img

স্বপ্নের বিসর্জন

প্রকাশিত :  ০৮:৫৯, ১০ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১০:০৯, ১০ মে ২০২৬

স্বপ্নের বিসর্জন

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

গড়াই নদীর বুক চিরে যখন সকালের হিমেল হাওয়া বয়ে যায়, তখন কুষ্টিয়ার পাংশার মাটির সোঁদা গন্ধ দিগন্তে মিশে যেতে চায়। এখানকার মাটি কেবল উর্বরই নয়, বরং মহাকালের এক জীবন্ত সাক্ষী। পদ্মা, চন্দনা আর গড়াই— এই তিন নদীর পলিবিধৌত জনপদকে দেখলে মনে হয়, বাংলার আদি প্রকৃতি নিজ হাতে সিঞ্চন করে গড়ে তুলেছে তার এই প্রিয় সন্তানকে।

সেই পাংশাতেই বাড়ি সাইদুল ইসলামের। বয়স তেইশ ছুঁই ছুঁই। দুচোখে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে যখন সে হাঁটে, পথিকও যেন থমকে দাঁড়ায়। তবে সেই উজ্জ্বল চোখের মণিকোঠায় চেনা যায় দারিদ্র্যের এক ধূসর ছায়া। সাইদুলের সারা অবয়ব জুড়ে গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপ। তার মনটা মাটির মতোই সহজ, সরল, নির্লোভ ও অতিথিপরায়ণ। গ্রামের ছোট-বড় সবাই তাকে এক নামে ‘সাইদুল’ বলেই চেনে; এর বাইরে তার আর কোনো বাড়তি পরিচয়ের প্রয়োজন পড়ে না।

পাংশার ইতিহাস ঘাটলে প্রাচীন বঙ্গ সমতটের কথা উঠে আসে। এখানকার মানুষের কথ্য ভাষায় ‘স’ বর্ণটি অবলীলায় ‘হ’ হয়ে যায়— যেন জীবনের সব আশাই এখানে ‘হওয়া’র প্রতীক্ষায় প্রহর গোনে। সাইদুলের শৈশবটাও ছিল সেই অতি সাধারণ ‘হওয়া’র গল্পে মোড়া। মায়ের ডাকে ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, শিশিরভেজা মাঠে খালি পায়ে দৌড়ানো, আর বিকেলে নদীর কূলে বসে বাউল গানের সুর শোনা। খাবারের পাতে পাংশার বিখ্যাত চমচম, দই, তিলের খাজা কিংবা শীতের সন্ধ্যায় কুলফি মালাই— সব মিলিয়ে এক মায়াবী জগৎ ছিল তার।

কিন্তু সেই রঙিন জগতে একদিন অনটনের করাল গ্রাস হানা দিল। অভাব যখন সাইদুলের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াল, বাবা-মায়ের জীর্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে সে বুঝল— সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোই এখন তার একমাত্র ব্রত। আর সেই সচ্ছলতার সিঁড়ি হিসেবে বেছে নিল ‘প্রবাস’ নামক সোনার হরিণকে। স্বপ্নের পিছু ছুটতে ছুটতে সাইদুল একদিন পাড়ি জমাল যান্ত্রিক শহর ঢাকায়। সে জানত না, তার স্বপ্নের এই রাজপথ শেষ পর্যন্ত কোন অন্ধকার খাদের গভীরে গিয়ে মিশবে।

‘আমিরা ট্রাভেলস’ অফিসের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে যখন সে মালিকের কথা শুনছিল, তখন তার চোখে আশার আলো জ্বলজ্বল করছিল। মালিকের প্রতিটি শব্দ তার কানে অমৃতের মতো শোনাল: "সৌদি আরবে ক্লিনারের কাজ, বেতন ১২০০ রিয়াল, থাকা-খাওয়া কোম্পানির, আট ঘণ্টা ডিউটি। তার ওপর ওভারটাইমও আলাদা। বিশ্বাস করেন মিয়া, মাত্র সাড়ে চার লাখ টাকা দিলেই আপনার কপাল খুলে যাবে।"

সাইদুলের দীর্ঘশ্বাস ভারী হয়ে এল। সাড়ে চার লাখ টাকা! এই বিপুল অর্থ সে কোথা থেকে জোগাড় করবে? বাবা-মায়ের শেষ সম্বলটুকু তো গত দেড় বছরের দৌড়ঝাঁপেই শেষ হয়ে গেছে।

তারপর শুরু হলো অর্থ সংগ্রহের এক মরণপণ লড়াই। পৈতৃক জমি বন্ধক রাখা হলো, গ্রামের মহাজন অলি মিয়ার কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নেওয়া হলো। সাইদুল ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি, এই ঋণের বিষবৃক্ষ তাকে একদিন কত বড় মাশুল গুনতে বাধ্য করবে। বৃদ্ধ বাবা, যার শরীর আর ক্ষেতের পরিশ্রম সইতে পারে না, তিনিও ছেলের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজের শেষ অস্তিত্বটুকু মহাজনের কাছে বন্ধক রাখলেন।

টাকা জোগাড় হলো। সাইদুলের হাতে যখন সাড়ে চার লাখ টাকা এল, তখন নিজেকে রাজকুমার মনে হলো। কিন্তু সেই রাজকুমারের সিংহাসন ছিল আগুনের ওপর পাতা। বারবার ফ্লাইট বাতিলের খবরে শ্বশুরবাড়িতে তার সম্মান ধুলোয় মিশে যাচ্ছিল। বন্ধুদের ব্যঙ্গাত্মক তীর তাকে বিদ্ধ করত: "আবার যাওয়ার গল্প করিস? তোর কি আসলেই ফ্লাইট হয়, নাকি সব ভুয়া?"

প্রথমবার যেতে না পেরে সাইদুল পরাজিত সৈনিকের মতো ফিরে এল। দ্বিতীয়বারেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। তৃতীয়বারও ব্যর্থ। প্রতিবার বিদায়বেলায় আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর সামনে সে যে বুক চিতিয়ে বিদায় নিয়েছিল, ফিরে আসার সময় সেই বুক লজ্জায় কুঁকড়ে যেত। অপমানের আগুনে তার আত্মা প্রতিনিয়ত পুড়ে ছারখার হচ্ছিল।

চতুর্থবার যখন সে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলো, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল— হয় প্রবাসে যাবে, নয়তো চিরতরে হারিয়ে যাবে; কিন্তু এই মুখ নিয়ে আর গ্রামে ফিরবে না।

আমিরা ট্রাভেলস তাকে ফকিরাপুলের এক ঘিঞ্জি মেসে থাকার ব্যবস্থা করে দিল। ঘরটি এতই ছোট যে সোজা হয়ে দাঁড়াতেও ঘাড় বাঁকা করতে হয়। সেখানে বিশ-পঁচিশ জন প্রবাসপ্রত্যাশী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কোনোমতে দিন কাটায়। রাত নামলেই মেসের অন্ধকার কোণ থেকে ভেসে আসত চাপা কান্নার আওয়াজ আর দীর্ঘশ্বাস।

কেউ বলত, "তিন বছর পার হয়ে গেল, ভিসা হয় না। দালালের ঠিকানাও পাই না।" কেউ বলত, "ছয় মাস সৌদি আরব ছিলাম। কাজ পাইনি, ইকামা ছিল না। জেল খেটে দেশে ফিরেছি। এখন আবার দালালের পেছনে ঘুরছি।"

এসব আর্তনাদ শুনে সাইদুলের বুক ফেটে যেতে চাইত। মেসের ছাদে একা বসে সে কুষ্টিয়ার নদীর গন্ধ খুঁজত। লালন সাঁইয়ের গান তার কানে বাজত— "বিষয় বিষে চঞ্চলা মন দিবা রজনী, মনকে বোঝালে বুঝ মানে না ধর্মকাহিনী।" সাড়ে চার লাখ টাকার সেই ‘বিষয়-বিষ’ তাকে প্রতি মুহূর্তে দংশন করছিল। ঋণের কিস্তির জন্য বাবার আর্তনাদ ফোনে ভেসে আসত— "বাবা, মহাজন তো তাগাদা দিচ্ছে। জমিটা বোধহয় আর বাঁচানো যাবে না।"

একদিন অফিসে গিয়ে সাইদুল শুনল, তার ফ্লাইট আবারও অনিশ্চিত। বিলম্বের কারণ কেউ স্পষ্ট করে বলছে না। চার দিন অপেক্ষার পর মালিকের দেখা মিলল। তখন দুপুরের ঘড়িতে সাড়ে তিনটা বাজে। সেদিন ঢাকার আকাশ ছিল মেঘলা, কিন্তু সাইদুলের অন্তরে তখন বইছিল কালবৈশাখী ঝড়।

অফিসের ভেতরে এসি চলছে, মালিক আরাম করে মোবাইলে কথা বলছেন। সাইদুলকে দেখেই তিনি উদাসীনভাবে বললেন, "বসেন মিয়া। ফ্লাইটের ব্যাপারটা একটু জটিল হয়ে গেছে। আগামী মাসে ব্যবস্থা হবে ইনশাআল্লাহ।"

আগামী মাস! এই একই সান্ত্বনা সে দেড় বছর ধরে শুনে আসছে। সাইদুলের মাথার ভেতর যেন অগ্ন্যুৎপাত শুরু হলো। বাবার জীর্ণ চেহারা, মায়ের চোখের জল, শ্বশুরবাড়ির বিদ্রূপ আর বন্ধুদের বাঁকা হাসি— সবকিছু একসঙ্গে তার চোখের সামনে ভিড় করল। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পাশে থাকা একটি ভারী কাঠের চেয়ার তুলে নিল সে। মালিক কিছু বুঝে ওঠার আগেই চেয়ারটি সজোরে তার মাথায় আঘাত করল। মুহূর্তেই শুভ্র টাইলের মেঝেতে রক্তের ধারা বইতে শুরু করল। সেই লাল রক্ত যেন সাইদুলের সাড়ে চার লাখ টাকার আর্তনাদ।

অফিসে হৈচৈ পড়ে গেল। কেউ পুলিশ ডাকল, কেউ হাসপাতালে ছুটল। কিন্তু সাইদুল নড়ল না। সে পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে আর জল আসছিল না, কেবল বুকের ভেতরটা এক অজানা ভারে থমকে ছিল। সে জানত, আজ তার সব পিছুটান শেষ হয়ে গেছে।

পুলিশ এসে তাকে হাতকড়া পরিয়ে দিল। সাইদুলের সেই সরল চেহারায় তখন কোনো ভাবের পরিবর্তন ছিল না। কেবল একটি প্রশ্নই তার মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল— এই ঋণের বোঝা কি কোনোদিন তার ঘাড় থেকে নামবে?

থানায় মামলা হলো গুরুতর আঘাতের (ধারা ৩২৫ ও ৩২৬)। ‘বিপজ্জনক অস্ত্র’ হিসেবে চেয়ার ব্যবহারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টার মামলাও আনা হলো। সাত বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সম্ভাবনা। সে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু যে আইন তাকে দেড় বছর ধরে প্রতারিত হওয়া থেকে বাঁচাতে পারেনি, সেই আইনই তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করল।

আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ বাবা অশ্রুসজল চোখে বললেন, "আমার ছেলে খুনি না স্যার। ও শুধু ওর হকের টাকাটা চেয়েছিল। মহাজনের চাপে আমরা পথে বসেছি। ওর ওপর অপমানের বোঝাটা বড় বেশি ভারি ছিল।" কিন্তু আইনের কাছে আবেগ মূল্যহীন। সাইদুলকে যেতে হলো অন্ধকার কারাপ্রকোষ্ঠে।

জেলখানার লোহার শিকের আড়ালে বসে সে এখন কুষ্টিয়ার নদীর কথা ভাবে। গড়াইয়ের জলের সেই মাটির গন্ধ কি আর কোনোদিন নাকে আসবে? মা কি আর কোনোদিন পাতে ডাল-ভাত তুলে দেবেন? সে তো শুধু একটু সচ্ছলতা আর সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চেয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তার কপালে জুটল কারাবাস।

এদিকে ‘আমিরা ট্রাভেলস’ কয়েকদিন বন্ধ থেকে আবার চালু হয়ে গেল। আরও কত নাম-না-জানা এজেন্সি এভাবেই মানুষের স্বপ্নের রক্ত চুষে এসি রুমে বসে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। পাংশার ঘাটে দাঁড়িয়ে আজও এক বৃদ্ধ বাবা নদীর দিকে তাকিয়ে থাকেন। জলের ঢেউয়ে তিনি ছেলের কণ্ঠ শোনেন— "বাবা, আমি বড় হতে যাচ্ছি। টাকা পাঠাব। দেড় বছরের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে।"

দেড় বছর পার হয়েছে। সাইদুল ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু এ ফেরা বড় কষ্টের। গ্রামের লোক এখনো বলে, দালালের হাতে টাকা দেওয়াটাই ছিল ভুল। কিন্তু সাইদুলের মতো সাধারণ মানুষের আকাশছোঁয়া স্বপ্নের সামনে বাস্তবতা বরাবরই নড়বড়ে।

কুষ্টিয়ার তিলের খাজা কিংবা কুলফি মালাইয়ের স্বাদ আর তার জীবনে ফেরেনি। পরিবর্তে কপালে জুটেছে গভীর ক্ষত আর দীর্ঘমেয়াদি সাজা। লালনের গানের সেই কলিটিই যেন এখন সাইদুলের জীবনের পরম সত্য— "কী করি কী কই ভূতের বোঝা বই, একদিন ভাবলাম না গুরুর বাণী।"

সাইদুলের এই ট্র্যাজেডি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি চলমান বৃত্ত। প্রতিদিন কোনো না কোনো সাইদুল দালালের খপ্পরে পড়ছে, ফকিরাপুলের মেসে নতুন কেউ নাম লিখিয়ে আসছে। স্বপ্নের এই বিসর্জন অবিরাম চলছে। এই ব্যবস্থা বদলাতে প্রয়োজন সরকারি স্বচ্ছতা ও দালাল সিন্ডিকেটের বিনাশ। তা না হলে সাইদুলের মতো হাজারো পাখির ডানা এভাবেই ভেঙে যাবে, আর স্বপ্নগুলো ধুলোয় মিশে যাবে নিঃশব্দে।

— সমাপ্ত —

img

আমি লেখক নই, আমি শব্দের টুকাই

প্রকাশিত :  ১৯:২৭, ১৬ জুন ২০২৬

রেজুয়ান আহম্মেদ

মানুষের কিছু পরিচয় অযাচিত, যা সময় নিজে এসে কাঁধে চাপিয়ে দেয়। আবার কিছু পরিচয় মানুষ বেছে নেয় সম্পূর্ণ নিজের তাগিদে—একেবারে নিভৃতে, কোনো ঢাকঢোল না পিটিয়ে। আমার পরিচয়টা পরের দলের। কেউ যখন অবলীলায় জিজ্ঞেস করে বসেন, \"আপনি কি লেখক?\"—আমি খানিকটা থমকে যাই। \'লেখক\' শব্দটার একটা নিজস্ব ওজন আছে, এক ধরনের গাম্ভীর্য আছে; যা আমার ঠিক আসে না। তাই মৃদু হেসে আলতো করে দায় এড়াতে বলি, \"আমি লেখক নই, বড়জোর শব্দের টুকাই।\"

\'টুকাই\' শব্দটার গায়ে এক চিলতে অনাড়ম্বর সারল্য লেগে থাকে। অলিগলিতে বা চেনা চত্বরে আমরা এমন কিছু মানুষকে দেখি, যারা সবার ফেলে দেওয়া টুকরো জিনিস কুড়িয়ে বেড়ায়। পথচলতি মানুষের চোখে ওগুলো স্রেফ আবর্জনা হলেও, ওই সংগ্রাহকের চোখে তার প্রতিটিই মূল্যবান। সে জানে, এই আপাত-পরিত্যক্ত ভাঙাচোরার বুকেও কোনো না কোনো জীবনের আখ্যান লুকিয়ে থাকে।

আমার কাজটাও আলাদা কিছু নয়; তফাত শুধু আমি কুড়িয়ে নিই ছিটকে পড়া সব শব্দ।

ভিড়ের মধ্যে আচমকা খসে পড়া কোনো অবহেলিত বাক্য, মায়ের বুকের গভীর থেকে আসা এক দীর্ঘশ্বাস, শ্রমিকের চেরা কণ্ঠস্বর, বৃদ্ধ বাবার একা হয়ে যাওয়া বিকেল, শিশুর অকারণ খিলখিল কিংবা নিঝুম রাতে বালিশে মুখ গোঁজা চাপা কান্না—এসবই আমার সঞ্চয়। আমি সেগুলোকে পরম যত্নে মনের কোনো এক গোপন কুঠুরিতে জমিয়ে রাখি। তারপর কোনো এক অলস অবসরে সেই জমা হওয়া উপাদানগুলোই নতুন গল্পের অবয়ব নেয়।

অনেকের ধারণা, গল্প মানেই জাদুকরী কল্পনা। আমার তা মনে হয় না। বিশ্বাস করি, এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর গল্পকার হলো স্বয়ং \'জীবন\'। আমরা যারা লিখতে বসি, তারা আসলে সেই প্রবহমান জীবনের এক-একজন সামান্য অনুবাদক মাত্র। জীবন যা আড়ালে বলে যায়, আমরা তাকেই অক্ষরে বাঁধি; সময় যা দেখিয়ে যায়, আমরা তাকেই বাক্যের সুতোয় বুনে রাখি।

দিনকয়েক আগে বাজারের এক কোণে এক বৃদ্ধকে দেখেছিলাম। হাতে জীর্ণ একটা বাটন ফোন, যার রঙ চটে গেছে বহু আগে। শার্টের পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে তিনি বারবার কী যেন মিলিয়ে দেখছিলেন। কৌতূহল সামলাতে না পেরে কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, \"কী খুঁজছেন, চাচা?\"

তিনি ম্লান হেসে বললেন, \"ছেলেদের মোবাইল নম্বরগুলো লিখে রাখছি বাবা। ফোনটা তো বুড়ো হয়েছে, কখন নষ্ট হয়ে যায় ঠিক নেই। কাগজটা থাকলে নম্বরগুলো অন্তত হারাবে না।\"

কথাটা শোনার পর মনে হলো, ওটা তো কেবল কিছু সংখ্যার খতিয়ান নয়, ওটা আসলে এক বাবার বুকপকেটে আগলে রাখা ভালোবাসার দলিল। এই ডিজিটাল যুগে, যেখানে আঙুলের ডগায় হাজারো নম্বর নিমেষে সংরক্ষিত থাকে, সেখানে একজন বাবা সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগের শেষ সূত্রটুকু কাগজের টুকরোতে বাঁচিয়ে রাখছেন। কারণ নম্বর হারালে যে বড্ড একলা হয়ে যেতে হবে!

সেদিন ডায়েরির পাতায় কোনো গল্প উঠেনি, শুধু দৃশ্যটা বুকের ভেতর গেঁথে গিয়েছিল। পরে বুঝেছি, গল্পের আসল বীজ তো ওখানেই ছড়ানো ছিল।

পথ হাঁটতে হাঁটতে এইটুকু বুঝেছি, মানুষের আসল সম্পদ তার অনুভূতি। ক্ষমতা, দাপট, ধনদৌলত—সবই একসময় ধুলোয় মেশে, কেবল অনুভূতিটুকুই অমর। সন্তানের পথ চেয়ে থাকা মায়ের ব্যাকুলতা, প্রেমিকের আজন্ম ব্যর্থতা, চাতক পাখির মতো বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকা কৃষকের চশমাহীন চোখ কিংবা প্রবাসে বসে ঈদের দিনে ঘরের জন্য হাহাকার—এসব অনুভূতির কোনো মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ থাকে না।

আমি নিজেকে সেই অনুভূতির এক সামান্য ফেরিওয়ালা ভাবতেই পছন্দ করি।

ভোরের ঘাসে জমে থাকা শিশিরের মতো ছোট ছোট অনুভূতি কুড়িয়ে এনে আমি শব্দের মালায় গাঁথি, তারপর তুলে দিই পাঠকের হাতে। কেউ সেখানে নিজের ফেলে আসা ছায়া দেখতে পান, কেউ খুঁজে পান চেনা স্মৃতি, আবার কেউ হয়তো নতুন করে বাঁচার একটুখানি রসদ পান।

অনেকে লেখালেখিকে পেশা বলেন, কারও কাছে এটা সাধনা কিংবা শুদ্ধ শিল্প। আমার কাছে এর চেয়ে বড় সত্য হলো—এটি এক মানুষের বুক থেকে অন্য মানুষের বুকে পৌঁছানোর সেতু। যখন সাদা পাতায় কলম ঘষি, তখন নিজেকে আর একলা মনে হয় না। মনে হয় আমার চারপাশের অজস্র মানুষ, তাঁদের অধরা স্বপ্ন, ক্লান্তি, আশা আর গোপন দীর্ঘশ্বাসগুলো এসে মিশে যাচ্ছে আমার কালির স্রোতে।

এই চেনা পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষের বুকেই একটা না বলা উপাখ্যান থাকে। কেউ তা প্রকাশ করতে পারে, কেউ পারে না। কেউ অপবাদে জড়ানোর ভয়ে কুঁকড়ে থাকে, কেউ আবার সুযোগের অভাবে নীরব হয়ে যায়। আমি সেই স্তব্ধ অধ্যায়গুলোর একনিষ্ঠ শ্রোতা হতে চাই। জীবনের সবচেয়ে দামি পাতাগুলো তো আসলে নিঃশব্দেই ওল্টায়।

একজন রিকশাচালক যখন সারাদিন রোদে পুড়ে ঘরে ফেরেন, তাঁর সেই ক্লান্তির বিবরণ সংবাদপত্রের মূল শিরোনাম হয় না। একজন গৃহিণী যখন নিজের চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দিয়ে সংসার টানেন, তাঁর জন্য কোনো পুরস্কার বরাদ্দ থাকে না। নামমাত্র বেতনে যে শিক্ষক শত শত ভবিষ্যৎ গড়ে দিচ্ছেন, ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম খোদাই করা থাকে না।

অথচ প্রকৃত গল্পগুলো তো ঠিক এই অন্তরালেই লুকিয়ে থাকে। আমি শুধু সেই আড়ালের আখ্যানগুলো খুঁজে বেড়াই।

সময়ের ধুলোবালির নিচে চাপা পড়া জীবনগুলো এত বেশি সাধারণ যে, সাধারণ চোখে তা অলক্ষ্যেই থেকে যায়। অথচ ওই সাদামাটা যাপনের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে মহাকাব্যের সৌন্দর্য। একটা গ্রামের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা নিঃসঙ্গ কদমগাছ, একটা জরাজীর্ণ সাঁকো, পুরোনো স্কুলঘর কিংবা উদাস হয়ে থাকা কোনো পার্কের বেঞ্চ—দুনিয়ার কোনো কিছুই গল্পহীন নয়। শুধু তা শোনার মতো কান আর ছোঁয়ার মতো একটা সংবেদনশীল হৃদয় থাকতে হয়। আমি কেবল সেই হৃদয়টুকুকে মরে যেতে দিই না।

চারপাশে যখন ইঁদুরদৌড়, ক্ষোভ আর তীব্র কোলাহল দেখি, তখন আমি মানুষের চোখের দিকে তাকাই। প্রতিটি চোখেই একটা করে অসমাপ্ত উপন্যাস বোনা থাকে। কেউ সেখানে সুখের পরিচ্ছেদ লিখছেন, কেউ দুঃখের; কেউ নতুন স্বপ্নের প্রাক্কথন সাজাচ্ছেন, কেউ বা বিদায়ের শেষ লাইনটি টেনে চলে যাচ্ছেন।

আমি তাঁদের পাশে একটু বসি। শুনি। অনুভব করি। তারপর মনের অজান্তেই শব্দগুলো কুড়িয়ে নিই।

আমার এই ঝুলির শব্দগুলো খুব দামি বা অলংকৃত নয়। কোনো রাজকীয় বিপণি থেকে এগুলো সংগৃহীত হয়নি। এগুলো উঠে এসেছে পথের ধুলোবালি থেকে, মানুষের আটপৌরে যাপন আর বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস থেকে। হয়তো সে কারণেই সাধারণ মানুষ আমার লেখার লাইনে নিজেদের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পায়।

যখন কোনো পাঠক এসে বলেন, \"আপনার লেখাটা পড়ার পর মনে হলো, এটা তো আমারই ভেতরের কথা\"—তখন মনে হয়, এই ধুলো ঘেঁটে শব্দ কুড়ানোর ক্লান্তিটুকু এক নিমেষে সার্থক হলো। সাহিত্য তো শেষ পর্যন্ত মানুষের বুকেই আশ্রয় খোঁজে; কোনো বইয়ের মধ্যে তাকে বন্দী করে রাখা তার নিয়তি নয়।

আমি বিশ্বাস করি, সমাজ বা মনস্তত্ত্ব বদলে দেওয়ার চাবিকাঠি সবসময় দীর্ঘ বক্তৃতার মঞ্চে থাকে না। কখনো কখনো একটা ছোট গল্প, একটা সহজ সরল বাক্য কিংবা এক চিলতে আন্তরিক অনুভূতিও মানুষের ভেতরের নিভে যাওয়া আলোটাকে নতুন করে জ্বালিয়ে দিতে পারে। যে আলো মানুষকে একটু বেশি মানবিক হতে শেখায়, অন্যের ক্ষতটাকে নিজের বলে চিনতে শেখায়, আর মানুষকে ভালোবাসতে বাধ্য করে।

তাই বুক ফুলিয়ে লেখক হওয়ার কোনো দাবি আমার নেই। তেমন কোনো মহৎ কৃতিত্বও আমি অর্জন করিনি। আমি কেবল মানুষের চলার পথে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অনুভূতির কণাগুলো কুড়িয়ে আনি। কারও ফেলে যাওয়া ভাঙা স্মৃতি, কারও ভুলে যাওয়া আবেগ, কারও অবহেলিত স্বপ্ন—এসব দিয়েই নিজের মতো করে মালা গাঁথি।

হয়তো কোনো এক সময় মানুষ আমার নামটা ভুলে যাবে, আমার লেখাগুলোও মহাকালের স্রোতে ভেসে যাবে। কিন্তু যদি কোনো একটি লাইনও কোনো এক উদাসীন পাঠকের চোখে এক ফোঁটা জল এনে দিতে পারে, কোনো এক ভগ্নহৃদয় মানুষকে নতুন করে দাঁড়ানোর সাহস দেয়—তবেই বুঝব আমার এই জীবন বৃথা যায়নি।

আমি তো যশের ক্যানভাসার নই। আমি অনুভূতির বাহক, সময়ের ধুলোয় লুকিয়ে থাকা গল্পের এক সামান্য অন্বেষী।

আমি লেখক নই, আমি শব্দের টুকাই।

আজও পথ চলতে চলতে আমি মানুষের হাসি, কান্না, মান-অভিমান আর অন্তহীন অপেক্ষা থেকে শব্দ কুড়িয়ে চলি। প্রতিটি দিন আমাকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়, নতুন কিছু অনুভব করায়। আর আমি সেই অনুভূতিগুলো যত্ন করে পকেটে পুরে রাখি।

হয়তো কোনো এক নিঝুম রাতে, যখন চরাচর নিস্তব্ধ হয়ে যাবে, তখন ওই কুড়িয়ে আনা শব্দগুলো আবার ডানা মেলবে। তারা গল্প হবে, স্মৃতি হবে, আর ঠাঁই করে নেবে কোনো এক মানুষের নিভৃত হৃদয়ে।

সেদিনও যদি কেউ শুধায়, আমি একই উত্তর দেব—

আমি লেখক নই, আমি শব্দের টুকাই; মানুষের জীবনের রাজপথে ছড়িয়ে থাকা অনুভূতির কণা কুড়িয়ে বেড়ানো এক নামহীন পথিক।

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর