img

শ্রীমঙ্গলে অবৈধ সিলিকা বালুর অদৃশ্য সাম্রাজ্য: মোবাইল কোর্ট, প্রাণহানি আর অভিযোগের পাহাড়

প্রকাশিত :  ০৪:১৭, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬

ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল হোতারা

শ্রীমঙ্গলে অবৈধ সিলিকা বালুর অদৃশ্য সাম্রাজ্য: মোবাইল কোর্ট, প্রাণহানি আর অভিযোগের পাহাড়

সংগ্রাম দত্ত: পর্যটন নগরী ও চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গল—যেখানে পাহাড়ি ছড়া, বনাঞ্চল ও চা-বাগান প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে—সেই শ্রীমঙ্গলেই বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে অবৈধ সিলিকা বালু উত্তোলন ও পাচারের এক শক্তিশালী অদৃশ্য সাম্রাজ্য। প্রশাসনের অভিযান, মোবাইল কোর্ট, এমনকি প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও এই চক্রের লাগাম আজও টানা যায়নি।

বরং প্রশ্ন উঠছে—কারা এই চক্রের নেপথ্যে, আর কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে দমন অভিযান?

৩,৪২০ ঘনফুট বালু জব্দ: সফল অভিযান নাকি নিয়মিত আনুষ্ঠানিকতা?

মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার লাংলিয়া ছড়া ও উদনা ছড়ায় খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর (বিএমডি) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈকত রায়হানের নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট অভিযান চালানো হয়। অভিযানে ৩,৪২০ ঘনফুট সিলিকা বালু জব্দ করা হয়।

জব্দকৃত বালু স্থানীয় চেয়ারম্যানের জিম্মায় রেখে বিধি অনুযায়ী উন্মুক্ত নিলামে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কাগজে-কলমে এটি একটি সফল অভিযান। কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—এই পরিমাণ বালু মোট উত্তোলনের তুলনায় অতি নগণ্য অংশ।

স্থানীয়দের ভাষায়, “যা ধরা পড়ে, তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বালু প্রতিদিন রাতের আঁধারে পাচার হয়ে যায়।”

পাহাড়ি ছড়া থেকে ট্রাক—পুরো রুটই ওপেন সিক্রেট

শ্রীমঙ্গলের চারপাশে থাকা পাহাড়ি ছড়াগুলো—লাংলিয়া, উদনা, জাগছড়াসহ একাধিক স্থান—দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বালু উত্তোলনের মূল উৎস। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নির্দিষ্ট কয়েকটি সিন্ডিকেট এই ছড়াগুলো ‘এলাকা ভাগ’ করে নিয়ন্ত্রণ করে।

রাত নামলেই শুরু হয় বালু তোলা, আর ভোর হওয়ার আগেই ট্রাক বোঝাই বালু শহর ছাড়ে। ভূনবীর, সিন্দুরখান ও শ্রীমঙ্গল ইউনিয়নের নোয়াগাঁও এলাকাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বালু পাচারের প্রধান করিডর।

বিশেষ করে নোয়াগাঁও গ্রামের হেলদি চয়েজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেডের সামনের জাগছড়া থেকে উত্তোলিত বালু জোরপূর্বকভাবে একাধিক শিল্পপতি সিরাজুল ইসলাম হারুন মিয়া, অঞ্জু বর্মন ও শ্রীমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর ভূমির উপর দিয়ে পাচার করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

ধরা পড়ে শ্রমিক, অদৃশ্য থাকে রাঘববোয়াল 

প্রশ্ন হলো—এত বড় আকারের অবৈধ কার্যক্রমে কারা ধরা পড়ছে?

উত্তর একটাই—ড্রাইভার, হেলপার আর দিনমজুর শ্রমিক।

অভিযানের সময় মাঝে মাঝে দু-একটি ট্রাক আটক হয়, চালান কাটা হয় কোটি টাকার অঙ্কে। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব চালান আদায়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত পড়ে ট্রাক মালিক বা শ্রমিকদের ওপরই। মূল অর্থ জোগানদাতা ও সিদ্ধান্তদাতারা থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে।

স্থানীয় এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “নাম জানলে বুঝবেন, কারো বিরুদ্ধে হাত দেওয়ার সাহস নেই।”

রাজনীতি, প্রশাসন ও সাংবাদিকতার অস্বস্তিকর যোগসূত্র

অনুসন্ধানে সবচেয়ে স্পর্শকাতর যে তথ্য উঠে এসেছে, তা হলো—এই চক্রের সঙ্গে রাজনীতি, প্রশাসন এবং সাংবাদিকতার একাংশের সম্ভাব্য যোগসাজশ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্তদের অনেকেই কোনো না কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত। সরকার বদলালেও বালুর ব্যবসা বন্ধ হয় না—শুধু রং বদলায়।

আরও উদ্বেগজনক হলো, প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে দু-একজনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে যখন দৈনিক কালের কণ্ঠ-এর মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি মো. সাইফুল ইসলাম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে এক প্রভাবশালী সাংবাদিকের নাম ইঙ্গিত করে জড়িত থাকার কথা তুলে ধরেন। এই পোস্টের পরও দৃশ্যমান কোনো তদন্ত শুরু না হওয়ায় প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

প্রাণহানি: সবচেয়ে ভয়াবহ মূল্য

অবৈধ বালু উত্তোলনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—মানবিক বিপর্যয়।

ভূনবীর ইউনিয়নের পাত্রীকুল এলাকায় বালুবাহী ট্রাকের চাপায় এক বৃদ্ধ নারী ও এক শিশু নিহত হন। সিন্দুরখান বাজার এলাকায় একইভাবে এক ছাত্রের প্রাণহানি ঘটে।

এসব ঘটনার পর স্থানীয়রা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন, স্লোগান ওঠে—“বালু চাই না, প্রাণ চাই।” কিছুদিন উত্তোলন বন্ধ থাকলেও পরে আবার আগের মতোই শুরু হয়।

অভিযোগ যায়, ব্যবস্থা আসে না

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অবৈধ উত্তোলনের বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে একাধিকবার লিখিত ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অভিযোগের পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ফলে জনমনে প্রশ্ন—তাহলে কি শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি ছড়া, পরিবেশ ও মানুষের জীবন সঙ্ঘবদ্ধ প্রভাবশালী বালু সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি?

শেষ প্রশ্ন: শ্রীমঙ্গল কি রক্ষা পাবে?

পরিবেশবিদদের মতে, পাহাড়ি ছড়া থেকে নির্বিচারে সিলিকা বালু উত্তোলন শ্রীমঙ্গলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ধ্বংস করছে। ভূমিধস, পানিপ্রবাহের পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।

সবকিছু জেনেও যদি মূল হোতারা ধরা না পড়ে, তাহলে প্রশ্ন একটাই—এই অনুসন্ধান কবে পরিণত হবে বিচার ও জবাবদিহিতায়?

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

গোয়াইনঘাটে নাতনিকে অপহরণে বাধা দেওয়া দাদিকে হত্যা: মূল আসামি গ্রেপ্তার

প্রকাশিত :  ০৬:৫৫, ১৮ মে ২০২৬

সিলেট জেলার গোয়াইনঘাটে গভীর রাতে বসতঘরে ঢুকে এক কিশোরীকে (১৪) অপহরণে বাধা দেওয়ায় ছুরিকাঘাতে বৃদ্ধা হত্যার ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।  গতকাল রোববার (১৭ মে) ভোরে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ।

চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মূল আসামিকে গ্রেফতার করেছে গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ। র‌্যাব-৯ সিলেটের সহায়তায় পরিচালিত অভিযানে গ্রেফতার হওয়া হারুন রশিদ (৩৫) প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার (১৬ মে) দিবাগত রাত আনুমানিক ৩টা ২০ মিনিটে প্রবল বর্ষণের সুযোগ নিয়ে কয়েকজন দুর্বৃত্ত নয়াপাড়া (বীরমঙ্গল হাওর) এলাকার একটি বসতঘরে প্রবেশ করে। এসময় তারা ঘরে থাকা কিশোরীকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার চেষ্টা চালায়। কিশোরীর চিৎকারে পরিবারের সদস্যরা এগিয়ে এলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়।

একপর্যায়ে কিশোরীর দাদি দিলারা বেগম বাধা দিতে গেলে দুর্বৃত্তরা তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে বুকের ডান পাশে আঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। হামলায় আহত কিশোরী বর্তমানে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ঘটনার পর নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে গোয়াইনঘাট থানায় (১৭মে) রবিবার একটি হত্যা মামলা নং-১২ দায়ের করা হয়েছে। মামলা দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারা এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭/৩০ ধারায় এ মামলাটি রুজু করা হয়। মামলার তদন্ত দায়িত্ব পালন করছেন থানার এসআই (নিঃ) কাজী আশরাফুল হক।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারকৃত হারুন রশিদের সঙ্গে নিহত পরিবারের ছেলে আম্বিয়া আহমদের পূর্ব থেকে আর্থিক লেনদেন ও বিরোধ ছিল। সেই পূর্ব শত্রুতার জের ধরেই পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা।

ঘটনার পরপরই পুলিশ প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত ও গোয়েন্দা তৎপরতা শুরু করে। পরে র‌্যাব-৯-এর সহযোগিতায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে মূল আসামিকে তার ফুফুর বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ বিষয়ে গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ঘটনার পরপরই পুলিশ গুরুত্বসহকারে তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মূল আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর