img

সীমান্তের ওপারে মানুষের মুখ: ‘গাজায় দিনগুলো’ নিয়ে কিছু কথা

প্রকাশিত :  ১৯:৪৪, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সীমান্তের ওপারে মানুষের মুখ: ‘গাজায় দিনগুলো’ নিয়ে কিছু কথা

✍️ ড. নাজমুল ইসলাম 

সাহিত্য কখনো কখনো সংবাদপত্রের চেয়েও দ্রুত ইতিহাসকে স্পর্শ করে। কিছু বই থাকে যেগুলো পড়তে পড়তে মনে হয়—আমরা কেবল গল্প পড়ছি না, বরং সময়ের ক্ষতস্থান ছুঁয়ে দেখছি। রেজুয়ান আহম্মেদের গল্পসংকলন ‘গাজায় দিনগুলো’ তেমনই এক সৃষ্টি, যা যুদ্ধের শোরগোলের ভেতর মানুষের নীরব কান্নাকে শব্দে রূপ দিয়েছে।

এই সংকলনের প্রধান আখ্যান আবরা নামের এক ফিলিস্তিনি স্কুলশিক্ষিকাকে ঘিরে। তাঁর জীবনের ভাঙাচোরা দিনগুলোর সমান্তরালে এক অদ্ভুত স্বপ্নধারা এসে মিশে যায় শির নামের এক আহত ইসরায়েলি কিশোরীর সঙ্গে। স্বপ্ন এখানে কেবল কল্পনা নয়—বরং এক সেতু, যা দুই বৈরী ভূখণ্ডের দুই কিশোরী মনকে ট্রমার অভিন্নতায় যুক্ত করে। লেখক অত্যন্ত সংযমের সঙ্গে দেখিয়েছেন যে, ট্রমা কোনো জাতিসত্তা মানে না; ব্যথার ভাষা আলাদা হয় না। আবরা যখন শিরের গল্প বলার সংকল্প নেয়, তখন সে আসলে নিজের অস্তিত্বকেই পুনরুদ্ধার করে। এই বিন্দুতেই বইটি রাজনৈতিক বক্তব্যের ঊর্ধ্বে উঠে এক মানবিক বিবৃতিতে রূপান্তরিত হয়।

সংকলনের অন্যান্য গল্পেও লেখক সংঘাতের ভেতর মানবিকতার ক্ষীণ অথচ দৃঢ় আলো খুঁজেছেন। কখনো কোনো মরিয়া পালানোর প্রচেষ্টা—যেখানে বাঁচার ইচ্ছাই একমাত্র নায়ক; আবার কখনো এক উদ্ধার অভিযানের সূত্রে এক ফিলিস্তিনি কিশোরী ও এক ইসরায়েলি সৈনিকের সম্পর্কের সূচনা—যেখানে কর্তব্য ও করুণার দ্বন্দ্ব পাশাপাশি চলে। আবার কোথাও এক ফিলিস্তিনি শিল্পী ও এক ইসরায়েলি বিশ্লেষকের মধ্যে গড়ে ওঠা নিষিদ্ধ প্রেম—যেখানে শিল্প ও বিশ্লেষণ মিলেমিশে দেয়ালের ওপারে মানুষের মুখ চিনিয়ে দেয়। প্রতিটি গল্পে লেখক সংঘাতকে পটভূমি করলেও কেন্দ্রে রেখেছেন মানুষকে।

রেজুয়ান আহম্মেদের ভাষা লক্ষণীয়ভাবে সংযত, যা কখনোই আবেগের আতিশয্যে ভেসে যায় না। তাঁর বাক্যগঠন মসৃণ, কিন্তু তার গভীরে লুকিয়ে থাকে তীক্ষ্ণ বোধ। তিনি কেবল রক্তের বর্ণনা দেন না; বরং একটি ভাঙা খেলনা, একটি অর্ধেক লেখা চিঠি কিংবা একটি নিঃশব্দ শ্রেণিকক্ষ—এমন সব রূপকের মাধ্যমে যুদ্ধের অভিঘাত তুলে ধরেন। এই নান্দনিক সংযমই বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি।

লেখকের দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রা—১৯৯৮ সাল থেকে নিরবচ্ছিন্ন সাধনা—তাঁকে এক অনন্য স্বর দিয়েছে। তিনি প্রচারের আলো এড়িয়ে চললেও তাঁর রচনার ভেতরের নির্জন দীপ্তি অনস্বীকার্য। ‘এক মুঠো গল্প’, ‘সন্দেহের ছায়া’, ‘মায়াবী মুহূর্ত’ থেকে শুরু করে ‘The Days of Gaza’ কিংবা ‘অ-জল নির্বাসন’—প্রতিটি বইয়েই তিনি মানুষের অন্তরের সুর শোনার চেষ্টা করেছেন। ‘গাজায় দিনগুলো’ সেই ধারাবাহিকতারই এক পরিণত প্রকাশ।

তবে একটি বিষয় উল্লেখ্য—মাঝে মাঝে লেখক সহমর্মিতার বার্তাকে এতটাই সরাসরি প্রকাশ করেছেন যে, গল্পের স্বাভাবিক প্রবাহ কিছুটা ঘোষণামূলক (Declarative) হয়ে উঠেছে। তবে একে সমকালীন সাহিত্যিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবেই বিবেচনা করা যায়। কারণ এই বইয়ের লক্ষ্য কেবল নন্দনতত্ত্ব নয়, বরং এটি এক নৈতিক আহ্বানও বটে।

পরিশেষে, ‘গাজায় দিনগুলো’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রতিশোধের চক্র ভাঙতে কেবল আইন কিংবা অস্ত্র যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন গল্প বলার এবং অন্যের যন্ত্রণাকে নিজের ভেতরে ধারণ করার সাহস। রেজুয়ান আহম্মেদ সেই সাহসেরই সাহিত্যিক অনুবাদ করেছেন। তাঁর এই সংকলন কেবল সংঘাতের দলিল নয়, বরং মানবিক পুনর্মিলনের সম্ভাবনার এক নীরব ও দীপ্ত স্বাক্ষর।

img

ইউনেস্কো উদ্যোগে শ্রীমঙ্গলে জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ

প্রকাশিত :  ১৫:১৪, ২৩ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৫:১৭, ২৩ মে ২০২৬

ইউনেস্কো, আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (CRIHAP) ও অনুবাদের সহযোগিতায় শ্রীমঙ্গলে পাঁচ দিনের কর্মশালার আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে।

১৭–২১ মে পর্যন্ত ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় সিলেট বিভাগের তিনটি সম্প্রদায় — বিষ্ণুপ্রিয়া, মেইতেই এবং চা-জনগোষ্ঠী — থেকে ১৫ জন আদিবাসী তরুণ অংশগ্রহণ করেন।

কর্মশালার মাধ্যমে তারা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কমিউনিটি-ভিত্তিক তালিকাকরণে ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করেন। এর মধ্যে রয়েছে মৌখিক ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক চর্চা, ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প এবং আদিবাসী জ্ঞানব্যবস্থার নথিভুক্তকরণ।

কর্মশালাটি পরিচালনা করেন ইউনেস্কো স্বীকৃত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিশেষজ্ঞ ড. আলেকজান্দ্রা ডেনেস।

কর্মশালার উদ্বোধনীতে ইউনেস্কোর বাংলাদেশ অফিস প্রধান ও প্রতিনিধি ড. সুসান ভাইস বলেন, “তরুণরা শুধুমাত্র ভবিষ্যতের ঐতিহ্যের রক্ষকের ভূমিকা পালন করবে এমন নয়, বরং বর্তমানেও তারা সক্রিয় সংস্কৃতির অংশীদার। এই কর্মশালার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা কমিউনিটি ভিত্তিক তালিকাকরণে ব্যবহারযোগ্য দক্ষতা অর্জন করবে, যা সাক্ষাৎকার গ্রহণ, অডিওভিজুয়াল ডকুমেন্টেশন, নৈতিক গবেষণা পদ্ধতি এবং সঠিক অনুমোদন প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত। এই পুরো প্রক্রিয়ার সময় কমিউনিটির ভূমিকা সর্বদাই কেন্দ্রীয় হওয়া উচিত।”

তিনি আরও বলেন: “সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে তরুণরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কমিউনিটি-ভিত্তিক তালিকাকরণ ও নথিভুক্তকরণে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই কর্মশালা আদিবাসী তরুণদের নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সক্রিয় রক্ষক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।”

কমলগঞ্জের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণকারী তৃষা সিনহা বলেন: “নিজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে কাজ শুরু করার পর এই কর্মশালাটি আমার জন্য অনেক অর্থবহ হয়ে উঠেছে। ছোটবেলায় শুধু বইয়ে ইউনেস্কো সম্পর্কে পড়েছি, কিন্তু এই প্রথমবার তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ কার্যক্রমকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেলাম। গত কয়েক দিনে আমি অনেক নতুন বিষয় শিখেছি, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নতুন বন্ধু পেয়েছি এবং আমাদের ঐতিহ্য সংরক্ষণের গুরুত্ব আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি।”

শমসেরনগর, কমলগঞ্জের চা-জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকারী জিয়ানা মাদ্রাজি বলেন: “আমি সত্যি এখানকার কর্মশালার অংশ হতে পেরে খুবই আনন্দিত এবং গর্বিত। ইউনেস্কো ও CRIHAP দ্বারা আয়োজিত এই প্রশিক্ষণ কর্মশালার মাধ্যমে আমি আমাদের চা-জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। বিশেষত, আমাদের দল "পাটিচকা" ঐতিহ্য নিয়ে আমাদের গবেষণার মাধ্যমে এই কর্মশালা আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারার কথা তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। আমি বিশ্বাস করি, এ ধরনের উদ্যোগ আমাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে এবং ভবিষ্যতে চা-জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”

সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর