img

দেশের সবচেয়ে দূষিত নদী হবিগঞ্জের সুতাং

প্রকাশিত :  ০৬:২৪, ১০ জুন ২০২৬

 দেশের সবচেয়ে দূষিত নদী হবিগঞ্জের সুতাং

এক সময়ের সমৃদ্ধ জলপথ, হবিগঞ্জের সুতাং নদী এখন তীব্র পরিবেশগত সংকটের কবলে। কারখানার শিল্পবর্জ্য নদীটিকে বিষাক্ত জলাশয়ে পরিণত করেছে।

বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর প্রায় সবগুলোয়ই শিল্পবর্জ্য ও মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। দেশের নদ-নদীর ওপর করা গবেষণা প্রতিবেদনের ফলাফল অনুযায়ী দেশের সবচেয়ে দূষিত নদী তিনটি। এরমধ্যে রয়েছে হবিগঞ্জের সুতাং নদী। সবচেয়ে দূষিত নদীর শীর্ষে থাকা অপর দুটি হলো- গাজীপুরের লবণদহ নদী ও নরসিংদীর হাঁড়িধোয়া নদী।

পরিবেশসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্পবর্জ্যের দূষণের সঙ্গে প্লাস্টিক দূষণ নতুন করে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি পৌরবর্জ্য নদী দূষণে নতুন মাত্রা যোগ করছে।

২০২৩ সালে রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) উদ্যোগে দেশের ৫৬টি প্রধান নদ-নদীর দূষণ নিয়ে এক বছরব্যাপী গবেষণা পরিচালনা করা হয়। গবেষণায় ৫৬টি নদীর পানির গুণাগুণ পরিমাপ করে দেখা গেছে, শুধু শহর বা উপশহরে নয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের নদীতেও প্লাস্টিক ও শিল্পবর্জ্যের দূষণ ছড়িয়ে পড়েছে। নদী বহমান, তাই দূষণ স্রোতের সঙ্গে সঙ্গে এক নদী থেকে অন্য নদীতে ছড়ায়।

নদীর স্বাস্থ্য ও জলজ চরিত্র বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে দূষণের মূল চারটি প্যারামিটার সামনে রেখে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। এক্ষেত্রে পানির জারক প্রকৃতি, দ্রবীভূত অক্সিজেন, জৈব অক্সিজেনের চাহিদা (বিওডি) ও রাসায়নিক অক্সিজেনের চাহিদা (সিওডি) পরিমাপ করে নির্ণয় করা হয় নদ-নদীর দূষণ। গবেষক দল জানায়, শুষ্ক মৌসুমে নদীর বিভিন্ন অংশ থেকে সংগ্রহ করা হয় স্যাম্পল। তবে এ গবেষণায় নদী দখল ও অন্যান্য প্যারামিটার আমলে নেয়া হয়নি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গবেষক দলের সদস্যরা বলেন, ‘‌একটা সময় আমাদের উদ্বেগের কারণ ছিল শহর ও নগরের পার্শ্ববর্তী নদীগুলো। কারণ শিল্পকারখানা এসব অঞ্চলে বেশি। কিন্তু এবার আমরা দেখলাম এমন কোনো নদী নেই যেখানে দূষণ নেই। কারণ হলো প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এখন শিল্পকারখানা নির্মাণ হচ্ছে। ফলে সুন্দরবনের আশপাশের নদীতেও দূষণ পাওয়া গেছে। নদীর স্রোত বয়ে চলে, তাই গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদীতেও দূষণ ঘটছে। এছাড়া সব নদীতেই বিভিন্ন উৎস থেকে প্লাস্টিক দূষণও পাওয়া গেছে প্রচুর।

গবেষণার তথ্যমতে, সবচেয়ে দূষিত তিন নদীর পানির গুণাগুণ প্রায় সমান। লবণদহ, হাঁড়িধোয়া ও সুতাংয়ে পানির ক্ষারতার পরিমাণ যথাক্রমে ৫, ৪ দশমিক ১ ও ৪। পানিবিজ্ঞানীদের মতে, বিশুদ্ধ পানির পিএইচ বা ক্ষারের পরিমাণ ছয় থেকে সাতের মধ্যে থাকতে হয়। এর কম হলে পানিকে আম্লিক এবং বেশি হলে ক্ষারীয় বলা হয়। পিএইচের মানমাত্রা বেশি ও কম দুটোই মানব স্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর।

তিন নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মানমাত্রা ভয়াবহ রকম কম। লবণদহে অক্সিজেনের পরিমাণ শূন্য দশমিক ২১, হাঁড়িধোয়ায় শূন্য দশমিক ৬ ও সুতাংয়ে শূন্য দশমিক ৪। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পানিবিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ অবশ্যই ৪ দশমিক ৫ থেকে ৮ মাত্রায় থাকতে হবে। নয়তো জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।

উৎপত্তি ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ তিনটি নদীই সমৃদ্ধ জনপদ গড়তে নানাভাবে ভূমিকা রেখেছে।

সুতাং বাংলাদেশ-ভারতের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হবিগঞ্জে নদীটির দৈর্ঘ্য ৮২ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৩৬ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। পাহাড়ের কোলঘেঁষা সুতাং নদী এককালে ছিল খরস্রোতা। কালের আবর্তনে নদীর এ ঐতিহ্যও হারিয়ে যাচ্ছে।

হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হকৃবি) সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণা সূত্রে জানা গেছে, সুতাং নদ ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের কবলে পড়েছে। এই নদ থেকে সংগৃহীত ৩০টি মাছের পরিপাকতন্ত্র বিশ্লেষণ করে মোট ৫১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি মাছে গড়ে প্রায় দুটি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। সুতাংয়ের পানিতেও পাওয়া গেছে বিপুল ক্ষুদ্র প্লাস্টিক ও ভারী ধাতব কণা।

গবেষণায় বলা হয়, ছোট মাছের তুলনায় বড় আকারের মাছে দূষণের মাত্রা তুলনামূলক বেশি। দীর্ঘদিন এই নদে তাদের বসবাসে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

পানিতে দূষিত প্লাস্টিক: নদের পানিতেও পাওয়া গেছে বিপুল ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা। প্রতি লিটার পানিতে ৬টি থেকে সর্বোচ্চ ৪৬টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এসব কণার গড় আকার শূন্য দশমিক ১ মিলিমিটার থেকে শূন্য দশমিক ৫ মিলিমিটার পর্যন্ত। রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব কণার মধ্যে পলিথিন, পলিইথিলিন টেরেফথালেট ও পলিআমাইডের মতো ক্ষতিকর প্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এসব কণা এসেছে শিল্পবর্জ্য ও প্লাস্টিক প্যাকেটজাত পণ্য থেকে।

সুতাং নদের পানি নিয়ে আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, এর পানিতে লোহা, ম্যাঙ্গানিজ ও সিসার মতো ভারী ধাতুর মাত্রাও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। পানির দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কম এবং মোট দ্রবীভূত কঠিন পদার্থের পরিমাণ বেশি হওয়ায় ‘ওয়াটার কোয়ালিটি ইনডেক্স’ অনুযায়ী এই নদের পানি খুবই নিম্নমানের হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকেরা। তাঁদের মতে, শিল্প এলাকাসংলগ্ন ভাটির দিকে দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। অনিয়ন্ত্রিত শিল্পবর্জ্য, টেক্সটাইল কারখানার বর্জ্য এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে সুতাংয়ের পরিবেশের দ্রুত অবনতি ঘটছে।

গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার দক্ষিণ সীমান্তঘেঁষা ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলার ক্ষীরু নদীর সংযোগস্থল থেকে উৎপত্তি লবণদহের। এরপর আঁকাবাঁকা দীর্ঘপথ অতিক্রম করে মির্জাপুরের কাছে তুরাগ নদে এসে মিশেছে। একসময়ের প্রমত্তা নদ এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে ‘লবণদহ খাল’ হিসেবেও পরিচিতি পাচ্ছে। হারিয়ে ফেলেছে তার নদী চরিত্র। এখন কেউ বলে লবলং খাল আবার কেউ বলে লবলং নালা।

নরসিংদী জেলা শহর ঘেঁষে বয়ে যাওয়া খরস্রোতা হাঁড়িধোয়া নদীটি একসময় এ জেলাবাসীর জন্য আশীর্বাদ ছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে এ নদীপথের ভূমিকা ছিল ব্যাপক। পাশাপাশি নদীপারের মানুষের কৃষিজমি যেমন ছিল ফসলে ভরা, তেমনি নদীর পানিতে ছিল প্রচুর দেশীয় প্রজাতির মাছ। দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত দখল আর শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে এ নদী এখন এলাকাবাসীর জন্য অভিশাপে পরিণত হচ্ছে। নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিম ও শিবপুর উপজেলার পশ্চিম-উত্তর শীতলক্ষ্যা নদীর কোণ থেকে প্রায় ৬০-৭০ কিলোমিটার আঁকাবাঁকা হয়ে নদীটি জেলা শহরের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে এসে মেঘনা নদীর মোহনায় মিলিত হয়েছে। এখন আর মাছ পাওয়া যায় না, এমনকি পশুপাখির জন্যও সম্পূর্ণ ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে হাঁড়িধোয়া নদীর পানি।


সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

সুনামগঞ্জে বাসের ধাক্কায় বৃদ্ধ নিহত

প্রকাশিত :  ০৬:৩১, ১০ জুন ২০২৬

সুনামগঞ্জ জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলাস্থ পাগলা বাজারে সাগরিকা পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় আব্দুল মনাফ (৭০) নামে এক বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন।

মঙ্গলবার ভোরে সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাগলা বাজার বাসস্ট্যান্ডে এই মর্মান্তিক দূর্ঘটনা ঘটে।

নিহত আব্দুল মনাফ উপজেলার ডুংরিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মৃত রিফাত উল্লাহর ছেলে।

স্থানীয় সূত্র ও জয়কলস হাইওয়ে পুলিশ জানায়, ভোরে কান্দিগাঁও জামে মসজিদে ফজরের নামাজ আদায় শেষে কান্দিগাঁওয়ে এক আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পাগলা বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মহাসড়কের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন আ. মনাফ। এ সময় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা সুনামগঞ্জগামী ঢাকা মেট্রো-ব-১২-১৯৬০ নম্বরের সাগরিকা পরিবহনের একটি বাস তাকে ধাক্কা দেয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন।

দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

দূর্ঘটনার পর বাসটি ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত চলে যায়। পরে উপজেলার সদরপুর সেতুর সামনে বাসটি রেখে চালক পালিয়ে যান। খবর পেয়ে জয়কলস হাইওয়ে পুলিশ সেখানে গিয়ে বাসটি জব্দ করে। তবে চালককে আটক করা সম্ভব হয়নি।

জয়কলস হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মোতালেব বলেন, দুর্ঘটনায় জড়িত বাসটি পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।