img

শ্রীমঙ্গলের সপ্তগ্রাম ও শ্রী বাসুদেব মন্দির: প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্য বহনকারী এক বিস্মৃত ইতিহাস

প্রকাশিত :  ০৮:৩৪, ০৫ জানুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৮:৩৬, ০৫ জানুয়ারী ২০২৬

শ্রীমঙ্গলের সপ্তগ্রাম ও শ্রী বাসুদেব মন্দির: প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্য বহনকারী এক বিস্মৃত ইতিহাস

সংগ্রাম দত্ত: শ্রীমঙ্গলের প্রাচীন ইতিহাসে যে কয়েকটি জনপদ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, সপ্তগ্রাম বা সাতগাঁও তাদের মধ্যে অন্যতম। অরণ্য, পাহাড় ও হাওরের প্রাকৃতিক বেষ্টনীতে গড়ে ওঠা এই জনপদ একসময় ছিল রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সপ্তগ্রামের ইতিহাস মূলত যুক্ত হয়ে আছে উপমহাদেশের প্রখ্যাত চিকিৎসাশাস্ত্রবিদ চক্রপাণি দত্ত ও তাঁর উত্তরসূরি দত্ত বংশের সঙ্গে।

চক্রপাণি দত্ত ছিলেন চিকিৎসাশাস্ত্রের কালজয়ী গ্রন্থ চক্রদত্ত-এর প্রণেতা। খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকে সিলেটের তৎকালীন শাসক গৌড় গোবিন্দ দুরারোগ্য উদর রোগে আক্রান্ত হলে রাজমহিষীর আকুল আবেদনে চক্রপাণি দত্ত সিলেটে আগমন করেন। তাঁর সুচিকিৎসায় রাজা আরোগ্য লাভ করেন। ১২৮৪ খ্রিস্টাব্দে বৃদ্ধ চক্রপাণি দত্ত তাঁর তিন পুত্র—উমাপতি, মহীপতি ও মুকুন্দকে সঙ্গে নিয়ে সিলেটে আসেন। গঙ্গাহীন দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসে অনিচ্ছুক হওয়ায় তিনি নিজে প্রত্যাবর্তন করলেও মহীপতি ও মুকুন্দকে এদেশে রেখে যান।

রাজা গৌড় গোবিন্দ মহীপতিকে দক্ষিণ শূর এবং মুকুন্দকে গোয়ার নামক জনপদের শাসনভার প্রদান করেন। দক্ষিণ শূর ছিল এক বিস্তৃত অঞ্চল—উত্তরে বরাক নদী, পূর্ব-পশ্চিম ও দক্ষিণে পাহাড়ঘেরা এবং দক্ষিণে ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। মহীপতি হাইল হাওরের পশ্চিম প্রান্তে বসত গড়ে তোলেন এবং পূর্ব বাসস্থানের স্মৃতিতে জনপদের নামকরণ করেন ‘সপ্তগ্রাম’। আজও দক্ষিণ শূরের স্মৃতিবাহী উত্তরসূরি গ্রাম হিসেবে সপ্তগ্রামের অস্তিত্ব টিকে আছে।

মহীপতির উত্তরাধিকার কল্যাণ দত্তের শাসনামলে সপ্তগ্রাম ত্রিপুরার রাজার অধীনে চলে যায়। কল্যাণ দত্ত সামন্ত রাজা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করলেও তাঁর পরিবার নানা রাজনৈতিক সংঘাত ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে যায়। তাঁর পুত্রদের নামে একাধিক গ্রাম প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আজও ইতিহাসের নিদর্শন বহন করে।

এই বংশের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন শ্রীবৎস দত্ত। তিনি গৌড়ের নবাব হুসেন শাহের ত্রিপুরা অভিযানে সক্রিয় সহযোগিতা করেন। ত্রিপুরা বিজয়ের পর নবাব তাঁকে ভানুগাছ, ছয়ছিরি, ইটা, পাচাউন ও পুটিজুরি পরগনার অধিকার প্রদান করেন এবং ‘দত্ত খান’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তাঁর বড় ভাই ভব দত্ত পরিচিত ছিলেন ‘বড়দত্ত খান’ নামে।

শ্রীবৎস দত্তের পুত্র হরিদাস দত্ত সপ্তগ্রাম ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেন। ইতিহাসে জানা যায়, বর্তমান মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভূনবীর ইউনিয়নের অন্তর্গত ভূনবীর গ্রামটি প্রতিষ্ঠা করেন শ্রীবৎস দত্তের পুত্র হরিদাস দত্ত। তিনি তাঁর বসতবাড়ির সংলগ্ন এলাকায় একটি শ্রী বাসুদেব মন্দির নির্মাণ করেন। বৌদ্ধ স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত এই মন্দিরটি আজও দাঁড়িয়ে আছে প্রায় পাঁচ শতাব্দীর ইতিহাস বুকে ধারণ করে, যদিও মন্দিরের শ্রী বাসুদেব মূর্তি বহু আগেই চুরি হয়ে গেছে।

হরিদাস দত্তের পরবর্তী উত্তরাধিকার কালী কুমার দত্ত চৌধুরী ভূনবীর জমিদার বাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। জমিদারির ঐশ্বর্য আজ আর নেই, তবে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে প্রাচীন বাসুদেব মন্দিরটি এখনো নিজ মহিমায় দাঁড়িয়ে আছে। জমিদার কালী কুমার দত্ত চৌধুরী ১৮৯৬ সালে নিজ বাড়িতে এলাকার শিশুদের ইংরেজি শিক্ষার জন্য ভূনবীর এমই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, যা ১৯১৫ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। পরবর্তীতে এটি দশরথ উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে পুনর্গঠিত হয়।

জমিদার বাড়ির শেষ প্রজন্মের মধ্যে ভূবন দত্ত চৌধুরী বাংলাদেশে এবং প্রমোদ দত্ত চৌধুরী (রবি) ভারতের শিলচরে ১৯৯০-এর দশকে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁদের পরবর্তী উত্তরসূরিদের অনেকেই দেশান্তরী হন।

পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন—ত্রিপুরা রাজ্যের কমলপুরে বসবাসরত বিশ্বজিৎ দত্ত চৌধুরী (টুটু) ও তাঁর সন্তানরা; স্বর্গীয় স্বপন দত্ত চৌধুরীর সন্তান দীপ দত্ত চৌধুরী ও ববি দত্ত চৌধুরী; আসামের করিমগঞ্জ জেলার সুপ্রাকান্দিতে বসবাসরত বীরেন্দ্র কিশোর দত্ত চৌধুরীর সন্তানরা, যারা বর্তমানে আসামের রাজধানী গৌহাটিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।

এই বংশেরই এক কন্যা ইন্দিরা দত্ত চৌধুরী ২০২০ সালের ২১ নভেম্বর শ্রীমঙ্গলের পূর্বাশা আবাসিক এলাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন শ্রীমঙ্গল ও বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের বাম রাজনীতির পুরোধা, প্রবীণ সাংবাদিক এবং আশির দশকে শ্রীমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর সহধর্মিণী। রাজনৈতিক আন্দোলন, প্রগতিশীল সাংবাদিকতা ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর ভূমিকা শ্রীমঙ্গল অঞ্চলের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।

তবে বিনোদবিহারী দত্ত চৌধুরী ও মৃত্যুঞ্জয় দত্ত চৌধুরীর বংশধরদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

বর্তমানে ঐ জমিদার বাড়িতে বসবাস করছেন জনৈক সুনীল দেবের পরিবার। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এই প্রাচীন শ্রী বাসুদেব মন্দিরে আজও প্রতিবছর নিয়মিত বাৎসরিক পূজা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, যা এই অঞ্চলের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতাকে বহন করে চলেছে।

সপ্তগ্রাম ও শ্রী বাসুদেব মন্দির তাই কেবল একটি স্থান বা স্থাপনা নয়—এটি প্রায় পাঁচ শতাব্দী প্রাচীন এক জীবন্ত ইতিহাস। সংরক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার অভাবে এই ঐতিহ্য আজ বিস্মৃতির পথে, তবু প্রাচীন ইট-পাথর আর লোককথার স্মৃতিই জানান দেয়—সপ্তগ্রাম এখনো ইতিহাসের মানচিত্রে এক নীরব কিন্তু গৌরবময় উপস্থিতি।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

লাউয়াছড়ায় সড়ক পার হতে গিয়ে গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ গেল বিপন্ন মুখপোড়া হনুমানের

প্রকাশিত :  ১৫:৫৯, ২৫ জুলাই ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে সড়ক পার হওয়ার সময় দ্রুতগতির গাড়ির ধাক্কায় বিপন্ন প্রজাতির একটি মুখপোড়া হনুমান (Capped Leaf Monkey) মারা গেছে। শুক্রবার (২৪ জুলাই) দুপুরের পর কোনো একসময় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভানুগাছ–শ্রীমঙ্গল সড়কের মাগুরছড়া গ্যাসফিল্ড এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিকেল পাঁচটার দিকে বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী কাজল হাজরা মোটরসাইকেলে ওই সড়ক দিয়ে শ্রীমঙ্গলের দিকে যাওয়ার সময় রাস্তার পাশে হনুমানটিকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে তিনি বিষয়টি বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগকে জানান।

সন্ধ্যা সাতটার দিকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের বিট অফিসের বনকর্মীরা ঘটনাস্থল থেকে মৃত হনুমানটি উদ্ধার করেন। পরে সেটি জানকিছড়া বন্যপ্রাণী রেসকিউ সেন্টারের কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মধ্য দিয়ে শ্রীমঙ্গল–কমলগঞ্জ সড়কটি চলে গেছে। ফলে বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া এ সড়কটি বন্যপ্রাণীদের চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার ওপর দিয়ে গেছে। প্রতিবছরই এ সড়কে যানবাহনের নিচে চাপা পড়ে লাউয়াছড়া বনাঞ্চলের বিভিন্ন প্রজাতির পশুপাখি মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যায়।

শুধু সড়কপথ নয়, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে গেছে আখাউড়া–সিলেট রেলপথও। ফলে সড়ক ও রেল—দুই ধরনের যোগাযোগ অবকাঠামোর কারণে বন্যপ্রাণীদের চলাচলের ওপর বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে লাউয়াছড়া ও আশপাশের বনাঞ্চলের বন্যপ্রাণী ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ রেলপথে মাঝেমধ্যে মানুষও ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় বন্যপ্রাণীপ্রেমীদের অভিযোগ, বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া সড়কটিতে অনেক চালক অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালান। ফলে বন্যপ্রাণীরা সড়ক পার হওয়ার সময় প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। তাঁদের মতে, সড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং বন্যপ্রাণী চলাচলের এলাকাগুলোতে কার্যকর নজরদারি না থাকায় এমন ঘটনা বারবার ঘটছে।

লাউয়াছড়া এলাকার বাসিন্দা ও গণমাধ্যমকর্মী সাজু মারচিয়াং মৃত হনুমানটির ছবি ও ঘটনার তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশ করলে বিষয়টি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

মুখপোড়া হনুমান বাংলাদেশের একটি বিপন্ন বন্যপ্রাণী। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) বাংলাদেশের রেড লিস্টে এ প্রজাতিটি অন্তর্ভুক্ত। বনভূমি সংকুচিত হওয়া, আবাসস্থলে মানুষের হস্তক্ষেপ এবং সড়ক দুর্ঘটনাসহ নানা কারণে এ প্রজাতির সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

বন্যপ্রাণীপ্রেমীরা বলছেন, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মধ্য দিয়ে যাওয়া সড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন এবং নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি রেলপথে বন্যপ্রাণীর চলাচল বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তাঁদের মতে, দুর্ঘটনার পর মৃত প্রাণী উদ্ধার করাই যথেষ্ট নয়; লাউয়াছড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাওয়া সড়ক ও রেলপথে বন্যপ্রাণী এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।


সিলেটের খবর এর আরও খবর