গ্রিস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নিখোঁজ জগন্নাথপুরের ৩ যুবক
লিবিয়া থেকে গ্রিসে অবৈধভাবে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ভয়াবহ নৌকা ট্র্যাজেডির ঘটনায় সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার তিন যুবক নিখোঁজ রয়েছেন। খাবার ও পানির সংকটে নৌকাটি দীর্ঘ ১১ দিন সাগরে ভেসে থাকার পর তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।
নিখোঁজ যুবকেরা হলেন- উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের বাগময়না গ্রামের আখল মিয়ার ছেলে জুয়েল আহমদ টিপু (২৫), গন্ধর্বপুর গ্রামের মৃত নুরুল ইসলামের ছেলে হাবিব উল্লাহ (২৮) এবং হিজলা গ্রামের ছালিক মিয়ার ছেলে ইউসুফ আলী (২০)।
স্বজনদের দেওয়া তথ্য মতে, নিখোঁজ যুবকদের বিদেশ পাঠাতে আন্তর্জাতিক দালাল চক্রের সাথে মোটা অঙ্কের টাকার চুক্তি হয়েছিল। রানীগঞ্জ ইউনিয়নের ইছগাঁও গ্রামের দালাল আজিজের মাধ্যমে ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে ওমান হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান গন্ধর্বপুর গ্রামের হাবিব উল্লাহ। পরবর্তীতে ৩ আগস্ট রাতে তিনি লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে গেইম দেন। অপরদিকে হিজলা গ্রামের ইউসুফ আলী পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে চিলাউড়ার করিম দালালের মাধ্যমে গত ১ জুলাই বাড়ি ছাড়েন এবং লিবিয়া পৌঁছে গ্রিসের উদ্দেশে গেইমে অংশ নেন। বাগময়না গ্রামের জুয়েল আহমদ টিপু চিলাউড়ার করিম দালাল ও দোয়ারাবাজারের জসিম দালালের মাধ্যমে লিবিয়া গিয়ে গ্রিসের উদ্দেশে গেইম দেওয়ার পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন।
ঘটনার পর থেকে নিখোঁজদের স্বজনরা কোনোভাবেই এই নির্মম সত্যি মেনে নিতে পারছেন না। স্থানীয় ইউপি সদস্য ও নিখোঁজ ইউসুফ আলীর সম্পর্কে চাচা সাদিক আলম জানান, অভাব-অনটনের কারণে বাবার সাথে কৃষিকাজ করতো ইউসুফ। খুবই নিরীহ ও নম্র প্রকৃতির ছেলেটিকে অনেক কষ্ট করে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ১৩ লাখ টাকার চুক্তিতে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। করিম দালালের মাধ্যমে লিবিয়া গিয়ে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা দেয়। গন্ধর্বপুর গ্রামের হাবিব উল্লাহর ছোট ভাই জহুর উল্লাহ ও প্রবাসে থাকা বড় ভাই আব্দুল ওয়াহিদ জানান, তারা পাঁচ ভাই ও এক বোন, যার মধ্যে হাবিব সবার ছোট। দালাল আজিজের মাধ্যমে ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে তিনি ওমান হয়ে লিবিয়া যান। লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে ৩টি বোট রওনা হয়েছিল, যার মধ্যে ২টি পৌছালেও অপর বোটটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। নিখোঁজদের পরিবারে কান্নার রোল পড়লেও স্বজনরা এখনো বিশ্বাস করেন তাদের সন্তানরা জীবিত আছেন। স্বজনদের ধারণা, গ্রিসে না পৌঁছানো বোটটির কোনো একটি স্থানে তারা এখনও বেঁচে আছেন এবং শিগগিরই ভালো কোনো খবর আসবে।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ৩ আগস্ট লিবিয়া থেকে ৪২ জন যাত্রী নিয়ে একটি রাবার নৌকা গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিল। যাত্রীদের মধ্যে ৩৮ জনই ছিলেন বাংলাদেশি এবং চারজন সুদানের নাগরিক। নৌকাটি একটি স্পিডবোট ইঞ্জিন দ্বারা পরিচালিত হলেও এতে কোনো উপযুক্ত নেভিগেশন ব্যবস্থা ছিল না, ফলে এটি দিকভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। সমুদ্রের মাঝপথে নৌকাটির ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায় এবং জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। একই সঙ্গে খাবার ও পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। অনাহার, প্রচণ্ড সূর্যের তাপ ও চরম পানিশূন্যতায় টানা ১১ দিন সাগরে ভেসে থাকার সময় অন্তত ১১ জন মৃত্যুবরণ করেন। এদের মধ্যে ৯ জন বাংলাদেশি ও ১ জন সুদানির মরদেহ বাধ্য হয়ে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ১৩ আগস্ট স্রোতের টানে নৌকাটি মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছালে সেখান থেকে উদ্ধার হওয়া ৩০ জনের মধ্যে মারাত্মক অসুস্থদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে তাদের অনেকের শরীরে পচন ধরেছে।
ভূমধ্যসাগরে যুবকদের নিখোঁজের বিষয়ে জগন্নাথপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, গ্রিসে যাওয়ার পথে এলাকার কেউ নিখোঁজ হয়েছেন বলে পুলিশকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি বা অভিযোগ করা হয়নি।
জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ ইসলাম উদ্দিন জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লেও আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।



















