img

এফোর্ডেবল হোমসের কোটায় লন্ডন মেয়রের আংশিক ছাড়ে টাওয়ার হ্যামলেটস মেয়র-এর প্রতিক্রিয়াঃ “এটি আমাদের আইনি চ্যালেঞ্জের ফল”

প্রকাশিত :  ১৯:৪১, ২০ জুলাই ২০২৬

এফোর্ডেবল হোমসের কোটায় লন্ডন মেয়রের আংশিক ছাড়ে টাওয়ার হ্যামলেটস মেয়র-এর প্রতিক্রিয়াঃ “এটি আমাদের আইনি চ্যালেঞ্জের ফল”

সাশ্রয়ী আবাসন বা এফোর্ডেবল হোমসের  কোটা ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে টাওয়ার হ্যামলেটস, হ্যাকনি ও লুইশাম কাউন্সিল আইনি লড়াই শুরু করেছিল মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে। সেই চাপের মুখেই আজ (১৬ জুলাই) কিছুটা পিছু হটলেন লন্ডনের মেয়র। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রস্তাবিত কর্তন থেকে অব্যাহতি পাচ্ছে টাওয়ার হ্যামলেটস সহ আরও কয়েকটি বারা।

তবে এই ছাড়কে \"অর্ধেক জয়\" হিসেবেই দেখছেন টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান। তিনি বলেন, \"আজকের (১৬ জুলাই) ঘোষণা প্রমাণ করে আমাদের আইনি চ্যালেঞ্জের প্রভাব কতটা ছিল\", কিন্তু এটি \"যথেষ্ট দূর পর্যন্ত যায়নি\"। ২০২৮ সাল পর্যন্ত এই ‘জরুরি ব্যবস্থা’ চালু রাখলে “আগামী দুই বছরে হাজার হাজার সাশ্রয়ী বাড়ি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে, যেগুলো একবার হারালে আর ফিরে পাওয়া যাবে না।”

টাওয়ার হ্যামলেটস, হ্যাকনি ও লুইশাম - এই তিন কাউন্সিল যৌথভাবে গ্রেটার লন্ডন অথরিটির (জিএলএ) বিরুদ্ধে হাইকোর্টে জুডিশিয়াল রিভিউ এর আবেদন জানায়। এই আইনি পদক্ষেপকে সমর্থন জানায় আরও চারটি কাউন্সিল - ল্যামবেথ, সাউথওয়ার্ক, ওয়ালথ্যাম ফরেস্ট ও হ্যারিঙ্গে। মোট সাতটি কাউন্সিলের এই সম্মিলিত অবস্থানই শেষ পর্যন্ত সিটি হলকে নীতি পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করেছে বলে মনে করছেন মেয়র রহমান।

মেয়র লুৎফুররহমানের মতে, সিটি হল “আমাদের জুডিশিয়াল রিভিউ দাবিতে উপস্থাপিত যুক্তির মৌলিক ভিত্তি মেনে নিয়েছে”, কারণ এই প্রস্তাবটি “স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী উচ্চাভিলাষী সাশ্রয়ী আবাসনের লক্ষ্য নির্ধারণে কাউন্সিলগুলোর ভূমিকার গুরুত্ব স্বীকার করছে এবং টাওয়ার হ্যামলেটসের মতো বারাগুলো যে উচ্চমাত্রায় সাশ্রয়ী আবাসন বা এফোর্ডেবল হোমস সরবরাহ করছে তার স্বীকৃতি দিচ্ছে।

লন্ডনের আবাসন সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। সোশ্যাল হাউজিংয়ের অপেক্ষমাণ তালিকা গত দশ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, আর অস্থায়ী আবাসনে থাকা পরিবারের সংখ্যাও রেকর্ড ছুঁয়েছে। স্থানীয় কাউন্সিলগুলো বারবার সতর্ক করে আসছে যে, সাশ্রয়ী আবাসনের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিলে বাসিন্দাদের জন্য প্রকৃত অর্থে এফরডেবুল বাড়ি পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান বলেন, \"লন্ডনের মেয়রের সাশ্রয়ী আবাসন বা এফোর্ডেবল হোমসের  কোটাকে ৩৫% থেকে ২০%-এ নামানোর সিদ্ধান্ত ঠেকাতে আমাদের আইনি চ্যালেঞ্জ যে প্রভাব ফেলেছে, আজকের ঘোষণা তারই প্রমাণ। আমরা আইনি কার্যক্রম শুরুর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সিটি হল এই ছাড় দিয়েছে, যা আমাদের জুডিশিয়াল রিভিউ দাবিতে উত্থাপিত যুক্তির মৌলিক ভিত্তি মেনে নেওয়ারই ইঙ্গিত দেয়। এই চ্যালেঞ্জটি আমরা হ্যাকনি ও লুইশাম কাউন্সিলের সঙ্গে যৌথভাবে করেছি এবং লন্ডনের সাতটি কাউন্সিল এর পক্ষে সমর্থন দিয়েছে।\"

তিনি বলেন, \"সিটি হল এখন স্বীকার করছে যে কাউন্সিলগুলোকে স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী উচ্চাভিলাষী এফোর্ডেবল হোমসের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের সুযোগ দেওয়া উচিত, এবং টাওয়ার হ্যামলেটসের মতো বারা ইতিমধ্যেই যে উচ্চ মাত্রায় সাশ্রয়ী আবাসন সরবরাহ করছে, তা স্বীকৃতি পাওয়া উচিত। একটি একচেটিয়া ২০% কর্তন নির্ধারণ করলে এই সুবিধাগুলো সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যেত।

“তবে এই প্রস্তাব যথেষ্ট নয়। কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই সিটি হল ২০২৮ সাল পর্যন্ত এই বিধ্বংসী ‘জরুরি ব্যবস্থা’ চালিয়ে যেতে চায়। এর ফলে আগামী দুই বছরে হাজার হাজার সাশ্রয়ী বাড়ি হারিয়ে যাবে, যেগুলো একবার হারালে আর কখনো ফিরে পাওয়া যাবে না। একই সময়ে লক্ষ লক্ষ পরিবার আবাসনের অপেক্ষায় রয়েছে এবং প্রায় এক মিলিয়ন লন্ডনবাসী অতিরিক্ত ভিড় বা বসবাস অনুপযুক্ত বাসস্থানে বাস করছে।”

মেয়র লুৎফুর রহমান বলেন, \"আমরা লন্ডনের মেয়র ও গ্রেটার লন্ডন অথরিটির সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। আমরা এই মূলনীতির পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকব যে, বড় ধরনের পরিকল্পনা নীতিতে পরিবর্তন আনতে হলে তা যথাযথ পর্যালোচনা, অর্থবহ পরামর্শ এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার মধ্য দিয়েই আসতে হবে। যেখানে লন্ডনের প্রতি ২১টি শিশুর একজন গৃহহীন, অর্থাৎ প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে অন্তত একজন গৃহহীন শিশু রয়েছে, সেখানে আমরা নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারি না, যখন আমাদের কমিউনিটির একান্ত প্রয়োজনীয় প্রকৃত সাশ্রয়ী বাড়ির বা এফোর্ডেবল হাউস-এর চেয়ে ডেভেলপারদের মুনাফাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।\"


কমিউনিটি এর আরও খবর

img

ইস্ট লন্ডন মসজিদে আদমশুমারির তথ্য নিয়ে আলোচনা: ব্রিটেনে ১০ বছরে মুসলমানের সংখ্যা বেড়ে ২৮ লাখ থেকে ৪০ লাখ

প্রকাশিত :  ২০:০০, ২০ জুলাই ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ২১:২০, ২০ জুলাই ২০২৬

লন্ডন, ২০ জুলাই ২০২৬ :  ইস্ট লন্ডন মসজিদের উদ্যোগে যুক্তরাজ্যের আদমশুমারির তথ্যের আলোকে ব্রিটিশ মুসলিম কমিউনিটির বর্তমান চিত্র নিয়ে একটি বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে । মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেন- এর সহযোগিতায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষার্থী, সমাজকর্মী এবং বিভিন্ন পেশাজীবী অংশ নেন। আলোচনায় ব্রিটেনে ১০ বছরে মুসলমানের সংখ্যা বেড়ে ২৮ লাখ থেকে ৪০ লাখে উন্নীত হয়েছে বলে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।  

১৪ জুলাই মঙ্গলবার সন্ধ্যায় লন্ডন মুসলিম সেন্টারে অনুষ্ঠিত এ আলোচনায় সভায় “সংখ্যায় ব্রিটিশ মুসলিম : কমিউনিটির উন্নয়নে নেতৃত্বদানকারীদের জন্য আদমশুমারির তথ্য” শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয় । এতে গত দুই দশকে ব্রিটিশ মুসলিম সমাজের জনসংখ্যাগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের চিত্র জনশুমারির তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।  আলোচনা সভাটি ইস্ট লন্ডন মসজিদের 'ইএলএম কনেক্স' প্রজেক্টের উদ্যোগে আয়োজন করা হয়।

গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন মুসলিম কাউন্সিল অব বৃটেনের রিসার্চ অ্যান্ড ডকুমেন্টেশন কমিটির দুই গবেষক ড. জামিল শরীফ এবং ফাতেমা সুন্দারজি।

প্রথম পর্বে ড. জামিল শরীফ ব্রিটেনের মুসলিম জনসংখ্যার পরিবর্তন তুলে ধরেন । তিনি জানান, এক দশকে ব্রিটেনে মুসলমানের সংখ্যা ২৮ লাখ থেকে বেড়ে ৪০ লাখে পৌঁছেছে । দশ বছরে বেড়েছে ১২ লাখ মুসলিম।

ড. শরীফ জামিল মুসলিম কমিউনিটির বয়স কাঠামো ও সামাজিক অগ্রগতির বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, উচ্চ পর্যায়ের ব্যবস্থাপনা ও পেশাজীবী পদে মুসলমানদের অংশগ্রহণ ২০০১ সালে ছিলো ৬.৬ শতাংশ। কিন্তু এটা বেড়ে ২০২১ সালে ৮ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

তিনি মুসলমানদের সম্পর্কে প্রচলিত কিছু উগ্র ডানপন্থী প্রচারণারও তথ্যভিত্তিক জবাব দেন । উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের চিকিৎসকদের ১১ দশমিক ৪ শতাংশ মুসলিম। আবার মুসলমানরা ইংরেজি বলতে পারেন না—এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। আদমশুমারী অনুযায়ী, ৯১ শতাংশ মুসলমানের ইংরেজি ভালো বা খুব ভালোভাবে বলতে পারেন, যেখানে জাতীয় গড় ৯৮ শতাংশ।

ফাতেমা সুন্দারজি টাওয়ার হ্যামলেটস, নিউহ্যাম, রেডব্রিজ এবং বার্কিং অ্যান্ড ড্যাগেনহামে মুসলিম জনসংখ্যার বিস্তার এবং ইনডেক্স অব মাল্টিপল ডিপ্রাইভেশন-এর (বহুমাত্রিক বঞ্চনা সূচক) সঙ্গে তার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, গত ২০ বছরে বার্কিং অ্যান্ড ড্যাগেনহামে মুসলিম জনসংখ্যা ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে । এসব এলাকায় মুসলিমদের প্রধান সমস্যা আবাসন । তিনি প্রশ্ন তোলেন, এ ধরনের সমস্যাগুলো কি শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবী কমিউনিটির সঙ্গেও মিল রয়েছে?

ফাতেমা সুন্দারজি জানান, মুসলিম পরিবারের ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ বিবাহিত দম্পতি ও নির্ভরশীল সন্তান নিয়ে গঠিত, যা যুক্তরাজ্যের সব ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে সর্বোচ্চ এবং জাতীয় গড়ের আড়াই গুণ। তিনি আরও বলেন, প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মুসলমান একাকী বসবাস করেন, যা মসজিদ ও কমিউনিটি সেন্টারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

চারটি বরোতে স্কুলপড়ুয়া শিশুদের ৫৬.৮ শতাংশ মুসলিম, যেখানে পুরো যুক্তরাজ্যে এ হার মাত্র প্রতি দশজনে একজন।

শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলিম তরুণদের অগ্রগতিও আলোচনায় উঠে আসে। ২০০১ সালে সাধারণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও ২০২১ সালে তারা সেই অবস্থান অতিক্রম করেছে। বর্তমানে তরুণ মুসলিম নারীরা শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে মুসলিম পুরুষদের ছাড়িয়ে গেছেন । টাওয়ার হ্যামলেটসে মুসলিম নারীদের ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী, যা ইংল্যান্ডের প্রধান মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।

প্রবীণ মুসলিমদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। টাওয়ার হ্যামলেটসে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মুসলিম নারীদের ৪০.৫ শতাংশ নিজেদের স্বাস্থ্যকে খারাপ বা খুব খারাপ বলে উল্লেখ করেছেন, যেখানে একই বয়সী সব নারীর ক্ষেত্রে এ হার ২৬.৮ শতাংশ।

এছাড়া ৬৫ বছরের বেশি বয়সী টাওয়ার হ্যামলেটসের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মুসলমান ইংরেজি বলতে পারেন না, যাদের অধিকাংশই নারী। তিনি প্রশ্ন রাখেন, আগামী দুই দশকে প্রবীণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে—সেই বাস্তবতার জন্য কমিউনিটি কতটা প্রস্তুত?

সমাপনী উপস্থাপনায় ড. জামিল শরীফ ২০২৯ সালের নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেন কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে নয়; বরং ভোটার নিবন্ধন, নির্বাচনী ইশতেহার বিশ্লেষণ এবং প্রার্থীদের জন্য জবাবদিহিমূলক প্রশ্নমালা তৈরির মাধ্যমে সচেতন নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কাজ করে।


কমিউনিটি এর আরও খবর