img

যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে মানুষের গল্প, আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে রেজুয়ান আহম্মেদের ‘দ্য শ্যাডো অব ওয়ার’

প্রকাশিত :  ১৯:৪০, ১৫ জুলাই ২০২৬

যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে মানুষের গল্প, আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে রেজুয়ান আহম্মেদের ‘দ্য শ্যাডো অব ওয়ার’
✍️ ড. নাজমুল ইসলাম 

যুদ্ধের ইতিহাসে বিজয়ী ও পরাজিতের হিসাব থাকে। কিন্তু সেই হিসাবের বাইরে থেকে যায় অসংখ্য মানুষের ব্যক্তিগত ক্ষতি, অপূরণীয় শোক এবং ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন। রাষ্ট্রের সংঘাত শেষ হলেও সাধারণ মানুষের জীবনে যুদ্ধের দীর্ঘ ছায়া বহুদিন রয়ে যায়। সেই মানবিক বাস্তবতাকেই কথাসাহিত্যের ভাষায় তুলে এনেছেন লেখক রেজুয়ান আহম্মেদ তাঁর নতুন ইংরেজি উপন্যাস The Shadow of War এ।

চলতি বছরের জুলাই মাসে অ্যামাজন কেডিপির মাধ্যমে প্রকাশিত উপন্যাসটি ইতিমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনলাইন বইয়ের প্ল্যাটফর্মে পাঠকের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। ই-বুক ও পেপারব্যাক উভয় সংস্করণেই বইটি সংগ্রহ করা যাচ্ছে।

উপন্যাসটির পটভূমি ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের ইরান–ইসরায়েল সংঘাত। তবে এটি যুদ্ধের সামরিক কৌশল বা কূটনৈতিক টানাপোড়েনের গল্প নয়। বরং যুদ্ধের মধ্যে আটকে পড়া মানুষের জীবন, হারিয়ে যাওয়া স্বজন, ভয়, অনিশ্চয়তা এবং শান্তির আকাঙ্ক্ষাই এখানে প্রধান হয়ে উঠেছে।

গল্পটি এগিয়ে যায় চারটি চরিত্রকে কেন্দ্র করে। তেহরানের গোয়েন্দা বিশ্লেষক মজিদ করিমি, ইতিহাসের অধ্যাপক নার্গিস নাতাঞ্জ, হাইফার আইডিএফ বিশ্লেষক রিনা কাহলোন এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ নেতা আয়ান আল-হাবস—চারজনের জীবন ভিন্ন, পরিচয় ভিন্ন, রাজনৈতিক অবস্থানও ভিন্ন। কিন্তু যুদ্ধ তাঁদের সবার কাছ থেকেই কেড়ে নিয়েছে প্রিয়জনকে। ব্যক্তিগত সেই শোকই একসময় তাঁদের কাছাকাছি নিয়ে আসে। উপন্যাসে তাঁরা গড়ে তোলেন ‘ব্রিজেস অব পিস’ নামে একটি আন্তঃসীমান্ত উদ্যোগ, যেখানে প্রতিশোধের পরিবর্তে গুরুত্ব পায় সহমর্মিতা, সংলাপ এবং পুনর্মিলনের স্বপ্ন।

এই উপন্যাসে লেখক যুদ্ধকে কোনো পক্ষের বিজয় বা পরাজয়ের দৃষ্টিতে দেখেননি। বরং তিনি দেখিয়েছেন, গোলাবর্ষণের শব্দ থেমে গেলেও মানুষের ভেতরে যুদ্ধ অনেক দিন বেঁচে থাকে। পরিবার হারানোর বেদনা, শিশুদের আতঙ্ক, মায়েদের অপেক্ষা এবং ভেঙে পড়া স্বাভাবিক জীবন—এসবই উপন্যাসের মূল সুর।

প্রকাশের পর বইটি আন্তর্জাতিক অনলাইন বইয়ের বাজারেও জায়গা করে নিয়েছে। রাকুটেন কোবো, ওয়ালমার্ট, ফনাক, বুকটোপিয়া, বুকস-এ-মিলিয়ন এবং রাকুটেন বুকসসহ একাধিক প্ল্যাটফর্মে বইটির ডিজিটাল ও মুদ্রিত সংস্করণ পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশের আঞ্চলিক স্টোরের মাধ্যমে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, এশিয়া ও ওশেনিয়ার পাঠকেরা বইটি সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছেন।

ই-বুক সংস্করণটি EPUB2 ফরম্যাটে প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি ১৪৬ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রকাশ করা হয়েছে। অ্যামাজন কেডিপির প্রিন্ট-অন-ডিমান্ড প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক ডিজিটাল বিতরণব্যবস্থার কারণে একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাঠকের কাছে বইটি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

রেজুয়ান আহম্মেদ এর আগে ইংরেজি ভাষায় The Days of Gaza প্রকাশ করেছিলেন। সম্প্রতি তাঁর কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক উপন্যাস Death Break-ও প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা ভাষায়ও তিনি নিয়মিত লিখছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে শব্দে তুমি, সন্দেহের ছায়া, মায়াবী মুহূর্ত, অভাগী এবং গাজার দিনগুলো।

ডিজিটাল প্রকাশনা বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। একসময় আন্তর্জাতিক প্রকাশকের দরজায় দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হতো। এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে একজন লেখকের বই অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের পাঠকের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। The Shadow of War সেই পরিবর্তিত প্রকাশনা-বাস্তবতার একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ।

যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও মানুষ শেষ পর্যন্ত শান্তির পথ খুঁজে নিতে চায়। রেজুয়ান আহম্মেদের এই উপন্যাস সেই বিশ্বাসের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। রাষ্ট্রের সীমান্ত যতই কঠোর হোক, মানুষের শোক, ভালোবাসা এবং সহমর্মিতার কোনো সীমান্ত নেই।
img

সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডীয় লেখিকা অ্যান কার্সন

প্রকাশিত :  ১২:৩৪, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

কানাডীয় লেখিকা অ্যান কার্সন ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। সাহিত্যে তার সাহসী ও নতুন ধরনের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টায় সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম থেকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়।

অ্যান কার্সন ১৯৫০ সালে কানাডার টরন্টোতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮১ সালে তিনি ক্লাসিকস বিষয়ে ‘ওদি এত আমো এরগো সুম’ নামে ডক্টরাল থিসিস প্রকাশ করেন। এই ল্যাটিন বাক্যাংশটির শাব্দিক অর্থ, ‘আমি ঘৃণা করি এবং আমি ভালোবাসি, সুতরাং আমি আছি’।

তিনি কবিতা লেখার পাশাপাশি বিভিন্ন বই অনুবাদ করেছেন এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। অ্যান কার্সনের বেশিরভাগ সাহিত্যকর্মে ভাষা ও শব্দের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পেয়েছে। নতুন অর্থ ও ভাবনা তৈরির জন্য তিনি শব্দের উৎস ও ব্যুৎপত্তি নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করেন। তার অনেক লেখার শুরুই শব্দের ব্যুৎপত্তি থেকে।

অ্যান কার্সন তার পুরো সাহিত্যজীবনে লেখার নতুন নতুন ধরন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। প্রচলিত সাহিত্যিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে ভিন্নভাবে লেখার প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। এর একটি উদাহরণ ২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘ফ্লোট’। বইটিতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখা ২২টি ছোট রচনা রয়েছে। এগুলো যেকোনো ক্রমে পড়া যায়।

এ ছাড়া দৃশ্যশিল্পী, নৃত্য পরিচালক, অপেরা ও থিয়েটার পরিচালকদের সঙ্গে অ্যান কার্সনের যৌথ কাজ তার ভিন্নধর্মী চিন্তা ও সৃজনশীলতার পরিচয় দেয়। তিনি প্রচলিত সাহিত্যিক নিয়মের বাইরে গিয়ে নতুনভাবে কাজ করতে পছন্দ করেন। ১৯৯০-এর দশক থেকে আন্তর্জাতিক শিল্প ও সাহিত্য অঙ্গনে তার কাজ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। 

২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘রং নর্মা’তেও কার্সনের এই বৈচিত্র্যময় লেখার ধরন দেখা যায়। বইটিতে বিভিন্ন ধরনের রচনা রয়েছে এবং এতে অভিনয় ও মঞ্চ পরিবেশনার উপাদানও রয়েছে। একই সঙ্গে সাহিত্য, শিল্প ও শিক্ষাক্ষেত্রের নানা বিষয় তিনি এতে তুলে ধরেছেন।

প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য থেকে তার করা অনুবাদগুলোও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে গ্রিক কবি স্যাফোর কবিতার বিভিন্ন খণ্ডাংশ নিয়ে কাজ এবং ২০০২ সালে প্রকাশিত ‘ইফ নট, উইন্টার’ উল্লেখযোগ্য। তিনি গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিসের ‘ইলেক্ট্রা’ ও ‘অ্যান্টিগোন’ এবং ইউরিপিডিসের ‘বাক্কাই’ নাটকও অনুবাদ করেছেন। এসব অনুবাদ যথাক্রমে ২০০১ ও ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয়।

১৯৯০-এর দশকে অ্যান কার্সন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম প্রকাশ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ‘গ্লাস, আয়রনি অ্যান্ড গড’ কাব্যগ্রন্থের ‘দ্য গ্লাস এসে’। এই দীর্ঘ কবিতায় কবিতা, প্রবন্ধসহ বিভিন্ন সাহিত্যধারার মিশেল দেখা যায়। এর মাধ্যমে কার্সন দীর্ঘ কবিতার একটি নতুন ধরনের রূপ তুলে ধরেছেন, যেখানে বিভিন্ন সাহিত্যধারার সীমারেখা স্পষ্ট থাকে না।

১৯৯০-এর দশকে অ্যান কার্সনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশিত হয়, ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড : আ নভেল ইন ভার্স’। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত এই বইটিকে তার অন্যতম সেরা কাজ হিসেবে ধরা হয়। বইটিতে কার্সন প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যকে আধুনিক জীবন ও ভাষার সঙ্গে মিলিয়েছেন। এর মূল চরিত্র গেরিয়ন—ডানাওয়ালা এক লাল দানব।

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর গ্রিক কবি স্টেসিখোরোসের গেরিয়নকে নিয়ে লেখা একটি কবিতার খণ্ডাংশ থেকেই কার্সন এই বইয়ের ভাবনা নিয়েছেন। প্রাচীন এই গল্পকে আধুনিক ভাষা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে কার্সন বইটিতে একটি নতুন ধরনের সাহিত্যিক রূপ তৈরি করেছেন।