img

নীরবতার ভেতর যে সাহিত্য কথা বলে

প্রকাশিত :  ০৫:২৬, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬

নীরবতার ভেতর যে সাহিত্য কথা বলে

প্রফেসর শওকত আনোয়ার

সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের দৃশ্যপটে এমন কিছু লেখকের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, যাঁরা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে আগ্রহী নন; অথচ তাঁদের রচনা নিরবচ্ছিন্নভাবে পাঠকের হৃদয়ে গভীর জায়গা করে নেয়। রেজুয়ান আহম্মেদ সেই বিরল ঘরানার একজন—যিনি নিজেকে আড়ালে রাখতে পছন্দ করেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিকর্ম নিজস্ব শক্তিতে পাঠকের সামনে উন্মোচিত হয়।

বর্তমান সময়ে সাহিত্য অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। লেখকের উপস্থিতি, বক্তব্য ও অবস্থান—সবকিছু মিলিয়ে সাহিত্য যেন দৃশ্যমানতার এক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে রেজুয়ান আহম্মেদের লেখালেখি তাঁর নিজস্ব ‘নীরবতার’ কারণে আলাদাভাবে চোখে পড়ে। তিনি নিজেকে ‘লেখক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিযোগিতায় নামেননি; বরং তাঁর লেখাকেই নিজের প্রতিনিধি হতে দিয়েছেন। এই সচেতন নিভৃতচারিতা তাঁকে আড়াল করেনি, বরং সময়ের বিবর্তনে তাঁর গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যিক পরিচয় একমাত্রিক নয়। তিনি একাধারে কবি, গল্পকার, গীতিকার, কলামিস্ট, পুঁজিবাজার বিশ্লেষক এবং পেশাগতভাবে একজন সফল ব্যবসায়ী। বাংলা ও ইংরেজি—উভয় ভাষাতেই তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ লক্ষণীয়। এই বহুমাত্রিকতা তাঁর লেখাকে কৃত্রিমভাবে ভারাক্রান্ত করে তোলে না, বরং বিষয়ভেদে ভাষা ও ভঙ্গির এক স্বাভাবিক রূপান্তর ঘটায়।

তাঁর গ্রন্থগুলোর দিকে তাকালে বিষয়বৈচিত্র্য ও মানবিক গভীরতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এক মুঠো গল্প, মায়াবী মুহূর্ত, শঙ্খের শপথ, আলোকছায়া, সন্দেহের ছায়া, অদৃশ্য কান্না, কিংবা শব্দে তুমি—এই বইগুলোতে ব্যক্তিগত অনুভূতি, সামাজিক বাস্তবতা ও অন্তর্লীন মানবিক সংকট একসূত্রে গাঁথা। এগুলো উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ নয়, বরং কিছু নীরব প্রশ্ন—যা পাঠককে ভাবনার খোরাক দেয়।

পাশাপাশি সাদা অ্যাপ্রনের আড়ালে বা স্বপ্নের চাকরি–র মতো রচনায় পেশাগত জীবনের বাস্তবতা উঠে এসেছে সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল ভাষায়। এখানে অভিজ্ঞতার নির্যাস আছে কিন্তু আত্মশ্লাঘা নেই; আছে প্রখর পর্যবেক্ষণ, কিন্তু উপদেশমূলক ভঙ্গি নেই।

রেজুয়ান আহম্মেদের লেখালেখির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে রচিত তাঁর কাজগুলো। গাজার দিনগুলো, The Day of Gaza, অ-জল নির্বাসন—এসব লেখা কেবল সাহিত্যিক প্রয়াস নয়, বরং সময়ের একনিষ্ঠ সাক্ষ্য। যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে মানুষের হাহাকারকে তিনি তুলে এনেছেন নির্মোহ ভাষায়, কিন্তু গভীর সহমর্মিতার সঙ্গে। এই লেখাগুলো কোনো পক্ষপাতমূলক প্রচার নয়, বরং মানবিক বোধের এক নীরব দলিল।

একইভাবে বন পাখির প্রেম ও Love of the Forest Bird–এ প্রকৃতি, প্রেম ও স্বাধীনতার প্রতীকী উপস্থাপন পাঠককে নিয়ে যায় এক ভিন্ন অনুভূতির জগতে—যেখানে ভাষা সহজবোধ্য হলেও তার ইঙ্গিত অত্যন্ত গভীর।

তাঁর লেখনীর সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত তাঁর অহংকারহীনতা। ভাষা কখনো গুরুগম্ভীর অলংকারে আচ্ছন্ন হয় না, আবার অতি-সরলতায় ভঙ্গুরও হয়ে ওঠে না। তিনি পাঠককে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দেন; নিজের মত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন না। এই সংযমই তাঁর লেখাকে বিশ্বাসযোগ্য ও ধ্রুপদী করে তোলে।

ব্যক্তিজীবনে রেজুয়ান আহম্মেদ প্রচারবিমুখ। সাহিত্যিক উপস্থিতিকে তিনি ব্যক্তিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে রাখেন। তবু তাঁর লেখা নিয়মিত পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়—নীরবে, কিন্তু ধারাবাহিকভাবে। সম্ভবত এখানেই তাঁর অবস্থানের দৃঢ়তা: তিনি নিজেকে নয়, নিজের ভাবনাকে সামনে রাখেন।

যখন সমসাময়িক সাহিত্য ক্রমে দ্রুত ভোগের উপাদানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, তখন রেজুয়ান আহম্মেদের মতো লেখকরা আমাদের মনে করিয়ে দেন—সাহিত্য আসলে আত্মপ্রচারের মাধ্যম নয়, বরং এটি আত্মউন্মোচনের পথ। নীরবতার আড়ালে থাকা এই বহুমাত্রিক সাহিত্যিক তাই কেবল একটি নাম নন, বরং সময়ের সঙ্গে সংলাপে রত এক ব্যতিক্রমী কণ্ঠস্বর।


লেখক: প্রফেসর শওকত আনোয়ার, স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র

img

অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এর স্টল ভাড়া ৫৫ শতাংশ মওকুফ

প্রকাশিত :  ১৯:৫০, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এর স্টল ভাড়া ৫৫ শতাংশ মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আজ মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানান মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. মো. সেলিম রেজা।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আসন্ন অমর একুশে বইমেলা-২০২৬ আয়োজন সম্পর্কে প্রকাশকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় বাংলা একাডেমির শহিদ মুনীর চৌধুরী সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।

সভায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশকরা প্রকাশনা-শিল্পের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে সরকারের কাছে বিভিন্ন দাবি পেশ করেন। সংস্কৃতি উপদেষ্টা গ্রন্থনীতি প্রণয়নসহ অধিকাংশ দাবির সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে লিখিত প্রস্তাব পেশ করার আহ্বান জানান।

সভায় উপদেষ্টা আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া বইমেলায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রকাশকদের স্টল ভাড়া সরকারের পক্ষ থেকে ৫৫ শতাংশ মওকুফের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ইতোমধ্যে যেসব প্রকাশক স্টল ভাড়ার টাকা একাডেমিতে জমা দিয়েছেন, তাদের জমাকৃত অতিরিক্ত টাকা বইমেলা কর্তৃপক্ষ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। যারা এখনো টাকা জমা দেননি, তারা নতুন নির্ধারিত হারে সরাসরি টাকা জমা দিতে পারবেন।

সভায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম, অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড.মো. সেলিম রেজা