img

শ্রীমঙ্গলে এক মাসে ১৫ বন্যপ্রাণী উদ্ধার, বাড়ছে লোকালয়ে বিচরণ

প্রকাশিত :  ০৫:৫৮, ০৬ নভেম্বর ২০২৬

শ্রীমঙ্গলে এক মাসে ১৫ বন্যপ্রাণী উদ্ধার, বাড়ছে লোকালয়ে বিচরণ
সংগ্রাম দত্ত: পর্যটন নগরী ও চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল উপজেলায় লোকালয়ে চলে আসা ১৫টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। গত ১ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত এসব প্রাণী উদ্ধার করে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। উদ্ধার হওয়া প্রাণীর তালিকায় রয়েছে অজগর, বিষধর পদ্মা গোখরা, শঙ্খিনী, দাঁড়াশ, ফণিমনসা, বেত আঁচড়া ও মুখপোড়া হনুমান।
 
চা-বাগান, বসতবাড়ি ও সড়কসংলগ্ন বিভিন্ন স্থানে এসব প্রাণীর দেখা মেলে। কোনোটি ঢুকে পড়ে মানুষের ঘরে, কোনোটি আটকা পড়ে বৈদ্যুতিক তারে। আবার একটি অজগরের সন্ধান পাওয়া যায় মুরগির খামারে। স্থানীয় ব্যক্তিদের কাছ থেকে খবর পেয়ে ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবকেরা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাণীগুলো উদ্ধার করেন।
 
ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, অক্টোবর মাসে আমরইলছড়া, উত্তর ভাড়াউড়া, দক্ষিণ রামপুর চা-বাগান, নোয়াগাঁও, সবুজবাজার, রাজু মিয়ার বাড়ি, ভুরভুরি চা-বাগান, সিন্দুরখান সড়ক ও রাধানগর সড়ক এলাকা থেকে এসব প্রাণী উদ্ধার করা হয়।
 
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল ও রাজদীপ দেব দীপ জানান, মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত করাই তাঁদের কাজের মূল উদ্দেশ্য। লোকালয়ে সাপ কিংবা অন্য কোনো বন্যপ্রাণী দেখা গেলে সেটিকে হত্যা না করে তাঁদের অথবা বন বিভাগকে খবর দেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা। খবর পাওয়ার পর উদ্ধারকারী দল গিয়ে প্রাণীটিকে নিরাপদে সরিয়ে উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করে।
 
আগের মাসগুলোতেও বেড়েছে উদ্ধার কার্যক্রম
 
শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের এলাকায় বন্যপ্রাণী উদ্ধারের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। ফাউন্ডেশন ও স্থানীয় সূত্রের তথ্যমতে, গত সেপ্টেম্বর মাসে এ অঞ্চল থেকে বিভিন্ন প্রজাতির ২৭টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল সাপ, অজগর, বনবিড়াল, গন্ধগোকুল, মুখপোড়া হনুমান ও শালিক।
 
সেপ্টেম্বর মাসে উদ্ধার হওয়া প্রাণীগুলোর মধ্যে চারটি ছিল বড় আকারের অজগর। এর মধ্যে দুটির দৈর্ঘ্য ছিল যথাক্রমে ১৪ ও ১৬ ফুট। এ ছাড়া ফণিমনসা, পাঁচটি মনোক্লেড সাপের বাচ্চা, খৈয়া গোখরা ও তিনটি পদ্ম গোখরাও উদ্ধার করা হয়।
 
এর আগে আগস্ট মাসেও শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের এলাকা থেকে বিষধর শঙ্খিনী ও অজগরসহ অন্তত ১৭টি সাপ উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল সংগঠনটি।
 
আবাসস্থল সংকটে বাড়ছে মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত
 
পরিবেশকর্মীদের মতে, শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের বনাঞ্চল, পাহাড়-টিলা, ঝোপঝাড়, হাওর ও জলাভূমি অসংখ্য বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। তবে বন উজাড়, বসতি সম্প্রসারণ, রিসোর্ট ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশে পরিবর্তন আসছে। এতে বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি খাদ্য ও আশ্রয়ের সংকট তৈরি হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক আবাসস্থল ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসছে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী।
 
বিশেষ করে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও আশপাশের বনাঞ্চলের পরিবেশগত পরিবর্তন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। লোকালয়ে এসব প্রাণীর উপস্থিতিতে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে মানুষের হাতে প্রাণী হত্যার পাশাপাশি সড়কে যানবাহনের চাপায় মারা যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
 
পরিবেশসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, উদ্ধার কার্যক্রমের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণীর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ অপরিহার্য। বনাঞ্চল ও জলাভূমি রক্ষার পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর খাদ্য ও নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত আরও বাড়তে পারে।
 
ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সাপসহ প্রতিটি বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। লোকালয়ে কোনো সাপ বা অন্য বন্যপ্রাণী দেখা গেলে আতঙ্কিত হয়ে সেটিকে হত্যা না করে ফাউন্ডেশন কিংবা বন বিভাগকে জানানো উচিত। এতে প্রাণীটিকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
 
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শুধু উদ্ধার ও অবমুক্তকরণের মধ্যে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বনভূমি রক্ষা, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নিরাপদ রাখা গেলে লোকালয়ে তাদের চলে আসার প্রবণতাও অনেকাংশে কমানো সম্ভব।


সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

চায়ের স্বর্গরাজ্য শ্রীমঙ্গল: সবুজ চা-বাগানের বুকে লেক-জলধারা, প্রকৃতির ক্যানভাসে লাল শাপলার লালিমা

প্রকাশিত :  ০৫:৫৯, ০৬ নভেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:০৩, ০৬ নভেম্বর ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: চারদিকে সবুজের সমারোহ। কোথাও উঁচু-নিচু টিলায় সারি সারি চা-গাছ, কোথাও ঘন বনানী। পাহাড়ের বুক চিরে এঁকেবেঁকে চলে গেছে আঁকাবাঁকা পথ। সেই সবুজের মাঝেই কোথাও স্বচ্ছ জলরাশির লেক, কোথাও বয়ে চলেছে প্রাকৃতিক জলধারা। আর কোনো কোনো লেকের পানিতে ফুটে আছে অসংখ্য লাল শাপলা। সবুজের বুকে লাল ফুলের এমন সমারোহ যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক অপূর্ব জলরঙের ছবি।

দূর থেকে তাকালেই চোখ আটকে যায়। মনে হয়, সবুজের রাজ্যে প্রকৃতি আপন মনে ছড়িয়ে দিয়েছে লালিমার এক মায়াবী চাদর। চা-বাগানের নিস্তব্ধ পরিবেশ, পাহাড়ি লেকের স্বচ্ছ পানি আর ফুটন্ত লাল শাপলার সৌন্দর্য মিলেমিশে তৈরি করেছে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।

এমনই অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি মৌলভীবাজারের পর্যটননগরী ও চায়ের স্বর্গরাজ্যখ্যাত শ্রীমঙ্গল। চা-বাগানের সবুজ সমারোহ, পাহাড়-টিলা, বনাঞ্চল, লেক, জলাশয় ও জলধারা—সব মিলিয়ে এ জনপদ প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য আকর্ষণ। এরই মধ্যে বিভিন্ন চা-বাগানের লেকের পানিতে ফুটে থাকা লাল শাপলা শ্রীমঙ্গলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যোগ করেছে নতুন এক নান্দনিক মাত্রা।

সম্প্রতি শ্রীমঙ্গলের একটি চা-বাগান এলাকায় ঘুরতে গিয়ে চোখে পড়ে লেকজুড়ে ফুটে থাকা অসংখ্য লাল শাপলা। স্বচ্ছ পানির ওপর পাতা মেলে থাকা ফুলগুলোকে দেখে মনে হয়, প্রতিটি ফুল যেন প্রকৃতির একেকটি ছোট্ট শিল্পকর্ম। কখনো মৃদু বাতাসে দুলছে, কখনো পানির আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব তৈরি করছে। আর ফুলের পাপড়িতে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত মৌমাছির দল। কিছুক্ষণ পরপর ফুলে ফুলে তাদের আনাগোনা লেকের নির্জনতায় যোগ করেছে অন্যরকম প্রাণচাঞ্চল্য।

চা-বাগানের সৌন্দর্যে লেক ও জলধারার মিতালি

চা শিল্পের নগরী শ্রীমঙ্গল ও এর চারপাশে বিস্তৃত রয়েছে অসংখ্য চা-বাগান। এসব বাগান শুধু চায়ের সবুজ সমারোহের জন্যই নয়, প্রাকৃতিক লেক, জলাশয় ও বিভিন্ন জলধারার কারণেও বিশেষ আকর্ষণীয়। কোথাও পাহাড়ি টিলার পাদদেশে স্বচ্ছ পানির লেক, কোথাও চা-বাগানের বুক চিরে বয়ে চলেছে জলধারা। এসব জলাশয় ও জলধারা চা-বাগানের প্রাকৃতিক পরিবেশে যোগ করেছে ভিন্ন এক সৌন্দর্যমাত্রা।

উঁচু-নিচু সবুজ টিলায় সারি সারি চা-গাছ, চারপাশে বনভূমির আবহ, আর মাঝেমধ্যে স্বচ্ছ জলরাশির উপস্থিতি—সব মিলিয়ে শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানগুলো যেন প্রকৃতির একেকটি বিচিত্র সৌন্দর্যভুবন। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব লেক ও জলধারার রূপও বদলে যায়। বর্ষায় পানিতে ভরে ওঠে জলাশয়, কোথাও ফুটে ওঠে শাপলা, আবার কোথাও পানির ওপর ভেসে থাকে সবুজ পাতার সমারোহ।

 প্রকৃতির এমন বৈচিত্র্যময় দৃশ্য স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দেশ-বিদেশ থেকে আসা পর্যটকদেরও মুগ্ধ করে। শ্রীমঙ্গলে ঘুরতে আসা পর্যটকদের কাছে চা-বাগানের সবুজ সৌন্দর্যের পাশাপাশি এসব লেক ও জলধারা বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে। বিশেষ করে পাহাড়, বন, চা-বাগান ও জলাশয়ের সম্মিলিত প্রাকৃতিক দৃশ্য পর্যটকদের মনে তৈরি করে ভিন্ন রকম ভালোলাগা।

 আর এমনই এক প্রাকৃতিক পরিবেশের অংশ হয়ে কোনো কোনো লেকের পানিতে ফুটে থাকা লাল শাপলা শ্রীমঙ্গলের সৌন্দর্যে যোগ করেছে নতুন এক মাত্রা।

 সবুজের বুকে লাল শাপলার মায়া

 বাংলাদেশের খাল-বিল, হাওর, পুকুর ও নানা জলাশয়ে প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে শাপলা। জলজ এ ফুল দেশের প্রকৃতির সঙ্গে মিশে আছে নিবিড়ভাবে। সাদা শাপলার পাশাপাশি বর্ষা ও শরৎকালে বিভিন্ন জলাশয়ে দেখা মেলে লাল শাপলার। তবে চা-বাগানের সবুজ টিলার কোলে স্বচ্ছ লেকের পানিতে ফুটে থাকা লাল শাপলার সৌন্দর্য যেন একটু ভিন্ন।

 লাল শাপলার আরেক নাম রক্তকমল। ইংরেজিতে একে বলা হয় Red Water Lily। এর বৈজ্ঞানিক নাম Nymphaea pubescens। জলজ এ ফুলের পাপড়ির রং, গঠন ও সৌন্দর্য প্রকৃতিপ্রেমীদের সহজেই আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে ভোরের আলোয় ফুলের পাপড়িতে জমে থাকা শিশিরবিন্দু যেন সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা যোগ করে। সকালের কোমল রোদে লাল পাপড়িগুলো যখন ঝলমল করে ওঠে, তখন লেকের পানিতে তৈরি হয় এক মনোরম দৃশ্য।

 সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাওর-বিল ও জলাশয়েও এ ফুলের দেখা মেলে। তবে শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানের লেকের লাল শাপলার বিশেষত্ব হলো, এখানে জলজ ফুলের সৌন্দর্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাহাড়, টিলা, চা-বাগান ও বনাঞ্চলের অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশ।

 নির্জন লেক ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা

 স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিবছর জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এ লেকে শাপলা ফুলের আধিক্য দেখা যায়। এ সময় লেকের পানিতে ফুটে থাকা অসংখ্য লাল শাপলা পুরো এলাকাকে অন্য রকম সৌন্দর্যে সাজিয়ে তোলে। আশপাশের এলাকার অনেক মানুষ অবসর সময়ে এ সৌন্দর্য দেখতে আসেন। কেউ ছবি তোলেন, কেউবা নীরবে উপভোগ করেন প্রকৃতির এই অপার সৃষ্টি।

 স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, শাপলা ফুলের সৌন্দর্য সহজেই মানুষকে মুগ্ধ করে। চা-বাগানের সবুজ পরিবেশের মধ্যে লাল শাপলার এমন সমারোহ সত্যিই অসাধারণ। আশপাশের অনেকেই এখানে ঘুরতে আসেন। তবে জায়গাটি সবার জন্য উন্মুক্ত না হওয়ায় অনেক মানুষ ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আসতে পারেন না।

 পড়ন্ত বিকেলে লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা উত্তর সুর তালতলার বাসিন্দা মো. আব্দুস ছোবহান বলেন, ‘চা-বাগানের উঁচু-নিচু টিলা আর লেকের মনকাড়া সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। জায়গাটি সত্যিই অসাধারণ। লেকটিকে আরও পরিকল্পিতভাবে সাজানো এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে এটি মৌলভীবাজারের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।’

 সৌন্দর্যের আড়ালে প্রবেশের বিধিনিষেধ

 এত সৌন্দর্য থাকা সত্ত্বেও চা-বাগানের লেকটি এখনো পর্যটকদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত নয়। চা-বাগান কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সাধারণ মানুষের প্রবেশের সুযোগ নেই। ফলে যোগাযোগব্যবস্থা তুলনামূলক ভালো হলেও পর্যটকদের আনাগোনা খুব বেশি নয়।

 চা-বাগানের কয়েকজন বাসিন্দা ও শ্রমিক জানান, উঁচু-নিচু টিলাভূমির কারণে লেকের আশপাশে চলাচল কিছুটা কষ্টকর। এর পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় ভ্রমণপিপাসু মানুষের উপস্থিতিও সীমিত। তাঁদের ভাষ্য, বাগানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ রয়েছে, অনুমতি ছাড়া কেউ যেন এখানে প্রবেশ না করেন। কেউ প্রবেশ করলে দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তাকর্মীদেরও জবাবদিহি করতে হয়।

 চা-বাগান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, লেক ও আশপাশের এলাকা একটি বেসরকারি চা কোম্পানির নিজস্ব সম্পত্তি। বিভিন্ন নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনাগত বিধিনিষেধের কারণে জায়গাটি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে অল্পসংখ্যক প্রকৃতিপ্রেমী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে ঘুরতে এলে সাধারণত তাঁদের বাধা দেওয়া হয় না।

 নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রকৃতিপ্রেমী বলেন, ‘প্রকৃতির এমন সৌন্দর্য খুব সহজে দেখা যায় না। চারদিকে চা-বাগানের সবুজ টিলা, মাঝখানে স্বচ্ছ পানির লেক আর লাল শাপলার সমারোহ—সব মিলিয়ে মন ভালো হয়ে যায়। এমন জায়গা মানুষের মনকে সতেজ করে তোলে।’

 শ্রীমঙ্গলের অজানা সৌন্দর্য পর্যটকদের সামনে তুলে ধরার আহ্বান

 শ্রীমঙ্গলের পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হ্যালো শ্রীমঙ্গল ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলসের কর্ণধার তাজুল ইসলাম জাবেদ বলেন, ‘শ্রীমঙ্গল প্রকৃতির এক অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি। শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, চায়ের রাজধানী ও পর্যটননগরী হিসেবে শ্রীমঙ্গল একটি কসমোপলিটন শহর। শহরটির চারপাশে রয়েছে অসংখ্য চা-বাগান, পাহাড়, উঁচু-নিচু টিলা, বনাঞ্চল, লেক, জলধারা ও নানা প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য। স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি দেশ-বিদেশ থেকে আসা পর্যটকদের জন্য এসব স্থান দেখার মতো অসাধারণ আকর্ষণ।’

 শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন সড়কপথের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘শ্রীমঙ্গল উপজেলা শহরের কালীঘাট রোড থেকে যাত্রা শুরু করে ফুলছড়া চা-বাগানের মধ্য দিয়ে কালীঘাট হয়ে ভারতীয় সীমান্তবর্তী হোসেনাবাদ চা-বাগান পর্যন্ত সড়কপথে এগিয়ে গেলে প্রকৃতির একের পর এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য চোখে পড়ে। পথের দুই পাশে বিস্তীর্ণ চা-বাগানের সবুজ গালিচা, উঁচু-নিচু টিলা, বনাঞ্চল ও নানা প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য পর্যটকদের মুগ্ধ করবে। পুরো পথজুড়ে রয়েছে স্মৃতিময়, আনন্দময় ও উপভোগ করার মতো অসংখ্য দৃশ্য। বিশেষ করে হোসেনাবাদ চা-বাগান পর্যন্ত যেতে যেতে প্রকৃতির যে রূপ অবলোকন করা যায়, তা সত্যিই অসাধারণ।’

 তিনি আরও বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য, শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে আসা অনেক পর্যটক এই সড়কপথের সৌন্দর্য সম্পর্কে জানেন না। ফলে তাঁরা এসব এলাকায় যান না। শুধু পর্যটকই নন, স্থানীয় অনেক মানুষের কাছেও এ পথের আশপাশে ছড়িয়ে থাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনেক কিছুই এখনো অজানা। অথচ এই পথে রয়েছে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এক বিশাল ভান্ডার।’

 প্রকৃতির এমন বৈচিত্র্যই শ্রীমঙ্গলকে চায়ের স্বর্গরাজ্য হিসেবে দেশ-বিদেশে পরিচিতি দিয়েছে উল্লেখ করে তাজুল ইসলাম জাবেদ বলেন, ‘এখানে এমন অনেক প্রাকৃতিক স্থান রয়েছে, যেগুলো এখনো পর্যটকদের কাছে পুরোপুরি পরিচিত নয়। পাহাড়ি এলাকায় রয়েছে অসংখ্য গুহা ও গিরিখাতসহ নানা আকর্ষণীয় স্থান, যেগুলোর অনেক কিছুই স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকদের কাছেও অজানা।’

 পর্যটকদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘অনেক পর্যটক শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে আসেন। কিন্তু সঠিক তথ্য ও পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনার অভাবে তাঁরা প্রকৃত সৌন্দর্যে ভরপুর অনেক জায়গায় যেতে পারেন না। আমাদের সঙ্গে যাঁরা যোগাযোগ করেন, তাঁদের এসব অজানা ও কম পরিচিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। শ্রীমঙ্গলের আনাচকানাচে ছড়িয়ে থাকা সৌন্দর্য পর্যটকদের সামনে তুলে ধরাই আমাদের লক্ষ্য।’

 তিনি আরও বলেন, ‘এ এলাকার মানুষ সত্যিই ভাগ্যবান। কারণ, প্রকৃতি এখানে দুহাত ভরে সৌন্দর্য দিয়েছে। প্রয়োজন শুধু এসব সম্পদকে পরিকল্পিতভাবে পরিচিত করা ও সংরক্ষণ করা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন এবং সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে শ্রীমঙ্গলের পর্যটন এলাকাগুলোকে আরও সুন্দরভাবে সাজানো গেলে এটি বিশ্বপর্যটনের মানচিত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিতে পারবে। একই সঙ্গে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটবে, সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান, বাড়বে স্থানীয় মানুষের আয় এবং সামগ্রিকভাবে উন্নত হবে এলাকার অর্থনীতি।’

 পরিকল্পিত উদ্যোগে হতে পারে নতুন পর্যটন আকর্ষণ

শ্রীমঙ্গল এমনিতেই দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। চা-বাগান, পাহাড়, বনাঞ্চল, হাওর ও প্রাকৃতিক জলাশয়ের কারণে প্রতিবছর দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক এখানে ছুটে আসেন। এরই মধ্যে চা-বাগানের লেক, জলধারা ও পানিতে ফুটে থাকা লাল শাপলা প্রকৃতির আরেকটি অনন্য সৌন্দর্যের পরিচয় তুলে ধরেছে।

 তাজুল ইসলাম জাবেদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে, শ্রীমঙ্গলের পর্যটন সম্ভাবনা কেবল পরিচিত কয়েকটি দর্শনীয় স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকা, গুহা, গিরিখাত, লেক ও জলধারাসহ বহু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এখনো যথাযথভাবে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হয়নি। প্রয়োজন সঠিক তথ্য, পরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থাপনা এবং দায়িত্বশীল উদ্যোগ।

 পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বেসরকারি সম্পত্তির মালিকানা ও নিরাপত্তার বিষয়টি অক্ষুণ্ন রেখেই এ ধরনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংরক্ষণ এবং সীমিত পরিসরে প্রকৃতিবান্ধব পর্যটনের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে বাগান কর্তৃপক্ষের অনুমতি, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, নিরাপদ যাতায়াত এবং নির্দিষ্ট দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ।

 তবে পর্যটনের নামে যেন লেকের প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট না হয়, সেদিকেও রাখতে হবে বিশেষ নজর। শাপলা ছেঁড়া, জলাশয়ে ময়লা ফেলা কিংবা ফুল ও জলজ উদ্ভিদের ক্ষতি করা থেকে দর্শনার্থীদের বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে পাহাড়ি গুহা, গিরিখাত ও বনাঞ্চলে পর্যটকদের প্রবেশের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

 প্রকৃতির এই সৌন্দর্য মানুষের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি সংরক্ষণের দায়িত্বও সবার। শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানের লেক, জলধারা ও লাল শাপলা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনুষঙ্গ নয়, এগুলো এ অঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

 চায়ের স্বর্গরাজ্য শ্রীমঙ্গলের পরিচিত সৌন্দর্যের ভান্ডারে লেক, জলধারা আর লাল শাপলা যেন যোগ করেছে নতুন এক মাত্রা। সবুজ পাহাড়ের বুকজুড়ে স্বচ্ছ জলরাশি আর লাল শাপলার লালিমা নীরবে জানিয়ে দিচ্ছে—প্রকৃতির সৌন্দর্য কখনো কখনো লোকচক্ষুর আড়ালেই সবচেয়ে বেশি মুগ্ধতা ছড়ায়।

সিলেটের খবর এর আরও খবর