শ্রীমঙ্গলে অবৈধ বালু উত্তোলন: অভিযানে যুবকের কারাদণ্ড, মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে
সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে পৃথক অভিযান চালিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। সোমবার (১৭ আগস্ট) পরিচালিত অভিযানে বালু উত্তোলনের দায়ে মো. ছাতির মিয়া (৩৫) নামে এক ব্যক্তিকে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযানের সময় আরেকটি এলাকায় বালু উত্তোলনকারীরা পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
সোমবার উপজেলার পশ্চিম ভাড়াউড়ার রুপশপুর এলাকার চিড়িয়াখানা রোডে অভিযান চালান শ্রীমঙ্গলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মিনহাজুল ইসলাম। প্রশাসনের অভিযান টের পেয়ে বালু উত্তোলনকারীরা ছড়ার অপর পাশ দিয়ে পালিয়ে যান। এ কারণে ঘটনাস্থল থেকে কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি এবং কোনো দণ্ডও দেওয়া যায়নি। তবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে গণমাধ্যমকর্মীদের জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
এরপর মৌলভীবাজার রোডের ৫ নম্বর পুল এলাকায় অভিযান চালিয়ে বালু উত্তোলনরত অবস্থায় মো. ছাতির মিয়াকে হাতেনাতে আটক করা হয়। তিনি শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালাপুর গ্রামের আব্দুল মালিকের ছেলে। পরে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী তাঁকে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
উপজেলা প্রশাসন গণমাধ্যমকর্মীদের জানিয়েছে, জনস্বার্থে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
ছড়ায় ছড়ায় বালু উত্তোলন
শ্রীমঙ্গলে পাহাড়ি ছড়া ও ছোট নদীর সংখ্যা প্রায় ৩৭টি। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ছড়ার বেশির ভাগ থেকেই দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী শ্রমিক, ট্রাকচালক ও সহকারীদের কাজে লাগিয়ে এসব বালু উত্তোলন করে দূরদূরান্তে সরবরাহ করে আসছে। ফলে অবৈধ বালু উত্তোলন এখানে দীর্ঘদিন ধরেই একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, প্রশাসনের অভিযান কিংবা কোনো দুর্ঘটনার পর সাময়িকভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলেও কিছুদিন পর আবার তা শুরু হয়ে যায়। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বালু পরিবহনের কারণে সড়কেও দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
অতীতে ভূনবীর ও সিন্দুরখান ইউনিয়নে অবৈধভাবে উত্তোলন করা বালুবাহী ট্রাকের ধাক্কায় এক বৃদ্ধা, এক শিশু কন্যা ও এক ছাত্রের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
অভিযানে ধরা পড়েন যারা, আড়ালে থাকেন মূল হোতারা
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসন মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বালু উত্তোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত শ্রমিক, ট্রাকচালক ও সহকারীরাই আটক হন। কিন্তু এর অর্থের জোগানদাতা বা মূল হোতারা থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে অভিযান শেষ হওয়ার কিছুদিন পরই আবার আগের মতো বালু উত্তোলন শুরু হয়।
অভিযানের খবর আগেই কীভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে যায়, তা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, অভিযান শুরুর খবর আগেভাগে পেয়েই অনেক সময় মূল ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে সরে যান। পরে সেখানে থাকা শ্রমিক বা পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আটক করা হয়।
স্থানীয় পর্যায়ে গুঞ্জন রয়েছে, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কারও কারও বিভিন্ন বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
সাংবাদিকের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে একজন প্রভাবশালী সাংবাদিকের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও স্থানীয়ভাবে আলোচিত হচ্ছে। জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠ-এর মৌলভীবাজার প্রতিনিধি সাইফুল ইসলাম তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এ বিষয়ে একটি পোস্ট দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত ওই সাংবাদিকের পরিচয় নিশ্চিত করে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত হয়েছে কি না, হলেও তদন্তে কী তথ্য পাওয়া গেছে, তা-ও স্পষ্ট নয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে শুধু শ্রমিক বা ট্রাকচালকদের আটক করে অভিযান চালালে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। এর সঙ্গে কারা অর্থের জোগান দিচ্ছেন, কারা বালু উত্তোলন ও পরিবহনের নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং কারা এর পেছনে রয়েছেন—তাঁদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তাঁদের মতে, নিয়মিত অভিযান, মূল হোতাদের শনাক্তকরণ এবং অবৈধ বালু পরিবহনে ব্যবহৃত যানবাহনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে শ্রীমঙ্গলের ছড়া ও নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা সম্ভব হতে পারে।



















