img

যীশুর জন্মস্থান বেথলেহামে একদিন

প্রকাশিত :  ০৭:৩৬, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫

যীশুর জন্মস্থান বেথলেহামে একদিন

দিলু নাসের

মার্চ মাসের রোদ ঝলমলে দিন। ফিলিস্তিনের ওয়েস্ট ব্যাংকে ঐতিহাসিক হেবরন নগরে নবী ইব্রাহিম আঃ তার পুত্র  ইসহাক আঃ  এবং ইসহাক পুত্র হজরত ইয়াকুব আঃ সহ তাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের পবিত্র রওজা মোবারক পরিদর্শন শেষে আমরা যাচ্ছি  আরও দুইজন বিশিষ্ট নবীর জন্মস্থান এবং রাসুলদের স্মৃতিবিজড়িত ঐশ্বর্যময় শহর বেথলেহাম অভিমুখে। আমার সাথে রয়েছেন বন্ধুবর এমদাদুল হক চৌধুরী ( সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদক  তৎকালীন লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব সভাপতি) সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মোহাম্মদ বেলাল আহমেদ, তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এমদাদ সিদ্দিক । মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হাসান হাফিজুর রহমান পলক আর আমার  বন্ধু শামীম জামান।

জুদাইন পর্বতমালা পাড়ি দিয়ে আমাদের  গাড়ি ছুটে  চলছে উঁচু-নীচু আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তায়, সমুখে চোখ জুড়ানো অসীম সৌন্দর্য। রাস্তার দু’ধারে সারি সারি সবজি আর ফলের বাগান,জলপাই, ডালিম, আঙ্গুর, ডুমুর আরও কতো কি। উঁচুনিচু  পাহাড়গুলো অনিন্দ্য সুন্দর, কখনো কঠিন পাথুরে, আবার কখনো নরম সবুজে মোড়া। বেথলেহামের কাছাকাছি পৌঁছাতেই চোখের সামনে খুলে গেল অপরূপ সব পাহাড়ি ঢাল। দেখে মনে হলো নরম সূর্যের আলোয় ঝলমল করা সবুজ আর মাটির রঙের স্তরগুলো যেন ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এখনো । মনে হলো, এই শান্ত পাহাড়গুলোর পাদদেশেই হয়তো একদিন  কিশোর নবী দাউদ (আ.) তার মেষপাল নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন, আর তার কণ্ঠের মোহনীয় সুরে আকাশ ভরিয়ে দিতেন প্রশান্তির আলোয় । তার সুর শুনে বনের পাখিরা থমকে যেতো। তন্ময় হয়ে শুনতো নবী দাউদের সুরেলা কণ্ঠ। এই প্রাচীন পথে যেতে যেতে আমাকেও আচ্ছন্ন করলো সেই  অবিনশ্বর সময়ের  সুবাস। চোখের সামনে দিয়ে একঝাঁক রঙিন পাখি উড়ে গেলো, দেখে মনে হলো হয়তো এদের পূর্বপুরুষরাই একদিন নবী দাউদের সাথে কথা বলতো।

মনে হচ্ছিল আমি সময়ের  স্রোত বেয়ে ফিরে যাচ্ছি সেই পুরোনো যুগে, যখন নবীরা হেঁটেছেন এই ভূমিতে, প্রার্থনা করেছেন এই আকাশের দিকে তাকিয়ে, ভালোবেসেছেন এই জনপদের মানুষদেরকে। আমার হৃদয় ভরে উঠলো এক অদ্ভুত আলোয়, শ্রদ্ধা, বিস্ময় আর স্রষ্টার কৃতজ্ঞতায় আমার চোখ অশ্রু সিক্ত হলো।  

নবীদের পদচিহ্নে ভেজা এই জনপদে ভ্রমণের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এই  অনির্বচনীয় মাহাত্ম্য, যা কেবল অনুভব করা যায়, বলা যায় না।

উল্লেখ্য যে  খ্রিস্টপূর্ব ১০৪০ সালের দিকে (আনুমানিক) বেথলেহেমের এরকম এক পাহাড়ী গ্রামে নবী দাউদ আঃ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। নবী দাউদ (আঃ) ছোটবেলায় ছিলেন একজন মেষপালক।তিনি বেথলেহেমের আশেপাশের এসব পাহাড়ি এলাকায় ভেড়া চরাতেন।এই সময়ই আল্লাহ তাঁকে সুরেলা কণ্ঠ ও সাহসী হৃদয় দান করেন।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তার সম্পর্কে বলেছেন - “নিশ্চয় আমি দাউদকে আমার তরফ থেকে অনুগ্রহ প্রদান করেছিলাম। হে পর্বতমালা, তোমরা দাঊদের সঙ্গে আমার পবিত্রতা ঘোষণা কর এবং হে পক্ষীকুল তোমরাও। আর লৌহকে তার জন্য নম্র করেছিলাম।\" (সূরা আস-সাবা, আয়াত ১০)

দাউদ (আঃ) তাঁর শৈশব ও কৈশোরের পুরোটা সময়ই বেথলেহেমে কাটিয়েছেন।

আনুমানিকভাবে তিনি ২০ বছর বয়স পর্যন্ত বেথলেহেমে ছিলেন। রাজা হওয়ার পরেও এখানে ছিলেন প্রায় সাত বছর।

 তবে বেথলেহামে দাউদের জন্মস্থান হিসেবে কোন নির্দিষ্ট গির্জা অথবা সিনেগগ  নেই, তবে শহরটি দাউদের জীবনী ও ধর্মীয় ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে পরিচিত।


ফিলিস্তিয়ান যুগে শহরটি ফিলিস্তিয়ান ও অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যের ছোট রাজ্যসমূহের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগ রাখত।  বাইবেলের বর্ণনা  অনুযায়ী, কিং ডেভিডের সময়ও বেথলেহাম একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল। বেথলেহাম মূলত বাইবেলের জন্য বিখ্যাত। এটি এখন  যীশু খ্রিষ্টের জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত,তাছাড়া  প্রাচীনকালের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর, যা অনেক শতাব্দী ধরে ধর্মীয় তীর্থস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

বাইবেলের পাশাপাশি বেথলেহাম ফিলিস্তিয়ান, রোমান, বাইজান্টাইন এবং  ইসলামি যুগেও উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র ছিল।

 যিশুর জন্মের আগে বেথলেহাম একটি ছোট গ্রামীণ শহর হিসেবে পরিচিত ছিল, যা পরে ধর্মীয় তীর্থস্থলে রূপান্তরিত হয়।

 বেথলেহাম শুধু ধর্মীয়ভাবে নয়, প্রাকৃতিক দৃশ্যের দিক থেকেও মনোরম শহর। পাহাড়, সবুজ উপত্যকা এবং ঐতিহাসিক রাস্তা শহরের সৌন্দর্যকে আরও বৃদ্ধি করেছে।

শহরে ঢুকেই চোখে পড়লো  প্রাচীন পাথরের রাস্তা, ছোট ছোট চত্বরে বাজার, ফুটপাতে নানান রকম দোকান। নজর কাড়লো কয়েকটি গির্জা।পাথরের দেয়াল, ঘণ্টা টাওয়ার , ক্রুশের ছায়া আর মসজিদের গুম্বুজ। পথে যেতে যেতে নজর কাড়লো মুসলিম ও খ্রিস্টানদের সহাবস্থান,মসজিদ আর চার্চ একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে যেন শতাব্দীর সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে ।  রাস্তার মোড়ে মোড়ে দেখলাম ফিলিস্তিনের পতাকা পতপত করে উড়ছে, লাল, সবুজ, কালো আর সাদা রঙের সেই পতাকা যেন এই ভূমির মানুষের হৃদস্পন্দন। বাতাসে দোলায়মান পতাকাগুলো শুধু রঙের নয়, তারা যেন ইতিহাসের ক্ষত, আশার আলো, আর অবিনশ্বর প্রতিজ্ঞার প্রতীক।কোথাও দোকানের ছাদের ওপরে, কোথাও ছোট্ট চায়ের স্টলের সামনে, কোথাও আবার পাহাড়ি গ্রামের প্রবেশমুখে,ফিলিস্তিনের পতাকা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

দেখলাম রাস্তাঘাট  পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত।আমাদের গাড়ি এসে থামলো একটি ব্যস্ত রাস্তার মোড়ে যেখানে রাস্তার ধারে  হস্তশিল্পের দোকান, ক্রিসমাসের তারকা, যিশুর ছবি, গিফট আইটেম, দেখলাম  একই দোকানে মুসলিম এবং খৃস্টানদের ধর্মীয় জিনিসপত্র বিক্রি হচ্ছে,  স্থানীয় খাবারের সুগন্ধ  আমাদেরকে  মুগ্ধ করলো।বেথলেহাম বিভিন্ন সময়  রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাতের মধ্য দিয়ে গেলেও কিন্তু এই শহর এখনও শান্তি এবং ধর্মীয় সহাবস্থানের প্রতীক। মুসলিম ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায় শহরের সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতা রক্ষা করছে, এবং পর্যটকরা এখানে এসে ইতিহাস, সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিকতার মেলবন্ধন উপভোগ করতে পারেন।

গাড়ি থেকে নামতেই দেখা হলো দাড়িওয়ালা একজন সুঠাম দেহের তরুণের সাথে। আমাদের ড্রাইভার বললেন ওনি হচ্ছেন সাদি বেথলেহামে আপনাদের গাইড। তিনি আপনাদেরকে যীশুর জন্মস্থান সহ দর্শনীয় স্থান গুলো দেখাবেন।   আমরা তাকে সালাম দিয়ে বললাম হ্যালো শেখ সাদি?  শুনে মন্তাহির এবং সাদি দুজনেই হা হা করে  হেসে উঠলেন। হাসার কারণ জিগ্যেস করলাম, মন্তাহির বললেন পরে বলবো এখন আপনারা যান তার সাথে। নানান দেশের নানান রঙের মানুষের ভীড়ে আমরা হাঁটছি সাদির সাথে। সাদি আমাদেরকে স্থানীয় জীবনযাত্রা এবং এই এলাকা সম্পর্কে কিছু তথ্য দিচ্ছেন। মুলত এমাদ ভাই আর বেলাল ভাই তার সাথে কথা বলছেন। সাদি বললেন বেথলেহেমে খ্রিষ্টান ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান রয়েছে। ম্যাঞ্জার স্কোয়ারে অবস্থিত ওমর মসজিদ এবং চার্চ অব দ্য ন্যাটিভিটি (যীশুর জন্মস্থানের গির্জা) পাশাপাশি অবস্থিত, যা দুই ধর্মের মধ্যে ঐক্যের প্রতীক।

আমি চোখ কান খোলা রেখে চারপাশ দেখছি। সড়কে হলুদ টেক্সি গুলো নজর কাড়লো, ঢালু এবং পাথর-বিছানো রাস্তা দিয়ে আমরা হাঁটছি। বোঝা গেলো এটা ব্যস্ত এলাকা।সারি সারি দোকানপাট, সাজানো,মশলা, অলংকার, কাঠের খোদাই, ধর্মীয় উপহার, পোশাক ইত্যাদি বিক্রি হচ্ছে। পাথরের দেওয়ালে ঝোলানো রঙিন কাপড়, কাঠের তৈরি ক্রস,  জলপাই কাঠের খোদাই, ছোট ছোট ফানুস, , মধু, আর হস্তশিল্পের অলংকারে ভরা। দেখলাম একটি দোকানে কাঁচের আলমারিতে সাজানো আছে চমৎকার সিরামিক প্লেট, স্থানীয় নকশার স্কার্ফ, জেরুজালেমের প্রতীক ছাপা ম্যাগনেট। দোকানের ভেতর থেকে হালকা আরবি গান বাজছে, দরজায় দাঁড়ানো হিজাব পড়া সহাস্য তরুণী বললেন ওয়েলকাম হাবিবী। চারপাশে  নানারকম মানুষ। বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন রঙের, বিভিন্ন ভাষার। কারও মাথায় হিজাব, কারও গলায় ঝুলছে ক্রস, কেউ আবার একেবারে সাধারণ আধুনিক পোশাকে। স্থানীয় লোকদেরকে দেখলেই বোঝা যায়। হাঁটতে হাঁটতে উপলব্ধি হলো বেথলেহামের রাস্তায় মানুষকে ধর্ম দিয়ে আলাদা করা যায় না। সবাই একই সুরে, একই রঙে মিলেমিশে আছে,ঠিক এই দোকানগুলোর মতো যেগুলোতে ইতিহাস, বিশ্বাস ও জীবনের রঙ একসাথে ঝুলে রয়েছে। এখানে মানুষের হাসি, হাঁটার ভঙ্গি, কণ্ঠস্বর, দোকানের সামনে জড়ো হয়ে আড্ডা দেওয়া, সবই এই শহরের স্বাভাবিক জীবন বলে মনে হলো।

রাস্তার দু’পাশে ছোট ছোট ক্যাফে, বেকারি ও রেস্টুরেন্ট বাতাসে আরবীয় কফি, খেজুর, মুসখান, হুমুসের গন্ধ ভাসছে ।  রেস্টুরেন্ট গুলোর সামনে  ছোট ডেলিভারি ভ্যান দাঁড়ানো।

রাস্তার মোড়ে এসে আমরা একটু দাঁড়ালাম, দেখতে পেলাম এখানে একটি ভবনের দেয়ালে ফিলিস্তিনের কিংবদন্তি নেতা ইয়াসির আরাফাত এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের একটি বিরাট ছবি শোভা পাচ্ছে। আমরা সেখানে দাঁড়িয়ে সবাই গ্রুপ ছবি তুললাম। তারপর চললাম নেটিভিটি চার্চের দিকে। রাস্তা পেরিয়েই চোখে পড়লো  চার্চ অব দ্য নেটিভিটি, যিশু খ্রিষ্টের জন্মস্থান। দেখলাম নেটিভিটি চার্চের বাইরে অসংখ্য তীর্থযাত্রী। কেউ নীরবে প্রার্থনা করছে, কেউ গাইডের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে। বাতাসে ধূপের গন্ধ, প্রাচীন  পাথরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে মানুষের  পায়ের শব্দ। সব মিলেমিশে যেন এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য তৈরি হয়েছে এখানে।

 আমাদের গাইড সাদি আমার সঙ্গীদেরকে চার্চের ইতিইাস এবং খৃস্টানদের কাছে এই জায়গা কতোটা গুরুত্বপূর্ণ তা বর্ণনা করছেন। এমাদ ভাই পলক সাদিকে বিভিন্ন প্রশ্ন করছেন সে উত্তর দিচ্ছে। আমি তাদের পিছনে পিছনে থেকে এই স্মরনীয় মুহূর্তকে ক্যামেরায় বন্দি করছিলাম-  আর অন্যান্য গ্রুপের গাইডদের মুখে শুনছিলাম এবং দেখলাম পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষের চোখে মুখে বিস্ময় আর উচ্ছাস।

এই চার্চ  অফ দ্য নেটিভিটি খৃষ্ট ধর্মালম্বিদের  সবচেয়ে প্রাচীন গির্জা। এটি  মূলত কনস্টানটাইন দ্য গ্রেট দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি ৩২৫-৩২৬ সালে তাঁর মা হেলেনার জেরুজালেম এবং বেথলেহমে ভ্রমণ করার খুব অল্প সময়ের মধ্যে এটি তৈরি করেছিলেন। ৩৩৯ খ্রিস্টাব্দে এটি পুরোপুরি  গির্জা হিসাবে চালু হলেও বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে গির্জাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই গির্জাটি ৩২৬ সালে  কনস্টানটাইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৩৫ খ্রিস্টাব্দে, রোমান  সম্রাট হ্যাড্রিয়ান এখানে যীশুর জন্মস্থানে গুহার উপরে গ্রীক পুরানের সৌন্দর্য এবং বাসনার  দেবী আফ্রোদিতির  প্রেমিক অ্যাডোনিসের  উপাসনা করার  জায়গা বানিয়েছিলেন। অনেকের ধারণা সেই সময় বিশ্ব থেকে যীশুর স্মৃতি পুরোপুরি মুছে ফেলার জন্য সেখানে এটি প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিলো।

 পরবর্তীতে  ৫২৯ খৃস্টাব্দে  বাইজেন্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ান এখানে  একটি নতুন বেসিলিকা তৈরি করেছিলেন । এরপর বিভিন্ন সময়ে এর পরিবর্তন এবং পরিবর্ধন হয়েছে। ২০১২ সালে ইউনেস্কো নেটিভিটি গীর্জাটিকে  বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দিয়েছে। এবং এটি ‘ফিলিস্তিনে ইউনেসকো’ঘোষিত প্রথম তালিকাভুক্ত কোন স্থান। বহু শতাব্দীর সংস্কারের পরও এর মূল গঠন আজও দাঁড়িয়ে আছে।

আমরা ছয়জন, সাদির সঙ্গে ধীরে ধীরে চার্চের  ভিতরে প্রবেশ করলাম।একটি অত্যন্ত নীচু  দরজা দিয়ে আমাদেরকে  চার্চে প্রবেশ করতে হয়েছে। সেখান দিয়ে ভেতরে ঢুকতে হলে মাথা নিচু করে ঢুকতে হয়। এই দরজাকে বলা হয়  ”ডোর অব হিউমিলিটি” বা “নম্রতার দরজা” ।ভেতরে ঢুকতেই  সাদি সামনে দাঁড়িয়ে আস্তে করে ইশারায় সবাইকে থামালেন। তখন ভেতরে প্রার্থনা চলছিলো,মৃদু সুরে ভেসে আসছে স্তোত্রগান, মাঝে মাঝে ধুপ,ধুনোর ঘ্রাণ, আর দূর থেকে শোনা গেলো ঘণ্টাধ্বনি। সাদি আমাদের দাঁড় করিয়ে সামনে গেলেন। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে রইলাম সেখানে,উঁচু ছাদ, মৃদু আলো, দেয়ালে পুরনো বাইজান্টাইন চিত্রকর্ম। সাদি আমাদের ইঙ্গিত করলেন নীরব থাকতে। মনে হচ্ছিল,চার্চের মূল হলটি ছিল বিশাল, আর তার মধ্যভাগে দেখা যাচ্ছিল দীর্ঘ কাঠের বিম,দেখেই বুঝা গেলো  পুরোনো দিনের স্থাপত্য এখনো নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্তম্ভগুলো বেশ মোটা, বয়সের ভাড়ে অনেক জায়গায় সামান্য ক্ষয়ে গেছে। উপরের দিকে ঝুলে থাকা লণ্ঠনগুলো আলো দিচ্ছিল নরম, কমলা,হলুদ আভায়। মোজাইকগুলো ছিল বিশেষ চোখে পড়ার মতো,সোনালি আর নীল রঙে আঁকা বাইবেলের দৃশ্য। আলো পড়ে সেগুলো ঝিকিমিকি করছিল, চার্চের নিচু এক কোণে ছোট ছোট দল গুলোর প্রার্থনা চলছে, কেউ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে, কেউবা মোমবাতি হাতে। আমরা যে জায়গায় যাবো সেটির নাম নেটিভিটি গুহা Grotto of the Nativity

নেটিভিটি গুহাটি একটি ভূগর্ভস্থ স্থানে, সেখানেই যীশুর জন্মস্থান। সেখানে যেতে হলে এই চার্চের ভেতর দিয়ে অন্য স্থানে যেতে হবে। কিছুক্ষণ পরে প্রার্থনা শেষ হলো। মানুষজন নড়াচড়া শুরু করতেই সাদি আবার আমাদের  কাছে ফিরে এলেন। এবার তিনি হাসিমুখে, কিন্তু আগের মতোই শান্ত স্বরে বললেন,

 “চলুন, এখন আপনাদের গ্রোটোতে নিয়ে যাই।” আমরা  ছয়জন তাঁকে অনুসরণ করে  চার্চের ভেতর দিয়ে অন্য একটা রুমে গেলাম।

সেখান থেকে  গুহার দিকে নামার পথটা ছিল একটু সরু,পাথরের সিঁড়ি, সামান্য নিচু ছাদ, আর মৃদু আলো। সাদি সামনে হাঁটছিলেন খুব ধীরে, মনে  হচ্ছিল  যেন প্রতিটি ধাপের মধ্যেই কোনো অর্থ লুকিয়ে আছে।

সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতেই পরিবেশের গন্ধ বদলাতে শুরু করল,ধুপের ওপরে যোগ হলো ঠান্ডা পাথরের কাঁচা গন্ধ। শব্দ কমে এলো আরও বেশি, মনে হলো যেন মাটির গভীরে  ঢুকে যাচ্ছি আমরা।

গুহার ভেতরে ঢুকতেই মাটির কাছাকাছি একটা ছোট বেদির সামনে গাইড থামলেন। সেখানে আরও কিছু লোকজন ছিলেন। কারও মুখে কোনো কথা নেই। দেখলাম কারও চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সাদি নিচু স্বরে বললেন, “এই জায়গাটাই সেই স্থান, যেখানে যীশুর জন্ম হয়েছিল।”

আধো আলো আধো  অন্ধকারে আমরা দেখলাম  সেই ঐতিহাসিক স্থানে মৃদু প্রদীপের আলোয়  রূপালি তারা-খচিত একটি পাথর,যার ওপর লাতিন ভাষায় খোদাই করা আছে “Here Jesus Christ was born.”

আমাদের আগেই কিছু তীর্থযাত্রী সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেউ নীরবে মাথা নত করে প্রার্থনা করছিল, কেউ চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে ছিলেন, কেউ আবার খুব আস্তে করে তারকাটাকে ছুঁয়ে দেখছিলেন, মনে হচ্ছিল তারা প্রত্যেকে নিজের মতো করে এই মুহূর্তটা গ্রহণ করছে। আমাদের ঠিক আগে ছিলেন একটি বয়স্ক দম্পতি। তারা আবেগ আপ্লুত হয়ে তারকায় হাত রাখছিলেন। আমরা ছয়জন একটু পেছনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম। আমি দেখছিলাম রুপালি তারকার ওপর মোমবাতির আলো পড়ে ঝিলিক দিচ্ছিল, আর গুহার পাথরের দেয়ালগুলো সেই নরম আলোয় আরও প্রাচীন, আরও পবিত্র মনে হচ্ছিল তখন ।

বয়স্ক দম্পতি সরে যেতেই  সাদি চোখের ইশারায় বললেন, “এবার আপনারা এগিয়ে আসুন।”

আমরা ধীরে ধীরে তারকার সামনে এগিয়ে গেলাম। আলো খুব কম, কিন্তু ঠিক যতটুকু প্রয়োজন,তারকাটাকে স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। আমরা একে একে হাঁটু গেড়ে বসলাম, আর হাত বাড়িয়ে খুব আস্তে করে সেই রূপালি তারকার ঠান্ডা ধাতু স্পর্শ করলাম। মুহূর্তটা যেন কয়েক সেকেন্ড নয়,আরও দীর্ঘ, গভীর কোনো অনুভূতির মতো লাগছিল। খৃস্টানরা বিশ্বাস করেন যীশু যে পাথরের উপর ভূমিষ্ঠ হয়ে ছিলেন সেটি স্বর্গীয় পাথর। তারকা স্পর্শ করার সেই ঠান্ডা অনুভূতি আর গুহার নীরবতার মধ্যে মনে হচ্ছিল এই ছোট জায়গাটা পৃথিবীর কোটি মানুষের স্মৃতি আর বিশ্বাস বহন করে আছে। আর আমরাও আজ সেই আবেগপ্রবণ নিঃশব্দ মুহূর্তের অংশ হলাম।

তারকাখচিত পাথরের ঠিক সামনেই রয়েছে একটি ছোট জায়গা কিছু টাইলস দিয়ে মোড়ানো জানলাম এখানেই ছিলো সেই খেজুর গাছটি যেটি থেকে বিবি মরিয়ম গর্ভাবস্থায় খেজুর খেয়েছিলেন। গুহার ভেতরে তারকা স্পর্শ করার পর আমরা আশপাশ একটু দেখলাম। ছবি এবং ভিডিও করলাম। একসময়  সাদি খুব আস্তে করে ইশারা করলেন যে এবার আমাদেরকে বেরুতে হবে। অন্য তীর্থযাত্রীরা সিঁড়ির উপর অপেক্ষা করছেন।  আমরা সেই সরু পাথরের সিঁড়ি বেয়ে আবার উপরে উঠতে লাগলাম। সিঁড়ির শেষ ধাপে পা রাখতেই চার্চের ভেতরের গম্বুজটা, লণ্ঠনের আলো আর মোজাইকগুলো আবার সামনে ফুটে উঠল,কিন্তু এবার সবকিছু যেন আরও উজ্জ্বল, আরও গভীর মনে হচ্ছিল।

চার্চের ভেতর থেকে বেরিয়ে যখন সেই ছোট দরজার দিকে হাঁটছিলাম, বাতাসে তখনও মোমবাতির গন্ধ আর স্তোত্রের সুর  ভেসে আসছিল। ছোট দরজা দিয়ে মাথা নিচু করে যখন বাইরে বের হলাম, হঠাৎ উজ্জ্বল দিনের আলো চোখে এসে লাগল। বাইরে ছিল মানুষের ভিড়, কোলাহল, সবকিছু ঠিক আগের মতোই। কিন্তু মনে হচ্ছিল আমরা ছয়জন যেন অন্য পৃথিবী থেকে   বাস্তবে ফিরে এসেছি।  

রাস্তায় এসেই ড্রাইভার মন্তাহিরের সাথে দেখা হলো। তিনি আমাদেরকে গাড়িতে ওঠার তাড়া দিলেন। সাদির সাথে করমর্দন করে সালাম জানিয়ে আমরা গাড়িতে উঠলাম। তিনি ও হাসি মুখে সালাম জানিয়ে বিদায় নিলেন। গাড়িতে উঠেই আমরা মন্তাহিরকে জিগ্যেস করলাম প্রথম দেখাতে সাদিকে শেখ সাদি বলায় তিনি কেন হেসেছিলেন?  তিনি আবারও হেসে বল্লেন আপনারা মনে করেছেন সে মুসলমান সে তো আসলে খৃস্টান। তাই তাকে শেখ সাদি বলায় আমরা হেসেছি।   আমরা আবারও বিস্মিত হলাম, কারণ সাদি যতো সময় আমাদের সাথে ছিলেন অথবা মন্তাহিরের সাথে তার কথাবার্তা এসব কিছুতেই ক্ষুনাক্ষরে ঠের পাওয়া যায়নি তিনি যে খৃস্টান!  তাদের দুজনের আচরণে আবারও প্রমানিত হলো বেথলেহাম- জেরুজালেম  সহ পুরো ফিলিস্তিনে প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাস থেকে সাম্প্রতিক  রাজনীতি যতোই কুঠিল হউক না কেন ধর্মীয় সহাবস্থান সতিই বিস্ময়কর। আমাদের গাড়ি ছুটে চলছে আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথে পথের দুধারে লালচে ধূসরের যুগলবন্দিতে ইতিউতি সবুজের থাবা।সোনালী বালুকায় সূর্যের মায়াবী আলোর ঝিকিমিকি। বুঝা  যাচ্ছে  সুর্য পাহাড়কে আলিঙ্গনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দিকচক্রবালের ধূসর আড়ালে। এখন আমাদের গন্তব্য জেরিকো শহরের পাশে মৃত সাগরের পাড়ের পাহাড়ী উপত্যকায় হজরত মুসা আঃ এর রওজা শরিফ।


সাহিত্য-সংস্কৃতি এর আরও খবর

img

বাঙালির জাতিসত্তা ও পহেলা বৈশাখ: ঐতিহ্য অন্বেষণে এক মহাকাব্যিক পথরেখা

প্রকাশিত :  ০৯:০৯, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

​বাঙালির পহেলা বৈশাখ কেবল পঞ্জিকার আবর্তন নয়, বরং এটি একটি জাতির সহস্রাব্দের আত্মপরিচয়ের দর্পণ। এই দিনটি আমাদের প্রাণের স্পন্দন এবং অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পহেলা বৈশাখ মানেই আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের শিকড় ও হাজার বছরের ঐতিহ্যের এক নিরন্তর স্মৃতিচারণা। বাঙালির আত্মপরিচয়ের এই উৎসব মূলত একটি অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন লোকউৎসব, যার গভীরতা মিশে আছে এ দেশের মাটি ও মানুষের দীর্ঘশ্বাসের সাথে। তবে বর্তমানের এই আনন্দধারার সমান্তরালে একটি গূঢ় কষ্টের সুরও অনুরণিত হচ্ছে, যা আমাদের অবচেতন মনকে বিদ্ধ করে। আমাদের অনেক সুন্দর ঐতিহ্য আজ সময়ের নিষ্ঠুর আবর্তে চোখের সামনে হারিয়ে যাচ্ছে। যে জমজমাট বৈশাখী মেলা একসময় গ্রামবাংলার প্রাণকেন্দ্র ছিল, আজ তা শহুরে কৃত্রিমতার চাপে ম্লান। লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ কিংবা হাডুডুর মতো শৌর্য-বীর্যের প্রতীকগুলো আজ ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই খুঁজছে। লোকসংগীত, বাউলগান বা পালাগানের সেই আধ্যাত্মিক মদিরা আজ নতুন প্রজন্মের কাছে এক অচেনা সুর। গ্রামবাংলার সেই সহজ-সরল সংস্কৃতি আজ বিশ্বায়ন ও নগরায়ণের জটিলতায় পর্যুদস্ত। তবুও বাঙালির অন্তরের বিশ্বাস এই যে—এই ঐতিহ্যই আমাদের প্রকৃত পরিচয় এবং আমাদের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। এই শিকড়কে বাঁচিয়ে রাখা কেবল নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা অঞ্চলের নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি বাঙালির পবিত্র দায়িত্ব।

​ঐতিহ্য অন্বেষণের এই মহাকাব্যিক পথরেখায় আমরা দেখতে পাই, বাঙালির পহেলা বৈশাখ কোনো একক ধর্ম বা গোষ্ঠীর সম্পদ নয়। এটি একটি বহুত্ববাদী সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ, যেখানে হিন্দু জমিদারের পুণ্যাহ আর মুসলিম কৃষকের নবান্ন একাকার হয়ে গিয়েছিল। কালানুক্রমিক বিবর্তনে এই দিনটি রাজনৈতিক প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষ করে ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এই বর্ষবরণ উৎসব। ১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে ছায়ানটের যে আয়োজন শুরু হয়, তা মূলত ছিল বাঙালির আত্মমর্যাদা রক্ষার এক শৈল্পিক লড়াই। এই প্রবন্ধে পহেলা বৈশাখের ঐতিহাসিক বিবর্তন, বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বর্তমান সংকট এবং আগামীর পথরেখা নিয়ে একটি নিবিড় বিশ্লেষণ উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।

​নববর্ষের ঐতিহাসিক পটভূমি: ফসলি সন থেকে জাতীয় উৎসব

​বাংলা নববর্ষের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এর মূলে রয়েছে কৃষি ও অর্থনীতির এক গভীর মেলবন্ধন। মুঘল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে কৃষিকাজের সুবিধার্থে এবং রাজস্ব আদায়ের একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতি প্রবর্তনের লক্ষ্যে ‘ফসলি সন’ হিসেবে বাংলা সনের গণনা শুরু হয়। ১৫৫৬ থেকে ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে আকবর যখন এই ভূখণ্ডের খাজনা আদায়ের পদ্ধতিকে সহজতর করতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি সৌর ও চন্দ্র বছরের সংমিশ্রণে একটি নতুন সময়রেখা তৈরি করেন। হিজরি সন চন্দ্রকেন্দ্রিক হওয়ায় তা ঋতু পরিবর্তনের সাথে মিলত না, ফলে কৃষকদের কর দিতে সমস্যা হতো। ঐতিহাসিক আবুল ফজল তাঁর ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, সম্রাট আকবর ৯৬৩ হিজরিতে (১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ) এই সনের প্রবর্তন করেন, যা তৎকালীন সময়ে ‘তারিখ-ই-ইলাহি’ নামে পরিচিত ছিল। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে ‘হালখাতা’ বা ব্যবসায়িক নতুন খাতা খোলার যে রীতি, তা এই অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটেরই এক শৈল্পিক রূপ।

​ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে নববর্ষ উদযাপনের বিবর্তনকে তিনটি প্রধান কালখণ্ডে বিভক্ত করা যায়। প্রথমত, প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় প্রেক্ষাপট, যেখানে এটি ছিল মূলত কৃষি উৎসব ও পুণ্যাহের দিন। সম্রাট আকবরের সময় থেকে এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। দ্বিতীয়ত, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল, যখন বাঙালির চিত্তে স্বাদেশিকতা ও জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই সময়ে পহেলা বৈশাখ বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য প্রকাশের একটি প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে। তৃতীয়ত, পাকিস্তান আমল—যা ছিল বাঙালির সাংস্কৃতিক সংগ্রামের এক অগ্নিপরীক্ষার কাল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি যে অস্তিত্বের জানান দিয়েছিল, ১৯৬০-এর দশকে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মাধ্যমে তা এক পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক বিপ্লবে রূপ নেয়। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিবাদে ১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল, যা আজ বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার আলোকবর্তিকা।

​স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পহেলা বৈশাখকে একটি সর্বজনীন জাতীয় উৎসবে রূপান্তর করেন এবং দিনটিকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রদর্শন ও আদর্শের অন্যতম ভিত্তি ছিল দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ। তবে পহেলা বৈশাখের ছুটির ইতিহাসের পেছনে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারেরও একটি বড় অবদান ছিল। মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক সেই সময় প্রথম এই দিনটিকে সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন, যদিও তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বর্তমানে এই উৎসব কেবল একটি দিন উদযাপনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত ‘বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পরিচয়কে মহিমান্বিত করেছে।

​বাংলা ভাষার ধ্রুপদী মহিমা: আড়াই হাজার বছরের শিকড়

​বাঙালির নববর্ষ উদযাপনের সঙ্গে তার ভাষার মর্যাদা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলা ভাষা বিশ্বের দরবারে একটি সমৃদ্ধ ও প্রাচীন ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর ভারত সরকার বাংলাকে ‘ধ্রুপদী ভাষা’র (Classical Language) মর্যাদা প্রদান করেছে। এই স্বীকৃতির প্রধান মানদণ্ড হলো ভাষাটির ইতিহাস হতে হবে অন্তত দেড় থেকে দুই হাজার বছরের প্রাচীন এবং এর একটি সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ঐতিহ্য থাকতে হবে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, বাংলা ভাষার বয়স আড়াই হাজার বছরেরও বেশি। এর আদি উৎস হিসেবে মাগধী প্রাকৃত বা পূর্বী অপভ্রংশকে চিহ্নিত করা যায়, যেখান থেকে পর্যায়ক্রমে বাংলা, অসমীয়া ও ওড়িয়া ভাষার উদ্ভব হয়েছে।

​বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হলো ‘চর্যাপদ’, যা মূলত অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে রচিত বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের আধ্যাত্মিক গানের সংকলন। ১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবার থেকে এই অমূল্য পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন, যা প্রমাণ করে যে হাজার বছর আগেই বাংলা ভাষা তার কাব্যিক ও দার্শনিক গভীরতা অর্জন করেছিল। চর্যাপদ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর এবং আধুনিক যুগের রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও জীবনানন্দের সাহিত্যকর্ম আমাদের এই ভাষাকে ধ্রুপদী সৌন্দর্যে মণ্ডিত করেছে। বিশেষ করে ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল বিজয় বাংলা ভাষাকে বিশ্বসাহিত্যের শিখরে আসীন করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ভাষার এই ধ্রুপদী শিকড় নিয়ে গর্ব করলেও বাস্তব জীবনে আমরা বাংলা ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগে অনেক ক্ষেত্রে উদাসীন। ইংরেজি মাধ্যমের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত প্রজন্মের অনেকেই তাদের মাতৃভাষা এবং সাহিত্যিক ঐতিহ্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখে না। এই উদাসীনতা আমাদের দীর্ঘস্থায়ী পরিচয় সংকটের একটি বড় কারণ।

​পুণ্যাহ ও হালখাতা: রাজা-প্রজা থেকে ব্যবসায়ীর মেলবন্ধন

​বাংলা সনের প্রবর্তনের সাথে সাথে এর অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে ‘পুণ্যাহ’ উৎসবের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। মুঘল ও নবাবী আমলে চৈত্র মাসের শেষ দিকে কৃষকরা ফসল ঘরে তুলতেন এবং বৈশাখের প্রথম দিনে জমিদারের কাঁচারিতে খাজনা পরিশোধ করতে যেতেন। এই অনুষ্ঠানকেই বলা হতো পুণ্যাহ। জমিদাররা প্রজাদের মিষ্টি ও পানের মাধ্যমে আপ্যায়ন করতেন, যা রাজা ও প্রজার মধ্যে একটি সামাজিক সেতুবন্ধন তৈরি করত। ব্রিটিশ আমলের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর এই উৎসবটি আরও ব্যাপকতা লাভ করে। নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ এই উৎসবের একটি সুনির্দিষ্ট রীতি প্রচলন করেছিলেন। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির সাথে সাথে পুণ্যাহ উৎসব আজ বিলুপ্তপ্রায় হলেও তার রেশ আজও টিকে আছে ব্যবসায়ীদের ‘হালখাতা’র মধ্যে।

​হালখাতা হলো বাঙালির এক অনন্য অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। বৈশাখের প্রথম দিনে ব্যবসায়ীরা তাঁদের পুরনো হিসাবের খাতা বন্ধ করে নতুন খাতা খোলেন। এই দিনে ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করানো হয় এবং বকেয়া পরিশোধের মাধ্যমে সম্পর্কের নবায়ন করা হয়। কলকাতা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত এই ঐতিহ্য আজও অমলিন। হালখাতা কেবল দেনা-পাওনার হিসাব নয়, বরং এটি বাঙালির সামাজিক সংহতির এক অনন্য উদাহরণ। আধুনিক শপিং মল ও অনলাইন কেনাকাটার যুগেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা আজও এই হালখাতার ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে আছেন।

​বিলুপ্তপ্রায় গ্রাম্য সংস্কৃতি: হারানোর দীর্ঘশ্বাস ও আধুনিকতার ঘাত-প্রতিঘাত

​বাঙালির সংস্কৃতির প্রধান উৎসস্থল হলো তার পল্লীপ্রকৃতি। হাজার বছরের গ্রামীণ সংস্কৃতিই আমাদের ঐতিহ্যের মূল কাঠামো। কিন্তু এই ডিজিটাল যুগে বিশ্বায়নের প্রবল স্রোতে আমাদের সেই পরিচিত গ্রামগুলো আজ আর আগের মতো নেই। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের হাজার বছরের লোকজ খেলাধুলা এবং সংগীত আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। একসময় বৈশাখী মেলা ছিল গ্রামের মানুষের চিত্তবিনোদনের একমাত্র ভরসা। মেলার সেই ধুলোমাখা পথ, মাটির পুতুলের বাঁশি, নাগরদোলার শব্দ আজ স্মৃতিতে ফিকে হয়ে আসছে।

​গ্রামের মেলার দৃশ্য ছিল শৈল্পিক ও প্রাণবন্ত। সেখানে কামারদের তৈরি দা-বঁটি থেকে শুরু করে কুমোরদের তৈরি মাটির হাঁড়ি ও পুতুলের এক অপূর্ব সমাহার দেখা যেত। শিশুদের জন্য ছিল তালপাতার বাঁশি কিংবা মাটির ঘোড়া। কিন্তু আজ প্লাস্টিকের সস্তা খেলনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির আগ্রাসনে মাটির পুতুল ও বাঁশি তৈরির কারিগররা পেশা বদলে ফেলছেন। বায়োস্কোপের মতো ভ্রাম্যমাণ বিনোদন আজ টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। শোলার তৈরি খেলনা ও অলঙ্কার আজ কাঁচামালের অভাব ও কারিগরদের অনাগ্রহে হারিয়ে যেতে বসেছে। শহুরে বৈশাখী মেলাগুলোতে জৌলুস থাকলেও গ্রামীণ মেলার সেই প্রাণের টান আজ অনুপস্থিত।

​ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া ও বাঙালির শৌর্য: মাঠ থেকে স্মার্টফোনে স্থানান্তর

​বাঙালির শৌর্য-বীর্য এবং সাহসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটত তার নিজস্ব খেলাধুলার মাধ্যমে। পহেলা বৈশাখ এবং মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ ও হাডুডু। বিশেষ করে হাডুডু বা কাবাডি, যা আমাদের জাতীয় খেলা, তা একসময় গ্রামবাংলার প্রতিটি জনপদে জনপ্রিয় ছিল। ১৯৭২ সাল থেকে এটি বাংলাদেশের জাতীয় খেলার মর্যাদা পেলেও বর্তমান প্রজন্মের কাছে এটি অনেকটা অচেনা। আধুনিক প্রজন্মের কিশোররা আজ স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ভিডিও গেমে আসক্ত হয়ে মাঠের ধুলোবালি থেকে দূরে সরে গেছে।

​নৌকাবাইচ ছিল বর্ষা ও বৈশাখের এক অনন্য উন্মাদনা। গ্রামবাংলার নদ-নদীগুলো যখন বর্ষায় টইটম্বুর থাকত, তখন আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটত। একইভাবে লাঠিখেলা, যা আমাদের পূর্বপুরুষদের আত্মরক্ষার এক শৈল্পিক কৌশল ছিল, তা আজ নিয়মিত চর্চার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। দাঁড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, বৌছি কিংবা কানামাছির মতো খেলাগুলো গ্রামীণ কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়ক ছিল। আধুনিক যুগের অভিভাবকরা আজ শিশুদের ধুলোবালি ও কাদা থেকে দূরে রাখতে গিয়ে তাদের এই প্রাকৃতিক আনন্দ থেকে বঞ্চিত করছেন। এর ফলে শিশুরা একাকিত্ব ও যান্ত্রিকতায় ভুগছে, যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকি।

​লোকসংগীতের আধ্যাত্মিক ধারা: বাউল ও পালাগানের সংকট

​বাঙালির সংগীতের প্রাণভোমরা হলো তার লোকসংগীত। বাউল গান, পালাগান ও লোকগাঁথা আমাদের মাটির গন্ধমাখা সুর। বাউল দর্শন কেবল গান নয়, এটি এক গূঢ় আধ্যাত্মিক সাধনা। বাউলরা বিশ্বাস করেন যে, মানুষের দেহের মধ্যেই স্রষ্টা বা ‘মনের মানুষ’-এর অবস্থান। ফকির লালন শাহের মতো সাধকরা এই দর্শনের মাধ্যমে মানুষে মানুষে বিভেদ দূর করার এবং মানবতার জয়গান গেয়েছেন। কিন্তু বর্তমান সময়ের ‘আকাশ সংস্কৃতি’ ও আধুনিক পপ মিউজিকের প্রভাবে এই সুরগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। পালাগান বা যাত্রাপালার সেই জমজমাট রাত জাগা আসর আজ টিভির সিরিয়াল কিংবা ইন্টারনেটের ভিডিওর দাপটে বিলুপ্তির পথে। লোকসংগীতের এই ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা আমাদের সংস্কৃতির মেরুদণ্ডকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

​মঙ্গল শোভাযাত্রা: ইউনেস্কো স্বীকৃতি ও অসাম্প্রদায়িকতার জয়গান

​পহেলা বৈশাখের আধুনিক উদযাপনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হলো ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে প্রথম এই শোভাযাত্রা বের করা হয়। তৎকালীন সামরিক শাসনের অন্ধকার থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে এবং মানুষের মনে নতুন আশা জাগানোর জন্য এই বর্ণাধ্য মিছিলের সূচনা হয়েছিল। ১৯৯৬ সাল থেকে এটি ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিতি পায়। এই শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত বাঘ (শৌর্য), হাতি (সম্পদ), পেঁচা (প্রজ্ঞা) এবং সূর্যমুখীর মতো লোকজ মোটিফগুলো বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরই প্রতিফলন। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো এই শোভাযাত্রাকে ‘মানবতার বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।

​মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল আবেদন হলো এর অসাম্প্রদায়িকতা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই শোভাযাত্রার নাম ও বিষয়বস্তু নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে এর নাম ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই ধরনের নাম পরিবর্তনকে বাঙালির দীর্ঘদিনের অসাম্প্রদায়িক পরিচয়ের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছেন অনেক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তবুও এটি আজও বাঙালির প্রতিরোধের এক সৃজনশীল রূপ হিসেবে টিকে আছে।

​নগরায়ণ ও বিশ্বায়নের প্রভাব: আত্মপরিচয়ের নব্য সংকট

​বর্তমানে নগরায়ণ বলতে কেবল দালানকোঠা নির্মাণ নয়, বরং এটি জীবনযাত্রার আমূল পরিবর্তনকে বোঝায়। শিল্পের প্রসারে গ্রামের মানুষ আজ কাজের খোঁজে শহরে ভিড় করছে, যার ফলে যৌথ পরিবার প্রথা ভেঙে যাচ্ছে। বিশ্বায়ন সারা বিশ্বকে একটি কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত করলেও এর ফলে ক্ষুদ্র ও আঞ্চলিক সংস্কৃতিগুলো হুমকির মুখে পড়ছে। পহেলা বৈশাখ আজ অনেক ক্ষেত্রে কেবল পান্তা-ইলিশ খাওয়ার একটি ‘ফ্যাশন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহুরে উৎসবের জৌলুসে গ্রামীণ ঐতিহ্যের সেই প্রাণের টান অনুপস্থিত। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে যে করপোরেট বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হয়েছে, তা এই উৎসবের মূল নির্যাসকে অনেক ক্ষেত্রে ম্লান করে দিচ্ছে।

​প্রবাসে বাঙালির লড়াই: পরবাসে শিকড়ের অস্তিত্ব রক্ষা

​জীবিকার তাগিদে দেশান্তরী হলেও প্রবাসে বসবাসরত বাঙালিরা তাঁদের হৃদয়ে বাংলাদেশকেই লালন করেন। লন্ডন, নিউইয়র্ক কিংবা আমস্টারডামের মতো শহরগুলোতে আজ নিয়মিত বৈশাখী মেলা আয়োজিত হয়। প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মকে বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতি জানানো আজ এক বড় চ্যালেঞ্জ। ড. হুমায়ুন আজাদের ‘মাই বিউটিফুল বাংলাদেশ’-এর মতো বই কিংবা বিভিন্ন বাংলা স্কুলের মাধ্যমে তাদের শিকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রবাসীরাই বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদায় আসীন করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

​ঐতিহ্যের প্রবহমানতা ও আবহমান বাংলা

​বাঙালির শিকড় ও ঐতিহ্যের কথা বলতে গেলে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘আবহমান’ কবিতার কথা মনে পড়ে। কবি সেখানে দেখিয়েছেন যে, মানুষ যতই আধুনিক হোক না কেন, তার অস্তিত্বের সত্য নিহিত আছে মাটির গহীন শিকড়ে। তাঁর কবিতায় লাউমাচা আর সন্ধ্যার বাতাসে দুলতে থাকা ফুলের যে চিত্রকল্প, তা বাঙালির চিরন্তন ঐতিহ্যের প্রতীক। ঐতিহ্যের মৃত্যু নেই, এটি কেবল রূপান্তর লাভ করে। জীবনানন্দ দাশের দর্শনেও আমরা আমাদের ‘নীল বাংলা’র সাথে এক আত্মিক সংযোগ অনুভব করি, যা পহেলা বৈশাখের চেতনায় আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

​সাহিত্যে বৈশাখ: মুকুন্দরাম থেকে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল

​বাংলা সাহিত্যে বৈশাখ কেবল একটি মাস নয়, বরং এটি রুদ্র ও নতুনের সংমিশ্রণ। ষোড়শ শতাব্দীর কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী বৈশাখকে বর্ণনা করেছেন দাবদাহ আর প্রাকৃতিক বিক্ষুব্ধতার মাস হিসেবে। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৈশাখকে দেখেছেন এক নতুনের আবাহন হিসেবে। তাঁর ‘এসো হে বৈশাখ’ গানটি আজ বাঙালির জাতীয় ঐতিহ্যের অংশে পরিণত হয়েছে, যা জীর্ণ ও পুরনোকে ধুয়ে-মুছে ফেলার আহ্বান জানায়। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বৈশাখকে দেখেছেন ধ্বংসের নকীব এবং অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে এক প্রচণ্ড বিপ্লব হিসেবে। এভাবে সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাধ্যমে বৈশাখ বাঙালির জাতীয়তাবোধের এক প্রধান স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

​আগামীর অঙ্গীকার: শিকড়কে শক্ত রাখার উপায়

​পহেলা বৈশাখ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিশ্বে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে হলে আগে আমাদের নিজেদের শিকড়কে শক্ত রাখতে হবে। আজ আমাদের প্রধান কাজ হলো হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যগুলোকে পুনরুদ্ধার করা। কেবল বছরে একদিন পান্তা-ইলিশ খেয়ে নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনে বাঙালি সংস্কৃতিকে চর্চা করতে হবে। আমাদের সন্তানদের ঐতিহ্যের গল্প শোনাতে হবে; পরিচয় করিয়ে দিতে হবে হাডুডু কিংবা নৌকাবাইচের রোমাঞ্চের সঙ্গে। রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত উভয় পর্যায়ের উদ্যোগের মাধ্যমেই আমাদের গৌরবময় সংস্কৃতিকে ধারণ করতে হবে। পহেলা বৈশাখ যেন কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ হয়ে না থাকে, বরং এটি যেন বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার জয়গান গেয়ে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার শপথের দিনে পরিণত হয়।