বইমেলায় চাকরিপ্রার্থীদের ঢল, 'স্বপ্নের চাকরি' এখন সবার হাতে
প্রকাশিত :
০৪:৫৯, ০২ মার্চ ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক: অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এ এবার এক ভিন্ন দৃশ্য চোখে পড়ছে। সাহিত্যের পাশাপাশি ক্যারিয়ার গঠনের বই ঘিরেও তৈরি হয়েছে আলাদা উচ্ছ্বাস। বিশেষ করে চাকরিপ্রার্থীদের ভিড় দেখা গেছে একটি নির্দিষ্ট স্টলের সামনে। তাদের হাতে একটি বই—\'স্বপ্নের চাকরি\'।
বহুল আলোচিত লেখক রেজুয়ান আহম্মেদের এই বইটি প্রকাশ করেছে অনিন্দ্য প্রকাশ। প্রকাশনীর স্টল নম্বর ৫৬৫ থেকে ৫৬৯—সেখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভিড় লেগেই আছে। অনেক তরুণ-তরুণীকে লাইনে দাঁড়িয়ে বই সংগ্রহ করতে দেখা গেছে। কারও হাতে বিসিএস প্রস্তুতির খাতা, কারও হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ভর্তি পরীক্ষার নোট—সবার সঙ্গী হয়ে উঠেছে \'স্বপ্নের চাকরি\'।
পাঠকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বইটিকে তাঁরা শুধু গাইড হিসেবেই নয়, অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবেও দেখছেন। চাকরির প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজেকে প্রস্তুত করতে আত্মবিশ্বাস, সময় ব্যবস্থাপনা ও মানসিক দৃঢ়তার যে প্রয়োজন, বইটিতে সে বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে তুলে ধরা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অনেকে।
বইটিতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির কৌশল, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় নিজেকে উপস্থাপনের বাস্তব টিপস এবং ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার মানসিক শক্তি নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এ কারণেই এটি তরুণদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একাধিক পাঠক জানিয়েছেন, \"চাকরির প্রস্তুতির বই অনেক আছে, কিন্তু এই বইটি আমাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে সাহায্য করছে।\"
বইমেলায় যেখানে গল্প-উপন্যাস ঘিরে সাধারণত বেশি আলোচনা হয়, সেখানে ক্যারিয়ারভিত্তিক একটি বইয়ের এমন সাড়া সবার নজর কেড়েছে। অনেকের মতে, বর্তমান সময়ে তরুণদের প্রধান চিন্তা কর্মসংস্থান—সেই বাস্তবতাই যেন প্রতিফলিত হচ্ছে এই ভিড়ে।
চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন—এমন পাঠকদের জন্য \'স্বপ্নের চাকরি\' এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। মেলায় ঘুরতে আসা অনেকেই বলছেন, হয়তো এই বই-ই বদলে দিতে পারে তাঁদের ক্যারিয়ারের মোড়।
মানবসভ্যতার ইতিহাসের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যে মূলমন্ত্রটি সমাজকে টিকিয়ে রেখেছে, তা হলো ‘মনুষ্যত্ব’। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তার সহমর্মিতা ও ভালোবাসার ক্ষমতা। কবি চণ্ডীদাস বহু বছর আগে মানুষের এই শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির সমান্তরালে মানুষের আত্মিক জগতে এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়েছে। মানুষ আজ যান্ত্রিক গতিশীলতায় অন্ধ হয়ে নিজের ভেতরের দয়া ও সহানুভূতি হারিয়ে ফেলছে। অথচ ইতিহাসের প্রতিটি সংকটে বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে, সভ্যতার শেষ আশ্রয় কোনো ইট-পাথরের প্রাসাদে নয়, বরং তা লুকিয়ে আছে মানুষের বাড়িয়ে দেওয়া উষ্ণ হাতটির ভেতর।
সময়ের আবর্তনে শহরের পিচঢালা রাজপথ, বহুতল ভবন আর নিয়ন আলোর ঝলকানিতে মানুষের জীবন সহজ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আত্মিক দূরত্ব বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। আজকের মানুষ ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলেছে এক ক্লান্তিকর ইঁদুর-দৌড়ে। প্রযুক্তি মানুষকে ভৌগোলিক দূরত্বে কাছাকাছি আনলেও হৃদয়ের বন্ধনগুলোকে এক অদৃশ্য প্রাচীরের আড়ালে বন্দি করে ফেলেছে।
এই মানবিক দেউলিয়াত্বের চরম রূপ দেখা যায় যখন মানুষের তীব্রতম কষ্ট অন্য মানুষের বিনোদনের খোরাক হয়ে ওঠে। নরসিংদী রেলস্টেশনের এক মর্মন্তুদ দুর্ঘটনায় যখন চলন্ত ট্রেনের ধাক্কায় এক রক্তাক্ত মা ও শিশু প্ল্যাটফর্মে কাতরাচ্ছিল, তখন শত শত মানুষ এগিয়ে না এসে ব্যস্ত ছিল মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় সেই মৃত্যুর দৃশ্য ধারণ করতে। মানুষের আর্তনাদ আজ স্ক্রিনের ‘কনটেন্ট’ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাইক-শেয়ারের উপাদানে পরিণত হয়েছে। যখন মানুষের জীবনের চেয়ে ভার্চুয়াল দুনিয়ার প্রসার বড় হয়ে ওঠে, তখন সমাজের আত্মিক মৃত্যু ঘটে। এই স্বার্থপরতা ও উদাসীনতা প্রমাণ করে যে, বাহ্যিক সভ্যতার মুখোশের আড়ালে মানুষ আজ একেকজন স্বার্থপর পশুতে পরিণত হচ্ছে।
শহুরে জীবনের এই যান্ত্রিক নরক ও মানসিক অবসাদ থেকে মুক্তির পথ দেখায় বাংলার চিরন্তন গ্রামীণ প্রকৃতি ও মাটির কাছাকাছি থাকা সাধারণ মানুষ। বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও দর্শনের মূল ভিত্তিই হলো মানবতাবাদ। লালন শাহের জাত-পাতহীন দর্শন, শ্রীচৈতন্যদেবের প্রেমধর্ম কিংবা রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের “শিবজ্ঞানে জীবসেবা”—সবই মানুষকে এক পরম সত্যের দিকে আহ্বান করে।
এই পরম সত্যের সন্ধান কোনো বিলাসবহুল প্রাসাদে নয়, বরং পাওয়া যায় প্রত্যন্ত গ্রামের কোনো এক দরিদ্র রিকশাচালকের মাটির কুঁড়েঘরে। জীবিকার তাগিদে যে মানুষটি দিনে রিকশা চালায়, অথচ রাতে হারিকেনের আলোয় লিও টলস্টয়, ম্যাক্সিম গোর্কি, রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুলের সাহিত্যসাধনায় মগ্ন থাকে, সেই-ই প্রকৃত মানুষ। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাঁর বেড়ে ওঠার পেছনেও ছিল জাত-ধর্মের ঊর্ধ্বে ওঠা কিছু মানুষের মানবিক হাত। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যও আমাদের শেখায়—ছোট হোক বা বড় হোক, মানুষ চরম মুহূর্তে নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দাঁড়াতে পারে। মানুষের এই দেবত্বকে বিশ্বাস করাই বেঁচে থাকার আসল পাঠ।
প্রকৃতির রুদ্ররূপ মানুষের অহংকার ও সংকীর্ণতাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের দুর্নীতির কারণে নদীভাঙন আজ এক নির্মম সত্য। মহেশপুর গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার জীর্ণ বাঁধটি যখন ধনী ব্যবসায়ী হরিহর ঘোষের মতো প্রভাবশালী মানুষের অর্থ আত্মসাতের কারণে ভেঙে পড়ে, তখন প্রকৃতি ধনী-দরিদ্রের কোনো ভেদ রাখে না। আষাঢ়ের প্রলয়ংকরী বন্যায় যখন তাসের ঘরের মতো ভেসে যায় গরিবের কুঁড়েঘর, তখন জল কিন্তু ধনীর পাকা দালানকেও রেহাই দেয় না।
কিন্তু এই প্রলয়ের মাঝেই ঘটে মানুষের আত্মিক রূপান্তর। যে রিকশাচালক রশিদুলকে সমাজ ‘ছোটলোক’ বলে অবহেলা করত, সে নিজের একমাত্র সম্বল—প্রিয় বইয়ের তাকের মায়া ত্যাগ করে নৌকার হাল ধরে মানুষের জান বাঁচাতে। অন্যদিকে, যে হরিহর ঘোষ অহংকারে অন্ধ হয়ে মানুষকে উপহাস করেছিলেন, বন্যার তীব্র স্রোতে দালান ভেঙে পড়ার মুহূর্তে তাঁর সব অর্থ-সম্পদ অর্থহীন হয়ে যায়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন:
“নারীর কোমলতা আর পুরুষের সহমর্মিতাই এই ভঙ্গুর সমাজকে টিকিয়ে রাখে।”
বিপদের মুখে শত্রুর প্রতি ক্ষোভ ভুলে নিজের জীবন বাজি রেখে মানুষকে বাঁচানোই মানুষের পরম ধর্ম। বন্যার জলে নামলে যেমন ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ থাকে না, তেমনই মানুষের মনুষ্যত্ব সমস্ত কুসংস্কার ও স্বার্থপরতার দেয়াল ধুলোয় মিশিয়ে একাকার করে দেয়।
সংকট কেটে যাওয়ার পর মানুষের বুকের ভেতরের সংকীর্ণতাও ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যায়। বিপর্যয়ের পর তৈরি হয় এক নতুন সমবায় চেতনা। অর্থের পেছনে অন্ধের মতো ছোটা মানুষও বুঝতে পারে যে, মানুষের আসল সম্পদ তার অর্থ নয়, বরং তার চরিত্র ও মানবিকতা। ধনীর অর্থ আর শ্রমিকের আদর্শ যখন মিলেমিশে একাকার হয়, তখন সমাজে এক নতুন যুগের সূচনা ঘটে। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিহীন মানুষের যৌথ চাষাবাদ ও শিশুদের অবৈতনিক পাঠশালা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে নতুন কর্মযজ্ঞ শুরু হয়, তা-ই হলো প্রকৃত সমাজসংস্কার।
ভূপেন হাজারিকার সেই অমর বাণী— “মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না... ও বন্ধু?” —কেবল একটি গান নয়, এটি আমাদের জীবনের শেষ ধ্রুবতারা। আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার মুখে মহেশপুরের গল্প এক জ্বলন্ত চপেটাঘাত। আমরা যখন নিজের স্বার্থের গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে পড়ি, তখন প্রলয়ের রাতগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের চেয়ে বড় এই মহাবিশ্বে আর কিছু নেই। আসুন, আমরা আমাদের ভেতরের স্বার্থপরতার মুখোশটি ছিঁড়ে ফেলি। বিপদে পড়া মানুষের দিকে ফোনের ক্যামেরা না বাড়িয়ে সাহায্যের হাতটি বাড়িয়ে দিই। আসুন, আমরা আবার প্রকৃত অর্থে মানুষ হয়ে উঠি।