img

শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি অরণ্যে ৩০টির বেশি প্রাচীন গিরিখাত, পর্যটন সম্ভাবনায় নতুন দিগন্ত

প্রকাশিত :  ১৪:৪১, ২২ জুন ২০২৬

শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি অরণ্যে ৩০টির বেশি প্রাচীন গিরিখাত, পর্যটন সম্ভাবনায় নতুন দিগন্ত

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি: চা-বাগান, পাহাড়ি টিলা, হাওর, লেক ও বনাঞ্চলের জন্য পরিচিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে একগুচ্ছ প্রাচীন গিরিখাত। উপজেলার সিন্দুরখান ইউনিয়নের ভারতীয় সীমান্তসংলগ্ন নাহার চা-বাগানের পাশের পুঞ্জি এলাকার গভীর পাহাড়ি অরণ্যে ৩০টিরও বেশি গিরিখাতের সন্ধান পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব গিরিখাতের কোনোটি প্রায় এক কিলোমিটার, আবার কোনোটি কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। কয়েকটি গিরিখাত বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ভেতরেও প্রবেশ করেছে।

স্থানীয় খাসিয়াসহ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষেরা গিরিখাতগুলোর নাম দিয়েছেন ‘লাসুবন’, ‘ক্রেম উল্কা’, ‘ক্রেম কেরি’সহ বিভিন্ন নামে। স্থানীয় ভাষায় ‘লাসুবন’-এর অর্থ পাহাড়ি ফুল। এলাকার গাছপালা, ফুল-ফল এবং ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে এসব নামকরণ করা হয়েছে।

গিরিখাতগুলোর চারপাশে রয়েছে গভীর গুহা, পাহাড়ি ঝরনা, ছোট ছোট জলপ্রপাত এবং বৈচিত্র্যময় শিলা গঠন। সব মিলিয়ে অঞ্চলটি পেয়েছে এক অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, যা প্রকৃতিপ্রেমী ও অভিযাত্রীদের কাছে নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।

আবিষ্কারের নেপথ্যে

শ্রীমঙ্গল উপজেলা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বিষয়ক সমন্বয়কারী তাজুল ইসলাম জাবেদ জানান, ২০১৮ সালে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনযাত্রা নিয়ে কাজ করার সময় তিনি প্রথম এসব গিরিখাতের সন্ধান পান। পরে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম এবং কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী এলাকাটি পরিদর্শন করেন।

তাজুল ইসলাম জাবেদ বলেন, দুর্গম যাতায়াতব্যবস্থা এবং জনসমাগমের অভাবে দীর্ঘদিন এলাকাটি সাধারণ মানুষের দৃষ্টির আড়ালে ছিল। পরবর্তীতে করোনা মহামারির কারণে চলাচলে বিধিনিষেধ থাকায় এ নিয়ে পর্যটন উন্নয়নের উদ্যোগও থমকে যায়।

স্থানীয়দের মতে, তারা বহু বছর ধরে এসব গিরিখাতের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানলেও এর পর্যটন ও গবেষণাগত গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না। অনেকের ধারণা, দীর্ঘমেয়াদি প্রাকৃতিক ক্ষয়প্রক্রিয়ার ফলে এসব গিরিখাতের সৃষ্টি হয়েছে।

পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হয় দুর্গম পথ

গিরিখাতগুলোতে পৌঁছাতে হলে প্রথমে জিপ বা মোটরসাইকেলে সিন্দুরখান ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকায় যেতে হয়। এরপর কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে অতিক্রম করতে হয় খাড়া পাহাড়ি ছড়া, ঘন জঙ্গল এবং পাথুরে উঁচু-নিচু পথ।

সীমান্তবর্তী এ অঞ্চলে খাসিয়া সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ এবং চা-বাগানের শ্রমিকেরা বসবাস করেন। দুর্গম অবস্থানের কারণে এলাকাটি এখনও অনেকাংশে অনাবিষ্কৃত ও অপরিচিত রয়ে গেছে।

প্রশাসনের নজরে আসে গিরিখাত

 তৎকালীন মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মো. ইসরাইল হোসেন এবং তৎকালীন শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসলাম উদ্দিন লাসুবন গিরিখাত পরিদর্শন করেন। বর্তমানে তাঁরা দুজনই অন্যত্র বদলি হয়েছেন।

পরিদর্শনের পর তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. ইসরাইল হোসেন তাঁর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে লিখেছিলেন, “শ্রীমঙ্গলের নাহারপুঞ্জির নিকটস্থ লা-সুবহান (লা-সুবন) গিরিখাত ভ্রমণ করলাম। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ভরপুর এই স্থান ভ্রমণপিপাসুদের জন্য হতে পারে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আপনাদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।”

তৎকালীন ইউএনও মো. ইসলাম উদ্দিন জানিয়েছিলেন, গিরিখাত এলাকায় যাতায়াত সহজ করতে সড়ক ও সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। একটি সেতুর নির্মাণকাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং অন্য সেতুগুলোর কাজও পর্যায়ক্রমে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

তিনি সে সময় পর্যটকদের সতর্ক করে বলেছিলেন, দুর্গম এলাকায় ভ্রমণের ক্ষেত্রে একা না গিয়ে অবশ্যই অভিজ্ঞ গাইডের সহায়তা নেওয়া উচিত।

পর্যটন মানচিত্রে নতুন সংযোজনের সম্ভাবনা

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, যথাযথ সংরক্ষণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে শ্রীমঙ্গলের পর্যটন মানচিত্রে যুক্ত হতে পারে নতুন একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য। চা-বাগান, বনাঞ্চল, ঝরনা, গুহা ও গিরিখাতের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ অঞ্চল দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য হয়ে উঠতে পারে প্রকৃতি ও রোমাঞ্চভিত্তিক পর্টনের অন্যতম কেন্দ্র।

প্রকৃতির নিভৃত কোলে লুকিয়ে থাকা এই গিরিখাতগুলো ধীরে ধীরে মানুষের নজরে আসছে। তবে পর্যটনের বিকাশের পাশাপাশি এলাকার পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ব্যবস্থা—এমন মত স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশসচেতনদের।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

শ্রীমঙ্গলে তিন দিনে দুটি অজগর ও একটি শঙ্খিনী উদ্ধার, লোকালয়ে বন্যপ্রাণীর আনাগোনায় উদ্বেগ

প্রকাশিত :  ১৯:২৪, ২১ জুন ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় গত তিন দিনে লোকালয়ের তিনটি পৃথক স্থান থেকে দুটি অজগর ও একটি অত্যন্ত বিষধর শঙ্খিনী (ব্যান্ডেড ক্রেইট) সাপ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা সাপগুলো অক্ষত অবস্থায় শ্রীমঙ্গল বন বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়।

স্থানীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীদের মতে, চা-বাগান, পাহাড়, হাওর ও লেকবেষ্টিত এই অঞ্চলে প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া এবং জনবসতি ক্রমাগত সম্প্রসারণের কারণে বন্যপ্রাণীরা প্রায়ই খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসছে।

গত রোববার (২১ জুন) দুপুরে উপজেলার বরুণা হাজিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন আওয়াল মিয়ার বাড়ির পুকুরে মাছ ধরার সময় জালে একটি বড় সাপ আটকা পড়ে। খবর পেয়ে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল এবং পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ ঘটনাস্থলে গিয়ে সেটিকে অজগর হিসেবে শনাক্ত করেন এবং উদ্ধার করেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক দিন ধরে ওই এলাকায় হাঁস, কবুতরসহ কিছু গৃহপালিত প্রাণী নিখোঁজ হচ্ছিল। প্রাথমিকভাবে শিয়াল বা বনবিড়ালকে দায়ী করা হলেও অজগর উদ্ধারের পর ধারণা করা হচ্ছে, এসব ঘটনার সঙ্গে সাপটির সম্পর্ক থাকতে পারে।

এর আগে শনিবার (২০ জুন) কাকিয়াবাজার এলাকায় ফসলি জমিতে মাছ ধরার সময় আরেকটি অজগর দেখতে পান স্থানীয় তপু দেবনাথ। পরে বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক সঞ্জিত দেব ও পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ সেটি উদ্ধার করে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেন।

এরও আগে বৃহস্পতিবার (১৯ জুন) কালীঘাট ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলাকালে শ্রমিকেরা একটি সাপ দেখতে পান। আতঙ্কে তারা সরে দাঁড়ালে বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সদস্যরা গিয়ে সেটিকে শঙ্খিনী বা ব্যান্ডেড ক্রেইট হিসেবে শনাক্ত করেন। অত্যন্ত বিষধর এই প্রজাতির সাপটি পরে নিরাপদে উদ্ধার করে বন বিভাগের কাছে দেওয়া হয়।

স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা জানান, শ্রীমঙ্গল ও এর আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা—চা-বাগান, বনাঞ্চল, টিলা ও ঝোপঝাড়ে ঘেরা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে বনভূমি দখল, রিসোর্ট নির্মাণ ও অনিয়ন্ত্রিত বসতি সম্প্রসারণের কারণে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল মারাত্মকভাবে সংকুচিত হচ্ছে। এর ফলে খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে সাপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে। অনেক সময় সড়ক দুর্ঘটনায় তাদের মৃত্যু হচ্ছে, আবার কখনো মানুষের হাতে ধরা পড়ছে।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের দাবি, গত দুই দশকে তারা দুই হাজারেরও বেশি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছে। উদ্ধারকৃত প্রাণীগুলো পরবর্তীতে বন বিভাগের মাধ্যমে প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অবমুক্ত করা হয়।

সংরক্ষণকর্মীরা সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, লোকালয়ে বন্যপ্রাণী দেখা গেলে আতঙ্কিত না হয়ে বা আঘাত না করে দ্রুত বন বিভাগ বা উদ্ধারকারী সংস্থাকে খবর দেওয়া উচিত। এতে মানুষ ও বন্যপ্রাণী—উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।

সিলেটের খবর এর আরও খবর