img

রাধানাথ দেব চৌধুরী: শ্রীমঙ্গলের ইতিহাসে এক নীরব নির্মাতা

প্রকাশিত :  ১৮:৩৯, ০৪ জানুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৮:৪০, ০৪ জানুয়ারী ২০২৬

রাধানাথ দেব চৌধুরী: শ্রীমঙ্গলের ইতিহাসে এক নীরব নির্মাতা

সংগ্রাম দত্ত

শ্রীমঙ্গল—চা-বাগান, পাহাড় আর সবুজ প্রকৃতির শহর। এই শহরের ইতিহাস শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে গঠিত নয়; এর ভিত নির্মিত হয়েছে কিছু দূরদর্শী মানুষের চিন্তা, দান ও শ্রমে। তাঁদেরই একজন ছিলেন জমিদার, শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক রাধানাথ দেব চৌধুরী—যাঁর অবদান আজও শ্রীমঙ্গলের শিক্ষা, নগরায়ণ ও ভূগোলের ইতিহাসে অমলিন।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

রাধানাথ দেব চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন ৩১ আগস্ট ১৮৭৫ সালে। তিনি ছিলেন এক ঐতিহ্যবাহী জমিদার পরিবারের সন্তান। তাঁর পিতা চন্দ্রনাথ দেব চৌধুরী এবং সহধর্মিণী জয়তারা দেব চৌধুরী।

তাঁদের চার পুত্র—রাসবিহারী দেব চৌধুরী, পুলিন বিহারী দেব চৌধুরী, বিনোদ বিহারী দেব চৌধুরী ও সর্বকনিষ্ঠ ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী—পরবর্তীকালে সমাজ, রাজনীতি ও মানবসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

নবীগঞ্জের ভূবীরবাগ থেকে শ্রীমঙ্গল: জমিদারি ও বসতি স্থাপন

তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের হবিগঞ্জ মহকুমার নবীগঞ্জ থানার ভূবীরবাগ এলাকায় রাধানাথ দেব চৌধুরীর ছিল এক বিস্তৃত ও প্রভাবশালী জমিদারি। এই জমিদারি শুধু আর্থিক শক্তির প্রতীকই ছিল না; বরং এলাকার কৃষি, শিক্ষা ও সামাজিক কাঠামোতেও এর গভীর প্রভাব ছিল।

জমিদারি পরিচালনা ও ব্যবসায়িক প্রয়োজনে তিনি পরবর্তীতে শ্রীমঙ্গলের পুরান বাজার এলাকায় এসে স্থায়ী বসতি স্থাপন করেন। এই বসতিই ধীরে ধীরে তাঁর সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এবং শ্রীমঙ্গলের নগর উন্নয়নে নতুন গতি সঞ্চার করে।

ভূমি ক্রয়, নগরায়ণ ও অট্টালিকা নির্মাণ

রাধানাথ দেব চৌধুরী তৎকালীন সময়ে শ্রীমঙ্গল থানাধীন ডলুছড়া পাহাড় এলাকায় প্রায় ১৭৮ বিঘা জমি ক্রয় করেন। একসময়ের নির্জন এই পাহাড়ি অঞ্চল পরবর্তীতে তাঁর নামানুসারে “রাধানগর” হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

শুধু ভূমি ক্রয়েই সীমাবদ্ধ ছিলেন না তিনি। তৎকালীন সময়ে শ্রীমঙ্গল শহরের বিভিন্ন এলাকায় তিনি চুন-সুরকী দিয়ে নির্মিত একাধিক অট্টালিকা ও স্থায়ী ভবন নির্মাণ করেন। এসব ভবন সে সময়ের আধুনিক নির্মাণশৈলীর নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হতো এবং শ্রীমঙ্গলের প্রাথমিক নগর কাঠামো গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

শিক্ষা ও সমাজসেবায় ঐতিহাসিক অবদান

রাধানাথ দেব চৌধুরী বিশ্বাস করতেন—শিক্ষাই সমাজ উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার জন্য নিজস্ব জমি দান করেন।

তিনি পিতা-মাতার নামে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য চন্দ্রনাথ প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দীনময়ী বালিকা বিদ্যালয়।

এছাড়াও শ্রীমঙ্গল শহরের হবিগঞ্জ রোডে তিনি আখড়ার বিগ্রহ মন্দির ও নাটমন্দির নির্মাণ করে দেন, যা তৎকালীন সময়ে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।

শ্রীমঙ্গল টাউন কমিটি ও প্রশাসনিক ভূমিকা

১৯২৩ সালের আসাম মিউনিসিপাল অ্যাক্ট অনুযায়ী ১ অক্টোবর ১৯৩৫ সালে শ্রীমঙ্গল স্মল টাউন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

এই উপলক্ষে রাধানাথ দেব চৌধুরী ইংল্যান্ডের কেন্ট (Kent) শহর থেকে বিশেষভাবে কেক আমদানি করে টাউন কমিটির উদ্বোধনের আয়োজন করেন—যা শ্রীমঙ্গলের পৌর ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী ও স্মরণীয় ঘটনা।

শ্রীমঙ্গল টাউন কমিটির প্রথম পরিষদে (১৯৩৫–১৯৩৭) তিনি সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং শহরের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি সুদৃঢ় করতে কার্যকর ভূমিকা রাখেন।

রাধানগর: ঐতিহ্য থেকে আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র

আজকের রাধানগর পাহাড়ি এলাকায় আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক রিসোর্ট, বিলাসবহুল হোটেল, চা-বাগানঘেরা পর্যটন অবকাঠামো ও বিনোদন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নিয়মিত পদচারণায় রাধানগর এখন শ্রীমঙ্গলের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র।

যে জনপদ একসময় ছিল নিভৃত ও অনুন্নত পাহাড়ি অঞ্চল, সেটিই আজ আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছে—যার সূচনা হয়েছিল রাধানাথ দেব চৌধুরীর দূরদর্শী ভূমি পরিকল্পনার মাধ্যমে।

জমিদারি বিলুপ্তি ও উত্তরাধিকার বণ্টন

১৯৫০ সালে পাকিস্তান সরকার জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত ঘোষণা করলে নবীগঞ্জ থানার ভূবীরবাগ এলাকায় অবস্থিত রাধানাথ দেব চৌধুরীর বিশাল জমিদারি প্রজাস্বত্ব আইনের আওতায় সরকারের অধীনে চলে যায়।

আইনানুযায়ী তিনি পারিবারিক ভোগদখলের জন্য মোট ৫০ হাল জমি সংরক্ষণের অধিকার লাভ করেন।

এই ৫০ হাল জমি তিনি তাঁর চার পুত্রের মধ্যে বণ্টন করে দেন। এর মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্র রাসবিহারী দেব চৌধুরী পান ২৫ হাল জমি, এবং অবশিষ্ট ২৫ হাল জমি বণ্টিত হয় অন্য তিন পুত্রের মধ্যে।

পরবর্তী সময়ে বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে কিছু জমি বিক্রি হয়ে যায়, আবার অনেক অংশ বেদখল হয়ে পড়ে। তবুও এসব জমির ওপর গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক স্থাপনা আজও তাঁর সমাজমুখী চিন্তার সাক্ষ্য বহন করছে।

১৯৮০-এর দশকে তাঁর সর্বকনিষ্ঠ পুত্র ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী, যিনি ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ—এই তিনটি আমল দেখেছেন, তাঁর পিতার নামে শ্রীমঙ্গল শহরতলী এলাকায় বিরামপুরে প্রায় ৩১ শতক জমি দান করেন “রাধানাথ প্রাথমিক বিদ্যালয়” এর জন্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার ধারক বাহকরা বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে “বিরামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়” করেছেন, যা ভূমিদাতার নামকে প্রকারান্তরে অস্বীকার করেছে।

প্রয়াণ ও উত্তরাধিকার

১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৮ সালে, প্রায় ৮৩ বছর বয়সে, জমিদার ও শিক্ষানুরাগী রাধানাথ দেব চৌধুরী ইহলোক ত্যাগ করেন।

তিনি রেখে যান শিক্ষা, সমাজসেবা, নগরায়ণ ও জনপদ গঠনের এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার—যা আজও শ্রীমঙ্গলের ইতিহাস ও পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

শেষ কথা 

রাধানাথ দেব চৌধুরী কেবল একজন জমিদার ছিলেন না; তিনি ছিলেন শ্রীমঙ্গলের ইতিহাসের এক নীরব নির্মাতা।

ভূবীরবাগ থেকে শ্রীমঙ্গল, ডলুছড়া পাহাড় থেকে রাধানগর—প্রতিটি অধ্যায়ে তাঁর দূরদর্শিতা ও দানশীলতা আজও জীবন্ত।

একজন মানুষের চিন্তা ও কর্ম কীভাবে একটি জনপদের শতবর্ষের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে—রাধানাথ দেব চৌধুরী তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।


সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

শ্রীমঙ্গলের ‘পানু বাবু’ ধীরেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর ত্যাগ, সংগ্রাম ও স্বীকৃতি-বঞ্চনার ইতিহাস

প্রকাশিত :  ০৮:১৫, ১২ জুলাই ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অসংখ্য মানুষের অবদান আজও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির বাইরে রয়ে গেছে। কেউ সরাসরি যুদ্ধ করেছেন, কেউ সংগঠক হিসেবে মানুষকে প্রস্তুত করেছেন, আবার কেউ জীবনভর আদর্শ ও জনসেবার রাজনীতি করে গেছেন নীরবে। তেমনই এক মানুষ শ্রীমঙ্গলের নোয়াগাঁও গ্রামের ধীরেন্দ্র দত্ত চৌধুরী, যিনি সবার কাছে ছিলেন ‘পানু বাবু’ নামে পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করলেও নানা কারণে তিনি রাষ্ট্রীয় মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি। তাঁর জীবন তাই ত্যাগ, আদর্শ, নির্যাতন, জনসেবা এবং স্বীকৃতি-বঞ্চনার এক অনুলিখিত ইতিহাস।

ধীরেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর জন্ম ব্রিটিশ শাসনামলে তৎকালীন সিলেট জেলার দক্ষিণ শ্রীহট্ট মহকুমার (বর্তমানে মৌলভীবাজার জেলা) শ্রীমঙ্গল থানার নোয়াগাঁও গ্রামে। তাঁর পিতা ছিলেন স্বর্গীয় যতীন্দ্রমোহন দত্ত চৌধুরী এবং মাতা স্বর্গীয় বিন্দুবাসিনী দত্ত চৌধুরী। ভাইবোনদের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ।

তাঁদের পরিবার ছিল এলাকার একটি ঐতিহ্যবাহী ও সচ্ছল পরিবার। তাঁর পিতা ব্রিটিশ আমলে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একজন স্থানীয় নেতা ছিলেন। পরে ১৯৬০ সালে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম শুরু হলে তিনি প্রথম ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার) নির্বাচিত হন।

ধীরেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর শিক্ষাজীবন শুরু হয় নোয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে তিনি শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। বিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার পর নোয়াগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগ পেলেও স্বল্প বেতন ও ছোট চাকরি হওয়ায় তিনি সেখানে যোগ দেননি। উচ্চশিক্ষার জন্য ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কৈলাশহরের একটি কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে আইএ পাস করেন। পরবর্তীতে সেখানে তিনি সরকারি চাকরি পেলেও মাতৃভূমির টানে বেশি দিন সেখানে চাকরি করেননি।

পরিশেষে নিজ গ্রামে ফিরে এলে কয়েকজন স্থানীয় তথ্যদাতার মাধ্যমে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁর অবস্থানের খবর পেয়ে তাঁকে আটক করে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। সেখানে তাঁর ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয় এবং বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়। এই নির্যাতনের ফলে তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটে, যার প্রভাব তিনি আমৃত্যু বহন করেন।

এলাকায় ফিরে তিনি পুনরায় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ-মোজাফফর)-এর রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হলে স্থানীয়ভাবে ন্যাপ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিরোধ আন্দোলন সংগঠিত করেন। মার্চ ও এপ্রিল মাসজুড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা, প্রাথমিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন।

পরে মৌলভীবাজার হয়ে শেরপুর ও সিলেট অঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হন। পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যাপক আক্রমণ, চারদিক থেকে অবরোধ এবং ভারী বোমাবর্ষণের মুখে মুক্তিবাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হলে তিনিও সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যান।

ভারতে অবস্থানকালে তিনি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শিবিরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারণা চালান, তরুণদের উদ্বুদ্ধ করেন এবং নতুন যোদ্ধাদের যুদ্ধে পাঠানোর কাজে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি নিজ গ্রাম নোয়াগাঁওয়ে ফিরে আসেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে এলাকার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন।

১৯৭৩ সালের প্রথম ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি মাছ প্রতীক নিয়ে সদস্য (মেম্বার) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে সততা, নিষ্ঠা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি এলাকাবাসীর আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেন।

১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ন্যাপের রাজনীতি কঠিন সময়ে পড়ে। তাঁর এক বড় ভাই রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী রাজনৈতিক কারণে গ্রেপ্তার হন। এরপরও তিনি রাজনৈতিক আদর্শ থেকে সরে যাননি। ন্যাপের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের উদয়ন পত্রিকা এবং ন্যাপের মুখপত্র নতুন বাংলা এলাকায় বিতরণ করে মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করেন।

১৯৭৯ সালে শ্রীমঙ্গল নতুন বাজারের সুলভ ভাণ্ডারের সামনের গলিতে ৮-দলের একটি মিছিলে স্থানীয় বিএনপির কিছু কর্মী হামলা চালায়। এ সময় ধীরেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর ওপর আক্রমণ করা হয়। দূর থেকে ঘটনাটি দেখে তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন তাঁর বড় ভাই রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী। কিন্তু তিনিও হামলার শিকার হন। পরবর্তীকালে জানা যায়, হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য ছিলেন রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী; তবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হন দুই ভাইই।

১৯৮৩ সালে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তাঁর বড় ভাই রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী শ্রীমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়িত হয়, যা আজও স্থানীয়ভাবে স্মরণ করা হয়।

ব্যক্তিগত জীবনে ধীরেন্দ্র দত্ত চৌধুরী ছিলেন অবিবাহিত। অভিজাত ও সচ্ছল পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন। সরকারি চাকরির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও জনসেবার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজনীতিকেই জীবনের পথ হিসেবে বেছে নেন। সততা, নির্ভীকতা এবং সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

২০১৪ সালে সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের অনলাইনে আবেদন গ্রহণের উদ্যোগ নিলে তিনি গুরুতর অসুস্থ থাকায় আবেদন করতে পারেননি। একই সঙ্গে পরিবার ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনের অসচেতনতার কারণে ন্যাপ–কমিউনিস্ট পার্টি–ছাত্র ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত গেরিলা বাহিনীর তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয় মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি থেকেও তিনি বঞ্চিত হন। তবে ন্যাপের সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের দেওয়া একটি প্রত্যয়নপত্র এখনো পরিবারের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে, যা তাঁর মুক্তিযুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।

২০০৪ সালের পর নোয়াগাঁও গ্রামের কিছু প্রভাবশালী ও কুচক্রী মহলের প্ররোচনায় স্থানীয় জয়নাল ও হারুনের নেতৃত্বাধীন একটি চক্র তিন অবিবাহিত ভাইবোনকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ১৩ ইঞ্চি স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নিয়ে তাঁদের বিশাল সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা চালায়। কিন্তু শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. আহাদ মিয়া এবং শ্রীমঙ্গল থানার কয়েকজন কর্মকর্তার সাহসী ও সময়োপযোগী ভূমিকার ফলে সেই অপচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গ্রেপ্তার হন। পরিবারের দাবি, ওই চক্রটি এখনো তাঁদের সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

জীবনের শেষ সময়ে তিনি অসুস্থতা ও আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে দিন কাটিয়েছেন। পর্যাপ্ত চিকিৎসার সুযোগও তিনি পাননি। অবশেষে ২০১৫ সালের ২০ ডিসেম্বর রাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির তালিকায় তাঁর নাম নেই। তবু শ্রীমঙ্গলের নোয়াগাঁওয়ের মানুষের কাছে ধীরেন্দ্র দত্ত চৌধুরী আজও ‘পানু বাবু’—একজন সৎ রাজনীতিক, মুক্তিযুদ্ধের নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক এবং জনসেবায় আত্মনিয়োগ করা বিরল ব্যক্তিত্ব। ইতিহাসের আনুষ্ঠানিক নথিতে তাঁর নাম স্থান না পেলেও মানুষের স্মৃতি, শ্রদ্ধা এবং স্থানীয় ইতিহাসে তিনি এখনো বেঁচে আছেন। তাঁর জীবন মনে করিয়ে দেয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেবল স্বীকৃতির তালিকায় সীমাবদ্ধ নয়; অসংখ্য নীরব ত্যাগ, আদর্শ ও আত্মনিবেদনের গল্পও সেই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সিলেটের খবর এর আরও খবর