img

সুন্দরবনে বেড়েছে চোরা হরিণশিকারিচক্রের দৌরাত্ম্য

প্রকাশিত :  ০৯:১৩, ২০ মে ২০২৬

উৎসব ঘিরে বাড়ছে বন্যপ্রাণী নিধন, অভিযুক্তদের পেছনে ‘গডফাদার’ ও প্রভাবশালীদের ছায়া

সুন্দরবনে বেড়েছে চোরা হরিণশিকারিচক্রের দৌরাত্ম্য

সংগ্রাম দত্ত: বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে চোরা হরিণশিকারিচক্র। বনজুড়ে হরিণের সংখ্যা বাড়ার সরকারি তথ্যের বিপরীতে বাস্তবে থামছে না শিকার। বরং উৎসব-পার্বণ এলেই সক্রিয় হয়ে উঠছে সংঘবদ্ধ শিকারি চক্র। স্থানীয়দের অভিযোগ, অসাধু বনকর্মকর্তা, প্রভাবশালী মহল এবং পাচারকারীদের যোগসাজশে বছরের পর বছর ধরে চলেছে এই বন্যপ্রাণী নিধন।

সম্প্রতি খুলনার ডুমুরিয়ায় হরিণের মাংস জব্দকে কেন্দ্র করে পুলিশের দুই সদস্যের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ ও জব্দকৃত মাংস ভাগাভাগির অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এনেছে পুরো চক্রটিকে।

হরিণের মাংস জব্দ, অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার মাদারতলা এলাকায় গত ১২ মে অভিযান চালিয়ে ১৫ কেজি হরিণের মাংসসহ সুফল মণ্ডল নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। অভিযোগ ওঠে, শোভনা পুলিশ ক্যাম্পের দুই সদস্য মামলার ভয় দেখিয়ে ওই ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা আদায় করেন এবং জব্দকৃত মাংস নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন।

প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় রোববার (১৭ মে) কনস্টেবল মো. মাইনুল ইসলাম ও মো. মুছাব্বির হোসেনকে খুলনা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে।

ডুমুরিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আছের আলি বলেন, “ঘটনার বিষয়ে তদন্ত চলছে। হরিণের মাংস কোথা থেকে এসেছে এবং এর সঙ্গে আর কারা জড়িত তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”

সংখ্যা বাড়লেও থামছে না শিকার

বন বিভাগের তথ্যমতে, বাংলাদেশের অংশে সুন্দরবনের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চল নিয়ে পশ্চিম সুন্দরবন এবং বাগেরহাট ও খুলনার অংশ নিয়ে পূর্ব সুন্দরবন গঠিত।

২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে আইইউসিএনের জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনে বর্তমানে হরিণের সংখ্যা ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৪টি। ২০০৪ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৮৩ হাজার।

তবে সংখ্যাগত উন্নতি সত্ত্বেও বনে থামেনি অবাধ শিকার। স্থানীয়দের ভাষ্য, সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত দেড় শতাধিক পেশাদার চোরাশিকারি চক্র সক্রিয় রয়েছে।

জেলের ছদ্মবেশে শিকার, ফাঁদে আটকা পড়ছে বাঘও

সুন্দরবন-সংলগ্ন কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারা জানান, শিকারিরা সাধারণত জেলের ছদ্মবেশে বনে প্রবেশ করে। মাছ ধরার জালের সঙ্গে তারা নিয়ে যায় শক্ত দড়ি। পরে বনের গভীরে হরিণ চলাচলের পথে তৈরি করা হয় ফাঁদ।

ফাঁদে শুধু হরিণ নয়, অনেক সময় আটকা পড়ে বন্য শুকর এমনকি রয়েল বেঙ্গল টাইগারও।

শিকার শেষে বনের ভেতরেই হরিণ জবাই করে মাংস লোকালয়ে এনে বিক্রি করা হয়। চামড়া, শিং, মাথা ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিশেষ কৌশলে সংরক্ষণ করে পাচার করা হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।

স্থানীয়দের দাবি, ব্যবহৃত ফাঁদগুলো শিকার শেষে মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়, যাতে সুযোগ বুঝে আবার ব্যবহার করা যায়।

উৎসব এলেই বাড়ে মাংসের চাহিদা

সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় সারা বছরই হরিণের মাংসের গোপন বাজার সক্রিয় থাকলেও উৎসব-পার্বণে এর চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

জানা গেছে, অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি হরিণের মাংস দিয়ে আয়োজন করেন বিশেষ ভোজ। আবার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ‘খুশি’ করতেও উপহার হিসেবে পাঠানো হয় এই নিষিদ্ধ মাংস।

বর্তমানে সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রতি কেজি হরিণের মাংস বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায়। জেলা শহরগুলোতে এর দাম পৌঁছে যায় ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকায়। আর জীবিত একটি হরিণের দাম চাওয়া হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত।

‘গডফাদারদের’ ছত্রছায়ায় বনঅপরাধ

স্থানীয়দের অভিযোগ, সুন্দরবন-সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় চিহ্নিত কয়েকটি বনঅপরাধী চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। এদের অনেকেই বংশ পরম্পরায় শিকারের সঙ্গে জড়িত। তাদের পেছনে রয়েছে স্থানীয় গডফাদার ও রাজনৈতিক ছত্রছায়া।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, “মাঝেমধ্যে মাংস বা চামড়া উদ্ধার হলেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।”

‘যা ধরা পড়ে, তার চেয়ে বেশি শিকার হয়’

সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, “সুন্দরবনে বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণ। কিন্তু উদ্বেগজনক হারে এই প্রাণী শিকার হচ্ছে। যা আটক হয়, বাস্তবে তার কয়েকগুণ বেশি হরিণ মারা পড়ে।”

তিনি বলেন, “অধিকাংশ ক্ষেত্রে বহনকারীরা ধরা পড়ে, মূল শিকারি বা পাচারকারীরা নয়। আবার দুর্বল আইনের কারণে অভিযুক্তরা দ্রুত জামিনে বের হয়ে একই কাজে জড়িয়ে পড়ে।”

কোন এলাকাগুলো বেশি ঝুঁকিতে

বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যে জানা গেছে, সুন্দরবন-সংলগ্ন খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর এবং বাগেরহাটের মোংলা ও শরণখোলায় হরিণ শিকারের প্রবণতা বেশি।

এসব অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ জীবিকার জন্য সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। সেই সুযোগে কিছু মানুষ জড়িয়ে পড়ছে বনজ অপরাধে।

বন বিভাগের দাবি— টহল জোরদার

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন,“বনে পেতে রাখা বিপুল পরিমাণ ফাঁদ উদ্ধার ও ধ্বংস করায় আগের তুলনায় হরিণ শিকার কমেছে।”

পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমান গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, “উৎসবকে কেন্দ্র করে অসাধু চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাদের দমনে সার্বক্ষণিক টহল ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।”

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, “সুন্দরবনকেন্দ্রিক অপরাধ দমনে বন বিভাগ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। তবে সীমিত জনবল, বনদস্যুদের তৎপরতা এবং ভৌগোলিক জটিলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।”

অন্যদিকে কোস্টগার্ড ও পুলিশের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, সুন্দরবন ও উপকূলীয় এলাকায় চোরাচালান, বনজ সম্পদ লুণ্ঠন ও অবৈধ কর্মকাণ্ড ঠেকাতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।


বাংলাদেশ এর আরও খবর

img

হাসপাতালের তরকারি মুখে নিয়েই ফেলে দিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী

প্রকাশিত :  ১০:৫৮, ২০ মে ২০২৬

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন হঠাৎ খুলনা সদর হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন। এ সময় হাসপাতালের খাবার ঘর পরিদর্শনে গিয়ে রোগীদের জন্য তৈরি করা সবজি মুখে দিয়ে ফেলে দেন তিনি।

আজ বুধবার (২০ মে) সকালে খুলনা সদর হাসপাতালে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে এ চিত্র দেখেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ সময় রোগীদের খোঁজখবর নেন ও হাসপাতালে সার্বিক পরিবেশ পরিদর্শন করেন।

এতে উপস্থিত কর্মচারীদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, এ ধরনের তরকারি আপনাদের বাসায় রান্না হলে কি খেতেন? এ সময় সুপারিন্টেনডেন্টকে ভালো মানের তরকারি সরবরাহের নির্দেশ দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

রোগীদের সঙ্গে কথা বলে রাবিস ভ্যাকসিন নিয়ে হয়রানির অভিযোগ এবং টাকা দিয়ে ভ্যাকসিন কেনার ঘটনা হাতেনাতে ধরে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক গাজী রফিকুল ইসলামকে ধমক দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। 

এ সময় মন্ত্রী জানতে চাইলে রফিকুল ইসলাম বলেন, সরবরাহ না থাকায় সমস্যা তৈরি হয়েছে।

তখনই স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ঢাকায় ফোন করেন। তিনি জানতে পারেন, ভ্যাকসিন আনার জন্য কোনো ধরনের যোগাযোগ করেননি তত্ত্বাবধায়ক। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ মন্ত্রী দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।

এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু ও জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত।


বাংলাদেশ এর আরও খবর