নদী থামে না
মানুষের মন পরিবর্তনের এক কথাসাহিত্যিক অভিযাত্রা
রেজুয়ান আহম্মেদ
শীতের শেষ রাতগুলোতে নদীকে দেখে মনে হয়, সে ঘুমিয়ে আছে। অথচ নদী কখনো ঘুমায় না। অন্ধকারের নিচে তার জল সরে যায়, তীরের মাটি ভাঙে, দূরের কোনো ঘাটে নৌকার দড়ি ঢিলে হয়ে আসে। চাঁদ না থাকলেও জলের ভেতর অদৃশ্য এক আলো নড়তে থাকে।
সেদিন রাতেও নদী চলছিল। শহরের সব আলো নিভে যাওয়ার পর পুরোনো ফেরিঘাটের পাশে একা দাঁড়িয়ে ছিল আরিন। তার হাতে বাবার কাঠের বাক্স। ভেতরে কয়েকটি চিঠি, একটি মরচে ধরা ঘড়ি, তিনটি পুরোনো ছবি আর একটি ছোট নীল খাতা। খাতার প্রথম পাতায় বাবার হাতে লেখা ছিল একটিমাত্র বাক্য: “নিজেকে যে মানুষ মনে করো, সে মানুষটি আসলে কে, তা একদিন জেনে নিও।”
বাক্যটি আরিন বহুবার পড়েছে। তবু সেই রাতেই প্রথমবার তার মনে হলো, মানুষ নিজের সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি ভুল করে ঠিক তখনই, যখন ভাবে সে নিজেকে চেনে।
বাবার মৃত্যুর তিন মাস পেরিয়ে গেছে। এই তিন মাস বাড়ির প্রতিটি ঘর তার কাছে একই সঙ্গে চেনা আর অচেনা ঠেকেছে। রান্নাঘরের দেয়ালের পুরোনো ঘড়িটা এখনো সাড়ে সাতটায় থেমে আছে। উঠোনের আমগাছের নিচে পড়ে আছে বাবার কাঠের চেয়ার। মা মারা যাওয়ার পর বাবা ওই চেয়ারে বসেই বিকেল কাটাতেন। ছোটবেলায় আরিন ভাবত, বুড়ো মানুষ এক জায়গায় বসে থাকলেই বুড়িয়ে যায়। এখন সে বোঝে, মানুষ কখনো কখনো এক জায়গায় বসে থেকেও ভেতরে ভেতরে এক জীবন থেকে আরেক জীবনে চলে যায়।
বাবার সঙ্গে তার সম্পর্ক কখনো সহজ ছিল না। ঘৃণাও ছিল না। ছিল এমন এক দূরত্ব, যার নাম সে অনেক বছর জানত না। বাবার কঠিন মুখ, কম কথা, ভুল করলে লম্বা নীরবতা, মাঝে মাঝে অকারণ রাগ, এসব দেখে ছেলেবেলাতেই আরিন একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছে গিয়েছিল: বাবা তাকে বোঝেন না। সময়ের সঙ্গে সিদ্ধান্তটা এত শক্ত হয়ে বসল যে বাবার প্রতিটি আচরণ সে ওই সিদ্ধান্তের ভেতর দিয়েই দেখতে শুরু করল।
বাবা তখন অসুস্থ, হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে আছেন। একদিন তিনি বললেন, “তুই এখনো ভাবিস, আমি তোকে বুঝিনি।”
আরিন অবাক হলো।
“আপনি বুঝতেন?”
বাবা হাসলেন। তাঁর মুখের চামড়া তখন খুব পাতলা, চোখের নিচে গাঢ় ছায়া।
“মানুষ সব সময় বুঝতে পারে না। কিন্তু না-পারা আর না-চাওয়া এক জিনিস নয়।”
আরিন কোনো উত্তর দেয়নি। সে ভাবত, উত্তর না দিলে কথাটা ওখানেই শেষ হয়ে যায়। সেদিনও হয়নি। কয়েক সপ্তাহ পর বাবা মারা গেলেন, আর কথাটা রয়ে গেল।
সেই রাতে নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে আরিন বুঝল, কিছু কথা মৃত্যুর পরও মানুষের ভেতরে বেঁচে থাকে। স্মৃতি মৃত মানুষকে ফিরিয়ে আনে না। ফিরিয়ে আনে তার সঙ্গে নিজের সম্পর্কের নতুন একটা অর্থ।
তারপর ধীরে ধীরে আরিনের জীবন বদলাতে শুরু করল। কিন্তু সেই বদল কোনো একটি দিনের ঘটনা নয়। একটি দুপুর, একটি পুরোনো চিঠি, একজন অচেনা মানুষের প্রশ্ন, একটি ভাঙা সেতু, হাসপাতালের গন্ধ, একটি মেয়ের নীরবতা, একটি যুদ্ধের ছবি, একটি শিশুর কান্না। এমন অসংখ্য ছোট ঘটনা তার পুরোনো বিশ্বাসের দেয়ালে একটু একটু করে চিড় ধরিয়েছিল।
সে বুঝতে পারল, মানুষের মন কোনো ঘর নয় যে দরজা বন্ধ করে চাবি তুলে রাখা যায়। মন একটি নদী। একই তীরে দাঁড়িয়ে থাকলেও তার জল বদলে যায়। মানুষও বদলায়, আর অনেক সময় টেরই পায় না কখন বদলে গেছে।
এই গল্প সেই বদলে যাওয়ার।
এ কোনো তত্ত্বের বই নয়। এ কয়েকজন মানুষের জীবনের গল্প, তাদের ভুল, ভয়, ভালোবাসা, লজ্জা, অপরাধবোধ, প্রতিরোধ, স্মৃতি আর ক্ষমার ভেতর দিয়ে বলা। কারণ মানুষের মনকে বাইরে থেকে যতটা বোঝা যায়, ভেতর থেকে দেখলে তার চেয়ে অনেক বেশি দেখা যায়।
আরিনের বয়স তখন সাত। বাড়ির সামনের রাস্তা বর্ষায় কাদায় ডুবে যেত, শীতে উড়ত ধুলোর মেঘ। বাড়ির পেছনে সরু একটি খাল, খালের ওপারে বাঁশঝাড়, তারও ওপারে নদী। কিন্তু সাত বছর বয়সের পৃথিবী এত দূর পর্যন্ত পৌঁছাত না। তার পৃথিবী ছিল ছোট একটি বৃত্ত: মায়ের রান্নাঘর, বাবার টেবিল, পুকুরের পাড় আর স্কুলের লাল দরজা।
মা ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে নরম মানুষ। অন্তত আরিনের তা-ই মনে হতো। মা কখনো গলা চড়িয়ে কথা বলতেন না। রাগ করলে শুধু থালা ধোয়ার শব্দটা একটু জোরে হতো, এর বেশি কিছু নয়। বাবা ছিলেন অন্যরকম। তাঁর রাগের কোনো শব্দ ছিল না। তিনি চুপ করে যেতেন, আর সেই নীরবতা আরিনের কাছে যেকোনো শাস্তির চেয়ে ভারী ঠেকত।
একদিন আরিন বাবার টেবিল থেকে লাল কালির কলম চুরি করে দেয়ালে একটা নৌকা আঁকল। নৌকার পাশে নদী, নদীর ওপর সূর্য, আর সূর্যের নিচে ছোট একটি মানুষ। বিকেলে বাবা ছবিটা দেখলেন। কিছু বললেন না। অনেকক্ষণ শুধু দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর আরিনকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “এটা কে?”
“আমি।”
“নদীতে কেন?”
“আমি নৌকা চালাই।”
বাবা একটু হাসলেন। সেই হাসির অর্থ আরিন তখন বোঝেনি। অনেক বছর পরে, যখন ভুলে যাওয়া অনেক কিছু একে একে ফিরে এল, তখন বুঝেছিল।
“নৌকা চালাতে শিখবি?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে আগে নদীর ভয়টা বুঝে নে।”
আরিন বুঝতে পারেনি। ভয় আবার শেখা যায় নাকি?
সন্ধ্যায় বাবা তাকে নিয়ে নদীর কাছে গেলেন। জোয়ার উঠছিল, ফুলে ওঠা জল তীর ছুঁয়ে যাচ্ছিল। বাবা বললেন, “জলে নামার আগে জলের দিকে তাকাতে হয়। জলকে ছোট ভাবলে জল তোকে ছোট করে দেবে।”
আরিন বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মনে হয়েছিল, বাবা পৃথিবীর সবকিছু জানেন।
সাত বছর বয়সে বাবাকে সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষ ভাবাটাই স্বাভাবিক ছিল। দশ বছরে সেই বিশ্বাসে প্রথম চিড় ধরল। বারোয় চিড়টা বড় হলো। পনেরোয় পৌঁছে আরিন নিশ্চিত হয়ে গেল, তার বাবা অনেক কিছুই বোঝেন না।
সেদিন স্কুলে এক শিক্ষক একটি ছাত্রকে অন্যায়ভাবে শাস্তি দিয়েছিলেন। ছেলেটি গরিব, তাই তার কথা কেউ শোনেনি। বাড়ি ফিরে আরিন বাবাকে বলল, “বড়রা সব সময় ঠিক কথা বলে না।”
“সত্যি,” বাবা বললেন।
আরিন অবাক হলো। “তাহলে আপনিও ভুল করতে পারেন?”
“সবাই পারে।”
“আপনিও?”
“বিশেষ করে আমি।”
উত্তরটা আরিনের ভালো লাগেনি। সে তখন এমন একজন বাবা চাইছিল, যিনি কখনো ভুল করেন না। অনেক পরে সে বুঝেছিল, প্রিয় মানুষকে আমরা প্রায়ই মানুষ হিসেবে দেখি না, দেবতার মতো দেখতে চাই। তারপর একদিন তাদের ভুল চোখে পড়লে ভাবি, মানুষটা বদলে গেছে। আসলে সে বদলায়নি। বদলেছে আমাদের চোখ।
কৈশোরে আরিন বাবার সঙ্গে তর্ক করত, কলেজে গিয়ে আরও বেশি। শহরে সে নতুন বই পড়ল, নতুন মানুষ চিনল, ইতিহাসের অন্য একটা ভাষা শুনল। সমাজ নিয়ে এমন কথা শুনল, যা তাদের বাড়িতে কখনো উচ্চারিত হয়নি। সে আবিষ্কার করল, তার পরিবার যে সত্যকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়, পৃথিবীর অন্য কোনো পরিবার সেই সত্যকেই প্রশ্ন করতে পারে।
তার পুরোনো বিশ্বাসের দরজায় প্রথম কড়া নাড়ল কোনো দার্শনিকের বই নয়। নাড়ল একটি মেয়ের প্রশ্ন। মেয়েটির নাম মেঘ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগারে একদিন মেঘ বলল, “তুমি সবকিছুর উত্তর এত নিশ্চিতভাবে দাও কেন?”
“আমি নিশ্চিতভাবে দিই নাকি?”
“দাও।”
“কীভাবে বুঝলে?”
মেঘ বই বন্ধ করে তার দিকে তাকাল। “কারণ তুমি প্রশ্ন শুনে আগে উত্তর বানাও, প্রশ্নটা নিয়ে ভাবো তার পরে।”
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে আরিন অনেকক্ষণ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, মেয়েটি ভুল বলেছে। কিন্তু পরদিন কথাটা আবার মনে পড়ল। তার পরের দিনও। এক সপ্তাহ পর সে খেয়াল করল, কোনো বন্ধু কিছু জিজ্ঞেস করলেই সে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিয়ে দেয়। জবাবটা ঠিক কি না, সেটা ভাবে পরে।
তার অস্বস্তি হলো।
নিজের ভেতরে সে একটা সরু ফাটল দেখতে পেল। সেই ফাটল দিয়ে আলোও আসছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে আরিন প্রথমবার একা ভ্রমণে বেরোল। গন্তব্য পাহাড়ি ছোট একটি শহর, যেখানে সন্ধ্যার পর কুয়াশা নামত আর রাস্তার বাতিগুলো দূর থেকে কাগজের লণ্ঠনের মতো দেখাত।
স্টেশনে এক বৃদ্ধের সঙ্গে তার দেখা হলো। তিনি চা বিক্রি করতেন। চা খেতে খেতে আরিন বলল, “এই শহরটা খুব শান্ত।”
বৃদ্ধ হাসলেন। “শান্ত?”
“হ্যাঁ।”
“তুমি নতুন এসেছ, তাই শান্ত লাগছে।”
“আপনার কাছে?”
“আমার কাছে এই শহর নদীর মতো। রোজ একই রকম, অথচ একটুও একই রকম নয়।”
আরিন কথাটা লিখে রাখল। এত বছর পরে এই সরল বাক্যটাই যে তার নিজের জীবনকে ব্যাখ্যা করবে, তা তখন তার জানার কথা ছিল না।
দুদিন পর বৃষ্টিতে পাহাড়ি রাস্তা বন্ধ হয়ে গেল। বাস ফিরতে পারল না, আরিনকে আরও একটা দিন থেকে যেতে হলো। সে শহরের পাশের নদীটার ধারে গেল। নদী চওড়া নয়, কিন্তু স্রোত তীব্র। পাথরের ওপর বসে থাকতে থাকতে তার বাবার কথা মনে পড়ল: জলের দিকে তাকাতে হয়।
হঠাৎ তার মনে হলো, মানুষ নদীর মতোই। নিজের পুরোনো রূপটাকে আঁকড়ে রাখতে চাইলেও জলের মতো কিছু না কিছু সরে যায়। একটা শোক, একটা প্রেম, একটা অপমান, একটা ক্ষমা, কোনো না কোনো স্রোত ভেতরের মানচিত্র বদলে দেয়।
ফিরে এসে সে মেঘকে বলল, “একটা জিনিস বুঝেছি।”
মেঘ হেসে বলল, “কী?”
“একই জায়গায় থাকলেও মানুষ একই থাকে না।”
“তুমি এটা বুঝেছ?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে তুমি বদলেছ।”
“কীভাবে বুঝলে?”
মেঘ সরাসরি উত্তর দিল না। শুধু বলল, “যে মানুষ সত্যিই বদলায়, সে সাধারণত প্রথমে টের পায় না যে বদলে গেছে।”
তাদের সম্পর্কও তখন বদলাচ্ছিল। প্রথমে বই নিয়ে কথা, তারপর শহর নিয়ে, তারপর পরিবার, তারপর ভয়। এক রাতে মেঘ বলল, “ছোটবেলায় আমি অন্ধকারকে ভয় পেতাম। এখন পাই না। এখন ভয় পাই একা থাকার কথা ভাবলে।”
“অন্ধকার তো একই আছে,” আরিন বলল।
“মানুষটা বদলেছে।”
সেদিন সন্ধ্যায় নদীর ধার ধরে হাঁটতে হাঁটতে তারা একটা পরিত্যক্ত ঘাটে পৌঁছাল। সেখানে একটি শিশু জলে পাথর ছুড়ছিল। প্রতিটি পাথর জলে পড়ে গোল গোল ঢেউ তুলছিল। আরিন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাবল, একটা ছোট ঘটনা কত দূর পর্যন্ত যায়, আমরা কখনো জানতে পারি না। একটা কথাও তেমনই। আজ একটা বাক্য শোনা হয়, দশ বছর পরে তার অর্থ বদলে গিয়ে সে ফিরে আসে।
মেঘ জিজ্ঞেস করল, “তুমি কখনো ভাবো, যে মানুষটি হতে চেয়েছিলে, সে এখনো তোমার ভেতরে আছে?”
“জানি না।”
“‘জানি না’ বলার অভ্যাস করো।”
“কেন?”
“কারণ না-জানার জায়গা না থাকলে নতুন কিছু ঢুকতে পারে না।”
কথাটা সেদিন আরিনের কাছে নিছক একটা সুন্দর বাক্য ছিল। একদিন যে এটাই হয়ে দাঁড়াবে তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন পাঠ, তা সে তখনো জানত না।
মায়ের মৃত্যুর পর বাবার আচরণ বদলে গিয়েছিল। আরিন তখন কলেজে, বাবার সঙ্গে যোগাযোগ আরও কমে গেল। ফোন করলে বাবা শুধু জিজ্ঞেস করতেন, “খেয়েছিস?”
আরিন রেগে যেত। “আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন না?”
“কী জিজ্ঞেস করব?”
“আমার পড়াশোনা, আমার কাজ, আমি কেমন আছি।”
বাবা চুপ করে থাকতেন।
আরিনের মনে হতো, বাবা তার জীবনের প্রতি উদাসীন। এই ধারণা ধীরে ধীরে সত্যের মতো শক্ত হয়ে উঠল। যত বড় হলো, বাবার প্রতি তার ক্ষোভও তত স্পষ্ট হলো। একদিন সে বন্ধু তানভীরকে বলল, “আমার বাবা কখনো আমাকে বুঝতে চাননি।”
তানভীর বলল, “তুই কি কখনো তাঁকে বোঝার চেষ্টা করেছিস?”
আরিন হাসল। “আমি কেন করব? উনি বাবা।”
“সে জন্যই।”
“তুই আবার দর্শন শুরু করলি?”
“না,” তানভীর বলল। “শুধু একটা কথা বললাম।”
আরিন শুনেও শুনল না।
তারপর একবার ছুটিতে বাড়ি গিয়ে বাবার পুরোনো আলমারি গোছাতে বসে সে একটা নোটবুক পেল। তার পাতায় আরিনের শৈশবের ছোট ছোট ঘটনার তারিখ লেখা। কোথায় সে প্রথম সাঁতার শিখেছিল, কবে প্রথম পরীক্ষায় ফেল করেছিল, কোন দিন জ্বর এসেছিল। এক পাতায় লেখা, “আজ আরিন আমার ওপর রাগ করেছে। আমি কথা বলিনি। হয়তো চুপ থাকা উচিত হয়নি।”
আরিন পাতা বন্ধ করে বসে রইল।
পুরোনো একটা ধারণা তার ভেতরে কেঁপে উঠল। কিন্তু সে সঙ্গে সঙ্গে তা মেনে নিল না। প্রথমে ভাবল, বাবা হয়তো তাকে দেখানোর জন্যই এসব লিখে রেখেছিলেন। পরক্ষণেই সন্দেহটা তার নিজের কাছেই হাস্যকর লাগল।
তবু সে নোটবুকটা আবার খুলল।
এক জায়গায় লেখা, “ছেলেটা ভাবে আমি কঠোর। আমি আসলে ভয় পাই। ওকে হারানোর ভয়।”
আরিনের বুকের ভেতর কোথাও যেন একটা শব্দ হলো।
সে উঠে জানালার কাছে গেল। বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছে। তার মনে হলো, এতগুলো বছর বাবাকে সে যে আলোয় দেখেছে, সেখানে ছিল শুধু তার কৈশোরের রাগ। বাবার ভয়, ব্যর্থতা, অনিশ্চয়তা, এসবের দিকে সে কখনো তাকায়নি।
পুরোনো ধারণাটা অবশ্য পুরোপুরি ভেঙে পড়ল না। বরং তার পাশে আরেকটা সত্য এসে জায়গা করে নিল। বাবা ভুল করেছিলেন। বাবা তাকে আঘাতও করেছিলেন। কিন্তু সেই মানুষটাই একই সঙ্গে তাকে ভালোবেসেছিলেন।
দুটি সত্য একসঙ্গে থাকতে পারে, এই উপলব্ধি তাকে অনেক দিন অস্বস্তিতে রাখল। এতদিন সে মানুষকে দেখেছে সাদা অথবা কালো রঙে। এখন তার সামনে এসে দাঁড়াল এক ধূসর অঞ্চল। সেখানে বিচার কঠিন, কিন্তু মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা যায়।
সেই রাতে সে নোটবুকটা বুকে চেপে ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে উঠে দেখল, তার মনের ভেতর বাবার মুখ বদলে গেছে।
বাবা বদলাননি। আরিনের স্মৃতিই বাবার অর্থ বদলে দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে আরিন একটি পত্রিকায় কাজ পেল। শহরের ব্যস্ততা প্রথমে তাকে আনন্দ দিয়েছিল। নতুন অফিস, নতুন সহকর্মী, নতুন দায়িত্ব। কয়েক মাস পর সে বুঝল, মুখের ভিড়ের মধ্যেও মানুষ কতটা একা থাকতে পারে।
প্রতিদিন সে খবর লিখত। কারও মৃত্যু, কারও চাকরি হারানো, কারও ঘর ভাঙা, কারও বিয়ে, কারও ব্যবসা। প্রতিটি ঘটনার পেছনে একটা পুরো মানুষের জীবন থাকত, কিন্তু কাগজে তা কয়েকটি অনুচ্ছেদে এসে ঠেকত।
একদিন তাকে পাঠানো হলো কারখানার শ্রমিক বস্তিতে। আগুনে কয়েকটি ঘর পুড়ে গেছে। সেখানে এক কিশোরী তার ছোট ভাইকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আরিন জিজ্ঞেস করল, “তোমাদের ঘর পুরোটাই পুড়ে গেছে?”
“হ্যাঁ।”
“এখন কোথায় থাকবে?”
“জানি না।”
উত্তরটা সে লিখে নিল। কিন্তু ফেরার পথে গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হলো, “জানি না” কথাটার ভেতরে কত বিশাল একটা ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে।
মানুষ নিশ্চয়তা চায়। চাকরি হবে কি না, প্রিয় মানুষটা থাকবে কি না, বাবা বাঁচবেন কি না, সন্তান কেমন হবে, রোগ সারবে কি না। অথচ জীবন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় না।
যে রাতে বাবার অসুস্থতার খবর এল, আরিন অফিসে বসে একটা রাজনৈতিক প্রতিবেদন লিখছিল। ফোন ধরে প্রথমে সে কিছুই বলতে পারেনি। তারপর হাসপাতালের করিডরে ছুটতে ছুটতে তার মনে হলো, এত জরুরি সংবাদ লিখেও জীবনের সবচেয়ে জরুরি বিষয়টার কোনো ভাষা সে জানে না।
হাসপাতালে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, “ভয় পাচ্ছিস?”
আরিন মাথা নাড়ল।
“ভালো। ভয় থাকলে মানুষ বোঝে, সে বেঁচে আছে।”
“আপনি কি মরতে ভয় পান?”
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। “আমি অসমাপ্ত থাকতে ভয় পাই।”
“সবাই তো অসমাপ্তই থাকে।”
“তাই তো।”
বাবা চোখ বন্ধ করলেন।
সেদিনই আরিন প্রথম বুঝল, মানুষ শুধু মৃত্যুকে ভয় পায় না, অর্থহীনতাকেও ভয় পায়। সে জানতে চায়, তার বেঁচে থাকা কী রেখে গেল। সে নিজের সিদ্ধান্তগুলোর দিকে ফিরে তাকায়। কোনটা সত্যি ছিল, কোনটা অভ্যাস, কোনটা ভয় থেকে নেওয়া, কোনটা ভালোবাসার জন্য।
বাবার মৃত্যুর পর আরিন যেন একটা অদৃশ্য পরিচয় হারাল। সে শুধু বাবাকে হারায়নি, হারিয়েছিল এমন একটি সম্পর্ক, যার ভেতর দিয়ে বহু বছর ধরে সে নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছিল। নিজের জীবনকে নতুন করে দেখতে গিয়ে সে বুঝল, স্বাধীনতা যতটা আনন্দের, ততটাই ভয়ংকর। কারণ এখন থেকে সিদ্ধান্তের দায় শুধু তার।
সে চাকরি ছেড়ে দিল। সবাই বলল, “এটা পাগলামি।”
“হয়তো,” আরিন বলল।
তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, “কী করবে?”
সে জানত না। কিন্তু এই না-জানাই তার সামনে নতুন একটা দরজা খুলে দিয়েছিল।
চাকরি ছাড়ার পর আরিন কিছুদিন একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করল। সেখানে একটি পুরোনো প্রকল্পের অর্থনৈতিক অনিয়মের খবর সামনে এল। তার বন্ধু তানভীর ওই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিল। নথিপত্র দেখে আরিন বুঝল, তানভীর ভুল করেছে। কিন্তু ভুলটা যত বড়, বন্ধুত্বের প্রশ্নটাও তত বড়।
তানভীর বলল, “আমি নিজের জন্য টাকা নিইনি।”
“তাহলে?”
“একজন কর্মীর চিকিৎসা করাতে হয়েছিল। অনুমতি ছিল না। আমি নিয়ম ভেঙেছি।”
আরিন চুপ করে রইল।
“তুই রিপোর্টে লিখবি?”
আরিন উত্তর দিল না।
সে নিজেকে সব সময় সৎ মানুষ হিসেবে দেখে এসেছে। কিন্তু এবার তার সততার সঙ্গে বন্ধুত্বের সংঘর্ষ বাধল। সে ভাবল, তানভীরের কাজ ভুল। একই সঙ্গে সে জানত, নিয়মের অক্ষর মেনে চললে একজন অসুস্থ মানুষ হয়তো চিকিৎসাই পেত না।
রাতে সে কাগজের সামনে বসে রইল। তার মাথার ভেতর দুটো কণ্ঠ লড়ছিল। একটা বলছিল, আইন সবার জন্য এক। অন্যটা বলছিল, মানুষের জীবন সব সময় নিয়মের অক্ষরে ধরা যায় না।
সকালে সে রিপোর্টে লিখল, নিয়ম ভাঙা হয়েছে। সঙ্গে ভাঙার কারণটাও লিখল।
পরদিন কর্তৃপক্ষ তাকে ডেকে বলল, “আপনি বন্ধুকে বাঁচাতে চাইছেন।”
“আমি কাউকে বাঁচাচ্ছি না,” আরিন বলল। “পুরো ঘটনাটা লিখছি।”
“আপনি কি নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারবেন?”
“আমি এখনো সেটা নিয়ে ভাবছি।”
বাড়ি ফিরে সে আয়নায় নিজের দিকে তাকাল। বহু বছর ধরে নিজেকে সে যে সৎ, নীতিবান, যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে দেখে এসেছে, সেই ছবিটা কেঁপে উঠেছে। এখন হয় নিজের কাজের নতুন একটা অর্থ খুঁজতে হবে, নয়তো পুরোনো ছবিটা ভেঙে ফেলতে হবে।
পরের কয়েক দিন সে নিজের সিদ্ধান্ত রক্ষার জন্য নানা যুক্তি দাঁড় করাল। বলল, সে আসলে মানবিকতার পক্ষে দাঁড়িয়েছে। আবার অন্য সময় ভাবল, বন্ধুত্বের টানেই হয়তো সে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
শেষ পর্যন্ত সে বুঝল, নিজের উদ্দেশ্যকে এক শব্দে নাম দেওয়া যায় না। সত্যি কথা হলো, সে তানভীরকে বাঁচাতেও চেয়েছিল, আবার সত্যটা লুকোতেও চায়নি। মানুষের ভেতরের সিদ্ধান্ত এত পরিষ্কার হয় না।
এই স্বীকারোক্তি তাকে স্বস্তি দেয়নি, বরং আরও অস্বস্তিতে ফেলেছিল। কিন্তু সেই অস্বস্তির ভেতর দিয়েই প্রথমবার সে নিজের গড়া নৈতিক প্রতিমাটাকে মানুষ হিসেবে দেখতে শিখল।
আরিন আর মেঘের সম্পর্ক তখন দূরত্বে এসে ঠেকেছে। দুজনেই জানত, তারা একে অন্যকে ভালোবাসে। তবু মেঘ বিদেশে গবেষণার সুযোগ পেল। আরিন যেতে চাইল না। সে বলল, “আমি এই শহরেই থাকতে চাই।”
“কেন?”
“আমার কাজ আছে।”
“কাজ বদলানো যায়।”
“আমি বদলাতে চাই না।”
“নাকি হারানোর ভয় আছে?”
আরিন উত্তর দিল না।
মেঘ চলে গেল। যাওয়ার আগে শুধু বলল, “তুমি যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছ, তার সঙ্গে থাকতে পারবে তো?”
বিমানবন্দরের বাইরে দাঁড়িয়ে আরিন বলল, “পারব।”
কয়েক মাস পর সে মেঘের পাঠানো ছবি দেখত। সমুদ্রের তীরে দাঁড়ানো মানুষ, নতুন শহর, নতুন জীবন। মাঝে মাঝে তার মনে হতো, সে ভুল করেছে। তারপর নিজেকে বোঝাত, না, ঠিকই করেছে। একটু পরেই সেই যুক্তির উল্টোটাই সত্যি মনে হতো।
মানুষ যে পথে হাঁটে, কিছুদিন পর সেই পথের ভালো দিকগুলো তার চোখে বড় হয়ে ওঠে। না-নেওয়া পথেরও ভালো দিক থাকে, কিন্তু সেগুলো ধীরে ধীরে কল্পনায় মিলিয়ে যায়। আরিনও তা-ই করছিল। নিজের বেছে নেওয়া জীবনের প্রতিটি ছোট সুবিধাকে সে বড় করে দেখছিল। একা থাকা যেন স্বাধীনতা। মেঘকে ধরে না রাখা যেন আত্মসম্মান। শহর না ছাড়া যেন দায়িত্ব।
এক রাতে মেঘ ফোন করল। দীর্ঘ নীরবতার পর বলল, “তুমি কি সুখী?”
আরিন জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল, “আমি ভালো আছি।”
“আমি জিজ্ঞেস করিনি তুমি ভালো আছ কি না। জিজ্ঞেস করেছি সুখী কি না।”
আরিন চুপ করে গেল।
মেঘ বলল, “আমাদের সবচেয়ে কঠিন কাজ বোধহয় নিজের সিদ্ধান্তকে নিজের কাছেই সত্যি রাখা।”
ফোন কেটে যাওয়ার পর আরিন অনেকক্ষণ বসে রইল। সে বুঝেছিল, সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মানুষ শুধু জীবন বদলায় না, নিজের স্মৃতিও নতুন করে সাজাতে শুরু করে। যে ভুল তাকে কষ্ট দেয়, তার নাম দেয় প্রয়োজন। যাকে হারিয়েছে, তাকে বলে অসংগতি। যে ভয় তাকে থামিয়েছে, তাকে বলে নীতি।
কখনো এই ব্যাখ্যা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। কখনো আবার সত্যকে দূরে সরিয়ে দেয়।
শহরের এক ছোট ক্যাফেতে সালেহ সাহেবের সঙ্গে আরিনের দেখা হলো। তিনি অবসরপ্রাপ্ত মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক। আরিন একটা লেখার জন্য তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিল। কথার ফাঁকে সালেহ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল কোনটাকে মনে করেন?”
“বাবাকে বুঝতে না পারা,” আরিন বলল।
“কীভাবে বুঝলেন?”
“তাঁর মৃত্যুর পরে।”
“আর তার আগে?”
“ভাবতাম, আমি ঠিক।”
সালেহ সাহেব হাসলেন। “মানুষ নিজের কাছে সবচেয়ে ভালো গল্পকার।”
আরিন মুচকি হেসে বলল, “নিজের সঙ্গেও?”
“বিশেষ করে নিজের সঙ্গে।”
সেদিন তিনি কোনো তত্ত্ব বোঝাননি। শুধু একটা গল্প বলেছিলেন। এক ব্যক্তি বহু বছর পর স্বীকার করেছিল, সে অন্যায় করেছে। কিন্তু স্বীকারোক্তির মাঝখানে সে বারবার বলছিল, পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করেছিল। সালেহ সাহেব বললেন, “সে ক্ষমা চাইছিল, নাকি নিজের পক্ষে মামলা লড়ছিল, আমি বুঝতে পারছিলাম না।”
“মানুষ কীভাবে বুঝবে?” আরিন জিজ্ঞেস করল।
“যেখানে তার নিজের ব্যাখ্যা সবচেয়ে সুবিধাজনক, সেখানেই একটু থামতে হবে।”
আরিন কথাটা লিখে রাখল।
কয়েক বছর পর বাবার একটা চিঠি পড়ে সে বুঝল, নিজের সম্পর্কে সে যে গল্প বানিয়েছে, তার অনেকটাই অসম্পূর্ণ। সে বলত, বাবা তাকে সময় দেননি। অথচ চিঠিতে বাবার একটা লাইন ছিল: “তোর পরীক্ষার আগের রাতে তুই বলেছিলি, আমার জেগে থাকার দরকার নেই। আমি তবু সারারাত তোর দরজার বাইরে বসেছিলাম, যদি তোর কিছু লাগে।”
আরিন কাঁদল না। চুপ করে বসে রইল।
মানুষের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা চোখে দেখা যায় না। সে নিজেকে খারাপ মানুষ ভাবতে চায় না। তাই নিজের ভুলের চারপাশে এমন একটা ব্যাখ্যা বানায়, যেখানে সে এখনো নির্দোষ। কিন্তু সব ব্যাখ্যা মিথ্যা নয়। কেউ সত্যিই বাধ্য হতে পারে, কেউ হতে পারে পরিস্থিতির শিকার। আসল প্রশ্ন হলো, ব্যাখ্যাটা সত্যকে জায়গা দিচ্ছে, নাকি নিজের সুবিধামতো কেটেছেঁটে সাজাচ্ছে।
প্রথমবার আরিন এই প্রশ্ন নিয়ে নিজের জীবনের দিকে তাকাল। মেঘকে হারানোর গল্পে সে শুধু নিজের সাহসের কথা বলেছে। বাবার সঙ্গে দূরত্বকে দেখেছে শুধু বাবার ব্যর্থতা হিসেবে। তানভীরের পাশে দাঁড়ানোর ঘটনায় বলেছে নিজের মানবিকতার কথা। প্রতিটি গল্পে তার নিজের অংশটাই ছিল সবচেয়ে পরিষ্কার।
অন্ধকার ছিল অন্য কোথাও।
সে সেখানে আলো ফেলতে শুরু করল।
একটি সাহিত্য উৎসবে আরিনকে নিজের একটি প্রবন্ধ পড়তে বলা হলো। প্রবন্ধে সে এক রাজনৈতিক নেতার সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছিল। অনুষ্ঠানের পর এক বৃদ্ধ পাঠক এসে বললেন, “আপনার লেখা ভালো। কিন্তু একটা জায়গায় আপনি ভুল করেছেন।”
আরিন সঙ্গে সঙ্গে বলল, “কোথায়?”
বৃদ্ধ একটা কাগজ বের করলেন। তাতে একটি তারিখ। আরিন নিজের নোট মিলিয়ে দেখল, সত্যিই ভুল হয়েছে।
প্রথমে সে বলতে চাইল, “ওটা টাইপের ভুল।” তারপর থেমে গেল।
“আপনি ঠিক বলেছেন। আমি ভুল করেছি।”
বৃদ্ধ হাসলেন। “বলাটা কঠিন ছিল?”
আরিনও হাসল। “ছিল।”
“এখন কেমন লাগছে?”
“হালকা।”
“মানুষ কখনো কখনো সত্যের চেয়ে নিজের অহংকারকে বেশি রক্ষা করে,” বৃদ্ধ বললেন।
সেদিন থেকে আরিন নিজের লেখা পড়ার সময় একটা নতুন অভ্যাস গড়ে তুলল। সে আর পছন্দের জায়গাগুলো খুঁজত না, খুঁজত দুর্বল জায়গাগুলো। প্রথমে এতে তার অস্বস্তি হতো। পরে সে বুঝল, বিশ্বাস বদলানো মানে সব বিশ্বাস ফেলে দেওয়া নয়। নতুন প্রমাণ এলে পুরোনো ধারণাটাকে যাচাই করে দেখাই বিশ্বাস বদলানো।
একদিন তানভীর এসে বলল, “তুই আগের মতো তর্ক করিস না।”
“বদলেছি।”
“নরম হয়ে গেছিস?”
“না। শুধু সব কথায় নিজেকে জিততে হয় না।”
“তাহলে তুই হারতে শিখেছিস?”
আরিন হাসল। “হয়তো শুনতে শিখেছি।”
এই পরিবর্তন এসেছিল ধীরে ধীরে। তার ভেতরে কোনো নাটকীয় ঘোষণা ছিল না, ছিল ছোট ছোট সংশোধন। আজ একটা মত বদলানো, কাল একটা কথা ফিরিয়ে নেওয়া, পরদিন কোনো পুরোনো অভ্যাসের জায়গায় নতুন আচরণ। মানুষের মন নরম মাটির মতো নয়, আবার পাথরও নয়। একটু একটু করে চাপ, অভ্যাস আর অভিজ্ঞতা তাকে বদলায়।
সেই সময় আরিন এমন একটা ভাষা শিখতে শুরু করল, যা ছোটবেলায় শেখার সুযোগ হয়নি। নতুন শব্দ মুখস্থ করতে করতে সে টের পেল, তার মস্তিষ্ক যেন রোজ একটু একটু করে পথ তৈরি করছে। প্রথমে জড়তা, তারপর পরিচয়, শেষে স্বাভাবিকতা। শব্দগুলো আর আলাদা আলাদা পড়ে থাকছে না, বাক্যের ভেতর নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে।
তার মনে হলো, মানুষ বদলাতে পারে কারণ তার ভেতরে পথ বদলানোর ক্ষমতা আছে। রোজকার অনুশীলন, পুনরাবৃত্তি, নতুন অভিজ্ঞতা, পরিবেশের বদল, সব মিলিয়ে ভেতরের কাজের ধরনটাই বদলে যেতে থাকে।
এই সত্য যে একদিন তার জীবনের গভীরতম ক্ষতের সঙ্গে জড়িয়ে যাবে, তা তখনো সে জানত না।
ভাষা শেখার কয়েক মাস পর আরিন লক্ষ করল, তার মাথার ভেতর কিছু শব্দ আর আগের মতো নেই। আগে বিদেশি ভাষার একটা বাক্য শুনলে সে শব্দগুলো আলাদা করে ধরত। এখন অর্থটা একসঙ্গে এসে দাঁড়ায়। নতুন শব্দের সঙ্গে পুরোনো শব্দের সম্পর্ক তৈরি হয়। ভুল করলে লজ্জা লাগে, আবার সেই ভুলটা মনেও থাকে। পরেরবার সে সাবধান হয়।
একদিন সে সালেহ সাহেবকে বলল, “মনে হচ্ছে মাথার ভেতর কিছু একটা বদলাচ্ছে।”
“বদলাচ্ছে,” সালেহ সাহেব বললেন। “আর তুমি সেটা টের পাচ্ছ।”
“মস্তিষ্কও কি অভ্যাসের মতো বদলায়?”
“মানুষের অভিজ্ঞতা মস্তিষ্ককে স্পর্শ না করে থাকে না।”
তিনি লম্বা বক্তৃতা দিলেন না। তার বদলে একটা সহজ কাজ দিলেন। রোজ নতুন কোনো দক্ষতা অনুশীলন করতে বললেন। আরিন বাঁশি শেখা শুরু করল। প্রথম সপ্তাহে একটা সুরও ঠিকমতো বাজল না। ঠোঁট ব্যথা করত, মাথা ঝিমঝিম করত। বিরক্ত হয়ে সে বাঁশিটা টেবিলে ছুড়ে ফেলত। পরদিন আবার তুলে নিত।
তিন মাস পর এক সন্ধ্যায় জানালার পাশে বসে সে খুব সরল একটা সুর বাজাতে পারল। সুরটা শেষ হওয়ার পর নিজের কানকেই তার বিশ্বাস হচ্ছিল না।
সে বুঝল, মানুষের ভেতরে নতুন পথ তৈরি হতে সময় লাগে। শুধু চাইলেই হয় না। লাগে কাজের পুনরাবৃত্তি, লাগে ভুল, ধৈর্য আর পরিবেশ। কোনো কিছু বারবার করতে করতে শরীর আর মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত সহযোগিতা গড়ে ওঠে।
এই উপলব্ধি তার জীবনের একটা বড় ভুল ধারণা বদলে দিল। আগে সে ভাবত, মানুষ মূলত যেমন, তেমনই থাকে; পরিস্থিতি তাকে শুধু ভিন্নভাবে আচরণ করায়। এখন সে বুঝল, আচরণও ভেতরের কাঠামো বদলে দিতে পারে।
তার নিজের জীবনেই এর প্রমাণ ছিল। যে ছেলে একসময় বাবার সঙ্গে কথা না বলে দিনের পর দিন কাটাতে পারত, সে এখন বাবার পুরোনো চিঠিগুলো পড়ে। যে মানুষ ভুল স্বীকার করতে লজ্জা পেত, সে নিজের লেখা ছিঁড়ে ফেলে আবার নতুন করে লিখতে শিখেছে। যে যুবক ভালোবাসাকে দুর্বলতা ভাবত, সে এখন বোঝে, কাউকে ভালোবাসা মানে নিজের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড়ানোও।
মস্তিষ্কের পথ চোখে দেখা যায় না, কিন্তু আচরণের বদল তার ছায়া ফেলে। পুরোনো অভ্যাসের জায়গায় নতুন অভ্যাস এসে দাঁড়ালে জীবনও একটু অন্যরকম হয়ে ওঠে।
এক রাতে আরিন বাঁশি হাতে বসে ছিল। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। হঠাৎ তার মনে হলো, বহু বছর আগে তৈরি হওয়া তার ভেতরের কিছু রাস্তা এখন আর আগের মতো ব্যস্ত নয়। অন্য কোথাও নতুন চলাচল শুরু হয়েছে।
সামনে কী আসছে, সে জানত না। শুধু এটুকু বুঝেছিল, পরিবর্তন কেবল চিন্তার ভাষায় ঘটে না। শরীরের ভেতরেও তার নীরব ইতিহাস লেখা হয়ে চলে।
বাবার মৃত্যুর দুই বছর পর একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। এক বিকেলে পুরোনো বাড়ির রান্নাঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে আরিন একটা টিনের বাক্স খুলল। ভেতরে শুকনো লবঙ্গ আর দারুচিনি। ঢাকনা খোলার সঙ্গে সঙ্গে একটা গন্ধ বেরিয়ে এল।
আরিন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে পড়ল, সাত বছর বয়সে শীতের সকালে মা দুধে দারুচিনি দিয়ে চা বানাতেন। পাশের ঘর থেকে শোনা যেত বাবার কাশি। জানালার কাচে কুয়াশা জমে থাকত। আর সে মেঝেতে বসে লাল খাতায় আঁকিবুঁকি করত।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সে যেন সেই ঘরেই ফিরে গেল। মায়ের হাত, কেরোসিনের গন্ধ, বাবার কাশির শব্দ, শীতের আলো, সব একসঙ্গে।
সে রান্নাঘরের মেঝেতে বসে পড়ল।
তখন তার মনে হলো, স্মৃতি কোনো বন্ধ আলমারি নয়, যেখানে অতীত নিঃশব্দে পড়ে থাকে। কোনো গন্ধ, শব্দ, গান, রাস্তা বা মুখ কখনো হঠাৎ করে দরজা খুলে দেয়। বর্তমান মুহূর্তের ভেতর অতীত ঢুকে পড়ে।
মেঘ চলে যাওয়ার পর বহু বছর সে একটা বিশেষ গান শোনেনি। এক রাতে গাড়িতে বসে থাকতে থাকতে রেডিওতে সেই গানটাই বেজে উঠল। সে গাড়ি থামিয়ে দিল। গানের সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এল একটা বৃষ্টিভেজা বিকেল, মেঘের ভেজা চুল, ফুটপাতের চায়ের দোকান, আর একটা অসমাপ্ত কথোপকথন।
সে অবাক হয়ে দেখল, মেঘকে সে যতটা ভুলে গেছে বলে ভাবত, ততটা ভোলেনি। স্মৃতির অন্য দরজাগুলো শুধু বন্ধ ছিল। ঠিক শব্দটা এসে সেই দরজা খুলে দিল।
তারপর সে নিজের অনেক পুরোনো আচরণের অর্থ খুঁজতে শুরু করল। নতুন কোনো সম্পর্ক গড়ে উঠলে সে কেন সন্দেহ করত? কেউ উত্তর দিতে দেরি করলে কেন ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠত? কাউকে কাছে আসতে দেখলে কেন মনে হতো, একদিন আবার তাকে হারাতে হবে?
উত্তরগুলো তাকে শৈশবের দিকে নিয়ে যেত। মায়ের অসুস্থতা, বাবার নীরবতা, হঠাৎ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হওয়া এক আত্মীয়, স্কুলের এক বন্ধুর প্রতারণা। এইসব ছোট-বড় অভিজ্ঞতা তার ভেতরে কিছু প্রত্যাশা গড়ে দিয়েছিল। সেগুলো কোথায় তৈরি হয়েছে, সে সব সময় বুঝতে পারেনি। কিন্তু নতুন মানুষের আচরণে সে পুরোনো সংকেত খুঁজে পেয়েছে।
একদিন এক তরুণ সহকর্মী তাকে বলল, “স্যার, আপনি কখনো আমাকে বিশ্বাস করেন না।”
আরিন থমকে গেল।
“কেন মনে হলো?”
“আমি দেরি করলে আপনি ধরে নেন, আমি কাজ করিনি।”
আরিন কিছু বলল না। কারণ সে বুঝতে পারল, ছেলেটা সত্যিই দেরি করেছিল। কিন্তু তার নিজের প্রতিক্রিয়া ছিল প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বড়। সে যেন সামনে দাঁড়ানো ছেলেটাকে নয়, বহুদিন আগের অন্য কাউকে দেখছিল।
সেদিন রাতে সে ডায়েরিতে লিখল, “আমরা যাদের দেখি, তাদের মধ্যে অনেক সময় যারা নেই, তাদের ছায়াও দেখি।”
স্মৃতি শুধু অতীতকে ফিরিয়ে আনে না, বর্তমানের অর্থও ঠিক করে দেয়। একজন নতুন মানুষের মুখে পুরোনো একটা মুখ এসে বসে। নতুন একটা বাক্য পুরোনো অপমানের প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে। আবার নতুন কারও স্নেহ বহু বছরের অবিশ্বাসের ওপর ধীরে ধীরে জল ঢালে।
আরিন বুঝতে শুরু করেছিল, তার বর্তমান জীবন আসলে অনেক পুরোনো গল্পের সঙ্গে কথা বলে চলেছে।


















