img

অসমাপ্ত ক্যানভাস

প্রকাশিত :  ০৮:১৪, ১৪ আগষ্ট ২০২৬

অসমাপ্ত ক্যানভাস

রেজুয়ান আহম্মেদ

মানুষের সবচেয়ে বড় রহস্য তার জীবন নয়, তার চেতনা। জন্মের মুহূর্তে একটি শিশু জানে না সে কে। তার কোনো পদবি নেই, সামাজিক পরিচয় নেই, ব্যাংক হিসাব নেই, সাফল্যের ইতিহাসও নেই। অথচ তার চোখে এমন এক বিস্ময় থাকে, যার সামনে পৃথিবীর সমস্ত অর্জন কখনো কখনো খুব ছোট মনে হয়।

ধীরে ধীরে সমাজ তাকে একটি নাম দেয়। নামের সঙ্গে আসে পরিবার, পরিবারের সঙ্গে প্রত্যাশা, প্রত্যাশার সঙ্গে শিক্ষা, শিক্ষার সঙ্গে প্রতিযোগিতা, আর প্রতিযোগিতার সঙ্গে সাফল্য ও ব্যর্থতা। একদিন মানুষ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারে, যে মানুষটি হওয়ার স্বপ্ন সে দেখেছিল, সে আর সেই মানুষটি নেই। সে হয়ে উঠেছে অন্যদের প্রত্যাশার সমষ্টি।

কেউ তাকে সফল বলেছে, তাই সে সফল হতে চেয়েছে। কেউ তাকে ব্যর্থ বলেছে, তাই নিজের চোখেও সে ব্যর্থ হয়ে উঠেছে। কেউ তাকে ভালোবাসেনি, তাই নিজের মধ্যে ভালোবাসার যোগ্যতা খুঁজে পায়নি। কেউ তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তাই একসময় সে নিজের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।

অথচ মানুষের ভেতরে এমন একটি অঞ্চল আছে, যেখানে পৃথিবীর কোনো প্রশংসা পৌঁছায় না এবং কোনো অপমান স্থায়ী হতে পারে না। সেই অঞ্চলটির নাম চেতনা। সেখানে মানুষ একা। কিন্তু সেই একাকিত্বই তার প্রথম স্বাধীনতা।

অর্ক সেই স্বাধীনতার অর্থ বুঝেছিল জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়ে। তার আগে সে ভাবত, মানুষের মূল্য নির্ধারিত হয় তার অর্জনে। পরে বুঝেছিল, মানুষকে বড় করে তার অর্জন নয়, বরং পতনের পর আবার উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা।

অর্কের শহরটির নাম ছিল শৈলপুর। শহর বলা হয়তো একটু বাড়িয়ে বলা। পাহাড়ের পাদদেশে কয়েক হাজার মানুষের বসতি, একটি পুরোনো বাজার, একটি সরকারি কলেজ, দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি হাসপাতাল এবং পাহাড়ের গায়ে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি গ্রাম নিয়েই শৈলপুরের অস্তিত্ব।

শীতকালে এখানে সকাল নামে ধীরে। পাহাড় থেকে নেমে আসা কুয়াশা রাস্তা ঢেকে রাখে। বিকেলে সূর্য খুব দ্রুত পশ্চিমে চলে যায়। রাতে আকাশে এত তারা দেখা যায় যে শহরের মানুষ মাঝে মাঝে ভুলে যায়, পৃথিবী আসলে কত বড়।

অর্ক এই শহরেই বড় হয়েছিল। তার বাবা ছিলেন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক, মা ছিলেন গৃহিণী। পরিবারটি দরিদ্র ছিল না, আবার স্বচ্ছলও ছিল না।

অর্ক ছোটবেলা থেকেই বই পড়ত। তার বাবা বলতেন, জীবনে বড় হতে চাইলে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করলেই হবে না, মানুষের ভেতরটা পড়তে শিখতে হবে।

অর্ক তখন কথাটির অর্থ বুঝত না। তার কাছে বড় হওয়া মানেই ছিল বড় চাকরি।

শেষ পর্যন্ত তার সেই বড় চাকরি হলো। এল বড় পদ, বড় বাড়ি, বড় গাড়ি, সম্মান এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতি। কিন্তু ততদিনে তার বাবা আর বেঁচে নেই।

মৃত্যুর কয়েক দিন আগে বাবা অর্ককে বলেছিলেন,

“তুই অনেক দূর যাবি। শুধু একটা কথা মনে রাখিস। মানুষের হাততালি যেন তোর নিজের কণ্ঠস্বরকে ঢেকে না দেয়।”

অর্ক হেসে বলেছিল,

“বাবা, তুমি এত চিন্তা করছ কেন?”

বাবা জানালার বাইরে তাকিয়ে ধীরে বলেছিলেন,

“কারণ মানুষ যখন নিজের কণ্ঠস্বর শুনতে পায় না, তখন সে অন্যের কণ্ঠে নিজের জীবন চালাতে শুরু করে।”

অর্ক তখনও কথাটির গভীরতা বুঝতে পারেনি। বহু বছর পরে বুঝেছিল। কিন্তু তখন তার বাবা আর ছিলেন না।

চল্লিশ বছর বয়সে অর্ক দেশের অন্যতম পরিচিত গবেষক ছিলেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সামাজিক আচরণ এবং সংকটের সময় মানসিক প্রতিক্রিয়া। বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানিত করেছিল। বিদেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তার লেখা বই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকায় স্থান পেয়েছিল।

সংবাদপত্রে তার সাক্ষাৎকার ছাপা হতো, টেলিভিশনে অনুষ্ঠান হতো। কেউ তাকে চিন্তাবিদ বলত, কেউ মনোবিজ্ঞানী, কেউ দার্শনিক।

অর্ক এসব শুনে আনন্দ পেত। কেন পেত, তা সে নিজেও জানত না। মানুষ যখন একটি পরিচয় পায়, তখন ধীরে ধীরে সেই পরিচয়টিকেই নিজের বলে মনে করতে শুরু করে।

অর্কের ঘরও তার পরিচয়ের সাক্ষী হয়ে উঠেছিল। পুরস্কারে ভরে গিয়েছিল দেয়াল, আলমারিতে জমেছিল সম্মাননা, ডেস্কের ওপর সাজানো ছিল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের স্মারক। একটি বড় কাঠের তাক জুড়ে ছিল বই।

একদিন মেঘলা বলেছিল,

“তোমার ঘরটা এখন তোমার চেয়ে তোমার পুরস্কারগুলোকে বেশি চেনে।”

অর্ক হেসেছিল।

“তুমি ঈর্ষা করছ?”

“না। ভয় পাচ্ছি।”

“কিসের?”

মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেছিল,

“তুমি যদি কোনোদিন এগুলো হারাও, তখন নিজেকে কী দিয়ে চিনবে?”

অর্ক হেসে উঠেছিল।

“মানুষ কি এত সহজে ভেঙে পড়ে?”

মেঘলা উত্তর দেয়নি। শুধু তার দিকে তাকিয়ে ছিল। সেই দৃষ্টির অর্থ অর্ক তখন বুঝতে পারেনি।

কিছু মানুষ ভবিষ্যৎ দেখতে পায় না। তারা কেবল বর্তমানের মধ্যে ভবিষ্যতের ছায়া অনুভব করে।

সেদিন সকালটিও অন্য দিনের মতোই ছিল। অর্ক ঘুম থেকে উঠে জানালা খুলেছিল। পাহাড়ের ওপর হালকা কুয়াশা। দূরে কয়েকটি পাখি উড়ছিল। মেঘলা তখন রান্নাঘরে। অর্ক কফির কাপ হাতে গবেষণাকক্ষের দিকে যাচ্ছিল।

ঠিক তখন ফোন বেজে উঠল।

সে ফোন তুলল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।

“আপনি নিশ্চিত?”

ওপাশ থেকে উত্তর এল।

“আমি এখনই আসছি।”

ফোন রেখে অর্ক স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

মেঘলা দূর থেকে জিজ্ঞেস করল,

“কী হয়েছে?”

কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর অর্ক বলল,

“প্রতিষ্ঠানে বড় সমস্যা হয়েছে।”

“কী ধরনের?”

“অর্থনৈতিক।”

“তুমি কি জড়িত?”

অর্ক তার দিকে তাকাল।

“আমি জানি না।”

সেই একটি বাক্যের মধ্যেই তার জীবনে প্রথম ফাটল তৈরি হয়েছিল।

অফিসে পৌঁছে অর্ক বুঝল, পরিস্থিতি তার ধারণার চেয়েও ভয়াবহ। বহু বছরের আর্থিক অনিয়ম সামনে এসেছে। প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা তদন্তের আওতায়। অর্কের স্বাক্ষর রয়েছে এমন কয়েকটি নথিও প্রশ্নের মুখে।

সে বলল,

“আমি এসব অনুমোদন করিনি।”

কেউ উত্তর দিল না।

একজন সহকর্মী চোখ নামিয়ে রাখল। অর্ক তার দিকে তাকিয়ে বলল,

“তুমি তো জানো আমি কীভাবে কাজ করি।”

লোকটি ধীরে বলল,

“এখন কিছু বলা ঠিক হবে না।”

অর্ক তখন বুঝল, বিপদের সময় মানুষ প্রথমে সত্যকে ভয় পায়, তারপর সম্পর্ককে, তারপর নিজের নিরাপত্তাকে।

পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে সংবাদমাধ্যমে তার নাম উঠে এল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হলো। কেউ বলল, সে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। কেউ বলল, সবকিছু সে জানত। কেউ বলল, এতদিন সে সৎ মানুষের মুখোশ পরে ছিল।

অর্ক প্রতিবাদ করল। ব্যাখ্যা দিল। নথি দেখাল। আইনি প্রক্রিয়া শুরু হলো।

কিন্তু জনমতের আদালত কখনো ধীর নয়। সেখানে বিচার দ্রুত হয়, আর প্রমাণের প্রয়োজন খুব কম। একটি গল্পই যথেষ্ট।

অর্কের বিরুদ্ধে একটি গল্প তৈরি হয়ে গেল।

তার বহু বছরের অর্জন কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সন্দেহের মধ্যে পড়ে গেল। যারা একসময় তাকে ঘিরে থাকত, তারা দূরে সরে গেল। যে সাংবাদিকরা সাক্ষাৎকার নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করত, তারা ফোন ধরল না। যে সহকর্মীরা তার সঙ্গে ছবি তুলতে গর্ব অনুভব করত, তারা এখন তার নাম উচ্চারণ করত সতর্কভাবে।

একদিন অর্ক অফিসে গিয়ে দেখল, তার কক্ষের দরজায় কোনো নাম নেই।

নামফলকটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। কাঠের ছোট্ট ফলকটি সরানোর সঙ্গে সঙ্গে যেন তার জীবনের একটি অধ্যায়ও মুছে গেল।

অর্কের সবচেয়ে বড় আঘাত অর্থনৈতিক ক্ষতি ছিল না। ছিল মানুষের পরিবর্তন।

একজন মানুষ ধনী হলে তার চারপাশে মানুষের সংখ্যা বাড়ে। কিন্তু সে পড়ে গেলে বোঝা যায়, সেই মানুষগুলো আসলে কতটা তার ছিল।

অর্কের ফোন ধীরে ধীরে নীরব হয়ে গেল। আগে প্রতিদিন অসংখ্য বার্তা আসত। এখন ফোনে কেবল সরকারি নোটিশ, আইনজীবীর খবর, ব্যাংকের সতর্কতা এবং অপরিচিত মানুষের কটু মন্তব্য।

মেঘলা তার পাশে থাকার চেষ্টা করছিল। কিন্তু অর্ক ক্রমশ অসহিষ্ণু হয়ে উঠছিল।

এক রাতে মেঘলা বলল,

“তুমি কার ওপর রাগ করছ?”

“সবার ওপর।”

“সবাই কী করেছে?”

“আমাকে ছেড়ে গেছে।”

“সবাই?”

অর্ক চুপ করে রইল।

মেঘলা বলল,

“আমি তো আছি।”

অর্ক তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল,

“তুমিও একদিন চলে যাবে।”

মেঘলা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল,

“তুমি কি জানো, সবচেয়ে কষ্টের বিষয় কী?”

অর্ক নীরব।

“তুমি এখন অন্যদের হারানোর ভয়েই এমন আচরণ করছ, যাতে যারা তোমার পাশে থাকতে চায়, তারাও একদিন চলে যেতে বাধ্য হয়।”

অর্ক কোনো উত্তর দিল না।

মেঘলা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

সেদিন রাতে অর্ক প্রথমবার নিজের আচরণকে যেন বাইরে থেকে দেখল। সে বুঝতে পারল না তার ভেতরে কী ঘটছে। শুধু অনুভব করল, নিজের চারপাশে সে অদৃশ্য একটি দেয়াল তুলছে।

তিন মাসের মধ্যে অর্কের জীবন বদলে গেল।

গাড়ি বিক্রি হলো। বাড়ির একটি অংশ বন্ধক পড়ল। গবেষণাকেন্দ্র থেকে সে সাময়িকভাবে দূরে সরে গেল। বই প্রকাশের কাজ বন্ধ হলো। কয়েকটি বক্তৃতা বাতিল হলো।

মানুষ তাকে ভুলতে শুরু করল।

একসময় যে অর্ককে ঘিরে ক্যামেরার আলো জ্বলত, সে এখন সন্ধ্যার পর একা বসে থাকত। দেয়ালে ঝোলানো পুরস্কারগুলোকে তার মনে হতো, সেগুলো যেন তাকে বিদ্রূপ করছে।

এক রাতে সে একটি পুরস্কার হাতে তুলে নিল। ধাতব ফলকের ওপর তার নাম, তারিখ এবং সম্মাননার কারণ লেখা।

অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে ফিসফিস করে বলল,

“তুমি কি এখনও আমাকে চেনো?”

কোনো উত্তর এল না।

সে পুরস্কারটি টেবিলে রেখে আরেকটি ছবি হাতে নিল। ছবিতে সে হাসছে। পাশে মেঘলা। পেছনে অনেক মানুষ।

অর্ক ভাবল, ছবির মানুষটি কি সত্যিই সে ছিল? নাকি সে ছিল কেবল সেই সময়ের একটি সামাজিক সংস্করণ?

মানুষের জীবনে এক ভয়ংকর মুহূর্ত আসে, যখন সে বুঝতে পারে, নিজের সম্পর্কে যে গল্পটি সে এতদিন বিশ্বাস করেছে, সেটি হয়তো পুরোপুরি সত্য নয়।

অর্ক সেই মুহূর্তে পৌঁছে গিয়েছিল।

শীতের এক রাতে অর্ক বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। কাউকে কিছু বলল না।

হাঁটতে হাঁটতে সে পাহাড়ের দিকে এগোল। শৈলপুরের মানুষ জানত, রাতের পর পাহাড়ে যাওয়া নিরাপদ নয়। কিন্তু অর্কের তখন নিরাপত্তার প্রতি কোনো আগ্রহ ছিল না। সে শুধু দূরে যেতে চেয়েছিল, নিজের কাছ থেকে, শহর থেকে, স্মৃতি থেকে, অপমান থেকে, মানুষের চোখ থেকে।

পাহাড়ি পথে উঠতে উঠতে কুয়াশা ঘন হয়ে এল। শ্বাস থেকে সাদা ধোঁয়া বের হচ্ছিল।

একসময় সে থেমে আকাশের দিকে তাকাল।

অসংখ্য তারা।

“আমি কোথায় ভুল করেছি?”

নীরবতা।

“আমি কি সত্যিই ব্যর্থ?”

শুধু বাতাসের শব্দ।

“আমার এত বছরের কাজ কি তাহলে অর্থহীন?”

দূরে কোথাও একটি পাথর গড়িয়ে পড়ার শব্দ হলো।

অর্ক চোখ বন্ধ করল।

তার মনে হলো, মহাবিশ্বের কাছে মানুষের দুঃখের কোনো বিশেষ মর্যাদা নেই। একটি মানুষের হৃদয় ভেঙে গেলে নক্ষত্রের গতি বদলায় না। কেউ চাকরি হারালে চাঁদ তার আলো কমায় না। কেউ প্রিয় মানুষ হারালে নদীর স্রোত থেমে যায় না।

প্রকৃতি নির্বিকার।

এই নির্বিকারতা প্রথমে তাকে আতঙ্কিত করেছিল। পরে সে বুঝতে শুরু করল, এই নীরবতার মধ্যেই এক ধরনের মুক্তি আছে।

মহাবিশ্ব যদি তার জীবনের অর্থ নির্ধারণ না করে, তবে সেই অর্থ তাকে নিজেকেই নির্মাণ করতে হবে।

উপলব্ধিটি তখনও সম্পূর্ণ হয়নি। কিন্তু বীজটি সেদিনই মাটিতে পড়েছিল।

পাহাড়ের ভেতরে আরও কিছুদূর যাওয়ার পর অর্ক একটি শব্দ শুনল।

টক।

তারপর বিরতি।

টক।

আবার বিরতি।

টক।

সে থেমে গেল।

এত রাতে পাহাড়ে কেউ পাথর কাটছে?

শব্দের দিকে এগোতেই কুয়াশার মধ্যে ক্ষীণ একটি আলো দেখা গেল। আগুনের পাশে বসে ছিলেন একজন বৃদ্ধ। চুল সাদা, দাড়ি লম্বা, গায়ে পুরোনো পশমি চাদর। সামনে বিশাল কালো ব্যাসল্ট শিলা। এক হাতে হাতুড়ি, অন্য হাতে ছেনি।

অর্ক কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখল।

বৃদ্ধ তার দিকে তাকালেন। চোখে বিস্ময় নেই, প্রশ্নও নেই।

শুধু বললেন,

“এসো।”

অর্ক এগিয়ে গেল।

“আপনি এখানে একা থাকেন?”

“হ্যাঁ।”

“কতদিন?”

“যতদিন প্রয়োজন।”

“কার প্রয়োজন?”

বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।

“যে প্রশ্নের উত্তর নিজের কাছে নেই, সে প্রশ্নের উত্তর অন্যের কাছে খুঁজতে গেলে মানুষ আরও দূরে চলে যায়।”

অর্ক চুপ করে রইল।

বৃদ্ধ আবার পাথরে আঘাত করলেন।

টক।

অর্ক বলল,

“আপনি কী বানাচ্ছেন?”

“একজন মানুষ।”

অর্ক অবাক হলো।

“পাথর দিয়ে মানুষ?”

“হ্যাঁ।”

“কোথায় মানুষ?”

বৃদ্ধ পাথরের দিকে তাকালেন।

“এখনও বের হয়নি।”

অর্ক বসে পড়ল।

“আপনি কি ভাস্কর?”

“ছিলাম।”

“এখন?”

“এখন আমি পাথরের সঙ্গে কথা বলি।”

“পাথর কথা বলে?”

“মানুষের মতো নয়।”

“তাহলে?”

“সে প্রতিরোধ করে।”

অর্ক বুঝতে পারল না।

বৃদ্ধ বললেন,

“যে জায়গায় আঘাত করলে পাথর সাড়া দেয়, সেখানে সে জানায়, তুমি সঠিক জায়গায় এসেছ। আর যেখানে আঘাত করলে শুধু শব্দ হয়, সেখানে সে বলে, তুমি এখনও তাকে বোঝোনি।”

অর্ক পাথরের দিকে তাকাল।

“এটার ভেতরে কী আছে?”

বৃদ্ধ বললেন,

“আমি জানি না।”

“তাহলে কীভাবে বানাবেন?”

“আমি বানাচ্ছি না।”

“তাহলে?”

“আমি সরাচ্ছি।”

“কী?”

বৃদ্ধ তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“যা প্রয়োজন নেই।”

অর্কের বুকের মধ্যে অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো।

বৃদ্ধ বললেন,

“মানুষও পাথরের মতো।”

অর্ক মৃদু হাসল।

“আমার বর্তমান অবস্থার সঙ্গে এই তুলনাটা বেশ মানানসই।”

বৃদ্ধ তার দিকে তাকালেন।

“তোমার জীবনে কী ঘটেছে?”

অর্ক অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,

“আমি সব হারিয়েছি।”

“সব?”

“প্রায়।”

“কী কী?”

অর্ক একে একে বলতে লাগল, “কাজ, সম্মান, অর্থ, বন্ধু, পরিচিতি, ভবিষ্যৎ।”

তারপর ধীরে বলল,

“নিজেকেও।”

বৃদ্ধ হাতুড়ি নামিয়ে রাখলেন।

“এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা।”

অর্ক তাকাল।

“কী?”

“তুমি যা হারিয়েছ, তার তালিকায় নিজেকেও রেখেছ।”

“আমি নিজেকে হারিয়েছি।”

“না।”

“কীভাবে?”

“যে মানুষ হারিয়ে যায়, সে এই প্রশ্ন করতে পারে না।”

অর্ক স্তব্ধ হয়ে রইল।

বৃদ্ধ বললেন,

“তোমার পরিচয়ের একটি সংস্করণ ভেঙেছে। তুমি পুরোপুরি ভাঙোনি।”

বৃদ্ধের নাম ছিল নিরঞ্জন।

তিনি অর্ককে কোনো ধর্মের কথা বললেন না, কোনো দর্শনের বইয়ের নাম করলেন না, কোনো মতবাদও চাপিয়ে দিলেন না। তিনি শুধু প্রশ্ন করতেন।

“তুমি কেন দুঃখী?”

“কারণ আমি সব হারিয়েছি।”

“কী হারিয়েছ?”

“যা আমার ছিল।”

“সত্যিই তোমার কী ছিল?”

অর্ক থেমে গেল।

“আমার কাজ।”

“কাজ কি তোমার জন্মের সময় তোমার সঙ্গে এসেছিল?”

“না।”

“তাহলে?”

“আমি অর্জন করেছি।”

“অর্জন করা জিনিস হারানো সম্ভব?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে তুমি হারিয়েছ অর্জন, নিজেকে নয়।”

অর্ক বিরক্ত হলো।

“আপনি শব্দ নিয়ে খেলছেন।”

নিরঞ্জন হাসলেন।

“শব্দ মানুষকে বাঁচায়ও, আবার মারেও।”

“কীভাবে?”

“তুমি যদি বলো, আমি ব্যর্থ হয়েছি, তাহলে ব্যর্থতা একটি ঘটনা। আর যদি বলো, আমি একজন ব্যর্থ মানুষ, তাহলে তুমি ঘটনাকে পরিচয়ে পরিণত করেছ।”

অর্ক চুপ করে রইল।

নিরঞ্জন বললেন,

“জীবনের প্রথম কাজ হলো ঘটনাকে নিজের সত্তা থেকে আলাদা করতে শেখা।”

সেই রাতে অর্ক অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারেনি। নিজের জীবনের ঘটনাগুলোকে সে আলাদা করে দেখতে শুরু করল।

সে চাকরি হারিয়েছে, কিন্তু জ্ঞান হারায়নি।

সে সম্মান হারিয়েছে, কিন্তু বিবেক হারায়নি।

সে অর্থ হারিয়েছে, কিন্তু শ্রম করার ক্ষমতা এখনও আছে।

সে কিছু সম্পর্ক হারিয়েছে, কিন্তু ভালোবাসার ক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হয়নি।

সে একটি পরিচয় হারিয়েছে, কিন্তু নতুন পরিচয় তৈরি করার সম্ভাবনা এখনও রয়েছে।

তার ভেতরে যেন একটি অদৃশ্য দরজা খুলতে শুরু করল।

পরদিন ভোরে নিরঞ্জন মাটিতে পাঁচটি বৃত্ত আঁকলেন।

অর্ক জিজ্ঞেস করল,

“এগুলো কী?”

“মানুষের রূপান্তরের পাঁচটি দরজা।”

প্রথমটির নিচে লিখলেন, বিনাশ।

দ্বিতীয়টির নিচে, শূন্যতা।

তৃতীয়টির নিচে, স্বাধীনতা।

চতুর্থটির নিচে, সৃষ্টি।

পঞ্চমটির নিচে, সেবা।

অর্ক বলল,

“সব মানুষ কি এই পথ দিয়ে যায়?”

“না।”

“তাহলে?”

“যে মানুষ নিজের গভীরে নামতে সাহস করে, সে কোনো না কোনোভাবে এই দরজাগুলোর সামনে দাঁড়ায়।”

নিরঞ্জন প্রথম বৃত্তটির দিকে ইঙ্গিত করলেন।

“বিনাশ মানে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাওয়া নয়। পুরোনো ধারণার পতনও বিনাশ।”

তারপর দ্বিতীয়টির দিকে তাকিয়ে বললেন,

“শূন্যতা হলো সেই সময়, যখন পুরোনো পরিচয় চলে গেছে, কিন্তু নতুন পরিচয় এখনও জন্ম নেয়নি।”

তৃতীয়টির দিকে তাকিয়ে বললেন,

“স্বাধীনতা আসে যখন মানুষ বুঝতে পারে, পরিস্থিতি তার সব সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করতে পারে না।”

চতুর্থটি দেখিয়ে বললেন,

“সৃষ্টি তখনই শুরু হয়, যখন সে নিজের যন্ত্রণা থেকে নতুন কিছু তৈরি করতে শেখে।”

শেষ বৃত্তটির দিকে তাকিয়ে বললেন,

“সেবা আসে যখন সে বুঝতে পারে, নিজের মুক্তি কেবল নিজের জন্য নয়।”

অর্ক জিজ্ঞেস করল,

“আমি এখন কোথায়?”

নিরঞ্জন বললেন,

“তুমি শূন্যতার দরজায়।”

“তৃতীয় দরজা কখন খুলবে?”

“যখন তুমি একটি কঠিন সত্য স্বীকার করবে।”

“কোন সত্য?”

নিরঞ্জন ধীরে বললেন,

“তোমার জীবনের সব ঘটনার জন্য তুমি দায়ী নও। কিন্তু এখন থেকে সেই ঘটনাগুলোর সঙ্গে তুমি কীভাবে বাঁচবে, তার দায়িত্ব তোমার।”

অর্কের কাছে কথাটি সহজ মনে হলো। কিন্তু তার ভেতরে ছিল অসীম ভার।

অন্যকে দোষ দেওয়া মানুষকে সাময়িক শান্তি দেয়। নিজের দায়িত্ব গ্রহণ তাকে স্বাধীন করে। আর স্বাধীনতা কখনো হালকা বোঝা নয়।

কয়েক সপ্তাহ পর নিরঞ্জন অর্ককে বললেন,

“তোমাকে যেতে হবে।”

“কোথায়?”

“কালাচলে।”

অর্ক পাহাড়ের দিকে তাকাল। কালাচলের চূড়া মেঘে ঢাকা।

“আমি কেন যাব?”

“কারণ কথার সীমা আছে।”

“সেখানে কী আছে?”

“তোমার জন্য যে উত্তর অপেক্ষা করছে, তার কোনো নাম নেই।”

“আপনি কি আমার সঙ্গে যাবেন?”

নিরঞ্জন মাথা নাড়লেন।

“না।”

“কেন?”

“জীবনের কিছু পথ অন্য কেউ তোমার হয়ে হাঁটতে পারে না।”

অর্ক বলল,

“যদি আমি না পারি?”

“তাহলে পড়ে যাবে।”

“আর যদি পড়ে যাই?”

“উঠবে।”

“যদি আর উঠতে না পারি?”

নিরঞ্জন তার দিকে তাকালেন।

“তাহলে অন্তত জানতে পারবে, কোথায় পর্যন্ত গিয়েছিলে।”

অর্ক হেসে ফেলল।

সেদিন সন্ধ্যায় সে যাত্রা শুরু করল। ব্যাগে খুব বেশি কিছু ছিল না। কিছু শুকনো খাবার, একটি পানির বোতল, একটি কম্বল এবং নিরঞ্জনের দেওয়া ছোট ছেনি।

পাহাড়ের পথ যত ওপরে উঠছিল, অর্কের অতীত তত কাছে আসছিল।

সে ভেবেছিল, পাহাড়ে উঠলে হয়তো সবকিছু ভুলে যাবে। কিন্তু মানুষ নিজের কাছ থেকে পালাতে পারে না।

একটি বাঁকের পর সে থেমে গেল।

তার সামনে যেন নিজের তরুণ বয়সের ছবি দাঁড়িয়ে আছে।

সেই তরুণ অর্ক, যার চোখে স্বপ্ন। যে বিশ্বাস করত, পরিশ্রম করলে পৃথিবী অবশ্যই তাকে পুরস্কৃত করবে। ভালো কাজ করলে ভালো ফল আসবে। মানুষের প্রশংসা তার যোগ্যতার প্রমাণ।

বর্তমানের অর্ক সেই তরুণটির দিকে তাকাল।

তার মনে হলো, সে ছেলেটিকে ঘৃণা করতে পারে না। সে শুধু জানে, ছেলেটি অনেক কিছু জানত না।

জীবন তাকে শেখানোর জন্য অপেক্ষা করছিল।

অর্ক ধীরে বলল,

“তুমি ভুল করেছিলে।”

তরুণ অর্ক যেন হাসল।

“তুমিও করেছ।”

অর্ক চুপ করে রইল।

“তাহলে তুমি আমাকে কেন বিচার করছ?”

অর্কের বুক কেঁপে উঠল।

সে বুঝল, মানুষ নিজের অতীতকে বিচার করতে গিয়ে নিজেরই একটি অংশকে হত্যা করে।

চোখ বন্ধ করে সে বলল,

“আমি তোমাকে ক্ষমা করছি।”

চোখ খুললে সেখানে কেউ ছিল না। শুধু পাহাড়।

কিন্তু তার বুকের ভেতরের একটি ভার যেন কিছুটা কমে গিয়েছিল।

কালাচলের চূড়ার কাছে পৌঁছাতে পথ আরও সরু হয়ে গেল। এক পাশে পাথরের দেয়াল, অন্য পাশে গভীর খাদ।

অর্ক নিচে তাকাল না।

সে জানত, ভয়কে যত বেশি চোখে জায়গা দেওয়া হয়, ভয় তত বড় হয়ে ওঠে। কিন্তু ভয়কে অস্বীকার করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

সে নিজের কাছে বলল,

“আমি ভয় পাচ্ছি।”

কথাটি স্বীকার করার পর আশ্চর্যভাবে শরীর কিছুটা শিথিল হলো।

ভয়কে অস্বীকার করলে সে শক্তি পায়। স্বীকার করলে তাকে পর্যবেক্ষণ করা যায়।

অর্ক সামনে তাকাল।

একটি পাথরের ফাঁক। তার ওপারে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ একটি জায়গা।

লাফ দিতে হবে।

সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর হঠাৎ বুঝল, জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে এমন একটি মুহূর্ত আসে। সেখানে কেউ আপনার হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। কেউ নিশ্চয়তা দিতে পারে না। কেউ বলতে পারে না, আপনি ঠিক করছেন কি না।

সেই একাকিত্বই স্বাধীনতার মূল্য।

অর্ক গভীর শ্বাস নিল।

দৌড়ে লাফ দিল।

কয়েক মুহূর্ত তার শরীর বাতাসে ভাসল। তারপর পা পড়ল পাথরের ওপর। সে পড়ে গেল, হাত দিয়ে মাটি আঁকড়ে ধরল।

কিছুক্ষণ পর উঠে বসে হেসে ফেলল।

সে বুঝল, সাহস ভয়কে হত্যা করে না। সাহস হলো ভয়কে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত।

চূড়ায় পৌঁছানোর সময় রাত শেষ হয়ে আসছিল। আকাশ এখনও অন্ধকার, কিন্তু পূর্বদিকে হালকা নীল রেখা ফুটে উঠেছে।

অর্ক একটি পাথরের ওপর বসে পড়ল। শরীর ক্লান্ত, মুখে তুষারের দাগ, হাত কাঁপছিল। তবু মনে কোনো অভিযোগ ছিল না।

নিচে তাকালে শৈলপুর শহরটিকে ছোট্ট একটি বিন্দুর মতো মনে হলো।

সেই শহরে তার অপমান ছিল, সাফল্য ছিল, ভালোবাসা ছিল, ব্যর্থতা ছিল। সবকিছু এত ছোট দেখাচ্ছিল যে অর্কের মনে হলো, মানুষের অহংকার কত অদ্ভুত।

আমরা যে ঘটনাগুলোকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র মনে করি, মহাবিশ্বের দৃষ্টিতে সেগুলো হয়তো এক মুহূর্তেরও কম।

সে চোখ বন্ধ করল।

তার মনে হলো, তার ভেতরের ‘আমি’ ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে।

সে আর শুধু অর্ক নয়।

সে একটি শ্বাস, একটি জীবন, একটি ক্ষণস্থায়ী চেতনা, বৃহৎ অস্তিত্বের একটি ক্ষুদ্র অংশ।

ঠিক তখন সূর্য উঠল।

পূর্ব আকাশের অন্ধকার ধীরে ধীরে সরে গেল। প্রথম আলো পাহাড়ের গায়ে পড়ল। তুষারের ওপর আলো জ্বলে উঠল।

অর্কের চোখে জল এসে গেল।

সে বুঝল, সূর্যোদয় তাকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। তবু আলো এসেছে।

জীবনও তেমন। ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা না থাকলেও মানুষ এগিয়ে যায়। আর সেই এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই জীবনের অর্থ জন্ম নেয়।

চূড়া থেকে নেমে আসার সময় অর্ক বুঝল, পাহাড়ে ওঠার চেয়ে নিচে নামা কঠিন।

ওপরে মানুষ নিজের সত্য দেখতে পারে। নিচে ফিরে এসে সেই সত্যকে কাজে পরিণত করতে হয়।

শৈলপুরে ফিরে সে দেখল, পৃথিবী তার জন্য অপেক্ষা করেনি।

এটাই তাকে সবচেয়ে বেশি স্বস্তি দিল।

তার অনুপস্থিতিতে বাজার খুলেছে, শিশুরা স্কুলে গেছে, মানুষ প্রেম করেছে, বিয়ে হয়েছে, কেউ মারা গেছে, নতুন শিশু জন্মেছে। শহর নিজের গতিতেই চলেছে।

অর্ক বুঝল, সে এতদিন নিজের গুরুত্বকে অতিরঞ্জিত করেছিল।

এই উপলব্ধির মধ্যে অপমান ছিল না।

ছিল মুক্তি।

অর্ক একটি ছোট ঘর ভাড়া নিল। কোনো সাইনবোর্ড লাগাল না, কোনো বিজ্ঞাপনও দিল না। শুধু দরজা খোলা রাখল।

প্রথম দিন একজন যুবক এল।

সে চাকরি হারিয়েছে।

বলল,

“আমি শেষ।”

অর্ক জিজ্ঞেস করল,

“কী শেষ হয়েছে?”

“আমার চাকরি।”

“তাহলে তুমি কেন বলছ, তুমি শেষ?”

যুবক চুপ করে রইল।

অর্ক বলল,

“একটি ঘটনা আর একটি পরিচয়কে এক করে ফেলো না।”

পরের দিন এক নারী এল। তার বিবাহ ভেঙে গেছে।

সে বলল,

“আমি আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারব না।”

অর্ক বলল,

“তুমি একজন মানুষকে হারিয়েছ। বিশ্বাস করার ক্ষমতা হারাওনি।”

এক বৃদ্ধ এলেন। বললেন,

“আমার জীবনে আর কোনো উদ্দেশ্য নেই।”

অর্ক জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

“আপনি কি আজ কারও জন্য কিছু করতে পারেন?”

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,

“হয়তো।”

“তাহলে আজকের জন্য আপনার উদ্দেশ্য আছে।”

ধীরে ধীরে মানুষ আসতে লাগল।

অর্ক বুঝতে পারল, মানুষ সবসময় উপদেশ চায় না। অনেক সময় সে শুধু চায়, কেউ তার কথা শেষ পর্যন্ত শুনুক।

এক বছর পর অর্ক একটি ছোট শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করল।

নাম দিল, ভাঙা মানুষের বিদ্যালয়।

নামটি শুনে অনেকে হাসল।

অর্ক বলল,

“ভাঙা মানুষ মানে পরাজিত মানুষ নয়। ভাঙা মানুষ মানে এমন একজন, যার পুরোনো কাঠামো আর আগের মতো নেই।”

এই বিদ্যালয়ে পরীক্ষার নম্বর ছিল না, সনদ ছিল না, প্রতিযোগিতাও ছিল না।

ছিল আত্মপর্যবেক্ষণ।

মানুষ সেখানে শিখত কীভাবে নিজের ব্যর্থতার দিকে তাকাতে হয়, কীভাবে নিজের ভয়কে চিনতে হয়, কীভাবে ক্ষোভকে কাজে রূপ দিতে হয়, কীভাবে প্রতিকূলতার মধ্যেও চরিত্র রক্ষা করতে হয় এবং সাফল্যের পর নিজেকে হারিয়ে না ফেলতে হয়।

অর্ক বলত,

“প্রেরণা সবসময় তোমার পাশে থাকবে না। তাই চরিত্র তৈরি করো। উৎসাহ কমে যাবে, অভ্যাস তোমাকে এগিয়ে নেবে।

মানুষ তোমাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। নিজের মূল্যবোধকে প্রত্যাখ্যান করো না।

তুমি ব্যর্থ হতে পারো। কিন্তু ব্যর্থতাকে তোমার নাম বানিয়ে দিও না।

অন্যায় তোমার সঙ্গে ঘটতে পারে। কিন্তু অন্যায়ের মতো মানুষ হয়ে ওঠা তোমার হাতে।”

অনেক বছর পর এক বিকেলে মেঘলা শৈলপুরে ফিরে এল।

অর্ক তখন বিদ্যালয়ের উঠোনে কয়েকজন শিশুর সঙ্গে বসে ছিল।

মেঘলাকে দেখে সে উঠে দাঁড়াল।

দুজনেই কিছুক্ষণ নীরব রইল।

তারপর মেঘলা বলল,

“তুমি বদলে গেছ।”

অর্ক মৃদু হাসল।

“তুমিও।”

“আমি তোমাকে অনেকবার মনে করেছি।”

“আমিও।”

“রাগ ছিল?”

“ছিল।”

“এখন?”

“কমেছে।”

“কীভাবে?”

অর্ক কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“আমি বুঝেছি, মানুষ কখনো কখনো নিজের যন্ত্রণার মধ্যে এমনভাবে আটকে যায় যে অন্যের যন্ত্রণাও দেখতে পায় না।”

মেঘলা চোখ নামিয়ে বলল,

“তুমি কি আমাকে ক্ষমা করেছ?”

অর্ক উত্তর দিল,

“আমি তোমাকে বিচার করার অধিকার নিজের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়েছি।”

মেঘলা তার দিকে তাকাল।

“এটা কি ক্ষমা?”

“হয়তো।”

“আর তুমি?”

“আমি এখনও নিজের প্রতি কঠোর।”

মেঘলা হেসে বলল,

“সেটা বদলাও।”

অর্কও হাসল।

“শিখছি।”

অর্কের বয়স বাড়ছিল। চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল, হাঁটার গতি ধীর হয়েছিল। কিন্তু তার চারপাশে মানুষের সংখ্যা বাড়ছিল।

কেউ তাকে গুরু বলত। সে বিরক্ত হতো।

“আমি গুরু নই।”

কেউ তাকে দার্শনিক বলত।

সে বলত,

“আমি শুধু অনেক ভুল করেছি এবং কিছু ভুল থেকে শিখেছি।”

কেউ বলত,

“আপনি আমাদের জীবন বদলে দিয়েছেন।”

অর্ক উত্তর দিত,

“আমি শুধু দরজা দেখিয়েছি। হাঁটতে হয়েছে তোমাকেই।”

একদিন এক তরুণ তাকে জিজ্ঞেস করল,

“জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?”

অর্ক দীর্ঘক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“তুমি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।”

তরুণ অপেক্ষা করল।

অর্ক বলল,

“কিন্তু নিজের সততা, শ্রম, মনোভাব এবং পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর কাজ করতে পারো।”

“সবচেয়ে বড় শক্তি?”

“নিজেকে হারিয়ে না ফেলা।”

“সবচেয়ে বড় ভয়?”

“নিজের জীবন অন্যের হাতে তুলে দেওয়া।”

“সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা?”

“নিজের সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নেওয়া।”

“সবচেয়ে বড় সাফল্য?”

অর্ক দূরের পাহাড়ের দিকে তাকাল।

“এমন মানুষ হওয়া, যার সঙ্গে একা থাকলেও নিজের কাছে লজ্জা লাগে না।”

অর্ক আর কখনো কালাচলে ওঠেনি।

মানুষ জিজ্ঞেস করত,

“আবার যাবেন না?”

সে বলত,

“প্রয়োজন নেই।”

“কেন?”

অর্ক পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসত।

“আমি যে পাহাড়ে উঠতে গিয়েছিলাম, সেটি এখন আমার ভেতরে।”

এক সন্ধ্যায় অর্ক বিদ্যালয়ের উঠোনে বসে ছিল।

আকাশে সূর্য অস্ত যাচ্ছিল। শিশুরা খেলছিল। একজন বৃদ্ধ বই পড়ছিলেন। এক তরুণ নিজের ব্যবসার পরিকল্পনা লিখছিল। এক নারী তার মেয়েকে পড়াচ্ছিল।

অর্ক চারপাশে তাকাল।

তার মনে হলো, জীবনের সবচেয়ে গভীর পরিবর্তন কখনো প্রচারের মাধ্যমে ঘটে না।

একজন মানুষ একটু বেশি সাহসী হলে, একজন বাবা সন্তানের কথা একটু বেশি মন দিয়ে শুনলে, একজন ব্যর্থ তরুণ আবার চেষ্টা করলে, একজন বিধবা নিজের জীবন নতুন করে গড়ে তুললে, কেউ নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইলে, একজন ক্ষমতাবান মানুষ দুর্বল মানুষের প্রতি একটু বেশি মানবিক হলে, সমাজের ভেতরে অদৃশ্য পরিবর্তন শুরু হয়।

এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো মিলেই একদিন সমাজ বদলে দেয়।

অর্ক বুঝেছিল, চূড়ায় পাওয়া জ্ঞান তখনই সত্য হয়, যখন তা উপত্যকার মানুষের জীবনে কাজে লাগে।

মানুষ নিজের জীবনকে একটি সম্পূর্ণ ছবি মনে করতে ভালোবাসে।

সে বলে, আমি এমন। আমি সফল। আমি ব্যর্থ। আমি সুখী। আমি অসুখী। আমি এই পরিবারের মানুষ। আমি এই পেশার মানুষ। আমি এই পরিচয়ের মানুষ।

কিন্তু জীবন কোনো স্থির প্রতিকৃতি নয়।

এটি একটি চলমান ক্যানভাস।

আজকের রেখা আগামীকাল বদলে যেতে পারে। আজ যে ক্ষত অসহনীয় মনে হচ্ছে, আগামীকাল তার পাশে নতুন কোনো অর্থ জন্ম নিতে পারে। আজ যে ব্যর্থতা জীবনকে শেষ করে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে, বহু বছর পর ফিরে তাকিয়ে মানুষ বুঝতে পারে, সেখান থেকেই তার অন্য জীবনের শুরু।

অর্কের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল।

তার পতন তাকে শেষ করেনি। শূন্যতা তাকে গ্রাস করেনি। ভয় তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। অতীত তাকে বন্দী করে রাখতে পারেনি।

কারণ একদিন সে বুঝেছিল, মানুষ পরিস্থিতির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রক নয়। কিন্তু পরিস্থিতির সঙ্গে নিজের সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের ক্ষমতা তার আছে।

এই ক্ষমতাই স্বাধীনতা।

স্বাধীনতার সঙ্গে আসে দায়িত্ব। দায়িত্ব থেকে শৃঙ্খলা। শৃঙ্খলা থেকে সৃষ্টি। সৃষ্টি থেকে অর্থ।

আর সেই অর্থ যখন নিজের সীমানা অতিক্রম করে অন্য মানুষের জীবনে আলো ছড়ায়, তখন ব্যক্তিগত মুক্তি মানবিক পূর্ণতায় পৌঁছায়।

অর্ক শেষ জীবনে একটি বাক্য প্রায়ই বলত,

“মানুষের সবচেয়ে বড় জয় পৃথিবীকে জয় করা নয়। নিজের ভেতরের সেই জায়গাটিকে জয় করা, যেখানে ভয় তাকে বলে, তুমি পারবে না।”

একদিন তার এক ছাত্র জিজ্ঞেস করেছিল,

“স্যার, তাহলে কি ভয় একদিন পুরোপুরি চলে যায়?”

অর্ক মাথা নাড়ল।

“না।”

“তাহলে?”

“একদিন তুমি ভয়কে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে শিখবে।”

“দুঃখ?”

“সেটিও থাকবে।”

“ব্যর্থতা?”

“সেটিও আসবে।”

“তাহলে মুক্তি কোথায়?”

অর্ক হেসে বলেছিল,

“মুক্তি হলো এগুলো না থাকার মধ্যে নয়। এগুলো থাকা সত্ত্বেও নিজের পথ বেছে নিতে পারার মধ্যে।”

সন্ধ্যা নেমে আসছিল।

পাহাড়ের গায়ে শেষ আলো।

অর্ক দূরে তাকিয়ে রইল।

কালাচল আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে। তার চূড়ায় আবার তুষার পড়বে, ঝড় আসবে, কুয়াশা নামবে, সূর্য উঠবে। কেউ পাহাড়ে উঠবে, কেউ মাঝপথে ফিরে আসবে, কেউ চূড়ায় পৌঁছাবে।

কিন্তু পাহাড় কাউকে বিজয়ী ঘোষণা করবে না।

কারণ পাহাড়ের কোনো বিচার নেই।

বিচার মানুষ নিজেই করে, নিজের কাছে, নিজের জীবনের সামনে, নিজের বিবেকের সামনে।

অর্ক ধীরে উঠে দাঁড়াল।

তার সামনে অন্ধকার পথ।

কিন্তু সে আর অন্ধকারকে ভয় পেল না।

কারণ সে জানত, আলো সবসময় সামনে থাকে না। কখনো আলো মানুষের ভেতরেই জন্ম নেয়।

যে মানুষ নিজের ভেতরে একটি ছোট আলো জ্বালাতে পারে, সে হয়তো পুরো পৃথিবীকে আলোকিত করতে পারবে না। কিন্তু তার পাশে দাঁড়ানো একজন মানুষের জন্য রাতটি একটু কম অন্ধকার হয়ে উঠতে পারে।

মানুষের ইতিহাসে সব বিপ্লব বড় শব্দে শুরু হয় না।

কিছু বিপ্লব শুরু হয় একটি নীরব সিদ্ধান্ত দিয়ে।

আজ আমি আবার চেষ্টা করব।

আজ আমি নিজের ভুল স্বীকার করব।

আজ আমি কাউকে ক্ষমা করব।

আজ আমি নিজের ওপর বিশ্বাস রাখব।

আজ আমি ভয় পেয়েও এগোব।

আজ আমি আমার যন্ত্রণাকে অর্থহীন হতে দেব না।

আজ আমি নিজের জীবনের ক্যানভাসে নতুন একটি রেখা আঁকব।

অর্ক সেই রেখাটি বহু বছর আগে এঁকেছিল।

তারপর একের পর এক রেখা।

কখনো কাঁপা হাতে, কখনো অশ্রুসিক্ত চোখে, কখনো একা, কখনো মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে।

ছবিটি কখনো সম্পূর্ণ হয়নি। হয়তো কোনোদিন হবে না।

কারণ মানুষ যতদিন বেঁচে থাকে, তার ক্যানভাস ততদিন অসমাপ্ত থাকে।

আর অসমাপ্ত থাকার মধ্যেই জীবনের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা।

শেষ হয়ে যাওয়া ছবির আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। কিন্তু অসমাপ্ত ছবির সামনে এখনও শিল্পীর হাত খোলা থাকে।

মহাকালের সেই বিশাল ক্যানভাসে অর্কের জীবনও একটি ক্ষুদ্র রেখা।

কিন্তু সেই রেখা তাকে একটি সত্য শিখিয়েছিল।

মানুষ তার সবকিছু বেছে নিতে পারে না।

সে নিজের জন্ম বেছে নিতে পারে না। সব হারানো ঠেকাতে পারে না। সব মানুষকে ধরে রাখতে পারে না। সব অন্যায় থামাতে পারে না। সব স্বপ্ন পূরণ করতে পারে না।

তবু সে তার পরবর্তী পদক্ষেপ বেছে নিতে পারে।

সেখানেই তার মর্যাদা।

সেখানেই তার স্বাধীনতা।

সেখানেই তার সৃষ্টিশক্তি।

আর সেখানেই তার অস্তিত্বের পরম অন্বেষণ।

অর্ক পাহাড়ের দিকে শেষবার তাকাল।

তারপর মানুষের দিকে ফিরে হাঁটল।

পাহাড় পেছনে রইল।

কিন্তু কালাচল আর পেছনে ছিল না।

কারণ যে পাহাড় একদিন তাকে ভয় দেখিয়েছিল, সেটিই এখন তার চেতনার ভেতরে এক নীরব প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

একটি স্মৃতি।

একটি শিক্ষা।

একটি আয়না।

একটি অসমাপ্ত প্রশ্ন।

আর একটি উত্তর।

মানুষ ভেঙে যেতে পারে।

কিন্তু ভাঙনের পর সে কী হয়ে উঠবে, সেই গল্পটি এখনও লেখা হয়নি।

কলমটি তার নিজের হাতে।

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর

img

Mawlāya ṣalli wa-sallim

প্রকাশিত :  ২১:৩৫, ১১ আগষ্ট ২০২৬


Mawlāya ṣalli wa-sallim dā\'iman abadan,

ʿalā ḥabībika khayri l-khalqi kullihimi.


Al-faṣlu l-awwalu fī l-ghazali wa-shakwā l-gharāmi

Amin tadhakkuri jīrānin bi-dhī salami,

mazajta damʿan jarā min muqlatin bi-dami.


Am habbati r-rīḥu min tilqā\'i kāẓimatin,

wa-awmaḍa l-barqu fī ẓ-ẓalmā\'i min iḍami.


Fa-mā li-ʿaynayka in qulta kfufā hamatā,

wa-mā li-qalbika in qulta stafiq yahimi.


Ayaḥsabu ṣ-ṣabbu anna l-ḥubba munkatimun,

Mā bayna munsajimin minhu wa-muḍṭarimi.


Lawla l-hawā lam turiq damʿan ʿalā ṭalalin,

wa-lā ariqta li-dhikri l-bāni wa-l-ʿalami.


Fa-kayfa tunkiru ḥubban baʿda mā shahidat,

bihi ʿalayka ʿudūlu d-damʿi wa-s-saqami.


Wa-athbata l-wajdu khaṭṭay ʿabratin wa-ḍanan,

mithla l-bahāri ʿalā khaddayka wa-l-ʿanami.


Naʿam sarā ṭayfu man ahwā fa-arraqanī,

wa-l-ḥubbu yaʿtariḍu lladhdhati bi-l-alami.


Yā lā\'imī fī l-hawa l-ʿudhriyyi maʿdhiratan,

minnī ilayka wa-law anṣafta lam talumi.


ʿAdatka ḥāliya lā sirrī bi-mustatirin,

ʿani l-wushāti wa-lā dā\'ī bi-munḥasimi.


Maḥḥaḍtanī n-nuṣḥa lākin lastu asmaʿuhu,

inna l-muḥibba ʿani l-ʿudh-dhāli fī ṣamami.


Innī t-tahamtu naṣīḥa sh-shaybi fī ʿadhalin,

wa-sh-shaybu abʿadu fī nuṣḥin ʿani t-tuhami.

Al-faṣlu th-thānī fī l-ḥadhīri min hawa n-nafsi


Fa-inna ammāratī bi-s-sū\'i mā ttaʿaẓat,

min jahlihā bi-nadhīri sh-shaybi wa-l-harami.


Wa-lā aʿaddat mina l-fiʿli l-jamīli qirā,

ḍayfin alamma bi-ra\'sī ghayra muḥtashimi.


Law kuntu aʿlamu annī mā uwaqqiruhu,

katamtu sirran badā lī minhu bi-l-katami.


Man lī bi-raddi jimāḥin min ghawāyatihā,

kamā yuraddu jimāḥu l-khayli bi-l-lujumi.


Fa-lā tarum bi-l-maʿāṣī kasra shahwatihā,

inna ṭ-ṭaʿāma yuqawwī shahwata n-nahimi.


Wa-n-nafsu ka-ṭṭifli in tuhmilhu shabba ʿalā,

ḥubbi r-raḍāʿi wa-in tafṭimhu yanfaṭimi.


Faṣrif hawāhā wa-ḥādhir an tuwalliyahu,

inna l-hawā mā tawallā yuṣmi aw yaṣimi.


Wa-rāʿihā wahya fī l-aʿmāli sā\'imatun,

wa-in hiya staḥlati l-marʿā fa-lā tusimi.


Kam ḥassanat ladhdhatan li-l-mar\'i qātilatan,

min ḥaythu lam yadri anna s-summa fī d-dasami.


Wa-khsha d-dasā\'isa min jūʿin wa-min shibaʿin,

fa-rubba makhmaṣatin sharrun mina t-tukhami.


Wa-stafrighi d-damʿa min ʿaynin qadi-mtala\'at,

mina l-maḥārimi wa-l-zam ḥimyata n-nadami.


Wa-khālifi n-nafsa wa-sh-shayṭāna wa-ʿṣihimā,

wa-in humā maḥaḍāka n-nuṣḥa fa-ttahimi.


Wa-lā tuṭiʿ minhumā khaṣman wa-lā ḥakaman,

fa-anta taʿrifu kayda l-khaṣmi wa-l-ḥakami.