা চোর। বুকের ভেতর জমছিল গভীর অভিমান। এই দেশ, এই শহর যেন তাঁর পিতৃত্বের মর্যাদা পায়ের তলায় পিষে দিয়েছে।

দূরে কোথাও পুলিশের সাইরেন বাজছিল। হয়তো আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আইনের হাতে তুলে দেওয়া হবে তাঁকে। কিন্তু ইয়াছিরের মন পড়ে ছিল সিদ্ধেশ্বরীর সেই ফ্ল্যাটে, যেখানে রুদ্র হয়তো তখনও বাবার নাম ধরে ডাকছে।

মালিবাগ মোড়ের আলো ঝলমলে সুপারশপের বাইরে তখন পুলিশের গাড়ির লাল-নীল আলো জ্বলছে। সাইরেনের শব্দে ফুটপাতে জমল কৌতূহলী মানুষ। দোকানের ভেতরে চাল, ডাল, প্রসাধনসামগ্রীর মাঝে ইয়াছির তখনও পিলারের সঙ্গে বাঁধা, কপাল থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত গড়িয়ে জমেছে চিবুকে। চাদরটা একপাশে খসে পড়েছে, সামনে মেঝেতে অবহেলায় পড়ে সেই দুধের কৌটো।

থানার ডিউটি অফিসার ঢুকতেই সিকিউরিটি গার্ড ব্যস্ত হয়ে উঠল। "স্যার, এই যে লোকটা। চাদরের নিচে কৌটা লুকিয়ে পালাচ্ছিল, হাতেনাতে ধরেছি।" অফিসার ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের এমন লাঞ্ছিত চেহারা দেখে তাঁর চোখে খানিকটা সংশয় ফুটে উঠল।

"আপনার নাম কী? বাড়ি কোথায়?" রুক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করলেন অফিসার। ইয়াছির রক্তাভ চোখ তুললেন ধীরে। গলায় ক্ষোভ ছিল না, ছিল শুধু অসীম ক্লান্তি। ফিসফিস করে বললেন, "আমার নাম ইয়াছির আহমেদ। ১৮৭/এ সিদ্ধেশ্বরী। কিন্তু থানায় নেওয়ার আগে দয়া করে এই দুধটুকু আমার ঘরে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। আমার তিন বছরের ছেলে না খেয়ে মরছে।"

অফিসার জবাব না দিয়ে গার্ডকে পকেট তল্লাশি করতে বললেন। টাকাপয়সা কিছু নেই। পাওয়া গেল শুধু একটা পুরনো, চামড়া উঠে যাওয়া মানিব্যাগ। উপুড় করতেই বেরিয়ে এলো কিছু ধুলোমাখা স্মৃতি— ১৯৭১ সালে শহীদ বাবার একটা ঝাপসা সাদাকালো পাসপোর্ট ছবি আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা পুরনো লাইব্রেরি কার্ড।

কার্ডটা হাতে নিয়ে অফিসার একটু থমকালেন। তাতে লেখা, "ইয়াছির আহমেদ, বাংলা বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ ১৯৯২-১৯৯৩।" চমকে গিয়ে লোকটার মুখের দিকে ভালো করে তাকালেন তিনি। মধ্যবয়সী এই মানুষের চেহারায় দাগি চোরের কোনো ছাপ নেই; বরং তাতে জড়িয়ে আছে শিক্ষিত, মার্জিত, আত্মমর্যাদাবান এক মুখের বিষাদ।

"আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র ছিলেন?" জিজ্ঞেস করলেন অফিসার। ইয়াছির উত্তর দিলেন না, শুধু চোখ বন্ধ করে রইলেন। সন্তানের খাবার কেনার সামর্থ্য যাঁর নেই, তাঁর কাছে ডিগ্রির অহংকার বড়ই অর্থহীন লাগে। এই শিক্ষাগত পরিচয় যেন তাঁর বর্তমান লাঞ্ছনাকে আরও বাড়িয়ে তুলছিল।

ঠিক তখনই ভিড়ের কোণে দাঁড়িয়ে ঘটনা দেখছিল শপের এক তরুণ কর্মী। সে হঠাৎ এগিয়ে এসে চেঁচিয়ে উঠল, "ইয়াছির আহমেদ! আপনি কি কথাসাহিত্যিক ইয়াছির আহমেদ? যাঁর 'অক্ষরের অশ্রুজল' আর 'পিতা' মেলায় হাজার কপি বিক্রি হতো?"

এই প্রশ্নে গোটা শপ যেন থমকে গেল। যারা একটু আগে "চোর, চোর" বলে চিৎকার করছিল, যারা মেরেছিল তাঁকে, তারা সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। দেশের ধ্রুপদী সাহিত্যের এক ধারক এভাবে সুপারশপ থেকে দুধ চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন, এটা যেন কারও বিশ্বাসই হতে চাইছিল না।

শপের ম্যানেজার হতবাক হয়ে হাঁটু গেড়ে বসলেন ইয়াছিরের সামনে। গলা কাঁপছিল তাঁর। "স্যার, আপনি? আপনি কেন এমন করতে গেলেন? আমাদের বললেই তো সাহায্য করতাম!" ইয়াছির ধীর গলায় বললেন, "আমি ভিক্ষা চাইতে আসিনি। চেয়েছিলাম সন্তানের জন্য কিছু জোগাড় করতে। মেধা বিক্রি করে আজ আমি নিঃস্ব, কিন্তু সন্তানের ক্ষুধা কোনো নীতিশাস্ত্র বোঝে না।"

লজ্জা আর অপরাধবোধে কর্মচারী আর গার্ডদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। একটু আগে যারা পশুর মতো মেরেছিল এই মানুষটাকে, তারা এবার ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে লাগল। মানুষের বাহ্যিক মোড়ক দেখে সমাজ সম্মান দেয় বা কেড়ে নেয়, কিন্তু পেটের ক্ষুধা যে জাতকুল বা খ্যাতি মানে না, এই অন্ধকার রাতে সেটাই স্পষ্ট হলো।

অফিসার আর দেরি করলেন না। ইয়াছিরের হাতের বাঁধন খুলে দিলেন। মুক্ত হয়ে অবশ হয়ে যাওয়া হাত দুটো একটু নাড়ালেন ইয়াছির। মনে তখন রাগ বা প্রতিশোধের কোনো ভাবনা নেই, শুধু তাকিয়ে রইলেন মেঝেতে ধুলো মাখা পড়ে থাকা দুধের কৌটার দিকে।

"স্যার, আমরা অত্যন্ত দুঃখিত। চিনতে পারিনি আপনাকে। কোনো কেস হবে না, বাড়ি যান।" হাত জোড় করে বললেন অফিসার। সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন ইয়াছির, কিন্তু দুর্বল শরীর কেঁপে উঠল। বললেন, "আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন। সমাজকে কিছু দিতে এসেছিলাম, শেষে একটা চোর হয়েই ফিরে যাচ্ছি।"

পুলিশের গাড়ি থেকে নেমে সিদ্ধেশ্বরীর গলিতে ঢোকার পথে ইয়াছিরের মনে ভেসে উঠল ত্রিশ বছরের ইতিহাস। ১৯৯৩ সালের জানুয়ারি— তরুণ ইয়াছির তখন সদ্য বাংলা বিভাগে পা রেখেছেন। কলা ভবনের করিডোর, কার্জন হলের লাল ইট, মধুর ক্যান্টিনের আড্ডা, সব মিলিয়ে সাহিত্যের এক মায়াবী জগতে ঢুকে পড়েছিলেন তিনি।

সেদিন মা স্কুলের বেতন থেকে কিছু টাকা বাঁচিয়ে হাতে তুলে দিয়েছিলেন নতুন একটা ফাউন্টেন পেন। বলেছিলেন, "ইয়াছির, তোর বাবা দেশের জন্য রক্ত দিয়েছেন। এই কলম দিয়ে তুই লিখবি মানুষের কষ্টের কথা। এমন কিছু লিখবি, যা মানুষের আত্মাকে নাড়া দেবে।"

মায়ের সেই কথা মনে রেখেই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাতগুলোতে জেগে ধ্রুপদী সাহিত্য চর্চা করেছেন তিনি। অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী আর ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর স্মৃতিবিজড়িত সেই বিভাগে ইয়াছির ছিলেন এক উজ্জ্বল নাম। অনার্সে প্রথম শ্রেণি পেয়েও কোনো সরকারি বা করপোরেট চাকরিতে যাননি, কারণ সাহিত্যকে ভালোবেসেছিলেন সবচেয়ে বেশি।

সেই ১৯৯২-৯৩ সেশনের দিনগুলোই ছিল ইয়াছিরের জীবনের সবচেয়ে স্বর্ণালী অধ্যায়। লাইব্রেরির কোণে বসে রবীন্দ্রনাথের গল্পের রূপতত্ত্ব খুঁজতে, বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষা নিয়ে ভাবতে ভাবতে কেটে যেত ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

সহপাঠীরা যখন বিসিএসের কোচিংয়ে দৌড়াদৌড়ি করত, ইয়াছির তখন বুড়িগঙ্গার তীরে বসে দেখতেন সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। তাঁর বিশ্বাস ছিল, খাঁটি সাহিত্য জন্মায় মানুষের জীবনের মাটির গন্ধ থেকে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের কল্পনা থেকে নয়।

মা সবসময় পাশে ছিলেন। সামান্য বেতনে সংসার চালিয়েও কখনো ছেলেকে চাকরির জন্য চাপ দেননি। বলতেন, "তোর বাবা দেশকে ভালোবেসে প্রাণ দিয়েছে, তুই সাহিত্যকে ভালোবেসে জীবন কাটা। টাকাপয়সা হয়তো বেশি পাবি না, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা পাবি।" মায়ের এই বিশ্বাসই ছিল ইয়াছিরের একমাত্র ভরসা।

মায়ের নিজের জীবনটাও এক দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। ১৯৩৩ সালের ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে তিনি তিন দশক শিক্ষকতা করেছেন বিশ্বস্ততার সঙ্গে। বেইলি রোড সংলগ্ন এই স্কুল শত শত মেয়েকে শিক্ষার আলো দেখিয়েছে।

প্রতিদিন সকালে রান্না সেরে হেঁটে স্কুলে যেতেন মা। বিকেলে ফিরে আবার বসতেন ইয়াছিরের পড়া নিয়ে। বছরের পর বছর নিজের জন্য একটা নতুন শাড়িও কেনেননি; শুধু টাকা জমিয়েছেন, যেন পিতৃহীন ছেলেটা অভাব বুঝতে না পারে।

শেষে সেই জমানো বাইশ লক্ষ টাকায় কিনেছিলেন সিদ্ধেশ্বরীর এই বারোশো বর্গফুটের ফ্ল্যাট। কেনার দিন ছেলেকে ডেকে বলেছিলেন, "ইয়াছির, এই ছাদটুকু আমাদের নিজের। এখানে বসে তুই স্বাধীনভাবে লিখবি, কাউকে তোষামোদ করতে হবে না।"

পরিবারের শেকড় ছিল ভারতের চব্বিশ পরগনায়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর লাখো মানুষের মতো ইয়াছিরের দাদাও ভিটেমাটি ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। নতুন দেশে শূন্য থেকে শুরু করতে হয়েছিল তাঁদের।

১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হলে ইয়াছিরের বাবা ঘর ছেড়ে চলে যান। ইয়াছির তখন মায়ের গর্ভে। বাবা আর ফেরেননি— যুদ্ধের শেষদিকে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে তুলে নিয়ে হত্যা করে। শহীদ বাবার মুখ ইয়াছির কোনোদিন দেখেননি।

মা তাঁকে বড় করেছেন বাবার একটা পুরনো ঘড়ি আর একখানা ডায়েরি দেখিয়ে। বলতেন, "তোর বাবা বলতেন, সততার চেয়ে বড় সম্পদ মানুষের হয় না। আমরা চব্বিশ পরগনা থেকে সব হারিয়ে এসেছি, কিন্তু ঈমান আর সততা হারাইনি।" মায়ের এই শিক্ষা ইয়াছির কখনো ভোলেননি।

বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে প্রথম বই প্রকাশ পেতেই পাঠকমহলে আলোড়ন তৈরি হয়েছিল। কোনো সস্তা চমক ছাড়াই, শুধু গভীর মানবিক অনুভূতি আর ভাষার জাদুতে তিনি জয় করে নিয়েছিলেন পাঠকের হৃদয়।

একুশে বইমেলায় তাঁর স্টলের সামনে ভিড় লেগে থাকত। প্রকাশকেরা ফ্ল্যাটে এসে লাইন দিতেন পাণ্ডুলিপির জন্য, অগ্রিম হিসেবে লাখ টাকা দিতে চাইতেন। কিন্তু ইয়াছির কখনো অতিরিক্ত নিতেন না; যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই নিতেন।

অনেক পরিচিত লেখক তখন টিভি টকশো আর পত্রিকার সাক্ষাৎকারে ব্যস্ত, নিজেদের প্রসারে মগ্ন। ইয়াছির তখন ঘরের কোণে বসে নির্জনে সাধনা করতেন। বলতেন, লেখক যখন নিজের মুখ বিক্রি শুরু করে, তার অক্ষরের জোর কমে যায়— লেখকের পরিচয় থাকা উচিত তার সাহিত্যেই।

সেই সুবর্ণ সময়ে এলেন সুচরিতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্রী, ইয়াছিরের সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠিকা। তাঁর নির্জনতা আর সরলতায় মুগ্ধ হয়ে এই অভাবী কিন্তু আত্মমর্যাদাবান পরিবারে বধূ হয়ে এসেছিলেন তিনি।

সুচরিতা আসার পর ফ্ল্যাটটা শান্তিতে ভরে উঠেছিল। শাশুড়ির সেবা, ইয়াছিরের এলোমেলো লেখা গুছিয়ে রাখা, ঘরটাকে পরিপাটি রাখা, সুচরিতা যেন এই সংসারের লক্ষ্মী হয়ে উঠেছিলেন।

তখনই ইয়াছির লিখেছেন জীবনের সেরা উপন্যাসগুলো। প্রতি বছর মেলায় তাঁর বই মানেই বেস্টসেলার তালিকার শীর্ষ। অর্থ আর যশ দুটোই তখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু সুখের সেই দিন যে এত দ্রুত শেষ হবে, তা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি ইয়াছির।

তিন বছর আগের সেই রাতে সুচরিতা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান। মুহূর্তে ওলটপালট হয়ে যায় ইয়াছিরের গোটা পৃথিবী। অপারেশন থিয়েটারের বাইরে ডাক্তার এসে বলেছিলেন, "আমরা মা-কে বাঁচাতে পারলাম না, কিন্তু সুন্দর একটা ছেলে হয়েছে আপনার।" ইয়াছির তখন পাথরের মতো স্থির দাঁড়িয়ে ছিলেন।

কোলে তুলে দেওয়া নবজাতক রুদ্রকে দেখে কান্না আর বেদনায় প্রায় ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। সুচরিতাকে হারানোর ক্ষত তাঁকে মানসিকভাবে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু বৃদ্ধা মা শক্ত হাতে নাতিকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন।

মা বলেছিলেন, "ইয়াছির, সুচরিতা তোকে রুদ্রকে দিয়ে গেছে। এই সন্তানই এখন তোর একমাত্র সম্বল। বাঁচতে হবে এই শিশুর জন্য।" নিজের কষ্ট চেপে ধরে কলম আবার তুলে নিয়েছিলেন ইয়াছির। কিন্তু ততদিনে সাহিত্যের বাজারে দেখা দিতে শুরু করেছে এক অদৃশ্য মড়ক।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আবির্ভাব প্রকাশনা শিল্পে নামিয়ে আনল এক কঠিন অন্ধকার। বিশ্বজুড়ে অ্যালগরিদমের আধিপত্যে প্রথাগত সাহিত্যচর্চা বড় একটা ধাক্কা খেল। দেশের নামী প্রকাশকেরা লাভ-ক্ষতির নতুন হিসাব কষতে লাগলেন।

এআই দিয়ে মিনিটের মধ্যে যেকোনো ধাঁচের উপন্যাস, গল্প বা অনুবাদ তৈরি করা সম্ভব হয়ে উঠল, লেখককে সম্মানী দিতে হয় না, মাসের পর মাস পাণ্ডুলিপির অপেক্ষা করতে হয় না। কম্পিউটারে তৈরি পাণ্ডুলিপি বাজারে সয়লাব করে দিতে লাগলেন প্রকাশকেরা। মৌলিক মানবিক অনুভূতি আর সাধনার জায়গা দখল করে নিল যান্ত্রিক শব্দমালা। ইয়াছিরের মতো লেখকেরা হঠাৎ নিজেদের আবিষ্কার করলেন এক নির্দয় নতুন জগতে, যেখানে মানুষের রক্তের অক্ষরের কোনো দাম নেই।

নতুন পাণ্ডুলিপি নিয়ে পুরনো প্রকাশকের কাছে গেলে সেই প্রকাশক চা খাইয়ে ঠান্ডা গলায় বললেন, "ইয়াছির সাহেব, লেখার মান নিয়ে কোনো কথা নেই, কিন্তু বাজার বদলে গেছে। এখন পাঠক গভীর উপন্যাস পড়ে না, সস্তা বিনোদন চায়। আর এআই দিয়ে এখন আমরা ইচ্ছেমতো গল্প বানাচ্ছি, খরচ নামমাত্র। আপনার এই জটিল সামাজিক উপন্যাস ছাপিয়ে লাভ হবে না। রোমান্টিক থ্রিলার সস্তায় লিখে দিতে পারলে দেখতে পারি।"

স্তব্ধ হয়ে শুনেছিলেন সেই কথা ইয়াছির। মেধা আর আত্মসম্মান বিক্রি করে সস্তা গল্প লেখা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। পাণ্ডুলিপি ব্যাগে ভরে বুকভাঙা কষ্ট নিয়ে হেঁটে ফিরেছিলেন সিদ্ধেশ্বরীর ঘরে। সেদিন থেকেই তাঁর আয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল।

আয় বন্ধ হতেই সঞ্চয় গলতে শুরু করল। আসল বিপদ এলো তখন, যখন মা মারাত্মক হৃদরোগ আর কিডনির জটিলতায় আক্রান্ত হলেন। যে মা সারাজীবন কষ্ট করে তাঁকে মানুষ করেছেন, সেই মায়ের চিকিৎসার জন্য নিজের শেষ সম্বলটুকু বাজি রাখলেন ইয়াছির।

পাণ্ডুলিপি বিক্রির সামান্য সঞ্চয়, সুচরিতার রেখে যাওয়া দুয়েকটা গয়না, সব একে একে বিক্রি হয়ে গেল ডাক্তারের ভিজিট আর ডায়ালিসিসে। কিন্তু মায়ের শরীরের কোনো উন্নতি হলো না; তিনি একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন।

এদিকে রুদ্র বড় হচ্ছিল। মায়ের বুকের দুধ না পাওয়া শিশুর মূল খাবার ছিল বাজারের গুঁড়ো দুধ। কিন্তু একসময় ইয়াছিরের হাতে টাকা রইল না একটাও। আয় শূন্য, ওষুধের টাকা নেই, চালের বয়াম পুরোপুরি খালি।

তিন দিন আগে ঘরের শেষ দুধের কৌটাটা ফুরিয়ে গিয়েছিল। রুদ্র কৌটাটা উপুড় করে শেষ গুঁড়োটুকুও চেটে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। সেই দৃশ্য দেখে ইয়াছিরের বুকের ভেতরটা দুমড়ে গিয়েছিল।

পরদিন সকাল থেকে শিশুটা এক ফোঁটা দুধ পায়নি। চাল ফুটিয়ে মাড় খাওয়ানোর চেষ্টা করেছিলেন ইয়াছির, কিন্তু তিন বছরের রুদ্র সেই তেতো মাড় মুখ থেকে ফেলে দিয়ে কেঁদে উঠেছিল, "বাবা, দুধ! দুধ দাও!" এই সরল আকুতি সিদ্ধেশ্বরীর শান্ত ঘরে কাচের মতো ভেঙে পড়ছিল।

পুরনো বন্ধুদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছিলেন ইয়াছির। যেসব বন্ধু একদিন তাঁর মেধার প্রশংসা করত, এখন বড় বড় পদে বসা, তারা সবাই ব্যস্ততার অজুহাতে ফিরিয়ে দিল। কেউ পাঁচশো টাকা ধার দেওয়ার সৌজন্যও দেখাল না।

আগের রাতে শেষবার এক পুরনো প্রকাশকের দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন যখন, প্রকাশক তাঁকে পাঁচশো টাকার নোট বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, "ইয়াছির সাহেব, ভিক্ষা হিসেবে নিয়ে যান। নতুন পাণ্ডুলিপি আর আনবেন না, এখন এআইয়ের যুগ, আপনার মতো লেখকের আর দরকার নেই।"

সেই নোট নেননি ইয়াছির। নীরব চোখে প্রকাশকের দিকে তাকিয়ে হেঁটে বেরিয়ে এসেছিলেন। ভিক্ষার টাকায় সন্তানকে খাওয়ানোর চেয়ে মরে যাওয়া ভালো, এমন অভিমান জন্মেছিল তাঁর মনে।

কিন্তু আজ বিকেলে রুদ্র কাঁদতে কাঁদতে নিস্তেজ হয়ে মেঝেতে পড়ে গেলে, চোখের তারা দুটো ওলটপালট হতে শুরু করলে, ইয়াছিরের সব অভিমান ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল। বুঝলেন, একজন মৃত লেখকের আত্মসম্মানের চেয়ে এক ফোঁটা দুধের দাম অনেক বেশি।

সেই তাড়না থেকেই আজ সন্ধ্যায় মালিবাগ মোড়ের 'স্বপ্ন' সুপারশপে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। পকেটে শূন্যতা, মাথায় সন্তানের নিস্তেজ মুখ। ভেবেছিলেন, চুরি করা পাপ, কিন্তু সন্তানকে না খাইয়ে মেরে ফেলা আরও বড় অপরাধ।

কিন্তু নিয়তি বড় অদ্ভুত। সারাজীবন সততার পথে হাঁটা মানুষটা জীবনের প্রথম অন্যায় করতে গিয়েই ধরা পড়ে গেলেন। মারধরের প্রতিটা আঘাত সহ্য করার সময় শুধু মনে মনে ভাবছিলেন, "হে ঈশ্বর, আমাকে অপমান করো, কিন্তু রুদ্রের জন্য একটু দুধের ব্যবস্থা করে দাও।"

রাত বারোটা তখন। মালিবাগ মোড় থেকে ধীরপায়ে হেঁটে সিদ্ধেশ্বরীর গলিতে এসে পৌঁছালেন ইয়াছির। গায়ের চাদর ছেঁড়া, ঠোঁটের কোণে জমাট রক্ত, কিন্তু হাতে ধরা সেই দুধের কৌটো। শপের সেই তরুণ কর্মী নিজের পকেটের টাকায় কিনে জোর করে গুঁজে দিয়েছিল তাঁর হাতে।

সিঁড়ি বেয়ে ওঠার প্রতিটা পা ভারী মনে হচ্ছিল। অন্ধকার সিঁড়িঘরের নীরবতা যেন উপহাস করছিল তাঁকে। তিন তলার দরজার সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন।

ভেতর থেকে কোনো শব্দ আসছে না। কাঁপা হাতে চাবি বের করে তালা খুললেন। দরজা খুলতেই ভেসে এলো এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। মোমবাতিটা অনেক আগেই নিভে গেছে।

পকেট থেকে ম্যাচ বের করে একটা কাঠি জ্বালালেন। ছোট্ট আলোয় ঘর স্পষ্ট হয়ে উঠল। বিছানায় শুয়ে মা, বুকের কাছে গুঁড়ি মেরে ঘুমিয়ে রুদ্র। ধীরপায়ে বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন ইয়াছির।

দেশলাইয়ের আলোটা রুদ্রের মুখের কাছে নিলেন। ছেলে ঘুমাচ্ছে, গাল বেয়ে শুকিয়ে যাওয়া চোখের জলের দাগ স্পষ্ট। ঘুমের মধ্যেও মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে সে। ইয়াছির হাত বাড়িয়ে রুদ্রের মাথায় রাখলেন।

তারপর মায়ের দিকে তাকালেন। শরীর অস্বাভাবিক ঠান্ডা। "মা, ও মা, দেখো আমি রুদ্রের জন্য দুধ এনেছি।" মা সাড়া দিলেন না। কপালে হাত রাখতেই ইয়াছিরের সারা শরীর কেঁপে উঠল।

মায়ের দেহ পুরোপুরি শক্ত, হিম। ইয়াছির যখন মালিবাগের রাস্তায় চোর অপবাদে লাঞ্ছিত হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই এই নির্জন ঘরে তাঁর মা নিঃশব্দে শেষ নিশ্বাস ফেলেছেন। একটা মুক্তিযুদ্ধোত্তর পরিবার, এক আত্মত্যাগী শিক্ষকের জীবনসন্ধ্যা এভাবেই ডুবে গেল চরম নীরবতায়।

চিৎকার করে কাঁদতে পারলেন না ইয়াছির। গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না। ধীরে ধীরে বসে পড়লেন নিথর মায়ের পায়ের কাছে। হাতে ধরা দুধের কৌটোটা গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে।

একদিকে মৃত মা, অন্যদিকে ক্ষুধার্ত নিস্তেজ সন্তান, মাঝে দাঁড়িয়ে এক ব্যর্থ লেখক, যাঁকে এই সমাজ আর প্রযুক্তি ধীরে ধীরে অপাঙক্তেয় করে তুলেছে। একুশে বইমেলার হাততালি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ডিগ্রি, বাবার শহীদি গৌরব, সবকিছু যেন এই অন্ধকারে তলিয়ে গেল।


ঘমন্ত রুদ্রকে আলতো করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন ইয়াছির। অন্ধকারেও বাবার চেনা গায়ের গন্ধ পেয়ে ছেলে ডুকরে উঠল, "বাবা, দুধ?" কপালে চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বললেন তিনি, "হ্যাঁ বাবা, দুধ এনেছি। কিন্তু তোর দাদিমা আজ অনেক দূরে চলে গেছে।"

এই শহরের বুকে পিতৃত্বের যে করুণ পরাজয় ঘটে গেল আজ রাতে, তা হয়তো কোনো এআইয়ের যান্ত্রিক গল্পে কখনো লেখা হবে না। থেকে যাবে শুধু সিদ্ধেশ্বরীর এই নীরব ইটের দেয়ালের দীর্ঘশ্বাসে।

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর