প্রকাশিত :
১৩:৩২, ১৬ জুন ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট: ১৩:৩৪, ১৬ জুন ২০২৬
সংগ্রাম দত্ত: দেশের অন্যতম পর্যটন নগরী ও চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গলে প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। জনসভা সফল করতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নিয়ে প্রস্তুতি কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, এমপি।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে তিনি শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিতব্য জনসভার স্থান পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি মঞ্চ নির্মাণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, দর্শনার্থীদের অবস্থান, যাতায়াত ও সার্বিক আয়োজন ঘুরে দেখেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও আয়োজকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে শ্রীমঙ্গলে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জনসভা যাতে সুষ্ঠু, সুন্দর ও সফলভাবে সম্পন্ন হয়, সে লক্ষ্যে প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
পরিদর্শনকালে স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী, বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পরে শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক সৈয়দ আবুজাফর সালাউদ্দিন ও সদস্যসচিব রুবেল আহমদের আমন্ত্রণে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী প্রেসক্লাব পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং প্রধানমন্ত্রীর সফর ও জনসভা ঘিরে বিভিন্ন প্রস্তুতির বিষয়ে আলোচনা করেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে পুরো শ্রীমঙ্গলে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দা, রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থক এবং আয়োজকদের মধ্যে দেখা গেছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। জনসভা সফল করতে সংশ্লিষ্টরা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
শ্রীমঙ্গলের গুরুত্বপূর্ণ এই আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর সফর জেলার উন্নয়ন ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
মানুষ, সময় ও সীমান্তের ওপারে: রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যভুবনের পাঠ
প্রকাশিত :
১৮:১২, ০৩ আগষ্ট ২০২৬
✍️ ড. সৈয়দ আনিসুর রহমান
সমকালীন বাংলা সাহিত্যের পরিসরে এমন কিছু লেখক আছেন, যাঁরা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থেকেও দীর্ঘ সময় ধরে নিজস্ব সাহিত্যভাষা নির্মাণ করে চলেছেন। রেজুয়ান আহম্মেদ সেই ধারারই একজন। তাঁর সাহিত্যিক যাত্রার বিশেষত্ব কেবল বিষয় নির্বাচনে নয়, মানুষের অন্তর্জগতের গভীর উপলব্ধির আন্তরিক চেষ্টাতেও দৃশ্যমান। তাঁর গল্প, উপন্যাস ও নিবন্ধ সবকিছুর কেন্দ্রেই শেষ পর্যন্ত ফিরে আসে মানুষ; উঠে আসে তার ভয়, ভাঙন, আশা, স্মৃতি এবং টিকে থাকার অবিরাম সংগ্রাম।
রেজুয়ান আহম্মেদের লেখায় প্রাত্যহিক জীবনের দৃশ্যমান ঘটনাগুলোর চেয়ে অদৃশ্য মানসিক অভিঘাতই বেশি গুরুত্ব পায়। তিনি বাহ্যিক সংঘাতের বর্ণনার চেয়ে মানুষের অন্তর্লোকের নীরব আলোড়নকে ধরতে আগ্রহী। তাঁর কাছে যুদ্ধ কেবল গোলাবারুদ বা রণক্ষেত্রের ইতিহাস নয়; যুদ্ধ মানে পরিবার হারানোর বেদনা, শৈশবের বিচ্ছেদ, দীর্ঘ নির্বাসনের ছায়া কিংবা মানুষের গভীরে জন্ম নেওয়া তীব্র অনিরাপত্তাবোধ। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর আখ্যানকে কেবল ঘটনানির্ভর না রেখে মানবিক অভিজ্ঞতার বিস্তৃত পরিসরে উন্নীত করে।
বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় তাঁর লেখালেখির প্রবণতা লক্ষণীয়। বাংলা রচনায় দেশীয় সমাজ, প্রান্তিক মানুষের জীবন, লোকজ বাস্তবতা ও সামাজিক বৈপরীত্য বারবার ফিরে আসে। অন্যদিকে, ইংরেজি আখ্যানগুলোতে প্রাধান্য পায় যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, অভিবাসন, মানসিক স্বাস্থ্য এবং বৈশ্বিক মানবিক সংকটের মতো বিষয়। বিষয়ের ভিন্নতা থাকলেও উভয় ধারার লেখার ভেতরেই একটি অভিন্ন সুর স্পষ্ট মানুষের মর্যাদা, সহমর্মিতা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন।
তাঁর গদ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য সংযম। অপ্রয়োজনীয় অলংকারে তিনি আখ্যানকে ভারাক্রান্ত করেন না, আবার অতিরিক্ত নাটকীয়তার আশ্রয়ও নেন না। বরং দৃশ্য, সংলাপ ও চরিত্রের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই তিনি পাঠকের গভীরে পৌঁছাতে চান। তাঁর চরিত্রগুলো প্রায়ই সমাজের প্রান্তিক বাস্তবতা থেকে উঠে আসা। তাদের জীবনে বড় কোনো বীরত্ব নেই; আছে ক্ষুদ্র অথচ গভীর মানবিক মুহূর্ত, যা পাঠ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় পাঠকের মনে অনুরণিত হয়।
রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যে নৈতিক বোধ সুস্পষ্ট। তিনি নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান, যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলতে চান এবং সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্ন উত্থাপন করতে চান। এই অবস্থান তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়েরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে সাহিত্যের নিজস্ব একটি নিয়ম রয়েছে চরিত্র যখন নিজ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে কথা বলে, তখন আখ্যান আরও বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। ভবিষ্যতের লেখায় চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও অনিশ্চয়তার গভীরতা আরও বৃদ্ধি পেলে তাঁর সাহিত্য নতুন শিল্পসম্ভাবনার দিকে অগ্রসর হবে।
পেশাগত জীবনে অর্থনীতি ও পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তার কাঠামোকে প্রভাবিত করেছে। ফলে সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার আন্তঃসম্পর্ক তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবে উপলব্ধি করেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর গদ্যকে অনেক সময় বিশ্লেষণধর্মী ভিত্তি দেয়, যা সমকালীন বাংলা কথাসাহিত্যে সচরাচর দেখা যায় না। তবে সাহিত্য তখনই সবচেয়ে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, যখন বিশ্লেষণ চরিত্রের অভিজ্ঞতার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশে যায়। রেজুয়ান আহম্মেদের সাম্প্রতিক লেখায় সেই ভারসাম্যের অনুসন্ধানই লক্ষ করা যায়।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে প্রকাশনাজগতেও বদল এসেছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ই-বুক এবং প্রিন্ট-অন-ডিমান্ড প্রযুক্তি লেখকদের সামনে নতুন পাঠকসমাজের দ্বার উন্মুক্ত করেছে। রেজুয়ান আহম্মেদ এই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে গ্রহণ করেছেন। ফলে তাঁর রচনা দেশীয় পাঠকের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পাঠকমহলেও পৌঁছে যাচ্ছে। তবে সাহিত্যে দীর্ঘস্থায়ী গ্রহণযোগ্যতার প্রকৃত ভিত্তি বিপণন নয়; বরং পাঠকের মনে গল্পের দীর্ঘস্থায়ী অনুরণন সৃষ্টির ক্ষমতা। সেই পরীক্ষা প্রতিটি লেখকের মতো তাঁর সামনেও উন্মুক্ত।
সবশেষে বলা যায়, রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যকে এক কথায় সংজ্ঞায়িত করা সহজ নয়। তিনি যেমন প্রান্তিক জীবনের কথক, তেমনি বৈশ্বিক মানবিক সংকটেরও নিবিড় পর্যবেক্ষক। তাঁর লেখায় দেশীয় বাস্তবতা ও বিশ্বজনীন অভিজ্ঞতা একে অপরের সঙ্গে প্রাঞ্জল সংলাপে যুক্ত হয়েছে। নিজের স্বরকে আরও শাণিত করা, চরিত্রের অন্তর্জীবনকে গভীরভাবে অন্বেষণ করা এবং ভাষার সংযমকে পরিণত করে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা কথাসাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান নির্মাণের সম্ভাবনা ধারণ করেন। একজন লেখকের প্রকৃত পরিচয় তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যায় নয়, বরং সময়ের সঙ্গে তাঁর সাহিত্য কতটা নতুন পাঠ ও ভাবনার জন্ম দিতে পারছে তার মধ্যেই। সেই বিবেচনায় রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যভুবন আরও মনোযোগী পাঠ ও গভীর আলোচনার দাবি রাখে।