img

শ্রীমঙ্গলে খাটের নিচে ১৬ ফুটের বিশাল অজগর

প্রকাশিত :  ০৭:২৬, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৯:৩৭, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শ্রীমঙ্গলে খাটের নিচে ১৬ ফুটের বিশাল অজগর

সংগ্রাম দত্ত: রাত তখন প্রায় ১২টা ১০ মিনিট। ঘুমাতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন পরিবারের সদস্যরা। হঠাৎ শোবার ঘরের খাটের নিচ থেকে ভেসে আসে অস্বাভাবিক শব্দ। কৌতূহল থেকে নিচে তাকাতেই চোখে পড়ে বিশাল আকৃতির একটি অজগর। মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো বাড়িতে।

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাতে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ইছবপুর এলাকায় মিতালি ডেকোরেটার্সের মালিক মৃত হারুন মিয়ার বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। পরে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সদস্যরা গিয়ে খাটের নিচ থেকে অজগরটি অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘুমাতে যাওয়ার সময় খাটের নিচ থেকে শব্দ শুনে তাঁরা প্রথমে বিষয়টি টের পান। পরে আলো জ্বালিয়ে নিচে তাকিয়ে বড় আকারের সাপটি দেখতে পান। বিষয়টি জানানো হয় চিকিৎসক প্রলাদ বাবুকে। রাত বেশি হওয়ায় তিনি বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে সাপটি উদ্ধারের অনুরোধ করেন।

খবর পেয়ে ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল ও পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। তখন তাঁরা ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বাড়িতে পৌঁছে সতর্কতার সঙ্গে খাটের নিচ থেকে অজগরটি উদ্ধার করেন। পরে সেটি নিয়ে যাওয়া হয় শ্রীমঙ্গল বন বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয়ে।

ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, উদ্ধার করা অজগরটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬ ফুট এবং ওজন প্রায় ২৬ কেজি।

সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীমঙ্গলের শহর ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় লোকালয়ে একের পর এক সাপের উপস্থিতি দেখা দেওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত কয়েক দিনে বিভিন্ন বাড়ি থেকে বিষধর সাপের পাশাপাশি বড় আকৃতির অজগরও উদ্ধার করা হয়েছে। কখনো খাটের নিচে, কখনো শোবার ঘরের সিলিংয়ে, আবার কখনো বসতবাড়ির বিভিন্ন স্থানে এসব সাপের সন্ধান মিলেছে।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে বড় আকারের অজগরসহ মোট ১৭টি বিষধর সাপ উদ্ধার করে স্থানীয় বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে বিষধর শঙ্খিনী ও পদ্ম গোখরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ছিল।

এভাবে বনাঞ্চল থেকে সাপ লোকালয়ে চলে আসার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। বিশেষ করে বসতঘরের ভেতরে কিংবা শোবার ঘরের মতো স্থানে বড় সাপের উপস্থিতি তাঁদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাড়ির আশপাশে সাপ দেখা গেলে আতঙ্কিত হয়ে সেটিকে মারার চেষ্টা না করে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে দ্রুত বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন বা সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

বিশ্বের বৃহত্তম গ্রাম বানিয়াচং: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য জনপদ

প্রকাশিত :  ১৯:২৭, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: হবিগঞ্জের বানিয়াচং—নামটি উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিস্তীর্ণ জনপদ, প্রাচীন রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ, শতবর্ষী স্থাপনা, দীঘি-জলাভূমি, আখড়া, মন্দির-মসজিদ আর গ্রামীণ জীবনের চিরচেনা ছবি। আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম গ্রাম হিসেবে পরিচিত এই জনপদ শুধু একটি ভৌগোলিক বিস্ময় নয়; ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেরও এক অনন্য ভান্ডার।

বর্তমানে বানিয়াচং বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলার একটি উপজেলা। আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে এটি বৃহত্তম গ্রাম হিসেবে পরিচিত। একসময় এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম গ্রাম হিসেবে পরিচিতি ছিল বানিয়াচংয়ের। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহর গ্রাম থেকে নগরে পরিণত হওয়ার পর বানিয়াচং বিশ্বের বৃহত্তম গ্রাম হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

প্রায় ৪৮২.৪৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বিশাল জনপদে রয়েছে ১৫টি ইউনিয়ন। জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখের বেশি। ফলে প্রচলিত অর্থে ‘গ্রাম’ শব্দটির সঙ্গে বানিয়াচংয়ের বিস্তৃতি ও জনজীবনের ব্যাপ্তি অনেকটাই ব্যতিক্রমী।

নামের পেছনে নানা গল্প

বানিয়াচংয়ের নামকরণ নিয়েও রয়েছে নানা মত। প্রচলিত একটি ধারণা অনুযায়ী, একসময় এখানে পুটিয়াবিল নামে একটি প্রকাণ্ড বিল ছিল। বিলে নানা জাতের পাখির বিচরণ ছিল। বানিয়া নামে এক শিকারি ওই বিলে একটি চাঙ নির্মাণ করে পাখি শিকার করতেন। পরে প্রাকৃতিক কারণে বিলটি ভরাট হয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে সেখানে গড়ে ওঠে উঁচু বৃক্ষলতাপূর্ণ বিস্তীর্ণ ভূমি। অনেকে মনে করেন, ‘বানিয়া’ ও ‘চাঙ’ শব্দ থেকেই ‘বানিয়াচং’ নামের উৎপত্তি।

তবে নামকরণ নিয়ে মতভেদ থাকলেও এ বিষয়ে দ্বিমত নেই যে, বানিয়াচংয়ের ইতিহাস বহু পুরোনো এবং এই জনপদের সঙ্গে সিলেট অঞ্চলের প্রাচীন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

লাউড় রাজ্যের রাজধানী

সিলেটের প্রাচীন ইতিহাসে লাউড়, গৌড় ও জৈন্তা—এই তিনটি পৃথক রাজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। এর মধ্যে লাউড় রাজ্যের রাজধানী ছিল বানিয়াচং। সেই সময় রাজারা বানিয়াচংয়ে কমলা রাণীর দীঘিসহ মোট পাঁচটি দীঘি খনন করেন বলে জানা যায়।

প্রায় ৬৬ একর আয়তনের কমলা রাণীর দীঘি বর্তমানে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দীঘি হিসেবে স্বীকৃত। বিশাল জলরাশি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই দীঘি বানিয়াচংয়ের ইতিহাস ও লোককথার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। দীঘির পশ্চিম পাড়ে রয়েছে প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ। সময়ের প্রবাহে রাজবাড়ির অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও অবশিষ্ট স্থাপনাগুলো এখনো অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে।

মোগল আমলে নির্মিত বেশ কিছু মসজিদ ও মন্দিরও বানিয়াচংয়ে আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এসব স্থাপনা শুধু ধর্মীয় নিদর্শন নয়, এই জনপদের দীর্ঘ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

ব্রিটিশ আমলে প্রশাসনিক গুরুত্ব

ব্রিটিশ আমলে বানিয়াচং গ্রাম সিলেট জেলার অন্তর্গত ছিল। ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে হবিগঞ্জ মহকুমা গঠিত হওয়ার পর প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বানিয়াচংয়ের গুরুত্ব বাড়ে। শাসনকার্যের সুবিধার্থে বানিয়াচং গ্রাম ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো নিয়ে ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ আগস্ট ২৮৬৭ জি.জে. বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী বানিয়াচং থানা গঠন করা হয়।

থানা প্রতিষ্ঠার পর এর সদর দপ্তর বানিয়াচং গ্রামের পূর্বদিকে অবস্থিত নন্দীপাড়ার পূর্ব প্রান্তে স্থাপন করা হয়। প্রশাসনিক এই ইতিহাসও বানিয়াচংয়ের দীর্ঘ পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

মহারত্ন জমিদার বাড়িতে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের ছাপ

বানিয়াচং থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার পশ্চিমে ২ নম্বর উত্তর-পশ্চিম ইউনিয়নে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী মহারত্ন জমিদার বাড়ি। এই বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা প্রাণকৃষ্ণ চক্রবর্তী। তাঁর দুই পুত্র বিজয় কৃষ্ণ মহারত্ন ও অন্নদা মহারত্ন ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে দুটি ভবন নির্মাণ করেন। প্রাণকৃষ্ণ চক্রবর্তী জীবিত থাকা অবস্থায় উত্তরের ভবনটির মন্দিরও ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে নির্মাণ করেন।

বিজয় কৃষ্ণ মহারত্ন বানিয়াচংয়ের বিভিন্ন পাড়ায় পাড়ায় পাকা মন্দির নির্মাণ করেন। হবিগঞ্জের কালীবাড়ির পুরোনো ভবনটিও তাঁর নির্মাণ বলে উল্লেখ করা হয়। তাঁর মাতা জয়তারা দেবীর নামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। মহারত্নপাড়া বিদ্যালয়ের জন্যও ভূমি দান করা হয়। বিজয় কৃষ্ণ মহারত্ন তাঁর নিজের নামে বিজয়নগর পাড়া প্রতিষ্ঠা করেন এবং শ্মশানের জন্যও ভূমি দান করেন।

বিজয় কৃষ্ণ মহারত্নের নাতি গোপাল কৃষ্ণ মহারত্ন ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন বানিয়াচংয়ের একজন সম্ভ্রান্ত শিক্ষানুরাগী। সমাজসেবামূলক নানা কর্মকাণ্ডের জন্য দাতা পরিবার হিসেবেও মহারত্ন বাড়ির সুনাম বৃহত্তর সিলেট ও হবিগঞ্জজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

ফলে মহারত্ন জমিদার বাড়ি কেবল একটি পুরোনো স্থাপনা নয়; এটি বানিয়াচংয়ের সামাজিক ইতিহাস, শিক্ষাবিস্তার, ধর্মীয় কর্মকাণ্ড ও জনহিতকর উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।

কালের সাক্ষী হয়ে এখনো রয়েছে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান, সরকারি সাব-রেজিস্টার অফিস বা ভূমি অফিস, সুবিশাল জুয়েল ফিল্ড, শতবর্ষীয় ফুটবল ক্লাব জুয়েল ক্লাব, বাবুর বাজার, অসংখ্য রাস্তা-ঘাট, পুকুর-দীঘি এবং সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নানা জনহিতকর সেবামূলক স্থাপনা।

কিন্তু সংস্কারের অভাবে মহারত্ন জমিদার বাড়ির অনেক কিছুই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। যথাযথ সংরক্ষণ করা গেলে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে বাড়িটির ঐতিহ্যও আরও সমৃদ্ধভাবে তুলে ধরা সম্ভব।

গুণী মানুষের জন্মভূমি

বানিয়াচং শুধু স্থাপত্য ও প্রকৃতির জন্য নয়, গুণী মানুষের জন্মভূমি হিসেবেও পরিচিত। এই জনপদে জন্মগ্রহণ করেছেন বাইসাইকেলে প্রথম বিশ্বভ্রমণকারী ভূপর্যটক ও ৪২টি গ্রন্থের লেখক রামনাথ বিশ্বাস, মেজর জেনারেল (অব.) এম আবদুর রব বীর উত্তম, ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের প্রবাসী সংগঠক জাকারিয়া খান চৌধুরী, ভারত মুক্তি সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক সুশীল কুমার সেন ও হেমসেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সাবেক এমপি গোপাল কৃষ্ণ মহারত্ন, সাবেক মন্ত্রী সিরাজুল হোসেন খান, ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সহযোদ্ধা মৌলভি আব্দুল্লাহ, উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ ফুটবল খেলোয়াড় ভূপেন্দ্র চৌধুরী (বি রায় চৌধুরী), এস কে চৌধুরী, সুরকার ও বাংলাদেশের বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দী, শিক্ষানুরাগী ও বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তাপস কৃষ্ণ মহারত্ন, ইসলামি রাজনীতিবিদ আলহাজ ফরিদ উল্লা সাহেব, উপমহাদেশের স্বনামধন্য ফুটবল খেলোয়াড় দিব্যেন্দু মহারত্ন রবি, গায়ক ও সাংবাদিক সঞ্জীব চৌধুরী এবং নবীন কবি, গীতিকার ও সাহিত্যিক মো. নাঈম মিয়া।

তাঁদের জীবন ও কর্ম বানিয়াচংয়ের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিচয়কে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর পরিসরে পরিচিত করেছে।

গ্রামীণ সংস্কৃতির জীবন্ত ভুবন

বানিয়াচংয়ের ঐতিহ্য শুধু প্রাচীন স্থাপনা বা ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়। এখানকার মানুষের জীবনযাপন ও স্থানীয় সংস্কৃতিতেও রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। গ্রামীণ খেলার প্রচলন এখনো অনেক বেশি। সাতছাড়া, লাটিম, হা-ডু-ডু ও ফুটবলের মতো খেলাগুলো স্থানীয় মানুষের বিনোদন ও সামাজিক জীবনের অংশ।

বিশাল খেলার মাঠ, পুরোনো ফুটবল ক্লাব এবং খেলাধুলার চর্চা এই জনপদের ক্রীড়া ঐতিহ্যকেও তুলে ধরে। আধুনিকতার প্রভাবে দেশের অনেক গ্রামীণ জনপদে যেখানে এসব ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, সেখানে বানিয়াচংয়ের এই বৈশিষ্ট্য আলাদা গুরুত্ব বহন করে।

পর্যটনের হাতছানি

ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রকৃতির সমন্বয়ে বানিয়াচংয়ে রয়েছে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। বিশ্বের বৃহত্তম গ্রাম হিসেবে পরিচিত এই জনপদের প্রধান দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে বিথঙ্গলের আখড়া, রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ, কমলা রাণীর সাগর দীঘি, শ্যাম বাউল গোস্বামীর আখড়া, নাগুরা ফার্ম, মাকালকান্দি স্মৃতিসৌধ, লক্ষ্মী বাওড় জলাবন এবং মহারত্ন জমিদার বাড়ি।

বিথঙ্গলের বড় আখড়া, যা বিতঙ্গল আখড়া নামেও পরিচিত, বানিয়াচংয়ে অবস্থিত বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম তীর্থস্থান। ষোড়শ শতাব্দীর দিকে নির্মিত এই আখড়া ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।

রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ এই অঞ্চলের প্রাচীন রাজকীয় ইতিহাসের স্মারক। কমলা রাণীর সাগর দীঘি বৃহৎ জলাশয় হিসেবে যেমন দৃষ্টিনন্দন, তেমনি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য।

শ্যাম বাউল গোস্বামীর আখড়া একটি সনাতন ধর্মীয় স্থান। নাগুরা ফার্মও এ অঞ্চলের একটি প্রসিদ্ধ স্থান। মাকালকান্দি স্মৃতিসৌধ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহন করে। আর লক্ষ্মী বাওড় জলাবন, যা ‘খড়তির জঙ্গল’ নামেও পরিচিত, বানিয়াচংয়ের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।

সংরক্ষণে প্রয়োজন উদ্যোগ

বানিয়াচংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বৈচিত্র্য। একই জনপদে পাওয়া যায় প্রাচীন রাজ্যের স্মৃতি, রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ, বিশাল দীঘি, ধর্মীয় স্থাপনা, জমিদারবাড়ি, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন, জলাবন, গ্রামীণ ক্রীড়া ও লোকজ সংস্কৃতি। বিশ্বের বৃহত্তম গ্রাম হিসেবে এর পরিচিতিও পর্যটনের জন্য একটি স্বতন্ত্র আকর্ষণ।

কিন্তু শুধু পরিচিতি দিয়ে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে ওঠে না। ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ, দর্শনীয় স্থানগুলোর উন্নয়ন, যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন, পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা তৈরি এবং স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সঠিকভাবে উপস্থাপনের উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিশেষ করে মহারত্ন জমিদার বাড়ির মতো ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো দ্রুত সংরক্ষণ করা জরুরি। একই সঙ্গে রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ, কমলা রাণীর দীঘি, বিথঙ্গলের আখড়া ও লক্ষ্মী বাওড় জলাবনের মতো স্থানগুলোকেও পরিকল্পিতভাবে পর্যটন ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা গেলে বানিয়াচংয়ের সম্ভাবনা বহুগুণে বাড়তে পারে।

বানিয়াচং তাই কেবল ‘বিশ্বের বৃহত্তম গ্রাম’—এই পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা একটি জনপদ, যেখানে প্রাচীন রাজ্যের স্মৃতি যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে লোকজ সংস্কৃতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য, ক্রীড়া, গুণী মানুষের উত্তরাধিকার এবং অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

যথাযথ কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ, পরিকল্পিত সংরক্ষণ ও পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়ন হলে বানিয়াচং বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে। দেশি-বিদেশি পর্যটকের পদচারণায় মুখর হতে পারে এই ঐতিহাসিক জনপদ। আর সেই সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম গ্রাম বানিয়াচংয়ের পরিচিতি যেমন আরও বিস্তৃত হবে, তেমনি পর্যটন থেকে সরকারও অর্জন করতে পারে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।


সিলেটের খবর এর আরও খবর