আরেকবার
রেজুয়ান আহম্মেদ
পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষের মুখ বদলেছে, সভ্যতা বদলেছে, সাম্রাজ্য উঠেছে আর ধ্বংস হয়েছে, নদীর গতিপথ পাল্টেছে, শহরের নাম বদলেছে, মানুষের বিশ্বাসও বহুবার জন্ম নিয়ে আবার মিলিয়ে গেছে। তবু মানুষের ভেতরে একটি প্রাচীন সত্য আজও অমলিন হয়ে আছে। মানুষ বাঁচতে চায়।
এই ইচ্ছার কোনো একক ভাষা নেই।
ধনী মানুষ যখন নিজের বিশাল ঘরের জানালা খুলে ভোরের আলো দেখে, তার চোখে যে জীবনের আকাঙ্ক্ষা ফুটে ওঠে, ফুটপাতে রাত কাটানো মানুষের চোখেও তার একটি ভিন্ন রূপ থাকে। সফল মানুষ আগামী দিনের নতুন পরিকল্পনা করে, ব্যর্থ মানুষও পরদিনের জন্য কোনো না কোনো অজুহাত খুঁজে নেয়। বৃদ্ধ মানুষ ফিরে তাকান অতীতের দিকে, শিশু তাকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের পানে। সময়ের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এই দুজনকে জুড়ে দেয় একটি অদৃশ্য সেতু। সেই সেতুর নাম জীবন।
মৃত্যু সম্পর্কে মানুষ জানে। জন্মের মুহূর্ত থেকেই তার যাত্রা শুরু হয় মৃত্যুর দিকে। এই সত্য এত পুরোনো যে পৃথিবীর কোনো ধর্ম, কোনো দর্শন কিংবা কোনো বিজ্ঞান তা অস্বীকার করতে পারেনি। তবু মানুষ প্রতিদিন এমনভাবে বাঁচে, যেন সামনে আরও একটি সকাল অপেক্ষা করছে। সম্ভবত এটাই মানুষের সবচেয়ে গভীর রহস্য।
সে জানে শেষ আছে, তবু শুরু করে।
সে জানে বিদায় আসবে, তবু ভালোবাসে।
সে জানে সবকিছু একদিন হারিয়ে যাবে, তবু ঘর বাঁধে।
সে জানে শরীর একদিন মাটিতে মিশে যাবে, তবু ভবিষ্যতের জন্য বীজ বোনে।
এই আপাত বিরোধের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানুষের অস্তিত্বের গভীরতম কবিতা।
জীবন কখনো মানুষের হাতে পুরোপুরি থাকে না। সে নিজের জন্ম বেছে নেয় না, মৃত্যুর দিনও জানে না। কার সঙ্গে তার দেখা হবে, কে তাকে ভালোবাসবে, কে ছেড়ে যাবে, কোন স্বপ্ন পূর্ণ হবে আর কোনটি অসমাপ্ত থেকে যাবে, কিছুই সে জানে না। তবু সে হাঁটে।
কেন?
হয়তো এই কারণে যে, মানুষ নিশ্চিততার চেয়ে সম্ভাবনাকে বেশি ভালোবাসে। একটি সম্ভাবনা, যত ক্ষীণই হোক না কেন, মানুষের কাছে কখনো কখনো গোটা একটা পৃথিবীর সমান হয়ে ওঠে।
ক্ষুধার্ত মানুষ যখন খাবারের অপেক্ষা করে, তখন সে শুধু খাদ্যের জন্য অপেক্ষা করে না; অপেক্ষা করে পরের মুহূর্তটির জন্য। অসুস্থ মানুষ যখন বিছানায় শুয়ে সুস্থ হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তখন সে কেবল সুস্থ শরীর চায় না; সে ফিরে যেতে চায় তার চেনা পৃথিবীতে। ব্যর্থ মানুষ যখন আবার চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সে জানে না পরের চেষ্টা সফল হবে কি না, তবু চেষ্টা করে।
কারণ ভেতরে একটি কণ্ঠ থাকে, যে যুক্তির ভাষায় কথা বলে না।
সে শুধু বলে, আরেকবার।
আরেকটি সকাল।
আরেকটি চেষ্টা।
আরেকটু অপেক্ষা।
এই \"আরেকবার\" শব্দটির মধ্যেই বোধহয় লেখা আছে মানবসভ্যতার দীর্ঘতম ইতিহাস।
কত যুদ্ধের পর মানুষ আবার ঘর তুলেছে। কত দুর্ভিক্ষের পর আবার জমিতে বীজ ফেলেছে। কত মহামারির পর শহরগুলো আবার আলোয় ভরে উঠেছে। কত ব্যক্তিগত শোকের পর একজন মানুষ আবার সন্তানের হাত ধরেছে। পৃথিবী বারবার তাকে ভেঙেছে, আর সে বারবার নিজের ভাঙা টুকরো দিয়েই গড়ে তুলেছে নতুন কোনো অর্থ।
এই ক্ষমতাকে হয়তো পুনর্জন্ম বলা চলে না, কারণ মানুষ একই রূপে ফিরে আসে না। সে বদলে যায়। কিছু পুরোনো তার ভেতরে থেকে যায়, কিছু নতুন জন্ম নেয়। কিছু ক্ষত শুকিয়ে যায়, কিছু থেকে যায় চিরকাল। কিছু স্মৃতি তাকে অনুসরণ করে, কিছু স্মৃতি থেকে সে মুক্তি পায়। কিন্তু তার যাত্রা কখনো থামে না।
সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার আগে জীবন তাকে বহুবার ভেঙে দেয়।
সম্ভবত ভাঙনও শেখার একটি ভাষা।
গতকাল আমরা যে মানুষ ছিলাম, আজ আর ঠিক সেই মানুষ নেই। একটি মৃত্যু বদলে দেয় আমাদের। একটি প্রেম বদলে দেয়। একটি প্রত্যাখ্যান বদলে দেয়। একটি অপমান, একটি ব্যর্থতা, একটি দীর্ঘ নির্ঘুম রাত, একজন অনুপস্থিত মানুষ, এমনকি একটি অপ্রত্যাশিত ক্ষমাও মানুষকে অন্যরকম করে তুলতে পারে।
মানুষের চরিত্র আসলে কেবল তার অর্জনের ইতিহাস নয়। তার সহ্য করার ইতিহাসও বটে।
কত রাত সে নিঃশব্দে পার করেছে, কেউ জানে না।
কতবার নিজের চোখের জল নিজেই মুছে আবার সবার সামনে দাঁড়িয়েছে, তার হিসাব নেই।
কতবার মনে হয়েছে আর পারবে না, অথচ পরদিন সকালে আবার উঠে দাঁড়িয়েছে, সে খবর কোথাও ছাপা হয়নি।
কিন্তু মানুষের জীবনের সবচেয়ে জরুরি সংবাদগুলো প্রায় কখনোই সংবাদপত্রে জায়গা পায় না।
একজন মানুষ রাতে একা কাঁদে, আর সকালে স্বাভাবিক মুখে কাজে যায়, এটাও একটা সংবাদ।
একজন মা নিজের ভয় লুকিয়ে সন্তানের সামনে হাসেন, এটাও একটা সংবাদ।
একজন বৃদ্ধ বহু কিছু হারানোর পরও সকালে জানালা খুলে আকাশ দেখেন, এটাও একটা সংবাদ।
একজন ব্যর্থ মানুষ নিজের সব পরাজয় সঙ্গে নিয়ে আরেকটি আবেদনপত্র লেখেন, এটাও একটা সংবাদ।
মানুষের আসল বীরত্ব প্রায়ই মঞ্চে ঘটে না।
তা ঘটে নিঃশব্দ ঘরে।
নিভু নিভু আলোয়।
একলা বিছানায়।
এমন এক সকালে, যখন কেউ জানে না গত রাতটা পার করতে তাকে কতটা শক্তি ব্যয় করতে হয়েছে।
এই কারণেই মানুষের ভেতরের অন্ধকারকে অবহেলা করা যায় না।
প্রত্যেকের জীবনে এমন কিছু দরজা থাকে, যার সামনে সে একা দাঁড়ায়। সেখানে অন্য কেউ পুরোপুরি ঢুকতে পারে না। কিছু বেদনা ভাষায় ধরা যায় না। কিছু বিচ্ছেদ ব্যাখ্যাতীত থেকে যায়। কিছু অপমানের কোনো প্রতিকার নেই। কিছু প্রশ্নের কোনো জবাব আসে না।
তখন মানুষ মুখোমুখি হয় নিজের ভেতরের নীরবতার।
সেই নীরবতা কখনো কখনো ভয়ংকর হয়ে ওঠে। মনে হয়, পৃথিবী যেন হঠাৎ তার সব শব্দ হারিয়ে ফেলেছে। চেনা মানুষগুলো দূরে সরে গেছে। ভবিষ্যৎ দাঁড়িয়ে আছে একটা বন্ধ দেয়ালের মতো। অতীত ফিরে আসতে চায়, বর্তমান সহ্য হয় না, আর ভবিষ্যৎ কল্পনা করাই কঠিন মনে হয়।
কিন্তু মানুষের অনুভূতি অনেক সময় বাস্তবের চেয়ে অনেক দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়।
যে মুহূর্তে মনে হয় সব শেষ, সেই মুহূর্তটি আসলে একটি মুহূর্তই। জীবন নয়।
দুঃখের সময় এই পার্থক্যটুকু আমরা ভুলে যাই।
একটি রাত কখনো গোটা জীবন নয়। একটি ব্যর্থতা সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। একটি বিচ্ছেদ সমগ্র পৃথিবী নয়। একজন মানুষের প্রত্যাখ্যান আমাদের অস্তিত্বের চূড়ান্ত রায় নয়।
সময়ের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। সে কোনো অনুমতির অপেক্ষা না করেই বদল নিয়ে আসে।
আজ যে দুঃখ অসহনীয় মনে হয়, সময় তা মুছে দেবেই এমন নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু সময় তাকে অন্যভাবে দেখতে শেখাতে পারে। আজ যে ক্ষত রক্তাক্ত, একদিন হয়তো তার ওপর জমবে স্মৃতির পাতলা এক আস্তরণ। স্পর্শ করলে তখনও ব্যথা লাগবে, কিন্তু সেই ব্যথা আর আগের মতো জীবনকে দখল করে রাখবে না।
তাই মানুষের আরোগ্য মানে বিস্মৃতি নয়।
আরোগ্য মানে কখনো কখনো ব্যথাকে সঙ্গী করেই হাঁটতে শেখা।
যে মানুষটি একদিন ভেঙে পড়েছিল, সে হয়তো পরে বুঝতে পারে, নিজের অচেনা একটা শক্তিই তাকে সেদিন ধরে রেখেছিল।
আমরা নিজেদের শক্তি নিয়ে প্রায়ই ভুল ধারণা পুষে রাখি। সুখের দিনে মানুষ নিজের শক্তি সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানে না। শক্তির আসল পরিচয় মেলে বিপদের দিনে, যখন চেনা আশ্রয়গুলো একে একে সরে যেতে থাকে, আর মানুষ নিজের ভেতরে এমন কিছুর দেখা পায় যা আগে কখনো দেখেনি।
অনেকটা বীজের মতো।
বীজের ভেতরে যে গাছটি লুকিয়ে থাকে, বাইরে থেকে তা দেখা যায় না। মাটির নিচে অন্ধকার। সেখানে আকাশ নেই, আলো নেই। তবু বীজ একদিন ভেঙে যায়, আর সেই ভাঙনই তার জন্মের শুরু।
মানুষের কিছু ভাঙনও তেমনই।
সব ভাঙন ধ্বংসের নয়।
কিছু ভাঙন জন্মেরও।
কিছু পরাজয় খুলে দেয় নতুন পরিচয়ের দরজা। কিছু বিচ্ছেদ মানুষকে ফিরিয়ে আনে নিজের কাছে। কিছু একাকিত্ব শেখায়, অন্যের ভালোবাসা পাওয়ার আগে নিজের অস্তিত্বকে নিজেরই স্বীকার করে নিতে হয়।
জীবন তাই শুধু আমাদের যা দিয়েছে তার গল্প নয়। জীবন যা কেড়ে নিয়ে আমাদের নতুন করে দেখতে শিখিয়েছে, সেটাও তার গল্পের অংশ।
এই পৃথিবীতে কেউ সম্পূর্ণভাবে জয়ী নয়। সাফল্যের চূড়ায় দাঁড়িয়েও মানুষ ভয় পায়। প্রাচুর্যের মধ্যেও একা হয়ে যায়। খ্যাতির ভিড়ে একটা হৃদয় নিঃসঙ্গ থেকে যেতে পারে। আবার নিঃস্ব মানুষের ঘরেও এমন হাসি দেখা যায়, যার তুলনা পৃথিবীর কোনো প্রাসাদেও মেলে না।
তাই জীবনের মূল্য মাপার জন্য বাইরের কোনো মাপকাঠি যথেষ্ট নয়।
একজন মানুষের ব্যাংক হিসাব তার স্বপ্নের গভীরতা জানে না।
তার পদবি জানে না তার চোখের জলের ইতিহাস।
তার পোশাক জানে না তার একাকিত্ব।
তার সামাজিক পরিচয় জানে না তার ভেতরের যুদ্ধ।
মানুষকে সত্যিকারের বোঝার জন্য তার নীরবতার কাছে যেতে হয়। আর সেই নীরবতার কাছে গেলে টের পাওয়া যায়, প্রত্যেকেই আসলে কোনো না কোনোভাবে বেঁচে থাকার জন্য লড়ছে।
কেউ অর্থের জন্য।
কেউ সম্মানের জন্য।
কেউ পরিবারের জন্য।
কেউ একটা অসমাপ্ত স্বপ্নের জন্য।
কেউ শুধু আগামীকাল পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য।
এই শেষ মানুষটির লড়াইও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং কখনো কখনো এটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় লড়াই।
কারণ বেঁচে থাকা সবসময় আনন্দের সিদ্ধান্ত নয়। কখনো তা সাহসের সিদ্ধান্ত, কখনো ধৈর্যের। কখনো তা কেবল এই বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে যে, আজকের অনুভূতিই জীবনের শেষ কথা নয়।
মানুষের ভেতরের আলো তাই সূর্যের মতো নিশ্চিত নয়। সূর্য ডুবলে আমরা জানি সে আবার উঠবে, কিন্তু মানুষের আলো সম্পর্কে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাকে কখনো নিজের হাতেই রক্ষা করতে হয়। কখনো অন্যের ভালোবাসা দিয়ে জ্বালিয়ে রাখতে হয়। কখনো একটা বই, একটা গান, একটা স্মৃতি, একটা প্রার্থনা, একটা বন্ধুত্ব, একটা শিশুর মুখ, একটা স্বপ্ন কিংবা কোনো অদৃশ্য বিশ্বাসই সেই আলোকে বাঁচিয়ে রাখে।
এই আলো হতে পারে বড় ক্ষীণ। কিন্তু ক্ষীণ আলোও অন্ধকারের বিরুদ্ধে একটা ঘোষণা।
তাই হয়তো মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার আশা নয়, বরং আশার দিকে বারবার ফিরে যাওয়ার ক্ষমতা। আশা সবসময় আনন্দময় নয়। কখনো সে ভীষণ ক্লান্ত। ধীরে হাঁটে। জানে না কোথায় গিয়ে থামবে। তবু হাঁটে।
এই হাঁটার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক গভীর নৈতিক সৌন্দর্য।
কারণ মানুষ যখন কেবল নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্যও বাঁচতে শেখে, তখন তার জীবন ব্যক্তিগত গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। বাবা বাঁচেন সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য। মা সন্তানের মুখ দেখে ভুলে যান নিজের ক্লান্তি। শিক্ষক গড়ে তোলেন অচেনা এক ছাত্রের আগামী দিন। লেখক লেখেন এমন এক পাঠকের জন্য, যার সঙ্গে তার হয়তো কোনোদিন দেখাই হবে না।
তখন মানুষ নিজের জীবনের সীমানা ছাড়িয়ে হয়ে ওঠে আরও বড় এক জীবনের অংশ।
সম্ভবত এটাই সভ্যতার আসল রহস্য।
আমরা প্রত্যেকেই একদিন চলে যাব, কিন্তু আমাদের কিছু কাজ থেকে যাবে অন্যের জীবনে। একটা ভালো কথা। একটা শিক্ষা। একটা বই। একটা গান। একটা ভালোবাসা। একটা ক্ষমা। একটুখানি সাহস। একটা হাত, যা কোনো অন্ধকার মুহূর্তে ধরে রেখেছিল আরেকজনের হাত।
এই সামান্য জিনিসগুলোই বোধহয় মানুষের অস্তিত্বকে মৃত্যুর পরও কিছুটা প্রলম্বিত করে।
কারণ মানুষ কেবল শরীর নিয়ে পৃথিবীতে থাকে না। সে থাকে স্মৃতির ভেতর। থাকে অন্য কারও বদলে যাওয়া জীবনে। থাকে অচেনা কোনো ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তে।
আমরা হয়তো কখনো জানবই না, আমাদের একটা ছোট্ট কাজ কারও জীবনে কতটা বড় অর্থ বয়ে এনেছিল। একটা বাক্য হয়তো কোনো তরুণকে ফিরিয়ে দিয়েছিল তার স্বপ্নের কাছে। একটা ক্ষমা হয়তো বাঁচিয়ে দিয়েছিল একটা সম্পর্ক। একটা বিশ্বাস হয়তো কাউকে শিখিয়েছিল নিজের ওপর আবার আস্থা রাখতে।
এই অদৃশ্য প্রভাবগুলোই মানুষের জীবনের সবচেয়ে গভীর উত্তরাধিকার।
তাই বেঁচে থাকা মানে কেবল নিজের গল্প চালিয়ে যাওয়া নয়। কখনো কখনো অন্যের গল্পে একটা অর্থবহ বাক্য হয়ে ওঠাও বেঁচে থাকা।
জীবনের চূড়ান্ত অর্থ হয়তো কেউই জানে না। দর্শন শত শতাব্দী ধরে সেই উত্তর খুঁজে চলেছে। ধর্ম দিয়েছে তার নিজস্ব ভাষায় উত্তর। বিজ্ঞান উন্মোচন করেছে জগতের বস্তুগত রহস্য। সাহিত্য তাকিয়েছে মানুষের অন্তরের গহনে। তবু মানুষ আজও প্রশ্ন করে, আমি কেন এখানে?
সম্ভবত এই প্রশ্নের একটিমাত্র উত্তর নেই।
হয়তো জীবন নিজেই তৈরি করে নেয় তার উত্তর।
একটা শিশু জন্ম নেয়, আর তার সঙ্গে জন্ম নেয় একটা নতুন অর্থ। কেউ ভালোবাসে, আর সেই ভালোবাসার ভেতরেই জেগে ওঠে নতুন অর্থ। কেউ সৃষ্টি করে, আর সৃষ্টির মধ্যে রেখে যায় নিজের অস্তিত্বের একটা অংশ। কেউ অন্যের দুঃখ লাঘব করে, আর সেই মুহূর্তে পৃথিবী একটুখানি ভালো হয়ে ওঠে।
হয়তো জীবনের অর্থ কোনো দূরের সত্য নয়।
হয়তো অর্থ তৈরি করে নিতে হয়। প্রতিদিন। ছোট ছোট কাজে। ছোট ছোট সিদ্ধান্তে।
মানুষ যখন বলে, \"আমি এখনও চেষ্টা করব\", তখন সে কেবল নিজের জীবনকে নয়, সম্ভাবনাকেও একটা সুযোগ দেয়।
এই কারণেই বেঁচে থাকা আসলে একটা দার্শনিক অবস্থান।
এটা বলা যে, পৃথিবী অসম্পূর্ণ, তবু আমি তার অংশ হতে চাই। এটা বলা যে, আমি সব উত্তর জানি না, তবু প্রশ্ন করা থামাব না। এটা বলা যে, আমি সবকিছু হারাতে পারি, তবু ভালোবাসার সামর্থ্যটুকু পুরোপুরি নষ্ট হতে দেব না। এটা বলা যে, আমার গল্পে অন্ধকার আছে, কিন্তু অন্ধকারই আমার শেষ পরিচয় নয়।
শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই এগিয়ে চলেছি একই নদীর দিকে। কারও নৌকা বড়, কারও ছোট। কারও যাত্রা শান্ত, কারও পথ ঝড়ে ঢাকা। কেউ তীরে পৌঁছানোর আগেই অনেকটা পথ পাড়ি দেয়, কেউ থেমে যায় অল্প পথেই। কিন্তু নদী সবার জন্যই বহন করে একই সত্য।
সময় থামে না।
তাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটা এই নয় যে, কতদূর গিয়েছি। বরং প্রশ্নটা হলো, এই মুহূর্তে কীভাবে হাঁটছি।
আমি কি এখনও মানুষের দিকে তাকিয়ে মমতা অনুভব করতে পারি? আমি কি এখনও নতুন কোনো সকালকে স্বাগত জানাতে পারি? আমি কি এখনও একটা অসম্ভব স্বপ্নের জন্য একটুখানি জায়গা রেখে দিয়েছি? আমি কি এখনও নিজের ভেতরের আলোটুকু আগলে রাখতে পারি?
উত্তরটা যদি সামান্যও হ্যাঁ হয়, তাহলে গল্প এখনও শেষ হয়নি।
কারণ মানুষের গল্প কখনো শুধু তার সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় দিয়েই লেখা হয় না। একটা বইয়ের মাঝখানে কয়েকটা কালো পাতা থাকতেই পারে, তাতে বইটা শেষ হয়ে যায় না। পরের পাতাটা তখনও সাদা থাকতে পারে। সেখানে কী লেখা হবে, তা এখনও অজানা।
এই অজানাই জীবনকে সহনীয় করে তোলে।
এই অজানাই জীবনকে সুন্দর করে।
এই অজানাই মানুষকে আবার হাঁটিয়ে নিয়ে যায় ভোরের দিকে।
তাই পৃথিবী যখন অসহনীয় মনে হয়, তখন হয়তো গোটা পৃথিবীটাকে একসঙ্গে বাঁচানোর দরকার নেই। কখনো শুধু পরের মুহূর্তটুকু পার হওয়াই যথেষ্ট। তারপর পরের সকাল। তারপর আরেকটা দিন।
জীবন সবসময় বড় কোনো লাফ চায় না। কখনো তার দরকার শুধু একটা ছোট্ট পদক্ষেপ। একটা দরজা খোলা। একটা ফোন করা। কারও কাছে ফিরে যাওয়া। কারও বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা ধরা। থেমে থাকা কোনো কাজ আবার শুরু করা। অথবা নিঃশব্দে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা, যতক্ষণ না আকাশের রং বদলায়।
কারণ আকাশ বদলায়। সময় বদলায়। মানুষ বদলায়। দুঃখের চেহারাও বদলে যায় সময়ের সঙ্গে।
আর সবচেয়ে জরুরি কথা, মানুষ নিজেকেও বদলাতে পারে।
হয়তো এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল। আজ আমরা যেমন, আগামীকাল ঠিক তেমনই থাকতে বাধ্য নই। নতুন করে শেখা যায়। নতুন করে ভালোবাসা যায়। নতুন করে বিশ্বাস করা যায়। নতুন করে শুরু করা যায়।
জীবনের প্রতি আস্থা রাখার অর্থ এই নয় যে জীবন আমাদের প্রতি দয়ালু হবে। এর অর্থ বরং এই যে, জীবন কঠিন হলেও তার ভেতরে অর্থ গড়ে তোলার ক্ষমতা আমাদের এখনো আছে।
অন্ধকার থাকবে, কিন্তু আলোও থাকবে। ক্ষতি থাকবে, কিন্তু প্রাপ্তিও থাকবে। বিদায় থাকবে, কিন্তু কোনো কোনো বিদায়ের পরে নতুন আগমনও অপেক্ষা করে থাকে। কান্না থাকবে, কিন্তু কোনো এক অপ্রত্যাশিত সকালে হাসিও ফিরে আসতে পারে।
আর যতক্ষণ এই \"পারে\" শব্দটা মানুষের ভাষায় বেঁচে আছে, ততক্ষণ মানুষ পুরোপুরি পরাজিত নয়।
কারণ সম্ভাবনা কখনো জোরে গলায় কথা বলে না। সে শুধু অপেক্ষা করে। একটা দরজার ওপারে। একটা ভোরের ঠিক আগে। একটা অন্ধকার ঘরের জানালায়। কোনো ক্লান্ত হৃদয়ের গহিনে, যেখানে সব যুক্তি ফুরিয়ে যাওয়ার পরও একটা ক্ষীণ বিশ্বাস টিকে থাকে।
আমি এখনও আছি।
আমি এখনও অনুভব করি।
আমি এখনও স্বপ্ন দেখতে পারি।
আমি এখনও ভালোবাসতে পারি।
আমি এখনও আগামীকালকে ফিরিয়ে দিইনি।
আর হয়তো মানুষের গোটা ইতিহাসকে যদি এক বাক্যে লিখতে হয়, তাহলে এটুকুই যথেষ্ট।
সে পড়ে গেছে, কিন্তু উঠে দাঁড়িয়েছে। সে কেঁদেছে, কিন্তু আবার হেসেছে। সে হারিয়েছে, কিন্তু আবার খুঁজেছে। সে ভেঙেছে, কিন্তু নিজেকে আবার গড়ে তুলেছে। সে মৃত্যুকে চিনেছে, তবু মুখ ফিরিয়েছে জীবনের দিকেই।
কারণ মানুষের গভীরে শেষ পর্যন্ত একটা আলো টিকে থাকে।
সেই আলো কখনো সূর্যের মতো উজ্জ্বল নয়, কখনো একটা তারার মতোই ক্ষীণ, কখনো প্রায় অদৃশ্য। তবু সে থাকে।
আর যতক্ষণ সেই আলো টিকে থাকে, ততক্ষণ কোনো রাতই সম্পূর্ণ রাত নয়। ততক্ষণ কোনো গল্পই একেবারে শেষ নয়। ততক্ষণ মানুষের সামনে একটা সকাল অপেক্ষা করে থাকে, হয়তো অনেক দূরে, হয়তো একদম কাছেই।
কিন্তু কোথাও না কোথাও, অন্ধকারের ওপারে, একটা আলো জ্বলছেই।
আর সেই আলোর দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়ার নামই বোধহয় জীবন।


















