img

সীমানা পেরিয়ে সাহিত্যের নীরব যাত্রা: বিশ্বায়নের যুগে এক প্রচারবিমুখ কথাসাহিত্যিকের মনন ও সৃজনবীক্ষা

প্রকাশিত :  ১৮:৫৮, ১৮ জুলাই ২০২৬

সীমানা পেরিয়ে সাহিত্যের নীরব যাত্রা: বিশ্বায়নের যুগে এক প্রচারবিমুখ কথাসাহিত্যিকের মনন ও সৃজনবীক্ষা

ড. অরুণ রায় চৌধুরী 

সাহিত্যের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এমন কিছু কালজয়ী স্রষ্টার দেখা মেলে, যাঁদের নাম প্রথমে লোকমুখে উচ্চারিত হয় না; বরং তাঁদের কালজয়ী সৃষ্টিই একসময় প্রদীপ্ত হয়ে আত্মপ্রকাশ করে। তাঁরা কখনো প্রচারের আলো খোঁজেন না; বরং আলোই এক মোহময় আকর্ষণের মাধ্যমে তাঁদের খুঁজে নেয়। বাংলা সাহিত্যের সুদীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্যে এই ঘরানার নিভৃতচারী লেখকের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিভৃত জীবন, জীবনানন্দ দাশের ঘোরলাগা আত্মমগ্নতা কিংবা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের পরিমিত ও সংযত সাহিত্যচর্চা আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় স্থায়ী সাহিত্যিক ভিত্তি শেষ পর্যন্ত প্রচারের করতালিতে নয়, বরং সৃষ্টির অতল গভীরতায় নির্মিত হয়।

তবে বর্তমান ডিজিটাল যুগে এসে সেই চিরন্তন বাস্তবতার রূপান্তর ঘটেছে। আধুনিক বিপণনব্যবস্থায় একজন লেখকের বই প্রকাশের সঙ্গেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় প্রচারণার ঝড়। অনেক সময় পাঠক মূল বইটি পড়ার আগেই লেখকের বহুল প্রচারিত পরিচিতির মুখোমুখি হন। বাজার, করপোরেট বিপণন এবং যান্ত্রিক অ্যালগরিদমের এই সময়ে সাহিত্যও যেন পণ্যের মতো দৃশ্যমানতার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছে। এই বাস্তবতার মধ্যেও যদি কোনো কথাসাহিত্যিক দীর্ঘ সময় ধরে নিভৃত সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন এবং তাঁর রচনা দেশীয় গণ্ডি অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক পাঠকমহলে আলোচিত হতে শুরু করে, তবে তা নিঃসন্দেহে গভীর সাহিত্যিক আলোচনার দাবি রাখে।

ডিজিটাল বাস্তবতায় বিশ্বায়ন ও নন্দনতত্ত্বের দ্বান্দ্বিকতা

ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যযাত্রা এক গভীর ও মৌলিক প্রশ্নের জন্ম দেয়। তিনি কি সমকালীন বাংলা কথাসাহিত্যের কোনো নতুন ও প্রগতিশীল ধারার প্রতিনিধিত্ব করছেন, নাকি কেবল ডিজিটাল প্রকাশনার সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিশ্ববাজারে প্রবেশের একটি উদাহরণ? এই প্রশ্নের উত্তর এতটা সরল নয়। কারণ, একজন লেখকের সামগ্রিক সাহিত্যিক গুরুত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁর বইয়ের বিক্রি বা বৈশ্বিক বিপণনই শেষ কথা নয়; বরং তাঁর রচনার অন্তর্নিহিত নন্দনতত্ত্ব, ভাষার বুনন, মানবিক গভীরতা এবং সময়কে ধারণ করার ক্ষমতাই প্রকৃত কষ্টিপাথর।

তবু এটুকু অনস্বীকার্য যে, বাংলা ভাষায় লিখে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ও বৈশ্বিক বিতরণব্যবস্থায় প্রবেশের এই প্রচেষ্টা নিজেই একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। বহু দশক ধরে বাংলা সাহিত্য বিশ্বের নানা ভাষায় অনূদিত হলেও সমকালীন লেখকদের একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রকাশনা সেই দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতায় কিছুটা হলেও পরিবর্তনের সূচনা করেছে। আজ পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে একজন লেখকের বই সংগ্রহ করা সম্ভব। কিন্তু সেই প্রযুক্তিগত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একজন স্রষ্টা আদৌ পাঠকের অন্তরের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারছেন কি না সেটিই আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাস আমাদের এই শাশ্বত শিক্ষাই দেয় সাহিত্য কখনো কেবল ভাষার মাধ্যমেই বিশ্বজনীন হয় না; বরং মানুষের মৌলিক অভিজ্ঞতার গভীরতায় তা বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে। ভাষা তার নান্দনিক বাহন, কিন্তু অকৃত্রিম মানবিকতাই তার প্রকৃত পরিচয়।

শিকড়ের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক সংকটের আখ্যান

রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যচর্চার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি চেনা লোকজ বাস্তবতার ভেতর থেকে বৈশ্বিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন। তাঁর আলোচিত উপন্যাসগুলোর বিষয়বস্তু লক্ষ করলে দেখা যায় যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট, নৈতিক দোলাচল এবং শান্তির আকাঙ্ক্ষা বারবার ফিরে আসে। সাহিত্য যখন কেবল ইতিহাসের ঘটনাবিবরণ নয়, বরং মানুষের অন্তর্গত ভাঙন ও রক্তক্ষরণকে শিল্পের ভাষায় প্রকাশ করে, তখনই তা ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমানা অতিক্রম করার সক্ষমতা অর্জন করে। কারণ, যুদ্ধের ভাষা দেশভেদে ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু স্বজন হারানোর শোকের ভাষা পৃথিবীর সর্বত্র এক।

সমকালীন বিশ্ব আজ এক অস্থির সময় অতিক্রম করছে। গণমাধ্যম প্রতিদিন আমাদের সামনে যুদ্ধ, উদ্বাস্তু সংকট, ধ্বংসযজ্ঞ এবং মানবিক বিপর্যয়ের অসংখ্য চিত্র তুলে ধরছে। কিন্তু সংবাদ যেখানে কেবল ঘটনার বিবরণ দেয়, সাহিত্য সেখানে মানুষের নীরব অভিজ্ঞতাকে ধারণ করে। একজন প্রকৃত কথাসাহিত্যিকের কাজ কোনো রাজনৈতিক পক্ষের মুখপাত্র হওয়া নয়; তাঁর দায়িত্ব মানুষের অন্তর্গত সত্যকে শিল্পে রূপ দেওয়া। কোনো লেখক যদি সেই মানবিক ও নান্দনিক ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেন, তবে তাঁর সৃষ্টি ভাষা ও সংস্কৃতির সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বপাঠকের কাছেও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

এই কারণেই রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে হলে কেবল তাঁর প্রকাশনার আন্তর্জাতিক পরিসর নয়, বরং তাঁর বিষয় নির্বাচনের দিকেও গভীর দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। যুদ্ধকে তিনি যদি কেবল ভূরাজনৈতিক সংঘাত হিসেবে না দেখে মানুষের অস্তিত্বসংকট হিসেবে তুলে ধরেন, তবে তা বাংলা সাহিত্যের মানবিক ধারার একটি তাৎপর্যপূর্ণ সম্প্রসারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

দ্বিভাষিক প্রকাশনা ও সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যযাত্রার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো তাঁর দ্বিভাষিক প্রকাশনার প্রচেষ্টা। বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্য যখন ইংরেজির মাধ্যমে নতুন পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়, তখন তা কেবল অনুবাদ থাকে না; বরং একটি সাংস্কৃতিক সংলাপে রূপ নেয়। বিশেষ করে, প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের বহু বাঙালি মাতৃভাষায় পুরোপুরি স্বচ্ছন্দ না হলেও নিজেদের শিকড় ও ঐতিহ্যকে জানতে আগ্রহী। তাঁদের কাছে বাংলা সমাজ, পারিবারিক মনস্তত্ত্ব, ইতিহাস এবং বাঙালি মানসের পরিচয় পৌঁছে দিতে দ্বিভাষিক সাহিত্য একটি কার্যকর সাংস্কৃতিক সেতু হিসেবে কাজ করতে পারে।

অবশ্য এই অগ্রযাত্রার পাশাপাশি একটি সতর্কতাও জরুরি। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা কিংবা বৈশ্বিক বিপণন একজন লেখককে দৃশ্যমান করে তুলতে পারে, কিন্তু তা তাঁকে রাতারাতি বড় সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে না। প্রকৃত সাহিত্যিক মর্যাদা অর্জনের জন্য প্রয়োজন সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া। এর জন্য অপরিহার্য পাঠকের পুনঃপাঠ, সমালোচকের বিশ্লেষণ এবং গবেষকের মনোযোগ। ইতিহাসে বহু জনপ্রিয় বই বিস্মৃত হয়েছে, আবার বহু অবহেলিত রচনা সময়ের প্রবাহে ক্লাসিক হয়ে উঠেছে। তাই সমকালীন যেকোনো লেখকের মূল্যায়নে সংযম ও ভারসাম্য বজায় রাখাই শ্রেয়।

মহাকালের আদালতে সাহিত্যের প্রকৃত বিচার

একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীকে যদি একটি শব্দে সংজ্ঞায়িত করতে হয়, তবে সেই শব্দটি হবে অনিশ্চয়তা। আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু যুদ্ধ, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য মানবসভ্যতাকে এক গভীর সংকটের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। এই সময়ে সাহিত্য কি কেবল বিনোদনের মাধ্যম হয়ে থাকবে, নাকি তারও একটি নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব রয়েছে?

বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মহান সাহিত্য সব সময় তার সময়ের সঙ্গে সংলাপে লিপ্ত থাকে। হোমারের ইলিয়াড থেকে শুরু করে এরিখ মারিয়া রেমার্কের অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের এ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস কিংবা স্বেতলানা আলেক্সিয়েভিচের যুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্য রচনাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস কেবল রাষ্ট্রের দলিলে লেখা থাকে না; তা মানুষের স্মৃতিতে, চোখের জলে এবং সাহিত্যের পাতায় সংরক্ষিত থাকে।

রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যিক পথচলা আজ সেই দীর্ঘ ও কঠিন পরীক্ষার সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর সামনে যেমন সম্ভাবনার বিস্তৃত দিগন্ত, তেমনি রয়েছে সাহিত্যিক দায়বদ্ধতার গভীর আহ্বান। সেই আহ্বানের প্রতি তিনি যত বেশি নিষ্ঠার সঙ্গে সাড়া দেবেন, তাঁর সৃষ্টিও তত বেশি সময়ের কঠিন পরীক্ষায় নিজের স্থায়ী অবস্থান গড়ে তোলার সুযোগ পাবে। প্রচারণার কোলাহল অতিক্রম করে, করতালির মোহ থেকে মুক্ত হয়ে, মানুষের প্রতি গভীর আস্থা এবং সৃষ্টির প্রতি অকৃত্রিম নিষ্ঠাই শেষ পর্যন্ত একজন কথাসাহিত্যিককে মহাকালের দরবারে বাঁচিয়ে রাখে।

img

বাংলাদেশের বাইরে একটি কণ্ঠের সন্ধানে

প্রকাশিত :  ১৫:৩৩, ২৯ আগষ্ট ২০২৬

রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্য, সীমান্ত পেরোনো গল্প এবং মানুষের না বলা কথার বিশ্ব

আন্তর্জাতিক সাহিত্য ফিচার: একটি নদী যখন সীমান্ত অতিক্রম করে, তার জলকে আর একটি দেশের সম্পত্তি বলা যায় না। মানুষের গল্পও অনেকটা তেমন। জন্মভূমি একজন মানুষকে একটি ভাষা দেয়, একটি ইতিহাস দেয়, কিছু স্মৃতি দেয়। কিন্তু একটি ভালো গল্পের সামনে শেষ পর্যন্ত ভূগোলের সীমানা খুব ছোট হয়ে আসে।

বাংলাদেশি লেখক রেজুয়ান আহম্মেদের সাম্প্রতিক ইংরেজি বইগুলোর আন্তর্জাতিক উপস্থিতিকেও সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়। তাঁর বই এখন ইউরোপের বই বিক্রয় প্ল্যাটফর্ম, আন্তর্জাতিক ডিজিটাল লাইব্রেরি এবং বিভিন্ন অনলাইন বইয়ের বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। Eldar.ch-এর লেখক পাতায় তাঁর একাধিক বই তালিকাভুক্ত রয়েছে। সেখানে We Are All Mad কথাসাহিত্য বিভাগে সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের তালিকায় প্রথম এবং Beyond the Naf নন-ফিকশন বিভাগে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বলে দেখা যায়।

এটি কোনো দেশের জাতীয় বেস্টসেলার তালিকার সমার্থক নয়। তবে একজন বাংলাদেশি লেখকের বই ইউরোপীয় বাজারে এমন দৃশ্যমানতা তৈরি করছে, বিষয়টি নিজেই একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আনে।

একজন লেখক যখন নিজের ভাষার বাইরে লিখতে শুরু করেন, তখন তিনি আসলে কী সঙ্গে নিয়ে যান?

একটি ভাষা, একটি ভূগোল, নাকি মানুষের গল্প?

রেজুয়ান আহম্মেদের বইগুলোর দিকে তাকালে উত্তরটি সম্ভবত তৃতীয়টির কাছাকাছি।

সীমান্তের ওপারে একটি নদী

তাঁর Beyond the Naf উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে নাফ নদী, আরাকান, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ইতিহাস এবং বাস্তুচ্যুতির দীর্ঘ বেদনা।

বইটির কাহিনি একটি পরিবারের মধ্য দিয়ে দুই শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাসকে অনুসরণ করে। ১৭৯৯ সালে ফ্রান্সিস বুকানানের নথিভুক্ত ‘Rooinga’ পরিচয় থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিক সময়, ১৯৬২ সালের সামরিক অভ্যুত্থান, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন এবং ২০১৭ সালের সহিংসতা পর্যন্ত ইতিহাস এখানে একটি পরিবারের ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে মিশে যায়। Kobo-র বইয়ের বিবরণেও এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক পরিসর এবং পারিবারিক আখ্যানের উল্লেখ রয়েছে।

এখানে ইতিহাস কেবল তারিখ নয়। ইতিহাস হয়ে ওঠে একটি বাড়ি, একটি ধানের ক্ষেত, একটি পরিবারের স্মৃতি এবং শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্ন।

মানুষ কি তার জন্মভূমি হারালে তার পরিচয়ের একটি অংশও হারায়?

এই প্রশ্নের কারণেই Beyond the Naf কেবল একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক কাহিনি হয়ে থাকে না। এর কেন্দ্রে রয়েছে ঘর হারানোর সেই অভিজ্ঞতা, যা পৃথিবীর বহু প্রান্তের মানুষের কাছে পরিচিত।

বইটি বর্তমানে Kobo, Fnac, bol.com এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক বই বিক্রয় প্ল্যাটফর্মেও তালিকাভুক্ত রয়েছে। Kobo-তে এর ইংরেজি সংস্করণ এবং Fiction & Literature বিভাগে র‌্যাঙ্কিংও দেখা যাচ্ছে।

‘পাগলামি’ যখন আয়না

We Are All Mad পাঠককে আরও ব্যক্তিগত একটি অঞ্চলে নিয়ে যায়।

বইটির কেন্দ্রীয় ধারণা হলো, সমাজ যাকে পাগলামি বলে দূরে সরিয়ে রাখে, তার কিছু রূপ হয়তো আমাদের সবার মধ্যেই রয়েছে। অর্থের পেছনে ছুটতে গিয়ে মানুষ নিজের ঘুম হারায়, ক্ষমতার কাছে গিয়ে নিজের বিবেক হারায়, ভালোবাসার নামে কাউকে নিজের সম্পত্তি মনে করে এবং কখনো বিশ্বাসের নামেও বিভাজন তৈরি করে।

Google Books-এ প্রকাশিত বইটির বিবরণে এসব প্রশ্ন স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। বইটি ২০২৬ সালে Amazon Digital Services LLC, KDP থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এর বিষয়শ্রেণির মধ্যে psychological fiction এবং visionary and metaphysical fiction রয়েছে।

Eldar.ch-এ বইটির ইংরেজি পেপারব্যাক সংস্করণ তালিকাভুক্ত রয়েছে। লেখকের পৃষ্ঠায় বইটি সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের তালিকায় প্রথম অবস্থানে দেখা যাচ্ছে।

Everand-এও We Are All Mad পাওয়া যাচ্ছে। প্ল্যাটফর্মটির লেখক পৃষ্ঠায় বইটি তাঁর অন্যান্য ইংরেজি বইয়ের সঙ্গে তালিকাভুক্ত রয়েছে।

তবে বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হয়তো কোনো র‌্যাঙ্কিং নয়।

বরং প্রশ্নটি হলো, আমরা যে সমাজকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিই, সেটি আসলে কতটা স্বাভাবিক?

যুদ্ধের বাইরে মানুষের গল্প

রেজুয়ান আহম্মেদের আরেকটি বই The Days of Gaza। নামটির মধ্যেই সমকালীন বিশ্বের একটি গভীর ক্ষত উপস্থিত।

বইটি আন্তর্জাতিক ডিজিটাল বইয়ের বাজারেও পাওয়া যাচ্ছে। Everand-এ এটি তাঁর অন্যান্য বইয়ের সঙ্গে তালিকাভুক্ত রয়েছে।

গাজা নিয়ে লেখা সাহিত্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো যুদ্ধকে শুধু সংবাদ হিসেবে না দেখে মানুষের অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখা। সংখ্যা, ধ্বংসস্তূপ এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে একটি শিশুর ভয়, একটি পরিবারের অপেক্ষা, একজন মায়ের নীরবতা কিংবা একটি ঘর হারানোর অনুভূতি সাহিত্যকে অন্য মাত্রা দেয়।

রেজুয়ান আহম্মেদের এই বইয়ের আন্তর্জাতিক উপস্থিতি সেই বৃহত্তর সাহিত্যিক প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার একজন লেখক মধ্যপ্রাচ্যের একটি মানবিক সংকটকে নিজের ভাষার বাইরে বিশ্বপাঠকের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।

এক লেখক, একাধিক সাহিত্যভুবন

রেজুয়ান আহম্মেদের লেখক পরিচয়কে একটি মাত্র ঘরে রাখা কঠিন।

Eldar.ch-এর লেখক পরিচিতিতে তাঁর কাজের পরিসরে ছোটগল্প, উপন্যাস, কবিতা, টেলিভিশন নাটক, গান এবং প্রবন্ধের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে The Days of Gaza, The Shadow of War, Death Break, Quantum Wizards, We Are All Mad এবং Beyond the Nafসহ একাধিক বই তালিকাভুক্ত রয়েছে।

এই বৈচিত্র্যকে কেউ শক্তি বলতে পারেন, আবার কেউ বলতে পারেন ঝুঁকি।

কারণ একজন লেখক যখন একসঙ্গে এতগুলো বিষয়ে লেখেন, তখন তাঁর সামনে সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়ায় নিজের সাহিত্যিক স্বরকে অক্ষুণ্ণ রাখা।

রেজুয়ান আহম্মেদের ক্ষেত্রে সেই স্বরের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে। তাঁর গল্পের কেন্দ্রে প্রায়ই থাকে মানুষ এবং তার ভেতরের দ্বন্দ্ব।

কখনো সে উদ্বাস্তু।

কখনো সে ক্ষমতার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন সাধারণ মানুষ।

কখনো সে নিজের মনস্তত্ত্বের সঙ্গে লড়াই করা একজন ব্যক্তি।

আবার কখনো সে ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে বেড়ানো একজন মানুষ।

বাংলা থেকে ইংরেজি

আন্তর্জাতিক সাহিত্যবাজারে প্রবেশের সবচেয়ে বড় বাধা অনেক সময় প্রতিভা নয়, ভাষা।

বাংলা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভাষা হলেও বাংলা ভাষায় লেখা একটি বইয়ের আন্তর্জাতিক বাজার স্বাভাবিকভাবেই ইংরেজি ভাষার বইয়ের তুলনায় সীমিত। ফলে একজন বাংলাদেশি লেখক যখন ইংরেজিতে নিজের গল্প লিখছেন, তখন তিনি শুধু ভাষা পরিবর্তন করছেন না। তিনি পাঠকের ভূগোলও পরিবর্তন করছেন।

রেজুয়ান আহম্মেদের সাম্প্রতিক বইগুলোর আন্তর্জাতিক তালিকাভুক্তি সেই পরিবর্তনের একটি উদাহরণ।

Beyond the Naf বর্তমানে Kobo-তে ইংরেজি ইবুক হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের প্রকাশনা তথ্য দেওয়া আছে।

Fnac-এও বইটির ইংরেজি ইবুক সংস্করণ তালিকাভুক্ত হয়েছে।

Bokus-এও তাঁর We Are All Mad, Death Break এবং Beyond the Nafসহ একাধিক ইংরেজি বই পাওয়া যাচ্ছে।

এই তালিকাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। একজন বাংলাদেশি লেখকের বই এখন শুধু বাংলাদেশের পাঠকের জন্য প্রকাশিত কোনো স্থানীয় পণ্য নয়। আন্তর্জাতিক বই বিতরণ ব্যবস্থার ভেতরেও তার একটি ঠিকানা তৈরি হচ্ছে।

বেস্টসেলার শব্দটির সতর্ক ব্যবহার

আন্তর্জাতিক বইয়ের বাজারে ‘বেস্টসেলার’ শব্দটির ব্যবহার যতটা আকর্ষণীয়, তার অর্থ ততটাই নির্দিষ্ট।

কোনো বই একটি নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের নির্দিষ্ট বিভাগে প্রথম হতে পারে। আবার একই বই সামগ্রিক জাতীয় বাজারে বা বিশ্বব্যাপী বিক্রিতে প্রথম নাও হতে পারে।

রেজুয়ান আহম্মেদের বইয়ের ক্ষেত্রেও তাই প্ল্যাটফর্মভিত্তিক তথ্য এবং সামগ্রিক বাজারের তথ্য আলাদা করে দেখা জরুরি।

Eldar.ch-এর বর্তমান লেখক পৃষ্ঠায় We Are All Mad এবং Beyond the Naf যথাক্রমে সর্বাধিক বিক্রীত তালিকায় প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।

Kobo-তে Beyond the Naf-এর Fiction & Literature বিভাগে একাধিক র‌্যাঙ্কিং প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে #18,338 এবং সামগ্রিক Fiction & Literature তালিকায় #275,894 অবস্থান দেখা যায়।

এই সংখ্যাগুলোকে অতিরঞ্জিত না করে দেখলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়। বইগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বইয়ের অবকাঠামোর মধ্যে প্রবেশ করেছে এবং বিভিন্ন বাজারে পরিমাপযোগ্য ডিজিটাল উপস্থিতি তৈরি করেছে।

যে গল্পের কোনো ভিসা লাগে না

সাহিত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই।

একজন লেখক বাংলাদেশে বসে রোহিঙ্গা পরিবারের গল্প লিখতে পারেন। গাজা নিয়ে লিখতে পারেন। ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নিয়ে লিখতে পারেন। মানুষের মানসিক সংকট নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন।

পাঠক কোথায় বসে আছেন, সেটি তখন দ্বিতীয় বিষয় হয়ে যায়।

Beyond the Naf-এর নাফ নদী হয়তো বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের একটি বাস্তব নদী। কিন্তু ঘর হারানোর অনুভূতি কোনো সীমান্তের মধ্যে আটকে থাকে না।

We Are All Mad-এর ‘পাগলামি’ হয়তো একটি সামাজিক রূপক। কিন্তু নিজের জীবনের অর্থ নিয়ে প্রশ্ন করা মানুষের অভিজ্ঞতা বিশ্বজনীন।

আর The Days of Gaza একটি নির্দিষ্ট ভূগোলের নাম বহন করলেও যুদ্ধের ভেতর মানুষের অসহায়ত্বের ভাষা অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

সামনে যে পরীক্ষা

রেজুয়ান আহম্মেদের আন্তর্জাতিক সাহিত্যযাত্রা এখনো চলমান। তাঁর সাম্প্রতিক ইংরেজি বইগুলোর আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে উপস্থিতি একটি নতুন পাঠকসমাজের দরজা খুলে দিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সাহিত্যিক স্বীকৃতি কেবল বইয়ের সংখ্যা বা কোনো একটি অনলাইন তালিকার অবস্থান দিয়ে নির্ধারিত হয় না।

সাহিত্যের আসল পরীক্ষা আরও কঠিন।

পাঠক বইটি মনে রাখবেন কি না।

সমালোচক বইটি নিয়ে আলোচনা করবেন কি না।

অনুবাদক অন্য ভাষায় গল্পটি নিয়ে যাবেন কি না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক বইটির ভেতরে নতুন কোনো অর্থ খুঁজে পাবেন কি না।

সাহিত্য উৎসবে লেখককে নিয়ে আলোচনা হবে কি না।

এসব প্রশ্নের উত্তর সময়ের হাতে।

তবে বাংলাদেশের সাহিত্যিক কণ্ঠের জন্য আন্তর্জাতিক ডিজিটাল বাজারের এই নতুন দরজা গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দশক আগেও একটি দেশের লেখকের পক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের পাঠকের কাছে একই সময়ে পৌঁছানো কঠিন ছিল। ডিজিটাল প্রকাশনা সেই দূরত্ব অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।

রেজুয়ান আহম্মেদের সাম্প্রতিক বইগুলোর যাত্রা সেই পরিবর্তনের একটি উদাহরণ।

শেষ পর্যন্ত একজন লেখকের আন্তর্জাতিক পরিচয় কতটি বই প্রকাশিত হয়েছে, কতটি ওয়েবসাইটে বই পাওয়া যায় কিংবা কোনো একটি তালিকায় কত নম্বরে অবস্থান করেছে, শুধু তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না।

সাহিত্যের দীর্ঘ যাত্রায় থেকে যায় অন্য কিছু।

একটি গল্প।

একটি চরিত্র।

একটি প্রশ্ন।

আর এমন একটি অনুভূতি, যা বই বন্ধ করার পরও পাঠকের সঙ্গে থেকে যায়।

রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যিক যাত্রার প্রকৃত পরীক্ষা হয়তো সেখানেই।

বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের দিকে তাকানো নয়, বরং বিশ্বের একজন পাঠক বাংলাদেশের একজন লেখকের গল্প পড়ে নিজের জীবন, নিজের সমাজ কিংবা নিজের পৃথিবীকে নতুন করে দেখতে শুরু করেন কি না, সেটিই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।