img

রাধানাথের স্বপ্নের রাধানগর এখন পর্যটনের গ্রাম

প্রকাশিত :  ১০:১৯, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাধানাথের স্বপ্নের রাধানগর এখন পর্যটনের গ্রাম

সংগ্রাম দত্ত: পাহাড়ের ঢালে সারি সারি চা-বাগান। চারপাশে সবুজের সমারোহ। কোথাও লেবু ও কাঁঠালের বাগান, কোথাও বাঁশ-কাঠে তৈরি নান্দনিক কটেজ। সন্ধ্যা নামলেই জ্বলে ওঠে রিসোর্টের আলো। ছুটির দিনে সড়কজুড়ে বাড়ে পর্যটকবাহী গাড়ির চলাচল। পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধুদের নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসছেন প্রকৃতির কাছে কিছুটা সময় কাটাতে।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার রাধানগর এখন আর নিছক একটি গ্রাম নয়। পর্যটনের বিকাশে বদলে যাওয়া এই গ্রাম পরিচিতি পেয়েছে ‘টুরিস্ট ভিলেজ’ বা পর্যটনের গ্রাম হিসেবে। গড়ে উঠেছে ৫০টির বেশি রিসোর্ট, কটেজ ও গেস্টহাউস। পর্যটনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে রেস্তোরাঁ, পরিবহন, গাইড, হস্তশিল্প, চা পাতা ও মনিপুরি কাপড়সহ নানা ব্যবসা। সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে কয়েক শ মানুষের।

বর্তমানে আধুনিক রাধানগরে পর্যটনশিল্পকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। একসময়ের নির্জন, কৃষিনির্ভর এই জনপদে এখন গড়ে উঠেছে আধুনিক মানের হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও নানা পর্যটনসুবিধা। এসব বিনিয়োগ শুধু রাধানগরের চেহারাই বদলায়নি, স্থানীয় অর্থনীতিতেও তৈরি করেছে নতুন গতি।

তবে রাধানগরের গল্প শুধু পর্যটনের নয়। এই নামের পেছনে রয়েছে প্রায় দেড় শ বছরের পুরোনো এক ইতিহাস। রয়েছে এক জমিদারের দূরদর্শিতা, ভূমিদান, শিক্ষানুরাগ ও সমাজসেবার কাহিনি। তিনি রাধানাথ দেব চৌধুরী। তাঁর নামেই পরিচিতি পাওয়া এই জনপদ আজ পর্যটনের আলোয় আলোকিত হলেও নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই তাঁর জীবন ও অবদানের ইতিহাস অজানা।

রাধানগরের বর্তমান উন্নয়নের সঙ্গে সেই বিস্মৃত ইতিহাসকে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, একটি জনপদের বিকাশ শুধু তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের গল্প নয়; এর পেছনে থাকে মানুষের স্বপ্ন, উদ্যোগ ও ত্যাগের দীর্ঘ ইতিহাস।

যে মানুষটির নামে রাধানগর

রাধানাথ দেব চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন ৩১ আগস্ট ১৮৭৫ সালে। তিনি ছিলেন শ্রীমঙ্গলের একজন দানবীর জমিদার, শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক ও রাজনীতিক। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ থানার ভুবীরবাগ এলাকার জমিদার হিসেবেও তাঁর পরিচিতি ছিল। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের আসাম-বেঙ্গল অঞ্চলের ৫৭টি এজেন্সির মালিক ছিলেন তিনি। সর্বোচ্চ করদাতা হিসেবেও তাঁর খ্যাতি ছিল।

ব্রিটিশ শাসনামলে শ্রীমঙ্গলের ডলুছড়া পাহাড়ে প্রায় ১৭৮ বিঘা জমি কিনেছিলেন তিনি। শুধু সম্পদ বাড়ানো তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। ওই জমিতে এলাকার উন্নয়ন, বসতি স্থাপন ও সামাজিক পুনর্গঠনের পরিকল্পনা ছিল তাঁর। সেই সময় পাহাড়ঘেরা ও অপেক্ষাকৃত অনুন্নত একটি অঞ্চলে বসতি ও উন্নয়নের সম্ভাবনা দেখা ছিল নিঃসন্দেহে দূরদর্শিতার পরিচয়।

তাঁর মৃত্যুর পর ওই ভূমি চার পুত্রের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে তাঁদের কেউ জমি বিক্রি করেন, কেউ জমি হারান। ফলে জমির মালিকানা ও ব্যবহার বদলে যায়। কিন্তু রাধানাথ দেব চৌধুরীর উদ্যোগে যে উন্নয়নের বীজ বপন হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় এলাকাটি ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে ওঠে ‘রাধানগর’ নামে।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা শহর থেকে বর্তমান রাধানগরের দূরত্ব প্রায় আড়াই থেকে তিন কিলোমিটার। শহরের এত কাছে হয়েও একসময় এটি ছিল পাহাড়ঘেরা নির্জন জনপদ।

শিক্ষাকে দিয়েছিলেন গুরুত্ব

রাধানাথ দেব চৌধুরীর পরিচয় শুধু জমিদার হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষা বিস্তারে তাঁর আগ্রহ ছিল গভীর। পিতার স্মৃতিতে তিনি চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ভূমি দান করেন। মায়ের নামে প্রতিষ্ঠা করেন দীনময়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। পরে বিদ্যালয়টি ‘শ্রীমঙ্গল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে পরিচিত হয়।

তাঁর সুযোগ্য পুত্র ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরীও বাবার সেই ধারাকে এগিয়ে নেন। তিনি ৩১ শতক জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘রাধানাথ প্রাথমিক বিদ্যালয়’। পরে বিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন হয়ে হয় ‘বিরামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়’।

একটি পরিবারের এসব উদ্যোগের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি শুধু জমিদারি বা ব্যক্তিগত সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক অবকাঠামো ও জনকল্যাণের সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততা ছিল। শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে তাঁদের অবদানের ছাপ রয়েছে।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ইতিহাস অনেকটাই বিস্মৃত হয়েছে।

কৃষির গ্রাম থেকে পর্যটনের গ্রাম

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পরও রাধানগর ছিল মূলত কৃষিনির্ভর গ্রাম। একসময় আখচাষের জন্য এলাকাটি পরিচিত ছিল। পরে লেবু ও কাঁঠালের বাগান গড়ে ওঠে। কৃষিকাজ ও বাগানই ছিল মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন।

পরিবর্তনের সূচনা হয় নব্বইয়ের দশকে। ১৯৯৬ সালে লাউয়াছড়া বনকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করার পর পর্যটকদের আগমন বাড়তে থাকে। বিশেষ করে বিদেশি পর্যটকেরা লাউয়াছড়ার জীববৈচিত্র্য দেখতে আসতে শুরু করেন। প্রকৃতির কাছাকাছি তাঁদের রাতযাপনের প্রয়োজন থেকে তৈরি হয় ‘নিসর্গ ইকো কটেজ’।

এরপর লাউয়াছড়া ও চা-বাগানের কাছাকাছি প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠে এ অঞ্চলের প্রথম পাঁচ তারকা মানের রিসোর্ট ‘গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ’। সেই রিসোর্টের সাফল্য দেখে রাধানগর ও আশপাশের এলাকায় পর্যটন ব্যবসায় বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে ওঠেন উদ্যোক্তারা।

২০০০ সালের দিকে পর্যটনের সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হতে থাকে। একের পর এক রিসোর্ট, কটেজ ও গেস্টহাউস গড়ে উঠতে থাকে। ধীরে ধীরে বদলে যায় গ্রামের চেহারা।

হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ

পর্যটনের বিকাশের সঙ্গে রাধানগরে শুরু হয় বড় ধরনের বিনিয়োগ। বর্তমানে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা পর্যটনশিল্পকে কেন্দ্র করে এখানে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। এসব বিনিয়োগের ফলে একসময়কার নির্জন গ্রামে গড়ে উঠেছে আধুনিক অবকাশকেন্দ্র, বিলাসবহুল রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট নানা প্রতিষ্ঠান।

বিনিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে জমির ব্যবহার, যোগাযোগব্যবস্থা ও স্থানীয় অর্থনীতির ধরন। স্থানীয় তরুণদের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। পর্যটকদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা। ফলে রাধানগর এখন শুধু শ্রীমঙ্গলের পর্যটনকেন্দ্র নয়, স্থানীয় অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাধানগরে ৫০টির বেশি রিসোর্ট, কটেজ ও গেস্টহাউস রয়েছে। পুরো শ্রীমঙ্গলে প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার পর্যটকের রাতযাপনের ব্যবস্থা থাকলেও শুধু রাধানগরেই থাকতে পারেন প্রায় দেড় হাজার পর্যটক।

গ্রামের উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে হোটেল প্যারাগন, নভেম ইকো রিসোর্ট, বালিশিরা রিসোর্ট, মাধবীলতা ইকো কটেজ, অরণ্যের দিনরাত্রি, শান্তিবাড়ি ইকো রিসোর্ট, লিচিবাড়ি ইকো রিসোর্ট, নিসর্গ নিরব ইকো কটেজ, চামুং রেস্টুরেন্ট, ওয়ান্ডার হিল ইকো রিসোর্ট, হারমিটেজ রিসোর্ট, ভ্রমণ কুঠী, পত্রস্নান ইকো রিসোর্ট, জলধারা রিসোর্ট ও বৃষ্টি বিলাস রিসোর্ট।

এসব রিসোর্টের অনেকগুলোর স্থাপত্যেও রয়েছে বৈচিত্র্য। বাঁশ ও কাঠের ব্যবহার, খোলা জায়গা এবং সবুজের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি স্থাপনা পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে। ফলে রাধানগরে পরিবেশবান্ধব পর্যটনেরও একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

বদলে গেছে স্থানীয় অর্থনীতি

পর্যটনের কারণে স্থানীয় অর্থনীতিতে এসেছে বড় পরিবর্তন। প্রায় ৪-৫ শ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে পর্যটনশিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানান। কেউ রিসোর্ট পরিচালনা করছেন, কেউ রেস্তোরাঁয় কাজ করছেন, কেউ পর্যটক পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত। আবার কেউ হস্তশিল্প, চা পাতা, মনিপুরি কাপড়, গাইডিং কিংবা অন্যান্য পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

ঢাকার তুলনামূলক কাছাকাছি হওয়ায় সারা বছরই এখানে পর্যটকের আনাগোনা থাকে। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে পরিবার ও বন্ধুদের দল নিয়ে পর্যটকেরা ভিড় করেন। বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও শনিবার রাধানগরের রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁগুলোতে ব্যস্ততা বেড়ে যায়।

কমিউনিটি বেসড ট্যুরিজমের সম্ভাবনা

রাধানগরের হারমিটেজ রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী অ্যাডভোকেট সুলতানা নাহার বলেন, ‘শ্রীমঙ্গল দেশের পর্যটনের উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় একটা জায়গা। ইতোমধ্যে রাধানগরে কমিউনিটি বেসড ট্যুরিজম গড়ে উঠেছে, যা স্থানীয় উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক উন্নতিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। রাস্তা-ঘাটের উন্নয়নসহ সরকারের আরো উদ্যোগ এ এলাকায় বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়তা করবে।’

রাধানগরের পর্যটন বিকাশের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের সম্পৃক্ততাই এখন এই এলাকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আগে যেখানে কৃষি ও বাগাননির্ভর অর্থনীতি ছিল, সেখানে এখন পর্যটনকেন্দ্রিক নানা পেশার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে গ্রামের তরুণদের একটি অংশ স্থানীয়ভাবেই কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে পাচ্ছেন।

উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার চ্যালেঞ্জ

শ্রীমঙ্গল প্রেস ক্লাবের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল হাই ডন বলেন, ‘পর্যটন শিল্পে শ্রীমঙ্গলের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে সরকার রাধানগরে রাত্রীকালীন সড়ক বাতি স্থাপন করেছে। পর্যটন উন্নয়নে আরো কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে পরিবেশবান্ধব পর্যটন শিল্প বিকাশে কাজ চলছে।’

পর্যটনের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ রাধানগরের প্রধান আকর্ষণই তার প্রাকৃতিক পরিবেশ। পাহাড়, চা-বাগান, বাগান ও সবুজ প্রকৃতি নষ্ট হলে পর্যটনের মূল আকর্ষণও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ইতিহাস সংরক্ষণের দাবি

রাধানগরের বর্তমান পরিচিতি যতটা উজ্জ্বল, এর অতীতের ইতিহাস ততটাই অনালোচিত। যে মানুষের নাম থেকে এই জনপদের নামকরণ, সেই রাধানাথ দেব চৌধুরীর জীবন ও কর্ম নিয়ে নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ গবেষণা বা স্মারক প্রতিষ্ঠান।

অথচ তাঁর জীবনের দিকে তাকালে পাওয়া যায় ব্রিটিশ আমলের জমিদারি ব্যবস্থা, শিক্ষা বিস্তার, ভূমিদান, সামাজিক উন্নয়ন এবং জনকল্যাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় ইতিহাস। তাঁর পুত্র ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরীর অবদানও সেই ইতিহাসের অংশ।

এই ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য রাধানগরে একটি জাদুঘর, তথ্যকেন্দ্র কিংবা স্মারক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের এলাকার অতীত সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে। পর্যটকেরাও শুধু রিসোর্ট কিংবা প্রকৃতি দেখতে নয়, রাধানগরের ইতিহাস জানতেও সেখানে আসতে পারবেন।

এতে পর্যটন ও ইতিহাস—দুইয়ের মধ্যে তৈরি হতে পারে নতুন একটি সংযোগ। স্থানীয় ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে ইতিহাসভিত্তিক পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা।

আলোয় ঢাকা পড়ছে যে ইতিহাস

আজ রাধানগরের পরিচয় বদলে গেছে। একসময় যে গ্রামে ছিল নীরবতা, কৃষিজমি আর বাগান, সেখানে এখন পর্যটকদের আনাগোনা। আধুনিক রিসোর্টের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নানা ব্যবসা। দেশ-বিদেশের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগে গড়ে উঠেছে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা। স্থানীয় মানুষের আয় বেড়েছে, কর্মসংস্থান হয়েছে, বদলেছে যোগাযোগব্যবস্থা।

কিন্তু রাধানগরের এই বর্তমানকে বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় অতীতের দিকে। কারণ এই জনপদের নামের সঙ্গে যে মানুষটির নাম জড়িয়ে আছে, তিনি শুধু একজন জমিদার ছিলেন না; শিক্ষা ও সমাজসেবায়ও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

রাধানাথ দেব চৌধুরী ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পর রাধানগর আজ পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণীয় এলাকায় পরিণত হয়েছে। তাঁর সময়ের সেই উন্নয়নের স্বপ্ন আজ ভিন্ন রূপে বাস্তবতা পেয়েছে।

রাধানগর তাই শুধু সবুজ পাহাড়, চা-বাগান আর বিলাসবহুল রিসোর্টের সমষ্টি নয়। এটি একটি জনপদের পরিবর্তনের গল্প। সেই গল্পের এক প্রান্তে আছেন দানবীর রাধানাথ দেব চৌধুরী; অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক পর্যটনের রাধানগর।

আজকের প্রজন্মের কাছে রাধানগরের অর্থ হয়তো পর্যটন, অবকাশ আর প্রকৃতির সান্নিধ্য। কিন্তু এই নামের ভেতরে লুকিয়ে আছে একজন মানুষের স্বপ্ন, একটি পরিবারের দান ও একটি জনপদের দীর্ঘ ইতিহাস। সেই ইতিহাস সংরক্ষণ করা গেলে রাধানগর শুধু বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রেই নয়, দেশের স্থানীয় ইতিহাসের মানচিত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিতে পারে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

সিলেটে রাষ্ট্রপতির সংবর্ধনা বর্জন বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় শীর্ষ অনেক নেতার

প্রকাশিত :  ১০:১৪, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সিলেটে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বর্জনের করেছেন কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় অনেক শীর্ষ নেতা। যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়া ও এককভাবে সংবর্ধনা আয়োজনের অভিযোগ এনে দলটির ডজনখানেক শীর্ষ নেতা সিলেট সিটি করপোরেশন আয়োজিত এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যাননি।

এরমধ্যে সিলেট মহানগর বিএনপি ঘোষণা দিয়ে রাষ্ট্রপতির সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বর্জন করে। বাকীরা প্রকাশ্যে কিছু না বললেও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যাননি।

মঙ্গলবার বিকেলে সিটি করপোরেশনের আয়োজনে নগরভবনে রাষ্ট্রপতিকে এ নাগরিক সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।

বর্জনকারী নেতাদের অভিযোগ, যথাযথ প্রক্রিয়ায় নাগরিক কমিটি গঠন না করে সংবর্ধনা আয়োজন এবং আয়োজকদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে তারা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যাননি।

বিএনপির স্থানীয় নেতৃবৃন্দের দাবি, সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানটিকে ‘নাগরিক সংবর্ধনা’ বলা হলেও প্রকৃত অর্থে এটি কোনো নাগরিক কমিটির মাধ্যমে আয়োজিত সংবর্ধনা নয়। সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীকে ইঙ্গিত করে তারা বলেন, এটি সিসিকের অনুষ্ঠান এবং আয়োজনটি একক ব্যক্তিকেন্দ্রিক।

বিএনপি সূত্রে জানা যায়, দলটির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় শীর্ষ নেতাদের অনেকেই এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যাননি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ড. এনামুল হক চৌধুরী, কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য হাদিয়া চৌধুরী মুন্নী, কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও ওয়াসার চেয়ারম্যান মিফতাহ সিদ্দিকী, সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন, জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী প্রমুখ।

এ ছাড়া মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের প্রশাসক, সুনামগঞ্জের সংসদ সদস্য ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং মৌলভীবাজার জেলার বিএনপির নেতৃবৃন্দও অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পাননি বলে দাবি করেছেন স্থানীয় নেতারা।

তাঁদের অভিযোগ, রাষ্ট্রপতিকে সংবর্ধনা দেওয়ার ক্ষেত্রে বৃহত্তর সিলেটের রাজনৈতিক, সামাজিক ও নাগরিক প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে একটি নাগরিক কমিটি গঠন করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সে ধরনের কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে।

নেতৃবৃন্দ বলছেন, এটাকে নাগরিক সংবর্ধনা বলা যায় না। এটা সিসিকের সংবর্ধনা। এই প্রোগ্রামটি একক ব্যক্তির প্রোগ্রাম। মহানগরের ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সকল নেতাকর্মী এই অনুষ্ঠান বয়কট করেছে।

রাষ্ট্রপতির সংবর্ধনা বর্জন প্রসঙ্গে মহানগর বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতা জানান, এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজনের ব্যাপারে মহানগর বিএনপির কোনো নেতার সাথে আলোচনা করা হয়নি। সিটি করপোরেশনের প্রশাসক একক সিদ্ধান্তে এটি আয়োজন করেছেন। এছাড়া এতে নেতাদের যথাযথভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

তারা জানান, আজকে রাষ্ট্রপতির মাজার জিয়ারতের সময়ে এমন একটি গাড়ি মহানগর বিএনপি নেতাদের জন্য দেওয়া হয় যেটি মাজার এলাকার ভেতরে প্রবেশের পাস ছিল না। ফলে গাড়িটি মূল সড়কেই আটকে দেয় নিরাপত্তাবাহিনী। সিনিয়র নেতাদের হেঁটেই মাজারে যেতে হয়। এসব কারণে আমরা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যাচ্ছি না।

এ ব্যাপারে সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন বলেন, নানা কারণে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মহানগর বিএনপির কোনো নেতাকর্মী অংশ নেবেন না। কারণগুলো এখনই বলছি না। তবে সংবর্ধনা ছাড়া রাষ্ট্রপতির বাকি সব অনুষ্ঠানে আমরা অংশ নিয়েছি।

মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়ায় নাগরিক কমিটি তৈরি করে সংবর্ধনা আয়োজন না করা ও অনুষ্ঠানের আয়োজকদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে মহানগর বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলো সিটি করপোরেশন আয়োজিত এই অনুষ্ঠান বয়কট করেছে।

কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও ওয়াসার চেয়ারম্যান মিফতাহ সিদ্দিকী বলেন, প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে অনেকেই যাননি। আমিও যাইনি।’

এ ব্যাপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

তবে সোমবার তিনি বলেছিলেন, সংবর্ধনার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আমরা নাগরিক সমাজসহ নানা স্তরের নাগরিকদের সাথে কথা বলেছি।

তবে মহানগর বিএনপির এক নেতা বলেন, সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হওয়া নিয়ে জেলা ও মহানগর বিএনপির কয়েকজন নেতার মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে। এ কারণেও সিটি করপোরেশনের আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিএনপির কয়েকজন নেতাকে দেখা যায়নি বলে মনে করেন তিনি।

মঙ্গলবার এক দিনের সফরে সিলেটে আসেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ওলিকুল শিরোমণি হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতের উদ্দেশ্যে তিনি সিলেট সফর করেন।

সিলেটের খবর এর আরও খবর